Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫১

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫১
Fatima Fariyal

সময়কাল ১৯৯২ ছিল ২০ শতকের শেষ দশক। তখন আটাশ বছরের সুদর্শন, তাগড়া এক যুবক ছিলেন আমজাদ মীর। উচ্চতা, শারীরিক গঠন আর ব্যক্তিত্ব, সব মিলিয়ে তার থেকে চোখ ফেরানো কঠিন ছিল। রাজনীতির মাঠে তখন তিনি ছাত্র সংগঠনের সবচেয়ে মেধাবী, তুখোড় ও আলোচিত তরুণ ছাত্রনেতা। সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন, মিছিল সব জায়গাতেই তার বিচরণ ছিল অবাধ। বক্তৃতায় ছিল যুক্তির শাণ, কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা, আর চোখে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের স্পষ্ট ছাপ। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন, সবচেয়ে প্রখর। সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন আশার প্রতীক, আর প্রতিপক্ষের কাছে ভয়ংকর এক সম্ভাবনা।

কিন্তু রাজনীতির মাঠ যেমন উজ্জ্বল, তেমনি নিষ্ঠুরও। প্রতিপক্ষের সাজানো মিথ্যা মামলায় হঠাৎ করেই আমজাদ মীরকে সপ্তাহখানেক জেলের ঘানি টানতে হয়। তখন নিরুপমা নিধি নামে একজন মধ্যবয়সী, অভিজ্ঞ ও দৃঢ়চেতা নারী আইনজীবী তার মামলাটি হাতে নেন। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সেই সাহসের মূল্য তাকে দিতে হয় ভয়ংকরভাবে। মামলা চলাকালীন তার ওপর পরিকল্পিত হামলা হয়। গুরুতর আহত হন তিনি। কিন্তু ভয় তাকে এক ইঞ্চিও তার অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে বাধ্য হয়ে তিনি মামলাটি হস্তান্তর করেন তার সদ্য পাশ করা জুনিয়র আইনজীবীর হাতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আফরোজা শেখ। বয়স তখন সাতাশ। বয়সের তুলনায় অভিজ্ঞতা কম হলেও তার ভেতরের দৃঢ়তা ছিল ধুমকেতুর মতো। চলনে ধীর, কথায় সংযত আর সিদ্ধান্তে অটল। সত্যের পথে লড়াই করাই ছিল তার একমাত্র আদর্শ।তিনি ভয় পাননি রাজনীতির রথী-মহারথীদের। ভয় পাননি ক্ষমতার দাপটকে। যুক্তি, প্রমাণ আর আইন এই তিন অস্ত্রেই তিনি লড়েছেন। অবশেষে রাজনীতির রাজা আয়ান রাজা মীরের মধ্যম পুত্র আমজাদ মীরকে আদালতের কাঠগড়ায় নির্দোষ প্রমাণ করেন।

শ্যামবর্ণের সেই তরুণী আইনজীবী আমজাদ মীরকে শুধু আইনি মুক্তিই দেননি, তার হৃদয়ের গভীরেও এক স্থায়ী আলো জ্বালিয়েছেন। আমজাদ মীর বুঝেছিলেন, এই নারী শুধু তার প্রয়োজন নয়, তার জীবনের ভারসাম্য। তিনি সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন।কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন আফরোজা শেখ।রাজনীতির এই কলুষিত, ষড়যন্ত্রময় জগতে নিজেকে জড়াতে চাননি। ক্ষমতার গ্যারাকলে নিজের পরিচয় হারানোর কোনো ইচ্ছাই ছিল না তার। কিন্তু আমজাদ মীরও ছিলেন একরোখা, নাছোড়বান্দা। কথার কৌশল, সম্মানের প্রলোভন, সামাজিক যুক্তি, সব ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত আফরোজার বাবাকে রাজি করান। তখন আর আফরোজার কিছু বলার ছিল না। আমজাদ মীর সুন্দর, সুদর্শন বীর পুরুষ, তাকে একবার প্রত্যাখ্যান করা গেলেও বারবার করা দুষ্কর!

আফরোজা শেখ একটি শর্ত রাখেন, তিনি নিজের নামে দেশের মাটিতে সত্যের পক্ষে লড়বেন। নিজের পরিচয় নিজের হাতে গড়ে তুলবেন। এই শর্তে কারো আপত্তি ছিল না। সেখান থেকেই শুরু হয় আমজাদ মীর ও আফরোজা শেখের জীবনের দীর্ঘ অধ্যায়, সংগ্রাম, সম্মান আর পারস্পরিক শ্রদ্ধায় ভরা এক দাম্পত্যের পথচলা।
বর্তমানে বসে সেই পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আফরোজা শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এতক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিল মেয়েরা। রিদিতা, আহিয়া, জেরিন সাথে হালিমা বেগমও যোগ দিয়েছেন। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী পুরো বত্রিশ বছরের পথচলা পূর্ণ করেছে তারা। মেয়েরা বায়না ধরে তাদের নব্বইয়ের প্রেম কাহিনী শোনার জন্য। আফরোজা শেখ সেটা উপেক্ষা করতে পারেননি। হঠাৎ রিদিতা প্রশ্ন করে বসে,

“আপনি বাবাকে খুব ভালোবাসেন, তাই না আম্মা?”
আফরোজা শেখ মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল স্মৃতি আর তৃপ্তি।
“তোমার শশুরমশাই মানুষটাই এমন, ভালো না বেসে উপায় আছে? প্রথম দিকে আমি রাজি না থাকলেও ধীরে ধীরে তার প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছি। তবে সেটা তাকে বুঝতে দিইনি। কারন আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তার ধৈর্য কতদূর যায়। কিন্তু সে আমাকে আর আমার আব্বাকে এমনভাবে ফাঁসাল, যে ওই সপ্তাহেই বিয়ে হয়ে গেল।”
একটু থেমে যোগ করলেন,
“তোমার বাবাকে বাইরে থেকে যতটা কঠোর মনে হয়, ভেতরে থেকে সে ততটাই কোমল। আমি আজও তাকে যত দেখি, ততই মুগ্ধ হই।”

রিদিতা গভীর মনোযোগে শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই বয়সেও এত অটুট ভালোবাসা! এত শ্রদ্ধা! এক বিন্দুও কমেনি। এই নারীকে সে যতবার দেখে ততবার মুগ্ধ হয়। মনে মনে ভাবল, একজন নারী কীভাবে এতটা পরিপূর্ণ হতে পারে? সে কি পারবে কখনো এমন হতে? হয়তো না! কারণ পৃথিবীতে একজনের জায়গা আরেকজন কখনো পুরোপুরি নিতে পারে না। সাহস সঞ্চয় করে সে আবার প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা আম্মা… আপনার মতো হতে হলে আমাকে কী কী করতে হবে? আমাকে আপনি শেখাবেন?”
আফরোজা শেখ কিছুটা অবাক হলেন। ক্ষীন হেসে স্নেহভরে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“অবশ্যই শেখাবো।”
“সত্যি?”
উৎফুল্লে রিদিতার চোখ ঝলমল করে উঠল। আফরোজা শেখ আবারও এক অমায়িক হাসি দিলেন। কন্ঠ দৃঢ় করে বললেন,

“হ্যাঁ, তবে একটা কথা কি জানো? প্রত্যেকটা মানুষের আলাদা আলাদা জ্ঞান, গুন, রুপ, রঙ থাকে। যার কারনে তুমি চাইলেও আমি হতে পারবে না আর আমি চাইলেও তুমি হতে পারবো না। হ্যাঁ.. তুমি কিছুটা অনুকরন করে চলতে পারবে কিন্তু তোমার সত্তা বদলাবে না। ভালো কিংবা খারাপ, সবই তোমার নিজস্ব পরিচয়। দিন শেষে তুমি তোমার কাজের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবে। তুমি তুমিই থাকবে। সেটা ভালো হোক কিংবা মন্ধ!”
প্রতিটি শব্দ রিদিতার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।এই কথাগুলো বাস্তবতার সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে গেছে। এমন সময় মূল দরজায় জোড়ে জোড়ে করাঘাত পরল। হলঘরে বসে থাকা প্রত্যেকের দৃষ্টি ঘুরে গেল সেদিকে। শারমিন এসে অসহায়ের ভঙ্গিতে বললেন,

“রাত তো কম হলো না আফরোজা। এবার অত্যন্ত ওদের ভিতরে আসতে দাও। তুমিও কি মেয়েদের কথায় তাল মিলিয়ে ওদের বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখেছো।”
হালিমা বেগম সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন,
“একদম না ভাবিজান! আজকে কেউ ভিতরে আসতে পারবে না। বারোটার আগে তো না-ই।”
আহিয়া আর জেরিনও তাল মিলাল সাথে,
“হুম, চাচি আম্মু ঠিকই বলেছে। বারোটার আগে আসলে তো সব সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যাবে। এতো কষ্ট করে সব আয়োজন করলাম। কিছুতেই ভিতরে আসতে দেয়া যাবে না।”
আফরোজা শেখ অসহায়ভাবে হাসলেন। মেয়েদের পাগলামিকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে তিনি নিজেই ফেঁসে গেছেন। এই বয়সে এসে আবার বিবাহবার্ষিকীর আয়োজন। জীবন সত্যিই অদ্ভুত!

রাতের আকাশ মেঘে আছন্ন। মৃদু বাতাস বইছে। আদনান ডিউটি শেষ করে বাসায় ঢুকতেই দেখল মূল দরজার সামনে সবাই জড়ো হয়ে আছে। হঠাৎ বুকে সূক্ষ্ম একটা ব্যথা চিনচিন করে উঠল। তবে কি তার আর আহিয়ার বিয়ে নিয়ে কোন ঝামেলা হয়েছে? এই সন্দেহটা বুকের ভেতর পাক খেতেই নিশ্চিত হতে দ্রুত তাদের নিকট এগিয়ে যায়। আসফাক মীর নিচে বসে আছেন, মুখে বিরক্তির ছাঁপ। আমজাদ মীর দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবার পাশে, নিচু স্বরে কিছু কথা বলছেন।

আহাদ হাওয়াই মিঠায়ের স্টান্ড কাঁধে নিয়ে কাঁচের দেয়াল দিয়ে ভিতরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। পাশেই আদিল, চোখে-মুখে কৌতূহল আর অস্থিরতা। সে উৎসুক কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? কী হয়েছে?”
কথা শেষ না হতেই আদিল তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল,
“ভাইকে, ভাবি ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। ভয়ানক রেগে আছে। কিন্তু কেন রেগে আছে জানিনা।”
“ওটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু বাকিরা?”
এইবার আমজাদ মীর গলা পরিষ্কার করে গম্ভীর স্বরে বললেন,

“তোমার ছোট আম্মা দু’বার কল করেছিল। আমি ব্যাস্ত থাকায় রিসিভ করতে পারিনি। এখন রেগে বলেছে, আজকে বাহিরে রাত কাটাতে। এটা কোন রাগের কারন হলো?”
আদনানের চোখ সরু হয়ে গেল। দৃষ্টি গিয়ে আটকাল আসফাক মীরের ওপর। সেই দৃষ্টির ভার বুঝে আসফাক মীর সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে উঠলেন,
“আমার কী দোষ বল তো! ভাইজানের সহকারী লতিফা আছে না? সে নিজে থেকে কফির অফার করছিল। আমি সোজাসাপটা না করে দিয়েছি। তবুও কীভাবে যেন তোর চাচি আম্মার কানে খবর পৌঁছে গেছে। এখন হ্যাব্বি রেগে আছে।”
আদনানের মুখ দিয়ে ফোস করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ মেশানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

“আর তুমি বাবা? তোমার বউ কী নিয়ে রেগে আছে?”
সালমান মীর অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
“আমি তো কিছুই করি নাই। তোর আম্মা ফোন দিয়ে বলে, সবাই যখন বাহিরে, আমি একা ভিতরে থাকলে নাকি খারাপ দেখায়। তাই আমাকেও নাকি আজ বাহিরে রাত কাটাতে হবে। বল, এটা কোনো ন্যায় হলো?”
এই কথায় আদনানের মাথায় যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তার ইচ্ছে করছিল নিজের চুল নিজেই টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। শত বাধা, গোপনীয়তা আর ঝুঁকি পেরিয়ে আজ কোনো রকমে বিয়েটা করেছে। আর আজই সবাই মিলে তাকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না!

সে ইচ্ছে করেই ডিউটি শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে নীলাকে হাসপাতালে দেখে থমকে যায়। নীলার অবস্থা নাজুক। আদনান কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কয়েক ঘণ্টা আগেও তো নীলার সাথে দেখা হয়েছিল। তখন তো সে বেশ স্বাভাবিকই ছিল। নীলার মতো দৃঢ় মেয়েটা কী নিয়ে এতটা ডিপ্রেশনে চলে গেল, আদনান বুঝতে পারছেনা। শারীরিক দুর্বলতায় জ্ঞান হারিয়েছে, নার্ভ দুর্বল, আরো কিছু জটিল সমস্যার কারনে জরুরি বিভাগে নিতে হয়েছে। তার পরিবারের কেউই নেই সাথে। এমন অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে আসাটাও সহজ ছিল না। সব মিলিয়ে ফিরতে দেরি হয়ে গেল। কিন্তু সে ভেবেছিল, যাক! রাতের নিরবতায় অন্তত আহিয়ার সাথে একটু একান্ত সময় কাটাতে পারবে। অথচ হলো তার উল্টো। সে আহাদের দিকে তাকিয়ে তির্যক কণ্ঠে বলল,
“দেখলে বাবা! কোনো কিছু না করেও মাঝখান থেকে আমরা বাপ-বেটা ফেঁসে গেলাম।”

আহাদের চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলে উঠল। হাত দুটো নিশফিশ করছে। আদনানের নাক বরাবর দু-এক ঘা বসাতে পারলে তার অন্তর শান্তি পেত। কিন্তু একটা কসমের শেকল তাকে আটকে রেখেছে। হঠাৎ মনে পড়তেই দরজার ধামধাম করে কয়েকটা লাথি মারল। কণ্ঠ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“রিদি! দরজা খোলো! আম্মাআআ! আরে কেউ তো খোল! এবার কিন্তু আমি সত্যিই খুব রেগে যাচ্ছি রিদি! রিদি খলো বলতেছি, না হলে কিন্তু থাপ্পড়ায়া চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো।”
ভিতরে তার আওয়াজ স্পষ্টই পৌঁছাচ্ছে কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কেউই কোনো সাড়া দিল না। এবার আদিল আর চুপ থাকতে পারল না। সে ও চেঁচিয়ে উঠল,

“আমার তো বউ-টউ নাই! আমারে বাহিরে রাখছ কেন? আমার কী দোষ? বসে বসে মশার কামড় খাওয়া লাগতেছে, এই দুঃখে তো বনবাসে যেতে ইচ্ছা করতেছে। অবশ্য বনবাসে গেলেও একটা সংসার করতে পারতাম। দূর! আমি যাইগা!”
সে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই টুক করে দারজা খুলে গেল। আহিয়া, রিদিতা, আদিবা, জেরিন আর রিতু একসাথে চেঁচিয়ে উঠল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫০

“সারপ্রাইজ!!”
মীর বাড়ির সকল পুরুষ সদস্যরা একসাথে চমকে যায়। উপর থেকে ছড়িয়ে পরে রঙিন কাগজ। মূহুর্তেই শুরু হয় এক হট্টগোল।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫২