রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২০
সোহানা ইসলাম
আসসালামু… হ্যালো… মানে হায়ালাইকুম… ওহ না— আসসা… হেলাইকুম সালাম?? ”
জারার এমন সালাম দওয়া শুনে আরমান হতভম্ব হয়ে যায়। আর এদিকে জারা’র সালাম দেওয়া শুনে পাশে থাকা মিম আর ফিহা হঠাৎ করে চমকে উঠে। জারাকে এমন ভাবে সালাম দিতে শুনে মিম আর ফিহা হাসতে হাসতে ঘরাঘরি খাচ্ছে। ফিহা কোনো রকম হাসিটা দমিয়ে রেখে বলে
–” জানু এই সালাম টা কোনো দেশ থেকে শিখে আসলি তুই? ”
মিম ও ফিহার সাথে তাল মিলিয়ে বলে
–” হ্যাঁ ওর সালাম শুনে আমাদেরই এই অবস্থা তাহলে ভাব আরমান ভাইয়ার কী অবস্থা হবে?”
মিম কাঁধ নাড়িয়ে বলে,
–” আমার মন হয় এখন আরমান ভাইয়া আমাদের জানুর সালাম শুনে হতভম্ব হয়ে গেছে।
ফিহা হাসতে হাসতে বলে,
–“আসলে জানুর ভুল সালাম শুনে আমাদেরই কেমন খিটমিট করছে। ”
জারা কনফিউজড আর একটু লজ্জিত মুখে হাত দিয়ে গাল ঢেকে ফেলল। তার গলা কাঁপতে লাগল আর চোখ ছোট করে নিচে নামিয়ে নিল।
__”আমি… আমি তো ভালো করেই সালাম দিতে চেয়েছিলাম…তাহলে এমন ভুল হলো কীভাবে? আল্লাহ কী লজ্জা। মনে মনে কথা গুলো ভাবে জারা।
জারার ভুল সালাম শুনে আরমান কথা বলতে যেনো ভুলেই গেছে। এই হাফ ইঞ্চি মেয়ে একেতো ভুল সালাম দিয়েছে আবার কথা ও বলছে না। ভোবা হয়ে গেলো না তো আবার? নিরবতা ভেঙ্গে আরমান বলে,
—” হ্যালো… হ্যালো ! শুনেতে পারছো হাফ ইঞ্চি মেয়ে?? ”
জারা মৃদু কন্ঠে বলে,
–” জি…জ্বি , শুনতে পারছি। ”
__” এই বিখ্যাত সালাম দেওয়া কার কাছ থেকে শিখে এসেছো তুমি? ”
আরমানের প্রশ্ন শুনে জারা হঠাৎ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিল।লজ্জায় তার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। তার গাল লাল হয়ে গেলো। একটু বিব্রত কণ্ঠে বলল,
__” কে..কো.. কোথাও থেকে শিখিনি। ভু..ভুল করে মুখ থেকে বের হয়ে গেছে। ”
দুজনের মাঝে আবারও নিরবতা মেনে আসে। কেউ কোনো কথা বলছে না। কি বললে? কোথা থেকে শুরু করবে বোঝে উঠে পারছে না দুজন। জারা’র কিছু বলার নেই কারণ তার কথা বলার মতো কোনো প্রকার কারণ নেই। কিন্তু আরমান কতো কিছু বলবে ভেবে কল করলো কিন্তু এখন মুখ থেকে একটা কথা ও বের হচ্ছে না তার। সে কিছু বলতেও পারছে না আবার কলটা কেটে দিতেও পারছে না। আরমান কে কিছু বলতে না দেখে দোনোমোনো করে জারা নিজেই বলে –” কিছু বলার জন্য কল করেছিলেন ? জিনিয়া আপু ওরা সবাই ঠিক আছে? ”
__” হ্যাঁ সবাই ঠিক আছে ! ধন্যবাদ তোমাকে! ”
__” হটাৎ আমাকে কেনো ধন্যবাদ দিচ্ছেন ? ‘
__’ খাবার পাঠানোর জন্য ‘
__’ কিন্তু আমি তো খাবার পাঠাইনি। আম্মু পাঠিয়েছে। ”
__” ওহ আচ্ছা ! তাহলে আমার ধন্যবাদ ফেরত দাও।এই ধন্যবাদ তোমার আম্মুর জন্য। ”
__” আরে আজব? আমি কী বলেছি আমাকে আপনি ধন্যবাদ দিন? আপনি তো ইচ্ছে করেই আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছে। ”
__” ধন্যবাদ দিয়েছি কারণ আমি মনে করেছি তুমি আমার জন্য খাবার পাঠিয়েছো তাই। এখন খাবার যখন তুমি পাঠাও নি তাহলে আমার ধন্যবাদ ফেরত দাও । ”
___” আমি আপনার জন্য খাবার পাঠাতে যাবো কেনো? ”
এটা শুনার পর আরমানের বুকটা হটাৎ করে মুচড় দিয়ে উঠে। খারাপ লাগে মানজারা তার জন্য নিজে থেকে খাবার পাঠায়নি বলে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে পরে তাদের মাঝে তো তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে কোন কারণে তার জন্য খাবার পাঠাবে সে। মন কে বোঝায় এখন হয়তো কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু একদিন তো হবেই। সুন্দর দুষ্টু মিষ্টির পবিএ একটা সম্পর্ক হবে তাদের। সে তো তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে ভালোবাসে। একদিন তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে ও তাকে খুব ভালো বাসবে। আরমান এবার কিছু টা নরম কণ্ঠে বলে –” হুমম তাও ঠিক। তুমি কেনো আমার জন্য খাবার পাঠাবে? ”
আরমানের কন্ঠ নরম হলেও কেমন যেনো কাঁপা কাঁপা শুানলো। তার এহন কথায় খারাপ লেগেছে লোকটার? কিন্তু এটা তো ঠিক সে কেন খাবার পাঠাবে তার জন্য? নিজের বলা কথায় এখন নিজেরই খারাপ লাগছে জারা’র । কিন্তু তার তো কিছু করার নেই এখানে। যা সত্যি তাই বলছে সে। তাই কথা প্রসংগ পাল্টাতে জারা বলে,
–” আমি একটু ব্যস্থ আছি? আপনি কি আর কিছু বলতে চান ?? ”
ব্যস্ততার কথা শুনে আরমানের কপালে বাঁজ পরে। এতো রাতে তার কীসের ব্যস্ততা থাকতে পারে আবার । সে কী তাহলে অন্য কাউকে পছন্দ করে। তার সাথে কথা বলবে বলে এখন তাকে ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। মনে কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে আরমান,
—” এতো রাতে কিসের ব্যস্ততা তোমার?? ”
এখন কী বলবে সে? বাঁচার জন্য মিথ্যা বললো এখন আরও ফেঁসে গেছে। লোকটা তাকে এতো ঝেরে করছে কেনো এটাই বোঝতে পারছে না জারা। শুকনো ঢোক গিলে আবারও মিথ্যা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমতা আমতা করে বলে,
—” ও..ও-ই পড়ছিলাম। তাই ব্যস্ত আছি ”
__”রাত ১১ টার সময় পড়াশোনা করার এমন তীব্র ইচ্ছে হয়েছে, সেটা সন্ধায় কোথায় ছিলো? ”
আবারও শুকনো একটা ঢোক গিলে। এক মুহূর্তে সময় থেমে যায়। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু কী বলবে? হঠাৎ করে মাথয় আসে জিনিয়া দের কথা। কন্ঠে আত্নবিশ্বাস নিয়ে বলে,
–” সন্ধার সময় তো জিনিয়া আপুরা ছিলো তাই পড়তে পারিনি। ”
__” তোমার এতো পড়াশোনা করে কী হবে? আমি তো বলছি না আমার বউকে বিসিএস, পিএইচডি বা নভোচারী হতে হবে? আমার বউ শুধু আমাকে আর আমার বাচ্চাদের সামলাতে পারলেই হবে। ”
আরমানের কথা শুনে জারা বোকা ভনে গেলো। সে তো তার কথা বলছিলো, তাহলে এই লোকটা তার বউয়ের কথা বলছে কেনো ? সে তার বউ কে কতো টুকু পড়াশোনা করাবে এটা তাকে বলার কি আছে ? জারা কিছুটা রাগান্বিত ভঙ্গিতে বলে,
— ” আমি আমার কথা বলছি, আপনার বউয়ের কথা নয়। ”
আরমানও ঠাট্টার ও সন্দেহের ভঙ্গিতে বলে,
— ” আমি তো তাই বলছি। আমার বউ কে এতো পড়াশোনা করাবো না আমি। ”
আরমানের কথা এবার সত্যি জারা’র মাথায় ঢুকলো না। বোকার মতো প্রশ্ন করে,
–” মানে? ”
__” মানে হচ্ছে তোমার এতো পড়াশোনা করতে হবে না। আমার বউয়ের এতো না পড়লেও হবে। ”
আরমানের কথা বোঝতে না পেরে আবারও বোকার মতো প্রশ্ন করে,
–” মা – মা’নে! বোঝতে পারছি না আপনার কথা। ”
দেখতে যেমন ছোটমোট হাফ ইঞ্চি ব্রেইন টাও তেমন তার থেকে হাফ ইঞ্চি ছোট। মনে মনে কথা গুলো বলে জারাকে আরমান। রাত অনেক হয়েছে তাই কথা না বারিয়ে বলে,
–” মানে কিছু না মাথা মোটা। কাল কলেজ ছুটির পর বটগাছ তলায় দাঁড়াবে, তোমার সাথে কথা আছে আমার। আর এখন বই খাতা রেখে ঘুমাও। গুড নাইট। বলেই কল টা কেটে দিলো আরমান। জারা’কে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে।
মিম আর ফিহা এতো টা সময় জারা’র দিকে একধেনে তাকিয়ে ছিলো। কি সুন্দর করে তার বান্ধবী কথা বলছে। আবার মিথ্যা বলে ধরা পরতে পরতে বেঁচেছে। বান্ধবীর এমন অবস্থা দেখে মিম আর ফিহা হেঁসে আটখানা।
ফিহা এবার জারা আর মিম কে ঠেঁস দিয়ে বলে –” একটা ধন্যবাদ নিয়ে আমাকে নিয়ে কতো মজা নিলি দুইজন। আর এখন গুড নাইট। কাল বটগাছ তলায় দাঁড়াবে কথা আছে এসব কী? ”
জারা লজ্জা ও পাচ্ছে আবার রাগও লাগছে। হুট করে এসে তাকে লজ্জায় ফেলে চলে গেলো শয়তান লোকটা। জারা লজ্জা পেলেও তা প্রকাশ করল না। মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৯
—” সব কিছু না। এখন ঘুমা অনেক রাত হয়েছে। ”
” আমাদের জানু কেমন অন্য সুরে গান গাইছে, কার কথা মেনে আমাদের ঘুমাতে বলছিস জানু। গুড নাইট, গুড নাইট! ” ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে মিম।
জারা এবার সত্যি অনেক লজ্জায় পরে যায়, না চাইতেও। মিমের কথায় উত্তর না দিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরে।
