Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৬
অনামিকা তাহসিন রোজা

সাত দিন। ১৬৮ ঘন্টা। ১০,০৮০ মিনিট। ৬,০৪,৮০০ সেকেন্ড। সময় খুব কমও না, আবার বেশিও না। তবে শ্বাস আটকে রেখে বেঁচে থাকার মত তুচ্ছ সময় সাতদিন। সাত দিন। শুধু ক্যালেন্ডারে সাতটা ঘর পার হয়নি। একটা মানুষ সাতদিন ধরে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। প্রথম দিনটা ছিল রাগ, দ্বিতীয় দিন অস্থিরতা, তৃতীয় দিন ভয়, চতুর্থ দিনে এসে শ্রাবণ প্রথমবার বুঝেছিল, সে ধারাকে খুঁজছে না, সে শ্বাস খুঁজছে, তার নিজেরই বেঁচে থাকার পিছুটানটা খুঁজছে। সেদিন শহরের বাইরে গেছে। নিজের ফোন বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর শেষে সপ্তম দিনে এসে, সে আর নিজেকেও খুঁজে পাচ্ছে না। শ্রাবণ রীতিমতো এই সাতদিন শ্বাস আটকে রেখে ধারাকে খুঁজেছে। বাধ্য হয়ে চতুর্থ দিনে শহরের বাইরেও খুঁজেছে। টানা দুদিন বাড়িতেও ফেরেনি। কোথায় গেছে কেও জানেনা। এদিকে নীল ও জিহানও খবর নিতে পারছে না। শ্রাবণ তাদের উপর আর ভরসা করেনি। নিজের মত নিজের হারানো রত্নকে খুঁজেছে।

আজ সপ্তম দিন। শ্রাবণ সেই চিরচেনা ব্রিজের উপর গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো পথহারা লোক ভুল করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখের নিচে কালসিটে দাগ পড়ে গেছে, চুল এলোমেলো, শার্ট মলিন, অগোছালো। গালে দাড়ি উঠে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। আর চোখ? সেই চোখে আর আগের মতো আগুন নেই। সেই শ্রাবণ শেখকে কেও এক পলক দেখলে হয়তো চিনতেই পারবেনা। শ্রাবণ অনুভূতিশূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে স্থির নদীটির দিকে। তার দুহাত পকেটে, শরীর এমনভাবে গাড়ির সাথে এলানো যেন যেকোনো মুহুর্তে সে পড়ে যেতে পারে। অবশ্য যাবেই বা না কেন। সাতদিনে একটুও ঘুমোয়নি সে। বাঁচার জন্য পানি ছাড়া কিছু খেতেও পারেনি। এই সাতদিনে শ্রাবণ শেখ একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছে, ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে না। ভালোবাসা মানুষকে অসহায় করে। কারণ ভালোবাসলে মানুষ নিজের উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। সে এখন নিজেও বুঝছে, কেন ধারা খাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করত সে খেয়েছে কিনা। কেন অপেক্ষা করত। কেন তার রাগ, তার খারাপ ব্যবহারও সহ্য করত। কারণ ভালোবাসা মানে সম্মান হারানো না। ভালোবাসা মানেই অকারণে কারো চিন্তা করা। আর এখন, সে নিজেও সেই একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার নিজেরও সবকিছু হারিয়ে গেছে। এমন একটা পর্যায়ে সে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সে দরকার হলে ধারার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতেও প্রস্তুত।
শ্রাবণ ধীরে চোখ বন্ধ করল। নদীর বাতাস লাগছে মুখে, মাথা কেমন দুলছে। শরীর আর চলছে না। হঠাৎ খুব শান্ত গলায় নিজের মনেই বলল,

—” তোমার ভালোবাসা অনেক দুর্বল। নইলে কীভাবে পারো আমাকে ছেড়ে যেতে? আমার যে শ্বাস আটকে যাচ্ছে।”
শ্রাবণ খুব আস্তে চোখ খুলল। চোখ নামিয়ে ঠোঁট বাঁকালো, এরপর একটা ক্লান্ত, হেরে যাওয়া হাসি ফুটিয়ে বলল,
—” আমি যদি পাগল হয়ে যাই, তাহলে তুমি দায়ী থাকবে বেয়াদব মেয়ে। মানসিক রোগী বানিয়ে দিল আমায়!!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে রিকশার ব্রেকের শব্দ শোনা গেল। ধপ করে কেউ নামল। দুই সেকেন্ডে দৌঁড়ে এসে শ্রাবণের বাহু ধরল জিহান,
—” শ্রাবণ!”

শ্রাবণ নড়ল না। এক পলক তাকাল শুধু। তার সামনে এসে দাঁড়াল জিহনন। আর দাঁড়িয়েই জমে গেল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। এটা শ্রাবণ? সাতদিন আগে যে লোকটা রাগে মানুষ খেয়ে ফেলতে পারত, আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে হালকা বাতাস এলেও পড়ে যাবে। জিহানের বুক ধক করে উঠল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে ভ্রু কুঁচকাল। এ কেমন ছেলে ভাই? এখানে টানা দুদিন ধরে তাকে খুঁজে না পেয়ে সবাই চিন্তায় মরছে, আর এই ছেলে দেবদাসের মত চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে? দুুদিন যাবৎ বন্ধ থাকা নাম্বার থেকে আজ সকালেই মেসেজ পেয়েছে জিহান। যেখানে তাকে ব্রিজে আসতে বলা হয়েছিল।
দ্রুত শ্রাবণের কাঁধ চেপে ধরল জিহান। কাঁপা গলায় বলল,
—” তুই এই কী অবস্থা করেছিস নিজের?”
শ্রাবণ তাকাল। চোখ তুলে কয়েক সেকেন্ড চিনতে সময় লাগল যেন। তারপর খুব আস্তে বলল,

—” এসেছিস?”
জিহান রেগে উঠল,
—” আমি এসেছি মানে? তো আসব না? শালা তুই কোথায় ছিলি দুইদিন?”
—” খুঁজছিলাম।”
—” কী খুঁজছিলি? তোর চেহারা দেখেছিস?”
শ্রাবণ নির্বিকার রইলো,
—” পাইনি।”
জিহান দাঁত চেপে বলল,
—” খেয়েছিস?”
—”…..”
—” ঘুমিয়েছিস?”
—”…. ”
—” তুই পাগল হয়ে গেছিস শালা?’
রীতিমতো শ্রাবণকে ধাক্কা দিল জিহান। শ্রাবণ দুর্বল চিত্তে তাকাল,
—” মেরে ফেলতে চাইছিস?”
জিহান বিরক্তির ভঙ্গিতে বড় শ্বাস ফেলল। যে নিজেই মরছে, তাকে আর কীভাবে মারা যাবে? কিছুক্ষণ চুপ রইলো শ্রাবণ। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বলল,

—” জিহান…!”
—” কী?”
—” মানুষ কি ভালোবাসলে এমন হয়?”
জিহান থেমে গেল। শ্রাবণ এবার প্রথমবারের মতো লাল চোখে তাকাল তার দিকে। অদ্ভুত অসহায় সেই দৃষ্টি নিয়ে বলল,
—” বুকটা এমন করে কেনো? ফাঁকা লাগছে! আমি আগে বুঝিনি। এত কষ্ট হয়?”
শেষ প্রশ্ন টা জিহানের দিকে তাকিয়ে করল শ্রাবণ। যেন তার উত্তর জিহান তাৎক্ষণিক দিতে পারবে। জিহান কিছু বলল না। কারণ উত্তরটা তার চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। শ্রাবণ খুব আস্তে হাসল।
—” ওই বেয়াদব মেয়েটা এজন্যই সারাদিন কাঁদতো তাইনা? এই কারনেই ও পাগলের মত ছুটে ছুটে আসতো। ও এমনভাবেই কষ্ট পেত? এভাবেই সহ্য করত। কাওকে ভালোবেসে তার কাছ থেকে ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণাটা একটু বেশিই পীড়াদায়ক।”
চোখ নামিয়ে ফিসফিস করল শ্রাবণ। গলা ভেঙে এলো,

—” এখন বুঝলাম, এটা আসলে রোগ। আমি ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাই জিহান। রাগ করে থাকুক, কথা না বলুক, কিন্তু বাড়িতে থাকুক। আমার চোখের সামনে থাকুক। আমার বউ হয়ে থাকুক। ওকে খুঁজে দে।”
জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শ্রাবণ এমনভাবে ধারাকে তার কাছে চাইছে যেন সে-ই ধারাকে লুকিয়ে রেখেছে। গাড়িতে হেলান দিয়ে এবারে জিহান মাথা এলিয়ে দিল। তখুনি বাইক নিয়ে নীলকে আসতে দেখা গেল। সে ফুল স্পিডে চালিয়ে কষে ব্রেক করল শ্রাবণের গাড়ির সামনে। তার মুখ দেখেই বোঝা গেল কোনো একটা খবর নিয়ে সে এসেছে। হাস্যোজ্জ্বল মুখটা সেটারই সংকেত দেয়। হেলমেট খুলে বাইকের সিটে ছুঁড়ে মারল নীল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ আগে গেল জিহানের দিকে, তারপর শ্রাবণের দিকে। তৎক্ষনাত সে একদম স্থির হয়ে গেল। হাসিটা মুখে জমে গেল। দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের স্বরে বলল,

—” ইয়া আল্লাহ! ভাইজান?”
শ্রাবণ তাকালো না। নীল কয়েক পা এগিয়ে এলো। ভ্রু কুঁচকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বলল,
—” কী অবস্থা করছো নিজের? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সাতদিন না, সাত বছর পাহাড়ে ধ্যান করে আসছো!”
জিহান বিরক্ত হয়ে বলল,
—” তুই পরে নাটক করিস। আগে দেখ তো এই লোকটাকে।”
নীল এবার সত্যিই সিরিয়াস হলো। সামনে গিয়ে একদম শ্রাবণের মুখের কাছে মুখ নিয়ে তাকাল। চোখ বসে গেছে, ঠোঁট শুকনো, গালে দাড়ি। নীলের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে শ্রাবণের গাল দুম করে টিপে বলল, —” ভাইজান?”
শ্রাবণ বিরক্তিে চোখে তাকালো। নীল মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—” ওকে, এখনো জীবিত আছো। ভালো। আমি ভাবছিলাম আত্মা হয়ে গেছো।”
জিহান না চাইতেও ফিক করে হাসল। শ্রাবণ নির্বিকার গলায় বলল,
—” তুই মাথা খেতে কেন এসেছিস? তোকে তো ডাকিনি আমি।”
নীল সাথে সাথে নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল,
—” আহা! কী নির্মম কথা। সাতদিন ধরে আমি তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে চার কেজি ওজন কমিয়েছি!”
জিহান ধমক দিল,
—” মিথ্যা বলবি না।”
—” আচ্ছা দুইশো গ্রাম।”
শ্রাবণ এবারও হাসল না। নীল সেটা লক্ষ্য করল। তারপর গলার স্বর একটু নরম করে বলল,
—” সিরিয়াসলি বলছি, আমরা টেনশনে ছিলাম ভাই। ফোন বন্ধ করে গায়েব হয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয়?”
শ্রাবণ চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—” চুপ থাক। নইলে চোয়াল বরাবর কষে একটা থাপ্পড় খাবি।”
নীল থেমে গেল। সে এবার আর মজা করল না। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,

—” আচ্ছা একটা কথা বলো?”
—” কী?”
—” আমাকে কি তোমার একটুও কাজের মনে হয়না?’
শ্রাবণ এবার প্রথমবারের মত চোখ তুলল। একদম সময় না নিয়ে উত্তর দিল,
—” একদমই না। অপদার্থ! ”
নীল এবার দাঁত বের করে হাসল। কিন্তু হাসিটার নিচে উত্তেজনা লুকানো যাচ্ছে না। সে একবার জিহানের দিকে তাকাল। একবার শ্রাবণের দিকে। তারপর কলার ঝাঁকিয়ে গর্ব করে বলল,
—” আজ এই অপদার্থ তোমার বউয়ের ফোনের পাসওয়ার্ড জানে বলেই একটা সুখবর পেতে চলেছো।”
শ্রাবণ তৎক্ষনাৎ সতর্কতার ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,
—” মানে?”
জিহানও ভ্রু কুঁচকাল

—” ফোন তো নাকি পাসই নি তুই!”
নীল এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল
—” ইয়ে মানে, মিথ্যে বলেছিলাম। ফোন স্টোররুমে পরে গিয়েও পেয়েছি। আর গতরাতে সেটার লক খুলেছি।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” তুই ওর ফোনের পাসওয়ার্ড জানিস কীভাবে?”
নীল শিরদাঁড়া খাড়া করে বলল,
—” ঠি-ঠিক এই কারনেই আমি সুখবর দিতে চাইনি। এত জেলাসি থাকলে হয়? তোমার বউ আমার ফ্রেন্ড বুঝেছো? আমরা যেদিন পেইন্টিং করতে বসেছিলাম, সেদিন কথার ফাঁকে ফাঁকে ফোনের পাসওয়ার্ড জেনে নিয়েছিলাম। আফটার অল, পাসওয়ার্ড আমিই সেট করে ভাবিকে দিয়েছি। বেচারি ফোন সম্পর্কে কিছু জানতো না আগে! ”
শ্রাবণের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে গেলেও জিহান তাড়া দেয়,
—” উফ বাজে আলাপ বাদ দে। ফোনে কী পেয়েছিস সেটা বল।”
নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে বলল,
—” আগে বলি, কেউ হার্ট অ্যাটাক কোরো না।”
শ্রাবণ এক ধাপ এগিয়ে এলো৷ কণ্ঠ শুকনো তার,
—” দ্রুত বল আহাম্মক। ”

নীল এবার আর দেরি করল না। তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটল। সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল,
—” ভাবি যাওয়ার আগে একটা লাস্ট কল এসেছিল ফোনে।”
জিহান আর শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
—”কার কল? কার নাম্বার ছিল?”
নীল পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে বলল,
—” কল তো এসেছিল “বাবা” নামে সেভ করা কোনো নাম্বার থেকে। তোমরা নিজেরাই দেখে নাও নাম্বারটা।”
বলেই শ্রাবণ ও জিহানের মুখের সামনে ফোনের স্ক্রিনটা ধরল নীল। জিহান চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,

—” ওহ শিট! আমার সন্দেহ সঠিক!”
শ্রাবণও অবিশ্বাস্যকর দৃষ্টিতে তাকাল। সামিউল শেখের নাম্বার? ধারা ফোনে কথা বলেছে বাবার সাথে?
নীল এবারে ফোনটা শ্রাবণের হাতে দিয়ে হাত ঝেরে বলল
—” আমি পরে পর্যবেক্ষণ করেছি অনেক। আর করতে গিয়ে খালুর কাছে ধরাও খেয়েছি। খালুই বাঁধা দিয়েছিল যেন তোমাদের কাওকে না বলি। আজকে বললাম। কারন আজও খালুই বলতে বলেছে।”
জিহান আর শ্রাবণ দুজনেই অবাক হয়ে তাকাল। শ্রাবণ রীতিমতো মারার জন্য তেড়ে যেতে চাইলে জিহান আটকে দেয়। বাঁকা হেসে বলল,
—” দেখেছিস শ্রাবণ, তোর বাপ কত চালাক! আমার একবার মনে হয়েছিল এমন কিছু। কিন্তু পরে মনে হলো এটা অসম্ভব। কিন্তু এদিক যে! ও গড, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিনা তোর বাবা-ই ধারাকে লুকিয়েছে। সো, শী ইজ সেইফ!”

শ্রাবণ কিছু বলল না আর। মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফোনটার স্ক্রিনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। একটা নাম্বার, সাধারণ একটা কল লগ। কিন্তু এই সাতদিনের সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত আতঙ্ক, সমস্ত শ্বাসরুদ্ধ করা ভয়, হুট করেই যেন অন্যরকম অর্থ নিতে শুরু করল। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা দৃশ্য জুড়ে যেতে লাগল। বাবার হঠাৎ দুদিন আগে শহরে ফেরা। বাড়িতে না এসে বনানীর ফ্ল্যাটে থাকা, অস্বাভাবিক শান্ত থাকা, কোনো চিৎকার না করা, ধারাকে নিয়ে একটুও ভেঙে না পড়া। আর সাতদিন সময় দেওয়া। শ্রাবণ খুব আস্তে চোখ বন্ধ করল। তারপর অদ্ভুতভাবে ঠোঁটের কোণে হাসির মত কিছু ফুটল। ক্লান্ত, হেরে যাওয়া তবুও শান্ত সেই হাসি নিয়ে সে খুব নিচু স্বরে বলল,
—” বাবা আমাকে চরম একটা জীবনশিক্ষা দিল।”
জিহান তাকালো। শ্রাবণ মাথা নিচু রেখেই থাকল। এইবার জিহান আর সহ্য করতে পারল না। সে ধীরে ধীরে নীলের দিকে ঘুরল। একদম স্থির মুখ নিয়ে দাঁত কটমট করল। নীল ভয় পেয়ে গেল।

—” কী?”
জিহান দাঁত বের করে হাসল,
—” মানে তুই সাতদিন ধরে এসব জানতিস? কিন্তু আমাকেও বলিস নি!”
নীল গলা খাঁকারি দিল,
—” উমম, জানতাম সব। বাট পুরোটা না।”
—” ফোনও পেয়েছিলি?”
—” মানে, হালকা।”
—” খালু তোকে চুপ থাকতে বলেছিল?”
—” মানে, জাস্ট একটু।”
জিহান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে নীলের কান মুচড়ে ধরল।
—” এই হারামজাদা! আমরা এখানে শ্রাবণকে নিয়ে হাসপাতালের রোগীর মত ঘুরছি আর তুই সিনেমা চালাচ্ছিস?”

—” আহহহহ! ভাই! ছাড়ো! কান ছিঁড়ে যাবে!”
—” তুই জানতি ভাবি সেফ?!”
—” পুরো জানতাম না! আন্দাজ করছিলাম!”
—” আন্দাজ করছিলি?”
—” আরে খালু বলছিলেন বিশ্বাস রাখতে!”
জিহান আরেকটু কান টানল,
—” তোরে আমি বুড়িগঙ্গায় না, ড্রেনে চুবাব!”
নীল এবার শ্রাবণের পেছনে লুকালো।
—” ভাইজান বাঁচাও!”
শ্রাবণ নির্বিকার মুখে বলল,
—” গু খা, মরে যা।”
—” ভাইজান??”
নীল হতবাক হয়ে বলল,
—” আমি তোমার জন্য এতকিছু করলাম…আর তুমি?’
—” সাতদিন আগে করলে ভালো হতো।”
জিহান এবার ছেড়ে দিল। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই থেমে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এলো। সে নীলের দিকে তাকাল।

—” ওয়েট।”
নীল সতর্ক হলো,
—” আবার কী?”
জিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” একটা কথা বুঝলাম না।”
—” কী?”
—” আঙ্কেল সাতদিন কিছু বলেনি। আজকে কেন বলতে দিল?”
হালকা বাতাস বয়ে গেল। নীলও থেমে গেল। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটল আবার। সে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে বলল,
—” ওটাই তো আসল ব্যাপার। খালু তো আর এমনি এমনি বলেনি।”
শ্রাবণ এবার ধীরে মাথা তুলল। প্রশ্নটা যৌক্তিক। নীল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” খালু আমাকে আজ বলতে বলেছে, কেননা আজই নাকি শেষ সুযোগ।”
জিহান ভ্রু কুঁচকাল,

—” কীসের শেষ সুযোগ?”
নীল নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,—” ভাবিকে ফিরিয়ে আনার। তাকে আটকানোর।”
শ্রাবণ এবারে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
—” মানে?”
নীল এবারে জিহান ও শ্রাবণের থেকে নিরাপদ দুরত্ব নিয়ে বাইকের কাছে যেতে যেতে বলল,
—” তোমরা যে ভাবছো ভাবি বনানীর ফ্লাটে আছে, ব্যপার টা ভুল। ভাবি বনানীর ফ্লাটে ছিল। কিন্তু এখন খালু সরিয়ে নিয়েছে। আর, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আজকে ভাবিকে গ্রামে চিরজীবনের জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছে খালু। তাই যা করার দ্রুত করো। এখন শেখ বাড়ির বড় কর্তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই তোমাদের। দ্রুত যাও। আজ হয়তো খালু ভাইজানকে তার সুখের ঠিকানা দিবেন।”
কথাটা বলে নীল আর দাঁড়াল না। হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে বাইকে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দে ব্রিজের নীরবতা ভেঙে গেল। শ্রাবণ স্থির, জিহান স্থির। দুজনেরই মাথা যেন কয়েক সেকেন্ড কাজ করল না। নীল হেলমেটের ভাইজার নামাতে নামাতে আবার বলল,

—” খালু একটা কথাই বলেছে, জীবনভর সবাইকে সব সুযোগ দেয়া যায় না। আজ শেষ দিন।”
শ্রাবণের বুকের ভেতর হঠাৎ ধপ করে উঠল। নীল এবার গম্ভীর গলায় বলল,
—” আর একটা কথা। ভাবি কিন্তু অলরেডি যাত্রাপথে নেমে গেছে। যা করার দ্রুত করো। আমাদের আবার সেই অনুযায়ী হিরোর মত গিয়ে চূড়ান্ত মুহুর্তে ভাবিকে তুলে আনতে হবে।”
কথাটা বলা শেষ হতেই বাইকটা সাঁ করে সামনে ছুটে গেল। দশ সেকেন্ড থেকে পনেরো সেকেন্ড শুধু বাতাসের শব্দ শোনা গেল। জিহান প্রথম নড়ল। ধীরে ধীরে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ তখনো স্থির দাঁড়িয়ে। মাথা নিচু, শ্বাস ভারী। জিহান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,

—” শ্রাবণ?”
কোনো উত্তর নেই।
—” দোস্ত?”
শ্রাবণ খুব আস্তে মাথা তুলল। তার চোখদুটো আগের মতো না। সেখানে ভয় আছে, আতঙ্ক আছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে সিদ্ধান্ত। সে হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। পরের মুহূর্তেই গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। জিহান চমকে উঠল।
—” এই! কী করছিস?”

শ্রাবণ চাবি ঘোরালো। ইঞ্জিন গর্জে উঠল। স্টিয়ারিং চেপে ধরে খুব আস্তে বলল,
—” সাতদিন আগে আমি ওকে হারিয়েছি। আর দ্বিতীয়বার হারাব না।”
জিহান বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকলে শ্রাবণ ধমক দেয়,
—” তুইও কি ওর মত অপদার্থ? দ্রুত ওঠ গাড়িতে। যেতে হবে।”
জিহান দ্রুত পাশে উঠে বসল। সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বলল,
—” মাথা ঠান্ডা রাখিস। আগে আঙ্কেলের সাথে কথা…
শ্রাবণ তার কথা শেষ হতে দিল না। গাড়ি ধীরে সামনে ছাড়তে ছাড়তে বলল,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৫

—” সব করব। যা করতে হবে, করব। বাবা যা বলবে, তাই করব।”
জিহান তাকালো। এক মুহূর্তে গাড়িটা সামনে ছুটে গেল। ব্রিজের বাতাস কেটে, রাস্তার আলো পেছনে পড়ে রইল। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে শ্রাবণ। মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে, আজ যদি দেরি হয়ে যায়? যদি এবার সত্যিই চলে যায়? যদি আর একবারও না তাকায় আমার দিকে?

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here