Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪১
সোহানা ইসলাম

“কি আর করতে যাবে? কাজি অফিসে তো সবাই বিয়েই করতে যায়। স্যারও তো…”
রাশেদের ঠোঁট থেকে যখন এই কথাটা বের হলো, মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশের সবাই যেন হিম হয়ে গেল বরফের মতো। কথাটার ওজন এতটাই ভারী যে, কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে শুধু। সবার চোখে একই প্রশ্ন—
তাহলে কি সত্যিই আরমান বিয়ে করতে কাজি অফিসে যাচ্ছে?
কেউই যেন নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছে না। পরিস্থিতি হঠাৎ করেই অন্যরকম মোড় নিয়েছে। মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল সবার মধ্যে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—যেভাবেই হোক আরমানদের গাড়িকে ফলো করতে হবে।
কিন্তু বিপত্তি হলো গাড়ি নিয়ে। গাড়ির সিট সংখ্যার সঙ্গে যাত্রী সংখ্যার হিসাব মিলছে না। ওরা সবাই ছয়জন, আর গাড়ির ভেতরে জায়গা মাত্র পাঁচজনের। ড্রাইভ করবে রাশেদ, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সামনে বসবে কে? এ নিয়ে শুরু হলো ছোটখাটো গন্ডগোল।
প্রথমেই জিনিয়া বলল,

— “আমি সামনে বসব।”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রোহান কড়া আপত্তি জানিয়ে বলে — “না, তুমি সামনে বসবে না।”
জিনিয়া চোখ কুঁচকে রোহানের দিকে তাকালেও রোহান কোনো গুরুত্ব দিল না। সে গম্ভীর মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। এমনি শান্ত হলেও তার একরোখা স্বভাব সবাই জানে। তাই তার সঙ্গে ঝগড়া করার সাহস কারও নেই।
এবার সমাধানের দায়িত্ব নিল জাহেদ। সে বলল,
— “মিম সামনের সিটে বসবে। এটাই ভালো হবে।”
মিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। তাই সবার নীরব সম্মতিতেই ঠিক হলো মিম বসবে সামনে।
পিছনের সিটে চারজনকে বসতে হবে। কিন্তু সেখানে তো জায়গা মাত্র তিনজনের জন্য। একজনকে কারও কোলে বসতেই হবে।জাহেদ এবার চোখ ঘুরাল ফিহার দিকে। জাহেদ চওড়া হাসি দিয়ে তাকাল তার দিকে। তার অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যটা যেন ফিহা মুহূর্তেই বুঝে গেল।
চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল তার। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,— “আমার কারও কোলে বসার দরকার নেই। পরিষ্কার?”

জাহেদের মুখ মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। সে মৃদু হেসে অন্যদিকে তাকাল।
বাকি থাকল জিনিয়া। একবার সে তাকাল রোহানের দিকে। রোহান তখন গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বিরক্তি তার চোখে মুখে স্পষ্ট। যেন সবার এই অযথা ঝগড়া তার অসহ্য লাগছে।
কিছু না বলে হঠাৎই সে এগিয়ে গিয়ে আগে গাড়ির ভেতর ঢুকে বসল।
— “যারা যাবে, তারা এসে বসো। অযথা নাটক করার সময় নেই এখন ।”
তারপর জাহেদও দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফিহাকে নিয়ে বসে গেল পিছনের সিটে।গাড়ির জানালার পাশে ফিহা বাধ্য হয়ে জায়গা করে নিলেও তার চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট।জাহেদ একেবারে তার গা ঘেঁষে বসে আছে।
এবার দাঁড়িয়ে রইল শুধু জিনিয়া। তাকে ওভাবে বোকার মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে রোহান ধমক দিয়ে বলল,
— “গাড়িতে উঠছো না কেন? নাকি যাওয়ার ইচ্ছে নেই তোমার?”
জিনিয়া কেঁপে উঠল। মাথা নিচু করে বলল,

— “আ আমি কোথায় বসব?”
রোহান এবার প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ঘুরে বসলো জাহেদের দিকে । রাগটা গিয়ে পড়ল জাহেদের ওপর। ধপ করে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল তার কাঁধে।
— “তোর বাপকে বলবি, একটা বড় গাড়ি কিনতে। যেখানে বিশজন একসাথে বসতে পারবে!”
ঘটনাটা হঠাৎ হওয়ায় জাহেদ হতভম্ব হয়ে গেল। তার তো কোনো দোষ নেই! রোহানের এমন আচরণে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বিরক্ত স্বরে জিনিয়াকে বলে,
— “এসে রোহান ভাইয়ার কোলে বস। কিছু হবে না, কয়েক মিনিটের ব্যাপার।”
রোহানের মুখ আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। কিন্তু জিনিয়া আর কোনো উপায় না দেখে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল গাড়ির দিকে। হৃদপিণ্ড যেন ধড়ফড় করছে তার। রোহান দরজা খুলে দিল।
একটা অদ্ভুত সঙ্কোচ নিয়ে জিনিয়া ধীরে ধীরে বসল তার কোলে। মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল তার গাল। যেন চারপাশের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। মাথা নিচু করে শুধু ভাবতে লাগল—
কেন যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো!

রোহানের মুখ শক্ত। চোখ সোজা রাস্তার দিকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেও এক অদ্ভুত অনুভূতি টের পাচ্ছে। তার কোলের ওপর বসা জিনিয়ার শরীরের কাঁপন, লজ্জার আভা—সবকিছু যেন তাকে অস্থির করে তুলছে। তবুও সে কোনো কথা বলল না। ভালোবাসার মানুষের এই প্রথম ছোঁয়া রোহানের কাছে। কিন্তু যে মানুষ টাকে সে মন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, সেই মানুষ তাকে চায় না।
গাড়ি স্টার্ট দিল রাশেদ। পাশে বসা মিমের দিকে একবার তাকাল সে। অদ্ভুত এক আকর্ষণ তার চোখে ভেসে উঠল। মিম নামটা শোনার পর থেকেই বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে মেয়েটির দিকে। যেন সে চাইলেও চোখ সরাতে পারছে না।অনেক দিনের চেনা পরিচয় লাগছে মেয়ে টাকে। মনের মাঝে অনেক বার একটা কথা এসেছে “এটাই কী সেই মেয়ে যাকে সে না দেখেই ভালোবেসে একসময়। এবং এখনো ভালোবাসে।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে দূরে দেখা যাচ্ছে আরমানের গাড়ি। সবাই টান টান উত্তেজনায়। কে জানে, ঠিক কোথায় যাচ্ছে তারা? সত্যিই কি কাজি অফিসে বিয়ে করতে যাচ্ছে আরমান?নাকি মজা করছে?
ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকের মনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।
জিনিয়া বসে আছে চুপচাপ। রোহানের কোলের ওপর বসে সে এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর লজ্জায় আচ্ছন্ন। মনে মনে বলছে—

“কেন আমার সাথেই এমন হলো! আল্লাহ আমি কেন তার কোলে বসলাম? লজ্জা কী লজ্জা? ”
রোহানের চাঁদ সুন্দরী তার কোলে বসে আছে এটা তার কাছে সব থেকে সুন্দর অনুভূতি। কিন্তু প্রকাশ করল না চোখে মুখে বিরক্তি চেপে বসে আছে। কিন্তু কোথাও যেন অদৃশ্য এক টান অনুভব করছে সে। নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।
জাহেদ চুপচাপ। সে নিজের জায়গা সামলে নিয়েছে, আর ফিহাকে বিরক্ত করছে। ফিহা বিরক্তি নিয়ে চোখ রাঙ্গালে, জাহেদ আরও বেশি করে করছে।
মিমও নিরব। কিন্তু তার মনেও ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ভালোবাসার মানুষের পাশে বসে আছে। হয় তো এই মানুষ টা তাকে চিনে না, কিন্তু সেতো চিনে।
রাস্তা পেরিয়ে গাড়িগুলো ছুটে চলেছে।

গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর বাইরে দৌড়ে চলা হাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজ। স্টিয়ারিং-এ শক্ত করে হাত রেখেছে আরমান। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। চোখ সরল রাস্তার দিকে।
কিন্তু তার পাশেই বসে থাকা জারা যেন ঝড় তুলেছে। বুক কাঁপিয়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে সে। ওড়নায় মুখ ঢেকে রেখেছিল, কিন্তু চোখের পানি, স্রোতের মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সেই হাহাকার যেন গাড়ির ভেতরের বাতাসটাকেও ভারী করে তুলেছে।
আরমান বিরক্ত। ভ্রু কুঁচকে তাকাল পাশের সিটের দিকে। গলা নিচু করে বলল—
— “চুপ করো মানজারা। আর কত কাঁদবে?”
কিন্তু জারা শোনার মতো অবস্থায় নেই। তার কান্না যেন আরও বেড়ে গেল। মুখ টিপে অশ্রু ঢাকতে চাইছে, অথচ সেই চেষ্টা আরও বেশি করে তার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে।
হঠাৎ আরমান হাত বাড়িয়ে দিল। ওড়নাটা, যেটা দিয়ে জারা মুখ ঢেকেছিল, সেটাই টেনে সরিয়ে নিল সে। তার চোখে বিরক্তি, কিন্তু কোথাও যেন লুকানো কোমলতাও আছে।

— “এইভাবে মুখ ঢেকে কাঁদতে হবে না। তোমায় ভালো করে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে আমার। ”
জারা অভিমান ভরে হাত দিয়ে সরিয়ে দিল তার হাতটা। নিচু স্বরে বলল—
— ” ছুবেন না আমায় বাজে লোক। না বলে চলে গিয়েছিলেন। টানা তিনদিন একটা কথাও বলেন নি আমার সাথে। কলও দেননি। আমি দিলেও রিসিভ করেন নি। এখন এসে ধমকাচ্ছেন, আবার কী জোরে থাপ্পড় মেরেছেন আমায়। ”
আরমানের বুকের ভেতর হালকা ধাক্কা লাগল। মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগেই সে জারাকে চড় মেরেছিল। হয়তো না মারলেও হতো। মেয়েটা এত নাজুক, এত ভঙ্গুর—তবু তার রাগের ঝড়ে সেই কোমল মুখে হাত উঠেছিল। অনুতাপের একটা ছায়া নেমে এল তার চোখে।
মুখ অনুপাত রেখেই বলে আরমান

— “আমার সাথে অনেক অভিমান করছো তাই পাখি? আর এমন করব না পাক্কা প্রমিজ সোনা। ”
স্টিয়ারিং একটা হাতে ধরে, অন্য হাতে হালকা টান দিয়ে জারাকে নিজের দিকে আনার চেষ্টা করল আরমান। কিন্তু জারা যেন সব শক্তি দিয়ে শরীরটা দরজার পাশে ঠেকিয়ে রাখল। যেন সে ওই মানুষটার কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই ভালো।
অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলে উঠল সে—
— “আমি আপনার সঙ্গে যাব না! নামিয়ে দিন আমায়।”
আরমানের ঠোঁটে একরোখা হাসি খেলে গেল। সে গলায় দৃঢ়তা নিয়ে বলে
— “তুমি না চাইলেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। এখন তোমার আর ফেরার উপায় নেই।”
জারা বিস্মিত চোখে তাকাল। বুকটা ধক করে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
— “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
আরমানের চোখে ঝিলিক। গম্ভীর স্বরে বলল—

— “কাজি অফিস।”
জারার বুক যেন হঠাৎ থমকে গেল। কাজি অফিস! মানে… মানে কি তবে সত্যিই—বিয়ে? তার ভেতরটা কেঁপে উঠল। অগণিত চিন্তা, ভয়ের ঢেউ তাকে গ্রাস করে ফেলল। মনে মনে বলল—
“না, এটা হতে পারে না। এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে? মা জানে না, ভাই জানে না। আমার কোনো প্রস্তুতি নেই। যদি সত্যিই ও আমাকে জোর করে বিয়ে করে নেয়, তবে আমার ভবিষ্যৎ কী হবে? আমি কি সত্যিই এই মানুষের সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে পারব? আমার স্বপ্নগুলো? আমার ইচ্ছে, আশা… সব ভেঙে যাবে না তো?”
কথাগুলো মুখ দিয়ে বের হলো না। শুধু কান্নায় আরও ভিজে গেল তার মুখ।
কিছুক্ষণ পর কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল জারা—

— “কাজি অফিসে কেন যাব? আমাকে নামিয়ে দিন। আমি যাব না!”
আরমান এবার সোজাসুজি তাকাল তার দিকে। ঠোঁট শক্ত করে বলল—
— “বিয়ে করতে।”
জারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। চোখ বড় বড় করে তাকাল। ঠোঁট কাঁপছে।
— “না… আমি বিয়ে করব না।”
___” কেন বিয়ে করবে না। আমাকে পছন্দ না তোমার। ভালোবাস না আমায় তুমি? ”
তারপর শুরু হলো একের পর এক অজুহাত।
— “আমার মা একা হয়ে যাবে, আমি কীভাবে ছেড়ে যাব তাকে?”
__” শাশুড়ী আম্মা একা হয়ে যাওয়ার আগেই একটা নাতি উপহার দিয়ে দিব ইনশাআল্লাহ। ”
আরমানের কথা শুনে মুখ ভোঁতা হয়ে যায় জারা’র। বিয়ে না করার জন্য আবারও আরেকটা অযুহাত দেয়
— “আমার পড়াশোনা শেষ হয়নি, আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই।”
___” এখনো বলছি, আগেও বলেছি আমার বউ কে এতো পড়াশোনা করাব না আমি। আমার বউ শুধু আমাকে সামলাবে! ”

— “আপনার পরিবারের লোকেরা আমাকে মেনে নেবে না।”
___” এটা নিয়ে তোমায় মাথা ঘামাতে হবে না। আমি বোঝে নিব? ”
— “আমি… আমি এখনো ছোট।”
এইসব বাহানাগুলো বলতে বলতে জারা একেবারে শিশুদের মতো আচরণ করতে লাগল। কান্নার মাঝেও ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে। যেন সে কোনো বাচ্চা মেয়ে, যার খেলনা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।ঠোঁট কামড়ে হাসে আরমান জারাকে বলে
___” আমার কি টাকার অভাব? বউকে দিনে দশবেলা করে হরলিক্স খাইয়ে বড় করে ফেলব। ”
__” আমি হরলিক্স খাই না ”
আরমান চোখ কুঁচকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি জমল। তার চোখে-মুখে বিরক্তি থাকলেও কোথাও যেন অদ্ভুত মমতা ফুটে উঠল।
হঠাৎ সে ঠোঁট কামড়ে হাসল।

__” তাহলে আমার দেওয়া স্পেশাল ফরমালিন দিয়ে পাকিয়ে ফেলব তোমায়? ”
জারা রাগে, অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু তার ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপন তৈরি হলো।
আরমান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। পুরো গাড়িটা যেন তার হাসিতে কেঁপে উঠল।
জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে পানি এখনো গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার ভেতরে প্রশ্ন জমছে—”এমন অবস্থায়ও হাসার মতো কী পেল সে? কিন্তু সুন্দর লাগছে। গেঁজা দাঁত গুলো হাসি দেওয়ার ফলে বের হয়ে আছে। ”
আরমান হেসেই বলল—
— “তুমি সত্যিই একদম বাচ্চা মেয়ের মতো আচরণ করছো। অবশ্য করতেই পারো, কারণ তুমি আমার একমাত্র হাফ ইঞ্চি বউ হবে। ”

জারা ঠোঁট ফুলিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। বিরক্তি, অভিমান, ভয়ের ভেতর কোথাও যেন একটা অদ্ভুত টান কাজ করছে। চোখে চোখ পড়তেই সে আর মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারল না।
মুহূর্তটা যেন আটকে গেল সময়ের খাঁচায়।
বাইরে গাড়ি ছুটে চলেছে। সামনের দিকে কাজি অফিস ধীরে ধীরে কাছে আসছে। অথচ গাড়ির ভেতরে বসে থাকা দুই মানুষ—একজন জেদে অনড়, আরেকজন কান্নায় ভিজে যাওয়া, অভিমানে রঙিন—তারা দুজনেই বুঝতে পারছে, তাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

সন্ধ্যা সাতটা বাজতে না বাজতেই রহিম জামাই সাজগোজ করে বের হলো। মাথায় ঝকঝকে টুপি, হাতে মোটা সুগন্ধির গন্ধ, গায়ে নতুন পাঞ্জাবি। সাথে তার চেনাজানা কয়েকজন সঙ্গী। দূর থেকে তাকালেই মনে হয় বরযাত্রী বেরিয়েছে বিয়ের আসরে যাওয়ার জন্য।
রহিম গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছে, কিন্তু তার সঙ্গীরা হাসি চাপতে পারছে না। একজন খ্যাপাটে ভঙ্গিতে বলেই ফেলল—
— ” ভাই আমনেও কাম সাইরা ফেললেন !”
রহিম মুখ গম্ভীর করে উত্তর দিল—
— “চুপ কর, এটা কোনো মজা নয়। আজ রাতেই কাজটা শেষ করতে হইব।”
সঙ্গীরা চোখ টিপে হেসে আবার চুপ হয়ে গেল।
বাড়ির মোড়ে এসে দাঁড়াতেই পুরো দৃশ্যটাই অন্যরকম হয়ে গেল। রহিম ভেবেছিল জারাদের বাড়ির চারপাশ ফাঁকা থাকবে। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই কিছু অচেনা লোক ওঁত পেতে বসেছিল। রহিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল।
দুই-তিনজন লোক রহিমকে ধরে ফেলল, বাকিদেরও কে কোথা থেকে এসে ঘাড় ধরে টেনে তুলল। মুহূর্তের মধ্যেই সব ওলটপালট হয়ে গেল।
রহিমের একজনা সঙ্গি ধস্তাধস্তি করতে করতে চিৎকার করল—

— “এই! এটা কী হচ্ছে?আমাদের ভাইয়ের আজকে বিয়া। ছাইড়া দেন তারে।”
তাকে ধরে থাকা একজন হেসে বলল—
— “ওরে বাবা, জামাই আবার রাস্তা দিয়ে এমন নাটক করে আসে নাকি? তোমাদের আজকে ভিন্ন রকমের শ্বশুরবাড়ি দেখানো হবে।”
রহিমের সঙ্গীদের অবস্থা আরও করুণ। কেউ জুতো হারিয়েছে, কেউ মাটিতে পড়ে গেছে, কেউ আবার আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়ে কণ্ঠ শুকিয়ে ফেলেছে।আর কাজি নিজের জান বাঁচাতে লুঙ্গি কাঁধে তুলে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
রহিমের গলা থেকে রাগ আর ভয়ের মিশ্র স্বর বের হলো—
— “ছাড়ো! না হলে কিন্তু খুব খারাপ হবে!”
আসলে খারাপটা হয়েছে ওদেরই। কারণ লোকগুলো এমনভাবে একেকজনকে কাঁধে তুলে নিচ্ছে, যেনো সত্যিই কোনো হালকা মাল তুলছে।
অবশেষে রহিম আর তার সঙ্গীদের সবাইকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। পেছনে শুধু থেকে গেল রহিমের ঝকঝকে টুপিটা, মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

গাড়ি এসে থামল কাজি অফিসের সামনে। সারা রাস্তা জেদি মুখে বসে থাকা জারা হঠাৎ গাড়ি থামতেই ছটফট করতে শুরু করল। আরমান দরজা খুলে তাকে টেনে নামাতে চাইছে।
কিন্তু নাছর বান্দা জারা কিছুতেই বিয়ে করবে না। হঠাৎ ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল সে। তারপর আরমানের পা আঁকড়ে ধরে বলল—
— “না, আমি বিয়ে করব না! আমাকে ছেড়ে দিন।”
আরমান তখনও কেবল তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায়। হঠাৎ জারার টানেই তার শরীর কেঁপে উঠল। তোয়ালেটা যদি খুলে যায়, তাহলে তো মানইজ্জত সব মাটিতে মিশে যাবে! মুখ লাল হয়ে গেল আরমানের।
— ” হাফ ইঞ্চির বাচ্চা তোয়ালে ছাড় আমার। এটা কী বাচ্চামি বা*ল?”
কিন্তু জারা আরও শক্ত করে তোয়ালে ধরে বসে রইল। চারপাশে জমে থাকা লোকজন হাসি চেপে ফিসফিস করছে। আরমানের বিরক্তি চরমে পৌঁছাল।

___” তোয়ালে খুলে যাবে কিন্তু? ছাড় বলছি পটলের বাচ্চা। ”
__” আমি বিয়ে করব না, লাল জাইঙ্গার বাচ্চা। ”
জারা’র কথায় আঁতকে উঠে আরমান। সে তো সত্যি লাল ভাইঙ্গা পরেছে তোয়ালের নিচে। তার মানে দেখে ফেলেছে? ইসসসেরে বিয়ে করার আগেই বউয়ের কাছে মানইজ্জত সব শেষ।
__” দেখে ফেলেছো? ”
জারাও বাচ্চাদের মতো মাথা উপর নিচে করে বোঝায়। সে দেখে ফেলেছে।
__” হুমমমম!”
__” হাফ ইঞ্চির বাচ্চা ছাড় আমাকে। নয় তো এই তোয়ালের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখব। ”
__” এ্যাঁ এতো সহজ না। ”

ঠিক তখনই হইচই শুনে রোহানরা এসে হাজির। সামনে দাঁড়ানো দৃশ্য দেখে সবার চোখ কপালে। রোহান, জাহেদ, রাশেদ—একেকজনের মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনই হেসে ফেটে পড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন, হাসতেও পারছে না।
অবশেষে অনেক কষ্টে জারার হাত ছাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিল আরমান। জারা কোলে উঠে হাত-পা ছুড়তে লাগল, লাফালাফি করে বলল—

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪০

— “আমি যাচ্ছি না! আমাকে নামান!”
কিন্তু আরমান কোনো কথা না বলে দৃঢ় ভঙ্গিতে সোজা কাজি অফিসের ভেতরে ঢুকে গেল। আর তাদের পিছনেই হইচই করতে করতে ঢুকে পড়ল রোহানরা সবাই।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here