রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩২
সোহানা ইসলাম
বিকেলের হালকা রোদ ঘরটাকে নরম সোনালি আলোয় ভরিয়ে রেখেছে। জানালার পর্দা দিয়ে আসা হাওয়ায় হালকা কাঁপছে চুলের কিছু গোছা। জারা বিছানায় বসে খরগোশ গুলো কোলে নিয়ে বসে আছে, কিন্তু চোখে কোনো শান্তি নেই। মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে—
___”আমার দরকার সবকিছু… যা তোমায় নিয়ে।”
সে নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর কেমন শূন্যতা। আরমানের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে, অথচ তার মুখে কিছুই নেই।জারা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে __”মা মানে…”
ওপাশে আরমানও চুপ। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর ভেতরটা ছুঁয়ে যাওয়া এক নিশ্বাস ফেলে বলল___”হাদিসে আছে, যে তোমায় সত্যিকারের ভালোবাসে… সে জানবেই না কীভাবে ঘৃণা করতে হয়, তুমি শত কষ্ট দিলেও।”
কথাগুলো বলেই কলটা কেটে দিল আরমান। কোনো জটিলতা না, কোনো ব্যাখ্যা না—শুধু ওই একটা বাক্য আর একটা নিঃশ্বাস।
জারার মনের ভিতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু মাথায় ঢুকল না কথার মানে। কেবল বুকের ভেতর ভারি কিছু জমে থাকল।
কিন্তু সে খেয়াল করেনি, ফোনটা স্পিকারে ছিল। মানে মিম আর ফিহা সব শুনেছে!
দুইজন একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর শুরু করল হাসাহাসি।
___”ওহহ জানু ! ভাইয়া কিন্তু একদম সিনেমার হিরো হয়ে গেছে!”
“এই যে… ‘শত কষ্ট দিলেও’! মানে ভাইয়া তোর জন্যই কষ্ট পাচ্ছে। এতো দিন কল না ধরায়, কথা না বলায় কিন্তু খুব কষ্ট পেয়েছে। ” বলল মিম
মিম আর ফিহা মজা নিতে শুরু করল।
জারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল, মুখ নামিয়ে ফেলল। তবুও ভেতরটা কেমন এলোমেলো। মানে কী ছিল আরমানের ওই কথার? কেন এমনভাবে বলল?
___” কষ্ট পাওয়ার কী আছে? আমার আর ওই লোকটার মাঝে তো কিছু নেই? ” বলল জারা।
তার অজান্তেই বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে।
___” নেই তো কী হয়েছে? কিছু হতে কতক্ষণ, তাই না? চোখ টিপ দিয়ে বলে ফিহা!
সন্ধা হয়ে আসায় মিম আর ফিহা আর বসলো না। জারা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় ওরা। আর অনেক বার করে বলে যায়, আরমান অনেক পছন্দ করে তোকে, তুই কিন্তু ভাইয়া কে আর কষ্ট দিবি না।
বারান্দায় খাবার টেবিলটা আলো ঝলমল করছে। গরম ভাতের গন্ধে ভরে গেছে পুরো ঘর। আরমান একপাশে চুপচাপ বসে খাচ্ছে। তার পাশে জাহেদ, আর সামনে রোহান, জিনিয়া আর জেরিন।
জাহেদ হালকা হাসি মুখে জেরিনের দিকে তাকিয়ে বলল—
___“জেরি, তোর স্কুল তো ছুটি শেষ ?”
জেরিন মুখ ফুলিয়ে বলল—
____“ ভাইয়া , প্লিজ ছুটি শেষ হওয়ার কথা বলো না।”
জাহেদ হেসে মাথা নেড়ে বলল—
___“আচ্ছা আচ্ছা! বলব না! কিন্তু এতদিন ধরে বেড়াতে এসে একদম পাকা অলস হয়ে গেছিস না?”
জেরিন গলা উঁচু করে বলল—
___“আহা ভাইয়া ! আমি কি অলস নাকি? আমি তো…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই টেবিলে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। মজার কথায় পুরো পরিবেশ হালকা হয়ে যায়।
খাওয়ার মাঝে হঠাৎ আরমান গম্ভীর গলায় বলল—“জাহেদ।”
জাহেদ মুখ তুলে তাকাল—
___“হ্যাঁ ভাইয়া?”
___“কালকে জিনিয়া আর জেরিনকে বাড়ি দিয়ে আসিস। এদিকে কাজ শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। এতো দিন ওরা এখানে থাকলে পড়াশোনার ক্ষতি হয়ে যাবে অনেক। ”
বড় ভাইয়ার কথায় টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তে পাল্টে গেল। জেরিনের মুখ হঠাৎ গোমড়া হয়ে গেল।
___“না, আমি যাব না!” – বায়না ধরল সে।
আরমান ঠাণ্ডা গলায় বলল—
____“বায়না ধরে না সিস্টার । যা বলেছি তাই হবে।”
তার গলায় চাপা রাগ। চোখে কঠিন দৃষ্টি।
জেরিন মুখ নামিয়ে ফেলল। চোখে পানি চলে এলো কিন্তু সে কিছু বলল না।
হঠাৎ আরমানের দৃষ্টি গেল জিনিয়ার দিকে। গ্লাসে পানি ডেলে খাচ্ছে সে। আরমার ঠান্ডা গলায় বলে
____“জিনিয়া, খাওয়া শেষ করে আমার রুমে আসিস একবার। Important কথা আছে ।”
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে উঠল তার পুরো শরীর। পানির জগটা হাতে থেমে গেল। গলায় শব্দ আটকে গেল। শুধু ভয়ে বড় বড় চোখে তাকাল ভাইয়ার দিকে।
রোহানও সব শুনল। ধীর চোখে তাকাল আরমানের দিকে, কিন্তু কিছু বলল না। ভেতরে ভেতরে কেমন অদ্ভুত অস্থিরতা। আরমান চাঁদ সুন্দরী কে কী বলবে?
জিনিয়ার বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছে। বারবার মনে হতে লাগল—
“কেন ডাকল আমাকে? কী করেছি আমি ? আমি তো কিছু ভুল করিনি…”
জিনিয়া রোহানের ভালোবাসা প্রতিবার ফিরিয়ে দিয়ে মনটা একেবারে বিস্নন করে তুলে। কিন্তু সেই কষ্টের মাঝেই একটাই প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হলো মনে
____“ আমি আমার ভালোবাসার দাবি নিয়ে তোমার কাছে আর একবার দাঁড়াবো। যদি আবার আমাকে ঠেলে দেও, তাহলে আমি সব ছেড়ে চলে যাবো। আমেরিকায় চলে যাবো। আর কোনো দিন দেশে ফিরব না।”
কথা গুলো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেও আরমান কে সে সব বলে রাখে। সামনে তার মায়ের মৃত্যুবার্ষিক। এর আগে আবার জিনিয়াকে তার মনের কথা, ভালোবাসার কথা জানাবে। যদি এবার ফিরিয়ে দেয় তো সে তার মায়ের মৃত্যুবার্ষিক এর দিন দেশ ছাড়বে। বিদেশে পারি জমাবে।
খাওয়া শেষ করে চুপচাপ উঠে গেল সে। সবার চোখ এড়িয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ পর…সবার খাওয়া শেষ। একে একে সবাই নিজেদের রুমে চলে গেছে। পুরো বারান্দায় যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। জিনিয়া ঠোঁট কামড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে পা টেনে বের হলো। আরমানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার ওপাশে মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। বুকের ভেতর যেন ঢোল বাজছে। কিন্তু আজ আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ভাইয়া ডাক দিয়েছে। কি বলবে তা ওর যানা নেই।
হাত বাড়াল দরজার দিকে। কাঁপতে থাকা আঙুলে নক করল—টক টক।
___” আসব ভাইয়া? ”
ভেতর থেকে গম্ভীর গলা—
___ “ আয় ।”
শব্দটা শুনে বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল জিনিয়া।
রুমের ভেতরে আরমান দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে। পর্দা হালকা দুলছে। সে পিছন ফিরল না। কেবল বলল—
___“এসেছিস?”
জিনিয়া কাঁপা গলায় বলল—
___“হ্যাঁ ভাইয়া… আমায় ডেকেছিলে…”
আরমান ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকাল। চোখে সেই কঠিন দৃষ্টি। হঠাৎ এগিয়ে এসে জিনিয়ার সামনে দাঁড়াল।
____“একটা প্রশ্ন করব।”
জিনিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।
___“কি প্রশ্ন?”
আরমান ঠাণ্ডা গলায় বলল—
___“রোহান কি খারাপ ছেলে জিনিয়া?”
প্রশ্নটা শুনে জিনিয়া মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। এটা সে আশা করে নি। ভেবেছিল হয়তো অন্য কিছু বলবে। কিন্তু এখন সে কী বলবে। তার ভাইয়া তো সব জানে। রোহান তাকে পছন্দ করে। কিন্তু আমার প্রকাশ না করা অনুভূতি কী ভাইয়া ধরে ফেলেছে? আর কিছু ভাবলো না,ধীরে ধীরে দুই পাশে মাথা নাড়ল—
___“না… রোহান ভাই খারাপ না।”
আরমান গম্ভীর চোখে তাকাল—
__“তাহলে তার ভালোবাসাকে মূল্য দিচ্ছিস না কেন?”
কথাটা শুনে জিনিয়ার গলা আটকে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট হঠাৎ চোখের পানিতে গলে গেল। কান্না চেপে রাখতে পারল না।
___“ভাইয়া… আমি… আমি পারব না…”
___“কেন পারবি না? রোহান তো তোকে ভালোবাসে। আমি জানি ও সৎভাবে তোকে চায়।”
আরমানের গলা এবার নরম হলো।
____“তুইও ওকে ভালোবাসিস, তাই না?”
জিনিয়া এবার পুরো ভেঙে পড়ল। হ্যাঁ, সে রোহানকে ভালোবাসে। কিন্তু বলার সাহস পায় না। কান্না করতে করতে মাটিতে বসে পড়ল।
জিনিয়া কে কান্না করতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলে __” কান্না না করে, যা যানতে চেয়েছি সেটার উত্তর দে জিনিয়া! ”
___“ভাইয়া… আমি ওকে ভালোবাসি… কিন্তু আমি তার ভালোবাসার যোগ্য না। আমি প.. পবিত্র নই…”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল—
___“কি বললি তুই?”
জিনিয়া মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
“হ্যাঁ ভাইয়া… আমি পবিত্র না। আমার শরীরে অন্য পুরুষের নোংরা ছোঁয়া লেগেছে…”
আরমানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
কথাটা শুনে আরমানের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। চোখ লাল হয়ে গেল।
___“কি বলছিস তুই, জিনিয়া? সব খুলে বল!”
জিনিয়া হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁপা গলায় বলল—
“ কী বলব তেমায় ভাইয়া… আ আমি অনেক বা বাদা দেওয়ার চে চেষ্টা করেছি… কিন্তু… ও ওই লোক গুলো …”
তারপর এক এক করে সব ঘটনা খুলে বলে বড় ভাই কে জিনিয়া।
[ জিনিয়ার অতীত সম্পর্কে আরও পরে লিখব ]
___“আমি মরে যেতে চেয়েছিলাম ভাইয়া… কিন্তু আম্মু বাঁচিয়ে নিয়েছে। এই জীবন রেখে কী লাভ তুমি বলো? আম্মু আমার সম্মান বাঁচাতে কাউকে বলেনি এসব। আমরা ভয় পেয়েছিলাম… সমাজ কি বলবে…”
কথা বলতে বলতে জিনিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
আরমানের মাথায় যেন আগুন ধরে এলো। হাতের শিরা ফুলে উঠল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দে ঘর কেঁপে উঠছে।
____“এসব তুই আমাকে আগে কেন বলিস নি জিনিয়া? আমি ওই জানোয়ারগুলোর শিকড় পর্যন্ত তুলে ফেলতাম!”
চোখ থেকে আগুন বের হচ্ছে যেন। দাঁত চেপে রাগে ফিসফিস করে বলল—
____“যারা তোকে ছুঁয়েছে… আমি তাদের বাঁচতে দেব না।”
জিনিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল—
___“ভাইয়া… প্লিজ… আর এসব নিয়ে আর কিছু করো না। পুরনো ঘাঁয়ে খুচা দিও না আর। আমি..আমি সব ভুলে যেতে চাই… বাঁচতে চাই আমি! ”
আরমান হঠাৎ নিচু হয়ে বোনকে বুকে টেনে নিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
___“তুই কোনো দোষ করিস নি। তুই এখনও আমার সবচেয়ে পবিত্র বোন। আমার চাঁদ তুই! ”
তার চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে প্রতিজ্ঞা করল—“ওদের শাস্তি আমি দেব। কেউ আমার বোনকে ছুঁয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না।”
আরমান মৃদু গলায় বলল—
____“রোহানের ভালোবাসা সত্যি। তোর অতীতের জন্য ও কখনো তোকে ছেড়ে যাবে না।”
জিনিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল—
___“কিন্তু ভাইয়া… আমি কিভাবে… আমি তো…”
আরমান চোখ মুছে বলল—
____“তোর জীবনের অন্ধকার মুছে ফেলার জন্য ও থাকবে। আমি জানি ও তোর জন্য সবকিছু করবে।”
এই কথার পর জিনিয়া বুকে হাহাকার নিয়ে কান্না করল। আরমান বারবার বলে—“তুই দোষী না জিনিয়া। অপরাধ তাদের, তোর না।”
আরমান জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। চোখে আগুন, মুখে প্রতিজ্ঞা।
___“তুই কাঁদিস না। তোর সাথে যারা এমন নোংরা কাজ করেছে, ওই সব জানোয়ারদের আমি কুওা দিয়ে খাওয়াব ।আমি তাদের রক্ত দিয়ে এর দাম আদায় করব। মৃত্যু এমন ভাবে দিন যে বাঁচার জন্য হাহাকার করবে ।”
তার কণ্ঠে ভয়ংকর দৃঢ়তা।
জিনিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন হালকা হলো—কারণ সে জানে, তার পাশে আছে একজন পাহাড়ের মতো। তার বড় ভাই।
সকাল আটটা। নদীর ধারে সেই পুরনো ঘাট। সকালের রোদ চারপাশে চিকচিক করছে। কুয়াশার মতো চারপাশে হালকা রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়েছে। ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। তার শরীরে হালকা ধূসর শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, আর মুখে অস্থিরতার ছাপ। চোখ বারবার ঘড়ি দেখছে। কারণ, ৮টা ৩০ মিনিটে তার এক জরুরি মিটিং আছে, যা মিস করা মানে বিপদ।
কিন্তু তবুও সে এখানে।কারণ, জারা আজ কলেজে যাবে।আর এই সময়টাই—আরমানের জন্য সবচেয়ে অপেক্ষার মুহূর্ত।
তার হাতে কিছু প্যাকেট। কাল রাতে নিজে পছন্দ করে আনিয়েছে। নতুন একটা স্কার্ফ, নানান ধরনের চকলেট, আর একটা ছোট প্যাকেটে লাল গোলাপ। সে যানে জারা’র লাল রং পছন্দ।ইনারের বিষয়টা মাথায় আসতেই ঠোঁট কামড়ে হাসে আরমান। কিন্তু তার অন্য হাতে… সিগারেট।যেটা সে জ্বালিয়ে আবার নিভিয়ে ফেলছে।অস্থিরতার চিহ্ন।
ঘাটে দাঁড়িয়ে সে বটগাছের দিকে তাকিয়ে আছে। আশা করছে—জারা হয়তো আজ তাকে দেখবে, কথা বলবে, একটা হাসি দেবে। কিন্তু প্রতি মিনিটে সে হতাশ হচ্ছে। বারবার ঘড়ি দেখছে, প্যাকেটের ফিতা ঠিক করছে, আবার পায়চারি করছে।
ঠিক তখনই দূর থেকে কিশোরী মেয়েদের হাসাহাসির শব্দ ভেসে এল।কিছুক্ষণ পর শব্দটা কাছে আসছে।সে পিছন ফিরল।তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
জারা আসছে।
সাদা কলেজ ড্রেস পরা , মাথায় পাতলা হিজাব । হাওয়ায় উড়ছে তার হিজাবের খোলা অংশ । কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। তার পাশে দু-একজন বান্ধবী। মিম আর ফিহা। হাসছে তারা।
কিন্তু জারা আরমানকে দেখল। তার পা হঠাৎ থেমে গেল।চোখে বিস্ময়।ঠোঁটে অচেনা কাঁপন।
মুহূর্তটা জমে গেল সময়ের বুকে।
আরমানের বুকের ভেতর চাপা ঝড়।
সে হালকা হাসল।কিন্তু জারা কোনো হাসি ফেরাল না।বরং সে ধীরে ধীরে বন্ধবীদের সাথে এগিয়ে এল, মিম আর ফিহা আরমানকে দেখে জারার পিছনে ফিসফিস করতে লাগল।
জারা আরামনকে দেখেও দাঁড়ালো না। হাঁটতে থাকে ঘাটের দিকে। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল আরমান।
চমকে উঠে জারা। কিন্তু তার কণ্ঠ ঠাণ্ডা।
___“আপনি এখানে?”
আরমান প্যাকেটগুলো একটু উঁচু করল।
___“তোমার জন্য।”
তার গলায় নরম স্বর, কিন্তু চোখে ভরপুর তৃষ্ণা।
জারা প্যাকেটের দিকে তাকাল।
____“কেন?”
একটা ছোট্ট প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নে অজস্র অভিমান।
আরমানের ঠোঁট নড়ল।
___“কারণ তোমার জন্য কিছু এনেছি ।”
জারা একটু চুপ।তার দৃষ্টি ঘাটের দিকে চলে গেল। মিম আর ফিহা তার জন্য দাড়িয়ে আছে ।__“আমার কলেজে দেরি হয়ে যাচ্ছে ।”বলেই চলে যেতে থাকে সে।
আরমান এগিয়ে এসে বলে
___“জারা…”তার কণ্ঠে অনুরোধের কম্পন।“এক মিনিট শোনো।”
জারা আরমানের দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে বলে
___“আপনার সিগারেট শেষ হয়েছে ?”
কথাটা কাঁটার মতো গেঁথে গেল আরমানের বুকে।
সে তাড়াতাড়ি সিগারেটটা পায়ের নিচে মাড়াল।
___“ করছিলাম তোমার জন্য। কথা ছিল তোমার সাথে। ”
জারা তখন প্রথমবার তার দিকে তাকাল।
চোখে রাগ, কষ্ট, ভালোবাসা—সব মিলেমিশে।
___“কেন? আমি তো বলিনি আপনাকে আসতে।”
আরমান হেসে ফেলল।
___“তোমার বলা লাগবে না।”
জারা’র বুকের ভেতর অস্থিরতা।তার মনের ভেতর লড়াই।সে জানে, আরমানের উপস্থিতি মানে ঝড়।কিন্তু এই ঝড়েই সে হারিয়ে যেতে চায়।
তবু সে মুখে শক্ত হল।
__“আমি ক্লাসের ধেরি হয়ে যাচ্ছে ।”
আরমানের হাত প্যাকেটের ফিতায় ধরে জারা’র দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে
___“ এটা নাও! তোমার জন্য ?”
জারা সোজা তাকাল তার চোখে।
___“ আমার জন্য মানে? আমার এসবের কোনো দরকার নেই।”
আরমানের বুক কেঁপে উঠল।
___“তোমার দরকার নেই, নাকি তুমি চাও না আমি তোমায় কিছু দিই?”
জারা উত্তর দিল না।সে ঘুরে দাঁড়াল।
ঠিক তখন আরমান এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে ফেলল।
“ হাফ ইঞ্চি মেয়ে ,তুমি এখনো আমার উপর অভিমান করে আছো? তাই তুমি আমার দেওয়া জিনিস গুলো নিবে না?”
জারা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩১
“আপনি আমার কিছু নন। আর অভিমান করার প্রশ্নই আসে না। দয়া করে হাত ছেড়ে দিন।”
এই কথাটা শোনার পর আরমানের বুকের ভেতর হাহাকার।সে ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দিল।
তার চোখে জল চিকচিক করল, কিন্তু সে হাসল।
___“ঠিক আছে। তুমি যাও।”
জারা এক মুহূর্ত থেমে রইল।তার বুকের ভেতরও কষ্টের ঢেউ।কিন্তু সে চলে গেল।পিছন ফিরে তাকাল না।
