রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৪
মহাসিন
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে মৃদু বাতাস, যেন কারো ফিসফিসানো অভিমান। বাড়ির ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে বসে আছে শাপলা আর শিখা। আকাশের গায়ে লেগে আছে কমলা রঙের ছোপ।
হঠাৎ শিখা শাপলার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলল,
— “আচ্ছা শাপলা, ওই ছেলেটার বউয়ের অভিনয় করলে কেমন হয়, বল তো?”
শাপলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “কি রে? তোর মাথা ঠিক আছে তো?”
শিখা হাসল। এই হাসিতে আছে একরাশ জেদ।
— “হ্যাঁ, মাথা একদম ঠিক আছে। মাথা ঠিক আছে বলেই তো বলছি। ছেলেটা তো বলছেই টাকা দেবে। ওর বউয়ের অভিনয় করলে সমস্যাটা কোথায়?”
শাপলা উঠে দাঁড়াতে চাইল। বাতাসে ওর ওড়নার আঁচল উড়ছে।
— “আরে পাগল! তোর তো ওর বাড়িতে যেতে হবে। কয়েকদিন থাকতে হবে ওখানে। পড়াশোনা আছে না তোর? আর মা বাবা যদি একবার জানতে পারে… ভাবতেও পারছিস না তোর কপালে কী আছে।”
শিখা চুপ করে গেল। ছাদের রেলিং আঁকড়ে ধরে দূরের আকাশ দেখতে লাগল। ওর চোখে একটা দোটানা।
ঠিক তখনই শিখার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের আলোয় ওর মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা যেন আর লুকানো গেল না।
শাপলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কে রে?”
শিখা ফোনটা হাতে নিতে নিতে বলল,
— “বড়লোক মানুষ কল দিছে।”
— “কে?”
শিখা একবার শাপলার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,
— ”সিয়াম।”
বলেই কলটা রিসিভ করল। গলার স্বরটা নরম করে বলল,
— “হ্যালো, কেমন আছিস?”
ওপাশ থেকে ভেসে এল গম্ভীর অথচ পরিচিত কণ্ঠ,
— “ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
শিখা হাসল।
__”তা এতদিন পর আমাদের কথা মনে পড়ল?”
সিয়াম মৃদু হেসে বলল,
— “আরে না। নাম্বার হারিয়ে গেছিল। তাই কল দিতে পারি নাই।আচ্ছা ভিডিও কল দিই?”
কথাটা বলেই সিয়াম কল কেটে দিল। এক মুহূর্ত। তারপরই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ভিডিও কল।
শিখা বলল,
— “তুই তো পুরাই বদলে গেছিস রে।”
সিয়াম একটু থেমে, চোখ সরু করে বলল,
— “সময় চলে গেলে মানুষ বদলায়ই। আচ্ছা আপু, আপনার ছোট বোন … শাপলা? ও কোথায়?”
শিখা পাশে বসা শাপলার দিকে তাকিয়ে হাসল।
— “এই তো আমার পাশেই আছে।”
— “ওর কাছে দেন, একটু কথা বলি।”
শিখা ফোনটা শাপলার দিকে বাড়িয়ে দিল। চোখে দুষ্টুমি।
— “নে, তোর সাথে কথা বলতে চায়। বলবি?”
শাপলা মুখ ঘুরিয়ে নিল। কানের লতি লাল হয়ে গেছে।
— “ধ্যাত না। আমার লজ্জা লাগে।”
শিখা সিয়াম কে বলল,
— “ও কথা বলবে না। ওর নাকি লজ্জা লাগে।”
ওপাশ থেকে সিয়ামের হাসির শব্দ ভেসে এল।
— “এখানে লজ্জার কী আছে? একটু কথা বললেই তো হয়।”
রাত নেমে গেছে অনেক আগেই। জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে শীতল বাতাস। ঘরের এক কোণে টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো জ্বলছে।
শাপলা পড়ার টেবিলে বই খুলে বসে আছে। কলম হাতে, চোখ খাতায়। কিন্তু মনটা কোথাও নেই। অক্ষরগুলো সামনে নাচছে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
বিছানার একপাশে পা গুটিয়ে বসে আছে শিখা। ওর চোখ শাপলার উপর স্থির। একটু চুপ থেকে, যেন অনেক ভেবে নিয়ে বলল,
— “আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”
শাপলা কলমটা নামিয়ে রাখল। ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “কি সিদ্ধান্ত?”
শিখার ঠোঁটে হাসি। একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— “বউ হবো।”
শাপলা চমকে উঠল। কলমটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল।
— “কিহ?”
— “আরে হ্যাঁ, বউই হবো।”
শাপলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কার বউ হবি তুই?”
শিখা দুষ্টু চোখে তাকাল।
— “আরে, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? ওই ছেলেটার।”
শাপলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গলায় আতঙ্ক।
— “সত্যি সত্যি বউ হবি?”
শিখা হেসে ফেলল। বিছানা থেকে বালিশটা কোলে নিয়ে বলল,
— “আরে পাগল! বউ হওয়ার অভিনয় করব। বাস্তবে না। তা বলতেছি।”
শাপলা কপালে হাত দিল।
— “তো আমি কি করব?”
শিখা ওর দিকে ঝুঁকে বসল। চোখে চতুর আলো।
— “তুই কি করবি মানে? তুই আমাকে সাহায্য করবি। একা একা তো আর যাওয়া যায় না।”
শাপলা বুকের উপর হাত ভাঁজ করল।
— “এতে আমার লাভ কি হবে শুনি?”
— “আমার ভাগের টাকা থেকে তোকে অর্ধেক দিয়ে দেবো। খুশি?”
শাপলা একটু ভেবে বলল,
— “আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হবি কিভাবে? মা বাবাকে কি বলবি?”
শিখা আবার চুপ করে গেল। কপালে ভাঁজ পড়ল। তারপর হঠাৎ চোখ চকচক করে উঠল।
— “পেয়েছি! মহুয়া আন্টির বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলব। দুজনে মিলে চলে যাবো। কেমন হয় প্ল্যানটা?”
শাপলা একটু হাসল।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৩
— “বুদ্ধিটা মন্দ না। তবে আমার মনে হয় না এতে কাজ হবে। ধরা পড়ে যাবো।”
শিখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “ধরা পড়লেও কিছু করার নেই রে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমাদের হাতে।”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। শুধু টেবিল ল্যাম্পের ফিলামেন্টটা টিক টিক শব্দ করছে। বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছে।
