রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৪
সোহানা ইসলাম
সন্ধ্যার আলো নরম, বাতাসে হালকা একটা শীতলতা। দূর থেকে নামাজের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। বারান্দার এক কোণে বসে আছে জিনিয়া। দৃষ্টিটা দূরে কোথাও, মনটা যেন আরেকটা সময়ে আটকে আছে।
রোহান আস্তে পা ফেলে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।রোহান নরম গলায় বলে–” এখানে কী করছো চাঁদ সুন্দরী ?”
জিনিয়া চমকে উঠে না, ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চেয়ে বলে হালকা হাসি দিয়ে বলে –” রোহান ভাইয়া… আপনি? ”
রোহান জিনিয়ার পাশের চেয়ারটায় বসে
বলে –” হুম আমি”
” আমি মনে করেছি, আপনি আর আমার সাথে কথা বলবেন না, সেদিনের পর থেকে। ”
“রাগ করতে শিখিনি তোমার উপরে।তুমি যেদিন কথা কাটাকাটি করেছিলে, মনে আছে?সেদিনও চুপচাপ তোমার চলে যাওয়া দেখেছিলাম।”
একটু থেমে, তার দিকে তাকিয়ে বলে –“আমি জানতাম… ওটা তুমি ছিলে না, ছিলো তোমার ভেতরের কষ্ট। একবার কী বলা যায় না, কি কারণ তুমি আমার সাথে এমন করছ। কি কষ্ট লুকিয়ে রেখেছ নিজের মাঝে? ”
জিনিয়ার মুখ নেমে যায়। গলার স্বর কাঁপতে থাকে জিনিয়ার —“আমি জানি, রোহান ভাই… আমি সেদিন খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম।
আপনাকে কথা শোনালাম, অপমান করলাম… অথচ আপনি শুধু পাশে থাকতে চেয়েছিলেন।
আমি… আমি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করি।
রোহান কিছু বলতে যাবে, জিনিয়া হাত তুলে থামিয়ে দেয়। রোহানের এইটুকু আস্তা যুক্ত কথা জিনিয়ার চোখে জল চলে আসে –“না, আজ আপনি কিছু বলবেন না।আজ আমি বলতে চাই।আপনার সেই ভালোবাসাকে আমি একবারও জায়গা দিতে পারিনি, শুধু দূরে ঠেলে গেছি বারবার।কারণ আমি জানি, আমি আপনাকে সুখ দিতে পারব না। আমার শরীরে নোংড়া লেগে আছে।”
রোহান গভীরভাবে তার দিকে তাকায়, কিছুটা কাঁপা গলায় বলে–“সুখ তো চাইলেই পাওয়া যায় না, জিনিয়া।তোমার পাশে থাকার অধিকার চেয়েছি, দাবী করিনি।আমি চাই তোমার সঙ্গে হাসতে, কাঁদতে, হারাতে… সব কিছুতে পাশে থাকতে। আর কথা যদি হয় তোমার শরীরে নোংড়া বা তোমার কোনো কালো অতীত নিয়ে, সেটা আমি জানতে চাই না। আমি শুধু তোমায় ভালোবাসার জন্য অধিকার চাই। একবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না আমায়। বিশ্বাস কর তোমায় কখনো কষ্ট পেতে দিব না। তোমার অতীত জানতে চাইব না। ”
জিনিয়া মুখ ঘুরিয়ে নেয়, চোখ মুছে নেয় চুপচাপ। মনে মনে বলে–“এই মানুষটার ভালোবাসার ওজন আমি নিতে পারি না। আমি যদি একটু দুর্বল হই, ও আবার সব ছেড়ে আমাকে আঁকড়ে ধরবে। কিন্তু আমি তো এটা চাই না। আমি তো শূন্য।”
জিনিয়া গলা আটকে আসছে –” রোহান ভাই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।সেদিনের জন্য… আর এতদিন ধরে আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।”
রোহান কিছুটা ব্যথা নিয়ে চুপ থাকে। মনে হয় কিছু বলবে, কিন্তু নিজেকে থামায়।
জিনিয়া চোখ নামিয়ে বলে –” আমি চাই না আপনি আমায় ভালোবাসুন। আমি চাই না আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করুন।আমি চাই না আপনার চোখে একদিন আমায় না পাওয়ার আক্ষেপ থাকুক। নিজের জীবন গুছিয়ে নিন।
সে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।জিনিয়া কাঁপা কণ্ঠে আবারও বলে –” শেষ একটা আবদার করব রাখবেন আপনি? ”
জিনিয়ার এমন কাঁপা কন্ঠে আবদারের কথা শুনে সাথে সাথে ওর দিকে তাকায় রোহান অসহায় দৃষ্টিতে ।
” আমার কাছে আর ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসবেন না আপনি। জানেন আমি অনেক লুভি। আপনার উজাড় করে দেওয়া ভালোবাসা দেখলে লুভ সামলাতে পারব না আমি । ”
কথাগুলো বলে সে চলে যেতে শুরু করে। পেছনে তাকায় না। রোহান একবার ডাকতে যায়, কিন্তু থেমে যায়।জিনিয়া ভেতরে চলে যায়। বারান্দায় হাওয়া বইছে ধীরে।রোহান একা বসে থাকে। তারপর নিজের মনেই বলে–“তুমি চলে গেলে, অথচ আমি এখনো এখানেই আছি…তোমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।তুমি যদি কখনো ফিরে আসো—আমি এখানেই থাকবো।”
রাত ১১টা। ঘরের ডিবানে বসে আরমান ল্যাপটপে ফ্যাক্টরির কাজ করছে। ডেস্ক ল্যাম্পের আলোয় কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ঘরে নীরবতা। এমন সময় হঠাৎ দরজা ধাক্কা দিয়ে কেউ ঢোকার চেষ্টা করে। দরজা ধাক্কানোর শব্দে বিরক্ত হয়। আরমান চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে –“এই কোন গরু এমন করছিস? রাতে দরজা ভেঙ্গে ফেলার ইচ্ছে আছে নাকি?”
দরজা খুলে ঢোকে জাহেদ, হাঁপাতে হাঁপাতে হেসে বলে –“ভাঙলে কি তুমি আর ঠিক করতে পারবে না ভাইয়া!কী করছো বসে বসে? ”
আরমান বিরক্ত হয়ে বলে –” প্রেমালাপ করছি তোর ভাবির সাথে। যাহ এখন বিরক্ত করিস না। ”
জাহেদ হালকা হাসি দিয়ে বলে–“আরে ভাইয়া আমি তো এই জন্যই এসেছি। একটা ছোট্ট সাহায্য লাগবে ভাবির। ”
আরমান ঠান্ডা গলায় বলে–“তোর ছোট সাহায্য মানেই আমার রাতটা শেষ। বল, কী চাস?”
জাহেদ কিছুটা ইতস্তত করে বলে –“ওই… মানে… ফিহা তো ভাবির বান্ধবী, তাই না?”
আরমান চোখ সরু করে বলে –“হুম। তারপর?
জাহেদ বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে –“তো ভাবির কাছে তো নিশ্চয়ই ফিহার নাম্বার আছে।এক
বারের জন্য নাম্বারটা নিয়ে দেও না ভাইয়া প্লিজ!”
আরমান সোজা হয়ে বসে, ঠান্ডা গলায় কিন্তু ভারী কন্ঠে বলে–” যেখানে বড় ভাইয়ের লাইন ঠিক হলো না ভালো করে, আমাকে সাহায্য করবি । তা, না করে, নিজের লাইন ঠিক করতে এসেছিস আমার কাছে গরু কোথাকার। ”
জাহেদ হতবাক হয়ে বলে –“না?! মানে?!”
আরমান –” তোর ভাবির ফোন নাম্বার আমি কাউকে দিব না । সেটা ফিহার জন্য হোক বা কারো বোনের।
জাহেদ আঁতকে উঠে, নাটকীয়ভাবে হাঁটু গেড়ে বসে বলে–“ভাইয়া ! আরে না না না… এমন করো না।তুমি বোঝ না—ফিহা আমার জীবন, আমার প্রাণ, আমার নিঃশ্বাস!একবারের জন্য কথা বলতে চাই শুধু। প্লিজ ভাই!”
আরমান বিরক্ত হয়ে পেছনে হেলে বসে।
“তোর এত প্রেম জন্ম হলো কবে থেকে? দুই একবার দেখে পাগল হয়ে গেলি? ”
জাহেদ মুখে দুষ্টুমির রেস এনে বলে–” তুমিও তো দুই একদিন দেখে ওই একরওি মেয়েকে আমাদের ভাবি বানিয়ে ফেলেছো। ”
জাহেদের কথা শুনে আরমান একটু শয়তানি হেসে বলে –” বেশি বকছিস তুই এখন। তাই নাম্বার পাবি না। যাহ বাগ এখান থেকে গরু।”
জাহেদ দ্রুত আরমানের দুই হাত,পা জড়িয়ে ধরে বলে,–“প্লিজ ভাইয়া এমন টা কর না তুমি। তুমি শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়ে বলো—“ফিহার নাম্বার দিতে,জাহেদ চায়।”ব্যস!
আরমান একটু বিরক্ত হলেও ফোনটা তুলে নেয়।
আরমান নিজের মনে বলে–“এই ছেলেটা একদিন এভাবে পায়ে ধরে বিয়ে করে নিবে হয়তো!”
ফোনে ছোট্ট মেসেজ পাঠায়। কিছুক্ষণ পর নাম্বার আসে। কিন্তু এতে আরমান খুব রাগ হয় জারা’র প্রতি। এতো রাতে এই মেয়ে এখনো জেগে আছে। মেসেজ পাঠানোর সাথে সাথে রিপ্লাই। ওকে পরে দেখে নিবে, আগে এই গরুটা কে বিদায় করে নিক সে।
আরমান চোখ তুলে তাকায় জাহেদের দিকে –“এটা নে। কিন্তু একটা কথা— আমি যদি শুনি তুই ফিহাকে বিরক্ত করিস,তাহলে তোর কান কেটে এই শীতলক্ষ্যায় বাসিয়ে দিব কিন্তু। ”
জাহেদ নাম্বার নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বলে -“ভাইয়া তুমি শুধু আমাকে একটা নাম্বার দিলে না, তুমি জান্নাতের দরজা খুলে দিলে আজ।”
আরমান আবার কাজে ফিরে যায়। দরজার বাইরে জাহেদের ফিসফিসানি শোনা যায়।
জাহেদ নিজের মনে মনে বলে–“ফিহা, আজ শুরু… ইনশাআল্লাহ শেষ হবে বিয়েতে।”
রাত ১১:৪৫ মিনিটে!ফিহা ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে মোবাইল কাঁপছে। স্ক্রিনে ‘অজানা নাম্বার’। ফিহা চোখ মেলে দেখে, বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে।
ফিহা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে–“হ্যালো…”
এক মুহূর্ত চুপচাপ। জাহেদ ভয় পেয়েই যায়।জাহেদ আস্তে করে ডাক দেয় –“ফিহা?”
ফিহা ঘুম জড়ানো গলায়, বিরক্ত হয়ে বলে–“কে ভাই এতো রাতে বিরক্ত করছ ??”
জাহেদের গলায় কষ্ট। তাকে এই মেয়ে ভাই বলছে? “ভাই?! আমি ভাই হই না তোমার !”
ফিহা চোখ না খুলেই বলে–“”তাহলে কি আপনি… আপা হন ?”
জাহেদ অবাক হয়। এই মেয়ে কী পাগল হয়ে গেছে নাকি? কি যা-তা বলছে তাকে? বিরক্ত হয়ে বলে –“না! আমি তোমার আপা না!”
ফিহা আরো বিরক্ত হয়ে বলে –“তাহলে কি তৃতীয় লিঙ্গের আপ্পা, আপ্পা কেউ নাকি?!”
জাহেদ হঠাৎ চুপ! ফোনের এদিকে ফ্রেমে ওর চোখ বড় বড়, মুখ কুঁচকে গেছে — আতকে উঠেছে। ফিহার কথা শুনে জাহেদ হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বলে–“আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! শয়তান বেডি নিজের ভবিষ্যতে কেউ লাল বাতি জ্বলায়। আমি তোর ভবিষ্যতের সবুজ বাতি কটকটি? ”
ফিহা ঘুমের ঘোর একদম উবে যায়, চট করে উঠে বসে, চোখ কচলে ফোন স্ক্রিনে তাকায় ফিহা অবাক হয় “আননোন নাম্বার দেখে! কিন্তু এটা তো জাহেদ খান এর গলা! জাহেদ তাকে কটকটি বলে ডাকে? “তার মানে এটা জাহেদের নাম্বার? কিন্তু সে নাম্বার পাইল কই?”
ওপাশ থেকে জাহেদ আবার ডাকছে ফিহা কে –“”হ্যালো? কটকটি? হ্যালো? কই গেলা?”
ফিহা সঙ্কোচ, ভয়, জেদে গলা আটকে আসা কন্ঠে বলে –“আমি তো ভাবলাম… আমি তো বুঝিনি যে…”
জাহেদ মজা নিতে নিতে বলে–” “আহা, এখন আটকে যাওয়া কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে রো’মা’ঞ্চ করার ফি’ল পাচ্ছি? ”
ফিহা বাচ্চা গলার মতো করে বলে —“আপনি আমার নাম্বার কেথায় পেয়েছেন ?”
জাহেদ গম্ভীর নাটুকে গলায় বলে—“তুমি যেখানে আমার হার্টে সেভ হয়ে আছো, সেখানে তোমার নাম্বার পাওয়া কোনো ব্যাপার না!”
ফিহা একটু ভয়, একটু লজ্জা, অনেক রাগ নিয়ে বলে —“এতো রাতে একটা মেয়েকে ফোন করে বিরক্ত করার অপরাধে আপনাকে পুলিশে দিব আমি। ”
“পুলিশে দাও, কিন্তু FIR ডিটেইলে লেখো –ছেলেটা শুধু একটু ভালোবাসতে চেয়েছিল আমায়। আর সেই ভালোবাসার অপরাধে একটা ছোট্ট কটকটি তাকে হিজড়া বানিয়ে দিল।”
ফহা একটু মুচকি হাসে, কিন্তু চেপে রাখে। ” “এতো রাতে, এভাবে আর কতো জনকে ফোন দিয়েছেন শুনি? ”
“তোমার আগেও কেউ ছিল না, তোমার পরে কেউ হবে না। আর মাঝখানে?মাঝখানে তো শুধু তুমি!”
দুজনেই চুপ… নরম সুর বাজছে মনে মনে তাদের। অবশেষে ফিহা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে –” আ আমি এখন ঘুমাব। বা বায়! “বলেই কলটা কেটে দেয়।
রাত ১১:৫০।চুপচাপ ঘরে অল্প আলো।জারা ফোনের স্ক্রিনটা বারবার উল্টে রাখছে।কল আসছে একের পর এক—আরমানের। মেসেজের শব্দও থেমে নেই। একটার পর একটা মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছে সে।
“জারা, কল ধরো।”তুমি জেগে আছো, আমি জানি।”
জারা চোখ বন্ধ করে রাখে।মাথার ভেতরটা ভারী লাগছে।এই লোকটা ফোন দিলেই কেন তাকে তুলতে হবে?এত রাতে এত চাপ কেন দিচ্ছেন উনি আমাকে ? কোনো সম্পর্ক বিহীন মানুষের সাথে এভাবে কেউ অধিকার ফলায়? ”
হঠাৎ নতুন মেসেজ আসে।এইবার আরমান আর ভদ্রতার জায়গায় নেই। রাগ, অভিমান আর অধিকার মিশে গিয়ে আগুনে পরিণত হয়েছে।
“ বা* উওর দিচ্ছিস না কেন? এতো রাতে কোন না*গ*রে*র সাথে কথা বলছিস তুই। আমার কল, মেসেজের উত্তর দিচ্ছিস না? ”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৩
মেসেজগুলো পড়েই জারার চোখ কপালে।রাগে শরীর কাঁপতে থাকে।তীব্র অপমান, ভয় আর বিরক্তি—সব একসাথে অনুভব করে।তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে না। ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করতে থাকে —” আপনি কে? আমার সাথে এভাবে কথা বলার? কোনো সম্পর্ক বিহীন মানুষের সাথে এভাবে কথা বলে অসভ্য লোক। তুইতোকারি করে, চরিএ নিয়ে কথা বলছেন কোন অধিকারে আপনি। দুই একবার ভালো করে কথা বলেছি বলে মাথা কিনে নিয়েছেন?”
মেসেজ টা পাঠিয়ে জারা আরমানকে ব্লক করে দেয়।ফোনটা এবার একেবারে নিস্তব্ধ।
আরমান জারার সেই শেষ মেসেজটাই পড়ে থেমে যায়।
