রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৮
ফারহানা চৌধুরী
-“এবার তো বলো, এখানে কেন? তাও এমন সময়?”
কেমন ছলচাতুরী করে জবাব এলো,
-“লোকে যা করে তাই করতে।”
অরু কপাল কুঁচকালো,
-“মানে?”
মিশমি হাসে। অরুর হাত টেনে, তাকে একপ্রকার বগলদাবা করে নিয়ে যেতে লাগল ভেতরে। যেতে যেতেই বলে উঠল,
-“বিয়ে করবো, তাই।”
চলন্ত পদযুগল থমকে গেল সহসা। মেয়েটা বিস্ময়ে হতবাক। তার হতভম্ব ভাবে মিশমি যেন আনন্দ পেল। মজা লুটে বলল,
-“কি হলো? বিয়ের কথা শুনেই ওমন থ মেরে আছো কেন?”
অরু হতবাক স্বরে আওড়ায়,
-“তুমি বিয়ে করবে?”
-“হ্যাঁ। কেন? আমার বিয়ে করায় বারণ আছে বুঝি?”
অরু তৎক্ষনাৎ নাথা নাড়ে,
-“তা নেই। তবে—”
-“তবে?”
-“তবে এমন হুট করে কেন? তারউপর কাকে বিয়ে করছো তুমি?”
মিশমি ছল করে হাসে,
-“সে করছি একজনকে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“আমার মাথার দশ হাত উপর দিয়ে যাচ্ছে সব মিশমি। আই মিন, হুট করে এসব কেন?”
মিশমি তার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করার বিশেষ প্রয়োজন বোধহয় দেখলো না। বরং পাল্টা বলল,
-“শোনো, ভেতরে গেলেই আমার হবু বরের সুদর্শন মুখখানা দেখতে পাবে। অবশ্য সেখানে আরো একজন আছে। দুজনেই তোমার পরিচিত। তুমি চেনো তাদের। খুব ভালো করেই চেনো।
এখন তোমার কাজ হলো, তুমি শুধু যাবে। গিয়ে লম্বা করে টেনে টেনে একটা সালাম দিবে। এরপর আমাদের বিয়ের রেজিস্টার হবে। তুমি তারপর ঘ্যাচাং করে একটা সিগনেচার করবে। এরপর আমি, তোমার এতো কাজের কৃতজ্ঞ উপহার সরূপ তোমার সুন্দর গাল দু’টোতে দু’টো চটাশ চটাশ চুমু খাবো। বুঝলে?”
অরু বাকরুদ্ধ। মেয়েটা কি পাগল? কিসব বলছে? তার ভাবনাচিন্তার অন্ত ঘটলো না। খেয়াল হলো, মিশমি তন্মধ্যেই তার হাত টেনে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। অরু বাঁধ সাধে না। চুপচাপ চঞ্চল পা চালিয়ে ভেতরে গেল। এবং…. ভেতরে ঢুকতেই হতভম্ব হয়ে গেল দু’খানা পরিচিত মুখ দেখে। বে-শ চমকানোর ফলে কেমন চেঁচিয়ে উঠে মুখ চেপে ধরলো। বড়সড় চোখ করে পাশ ফিরতেই মিশমিকে মিটিমিটি করে হাসতে দেখল। মেয়েটা ওমনিই বলল,
-“কি হলো? তাড়াতাড়ি চলো, বিয়ে করবো তো আমি।”
মেয়েটাকে বিয়ে পাগল বললে চলনসই হবে বোধহয়। এতো বিয়ে বিয়ে করছে! এখানে আসার পর থেকে বোধহয় দশ শব্দের বাক্যে নয় শব্দই বোধহয় বিয়ে নিয়ে। অরু অদৃশ্যভাবে কপাল চাপড়ালো। তার দিকে চেপে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এনারা এখানে কেন?”
মিশমি অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে চায়,
-“ওমা! বিয়ে করবো না? বর ছাড়া বিয়ে হয়?”
অরু কপাল কুঁচকে তাকালো,
-“বর কে?”
মিশমি এ যাত্রায়ও হাসে,
-“গেস করো।”
শুভ্র অসম্ভব রকমের কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে অরুর দিকে। চোখ-মুখে অগাধ প্রশ্ন। অরু কি করে এলো এখানে? তার কুঁচকানো কপালের দিকে চেয়ে অরু মিইয়ে গেল। চোখ ফিরিয়ে নিলো চকিতে। অপ্রস্তুত হাতে কানের পিছু চুল গুঁজে দাঁড়ালো।
সাদাফ অরুকে দেখে এগিয়ে এলো। সৌজন্য হেসে জিজ্ঞেস করলো,
-“কেমন আছেন অরু?”
অরু ঠোঁট টেনে জোরপূর্বক হাসল,
-“আলহামদুলিল্লাহ স্যার। আপনি ভালো আছেন?”
-“সে কি! স্যার ডাকছেন কেন? আমরা কি এখন অফিসে নাকি? স্যার ডাকবেন না। আমার অস্বস্তি হয়। আপনার ভাইয়ের মতোই আমি, ভাইয়া ডাকতে পারেন।”
অরু বলল,
-“আপনিও বা আমাকে ‘আপনি’, ‘আপনি’ করছেন কেন? আমি আপনার বেশ ছোট ভাইয়া। তুমি করেই বলুন।”
-“আচ্ছা।”
সাদাফ হাসে। মিশমির কাছে গেল কিছু কথা বলতে। শুভ্র সুযোগে ত্রস্ত পায়ে এসে অরুর পাশে দাঁড়ালো। গ্রীবা নামিয়ে মেয়েটার সমান হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে অসম্ভব রকমের কপাল কুঁচকে বলল,
-“হোয়াট আর ইয়্যু ডুইং হেয়ার?”
অরু মুখ কুঁচকে ফেললো। বিরক্তিতে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,
-“আপনার তাতে কি?”
শুভ্র দাঁতে দাঁত পিঁষল,
-“আমার কি মানে? তুমি একা একা না জানিয়ে বের হয়েছো কেন? আমাকে ফোন করতে কি হাত খসে পড়ছিলো তোমার? স্টুপিড!”
-“আপনি আমাকে না জানিয়ে বের হয়েছিলেন কেন? আপনি আমাকে না জানালে, আমি কোন দুঃখে আপনাকে জানিয়ে কাজ করতে যাব?”
-“তুমি আর আমি এক? তুমি রাস্তা-ঘাট চেনো এখানের কিছু? উল্টোপাল্টা কিছু হলে তোমার বাপ-ভাইকে আমাকে জবাবদিহিতা করতে হবে, ইডিয়েট।”
অরু তেঁতে উঠল,
-“আপনাকে বলেছি জবাবদিহিতা করতে? আজব লোক আপনি। বিয়ে করতে এসেছেন ঘরে বউ রেখে, তাও আমাকে কিছু না বলে। আপনি আমার উপর চেঁচান কি করে?”
শুভ্র কপাল কুঁচকে ফেললো। আশ্চর্য হয়ে বলল,
-“বিয়ে? কিসের বিয়ে?”
-“নাটক করেন? জানেন না কিসের বিয়ে? সিরিয়াসলি?”
শুভ্রর কুঁচকানো কপাল ক্ষণিকবাদেই মসৃণ হলো। অদৃশ্য হাতে কপাল চাপড়ালো বেচারা,
-“তোমার বোধ-জ্ঞান কি আসলেই হাঁটুতে অরু? নাকি সব বুঝেও ভং ধরো বোঝো না, কোনটা?”
অরু সত্যিই বুঝলো না। কপাল কুঁচকে নিলো। শুভ্র বলল,
-“তুমি এতোটাও অবুঝ নও, যতোটা দেখাচ্ছো। বিয়ে আমার না, সাদাফের। না জেনে বুঝে কথা বলতে আসবে না। আর এভাবে দাঁড়িয়েছো কেন? দূরে সরো। দূরে সরো!”
একপ্রকার ধমকে উঠল শুভ্র। অরু চমকালো। কপাল কুঁচকে এলো খুব করে। দু’কদম পিছিয়ে গেল পটাপট। এতো শিগগিরই তো ওয়েদারও চেঞ্জ করে না, যত তাড়াতাড়ি এই লোকের মুড চেঞ্জ হয়। অদ্ভুত! বড়ো অদ্ভুত!
অবশেষে খানিক সময় বাদে মিশমি আর সাদাফের বিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলো। রেজিস্ট্রি অফিস থেকে লাফিয়ে-ঝাপিয়ে মিশমি বের হলো। অরুর দু’গালে চটাশ চটাশ করে চুমু খাওয়ার প্রতিজ্ঞা তার কাছে করলেও, পরে আর তা খাওয়া হয়নি। অরু অবশ্য এতে রাগ করেনি। তবে, তার এতো লম্প-ঝম্পতে বেশ অবাক হয়েছে। বিয়ে করে কেউ এতো উচ্ছ্বসিত থাকে? কই, সে তো ছিল না। একটুও না। তবে? তার মন বিষাদে ছেয়ে গেল। সুশ্রী মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে গেল৷ পলক ফেলে শুভ্রর দিকে চাইলো একপলক। মূহুর্তেই চোখে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠল মেয়েটা। ত্বরিতে চোখ সরিয়ে নিল৷ দু’আঙুলে মুঠো করে খামচে ধরে পরনের জামার আস্তিন। দ্রুত পায়ে এগিয়ে মিশমির হাত ধরল,
-“আমি যাই এখন হ্যাঁ?”
মিশমি তৎক্ষণাৎ কপাল কুঁচকে নিলো,
-“যাবে মানে? এখনই কেন? আজকে আমরা একসাথে থাকবো তো।”
-“অ্যাঁ?”
-“হ্যাঁ!”
অরু হেসে ফেলল,
-“অন্য কোনোদিন থাকবো। দেরি হলো বেশ, এখন যাওয়া উচিত।”
মিশমি জেদি গলায় বলল,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৭
-“মোটেও না। তুমি থাকবে মানে থাকবেই। চলো, গাড়িতে ওঠো। চলোওওও।”
মেয়েটার এতো জেদে অরু হার মানলো। আড় চোখে শুভ্রর দিকে চেয়ে গাড়িতে উঠে বসল। শুভ্র তো আসবে না সাথে, তা-ই স্বস্তির। তবে… বেচারীর শত জল্পনা-কল্পনা আর স্বস্তিকে জঙ্গলে ছুঁড়ে শুভ্র তার পাশে এসে বসে পড়লো। অরু এতোটাই আশ্চর্য হলো, তার মুখভঙ্গি বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়লো৷ অদ্ভুত চোখে চেয়ে বলেই বসল,
-“আপনি এখানে কি করছেন?”
-“ক্রিকেট খেলছি। খেলবে?”
