Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৫+১৬

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৫+১৬

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৫+১৬
সাইয়্যারা খান

শাস্তি। শব্দটা দুই অক্ষরের হলেও পূর্ণ সেটাকে বেশ ভারী করে দিয়েছে। শুধু মুখেই বলে নি মৃত্তিকা’কে শাস্তি দিবে৷ সে শাস্তিটা বেশ ভালোই দিয়েছে। নরম মেয়েটার মন নিয়ে ফাঁকা হৃদয়ে ভয়ংকর শাস্তি দিয়েছে পূর্ণ। গত দুইটা সপ্তাহ ধরে মৃত্তিকা’র সাথে কথা বলে না। কথা তো দূর দেখেও যেন দেখে না। মৃত্তিকা যে পূর্ণ’তে সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছে সেটা বেশ ভালোই উপলব্ধি করতে পেরেছিলো পূর্ণ তাই তো সর্বোত্তম পন্থাটাই অবলম্বন করলো। মৃত্তিকা থেকে নিজেকে আড়ালে রাখলো। মেয়েটা করুক ছটফট। বুঝুক শাস্তি কি জিনিস। কষ্ট কি পূর্ণ’র হয় না তার পূর্ণময়ী থেকে দূরে থাকতে? রাতভর কি পূর্ণ ডুবে থাকে সেই শ্যামা মুখটায়? হাজার ব্যাস্ততার মাঝেও তো পূর্ণ তাকে স্মরণ করে। ধৈর্যহীন তো পুরুষ হয়। যেখানে পূর্ণ ধৈর্য ধরে আছে সেখানে কেন মৃত্তিকা এতটা ধৈর্যহীন? নারী মানেই কি ধৈর্য মূর্তি নয়? এতটা আবেগ দিয়ে এই কঠর দুনিয়াতে কিভাবে থাকবে তার মৃত্ত? দুনিয়াটা যে বড্ড নিষ্ঠুর। সেখানে একটা পূর্ণময়ী টিকবে কি করে?

এক ধ্যানে সামনের গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে মৃত্তিকা। এক ঘন্টা পর আরেকটা ক্লাস। নাহলে বাসায় চলে যেত। এখন আর ক্লাস শেষে কারো অপেক্ষা করতে হয় না। গত দশটা দিন ঘন্টার পর ঘন্টা এই রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করেছে সে। ছটফট করা হৃদয়টাকে সামাল দিতে ব্যার্থ সে। আজ পর্যন্ত তার দাবি কখনো সুবিশাল ছিলো না। সামর্থ্য থাকা সত্বেও কখনো তেমন কোন দাবি করে নি মৃত্তিকা। এই যে উজ্জ্বল, হিমু সহ ক্লাসের বাকিদের সাথে মিশে থাকে। সাধারণ পোশাক, সাধারণ বেশ ভুসায় নিজেকে রাখে। সাধারণ ভাবে প্রায় রিক্সায় চড়ে বাড়ি ফিরে। কই কখনো তো নিজেকে আলাদা করে রাখে নি। দম্ভ নিয়ে থাকে নি। গরীব ধনী ভিন্ন চোখে দেখে নি। বাবা কখনো ধনী গরিব মানুষের ভেদাভেদ তাকে বুঝতেই দেয় নি। শুদ্ধতম পুরুষ তার বাবা। কিন্তু জীবনের বড় একটা দাবি আছে এখন ওর। একটা পূর্ণ চাই। বললে ভুল হবে এভাবে। এই গম্ভীর, রাগী, হুমকি ধামকি দেয়া পূর্ণ নামক সিনিয়র ভাইকেই তার চাই।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সরল মানুষ গুলোর চাওয়া গুলো হয়তো এমনই। কখনো কোন আদর থেকে বঞ্চিত না হওয়া মেয়েটা এখন বাবা বাদেও অন্য পুরুষ চাইছে। তার সময় চাইছে। একটু আদর মেশানো কথা চাইছে। যা পাচ্ছে না সে। সামনের নিষ্ঠুরতম পুরুষটা দিচ্ছে না তাকে সেই ভালেবাসা।
এতটা অস্থির আগে কারো জন্য হয় নি মৃত্তিকা। গত চৌদ্দটা দিন শুধু বাবা বুকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়েছে বলে রাতে ঘুম হয়েছে নাহলে তো তাও হতো না। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উঠে ফ্রকটা ঝেড়ে নিলো। হাটা ধরলো ক্লাসের দিকে। ঘন্টা শেষ। অবসরে সেই পূর্ণ’তে ডুবে যাচ্ছে সে। তাহলে কি বাবা ঠিকই বললো? মৃত্তিকা কি পূর্ণ’তে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে?

দুই দলের একসাথে সমাবেশ আজ। সামনে নির্বাচন। সব দলই উঠে পড়ে লেগেছে। এখানে ছাত্রদল আসবে না। নয়াপল্টনে একদল আর পুরানা পল্টনে আরেকদল। মাঝখানে পুলিশের লোকজন। এখন কোনমতে দুই দল একসাথে হলেই লেগে যাবে সংঘর্ষ। পুলিশ সদা তৎপর ও সচেতন তাই। কখন কি লেগে যায় বলা মিশকিল। তাদের মুশকিল বাড়াতে সেখানে হাজির হলো ছাত্র দল। পুলিশের মাথায় হাত। যেখানে দুই দলই সামাল দেয়া যায় না সেখানে তিন দল? পূর্ণ’র লোকজন যখন স্লোগান দিচ্ছে। একদম সামনের দিকে পূর্ণ সহ তার ছেলেপুলে। দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন। পূর্ণ’কে সালাম দিয়ে বলে উঠলেন,
— ভাই আজ আসাটা ঠিক হলো? ছাত্রসমাবেশ তো দুই দিন পর হওয়ার কথা। ঝামেলা বেঁধে যাবে।
বাঁকা হাসলো পূর্ণ। বেশ ঠান্ডা ও নরম স্বরে বললো,

— আমি তো ছাত্র সমাবেশ নিয়ে বের হই নি অফিসার। ব্যানার দেখেন নি নাকি?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লিখা “জনসমাবেশ”। তিনি পরলেন মহা বিপদের মুখে। এখন কিভাবে তাড়াবেন পূর্ণ’কে? একেতো এরা ছাত্র দল। এদের কিছু বলা যায় না তার মধ্যে আজ জনগণের হয়ে সমাবেশ বের করেছে। তাই পুলিশের বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা নেই। পূর্ণ শুধু গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— পথ ছাড়ুন। ছাত্র সমাবেশ না এটা জনসমাবেশ।
পুলিশ অফিসার ইশারা করতেই পথ ছাড়া হলো। পূর্ণ’র দলবল স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে গেলো। যেদিকে বড় বড় দুই দল এখনও সমাবেশ শুধু করতে পারে নি সেখানে কি না একজন ছাত্রনেতা সমাবেশ চালিয়ে তাদের সামনে দিয়ে গেলো?

পরিস্থিতি আর ঠান্ডা রইলো না। দুটো বড় বড় দলের সামনে দুই দিনের ছেলে যায়? জনগনের নামে বেশ ভালোই বড় সড় মিছিল জমিয়েছে পূর্ণ। তার বরাবর সামনে পুলিশরা। প্রটেকশন দিচ্ছে তাদের। কখন কোন গন্ডগোল হয় বলা মুশকিল। বেশ শান্তিতেই চললো সমাবেশ। এককথায় শান্তি সমাবেশ। কিন্তু সেটা আর অব্যাহত রইলো না। হঠাৎ কিছু ছেলেপুলে দল বল নিয়ে হাজির হলো। এরা কোন দলের বুঝা গেলো না। এসেই কয়েকটা বাসে আগুন জ্বালিয়ে দিলো৷ মা*রা হলো জিরো পয়েন্টে দুই তিনটা বো*ম। শান্তি সমাবেশ মুহূর্তেই অশান্তিতে পরিণত হলো। হাতাহাতি এক পর্যায়ে চূড়ান্তে পৌঁছালো। পুলিশ পুড়ো তখন বেকায়দায়। রাবার বুলেট ছুড়া হলো। লাভ হচ্ছে না। এখানে দুই দল তো আগেরই ছিলো সেই সাথে জনসমাবেশের লোকজন। এর মধ্যে কে বা কার দলের লোক হাতাহাতি শুরু করেছে বুঝা মুশকিল। পুলিশের ফোর্স বাড়ানো হলো। কাঁদানেগ্যাস ছাড়া হলো৷ এলোপাথাড়ি তখন মারামারি চলছে৷ নেতাদের পুলিশ’রা হাপড়ে ধরে সেফ করে নিচ্ছেন। কিন্তু ব্যাতিক্রম হলো পূর্ণ’র বেলায়। পুলিশদের সাথে নিরাপদ আশ্রয়ে গেলো না ও। নিজের দল ছেড়ে সে সরবে না। কোথা থেকে হঠাৎ এক ইটের কোণা লাগতেই পূর্ণ’র কপাল বেয়ে র*ক্ত ঝরা শুরু হলো। দলের ছেলেদের ফুঁসানোর জন্য এটাই যথেষ্ট ছিলো৷ পুলিশের একজন তারাতাড়ি রুমাল চেপে ধরলো। পূর্ণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করলো ওর দলের কেউ জানি হাতাহাতি না করে কিন্তু কেউ যদি আঘাত করে তাকে পাল্টা আঘাতের অনুমতি দিলো।

সাংবাদিকরা সবটা ধারণ করে যাচ্ছে। হেডলাইনে এই নিয়ে শিরোনাম দখল করলো পূর্ণ পরপর দুই বার। আগে দেখানো হলেও ফুটে উঠলো এবার। এমন জোয়ান, সাহসী নেতাই তো চাই। যে পালাবে না লেজ গুটিয়ে। বীরের মতো বুক পেতে দিবে জনগণের দুর্ভোগে। সাদা পাঞ্জাবি তখন পূর্ণ’র এক অংশ ভিজে লাল হয়ে আছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে হতে বিকেল গড়ালো। বেধরক গ্রেফতার করা হলো দলের লোকজনকে। এদের মধ্যে পূর্ণ বা ওর দলের কেউ নেই৷ পুলিশ সহ সাংবাদিক এমনকি আম জনতা সাক্ষী পূর্ণ আঘাতের স্বীকার। তার দলের লোক কিছু আহত। তাদের উপর হামলা হয়েছে৷ এমনটাই পুলিশের জিটি খাতায় তুলা। সাংবাদিকরা যখন পূর্ণ’কে ঘিরে আছে পূর্ণ তখন শুধু বলেছে,
” আমরা জনগণের জন্য। জনসমাবেশ আমাদের। দলের হয়ে কিছু করিনি৷ যা হয়েছে আপনাদের চোখের সামনে হয়েছে। জানা কথা, দেখা জিনিস আমার মুখে শুনে কি মিথ্যা বা সত্যি হবে?”
ব্যাস ছড়িয়ে গেলো আবারও। এতটা খারাপ অবস্থায় এতটা দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী জবাব ই দরকার। এমন একজন বীরপুরুষ ই দরকার। জনগন মেতে উঠলো পুরোভাবে৷
মন্ত্রীদের নজরে পূর্ণ আগেই ছিলো। আজ এলো সাধারণ জনগণের নজরে।
কপালে চেপে ধরা রুমালটা ফেলে দিলো৷ র*ক্তে ভিজে চ্যাপচ্যাপা হয়ে আছে সেটা।
খবর সবই দেখেছে মৃত্তিকা। এতকিছুর মাঝে ওর চোখে ভাসছে পূর্ণ’র র*ক্তাক্ত মুখটা। ছটফটিয়ে উঠেছে তার ছোট্ট হৃদয়টা। লোকটাকে দেখে না আজ চৌদ্দ দিন৷ এখন ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে টিভির পর্দায়। কেমন শক্ত পুরুষ। মাথা দিয়ে র*ক্ত ঝরছে অথচ সে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে। পাশেই তন্ময় হাওলাদার বসা। টিভি থেকে নজর সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। আলতো হাতে গুছিয়ে বুকে চেপে নিলেন মেয়ের মাথাটাকে।

ভারি বর্ষণে মুখটিত চারপাশ। এদিকে শারদীয় উৎসবে মেতে উঠেছে সনাতনী ধর্মাবলম্বীরা। সরকারি ছুটি আগামী কাল থেকেই। যারা গ্রামের থেকে এসেছে সকলেই প্রস্তুতি গ্রহণ করছে নীরে ফিরার। ভার্সিটি বন্ধ হবে আগামী কাল। মৃত্তিকা আসত না কিন্তু শেষ দিনে এসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে বলেই আসতে হচ্ছে। এখন আর কারো জন্য অপেক্ষা করা লাগে না ওর৷ মনকে যথেষ্ট ঠান্ডা করার চেষ্টায় আছে মৃত্তিকা। কিন্তু দমানোটা সহজ হচ্ছে না। একটা মেয়ে হয়ে আর কত উপেক্ষা সহ্য করা যায়? পূর্ণ’র চড়া চড়া কথা, শাসন, ধমক কোনকিছুই মৃত্তিকা’কে তার থেকে দূর করতে সক্ষম হয় নি বরং তার লোকটার তেঁজী আচরণে কেন জানি মৃত্তিকা নিজের সর্বোচ্চ দিতে চেয়েছিলো। না বলেও ভালোবাসায় ডুবিয়েছিলো পূর্ণ তাকে। যখন মৃত্তিকা সম্পূর্ণ ডুবলো ঠিক তখনই পূর্ণ হাতটা ছেড়ে দিলো। সমুদ্র পর্যন্ত নিয়ে ভালেবাসা দেখিয়ে মাঝ সমুদ্রে সাঁতার না জানা মৃত্তিকা’কে ছেড়ে দিলো। কুলহারা মৃত্তিকা সেই থেকে ভেসেই গেলো। প্রথম প্রেম। প্রথম অনুভূতি। প্রথম তার ভালোবাসা। মর্যাদা রইলো কই এই প্রথম হওয়ার? পূর্ণ দিলো কি তার ভালোবাসা’কে সম্মান?

মৃত্তিকা’র এখন মনে হয় পূর্ণ তাকে নিয়ে টাইম পাস করেছে। এটাই হবে নাহলে কেন অতি সুন্দর, লম্বা চওড়া কাধ বিশিষ্ট, যোগ্য পুরুষটা তার মতো শ্যামকণ্যার প্রেমে পড়বে? মৃত্তিকা কি তাহলে এতটাই বোঁকা? প্রেম আর ছলনার পার্থক্যটাই আজ পর্যন্ত করতে পারলো না?
পাশ থেকে উজ্জ্বলের ডাকে ধ্বংস হলো মৃত্তিকা’র সকল অযাচিত চিন্তা। চায়ের কাপ তিনটা হিমু রাখতেই মৃত্তিকা একটা তুলে নিলো। উজ্জ্বল আর হিমু ও চুমুক বসালো। উজ্জ্বল সরস গলায় বলে উঠলো,
— টাকা ফেরত দিয়েছিস?
— হ্যাঁ।

মুখটা একদম ছোট করে উত্তর দিলো হিমু৷ গত রাতেই সেই তিন হাজার টাকা রুপা’কে ফেরত দিয়ে এসেছে ও৷ হিমু অতটাও বোকা না কিছুটা আন্দাজ করেছিলো সেগুলো কোন সৎ পথের টাকা না। মনের মধ্যে হাজার দেনামোনা পার করে যখন উজ্জ্বল’কে জানালো তখনই উজ্জ্বল বেশ চটে যায়। হিমুর সাথে থাকে আবার এক থার্ড ইয়ারের বড় ভাই। উজ্জ্বল রাতেই হোস্টেলে এসে কৌশলে এক প্যাকেট সিগারেট খায়িয়ে কথায় কথায় ঐ বড় ভাই থেকে জানতে পারে, ঐগুলো সব বেআইনি টাকা। ভার্সিটির কিছু পোলাপান বিভিন্ন বাজার থেকে টাকা তুলে জায়গা ভারা হিসেবে অথচ রাস্তা সরকারের। ফুটপাতে থাকা দোকানগুলো থেকে চাঁদা আদায় করে তারা। পুলিশ আইনি অভিজান চালিয়ে সেই সব দোকান ভাঙতে বা ভ্যান তুলতে আসলে তখন সেই সিন্ডিকেট থেকে দুইএক জন তাদের পকেটে মোড়ানো টাকা ভরে দিলেই মামলা শেষ। সরকারের রাস্তা ভারা দিয়ে টাকা আদায় করে তারা। এরা কোন দলের তা জানা যায় নি। সেই থেকে হিমু ভয় পেয়ে আছে। ছেলেটা যথেষ্ট সাদাসিধা আর তার দ্বারাই কি না এমন একটা কাজ হলো?
মৃত্তিকা’র সামনেই ওরা কথা বলাতে মৃত্তিকা কৌতুহলি হলো। না জানা বিষয়টা জানতে ইচ্ছে হলো। ওদের জিজ্ঞেস করতেই ওরা একে অপরের মুখ চাওড়া চাওড়ি করলো। চোখে চোখে কিছু যেন কথাও বললো। মৃত্তিকা সেটা লক্ষ্য করে রাগ করে বললো,

— চলে যাব আমি?
হিমু তারাহুরো করে বললো,
— এই বৃষ্টিতে কই যাস? চুপ করে বস।
মৃত্তিকা বসতেই হিমু আমতা আমতা করে সব খুলে বললো। বিষ্ময়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় মৃত্তিকা। ছেলেরা এসবে জড়িত থাকে সেটা তো সবাই জানে তাই বলে মেয়েরাও? মৃত্তিকা’র এহেন কথায় ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে উজ্জ্বল বললো,
— সতী সাবিত্রী আমাদের মৃত্তিকা ও সব বুঝে গেলো অথচ হাঁদারাম তুই। এই রুপা তোকে ঘোল খায়িয়ে ছাড়বে। এখনও বলছি ফিরে আয়!
হিমু হাসলো। একটু আড়ষ্টভাবেই বললো,
— ও এমন না রে। আমার টাকা নেই দেখেই হয়তো…
মাঝপথে মৃত্তিকা ওকে থামিয়ে দিয়ে দৃঢ়ভাবে বললো,
— “খারাপ যেমন কখনো ভালো হয় না ঠিক তেমনই খারাপ পথে গিয়েও কখনো ভালো হওয়া যায় না।” কথাটা আব্বু বলে। আর যুক্তি সহ সত্যি এটা।
হিমু কিছু বললো না। মনটাকে কেন জানি মানাতে পারে না। রুপা ওকে হাজার তিরস্কার করুক পরপর যখন আবার নরম কন্ঠে কথা বলে তখন পুলকিত হয় হিমুর এই আনাড়ী মনটা।
উজ্জ্বল বেশ ভালোই বুঝতে পারছে এই রুপা মেয়েটা ভয়ংকর। চোখের চাহনি দেখেই সেটা উপলব্ধি করা যায়। চায়ে আড্ডা আজ সারা ক্যান্টিন জুড়ে। একেতো তো বন্ধ শুরু হবে তারমধ্যে আবার বৃষ্টি।

বৃষ্টি থামার বদলে বেড়েই যাচ্ছে। পূর্ণ ডিপার্টমেন্টের সামনে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। আজকে দেড়ী হয়ে গিয়েছে তার। কোথায় ভেবেছিলো আজ মৃত্ত’টার সাথে দেখা করবে। কথা বলবে৷ মনটাকে শান্ত করবে কিন্তু হলো কই? এই তুখোড় বৃষ্টিতে কিভাবে বের হবে? আজ আবার গিয়েছিলো পার্টি অফিসে। বার্তমানে কিছু এমপি আর বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন সেখানে। পূর্ণ’কে ঘটা করেই সেখানে ডাকা হয়েছিলো। সামনে নির্বাচন। বেশ জোড়সোড় ভাবেই কাজ চলছে। এর মধ্যে নজর কেড়েছে এই যুবক। জনগন মেতে আছে তাতে। পূর্ণ নিজের দলের কিছু ছেলেদের সাথে নিয়েই হাজির হয়। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী তার সাথে নিজে কোলাকুলি করেন।

দুঃখ প্রকাশ করেন ঐদিন পূর্ণ’র মাথা ফেটে যাওয়াতে। ছেলেটা জনগণের হয়ে কাজ করেও কতটা আহত হয়েছিলো তবুও কি না হাতাহাতি তে যায় নি।
সরাসরি প্রস্তাব করা হয় পূর্ণ’কে, যাতে সে তাদের দলে যোগ দেয়। সামনে মেয়র পদে দাঁড় করাতে চান তাদের দলের হয়ে। প্রস্তাব পেয়ে বাঁকা হাসে পূর্ণ। শুধু মাত্র যে ঐ দুই ঘটনার জন্য পূর্ণ’র আজ এতটা নাম ডাক তা নয়। বিভিন্ন এনজিওর হয়ে কাজ করে পূর্ণ। সমাজ সেবা করে আসছে আজ চার বছর হয়ে আসছে। চার বছর বললে ভুল হবে। কলেজ পড়ুয়া পূর্ণ যখন টুকটাক রাজনীতি জনিত বিষয় ঘাটত তখন থেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে গিয়েছে। এসব বিষয়ে দক্ষতা তার গভীর।
পূর্ণ খুবই ভদ্র ভাবে জানায় আপাতত সে এই দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। তার এহেন কথায় অবাকের চূড়ান্ত পর্যায় সবাই। এতবড় অফার কে ঠুকনায়?
এমপি মহাদয় তো বলেই উঠলেন,

— বড় অফার পেয়েছো নাকি এর থেকেও?
পূর্ণ ভদ্র ভাবে জানায়,
— ছাত্রদল আমি আজ থেকে করছি না। এখন যোগ দিয়েছি জনসেবায়।
একটু থেমে আবারও বললো,
— গাছ যতই বড় হোক না কেন তার শেকড় কখনো ভুলে না। একবার শেকড় উপড়ে গেলেই গাছটা মুখ থুবড়ে পড়বে।
— দল ছাড়বে না বলতে চাইছো?
— বললাম তো শেকড় ছাড়ব না।
মন্ত্রী মহাদয় বেশ খুশি হন পূর্ণ’র আচরণে। পিঠ চাপড়ে সাবাসী দিয়ে বললেন,
— ইউ আর আ ম্যান বাই বয়। স্ট্রে ইন দিস প্যাসন।
পূর্ণ হেসে ধন্যবাদ জানায়। তার আগ্রহ জানতে চাইলে আসার আগে জানিয়ে আসে,
— সোজা সংসদ সদস্য হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই আমি।
তার কথার তেঁজ এবং ঝাঁঝ দেখে এমপি মহাদয় তো বলেই ফেললেন,

— আমার পদ চাইছো?
— না। যোগ্য পদে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হতে চাই।
কারো কারো তো বেশ লাগে এতটা আত্নবিশ্বাসী ছেলেটা আবার কারো চোখে কাটা হতেও যেন দেড়ী হলো না।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই দেখা হয় ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের সাথে। পূর্ণ সালাম জানাতেই স্যার তার সাথে দেখা করতে বলেন। পূর্ণ মাথা নেড়ে সায় জানায়। স্যার যেতেই পূর্ণ অন্য চিন্তায় পড়ে যায়। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও বাকি। এরজন্যই তো মৃত্তিকা থেকে আজ একমাস চৌদ্দ দিন দূরে আছে ও। পরিক্ষা আর শাস্তুি তো মন ভুলানো বাহানা মাত্র।

বৃষ্টি থেমে থেমে ঝরছে। এসাইনমেন্ট জমা দেয়া শেষ। মৃত্তিকা একবার চাইলো পূর্ণ’র ডিপার্টমেন্টের সামনে যেতে কিন্তু পরক্ষণেই মনকে শাসালো। পূর্ণ মৃত্তিকার জন্য না। কখনোই না। টাইম পাস শেষ এখন মৃত্তিকা ও শেষ। বট গাছটার গোড়ায় এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো। কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানটায়। মৃত্তিকা তেমন কিছু না ভেবে হেঁটে গেলো সেখানটায়। তার ভার্সিটি লাইফের সবচেয়ে চমৎকার সময়গুলো এখানে কাটিয়েছে সে।
কাঁদায় হাটা কষ্টসাধ্য তবুও মৃত্তিকা হাটছে। মাটির রাস্তাটা পার হয়ে যেই না গাছের দিকে যাবে ওমনি খেয়াল না করাতে অসাবধানতার কারণে ধাক্কা খেলো বলিষ্ঠ এক পুরুষ দেহের সাথে। তীব্র পুরুষ গন্ধ তার নাসারন্ধ্র ছেদ করে যাচ্ছে যেন। লোকটা তার শক্ত হাত দিয়ে মৃত্তিকা’কে পরে যাওয়া থেকে বাঁচালো৷ মৃত্তিকা নিজেও পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য লোকটার বুকে খাঁমচে ধরে আছে। সাফারাত মৃত্তিকা’র এলোমেলো চুলে হাত দিলো৷ কেমন তার দৃষ্টি সেটা বুঝা গেলো না। ডান হাতটা দিয়ে মুখ থেকে মৃত্তিকা’র চুল গুলো সরিয়ে দিলো৷ ঐদিন দেখা হয় নি নারীটিকে। গম্ভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলো নারীটির মায়াময় মুখ। শ্যামকণ্যা সে অথচ আচড় কাটা তার গোলাপি ঠোঁট। সাফারাত বুদ হলো। কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিলো সেই গাল৷ চোখ তার জলজল করে উঠছে। সাফারাত যেন ভেঙে যাচ্ছে। তার বলিষ্ঠ দেহটা ভেঙে আসছে। মৃত্তিকা অপ্রস্তুত হয়ে সরে যাওয়ার আগেই কেউ সজোরে আঘাত করে সাফারাতের চেহারায়। পূর্ণ অগ্নিশর্মা হয়ে ছাড়িয়ে নিলো মৃত্তিকা’কে। সাফারাত এত জোরে আঘাত খেয়েও ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো,

— দুই দিন ই বুকে আশ্রয় দিলাম। ঐ দিন বমি করে দিলে আর আজ দিলে আঁচড়।
মৃত্তিকা কিছু বলার সুযোগ পেলো না। ঘটনা এতটাই দ্রুত ঘটেছে যে বাক হারা ও। সাফারাত গা ঝাড়া দিয়ে বললো,
— এখন আবার গালি দেয়া শুরু করিস না। জানি আমি কু*ত্তা*র বাচ্চা।
বলেই চলে গেল। সাফারাত যেতেই পূর্ণ মৃত্তিকার হাত ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে দিলো। থেমে যাওয়া বৃষ্টিটা আবারও শুরু হলো। এক ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিলো দুটি মানব মানবী’কে। পূর্ণ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
— চৌচল্লিশ দিন! মাত্র চৌচল্লিস দিন মৃত্ত। এতটুকু সময়েই অন্য কাউকে খুৃঁজে নিলেন৷ বাহ্ বেশ তো। এখন তো মনে হচ্ছে বিয়ের পর আমি ম’রে গেলো ঈদ্দত ও পালন করবেন না আপনি। এতটা অধৈর্য? এতটা অধৈর্য একজন নারী কিভাবে হয় মৃত্ত? আমি দেখা না করায় অন্য পুরুষ খুঁজে নিলেন! তার বুক খুৃঁজে নিলেন! আমি অপবিত্র ছোঁয়া দেই না বিধায় এমন!

পূর্ণ’র এহেন কথায় গা ঘিনঘিন করে উঠলো মৃত্তিকা’র? পূর্ণ এতটা জঘণ্য ভাষায় কি ভাবে কথা বললো তার সাথে? চোখ বেয়ে তখন তার পানির ধারা যা খুব সহজেই বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যাচ্ছে।
কথা বলতে চাইলো মৃত্তিকা। প্রতিবাদ করতে চাইলো পূর্ণ’র তাকে বলা সকল ভুল অপবাদের কিন্তু কান্নাগুলো যেন গলায় দলা পাকিয়ে আছে৷ কোন ভাবেই কথা বলতে পারলো না মৃত্তিকা। পূর্ণ এবার ধমকে উঠে মৃত্তিকা’র হাত টেনে একদম নিজের ভেজা শরীরে মিশিয়ে নিলো। শক্ত অথচ জেদী গলায় বললো,
— কি ছোঁয়া চাই না আপনার? এখন দেই?
বৃষ্টি বেড়ে গেলো। ঝড়ো হাওয়া বইছে থাকে। পূর্ণ নিজের মুখটা এগিয়ে আনছে মৃত্তিকা’র কাছে। মৃত্তিকা নিজেকে ছাড়াতে চাইলো অথচ শক্ত বন্ধনি ভাঙার সাধ্য তার কই? একদম ওষ্ঠ দুটো যখন কাছাকাছি ঠিক তখন পূর্ণ বলে উঠলো,

— এখন এত ছটফট কেন মৃত্ত? এটাই তো চান আপনি।
মৃত্তিকা সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা মারলো পূর্ণ’র বুকে। ছুটে সরলো ওর থেকে। কান্না করতে করতে বলতে লাগলো,
— আপনি…আপনি একজন নোংরা মস্তিষ্কের লোক। আ..আর কখনো মৃত্তিকা আপনাকে ভালোবাসবে না। কখনো আপনার কাছে আসবে না। আই হেই.. আ..আমি…ঘৃ.. খা..রাপ লোক আপনি..জঘন্য…
বলতে পারলো না মৃত্তিকা। লোকটাকে ভালোবাসে ও। কিভাবে বলবে ঘৃণা করে। এক মুহূর্ত না তাকিয়ে দৌড়ে চলে গেল মৃত্তিকা। আর কখনো পূর্ণ”কে চাইবে না ও। কখনোই না।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৩+১৪

হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পরলো পূর্ণ। এতদিন পর কেন এলো আর কি হলো। সাফারাতের এতটা নিকটে মৃত্তিকা’কে দেখেই বুকে দহন হয়েছে তার। না চাইতেই বাজে কথাগুলো সে তার মৃত্ত’কে বলে ফেলেছে। এখনও কানে বাজছে, মৃত্তিকা তাকে আর ভালোবাসবে না, কখনো আসবে না। তীব্র বর্ষণের মাঝেই সেই বট গাছের গোড়ায় বসে রইলো পূর্ণ। তবে কি শুরুটা যেখানে ছিলো শেষটাও সেখানেই হলো?

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৭+১৮