শ্রাবণ ধারা পর্ব ৯
অনামিকা তাহসিন রোজা
নীল আনমনে গান গাইতে গাইতে হাতে ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল। ধারার পিছু পিছু যেতে যেতেই সে পর্যবেক্ষণ করে ফেলল মেয়েটাকে। সালোয়ার কামিজ পরিহিত মেয়েটাকে যে কেও দেখে এক কথায় লক্ষ্মী মেয়ে বলতে বাধ্য হবে। কি সুন্দর চালচলন, কি অমায়িক ব্যবহার, কি সুন্দর পোশাকের রুচি। এত সাবলীল চলাফেরা! মন থেকে মুগ্ধ হলো নীল। শহরে এসেও যে একটা মেয়ে এত সুন্দর করে চলাফেরা করতে পারে তা নীল জানতো না। হুট করে ধারার কোঁমর পর্যন্ত লম্বা বিনুনি দেখে একটু অবাক হলো সে, হতবাক গলাতেই জিজ্ঞেস করল,
—” বাহ, তোমার তো বেশ লম্বা চুল।”
ধারা পিছু না ঘুরেই যেতে যেতে জবাব দিল,
—” ছোটতে আরো সুন্দর আর ঘন ছিল। যত্ন না নেয়াতে একটু কমে গেছে। যত্ন নেয়ার সময়ই পাইনা। কিন্তু শখের চুল তো, কাটতেও কষ্ট হয়।”
নীল বুঝবার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম, কিন্তু শহরের মেয়েরা তো শুনেছি চুল ঘাড় পর্যন্ত রাখতেই বেশি পছন্দ করে।”
ধারাও জবাব দিল,
—” আমি তো গ্রামেরই মেয়ে নীল সাহেব।”
সাথে সাথে নাক মুখ কুঁচকে তাকাল নীল। চোখ পিটপিট করে বলল,
—” হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সাহেব? তুমি কি আমাকে ইনডিরেক্টলি ইনসাল্ট করলে? আমার কি তেরোটা নাতি নাতনি আছে? তুমি জানো আমি এখনো বিয়েই করিনি! সেখানে তুমি আমায় দাদু-নানুর মত ট্রিট করলে ধারা? ছিহ, ভীষণ কষ্ট পেলাম।”
নীলের বাচ্চাদের মত ভঙ্গিমা দেখে হাসি আটকাতে পারল না ধারা। হাসি চেপে রেখেই দুঃখী কন্ঠে বলল,
—” আমি সত্যিই আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। সরি সরি। আপনাকে তাহলে কী ডাকি বলুন তো? নীল ভাই ডাকি?”
নীল কিছুক্ষণ ভাবুক দার্শনিকের মত করে থুতনিতে আঙুল বুলালো। এরপর ধারার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম, সাউন্ডস গুড। এটা পারফেক্ট। নীল ভাই-ই ডাকো।”
ধারা মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল। নীল আবারো মাইকেল জ্যাকসনের মত পোজ দিতে দিতে ধারার পিছু নিল। গেস্ট রুমটা আগে থেকেই সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছিল ধারা। দরজা টা খুলে ঘরে ঢুকতেই নীল রীতিমতো অবাক হয়ে যায়, উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,
—” ওয়াও। আমেজিং! ঘরটা তো বেশ সুন্দর!”
ধারা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে,
—”হুম। মা..না মানে আন্টি আর আমি মিলে গুছিয়েছি।”
ভুল করে আবারো সালমা বেগম কে মা সম্বোধন করতে যাচ্ছিল ধারা। পথিমধ্যে দ্রুত শুধরে নিয়ে কথাটা শেষ করল সে। নীল বরাবরই উড়ন্ত পাখিরূপ মানুষ। অত কিছু খেয়াল করলই না সে। বরং বারান্দার দরজা খুলে দিয়ে পুরো ঘরটা মনোযোগ দিয়ে দেখল আর সাজানো গোছানো দেখে মুগ্ধ হলো।
ধারা এবারে বলল,
—” আপনি ফ্রেশ হয়ে খেতে আসুন। আমি আসছি, কোনো কিছু দরকার হলে অবশ্যই বলবেন।”
—” দাঁড়াও।”
নীল এবারে দ্রুত ধারার দিকে এগিয়ে গেলো। একটু ইতস্তত করে বলল,
—” একটা কথা জিজ্ঞেস করি? কিছু মনে করো না।”
—” জ্বি বলুন।”
—” তুমি তো নিজেও এ বাড়ির মেহমান। সবকিছু এত সুন্দর করে হ্যান্ডেল করছো কীভাবে?”
ধারা একটু থমকে গিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গেলেই তাকে থামিয়ে নীল আবার বলে,
—” উহু, আমার সাথে অযুহাত দিও না মিস। আমি নীল, বাইরে থেকে একটু বাচাল, বাট সবকিছু বুঝতে পারি। ব্যাপার টা কী হুম? এ বাড়ির সাথে বেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছো মনে হয়।”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। সে নিজেও ভাবছে। সেই সময় ঘরে সালমা বেগম অনেক কিছু বলেছেন ধারাকে। অনেক কিছু শিখিয়েও দিয়েছেন। সবটা আয়ত্তে আনতে না পারলেও ধারা এটুকু বুঝেছে তাকে কী করতে হবে। তাই নিজের হাসিটা ধরে রেখেই বলল,
—” আসলে ঠিকই বলেছেন। আপনার খালামনির মত মানুষ হয়না। আমি যেদিন থেকে এ বাড়িতে এসেছি সেদিন থেকে আমায় এতটা কাছে টেনে নিয়েছেন যে মাঝে মাঝে ভুলেই যাই এটা আমার বাড়ি নয়। আর আন্টির সাথে আমার খুব ভাব। ভীষণ আদর করেন আমাকে। এখানে বিনা পয়সায় থাকি, একটু যদি আন্টিকে সহযোগিতা না করি তাহলে তো আপনারাই বলবেন যে আমি ফ্রিতে শুধু গিলছি। চাকরিটা হয়ে গেলেই তো চলে যাব। তাই যতদিন আছি ততদিন আন্টিকে, এই বাড়িকে আপন করে নিয়েই চলি। এতে তো ক্ষতি নেই তাইনা?”
নীল সাথে সাথে আঁতকে উঠলো। দুহাত নেড়ে বলল,
—” এ বাবা! ছি ছি। তুমি তো সিরিয়াস নিয়ে ফেললে। আমি মজা করছিলাম। আমি এমনই। এভাবে বলো না। খালামনি তো বললই তুমি এ বাড়ির মেয়ে। সেই হিসেবে বাড়ি তোমারও। বরং আমিই মেহমান।”
বলেই ফিক করে হাসল নীল।
ধারা জবাবে মুচকি হাসল। নীল আবারো বলল,
—” খালামনি তোমায় ভীষণ ভালোবাসে, তাইনা?”
ধারার চোখজোড়া চকচক করল। মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ ভীষণ। আসলে আমার তো মা নেই। আন্টির কাছ থেকেই মায়ের ভালোবাসার সংজ্ঞা জেনেছি।”
নীলের হাসি নিভে গেলো। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
—” তোমার..মা নেই?”
ধারা দুদিকে মাথা নাড়াল। ঠোঁটের হাসি একটুও কমেনি। নীল আবারো জিজ্ঞেস করল,
—” আর বাবা..?
ধারা ফিক করে হেসে বলল,
—” নেই। আমার কেওই নেই। আমি এতিম।”
নীলের একটু মায়া লাগল। সে স্থির হয়ে একটু ভেবে বলল,
—” তুমি একা একা এ শহরে এসেছো? ভয় লাগেনি?”
ধারা আবারো দুদিকে মাথা নাড়ল। এর মাঝেই নিচ থেকে ভেসে এলো সালমা বেগমের ডাক,
—” কীরে নীল! খেতে আয় বাপ? তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
ধারা নিজেও এবারে বলল,
—” আপনি দ্রুত খেতে আসুন। কিছু দরকার হলে অবশ্যই বলবেন। আসছি! ”
বলেই দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল ধারা। নীল কিছুক্ষণ তার গমনপথে তাকিয়ে রইল। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতক্ষণে সে বুঝেছে কেনো তার খালামনি ধারাকে এ বাড়িতে থাকতে দিয়েছে। ইশ রে! বেচারি মেয়েটা। আপন বলতে কেওই নেই তার। এইজন্যই কি শহরে চাকরির খোঁজে এসেছে। ধারাকে নিয়ে অনেক ভাবলো নীল। ভীষণ আগ্রহী হলো। অজান্তেই ধারাকে নিয়ে আরো কিছু জানতে ইচ্ছে হলো তার। সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করবে। আর যদি কখনো কোনো সাহায্য লাগে, অবশ্যই পাশে দাঁড়াবে। এত মিষ্টি, ভালো একটা মেয়েকে তো এত বড় পৃথিবীতে একা ছাড়া যায়না।
দ্রুত পায়ে গেস্টরুম থেকে বের হয়ে দৌঁড় দিতে উদ্যোত হলেই ধারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। চলন্ত পা দুটো থমকে যায় সামনে শ্রাবণকে বুকে দু-হাত গুঁজে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। ধারা চোখ পিটপিট করে তাকায় শ্রাবণের দিকে। কি আশ্চর্য। লোকটা এমন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে কেনো। আর এখনো ফ্রেশ হয়নি কেনো? ধারা ভাবল তাকে দেখে শ্রাবণের মেজাজ খারাপ হয়েছে। তাই মাথা নিচু করে অনেকটা দূরত্ব নিয়ে শ্রাবণের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতে শুরু করে।
শ্রাবণকে পাশ কাটানোর সময়ই আবারো ধারা চমকে যায় শ্রাবণের বজ্রের ন্যায় দৃঢ় কন্ঠের শব্দে,
—” একটা পরপুরুষের সাথে এক ঘরে এতক্ষণ থাকতে লজ্জা করল না তোমার? কমনসেন্স কোথায়?”
ধারা সত্যিই অবাক হয়েছে। শুধু অবাক নয়। শ্রাবণের কন্ঠ শুনে চমকে গেছে সে। চোখ বড় করে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। শ্রাবণের কথা এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে ইতোমধ্যে বের হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্য হলেও যা শুনেছে তা একটু অবিশ্বাস্যকর মনে হলো ধারার কাছে। শ্রাবণ শেখ কবে থেকে ধারার বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করল? তাই ধারা নিশ্চিত হতে পারল না। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কিছু বললেন?”
শ্রাবণ এমনভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বেচারি ধারার উপর যেন ধারা তার কলিজাটা কে’টে ভুনা করে খেতে চেয়েছে। সে নিজেও জানেনা সে কী বলেছে আর কেনো বলেছে। বর্ননা করতে অক্ষম বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁত কটমট করল শ্রাবণ। শেষবারের মত ঈগল ন্যয় দৃষ্টি ফেলে আর কিছু না বলে বিড়বিড় করে “ইডিয়ট” বলল ধারাকে। এরপর গটগট পায়ে নিজের ঘরে চলে গেল শ্রাবণ। অকারনেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ঠাস করে দরজা আটকাল। দেয়ালসুদ্ধ কেঁপে উঠল সবকিছু। ধারাও পিলে চমকে উঠে নিজের বুকে থু থু করল। বিড়বিড় করে বলল
— ” ইন্না-লিল্লাহ। উনি এত রেগে গেলেন কেনো? আমি তো উনাকে বিরক্ত করতে যাইনি। উনার কাপড়েও হাত দিইনি, উনার সাথে কথাও বলিনি। তাহলে?”
স্টোররুমটা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। নীলের সামনে যেন ধারার আসল অবস্থা দেখা না যায় তাই আজ থেকে নীল এ বাড়ি থেকে প্রস্থান না নেয়া পর্যন্ত ধারা সালমা বেগমের সাথে বড়ঘরেই থাকবে। বড়ঘর বলতে সামিউল শেখ এবং সালমা বেগম যেই ঘরে থাকেন, তাকে বলা হয়েছে। বাড়ির সবচেয়ে বড় আকারের ঘরটা তাদেরই৷ তাই এ নামে ডাকা হয় তাদের ঘরকে। এমনিতেও সামিউল শেখ বিজনেস ট্রিপে গিয়ে কাজে আটকে গিয়েছেন। তিনি মোটামুটি এক মাসে আর ফিরতেই পারবেন না। তাই আপাতত ধারা সালমা বেগমের সাথে থাকতে পারবে। যদিও ধারা ভীষণ আপত্তি করেছে। কিন্তু সালমা বেগমের অনুরোধে সে রাজি হয়েছে। সর্ত দিয়েছে সে তবুও মেঝেতেই বিছানা পেতে ঘুমোবে। নিরুপায় হয়ে রাজি হয়েছেন সালমা বেগম।
নীলের ডিনার করার পর্ব শেষ হতেই সেও ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। শ্রাবণ কোনো এক কারনে আজ খেতেও আসেনি। কারন জানে না সালমা বেগম। পাত্তাও দেন নি তেমন। যা খুশি করুক গিয়ে। এদিকে ধারা মনে মনে আবিষ্কার করল সেই যে লোকটা নিজের শক্তির বলিদান দিয়ে দরজাটা আটকেছে, সেই থেকে দরজাখানা আর খোলেনি। সবকিছুর পাঠ চুকে গেলে সালমা বেগম আর ধারাও ঘুমোতে আসে।
খাটের উপরে শুয়ে তছবি গুনছেন সালমা বেগম। একটু আগেই নামায পড়ে এসেছেন তিনি। নিচেই মেঝেতে বিছানা পেতে চিত হয়ে শুয়ে রয়েছে ধারা। তার চোখ উপরে সিলিং এর দিকে। চোখ দুটো একদম খোলা। ঘুম নেই নয়নে। সালমা বেগম বেশ কিছুক্ষণ পর তছবি বালিশের পাশে রেখে ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত একটা পার হয়েছে ইতোমধ্যে। তিনি ধারাকে শেষবারের মত বললেন,
—” মা রে! ধারা। উপরে এলে ক্ষতি কী রে? উপরে এসে শুয়ে পড় দোহাই তোর। এত বড় বিছানা থাকতে কেনো তোকে মেঝেতে শুতে হবে আমি বুঝিনা বাপু। তোর শ্বশুর আসলে তো আবার ওই ছুপড়িতে গিয়েই ঘুমোবি!”
ধারা কাত হয়ে সালমা বেগমের দিকে মুখ করে শুয়ে খাটের উপরে তাকিয়ে বলল,
—” জানেনই তো, আমার মেঝেতেই শুতে ভালো লাগে মা। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি ঠিক আছি।”
সালমা বেগম মুখ কুঁচকে বললেন,
—” হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব আমি? কীভাবে বলব আল্লাহ আমার বউমা মেঝেতে শুতেই পছন্দ করতো, তাই তাকে বিছানা দিইনি আমি। আমায় ক্ষমা করুন! এভাবে বলব?”
ধারা খিলখিল করে হেসে ফেলল। বলল,
—” হ্যাঁ এভাবেই বলবেন মা!”
—” সত্যি করে বলতো তোর এই কাজের রহস্য কী?”
ধারার মুখের হাসি নিভে গেল। মাথার বালিশটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। জোরপূর্বক হাসি এনে মুখে বলল- কিছুই না মা।
কিন্তু সে তো আর বলতে পারল না। সে তো জানাতে পারল না, তার সরল মনের একটা সুপ্ত আকাঙ্খা আছে। কেনো যেন ভীষণ জেদ হয়েছিল তার। যেদিন এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছে, শ্রাবণের অবহেলা পেয়েছে। শ্রাবণের ঘরে ঠাঁই পায়নি, সেদিনই ধারা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে এ বাড়ির বিছানায় সে শোবে না। যেদিন শ্রাবণ নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় ধারাকে ঘুমোনোর অধিকার দেবে, সেদিনই প্রথম সে বিছানায় ঘুমোবে। এই সুযোগ যদি নাও আসে, তবুও আফসোস নেই ধারার। তবে মনের এই প্রতিজ্ঞা সে পালন করবেই।
ধারার হাসি দেখে সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বুঝলেন এই মেয়ে জবাব দেবে না প্রশ্নের। ভীষণ জেদি মেয়ে। তাই তিনি এই প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—” নীল বড্ড ভালো একটা ছেলে। অনেক সহজ সরল বুঝলি। ভাগ্যিস ছেলেটা এমন, নইলে ঠিকই বুঝে যেত কিছু একটা। সন্দেহ করতোই। জানিস ধারা, এইযে একটা অযৌক্তিক নাটক করছি আমরা, এটাতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমায় তুই আন্টি ডাকছিস, তোকে আমি বাইরের মেয়ে বলে পরিচয় দিচ্ছি, এর থেকে কষ্টের আর কিচ্ছু নেই। আমি ব্যর্থ।”
ধারা হাসল। স্বান্তনা দিয়ে বলল,
—” কষ্ট পাবেন না মা। আমার ভালোই লাগছে। এমনিতেও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকাকালীন পার্থক্য কোথায় ছিল? এমনই তো সব ছিল। শুধু আপনাকে মা ডাকতাম, এটুকুই। আপনি চিন্তা করবেন না। উনি যা চাইছে তা-ই হোক। এতে উনি খুশি থাকলে…আমিও খুশি।”
সালমা বেগম মুগ্ধ হলেন। হাজার তম বারের মত নিশ্চিত হলেন ধারার থেকে কেও শ্রাবণকে ভালো রাখতে পারবেনা। তিনি মাথা নাড়লেন। ধারা এবারে বলল,
—” আপনার ভাগিনা বেশ ভালো মানুষ মা। অনেক মিশুক, আর খোলা মনের। মনে একটুও বিষ নেই। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। স্বাভাবিকভাবে আমি কারো সাথে এত কথা বলিনা, কিন্তু উনার সাথে কথা বলে একটুও অস্বস্থি হয়নি আমার। বন্ধুর মত কথা বলেছেন। আবার উনাকে ভাই ডাকতেও অনুমতি দিয়েছেন। আমি যদি উনার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলি, আপনি কি রাগ করবেন?”
সালমা বেগম খুশি হলেন। দুদিকে মাথা নেড়ে আনন্দিত নয়নে বললেন,
—” মোটেই না। রাগ করব কেনো? নীল আসলেই খুব ভালো একটা ছেলে। ওর সাথে দু মিনিট কথা বললেই সব মন খারাপ পালিয়ে যায়। এত রসিক আর ভালো মানসিকতার ছেলেটা! বড় ভাইয়ের মতই দেখিস, কোনো সমস্যা নেই।”
ধারা মুচকি হেসে বলল,
—” আচ্ছা।”
কিছুক্ষণ থেমে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কিন্তু….তাহলে উনি কেনো এমন করল আমার সাথে?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সালমা বেগম,
—” কে?”
—” আপনার ছেলে।”
সালমা বেগম সতর্ক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
—” মানে? কী করেছে ও?”
ধারা অবুঝের ন্যয় দৃষ্টি রেখে বলল,
—” আমি নীল ভাইকে গেস্টরুমে পৌঁছে দেয়ার পর একটু গল্প করছিলাম। বেশ কয়েক মিনিট কথা বলে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি আপনার ছেলে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে ছিল। আমি তো ভাবলাম হয়তো আমার চেহারা দেখে উনার মেজাজ খারাপ হয়েছে। তাই চলে আসছিলাম, তখন উনি কী যেন বলল আমায়। আমি ভালো করে শুনিনি, কিন্তু গেস্টরুমে এতক্ষণ থাকতে আমার লজ্জা করেনি কেনো এমন কিছু বলেছে হয়তো। ইংরেজিতে গালিও দিয়েছে বোধহয়। খুব একটা বুঝিনি। এরপরই তো ঘরে গিয়ে দরজা আটকাল। আর বাইরেই আসেনি। ”
বলেই সালমা বেগমের দিকে কৌতুহলী নয়নে তাকাল ধারা। মলিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—” উনি এমন করল কেনো? আমি তো উনাকে আজকে একটুও বিরক্ত করিনি মা।”
সালমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ধারার প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু উত্তরটা মোটেও সহজ না। চোখের কোণে হালকা হাসি ফুটল তার। সেই হাসির ভেতরে যেন খানিকটা বুদ্ধি, খানিকটা কৌতুক, আর বেশ খানিকটা উপলব্ধি লুকিয়ে আছে। তিনি ধীরে ধীরে আরাম করে শুয়ে পড়লেন, বালিশে মাথা রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” সবকিছুর কারণ সবসময় বুঝতে হয় না রে মা। কিছু কিছু ব্যাপার না বুঝেই ছেড়ে দিতে হয়।”
ধারা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল। উত্তরটা তার মন ভরাল না একদমই। সালমা বেগম এবার পাশ ফিরে ধারার দিকে তাকালেন। চোখে মায়া, কিন্তু ঠোঁটে চাপা দুষ্টু হাসি।
—”তুই কি খুব ভয় পেয়েছিস?”
ধারা একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ল,
—”না…ভয় পাইনি। কিন্তু…খারাপ লেগেছে। মনে হলো আমি যেন খুব ভুল কিছু করেছি। উনি আমায় ইংরেজিতে গালি দিয়েছে মা!”
সালমা বেগম ফিক করে হাসলেন
—” কী বলেছে শুনি।”
—” কী যেন, ইডিয়ট ফিডিয়ট এমন কিছু।”
—” আরে বোকা, ওটা বাজে গালি না। তোকে ইংরেজিতে আহাম্মক বলেছে।”
সালমা বেগম আবারো হাসলেন। ধারা চুপ করে রইল। চোখ দুটো স্থির। আহাম্মকের মত কাজ কী করেছে তাই ভেবে পাচ্ছে না সে। কিছুক্ষণ থেমে সালমা বেগম হালকা গলায় অন্যরকম সুর এনে বললেন,
—” ধারা, শোন তুই একটা কাজ করবি?”
—”কি?”
—” শ্রাবণকে পাত্তা দিস না। এখন তো ও তোর কেও না। তুই হলি আমার বান্ধবীর মেয়ে, এ বাড়ির মেহমান। আপাতত যেহেতু আমরা অভিনয় করছি সবাই। তাই তুই আমার ছেলেকে পাত্তা দেয়া বন্ধ কর, ওকে ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। একদম ওর দিকে তাকাবি না, নীল সন্দেহ করতে পারে। ধরে নে শ্রাবণ এখন একজন পরপুরুষ।”
ধারা আঁতকে উঠল। বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে কথাগুলো শুনে ভাবল সত্যিই তো তাই। এই ভেবে সে সতর্ক হয়ে বলল,
—” আচ্ছা মা, খেয়াল রাখব! ”
সালমা বেগম আরো বললেন,
—” আর নীলের সাথে কথা বলবি। যেমন কথা বলছিলি, তেমনই। একদম স্বাভাবিকভাবে। ওর সাথে বেশ জমবে তোর। মনটাও ভালো থাকবে।”
ধারা একটু ইতস্তত করল। ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবতে থাকলো কিছু একটা। সালমা বেগম নিজে থেকেই বললেন
—”কি আজব তাইনা? আমি আবার নিজের বউমাকেই শিখিয়ে দিচ্ছি কীভাবে আমার ছেলেকে ইগনোর করবে।”
কথাটা শুনে ধারাও হাসল। সালমা বেগম একটু ভেবে বললেন
—” তবে ঠিকই আছে। তুই কাউকে অসম্মান করছিস না, খারাপ কিছু করছিস না। একটা ছেলের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলছিস, যাকে তুই ভাই ডাকছিস। এতে সমস্যা কোথায়? খারাপ কিছু দেখছি না আমি। আর বেচারা নীলও তো একা এসেছে, নতুন শহর। ওরও তো কাউকে দরকার কথা বলার জন্য। ছেলেটা ভালো, নইলে তোকে আমি ওর সামনেও যেতে দিতাম না!”
ধারা একটু নরম গলায় বলল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৮
—”হুম, ঠিক আছে।”
তারপর হালকা হাসল,
—” নীল ভাই সত্যিই ভালো মানুষ!”
সালমা বেগমের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল,
—”তাই তো বলছি।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল, রাতটা আরও গভীর হয়ে গেল। ধারা আবার সিলিংয়ের দিকে তাকাল। তার মাথায় এখনো ঘুরছে একটা প্রশ্ন— “উনি এমন করলেন কেন? কী এমন ভুল করেছে সে?” আর অন্যদিকে, খাটে শুয়ে থাকা সালমা বেগম চোখ বন্ধ করেও যেন সব দেখছেন। মনে মনে বিড়বিড় করলেন ভদ্রমহিলা,
—” আমার হতভাগা ছেলেটা…শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের হিংসার কাছে হার মানবে। এই দৃশ্যও আমায় দেখতে হবে ভবিষ্যতে। হায়রে কপাল।”
