Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৪

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৪

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৪
সোহানা ইসলাম

__”হ্যালো!” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে জারা!
সকাল ১১টা বাজলেও সেই দেয়াল অটল। গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত একবারও কথা হয়নি তাদের।ফোনের স্ক্রিন বারবার জ্বলে উঠলেও সেখানে আরমানের নাম দেখা যায়নি।
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা আর হাতে নেয় না। চার্জে বসিয়ে রেখে নিজেও এসে বেডে শুয়ে থাকে। সে জানে, আরমান এখন কল করবে না। ফিহা বা মিম কল করবে তাই এতো গুরুত্ব দেয়নি বিষয় টা।
ঠিক তখনই বার বার ফোনটা বেজে ওঠে। বেড থেকে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত নাম—”সুইট বয়”।জারা আশা করে নি এখন আরমান কল করবে।
জারার বুক ধক করে ওঠে। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ সব একসাথে ভর করে তার উপর। তবু সাহস করে কলটা রিসিভ করে ফেলে।
ওপাশে কণ্ঠটা ঠান্ডা আর রাগমাখা কন্ঠে বলে আরমান

—“এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি? কাল রাত থেকে একবারও কল করো নি! আর এখন আমি দিচ্ছি তাও ধরছো না কেন?”
জারা বোঝাতে চেষ্টা করে,
__“আমি… আমি আসলে কাল রাতে খুব ক্লান্ত ছিলাম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আজ সকালেও…”
কথা শেষ করার আগেই আরমান তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে,
—“মিথ্যে কথা বলো না। একবার কল ধরতে তোমার এত কষ্ট হলো? আমি কি তোমার কাছে এতটাই গুরুত্বহীন এখন ? মনে রেখো আমি কিন্তু এখন তোমার স্বামী মানজারা!”
জারা থমকে যায়। গলায় দলা পাকানো কান্না সামলে বলে,
—“বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি। আমি মনে করেছিলাম মিম বা ফিহা কল করছে! কিন্তু আমি সত্যিই…”
কিন্তু আরমান অভিমান ভরা স্বরে বলে,

—“থাক, আর কিছু বলার দরকার নেই।আমি কেনো তোমাকে কল করতে যাব? আমি তো তোমার কেউ না? তুমি যদি সত্যিই আমার কথা ভাবতে তাহলে একবার হলেও কল টা চেক করে দেখতে।”
এই বলে সে হঠাৎ করেই কল কেটে দেয়।
ফোনের স্ক্রিন নিভে গেলে জারা হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। যেন পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে। চোখের কোণে জল জমে ওঠে। সে চুপচাপ বিছানায় বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পরই নিজেকে সামলে আবার কল দেয় আরমানকে।একবার… দু’বার… তিনবার…
কিন্তু প্রতিবারই কল বাজতে থাকে, আরমান ধরেনা।
জারার বুকটা ভারী হয়ে আসে। মনে হয় যেন বুকের ভেতরে হাজারটা কষ্ট একসাথে জমে আছে।
সে আবার কল দেয়। এবারও একই অবস্থা।
অবশেষে জারা হাল ছাড়ে না। বারবার কল দেয়। মাঝে মাঝে মেসেজ পাঠায়—” প্লিজ রাগ করবেন না। আমি মানছি আমি ভুল করেছি। ”
“আমি আপনার সাথে কথা বলব বলে আশায় বসেছিলাম সত্যি বলছি। ”
“আপনার সাথে কথা না বললে আমি শান্তি পাই না।”
কিন্তু প্রতিটি মেসেজই অদৃশ্য শূন্যে হারিয়ে যায়। কোনো রিপ্লাই আসে না।

আরমানের ফোন একের পর এক বাজছে। জারা বারবার কল করছে, কিন্তু সে একবারও রিসিভ করলো না। আসলে অবহেলা করার জন্য নয়।জারা সাথে কথা বলার মাঝে, ঠিক তখনই রোহান হন্তদন্ত হয়ে এসে বললো,
“দোস্ত , আঙ্কেল কল করছ তোকে। কিন্তু পাচ্ছে না বলে আমাকে কল দিয়ে বলল,খুব ইম্পর্টেন্ট একটা অনলাইন মিটিং শুরু হতে যাচ্ছে।তুই তাড়াতাড়ি মিটিং এ জয়েন কর।”
কোনো দেরি করার সুযোগ নেই। কলটা কেটে দিয়ে আরমান দ্রুত নিজের ল্যাপটপ চালু করে মিটিংয়ে জয়েন করলো। ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন অন করে সে পুরো মনোযোগ ঢেলে দিলো আলোচনায়। প্রেজেন্টেশনের স্লাইড ঘুরছে একের পর এক, বোর্ড মেম্বাররা সিরিয়াস টোনে কথা বলছে।
এই মুহূর্তে যদি ফোন বেজে ওঠে, কিংবা কেউ কল করতে থাকে, তাহলে তার মনোযোগ ছিন্ন হবে। তাই মিটিং শুরুর আগেই সে মোবাইলটা সাইলেন্ট করে বেডের একপাশে রেখে দিলো।
এদিকে জারা অস্থির হয়ে উঠছে। কল যাচ্ছে, রিং হচ্ছে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। মনে হচ্ছিল, আরমান তার উপর খুব অভিমান করেছে। অভিমান করে, ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর কষ্ট জমছে প্রতিটি ব্যর্থ কলের সাথে। মেসেজ দিলেও কোনো রিপ্লাই নেই।
কিন্তু সত্যিটা অন্য। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ আটকে আছে আরমানের। সে একেবারেই বুঝতে পারছে না কে তাকে এতক্ষণ ধরে খুঁজছে। দায়িত্ব আর পরিস্থিতির চাপে পড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দূরে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে জারার মনে দুঃখ বাড়ছে প্রতিটি মিনিটে। সে জানে না, ঠিক এই মুহূর্তে আরমান অফিসিয়াল আলোচনায় ডুবে আছে। দুইজনের ভিন্ন অবস্থান থেকে জন্ম নিচ্ছে ভুল বোঝাবুঝি।জারা আরমানকে শেষ একটা মেসেজ করে দিয়ে মোবাইল টা রেখে দেয় নিঃশব্দে।
মিটিং শেষে যখন ল্যাপটপ বন্ধ হবে, তখন হয়তো আরমান মেসেজ টা দেখে বুঝতে পারবে—যে মানুষটা তাকে নিরন্তর খুঁজছিল, তার হৃদয় ভেঙে গেছে অজান্তেই।শুধু তার না বলে কলটা কেটে দেওয়ার কারণে।

দুপুরের নরম রোদ জানালার ফাঁক গলে ভেতরে এসে পড়ছে। বাড়ির ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা। আজ খাবার টেবিলে কেউ নেই—শুধু রোহান আর জিনিয়ার খাওয়ার কথা।কারণ জাহেদ ফিহার সঙ্গে বাইরে গেছে দেখা করতে, আর রাশেদ আরমানের সঙ্গে মিটিংয়ে ব্যস্ত। ল্যাপটপের সামনে বসা আরমানকে বারবার প্রয়োজনীয় কাগজ এগিয়ে দিচ্ছে রাশেদ।তারা একেবারে মিটিং শেষ করে তারপর খাবে। তাই জিনিয়া তাদের ডাক দিয়ে বিরক্ত করতে চায় না।
জিনিয়া রান্নাঘর থেকে খাবার সাজিয়ে রাখলো বারান্দায় ছোট টেবিলটায়। তারপর রোহানকে ডাকতে গেলো। ওদের দু’জনের একসাথে দুপুরে খাওয়া যেন এক ধরনের ছোট্ট আনন্দ লাগছে জিনিয়ার কাছে। মনে মনে হাসলো জিনিয়া—”আজ শুধু আমরা দু’জন।কি মজা ।”
কিন্তু যখন সে রোহানের রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, তখনই থমকে গেলো। ভেতর থেকে ভেসে এলো কথোপকথনের টুকরো শব্দ।
রোহান ফোনে কথা বলছে—গভীর, চিন্তিত কণ্ঠে।

“না বাবা, আমি বলেছি তো… আমি চার তারিখে আমেরিকায় চলে যাচ্ছি। বিয়ের জন্য আমাকে চাপ দিয়ো না। আমি কাউকে বিয়ে করবো না…।”
জিনিয়ার বুক কেঁপে উঠলো। তার গলা শুকিয়ে গেলো মুহূর্তেই। এই কথাগুলো শোনার পরও যেন এক অজানা আশার আলো জ্বলে উঠলো তার ভেতরে। রোহান তাকে এখনো ভালোবাসে—এটা সে সবসময় অনুভব করেছে, কিন্তু এত স্পষ্ট স্বীকারোক্তি শোনেছে অনেক বার। কিন্তু আজ তা যেন ভিন্ন।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সব আশা ভেঙে গেলো।
হঠাৎ রোহান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জিনিয়ার উপস্থিতি বুঝতে পারে। হয়তো তার অচেনা নিশ্বাস কানে গেলো, অথবা দরজার আড়াল থেকে ভেসে এলো ছায়া। কিছুক্ষণের ভেতরেই রোহান ফোনের ওপাশে হঠাৎ স্বর পাল্টে বললো—

__“হ্যাঁ বাবা… আচ্ছা, আমি বিয়েতে রাজি আছি। তিন তারিখেই হবে।তুমি সব ঠিক করো।”
জিনিয়ার মাথায় যেন বাজ পড়লো।
ফোনটা কেটে দিয়ে রোহান পিছনে ফিরে দাঁড়ালো। দরজার সামনে জিনিয়াকে দেখে কৌতুক মেশানো ঠোঁটের বাঁক টেনে বললো
—“কিছু বলবে তুমি?”
জিনিয়ার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, বুক ভরে উঠছে কান্নায়। মনে হচ্ছিল, হৃদয়ের ভেতর থেকে কেউ সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছে।
কষ্ট চেপে সে কেবল বললো
—“বি.. বিয়ে করবেন?”
রোহান হেসে উত্তর দিলো
—“হ্যাঁ,তিন তারিখে বিয়ে আমার। তারপর বউ নিয়ে চলে যাবো আমেরিকায়। আর তোমাকে আমার পক্ষ থেকে স্পেশাল দাওয়াত রইলো। অবশ্যই আসবে।”
প্রতিটি শব্দ যেন ছুরির মতো বিঁধলো জিনিয়ার মনে। সে কিছুই বললো না। কেবল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে

__” স সত্যি আপনি বিয়ে করবেন? ”
__” হ্যাঁ! দাড়াও তোমাকে আমার হবু বউয়ের ছবি দেখাই। ”
জিনিয়া নিজেকে অনেক কষ্টে স্বাভাবিক রেখে ধীরে ধীরে বলে
__” তা তার কোনো প্রয়োজন নেই। শুভকামনা রইল আপনি নতুন জীবনের জ জন্য! ”
তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে।
রোহান দরজায় দাঁড়িয়ে ওর পেছন ফিরে যাওয়া দেখলো। জানতো, তার চাঁদ-সুন্দরী কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু কিছু করার ছিল না। চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে ধরে রাখার মতো সাহস তার আর নেই।এই মানুষ টা তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, এখন সেও একটু কষ্ট পাক তার কাছ থেকে।
রুমে এসে দরজা বন্ধ করলো জিনিয়া। বিছানার কিনারায় বসতেই অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। কানে বারবার বাজছিল রোহানের সেই কথাগুলো—“তিন তারিখে বিয়ে করবো… তোমার দাওয়াত রইলো।”
কেন এমন হলো? কিছু দিন আগেও যে মানুষটা বললো, জিনিয়াকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না, সে হঠাৎ কীভাবে হ্যাঁ বলে দিলো?
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো জিনিয়া। আকাশটা কেমন মলিন হয়ে আছে, যেন তার বুকের ভেতরের যন্ত্রণা বুঝতে পারছে। ভালোবাসা কি এতো দুর্বল? না কি রোহানের ভালোবাসার শক্তি বাবার কথার সামনে ভেঙে পড়লো?
জিনিয়া চুপচাপ কাঁদতে থাকলো। প্রতিটি কান্না যেন আত্মাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
অন্যদিকে রোহান নিজের বিছানায় বসে মাথা দু’হাতে চেপে ধরলো।

___“আমি কেন এমন করলাম?” নিজের ভেতরেই প্রশ্ন করলো সে।
আসলে সে জানতো, জিনিয়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার উপস্থিতি লুকানো সম্ভব নয়। সেই মুহূর্তে, এক অদ্ভুত জেদ আর অভিমানে সে বাবাকে ‘হ্যাঁ’ বলে দিলো। যেন জিনিয়াকে আঘাত করাই তার একমাত্র উত্তর।
কিন্তু কেন? সে তো ওকে ভালোবাসে প্রাণ দিয়ে। ওকে ছাড়া কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনাই করতে পারে না।
চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলো—তিন তারিখের বিয়ে, লাল শাড়িতে অন্য কোনো মেয়ে তার পাশে। কিন্তু সেই ছবিটা অস্পষ্ট হয়ে ভেঙে যাচ্ছে বারবার। শুধু জিনিয়ার মুখটাই ভেসে উঠছে সামনে।

সময় এগিয়ে চলে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে। জারা একবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চারপাশের আলো, বাতাস, সবকিছু তার কাছে অর্থহীন লাগে। একটাই চিন্তা ঘুরপাক খায়—আরমান কেন এমন করছে? সে কি এতটাই অভিমানী যে তার কষ্টটা দেখতে পাচ্ছে না?
মোবাইলের স্ক্রিনে ঘনঘন কল লিস্ট খুলে দেখে জারা। সেখানে কেবল এক নাম্বার—আরমান। তার নামের পাশে একটার পর একটা “missed call” লেখা।কল করবে না করেও হাজার বার কল দিয়েছে আরমান কে জারা।
জারা মনে মনে ভাবে, “কেন এতটা রাগ? অভিমান করলে করবে,আমি তার অভিমান ভাঙ্গাব। কিন্তু এভাবে দূরে সরে যাওয়া কি ঠিক?”
তার চোখে আবারও জল চলে আসে। সে মুছে ফেলে, কিন্তু ভেতরের কষ্ট যেন আরও বেড়ে যায়।
রাত নেমে আসে ধীরে ধীরে। আকাশে তারা জ্বলজ্বল করে, কিন্তু জারার কাছে সেই আলোও অন্ধকার মনে হয়। সে এক হাতে ফোন চেপে ধরে থাকে। মনে মনে প্রার্থনা করে, “একবার শুধু কল ধরোন প্লিজ ।”
ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে ওঠে। বুক কেঁপে ওঠে জারার। কিন্তু হতাশা ভর করে—এটা চার সংখ্যার নাম্বার, আরমান নয়।

সে আবার কল করে। ফোন বাজতে থাকে, কিন্তু এবারও কোনো সাড়া নেই।
অভিমান যেমন তীব্র এখন জারা’র , ভালোবাসাও তেমনই গভীর। জারা জানে, আরমান সত্যিই তাকে ভালোবাসে। আর ভালোবাসাই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বেশি অভিমান তৈরি করে।
হয়তো কাল সকালেই এই অভিমান ভাঙবে। হয়তো আবার তারা একসাথে হাসবে, একসাথে কথা বলবে।কিন্তু এখন… এখন এই মুহূর্তে জারার পৃথিবী যেন থমকে আছে শুধু এক নামের অপেক্ষায়—আরমান।
সে আবার ফোনের স্ক্রিনে ডায়াল করে, একই নাম্বারে কল দেয়। কান পেতে থাকে, হয়তো ওপাশ থেকে এবার একটা পরিচিত কণ্ঠ শোনা যাবে—
—“হ্যালো, মানজারা…”
কিন্তু লাইনটা নিঃশব্দ থাকে।
জারা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে বলে, “আপনি যতবার না ধরবেন, আমি ততবারই কল দেবো। কারণ আমার ভালোবাসা অভিমানের চেয়ে বড়।”
তারপরও ফোন কাঁপতে থাকে তার হাতে। বারবার একই নাম, একই নম্বরে কল দিতে থাকে সে।
আর প্রতিটি ব্যর্থ কলে তার ভালোবাসা আরও প্রবল হয়ে ওঠে, আর অভিমান আরও গভীর।চোখ দিয়ে অজান্তেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ে জারার।
কাঁপা কাঁপা হাতে আবার মেসেজ লিখে জারা।
“আপনার এই নীরবতা আমাকে বারবার ভেঙে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমার আপনার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নই। হয়তো আমি একা একাই ভালোবাসা আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি।
আজ খুব তীব্র ভাবে অভিমান জমেছে আপনার ওপর।আর কথা বলব না আমি আপনার সাথে। সত্যি বলছি কল দিলেও ধরব না! হুমম ”

রাত প্রায় আটটার কাছাকাছি। দিনভর টানা মিটিংয়ের পর অবশেষে আরমান একটু ফাঁকা হলো। ল্যাপটপের স্ক্রিন বন্ধ করার পর যেন বুক থেকে ভার নেমে গেলো। দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি, শরীর ক্লান্ত আর মাথা ভারী লাগছিলো।
সে চেয়ারে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করলো। তারপর উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে-পানিতে ছিটিয়ে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্ত চোখ দেখে মনে হলো, এই চোখগুলো অনেক যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো। প্রথম ধোঁয়াটা ছেড়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো। তখনই মনে পড়লো—আজ সারাদিন তার লক্ষ্মী বউ টার সঙ্গে কথা হয়নি। মিটিংয়ের চাপ আর ব্যস্ততায় কল করার সময়ই পায়নি। এখনই কল করবে ঠিক করলো।রুমে গিয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়েছে,মোবাইল অন করতে যাবে, এমন সময় দরজায় শব্দ হলো।
ভেতরে ঢুকলো রোহান।
রোহানকে দেখে আরমানের কেমন যেন অস্বস্তি হলো। কতদিন হলো ওদের বন্ধুত্ব, তবুও আজকাল রোহানকে কাছে পেলে আরাম বোধ হয় না। হয়তো রোহান নিজের ভেতরেই ডুবে থাকে, কিংবা সময় দেয় না।
আরমান মোবাইলটা টেবিলে রেখে বললো,

—“কিছু বলবি তুই?”
রোহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বললো,
—“বাবা বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। মেয়েও ঠিক করে রেখেছে। বলছে বিয়ে করে বউ নিয়ে বিদেশ চলে যেতে হবে।”
আরমান সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রোহানের দিকে তাকালো। চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কেবল গভীর রাগ জমে উঠছে ভেতরে। কিছু না বলে শুধু চেয়ে রইলো।
রোহান কাছে এগিয়ে এসে হঠাৎ আরমানের হাত থেকে সিগারেট টেনে নিলো। এক টান দিয়ে বললো,
—“আজ ৩০ তারিখ। আগামী তিন তারিখে বিয়ে আমার। বাবা তোদের বাড়ি যাবে দাওয়াত দিতে। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তাই তোকেও যানা……”
কথাগুলো শুনে আরমানের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠলো। কোনো কথা না বলে হঠাৎ ঘুষি বসালো রোহানের মুখে। রোহান টলতে টলতে দু’পা পিছিয়ে গেলো।
আরমান তেড়ে এসে তার কলার চেপে ধরলো। চোখ লাল হয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—“জানোয়ারের বাচ্চা, কী বললি তুই? বিয়ে করবি? আমার বোনকে ভালোবেসে এখন অন্য কাউকে বিয়ে করবি?”

রোহান শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিলো। কষ্টে ভাঙা গলায় বললো,
—“তোর বোন আমাকে ভালোবাসে না। ও কখনো আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। আমি যতবার চেষ্টা করেছি, ও দূরে সরে গেছে। যদি সত্যিই ও আমাকে চাইতো, তাহলে এভাবে নিরব থাকতো না।”
__” সর সামনে থেকে তুই! তোর কোনো প্রয়োজন নেই আমার বোনের জীবনে। গিয়ে বিয়ে করে নে! ”
রোহান নাকে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে অনেক কষ্ট বলে___” তোর বোন আমাকে ভালোবাসে না। এখন কী আ আমি বিয়েও করব না তোর বোনের জন্য?তোর বোনের আশায় বসে থাকব? ”
একটা শুনে যেনো আরমানের আরও রাগ উঠে যায়। রোহানের আবারও একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়।
___” কে আটকাচ্ছে তোকে? যা গিয়ে বিয়ে কর? যৌবনে লারা দিচ্ছে এখন, বিয়ে কুর কুরি উঠে তোর, তো বিয়ে করে নে। কে বলেছে আমার বোনের জন্য বসে থাকার জন্য? ”
রোহানের এবার নিজের ও রাগ উঠে যায়। ছুটে গিয়ে আরমানের কলার ধরে চিৎকার করে বলে __”তুই তোর বোন দিবি না আমাকে। তোর বোন আমাকে চাইবে না। আমি একটা বছর ধরে পাগলা কুওার মতো নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করছি। তোর বোনের চোখে পরে না। বল তুই? ”
আরমান রোহানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে __” দিব না, কখনো বলিনি আমি। কিন্তু এখন আর তুই মরে গেলেও পাবি না আমার বোন কে। তোর ফা*কিং ভালোবাসা আমার বোনের লাগবে না। ”

___” এখন লাগবে কী করে? গিয়ে দেখ তোর অন্য কাউকে…. ”
আরমানের কান যেন ঝাঁঝরা হয়ে গেলো। ভেতরের রাগ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। এবার রোহানকে এমন জোরে ঘুষি মারে, রোহানের নাক দিয়ে রক্ত বের হয়ে যায়।
—“চুপ কর মাঙ্গের নাতী ! তুই আমার বোনের সম্পর্কে কিছু না যেনে বলতে আসবি না। ”
রোহান নাকে হাত দিয়ে দেখে রক্ত বের হচ্ছে। ব্যাথায় চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। বহু কষ্টে মিহি কন্ঠে বলে __” কী যানার কথা বলছি তুই? ”
___”তুই জানিস ওর সাথে কী হয়েছে? কেনো ছেলেদের সঙ্গে ও কথা বলে না, সবসময় একা থাকে। এমনকি আমার সাথেও ভয়ে ঠিকমতো কিছু বলে না। কলেজে যেতে চায় না। তুই জানিস কেন সে তোর ভালোবাসা গ্রহণ করতে চায় না?”
রোহান চোখ মেলে তাকালো। কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা।
—“কেন চায় না সে? কী হয়েছে ওর সাথে? আমাকে না বললে কীভাবে যাব আমি?”
আরমান কলার ছেড়ে দিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
—“তোর জানার দরকার নেই। তুই যা, গিয়ে বিয়ে করে বিদেশ চলে যা। আমার বোনের জীবনে তোর কোনো দরকার নেই।”

রোহান যেন হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ লাল হয়ে উঠেছে কান্নায়। সে আবারও আরমানের দিকে ঝুঁকে আকুতি করে বললো,
—“ভাই, দয়া করে বল না কী হয়েছে আমার চাঁদ সুন্দরীর সাথে । আমি সত্যিই কিছু জানি না। কেন ও আমাকে দূরে ঠেলে দিলো, তার উত্তর চাই আমার।”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ঠাণ্ডা গলায় বললো,
—“আমি তোকে বলার সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তুই তো নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলি—বিয়ে করে, চলে যাবি।তো যাহ, তোকে বাদা দিব না ।কিন্তু শোন, এসবের কিছু যেন জিনিয়া জানতে না পারে। সে বাঁচবে না তাহলে।”
রোহানের বুকের ভেতরটা যেন মুচড়ে গেলো। যেন কেউ হাত ঢুকিয়ে তার প্রাণটা চেপে ধরলো। মনে পড়লো দুপুরের সেই মুহূর্তটা—যখন জিনিয়া তার বিয়ের কথা শুনে চুপচাপ মাথা নিচু করেছিলো। ওর চোখে ভাসমান কান্নার ছবিটা এখনও ছুরি হয়ে বিঁধছে তার হৃদয়ে।
রোহান হাতজোড় করে আবারও বললো,

—“ ভাই আমি ওকে বলে ফেলেছি। কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আমি আমার চাদঁ সুন্দরীকে। ভাই, আমি ভুল করেছি। ওকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু আমার জানার দরকার আছে। আমি না জানলে শান্তি পাবো না।”
আরমান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর ঠাণ্ডা অথচ কঠিন গলায় বললো,
—“যাকে কষ্ট দিয়েছিস, তার কাছ থেকেই শুনে নে। কী ঘটেছে ওর জীবনে, সেটা ও-ই বলুক। আমি না।”
কথাগুলো শুনে রোহানের পা যেন মাটিতে দাঁড়াতেই পারছিলো না। বুক ভেঙে কান্না বেরিয়ে আসছিলো, তবুও দাঁতে দাঁত চেপে বেরিয়ে এলো দৃঢ় স্বর—
—“শুনবো ভাই। শুনবো ওর কাছ থেকেই।”
কোনো দেরি না করে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলো রোহান।ছোট করিডোরে কাঁপা কাঁপা পায়ে হাঁটছে সে। বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিলো।কী হয়েছিলো তার চাঁদ সুন্দরীর জীবনে? তার জন্য এতো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে নিজের মাঝে? প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিলো, ওর চাঁদ সুন্দরীর চোখের জল মাটিতে ঝরে পড়ছে।

রোহান বের হয়ে যেতেই আরমানের রুমে ঢুকে পড়ে জাহেদ। মুখে হাসি লেগে আছে, খুশিতে ভরপুর।
– “ভাইয়া, চলো না! সবাই মিলে শাপলা বিল থেকে ঘুরে আসি। ভাবিও রাজি।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায় জাহেদ। রুমের এলোমেলো অবস্থা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরমান এক কোণে বসে আছে গম্ভীর মুখে। চোখেমুখে অস্থিরতা।
– “কী হয়েছে ভাইয়া?” জাহেদের কণ্ঠে বিস্ময়।
আরমান কোনো উত্তর দেয় না। মোবাইল হাতে তুলে নেয়। এক নজরে স্ক্রিনে তাকাতেই বুকটা কেঁপে ওঠে। সকাল থেকে সন্ধ্যা—হাজারের উপর মিসকল, শত শত মেসেজ! শেষ মেসেজটা যেন তার ভেতরটা ভেঙে দেয়—

“আপনার প্রতি আমার তীব্র অভিমান জমেছে।”
আরমান বুঝে ফেলে—সে না চাইতে ও তার লক্ষ্মী বউকে সে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে—কীভাবে অভিমান ভাঙাবে? কী করে শান্ত করবে?
– “ভাইয়া, কী হয়েছে?” জাহেদ আরমানের কাছে এসে বসে।
– “তোর ভাবি অভিমান করছে… আজকে আমার কপালে শনি, রবি সব একসাথে পড়েছে মনে হয় ।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেয় আরমান।
– “কী করেছো তুমি,? যে ভাবি এত রাগ করেছে?” জাহেদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে।
– “ওসব বাদ দে, বল তো—তোর ভাবির রাগ ভাঙাব কীভাবে?”
জাহেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে গভীরভাবে ভাবে। তারপর বলে—
– “ফিহা বলছিলো শাপলা বিলে যাবে, ভাবিও যাবে। ”
___” হুম তো! এখানে রাগ বাঙ্গানোর সাথে কী সম্পর্ক?”
__” আরে তুমি বোঝতে পারছো না ভাইয়া। তুমি এখন ভাবির বাড়িতে গিয়ে সরাসরি দেখা করে রাগ ভাঙাও। তা না হলে একটা সুন্দর গিফট দাও, নিশ্চয়ই খুশি হবে।”
আইডিয়াটা শুনে আরমানের চোখে আশার আলো ফুটে ওঠে। তৎক্ষণাৎ মোবাইল হাতে নিয়ে জারাকে কল করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। জাহেদও পিছু নেয়।
গাড়ি ছুটে চলে যায় নরসিংদীর বড় শপিংমলের দিকে। সেখানে গিয়ে আরমান নিজের হাতে বেছে নেয় একখানা সুন্দর লাল রঙের দামি ড্রেস,। সে যানে ওর বউ লাল রঙ খুব পছন্দ করে। আরমান একজোড়া নূপুর আর একটি হীরের আংটি কিনে নেয়। মনে মনে ভাবে—

“বিয়ের পর তো কিছুই দিইনি তাকে। আজ অভিমান ভাঙাতে হলে বিশেষ কিছু দিতেই হবে।”
জাহেদও সুযোগ বুঝে ফিহার জন্য উপহার কিনে নেয়। কেনাকাটা শেষ করতে করতে রাত প্রায় দশটা বেজে যায়।
গ্রামে তখন গভীর রাত। চারপাশ অন্ধকার, বাতাসে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গাড়ি থামিয়ে আরমান বলে—
– “তুই বাড়ি যা জাহেদ। আমি যাই মানজারার কাছে।”
হাতে গিফট আর বেলি ফুলের গাজরা নিয়ে একা হেঁটে যায় জারাদের বাড়ির দিকে। উঠোনের সামনে দাঁড়িয়ে কল দেয়—
কিন্তু জারা ফোন তোলে না।
একবার, দু’বার নয়—রাত দশটা থেকে বারবার কল করছে আরমান। তবু কোনো সাড়া নেই।
অন্যদিকে জারা বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। সারাদিন কল করেছে সে, অথচ আরমান কোনোটা ধরেনি। তাই ইচ্ছে করেই আজ ফোন রিসিভ করছে না। কেবল ফোনের আলো জ্বলে নিভে যায়, জারা তাকিয়ে থাকে গম্ভীর চোখে।
হতাশ হয়ে আরমান মেসেজ পাঠায়—

“আমি তোমার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি। প্লিজ বের হও, লক্ষী বউ।”
কিন্তু জারা সেই মেসেজও দেখেও কোনো উত্তর দেয় না।
রাত তখন বারোটার ঘর পেরিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ। কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাতাসে দুলে ওঠা শুকনো পাতার শব্দ ভেসে আসছে। গ্রামের ঘুম যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। এই নিস্তব্ধতার মাঝেই এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। হাতে একটা শপিং ব্যাগ, ভেতরে সাজানো সুন্দর লাল রঙের ড্রেস, এক জোড়া নূপুর, আর হীরের আংটি। সঙ্গে আছে বেলি ফুলের গাজরা। সারাদিনের রাগ, অভিমান আর অপেক্ষার বোঝা যেন তার কাঁধে চেপে বসেছে।
সে বারবার মোবাইল হাতে নিয়ে কল করে যাচ্ছে, আবার মেসেজ পাঠাচ্ছে—“এবার বের না হলে কিন্তু আমি চলে যাব ।”

কিন্তু জারা কোনো সাড়া দেয় না। ফোনের আলো জ্বলে ওঠে, আবার নিভে যায়। অথচ দরজা খোলে না। অভিমানী মেয়েটা এবার সত্যিই তার উপর রাগ করেছে।
সময় কেটে যায়, রাত গভীর হয়। ধীরে ধীরে একটা বাজে, তারপর দুইটা। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে আরমানের। তবুও সে যায় না। বারবার চোখ তুলে তাকায়—হয়তো দরজা খুলবে, হয়তো দেখা মিলবে তার প্রাণের মানুষটার সাথে।তার ছোট্টো বউটার সাথে।
ওদিকে ঘরের ভেতরে বসে আছে জারা। সেও সারাদিন অভিমানে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসেছিলো। একবার কল করেছে, দু’বার করেছে, তবু কোনো উত্তর দেয়নি আরমান। তাই ইচ্ছে করেই সে ফোন ধরেনি। কিন্তু বাইরে মানুষটা যে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, সেটা জানার পর যেনো তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে মুচর কেমন করছে।
শেষমেশ অভিমান চাপা দিয়ে জারা চুপিচুপি দরজা খুলে উঠোনে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে তাকাতেই দেখে উঠোন ফাঁকা। আরমান নেই।
সেই দৃশ্য দেখে বুকটা কেঁপে ওঠে। চোখ ভিজে যায় জলের ধারা দিয়ে। বসে পড়ে মাটিতে, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
“কেন চলে গেলেন আপনি? আমাকে আর একবারও ডাকলেন না কেন ? আমি তো বেরিয়ে এলাম…”
কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ে জারা। রাতের নিস্তব্ধতায় তার কান্নার আওয়াজ গা ছমছমে লাগতে থাকে।
হঠাৎ শুকনো পাতার শব্দ। পায়ের আওয়াজও যেন ভেসে আসে। বুকের ভেতর ভয় ঢুকে যায়। জারা মাথা তুলে তাকায়। অন্ধকারের ভেতর থেকে এক ছায়া এগিয়ে আসছে।
সে মুহূর্তে বুক ধড়ফড় করতে থাকে। চোখ মেলে তাকাতেই বুকটা শান্তিতে ভরে ওঠে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটা—তার আরমান। তার প্রিয় স্বামী।
জারাকে বের হতে না দেখে আরমান একটু আড়ালে যায় সিগারেট খাওয়ার জন্য। মাথা যন্ত্রা করছিল খুব। হঠাৎ কে কখন ঘর থেকে বের হয়ে আসে বলা যায় না। তখন সিগারেটের নিবুনিবু আলো দেখে চুর ভাবতে পারে।
জারা কোনো কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরমানের বুকে। কান্না করতে করতে বলে ওঠে

“আপনি খুব খারাপ! আমাকে শুধু কষ্ট দেন। আমি কথা বলব না আপনার সাথে… চলে যান আপনি।”
আরমান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে—তার ছোট্ট বউটা সত্যিই অনেক অভিমান করেছে। হাতের ব্যাগের ভেতর থেকে তখনো গিফটগুলো বের করেনি। মুচকি হাসি দিয়ে বলে __” আচ্ছা তাহলে আমি না হয় চলেই যাচ্ছি কেমন। ”
জারাও অভিমানী সুরে বলে __” হ্যাঁ…হ্যাঁ! চলে যান আপনি। কে বলেছে আপনাকে আসতে? ”
কিন্তু জারা আঁকড়ে ধরে আছে তাকে। ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলে আরমান—
“এইভাবে যদি জড়িয়ে ধরে রাখো, তাহলে আমি যাব কীভাবে?”
মুহূর্তেই এক ঝটকায় সরে যায় জারা। মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঠোঁট ফুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
আরমান এবার তার হাতে থাকা ব্যাগগুলো জারার দিকে এগিয়ে দেয়।
– “আমি আমার লক্ষি বউয়ের জন্য এনেছি। সে কী একটু দেখবে না খুলে?”
জারা একবার তাকায়, আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখে অশ্রু টলমল করছে।
আরমান ধীরে ধীরে ব্যাগ গুলো মাটিতে রাখে। তার পাশে রাখে নূপুর আর হীরের আংটি পেকেট টাও। শেষমেশ বেলি ফুলের গাজরা হাতে নিয়ে জারার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

– “আমি জানি, অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। কিন্তু দেখো, তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই ভাবতে পারি না। তাই তো এতো রাতে তোমার অভিমান ভাঙ্গাতে চলে আসলাম।
আমার সব রাগ,অভিমান কেবল তোমার জন্য। তুমি আমার কাছে শুধু বউ না, পুরো দুনিয়া। আমার লক্ষি বউ তুমি। কিন্তু বউ আমাকে একটুও ভালোবাসে না। যদি বাসতো তাহলে কী এতোক্ষণ অপেক্ষা করা তো। ”
কথাগুলো শুনে বুক ভেঙে কান্না করে জারা। চোখ মুছে আবার কাঁদতে থাকে।

– “আপনি আমাকে সারাদিন কষ্ট দিলেন। একবারও কল ধরলেন না। আমি তো শুধু আপনাকে চাই, আপনার সাথেই থাকতে চাই।একটু কথা বলার আশায় বসে থাকি। কখন আপনি ফোন দিবেন।…আ আর আপনি..?”
এই বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আরমান এগিয়ে এসে জারা মুখটা দু’হাতে তুলে নেয়। চোখের পানি মুছে দেয়। কপালে আলতো করে চুমু খায়।তার বেলি ফুলের মালাটা জারার হাতে দিয়ে বলে
– “চল, একটু আড়ালে যাই। নয়তো কেউ দেখে ফেলবে? বউয়ের অভিমান ভাঙ্গাতে এসে পরে কট খেয়ে যাব।”
জারা’র দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে বলে আরমান।
জারা এখনো আরমানের দিকে অশ্রু মাখা চোখে তাকিয়ে আছে। আরমান জারার গালে আলতু স্পর্শ করে বলে

___” সারাদিন তোমাকে কাঁদালাম,এখন অন্তত আমার লক্ষি বউটার হাসি দেখি।”
জারা কাঁদতে থাকে। হাতের তার আরমানের দেওয়া বেলি ফুলের মালা। আরমানের কথাও ভাবে এখন যদি এতো রাতে তাদের কেউ একসাথে দেখে ফেলে তাহলে গ্রামে বেদনাম হয়ে যাবে।তাই জারা তাদের পুনো টিনের ঘরের দরজা খুলে ভেতর নিয়ে আসে। টিনের ছোট্ট ঘরটা সাদামাটা, কিন্তু দু’জনের জন্য যেন পৃথিবীর সবকিছুই সেখানে গুটিয়ে আছে।
ভেতরে ঢুকে আরমান সব গিফটগুলো পাশে রাখে।আরমান গিয়ে চৌউকিতে বসে, তার সামনে গুটিসুটি মেরে দাড়িয়ে আছে তারা লক্ষি বউ। আরমান উঠে এসে জারাকে জড়িয়ে ধরে বসে যায় চৌকির ওপর। আলতো করে চোখ মুছে দেয়।
জারা নাক টানতে টানতে বলে __” আপনি একটা খারাপ লোক! শয়তান লোক আপনি। আপনি একটা লাল জাইঙ্গা। ”
জারা’র কথা শুনে আরমান হেসেই ফেলে।জারা’র মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে

__” এই লাল জাইঙ্গার সাথেই কিন্তু সারাজীবন থাকতে হবে তোমায় মানজারা। ”
__” থাকব না আপনার সাথে। না থাকলে কী করবেন আপনি? ”
__” হাত, পা ভেঙে সারাজীবন কোলে নিয়ে গুরব তোমায়। তারপরও আমার সাথেই থাকতে হবে। ”
__” তারপর ও থাকব না আমি! ”
__” তাহলে তোমাকে মাটির নিচে পুঁতে রেখে দিব লক্ষি বউ। ”
জারা এবার শুকনো ঢোক গিলে। মুখে মুখে তর্ক করছে এখন যদি আবার রেগে যায়। তাই ছলছল চোখে চুপ করে আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আরমান বোঝতে পারে এখন যদি একটা ধমক দেয় তাহলে তার লক্ষি বউ টা আবার কান্না করে দিবে। আরমান তাই জারাকে নিজের কাছে টেকে নেয় নিঃশব্দে।
জারা বোধহয় অভিমান কিছু টা কমেছে। কান্নার শব্দ নেই। জারা বেলি ফুলের মালাটা আরমান কে দিয়ে বলে
__” এটা চুলে লাগিয়ে দিন আমার। ”

আরমান জারা’র হাতে থেকে মালা টা নিয়ে নেয়। জারার লম্বা চুলের খোপা করা চোল গুলো ছেড়ে দিয়ে মালা টা লাগানোর চেষ্টা করে। অনেক ক্ষন ধরে মালা লাগানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। শেষমেশ অসহায় কন্ঠে বলে __” এটা কী ভাবে লাগায় লক্ষি বউ? ”
জারা বোঝল আরমান এটা লাগানোর চেষ্টা করলেও পারবে না। তাই আরমানের বুক থেকে মাথ তুলে বসে তার সামনে। তারপর নিজের বাম হাত আরমানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে
__” থাক আপনাকে আর মালাটা চুলে লাগাতে হবে না। হাতে পরিয়ে দিন। ”
আরমান ও খুশিতে গদগদ হয়ে জারা’র হাতে মালাটা পরিয়ে দেয়। চুলে লাগিয়ে দেওয়ার থেকে হাতে পরিয়ে দেওয়া টা অনেক সোজা।
মালা টা পরিয়ে দিয়ে জারার হাতে চুমু খায় আরমান। জারা যেন লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

__” খুব ভালোবাসি লক্ষি বউ। ”
__” আমি বাসি না।”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকায় জারার দিকে।
___” কী বললে তুমি? ”
__” যা শুনেছেন তাই। ”
__” সর তাহলে এক্ষুণি চলে যাচ্ছি আমি! ”
___” চ চলে যান আপনি। ”
__” সত্যি চলে যাব?”
__” হুমম। ”
আরমান জারাকে ছাড়িয়ে উঠতে নিলে জারা আবারও কান্না করে দেয় । মাথা রাখে আরমানের বুকে। আারমনের বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে শান্তিতে। ধীরে ধীরে ক্লান্তি এসে ভর করে। কিছুক্ষণ পর কান্না থেমে যায় জারার। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে আরমানের বুকেই।
আরমান প্রথমে ডেকে ওঠে—
– “ মানজারা… শুনছো?”

কোনো উত্তর নেই। বুঝতে পারে, তার লক্ষ্মী বউ ঘুমিয়ে গেছে। বুকের ভেতর শান্তির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
চুপচাপ তাকে আগলে ধরে বসে থাকে। সময় গড়িয়ে যায়, রাত প্রায় চারটা বাজে। চারপাশ তখনও নিস্তব্ধ। ঘুম নেই তার চোখে। এক দেনে শুধু তাকিয়ে আছে তার ছোট্ট বউটার দিকে।
এমন সময় আরমান খেয়াল করে—ঘুমের ভেতর জারা নিজের আঙুল মুখে দিয়ে চুষছে। দৃশ্যটা দেখে অবাক হয়। হাত বাড়িয়ে আঙুল সরাতে চায়, কিন্তু পারছে না। মুখে এক অদ্ভুত হাসি খেলে যায় আরমানের।
মনে মনে বলে ওঠে—
“হায় আল্লাহ! কী মেয়ে বিয়ে করলাম আমি? বউ আমার এখনো ঘুমের মাঝে নিজের আঙুল খায়!”
দীর্ঘশ্বাসের পর একরাশ মায়া ভরে ওঠে বুকের ভেতর। চোখে জল চলে আসে, তবে সেটা আনন্দের।
– “যে মেয়ের এখনো বাচ্চামি যায়নি, সেই মেয়ে-ই কি না আমার সাথে এতো রাগ করে, এতো অভিমান করে। তবুও, এটাই আমার লক্ষি বউ। আমার সবকিছু।আমার জান, প্রান সব।”
আরমান আলতো করে জারার কপালে আরেকটা চুমু খায়। তারপর চুপচাপ বসে থাকে, বুকের ভেতর মিশে থাকা নিঃশ্বাসে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়। বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুঁটে শুরু করে , অথচ তাদের ভেতরটা ডুবে আছে ভালোবাসার অমলিন শান্তিতে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৩

রোহান জিনিয়ার দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে। চোখে জল, মনে একরাশ ভয় তার। সে ডাকলে কী তার চাঁদ সুন্দরী এখন সারা দিবে। নাকি অনেক অভিমান করছে। অভিযোগ করবে?মনে সাহস পাচ্ছে দরজায় টোকা দেওয়ার। প্রায় এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এর মাঝে একবার জাহেদ আসে। রোহানকে জিজ্ঞেস করে কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছে। রোহান কিছু বলে না।শুধু এমনি দাড়িয়ে আছি বলে দেয় জাহেদ কে। জাহেদও এতো ঘাটায় না। কারণ সে যানে রোাহন তার বোনকে পছন্দ করে। ভালোবাসে।
রোহান একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বুকে সাহস সঞ্চয় করে অবশেষে দরজায় নক করেই ফেলে।
___” জি…জিনিয়া ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here