Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৯

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৯

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৯
সোহানা ইসলাম

সকালটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি। গ্রামের চারপাশে কেবল মোরগের ডাক আর গাছের পাতায় শিশির ভেজা ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। বাতাসে হালকা শীতলতার ছোঁয়া।
কিন্তু সেই শান্ত সকালের মধ্যে জারার মন একেবারেই শান্ত ছিল না। রাতভর চেষ্টা করেও সে ঘুমাতে পারেনি। আরমানকে একের পর এক ফোন দিয়েছে, কিন্তু কলটা ধরেনি সে। উত্তর না পেয়ে ক্লান্তিতে কবে যে মাটিতে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা জারা নিজেও জানে না।
ভোরবেলায় মারজিয়া বেগমের ঘুম ভাঙে। তিনি হাতড়ে দেখেন পাশে মেয়ে নেই। বুক ধক করে উঠে যায়। “হায় আল্লাহ! জারা কোথায় গেল?”—চিন্তায় ঘেমে যান তিনি। তাড়াতাড়ি চৌকি থেকে নেমে খুঁজতে শুরু করেন। ঘরের এক কোণে মেয়েকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে দেখে তিনি দপ করে মেয়ের পাশে বসে পড়েন।

—“জারা… মা, কিরে তুই এখানে কেন শুয়ে আছিস?”
চোখ মেলে জারা ফিসফিস করে, “মা, কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাই’নি! ”
মারজিয়া বেগম মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দেন। —“মা, এত চিন্তা করিস না। তোরও তো শরীর আছে। দুশ্চিন্তা করবি না ?”
জারা ঠোঁট কামড়ে উত্তর দেয়, “ আচ্ছা ।”
মা–মেয়ে দু’জনেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নেয় জারা। মারজিয়া বেগম শুকনা মুড়ি আর আচার দিয়ে মেয়ের মুখে কিছু খাইয়ে দেন। এরপর ভাঙাচোরা ঘরটা গোছাতে শুরু করেন।
জোহান তখনো বিছানায়। ছোট ছেলেটা অসুস্থ। ঘুম ঘুম চোখ মেলে বলে, “আমিও উঠবো…”
কিন্তু জারা তাকে বারণ করে, “না, ভাইয়া। তুমি শুয়ে থাকো। আমরা করে নেবো।”
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে হঠাৎ কোলাহল শোনা যায়। দরজার সামনে কয়েকটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। সঙ্গে বুট জুতার শব্দ। ভয় পেয়ে মারজিয়া বেগম দরজার কাছে যান। চোখেমুখে আতঙ্ক।
এক মুহূর্ত পরে ভেতরে ঢোকে চেয়ারম্যানের ছেলে রহিম, তার সাথে আরও তিনজন চেলা। হাতে লাঠি, চোখেমুখে উদ্ধত ভাব।
জারার বুক ধক করে ওঠে। মারজিয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন।
রহিম ভেতরে ঢুকেই জারার দিকে তাকিয়ে বিকৃত এক হাসি ছুঁড়ে দেয়। —“কি খবর?তোমার জন্য ভোরবেলা হাজির হয়ে গেলাম।”

মারজিয়া বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বলেন, —“কেন এসেছো আবার? কী দরকার?”
রহিম গলায় গর্ব ঝরিয়ে বলে, —“বিয়ের জিনিসপত্র দিতে এসেছি।”
জারা ও তার মা চমকে ওঠে। জারা অবাক হয়ে বলে, —“কিসের বিয়ে?”
রহিম হেসে উঠে দাঁড়ায়, —“তোর আর আমার বিয়ে। আজই।”
এ কথা শুনে জারা ক্ষেপে যায়। তার চোখে আগুন ঝলসে ওঠে। —“কি বলছেন আপনি? আমি আপনাকে বিয়ে করবো? স্বপ্নেও না!”
রহিমের মুখের রঙ পাল্টে যায়। মাথা গরম হয়ে সে এগিয়ে আসে জারার দিকে। শক্ত করে দুই বাহু চেপে ধরে বলে —“একটা মেয়ে হয়ে এত জোরে কথা বলিস? আমি চাইলে আজই তোকে টেনে নিয়ে যেতে পারি আমার বিছানায় । বিয়ে করতে চাইছি, এখন হেডাম দেখাস।মা**গী?”
সে হাত বাড়িয়ে জারার বাহু চেপে ধরে। জারা ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে। —“ছাড়োন আমাকে!”
মারজিয়া বেগম দৌড়ে এসে রহিমকে আটকানোর চেষ্টা করেন। —“, ছাড়ো ওকে! আমার মেয়ের গায়ে তোমার নোংরা হাত দিও না!”

কিন্তু রহিম হিংস্র হয়ে জারার গায়ে ধাক্কা দেয়। জারা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোখে পানি চলে আসে। সে কাঁপতে কাঁপতে বলে, —“ আপনার মতো চরিএহীন -বদমাইশকে আমি কোনোদিন বিয়ে করবো না!”
রহিম দাঁতে দাঁত চেপে গালি দেয়। —“চুপ কর! আবার মুখে মুখে কথা বলিস না।”
বাড়ির ভেতর টানটান উত্তেজনা। একদিকে ভীতসন্ত্রস্ত মা–মেয়ে, অন্যদিকে ক্ষমতার দাপটে মাতাল চেয়ারম্যানের ছেলে। জারাও মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করে। অনেক ধস্তাধস্তির পর অবশেষে রহিমের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে।
জোর গলায় বলে ওঠে জারা, —“আমি মরে যাবো, তবু আপনাকে বিয়ে করবো না।”
রহিম চোখ লাল করে তাকায়। —“দেখিস, আমি তোকে যে করেই হোক আমার বিছানায় নিব। ইজ্জতের প্রশ্ন এখন আমার । তুই যতই না বলিস।”
সে তার চেলাদের ইশারা দেয়। তারা একে একে বিয়ের গয়না, কাপড়, আর কিছু জিনিসপত্র ঘরের কোণায় রাখে।
রহিম ব্যঙ্গ করে বলে, —“এগুলো রেখে যাচ্ছি। বিকেলে আসব কাজি নিয়ে । মেয়েকে তৈরি রাখবেন… শাশুড়ি আম্মা।”

তার চোখেমুখে শয়তানি হাসি। তারপর হুমকি দিয়ে বলে, —“না হলে ফল ভালো হবে না।”
এ কথা বলে তারা সবাই বেরিয়ে যায়।
ঘরের দরজা বন্ধ হতেই জারা হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বুকের ভেতর আতঙ্ক জমে থাকে।
—“মা, আমি কি করবো? আমি বিয়ে করবো না।…”
মারজিয়া বেগম মেয়েকে বুকে টেনে নেন। চোখের পানি মুছে দেন। —“কাদে না মা, ভয় পাবি না। আল্লাহ আছেন। তুই আমার কাছে নিরাপদ।”
কিন্তু মা–মেয়ে দু’জনেই জানে, ক্ষমতার দাপটে রহিম যা বলেছে তাই করবে। সন্ধ্যায় তাদের ঘরের সামনে আবার আসবে সে।
বাইরের সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, কিন্তু এই ভাঙাচোরা ঘরের ভেতরে অন্ধকার আর ভয় যেন আরও ঘন হতে থাকে।
জারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও একটাই প্রতিজ্ঞা করে বসে—
যে করেই হোক, এই বদমাইশ রহিমকে বিয়ে করবে না সে। বরং নিজের মর্যাদা রক্ষা করেই যে করে হোক।
চোখ মুছে তাড়াতাড়ি নিজের মোবাইল খুঁজতে থাকে জারা। মোবাইল টা পেয়ে তাড়াতাড়ি আরমান কে কল করতে থাকে কিন্তু কেউ ফোন টা রিসিভ করছে না। একবার দুইবার এমন করতে করতে অনেক কল দিয়ে ক্লান্ত হয়ে যায়।

হাঠাৎ মাথায় আসে জাহেদের কথা। তাকে কল করলেই তো আরমানকে পাবে। তাড়াতাড়ি কল করতে নেয়। কিন্তু… কিন্তু ফোন নাম্বার তো নেই। এখন? কি করবে সে? কিছু ক্ষন চিন্তা করে ফিহার কথা মনে পরে। ফিহার কাছে তো জাহেদের নাম্বার থাকবে।
ফোন করে ফিহা কে। কলটা রিসিভ হতেই জারা কান্না রত কন্ঠে বলে ___” ফিহা.. ”
বান্ধবীর এমন করুন সুর শুনে কলিজায় কামড় লাগে।
__” জানু কি হয়েছে তোর? কান্না করছিস কেনো? ”
জারা ফিহার কে সব ঘটনা খুলে বলে, কাল দুপুরের ঘটনা সহ এখন সকালের সব কিছু।
জারা ফিহাকে বলে যেন সে জাহেদকে কল করে বলে সবটা। আর আরমানকেও জানাতে। না হলে অনেক ধেরি হয়ে যাবে।
ফিহা জারা কে শান্ত হতে বলে। সে এক্ষুনি জাহেদকে কল করে বলবে সবটা। আর সে মিমকে নিয়ে এক্ষুনি ওদের বাড়িতে আসছে।
ফিহা কলটা কেটে দেয়। ফিহার কথায় জারা একটু সুস্তি পেল। তার বিপদে ফিহা আর মিম সব সময় পাশে থাকে।

এদিকে জাহেদ’রা সকলে মাএ সকালের নাস্তা করতে বসেছে। বারান্দায় ছোট টেবিলে সাজানো ডালপুরি, ভাজি, ডিম। জাহেদ মজা করে জিনিয়াকে খোঁচাচ্ছে, আর রোহানের পাশে রাশেদ চুপচাপ খেতে বসেছে।
ঠিক তখনই ফিহার কল এল জাহেদের ফোনে। এমন সময়,ফিহার কল আসায় জাহেদবঅবাক হয়। সে অবাক হয়ে ফোন ধরল।
—“হ্যালো ফিহা, এই সকালে কল করলে যে? খুব মিস করছো বুঝি?”
ফোনের ওপাশ থেকে তড়িঘড়ি গলা শোনা গেল। সিরিয়াল সময় এমন মজা করতে দেখে ফিহার রাগ তুঙ্গে উঠে যায়। জাহেদ কে ধমক দিয়ে বলে
—“ চুপ করুন। সবসময় মজা ভালো লাগে না!”
ফিহার হঠাৎ এমন রিয়েক্ট করাটা জাহেদের কাছে খটকা লাগে __” কী হয়েছে? এতো রেগে আছো কেন? ”

___” রহিম… রহিম জানু’কে জোর করে বিয়ে করতে চাইছে। আজ সন্ধ্যায় ওদের বাড়ি না-কি কাজি নিয়ে আসবে ।”
মুখে খাবার দিচ্ছিলো সে। ফিহার কথা শুনে হাত থেকে পড়ে গেল খাবারটা জাহেদের।
—“কি বলছো তুমি ?”
রোহান আর জিনিয়া দু’জনেই থমকে গেল জাহেদকে এমন চিন্তিত দেখে। জিনিয়ার চোখে আতঙ্ক। রোহানের ও কিছু একটা খটকা লাগছে।
—“কি হয়েছে ভাইয়া?” বলল জিনিয়া।
রোহান জাহেদের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে লাউড স্পিকার এর দেয়। ফিহা তখন ফোনে সব খুলে বলছে—রহিম কাল দুপুরে জারাদের বাড়ি গিয়ে ভাংচুর, জোহানের মাথায় আঘাত করা, সকালবেলার হুমকি,বিয়ের জন্য জিনিসপত্র রেখে যাওয়া এভরিথিং সব ।
ফিহার কথা শুনে বসা থেকে জাহেদ দাঁড়িয়ে পড়ল।
—“ আল্লাহ এতো কিছু হয়ে গেছে, আর তুমি আমাকে এখন জানাচ্ছো?”
রোহান কপালে হাত চাপড়াল।

—“চেয়ারম্যানের ছেলে? মানে ওই হারামখোর টা। ওই দিন মেরে পুতেঁ রেখে আসলে আজ আর এমন টা হতো না! ”
জিনিয়ার মুখ সাদা হয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল,
—“ জারা’ র অন্য কোথাও বিয়ে হতে দেওয়া যাবে না ।”
তাদের আলোচনার মাঝখানে একমাত্র রাশেদ কিছুই বুঝতে পারল না।
—“কি বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে? আপনারা সবাই এত চিন্তিত কেন? ”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। শুধু চোখাচোখি হলো। জাহেদ গম্ভীর গলায় বলল,
—“চল, সবার এখনই ভাবি দের বাড়িতে যেতে হবে।”

মিম আর ফিহা অনেক আগেই চলে এসেছে। তারা এসে দেখে জারা বসে কান্নাকাটি করছে। বাড়িটাও কেমন তছনছ হয়ে আছে।
মিম আর ফিহা জারা’কে শান্ত করার চেষ্টা করছে। মারজিয়া বেগম ওদের দুইজন কে দেখে মন একটু হলেও সাহস পেলেন। মারজিয়া বেগম ঘরের জিনিস পএ ঠিক করছিলেন। জারাও মায়ের কাজে সাহায্য করছে।
মিম আর ফিহা ও বসে থাকে নি। সবাই মিলে এক সাথে কাজগুলো করছে।
এতো কিছুর মাঝে জারা’র মন এখন শুধু আরমানের কথা ভাবছে। পাষাণ লোক এতো গুলো কল মেসেজ করার পরও একটা ও রিপ্লাই দিলো না। আপনি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। কি নিষ্ঠুর আপনি। আপনার কাছে থেকে এতোটাও কষ্ট পাব আশা করিনি। লাগবে না ওই লোকটাকে আমার। কারোর ভালোবাসার দরকার নেই । বিয়ে করে নিবে সে বদমাইশ রহিম কে।

জারাদের বাড়ির রাস্তায় গাড়ি ঢুকে না বলে বড় রাস্তায় গাড়ি রেখে আসতে হয় রোহান দের।
সকাল এগারোটার দিকে তারা সবাই একসাথে জারাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির চারপাশের অবস্থা কেমন নিরব হয়ে আছে। হালকা ভাঙাচোরা টিনের ঘরটা যেন আরও বেশি দমবন্ধ লাগছিল। জাহেদ তাড়াতাড়ি করে জারাদের দালান ঘরের সরদ দরজার বেল বাজায়।
ড্রইং রুমে কাজ করছিলো জারা। দরজা খুলে যখন জারা জিনিয়াদের দেখল, বুকটা হালকা হয়ে গেল। চোখ ভিজে গেলেও মনে একটু সাহস ফিরে পেল। দরজায় বেল বাজার শব্দ শুনে মারজিয়া বেগম, মিম আর ফিহা ও চলে আসে।
জিনিয়াকে এখানে দেখে মারজিয়া বেগম খুব অবাক হয়। তারা হঠাৎ এখানে?

__” বাবা! তোমরা হঠাৎ করে এখানে? ”
জিনিয়া মারজিয়া বেগম এর হাত ধরে বলে
__” আন্টি আপনি আমাকে মেয়ের মতো দেখেন। এখন আপনার বিপদের সময় আমরা যদি না থাকি তাহলে কেমন সন্তান হলাম। ”
রোহানও সায় জানিয়ে বলে __” হ্যাঁ আন্টি। আপনাদের বিপদ আর আমরা আসব না এটা কেমন করে হয়?”
__” আমরা যে বিপদে আছি এটা তোমাদের কে বলেছে ? ”
ফিহা এগিয়ে এসে বলে _
__” আ আমি বলেছি আন্টি! ”
মারজিয়া বেগম চিন্তিত ও ভয় নিয়ে বলেন
__” তোমরা এই গ্রামের মানুষ নও। তোমাদের বিপদ হতে পারে। আর আমি চাই না আমাদের জন্য কেই সমস্যায় পরুক। তোমরা চলে যাও। ”
জিনিয়া মারজিয়া বেগম কে ঘরের ভিতরে নিয়ে এসে সোফায় বসায়।

__” ভরসা রাখুন আন্টি আমাদের কিচ্ছু হবে না। আর আপনাদেও কিছু হতে দিব না আমরা। ”
এই এতো কিছুর মাঝে মিম শুধু একজনের দিকে তাকিয়ে ছিলো। রাশেদ। এই মানুষ টা কে এখানে দেখবে এটা যেন একটা সপ্ন তার কাছে। সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর কি অদ্ভুত ভাবে দেখা হয়ে যাচ্ছে বার বার। কিন্তু আফসোস ওই মানুষ টা তাকে চিনে না।
রাশেদ খেলায় করে মিম তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এই মেয়েটাকে তার চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখে মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনে পরে কাল এখানে আসার সময় রাস্তায় দেখেছিল। কালও ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো কেমন করে। আর আজকেও সেম একই ভাবে তাকিয়ে আছে।গায়ের রং চাপা হলেও মেয়েটা মিষ্টি দেখতে। রাশেদ মিমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে __” কি আন্টির মেয়ে এই ভাবে তাকিয়ে আছো কেন? কালও এই ভাবে তাকিয়ে ছিলে? ”
রাশেদের কথায় মিম লজ্জায় পরে যায়। কিন্তু উত্তর করল না। এরিয়ে গেলো রাশেদকে। চুপচাপ
গিয়ে জারা’র সাথে দাড়িয়ে থাকে।
মিমের এমন আচরণে ভ্রু কুঁচকে যায় রাশেদের। কিন্তু বেশি পাওা দিলো না বিষয় টা।
জিনিয়া জারাকে জড়িয়ে ধরল।

__”চিন্তা করো না! আমরা আছি তো ।”
জাহেদ আর রোহান ও ইশারায় বুঝায় ,
—“ভয় পায়েও না, আমরা আছি।”
কিন্তু সেই মুহূর্তে জারা খুঁজতে থাকে একজনকে। চারদিকে তাকায় বারবার।কিন্তু ওই মানুষ টার দেখে মিলে না। লজ্জার মাথা খেয়ে আস্তে করে প্রশ্ন করল জিনিয়া কে,
—“ ও ওনি কোথায়? ওনি আসে নি?”
জারার প্রশ্নটা রোহানের কানে আসে। তাই রোহান ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
—“আরমান পরশুদিন ময়মনসিংহে গেছে অফিসিয়াল কাজে। কেন তুমি যান না?”
এই খবর শুনে জারার বুক হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। চোখে এক নিস্তেজ শূন্যতা। ঠোঁট কেঁপে উঠল।
—“মানে? ”
জিনিয়া তাড়াতাড়ি তাকে জড়িয়ে ধরল।
—“ কান্না করে না বনু। আরমান ভাইয়া ফিরে আসবে । আমরা সবাই আছি।”
মারজিয়া বেগম জারাকে বলেন ওদের সবাই কে যেন ওর রুমে নিয়ে বসায়। জোহান ও অনেক ক্ষন ধরে একা আছে। ওদের দেখলে ছেলেটার ভালো লাগবে একটু। তিনি দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করছে। সব তো নষ্ট করে গেছে পশু গুলো। এখন এতোগুলো ছেলেমেয়েদের না খাইয়ে রাখা যাবে না। ঘরে কিছু টাকা ছিলো এই নিয়ে তিনি বাজারে চলে যান।

সবাই জারার রুমে চলে যায়। জোহান জারা’র রুমে শুয়ে আছে। এই বাচ্চা ছেলেটাকে এমন অবস্থায় দেখে জিনিয়াদের সবার বুক টা মুচড় দিয়ে উঠে। কি অবস্থা হয়ে গেছে। মুখটাও শুকিয়ে আছে। জিনিয়া গিয়ে জোহানের মাথার কাছে বসে।
আলতু করে ওর মাথায় হাত ভুলিয়ে দিতেই জোহান চোখ খুলে তাকায়। জিনিয়াকে দেখে মনটা যেনো নেচে উঠে জোহানের ।
__” কিউটি তুমি এসেছো?”
__” হ্যাঁ ভাই। তোমার এই অবস্থা আর আমি আসব না বলো? ”
জিনিয়া তাকে ভাই বলাটা পছন্দ হলো না। উজ্জ্বল মুখ টা কালো করে বলে __” আমাকে ভাই বলবে না কিউটি? আমি বড় হয়ে বিয়ে করব তোমায়। ”

__” আগে বিছানায় হিসু করার বয়স পার করো।বয়স কতো তোমার? নাক টিপলে দুধ বের হবে ।এখনই বিয়ের চিন্তা করে। ”
এই টুকু বলে থামে রোহান। সে আবার বলে
__” অন্যের জিনিসে চোখ দেওয়া কিন্তু মীরজাফর এর কাজ? ”
__” আমাকে একদম মীরজাফর বলবে না। ”
__ ” তো কি বলব? মাথা ফাটিয়ে বিছানায় শুয়ে আছো, তারপরও বিয়ে করার ভূত মাথা থেকে যায় নি। ”
___” আ হা কি শুরু করেছেন আপনি? আগে ভাইয়াকে ফোন করুন। তা না করে একটা বাচ্চার সাথে নিজেও বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছেন। ” বলল জিনিয়া।
জিনিয়ার ধমক শুনে জাহেদ আর রোহান একসাথে বারবার কল করতে শুরু করল আরমানকে। একের পর এক কল গেল, কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
রোহান দাঁত চেপে বলল,

—“কোথায় গেল এই ছেলে! দরকার এর সময় কোনো খবর নেই শা*লা ।”
মিম আর ফিহাও তখন তাদের সাথে বসে আছে। জারা’ কে জরিয়ে ধরে বসে আছে জিনিয়া । এইটুকু সময়ে যেনো জিনিয়ার সাথে ওর আরও ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। কেমন বড় বোনের মতো আগলে রেখেছে তাকে। সবার চোখেমুখে টেনশন। সময় যেন থেমে গেছে।
জারা কান্না করতে করতে বলে __” উনি কল ধরবে না ভাইয়া। আমি কাল রাত থেকে কল করছি ধরছে না। ওনি আমাকে ভালোবাসে না। পাষাণ লোক কতো কষ্ট দিচ্ছে আমাকে। তিন দিন ধরে একটা কথা ও বলেনি আমার সাথে। ”
রাশেদের সাথে এখন আরও এখন বোকা সদস্য যোগ হয়। জোহান। তাদের কথার আগাগোড়া কিছু মাথায় ঠুকছে না তাদের। শুধু বোকার মতো এর মুখে, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
অবশেষে রোহান শেষবার চেষ্টা করে।আল্লাহ রহমতে এবার কলটা রিসিভ হলো। সবার বুক ধুকপুক করতে লাগল।
কিন্তু কল আরমান নয়—ফারিয়া বেগম রিসিভ করে।

—“হ্যালো,?”
রোহান কণ্ঠ শান্ত করে বলল,
—“আন্টি, আমি রোহান। দয়া করে বলুন না আরমান কোথায়?”
ফারিয়া বেগম স্বাভাবিকভাবে বললেন,
—“ও তো ঘরেই আছে। রাতে ফোনটা ডাইনিং টেবিলে ফেলে রেখে মনে হয় ঘুমিয়ে গেছিলো। এখনো মনে হয় শুয়ে আছে।”
সবার মুখে একসাথে স্বস্তির ছাপ ফুটল।
রোহান অনুরোধ করে বলল,
—“আন্টি, প্লিজ… আরমানের কাছে ফোনটা দেন। ওর সাথে খুব জরুরি কথা আছে।”
ফারিয়া বেগম একটু অবাক হয়ে গেলেন।
—“আচ্ছা, লাইনে থাকো । আমি এখনই ফোনটা নিয়ে যাচ্ছি ওর ঘরে।”
এই কথাগুলো শোনার পর ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সবার চোখে তখন একটাই আশা।
ফারিয়া বেগম মোবাইল হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আরমানের ঘরের দিকে এগোলেন। দরজা খুলতেই দেখলেন, ছেলে মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। ভেজা চুল থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে, শরীরে জড়িয়ে আছে শুধু সাদা তোয়ালে।
আরমান মাকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো।

—“আম্মু, কিছু বলবে ?”
—“রোহান কল করেছে। বলছে খুব দরকারি কথা আছে।”
আরমান মোবাইলটা মায়ের হাত থেকে নিয়ে নিল। ঠোঁটে বিরক্তির ছাপ। মাথা টা কেমন যেন করছে, শাওয়ার নিয়ে ও শান্তি লাগছে না তার। কানে মোবাইল টা নিয়ে বলে
—“এই সকালে আবার কি এত জরুরি কথা তোর? ”
আরমানের গলা ফোনের ওপাশ থেকে আসতেই, রোহানের গর্জন দিয়ে বলে
—“শালা! কুত্তার বাচ্চা, হারামজাদার বাচ্চা কোথায় ছিলি তুই এতক্ষণ?”
আরমান থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে কণ্ঠ শক্ত করল।
—“ বা*ল গালি দিচ্ছিস কেন? যেটা বলতে কল করেছিস সেটা বল! ”
রোহান দাঁতে দাঁত চেপে আবার বলল,
—“গালি না দিয়ে উপায় আছে? তুই মরে যা, তোর বেঁচে থাকর কোনো অধিকার নেই ? তুই জানিস জারার কি অবস্থা?তুই ওর কল, মেসেজ কিচ্ছুর উওর করছি না কেন ? ”
আরমান অবাক।আবার চিন্তা ও কাজ করছে

—“কি বলছিস? কি হয়েছে ওর?”
রোহান ধপ করে টেবিলে হাত মারল।
—“ ওই বদমাইশটা,চেয়ারম্যান এর ছেলে, যার সাথে মাঠে ঝামেলা হয়েছিল। ওই বাদা*** না-কি আজ সন্ধ্যায় জারাকে জোর করে বিয়ে করতে আসবে। কাল দুপুরে এসে ভাংচোর করছে। জোহান এর মাথায় আঘাত করেছে। আবার সকালে এসে বিয়ের জন্য জিনিসপত্র রেখে গেছে। মেয়েটা আর তার মা এখন আতঙ্কে পাগল।”
আরমানের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। রক্ত গরম হয়ে গেল। দাঁত কড়মড় করে উঠল।
—“কি বললি? রহিম… জারাকে?!”
রোহান থেমে গেল না। আরও কয়েকটা গালি ঝাড়ল।

—“তুই চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলি, আর এখানে তোকে কল করতে নির্ঘুমে রাত কেটেছে ওর।”
আরমানের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। চোখ লাল হয়ে উঠল। সে নিজেও ফুঁসে উঠল।
—“ ওই কান**কির পোলারে জেন্ত করব দিমু আমি ! মা**গীর পোঁতে এতো দুঃসাহস কি করে হলো? ওর দিকে হাত বারানোর ? কলিজা ছিড়ে হাতে ধরিয়ে দিব আমি। আজ আমি ওর দাঁত ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব। চু*দি*র ভাইয়ের যে মেশিন এতো লাফালাফি করছে না, ওই মে*শি*ন ঘোরা থেকে কেটে ফেলব আমি। বিয়ে করার সাদ সারাজীবনের মতো গুছিয়ে দিব মাদার*চুদের। ”
ফারিয়া বেগম অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই প্রথম দেখলেন, আরমান এতটা ক্ষিপ্ত। আর একি ভাষা ব্যবহার করছে। আরমানে এমন চিৎকার শুনে জেসমিন বেগম রান্না ঘর থেকে ছুটে আসেন।
আরমান কণ্ঠ ভারী করে বলল,

—“রোহান, তোরা এখন কোথায়?”
—“আমরা সবাই জারাদের বাড়িতে।”
—“ঠিক আছে। আমি এক্ষুনি আসছি। তোরা ওকে একটু দেখে রাখ আমি আসছি ।”
ঠিক তখনই রোহানের হাত থেকে মোবাইল টা কেড়ে নেয় জারা। কান্না করতে করতে বলে
__” আপনাকে আসতে হবে না শয়তান লোক। লাগবে না আপনাকে আমার। কারো ভালোবাসা চাই না। আমি ওই…ওই বদমাইশ লোকটা কে বিয়ে করে নিব। সংসার করব আমি। দেখতে আসতে হবে না আপনাকে? আপনি ঘুমিয়ে থাকুন! ”
জারা’র কথায় আরমান এর রাগে যেনো কেরোসিন ডালার মতো জ্বলে উঠে। গলার স্বর তিন গুণ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলে

__” কুওার বাচ্চা মুখ ছিড়ে ফেলব তোর। আর এক বার ওই মুখ দিয়ে এসব বের হলে। বিয়ের শখ জেগেছে তোর তাই না, আসছি আমি! তোর বিয়ের শখ আমি ওই চেয়ারম্যান এর ছেলের টুনটুনি কেটে ছুটাব শো**রের বাচ্চা ? ”
জারা ফের নাক টানতে টানতে বলে
__” একদম ধমকে কথা বলবেন না শয়তান লোক। খবিশ লোক একটা। যাওয়ার সময় একবার বলে গিয়ে ছিলেন আপনি ? তাই আমিও ওই চেয়ারম্যান এর ছেলে কে বিয়ে করে নিব। ”
__” হাফ ইঞ্চি বাচচচচচচচ্চা। ”
__” কককী ”
__” জিব টেনে ছিড়ে ফেলব তোর। ”
__” আচ্ছা দেখব নে? ”
__” ওয়েট কর! আসছি আমি দেখানোর জন্য। ”
সিরিয়াস বিষয়েরও আরমানের কথা শুনে সকলেই হেসে ফেলে।
আরমান ফোন কেটে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে তোয়ালে পরেই রুমের বাইরে হাঁটা দিলো ।
ফারিয়া বেগম আরমানের পিছন পিছন রুম থেকে বের হন, ভয়ে কেঁপে উঠে বললেন,

—“কি হয়েছে বাবা? এতো রেগে আছিস কেন ?”
আরমান বড় বড় পা ফেলে বাইরে যেতে যেতে বলে
—“ কিছু হয় নি আম্মু! আব্বু আর ছোট আব্বু আসলে বলে দিও আমি ইসলাম পুড় গ্রামে বেক করছি। ”
জেসমিন বেগমের মুখ সাদা হয়ে গেল।
—“হায় আল্লাহ, সর্বনাশ! তুই এই ভাবে বের হবি?”
মারজিয়া বেগম __” আরমান তোয়ালে পরে কোথায় যাচ্ছিস? অত্যন্ত জামাপ্যান্ট তো পরে যা? ”
আরমান দৃঢ় গলায় বলল,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৮

—“ সময় নেই আম্মু। আমি যদি এখন না যাই, তাহলে সারাজীবন পাগলের মতো জামাপ্যান্ট ছাড়াই আমাকে রাস্তায় নেংটা হয়ে গুরতে হবে। রিস্ক নেওয়া যাবে না। তাই এটার পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি ।”
সে তাড়াহুড়া করে নিকের কালো মার্সেডেস কার এ-র চাবি হাতে নিয়ে,তোয়ালে পরা অবস্থায় সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে যায় । চোখেমুখে ঝড়।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here