শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
সামিউল শেখ ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে থাকতে পারলেন না। গা এলিয়ে দিয়ে আধশোয়া হয়ে পড়লেন বিছানায়। চোখের চশমা খুলে বেডসাইড টেবিলে রাখলেন। সালমা বেগম তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে বিছানায় পাশেই বসল। কপালে চিন্তার রেখা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কি আশ্চর্য শ্রাবণের বাবা। তুমি এত ঠান্ডা আছো কীভাবে? ধারার যদি কোনো বিপদ…
সামিউল শেখ কথা কেটে বললেন,
—” পুলিশ কমপ্লেইন করোনি এখনো?”
—” নীল গিয়েছিল। করেছে। কিন্তু এসব দিয়েই বা কী হবে? যে নিজে থেকে হারিয়ে যায়, তাকে কি কেও জোর করে খুঁজে আনতে পারে?”
সামিউল শেখ মাথা নেড়ে বললেন,
—” আমিও তোমাদের সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করছি। এখন অস্থির হয়ে চেঁচামেচি করে তো কোনো লাভ হবেনা। তাই আমি শান্ত আছি। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে, ধারাকে খুঁজতে হবে। পুলিশ কমপ্লেইন করা হয়ে গেছে, গুড! এখন আমাদের নিজেদেরকেও একটু কিছু করতে হবে।”
সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন সালমা বেগম,
—” শ্রাবণকে কিছু বললে না কেন? আমি তো ভেবেছিলাম ছেলেটাকে বকাবকি করবে।”
ফিক করে হাসলেন সামিউল শেখ,
—” তোমার ছেলেকে এখন কিছু বললে কেঁদেই ফেলত। ওর চোখ দেখোনি?”
—” দেখেছি।” শান্ত, মলিন কন্ঠ ভদ্রমহিলার।
—” কী বুঝেছো?”
এবারে ভ্রু কুঁচকালেন সালমা বেগম,
—” কি আবার বুঝব? ও তো নিজেও ভয় পেয়েছে এবার। পাগলের মত সারাদিন খুঁজেছে।”
—” আরো খুঁজুক। তোমার ছেলে ভালোবেসে ফেলেছে ধারাকে। গাধাটা এখন বুঝতে পেরেছে। আর হাদারামটাকে কষ্ট পেতে দেখে আমার ভালো লাগছে, তাই কিছু বললাম না।”
এই কথা সালমা বেগমও জানেন। তাই তিনি কিছু না বলে মলিন হাসলেন। তবে চিন্তিত হয়ে আরো বললেন,
—” কিন্তু ধারা?”
—” আহহা থামো তো। ধারা একদম বোকা তো নয়। নিজের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করবে সে। আমি যদি ভুল না করি, তাহলে মেয়েটা অভিমানে লুকিয়েছে। আর তোমার ছেলে যদি নিজের অভিমানী বউকে খুঁজে বের করার মত সামান্য কাজটা করতে না পারে, তাহলে ও একটা সলিড হাদারাম ছাড়া কিছুই না। তবে ধারা যেখানেই আছে, আমার মনে হয় নিজেকে নিরাপদে রেখেছে। আর তোমার ধারনাও সঠিক হতে পারে, ও হয়তো শহরের বাইরে যায়নি। যেতে পারার কথা না। খোঁজা আরো সহজ হবে।”
মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনে মাথা নাড়লেন সালমা বেগম। কথা মিথ্যে নয়। তিনিও বিষয়টা ভেবেছন।
জিহান শেখ বাড়িতে আর পা রাখেনি। নিজের মত করে অনেক চেষ্টা করেছে। শ্রাবণ ও নীল বাড়িতে চলে যাওয়ার পরেও সে কাজ চালিয়েছে। তবে লাভ হয়নি। আজ আর লাভ হবে বলেও মনে হয়না। শেষে ফ্লাটে ফিরে সে অন্ধকার ঘরে চেয়ারে বসে পড়ল। কল করল নীলকে,
—” নীল? আঙ্কেল কি ঝামেলা করেছে?”
নীল ঘেমে গিয়েছিল। তাই ঠান্ডা হতে গোসল করে কেবলই বের হলো। ভেজা চুল ঝারতে ঝারতে বারান্দায় দাঁড়াল সে
—” না। অদ্ভুত ব্যপার। ঝামেলা তো দুরের কথা, শুধু ঠান্ডা মাথায় ভাইজানকে একটু ধুয়ে দিয়েছে। আর কিছু তো বলল না।”
ভ্রু কুঁচকাল জিহান,
—” তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম আজ শ্রাবণের শেষ দিন।”
—” বিগ আস ব্রো।”
—” আঙ্কেল তাহলে শ্রাবণকে সুযোগ দিয়েছে। ”
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, বলল তো সাতদিনের মধ্যে ভাবিকে খুঁজে আনতে। নইলে বাড়িছাড়া করবে।”
—’ জানতাম এমন কিছুই বলবে। আচ্ছা ওয়েট, থানা থেকে কল এসেছিল?”
—” না ভাই।”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—” থানার দিক থেকেও এখনো কিছু জানায়নি।”
জিহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” খারাপ। খুব খারাপ।”
—” কেন?”
—” কারণ যদি এটা কিডন্যাপ হতো, তাহলে অন্তত কোনো ক্লু পাওয়া যেত। সিসিটিভি, ফোন, সাক্ষী, কিছু একটা। কিন্তু এখানে কিছুই নেই।”
নীল বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিল,
—” তাহলে?”
জিহান নিচু স্বরে বলল,
—” তাহলে দুইটা সম্ভাবনা হতে পারে। ভাবি আগে থেকেই খুব পরিকল্পনা করে বেরিয়েছে। অথবা…কেউ তাকে সাহায্য করেছে।”
কথাটা শুনে নীলের ভ্রু কুঁচকে গেল,
—” সাহায্য? কে করবে?”
—” সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
—” ধুর পাগল নাকি! সাহায্য করার মত কেও থাকলে তো আমি ছিলাম। আর কে আছে?”
জিহান নিজেও কিছুক্ষণ ভাবল। আসলেই কেও নেই আর। কিন্তু সাহায্য ছাড়া তো এসব আর সম্ভব মনে হয় না। দুজনেই নিজেদের মতো করে ভাবতে লাগল।
হঠাৎ জিহানের মাথায় কিছু একটা খেলে গেল।সে সোজা হয়ে বসল।
—” ওয়েট!”
—” কী হলো?”
—” ভাবি ফোন রেখে গেছে তাইনা?”
—” হ্যাঁ। ”
—” ফোনটা কোথায়?”
নীল ভেবে বলল,
—” স্টোররুমেই পড়ে আছে। কেও তো হাতও দেয়নি। ভাবি যেভাবে ফেলে রেখে গেছিল, সব একইভাবে পড়ে আছে! ”
জিহান এবার চিন্তিত গলায় বলল,
—” একটা কাজ কর। কাল সকালে আবার স্টোররুমটা ভালো করে খুঁজে দেখিস। আর কিছু আছে কিনা। আর ফোনটা নিয়ে আসিস। ফোনটা চেক করা দরকার।”
—” উমম আচ্ছা। ”
—” আর শ্রাবণের দিকে খেয়াল রাখিস।”
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” ভাইজানের অবস্থা খুব খারাপ। ডিনার করাতে পারিনি। খাবে না মানে খাবেই না।”
—” আমি জানি।”
—” আজকে গাড়ি থেকে নামার সময় দেখেছো? হাত কাঁপছিল।”
জিহান চোখ বন্ধ করল। তারও আজ ব্রিজের ওপরের দৃশ্যটা মনে পড়ছে। সারাদিন খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া একজন মানুষ। যে অবশেষে স্বীকার করেছে, সে ভালোবেসে ফেলেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষটাকে হারিয়েছে। ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল। তারপর জিহান নিচু স্বরে বলল,
—” নীল?”
—” বলো ব্রো!”
—” আমার মনে হয় না এই গল্প এত সহজে শেষ হবে।”
—” কেন?”
জিহান জানালার বাইরে রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার ভেতরের অদ্ভুত অনুভূতিটা কিছুতেই যাচ্ছে না।
—” কারণ জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে ভাবি আমাদের নাগালের বাইরে নেই।”
—” তাহলে কোথায়?”
জিহান ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
—” হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক কাছেই আছে। আশেপাশেই আছে, আমরা বুঝতে পারছি না।”
নীলের মেজাজ খারাপ হলো। বিরক্তি নিয়ে বলল,
—” শালা আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের প্যারাও এতটা ছিল না বিশ্বাস করো। এত টেনশন জীবনে হয়নি। হুদাই এখানে জীবনের ঝামেলা বাড়াতে এসেছিলাম। কু’ত্তামরা কপাল আমার!”
জিহান ফিক করে হাসলো।
—” যেটা বললাম সেটা করিস। ফোনটা নিয়ে আসিস মনে করে। আর শ্রাবণ না খেলে জোর করিস না, তার বউ যে খেয়েদেয়ে আছে এটারও গ্যারান্টি নেই। দুজনই নাটক কন্টিনিউ করুক। আমরা বসে বসে দেখি। শুধু একবার দুটো মিলে যাক, এরপর দুটোকেই আমি বুড়িগঙ্গায় একুশ বার চোবাব।”
নীল বিড়বিড় করে বলল,
—” দুজনের মাথায় বোম ফাটালেও আমার মনে শান্তি মিলবে না। যতসব সিনেমার মত কাহিনী শুরু করেছে দুজনে। ঢঙ দেখলে বাঁচি না।”
—” তুই দুজনের মাথায় বোম ফাটানোর আগে তোর ভাইয়ের বুকে আর পেটে দুটো করে বোম ফাটিয়ে দিস, যাতে ইগোকে লাথি মেরে নির্লজ্জের মত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।”
জিহানের কথা শুনে নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ করেই হো হো করে হেসে উঠল।
—” ব্রো, তুমি না থাকলে আমি এতদিনে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যেতাম।”
—” ধন্যবাদ। তবে আমি সিরিয়াস।”
—” আমিও সিরিয়াস। আমার তো মনে হচ্ছে আজকের রাতটাও ঠিকঠাক থাকবেনা। ভোরেই রাস্তায় নেমে পড়বে আবার।”
জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” নামবেই।”
নীল হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” আচ্ছা ব্রো?”
—” বল।”
—” একটা কথা মাথায় আসছে।”
—” কী?”
নীল রেলিংয়ে কনুই রেখে সামনে তাকাল,
—” ভাবি তো জানেনা ভাইজান তাকে ভালোবেসে ফেলেছে রাইট।”
কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,
—” হুম জানে না।”
—” জানলে ভালো হতো।”
—” কেন?”
—” কারণ জানলে যেত না।”
জিহান চুপ করে গেল। কথাটা মিথ্যে না। ধারা হয়তো অনেক কিছু সহ্য করেছে। অপমান, অবহেলা, কষ্ট, সবকিছু। কিন্তু সে যদি একবারও বুঝতে পারত শ্রাবণ সত্যি সত্যি তাকে চায়, তাহলে হয়তো যাওয়ার আগে অন্তত একটা সুযোগ দিত। নীল হতাশ গলায় বলল,
—” সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি জানো কী?”
—” কী?”
—” ভাইজান ভালোবেসেছে, কিন্তু বলতে শেখেনি। আর ভাবি ভালোবেসেছে, কিন্তু আর শুনতে চাইছে না।”
জিহান মাথা নেড়ে বলল,
—” এই জন্যই মানুষ বলে টাইমিং ইজ এভরিথিং।”
—” টাইমিং না, ভাইজানের মাথায় সমস্যা।”
—” এটাও সত্যি।”
দুজনেই এবার হেসে ফেলল। তবে হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। কারণ হাসির আড়ালেও একটা অস্বস্তি থেকে যাচ্ছে। ধারা কোথায়? এই মুহূর্তে কী করছে? খেয়েছে? নিরাপদে আছে? প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসছে।
ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়ে একটা ছুঁয়েছে। শ্রাবণের চোখে ঘুম নেই। চোখের পলকও পড়ছে না। দুশ্চিন্তায় মাইগ্রেনের ব্যাথা উঠে যাচ্ছে তার। এমনিতেই খালি পেটে রয়েছে সে। ঘরের লাইট বন্ধ। শুধু জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো মেঝেতে পড়ে আছে। বিছানার কিনারায় বসে থাকা মানুষটার চোখ স্থির। শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। রাত যত গভীর হচ্ছে, শ্রাবণের ভেতরের অস্থিরতাও যেন ততই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। তবুও বিছানার কিনারায় বসে থাকা মানুষটার চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। চোখ বন্ধ করলেই শুধু একটা মুখ ভেসে উঠছে।
শ্রাবণ কপালে হাত চেপে ধরল। মাইগ্রেনের ব্যথাটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু সেই ব্যথাও যেন তুচ্ছ। এর চেয়েও বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভেতরে। কিছু প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে। ও খেয়েছে? ও কোথায় ঘুমাচ্ছে? ভয় পাচ্ছে না তো? শ্রাবণ হঠাৎ করেই তিক্ত হাসল। কি অদ্ভুত! যে মেয়েটার দিকে তাকাতে পর্যন্ত বিরক্ত লাগত, আজ সেই মেয়েটা কোথায় আছে না জানার যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ ভিজে উঠেছে, সে নিজেও টের পায়নি। ধীরে ধীরে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল সে। প্রথমবারের মতো নিজের কাছেই হেরে যাচ্ছে শ্রাবণ শেখ।
খুব আস্তে বিড়বিড় করে বলল,
—” কেন গেলে? আর একটু সহ্য করা যেত না? আমি কি এতটাই খারাপ? মানলাম আমি খারাপ, কিন্তু আমি তো তোমারই। আর একটু অপেক্ষা করা যেত না?”
কথাটা বলেই নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। উত্তরটা সে জানে। না। আর অপেক্ষা করা যেত না। আর সহ্য করা যেত না। সে অনেক ক্ষেত্রেই সে খারাপ ছিল। অন্যায় করেছে। অপমান করেছে। আঘাত করেছে। বারবার করেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভালোবাসলেও সেটা নিজেও বুঝেনি, তাকেও বুঝতে দেয়নি। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সেই বিকেলের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ধারা বলেছিল “আমি বোকা হতে হতে ক্লান্ত।”
চোখ বন্ধ করে ফেলল শ্রাবণ। মনে হলো কেউ যেন তার বুকের মাঝখানে ধারালো কিছু বসিয়ে দিয়েছে। ধারা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। সে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। আর শ্রাবণ সেটা বুঝেছে খুব দেরিতে। ভীষণ দেরিতে। হঠাৎ করেই সে সোজা হয়ে বসল। চোখ দুটো লাল। মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছে।
অপেক্ষা। আর কত অপেক্ষা? সকাল পর্যন্ত? আর সাত ঘণ্টা? আট ঘণ্টা? অসম্ভব। সে পারবে না। এক সেকেন্ডও পারবে না। ধপ করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল শ্রাবণ। ওয়ারড্রোব খুলে এলোমেলোভাবে একটা শার্ট বের করল। হাত কাঁপছে। বোতাম লাগাতে পর্যন্ত সমস্যা হচ্ছে। তবুও থামল না। মনের ভেতর শুধু একটাই আর্তনাদ।
– ধারা, তুমি যেখানে থাকো… একবার সামনে এসো। একবার। শুধু একবার। আর একবার। আমি আর অন্যায় করবনা। আমি আর তোমাকে কষ্ট দেব না। তুমি শুধু সামনে এসো।”
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তার। কেউ উত্তর দিল না। ঘরের নিস্তব্ধতা আগের মতোই রয়ে গেল। দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে এলো শ্রাবণ। করিডোর অন্ধকার। সারা বাড়ি ঘুমিয়ে। কিন্তু তার ভেতরের ঝড়ের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। দরজা খুলে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে গেল সে। শহর তখন প্রায় ঘুমিয়ে।
রাস্তায় গাড়ি কম। বাতাস ঠান্ডা। কিন্তু শ্রাবণের ভেতরে শুধু আগুন। গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। চোখ দুটো ভিজে গিয়ে ভাঙন ধরল কন্ঠে,
—” তুমি রাগ করো। ঘৃণা করো। আমাকে শাস্তি দাও।”
স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরল সে। বিড়বিড় করল,
—” কিন্তু এভাবে হারিয়ে যেও না। আর একবার সামনে এসো। আমি তোমায়…
আর কিছু বলার ক্ষমতা নেই তার। অন্তত এখন নেই। তাই শুকনো ঢোক গিলল। পরের মুহূর্তেই গাড়িটা রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে গেল। আর শ্রাবণ শেখ, একজন হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজতে নয়, নিজের হারিয়ে যাওয়া শ্বাসটাকে খুঁজতে আবারও বেরিয়ে পড়ল।
—” কি গো আম্মাজান? তুমি তো এই এক জায়গাতেই সারাসময় বইসা আছো? মন খারাপ?”
বৃদ্ধার কথা শুনে ধারা মলিন হাসল। দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” না মন খারাপ না। আপনি খেয়েছেন সকালে?”
—” হ্যাঁ খাইছি। তুমি কি আজও খাইবানা?”
ধারা আবারো হাসল। নীরবে হেসে বলল,
—” এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিয়েন।”
বৃদ্ধার হাসি ধপ করে নিভে গেল। সে এবারে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ধারার পাশে বসল। তার বাহুতে হাত বুলিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ গো, তোমার কি অনেক দুঃখ? কী হইছে কওয়া যাইবো?”
ধারা কেমন করে যেন তাকাল। কথাটা বলতে গিয়ে সে অনুভব করল বিষয়টা কতটা মর্মান্তিক, একই সাথে রসিক। তবুও সে ফিক করে হেসে বলল,
—” আমি এতিম। কেও নেই আমার।”
বৃদ্ধা ভ্রু কুঁচকালেন,
—” এইডা কেমন কথা? পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা এতিম, বুঝলানি?”
—” কিন্তু এটা তো দুঃখের কারন না।”
—” তাইলে?”
ধারা আবারো চোখে পানি নিয়েই হেসে বলল,
—” আমার স্বামী আমাকে পছন্দ করে না দাদিমা। একটুও সম্মান করে না। ভালোবাসা তো দুরের কথা। ”
বৃদ্ধা এবারে পান চিবোনো দাঁতগুলো বের করে ভ্রু কুঁচকে ঘৃনা নিয়ে বললেন,
—” ধুর! পাগল মাইয়া। এতে দুঃখের কী আছে? তুমি আমারে দেখো, শয়তান বেডায় অন্য মাইয়ার লগে পিরিত কইরা ধরা খাইছিল আমার কাছে। এক মুহুর্তও রাখি নাই। বা’লের ভা’তা’র, বা’লের সংসারে এক লা’থি মাইরা চইলা গেছিলাম গ্রামে। মাইনষের বাড়ি কাম কইরা বাঁইচা আছি এই পর্যন্ত। তো হইছে কি? আমি কি বাঁচি নাই? খুব ভালা আছি হুহ্! ”
একটু থেমে তিনি পানের পিট ফেলে বললেন,
—” আমার কি ভা’তা’রের দরকার আছে নি? দরকার ছিল আদর-সোহাগের। ওই সময় আমার বয়স ছিল মাত্র পনেরো। আমার সাথে একটাদিন ভালো কইরা কথা কইছিল হেয়? কয়নাই। শয়তান হারামখোর! গত বচ্ছর খবর পাইলাম গায়ে পোকা ফুইটা ম’ইরা গেছে গা। আল্লাহ শাস্তি দিছে না ঠিকমত?”
এবারে বাঁকা হাসলেন বৃদ্ধা, যেন তিনি খুব খুশি। কিন্তু ধারার বুক ধ্বক করে উঠল। মনে মনে তওবা পড়ল। এরপর সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” আপনি ভালোবেসেছিলেন তাকে?’
বৃদ্ধা এবারে হাঁটু মুড়ে বসে চোখ উল্টে ভেবে মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
—” ন্যাহ! ম্যালা অহংকার ছিল আমার। যখন দেখছি শয়তানডা মোর লগে ভালো কথা কয়না, বাসর রাইতে আদর কইরা কথাও কয়নি, তখন থেইকাই ঘৃনা করছি। ভালবাসা? ছ্যাঁহ। মুখেও আনি নাই। অত আবেগ রাখিনাই। জীবন চলেনা, আর আবেগ দিয়া করুম কী? লা’থিগুতা খাইয়া সংসার করার থেইকা একা থাকা বহুত গুনে ভালা!”
ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে দিল। সে এখন কীভাবে বলবে- আমি তো ভালোবাসি। আমার এই খারাপ স্বামীকেই ভালোবাসি। সম্মান করি। তাই পারছিনা আপনার মত লা’থি মেরে যেতে।
আবারো ফোঁস করে শ্বাস ফেলল ধারা। তখনই ফ্লাটের কলিং বেল বেজে উঠল। বৃদ্ধা তড়িঘড়ি করে গিয়ে দরজা খুললেন। ধারা আগ্রহভরা দৃষ্টি দিয়ে তাকাল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বৃদ্ধা আবারো দৌঁড়ে আসলেন। ধারার হাতে একটা ছোট খাম ভরে দিয়ে বললেন,
—” নাও আম্মাজান।”
ভ্রু কুঁচকাল ধারা,
—” কী এটা?”
—” কি জানি। তোমার জন্য পাঠাইছে!”
ধারা খামটা খুলে দেখল, ভেতরে একটা শক্তপোক্ত কাগজ আর কিছু টাকা। আগে টাকাগুলো থেকে কিছু টাকা সে ভদ্রমহিলার হাতে দিয়ে বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
—” নিন দাদিমা। বাজার থেকে আলু আর লালশাক আনার ব্যবস্থা করুন। খিদে পেয়েছে আমার। দুদিন কিছু খাইনি।”
বৃদ্ধা অবাক হলেন,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৪
—” তুমি এহন খাইবা তাইলে?”
ধারা ঠোঁট চেপে হেসে মলিন কন্ঠেই বলল,
—” দেখি, আপনার মত কঠিন হতে পারি কিনা।”
বৃদ্ধা খুশি হলেন, এরপর আগ্রহ নিয়ে বললেন,
—” কাগজটা কীসের?”
ধারা নিজেও কিছুক্ষণ দেখে এরপর আবারো একই জায়গায় রেখে দিল। গ্রিল পেরিয়ে বাইরে তাকিয়ে মলিন গলায় বলল,
—” ট্রেনের টিকেট।”
