Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৮

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৮

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৮
নুসাইবা আরা নুরি

হসপিটালে একটা কেবিনে টুলের উপর বসে আছে মেহেরাজ।চোখ ঘুমন্ত শ্রেয়সীর দিকে নিবদ্ধ।বুজতে পারছে না ওষুধের ডোজ কাটার পরেও কেন ঘুম ভাঙছে না।মেহেরাজ এসে তার দলের সবাইকে চলে যেতে বলেছে।এমনকি ফুয়াদ কেও।ফুয়াদ ফ্লাট টা দেখিয়ে দিয়ে গেছে।সব কিছুই রেডি ফ্লাটে।তারপর চাবি টা দিয়ে চলে গেছে নিজের কাজে।
ভোর চারটে বেজে গেছে সেই কখন।মেহেরাজের চোখে তবুও ঘুম নেই।ঘুম আসছে না তার।সামনে কোন বিপদ অপেক্ষা করছে মেহেরাজ জানে না।তবে মনের মাঝে কু ডেকে যাচ্ছে সব সময়।মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়।চারপাশে একবার দেখে মেহেরাজ কে চোখের সামনে দেখে শান্ত গলায় বলে,

-আমি কোথায়।
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে তাকায়। তারপর হাত বাড়িয়ে শ্রেয়সীর দুই মুখে নিজের দুহাত রেখে বলে,
-আপনি এখন হস্পিটালে মিসেস।
-মানে আমি এখানে কেনো।আমার কি হয়েছে।
শ্রেয়সীর কথার প্রতিউত্তর না করে মেহেরাজ শ্রেয়সীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-রিলাক্স কিছুই হয়নি।একটু শান্ত হন সব বলছি।
শ্রেয়সী তাকিয়ে রইলো মেহেরাজের মুখের দিকে।মেহেরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে কারোর কাছে ম্যাসেজ পাঠালো।পরক্ষনে একজন নার্স তোহা কে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।তোহার অনেক্ষন আগেই জ্ঞান এসেছে।তাই নার্সকে দিয়ে ক্যান্টিনে খেতে পাটিয়েছিলো মেহেরাজ।খেলে সুস্থ লাগবে।
নার্স টা তোহাকে শ্রেয়সী বেডের পাশে টুলে বসিয়ে দিয়ে শ্রেয়সী কে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।নার্স যেতেই মেহেরাজ এবার শান্ত গলায় বিয়ে বাড়িতে ঘটা সব কিছু বলতে শুরু করে।সব বলে তারপর বলে,

-আমি আগেই জানতাম যে শ্রেয়সী বাবা কিছু না কিছু একটা করবেই।তাই আমি এক ছোট ভাইকে বলে রাখছিলাম অন্তত বিয়ের দিন্টা শ্রেয়সী দের বাড়ির উপর নজর রাখতে।আর সেই তোদের পালানোর খবর আমাকে দেয়।তবে আমার যেতে বড্ড দেরি হয়ে যায়।ছেলেটা আমাকে শুধু গাড়ির নাম্বার টুকু বলেছিলো আর কোথা দিয়ে গেছে সেটা বলেছিলো।আমি সেই রাস্তা ফলো করে এগিয়েছি।তারপর দেখি রাস্তার ধারে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আমি কিছু না বুজে উঠতে পেরে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি ড্রাইভার মরে পড়ে আছে আর তোরা দুজন ও সেম ভাবে পড়ে আছিস আমি ভয়ে দিশেহারা হয়ে যায়।তারপর দেখি না তোরা ঠিক আছিস শুধু অজ্ঞান হয়ে গেছিস।আমি আর কিছু না ভেবেই এখানে নিয়ে আসি হসপিটালে।তবে লক্ষ করি গাড়ির ডিকি খোলা ছিলো আর ওখানে ড্রাগ এর প্যাকেট।কেও হয়তো ড্রাগ নিতেই ড্রাইভার কে মেরেছে আমার ধারনা।
এক দোমে কথা গুলো বলে মেহেরাজ থামতেই শ্রেয়সী বলে,

-হ্যাঁ হ্যাঁ কালো পোশাক পরা সবাই।আমাদের সাম্নেই গাড়ির ড্রাইভার কে মেরেছে।তারপর আর জানিনা।
মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর তোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
-বাড়ির কথা তো শুনলি তোর হাজবেন্ড এখন তোদের কে উন্মাদ এর মতো খুজে চলেছে আমি কাওকে বলিনি তোদের এখানে এনেছি।তোরা কি বাড়িতে থাকবি নাকি কদিন এভাবে লুকিয়ে থাকবি।
তোহা কিছু বলার আগেই শ্রেয়সী ঘৃনা মিশ্রিত গলায় বলল,
-আমি যাবো না আর ওই বাড়িতে।আমি আপনার সাথেই থাকবো।কখোনো যাবো না কোনোদিন ও না।
শ্রেয়সী কে উত্তেজিত হতে দেখে মেহেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে বেড এ বসে তারপর শ্রেয়সীর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে বলে,

-জানবাচ্চা আমার রিলাক্স।উত্তেজিত হওয়ার দরকার নেই।শান্ত হন।ওই জন্য তো জিজ্ঞাসা করলাম বাড়িতে ফিরবেন কিনা।নাকি এখানে থাকবেন।
শ্রেয়সী মেহেরাজকে জড়িয়ে বুকে মুখ গুজে রইলো সেভাবেই।গায়ে এখোনো বিয়ের সেই লাল লেহেঙ্গা।তোহা মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে ভার হয়ে জাওয়া মাথাটা চেপে ধরে বলল,
-এখানে কোথায় থাকবো এটা তো হস্পিটাল।আর আমিও ফিরতে চায় না।ওরা যেহেতু খুজযে খুজুক।পুলিশ এ তো আর এফ আই আর করতে পারছে না।দূরে নিয়ে চল আমাদের।যাতে খুজে না পায়।
শ্রেয়সী মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দুতে মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-খুজে পাবে না।আর আশে পাশে একটাও ফ্লাট পাইকি দেখি রিচিপশনে গিয়ে খোজ নেই।তোরা একটু বস।তারপর না হয় কাল আবার খুজবো একটু পর তো সকাল হয়ে যাবেই।
-হুম।

মেহেরাজ শ্রেয়সীকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে কপালে একটা চুমু আকে।তারপর বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।মেহেরাজ বের হলে তোহা গিয়ে বসে মেহেরাজের যায়গায় শ্রেয়সীর সামনাসামনি।মেহেরাজ বাইরে বেরিয়ে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে হাজার টাকা তিন্টে নোট সেই নার্স টাকে দিয়ে আর চাবির রিং টা আর ঠিকানা দিয়ে বলে,
– আমি কেবিনে যাওয়ার পাচ মিনিট পর কেবিনে গিয়ে আমার হাতে এটা দিয়ে বলবা।রিসিপশন বসা আসাদ স্যার দিয়েছে।ফ্লাট এ সব আছে আজ রাতেই উঠতে পারবো।এই চাবি আর ঠিকানা।
নাইট ডিউটিতে থাকা নার্স টা টাকাটা বোরকার পকেটে পুরে বলে,
-আচ্ছা স্যার।
মেহেরাজ আর কথা বাড়ায় না হাটা ধরে ক্যান্টিনের দিকে।ঠোঁটে বিশ্ব জয়ের হাসি।একজন স্পেশাল ফোর্সের গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার ও তার মিথ্যা ধরতে পারলো না আর সাধারন মানুষ কিভাবে ধরবে।মেহেরাজ সত্যিই আগেই আচ করেছিলো যে বিয়ের দিন কিছু না কিছু হবে তাই সিয়াম দের বাড়িতে বিয়ের তিন দিন আগে থেকেই প্রায় পনেরো জন স্পাই লাগিয়ে দিয়েছিলো।আর তাদের থেকে সর্বক্ষন আপডেট পেয়েছিলো।এমন কি সকালে তোহার ম্যাসেজ ও সে পেয়েছিলো তবে রিপ্লাই করেনি।

আর দুপুরে যখন তোহা শ্রেয়সী কে নিয়ে গেলো তখন ক্যাপ্টেন কল করার পরপরই তার স্পাই কল করেছিলো।মেহেরাজ খেয়াল করেছিলো আনাম মিয়ার লোকজন আছে এবং কেন এসেছে সে খবর ও মেহেরাজের জানা।মেহেরাজ হাসি মুখেই নিজের টিম এর সাথে শ্রেয়সী দের গাড়ি আটকে ছিলো।পরে ড্রাইভার কে মেরে শ্রেয়সী আর তোহাকে নিজেদের গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে এসেছে।তবে শ্রেয়সী দের বলেছে ড্রাগ এর কথা যাতে সহজে বিশ্বাস করে নেয় তার কথা কিন্তু মেহেরাজ তো চেলেছে অন্য চাল শুধুই কিডন্যাপ করেছে যাতে সম্পুর্ন দাবার চাল ঘুরে সন্দেহের নিশানা চলে যায় আনাম মিয়ার উপরে।।
সব শেষ এ ফুয়াদ কে শ্রেয়সী আর তোহা স্লিপিং ইনজেকশন পুশ করতে বলে যাতে তাড়াতাড়ি ঘুম না ভাঙে তারপর নির্দিষ্ট ঠিকানায় চলে যেতে বলে সে আবার বিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে একটু ঝামেলা করে বাড়ি চলে গেছিলো।আর এই রাতে কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।কেও ঘুনাক্ষরেও তাকে সন্দেহ করতে পারলো না।
মেহেরাজ দেরি না করে ক্যান্টিন থেকে শ্রেয়সীর জন্য শুকনো খাবার কিনে আনে।দুই প্যাকেট কেক আর কোল্ড্রিংস।তারপর বেশ কিছুক্ষন হসপিটালের লম্বা বারান্দায় হাটাহাটি করে কেবিনে প্রবেশ করে।শ্রেয়সী ভালোভাবে বসেছে।মেহেরাজ কে আস্তে দেখে তোহা বলে,

-কিরে কি হলো পেলি কিছু।
-হুম টাকা পরিশোধ করে এলাম বিল এর।আর খোজ নিয়ে জানাচ্ছে বল্লো।আমি দাড়াইনি। শ্রেয়সী কিছু খাই নি তাই ওর জন্য কেক আর পানি নিয়ে আসলাম।ডিসচার্জ হয়ে গেছে এবার ফ্লাট টা খুজে পেলেই হয়।
-দেখা যাক আল্লাহ আল্লাহ করে।
তোহার কথা শেষ হতে না হতেই কেবিনের দরজা ঠেলে প্রবেশ করে একজন নার্স।তারপর মেহেরাকের দিকে এগিয়ে এসে মেহেরাজের শেখানো কথা গুলো বলে চাবি।আর কাগজে লেখা ঠিকানা টা দিয়ে বেরিয়ে।নার্স টা বের হতেই তোহা বলল,
-দেখলি আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য। পেয়ে গেছি।
-হুম চল শ্রেয়সী খেয়ে নিক।
শ্রেয়সী খাবে না মেহেরাজ ও আর জোর করেনি।হসপিটালের এমন পরিবেশ এ খাওয়াতে।তোহাকে আর শ্রেয়সী কে নিয়ে নিজের গাড়ির কাছে এলো।তারপর দরজা খুলে দিতেই শ্রেয়সী আর তোহা উটগে গেলো।মেহেরাজ ও আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।ছুটে চললো।কাগজে লেখা ঠিকানার উদ্দেশে।

শেখ বাড়ির অবস্থা বেহাল।সারারাত কেও ঘুমাই নি।সিয়াম উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।তোহা আর শ্রেয়সী কে খুজে খুজে।এদিকে আনাম মিয়া যে মেয়ে দুটোকে নিতে চেয়েছিলো তাদের নেয়নি কিছুদিন পর নিবে।তবে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে এটাই প্রথম যে আনাম মিয়া মাল না নিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে সাথে তাদের ভাগের ৪০% ও দিয়ে দিয়েছে।
সিয়াম যখন লোকেশন ট্রাক করে ঘটনা স্থলে পৌছায় তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।তার ড্রাইভার মরে পড়ে আছে।আর তার বউ তার বোন গাড়িতে নেই।সিয়ামেরর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো তখন প্রায়।তারপর থেকে হন্নে হয়ে খুজছে তবে কোনো ক্লু নেই।তবে আনাম মিয়ারমেয়ে নিতে মানা করায় আর তখন রাস্তায় আনাম মিয়ার লোক দেখার পর এখন সিয়ামের মাথায় অংক দুই এ দুই এ চার মিলে যাচ্ছে।কোনো ভাবে তার তোহা আর তার আদরের বোন কে আনাম মিয়ার লোক নেই নি তো।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৭

নিজের ভাবনায় নিজেই ভয় পায় সিয়াম।সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে চিৎকার করে বলে,
-না না এ হতে পারে না।নিজের লোক হয়ে নিজেদের সাথে এমন কাজ করবে না।আর যদি করে তাহলে আমার সব শেষ। সব শেষ আমার।ছাড়বো না আমি ওদের।
সিয়ামের চিৎকারে আলতাফ শেখ এর ঘুমে বুজে আসা চোখ খুলে যায়।সাথে সাথে বলে,
-কি কি হলো।কাকে ছাড়বি না।এইই সিয়াম কি হলো।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৯