শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩১
আফীফা আফনান
রাত নেমে এসেছে ধরনী জুড়ে। চারপাশ নিঝুম, স্তব্ধ। পদ্মা পারের শহর হওয়াতে বর্তামানে শহরের ওপর তখন এক স্নিগ্ধ, শীতল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে চরাচরের নিশিপ্রহর। রাতের মৃদুমন্দ হাওয়া আর অন্ধকার আকাশজুড়ে তারাদের নিঃশব্দ মেলা—সব মিলিয়ে চারপাশের প্রকৃতিতে এক গভীর প্রশান্তি।
কিন্তু পৃথিবীর এই সমস্ত স্নিগ্ধতা আর শান্ত পরিবেশের মাঝেও মেহুলের মনে বিন্দুমাত্র শান্তি ছিল না।
বিকেলের মলের সেই আকস্মিক ঘটনাটার পর থেকেই তার ভেতরটা যেন তোলপাড় করে জ্বলছিল। বহু বহু বছর পর নিজের রক্তের কাউকে এত কাছ থেকে দেখার যে তীব্র অনুভূতি, তা যেন তার বুক চিরে আছড়ে পড়ছিল। বাবার পরম আদরে আগলে রাখা সেই পুরোনো অ্যালবামের মুখটি আজ জীবন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তাকে হাত বাড়িয়ে সাহায্য করেছিল… কিন্তু মেহুল চাইলেও নিজের আত্মপরিচয় প্রকাশ করে সেই স্নেহের বুকে মাথা গুঁজতে পারেনি!
মনের এই দমবন্ধ করা ব্যাকুলতা আর গভীর দোটানা সহ্য করতে না পেরে আজ প্রথমবার ফ্ল্যাটের ছাদে উঠে এলো মেহুল। একটু খোলা হাওয়ার উদ্দেশ্যে।
নিঝুম ছাদটা একদম ফাঁকা। পটে আঁকা ছবির মতো বিশাল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মেহুল ছাদের রেলিংটা দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। রাতের হিমেল বাতাস এসে তার মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর মেহুল চোখ দুটো বুজে সেই অনুভুতির শেকড় থেকে বের হতে চাইছে। কিন্তু পারছে না অতঃপর একসময় সে একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলল।
চোখ বুজলেই বারবার ভেসে উঠছে ফুফু বিপাশা শিকদারের সেই ব্যাকুল দৃষ্টি! যে চোখে পরম মমতায় জড়ানো এক অদ্ভুত আত্মিক টান আর চেনা ব্যাকুলতা ছিল।
মেহুল মনে মনে কেঁদে উঠে ভাবল—‘আল্লাহ! এ কেমন পরীক্ষা আমার? যে রক্তের জন্য, যে শিকড়ের জন্য বাবা সারাটা জীবন ভেতরে ভেতরে তিল তিল করে কেঁদেছেন… সেই রক্তের এত কাছে এসেও আমাকে অচেনা সেজে দূরে সরে থাকতে হচ্ছে! আমি কী করব…?’
রাতের এই নিস্তব্ধতায় ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে মেহুলের চোখে তখন নিভৃত হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ…
এদিকে মেহুল যখন বিষণ্ণ হৃদয়ে ছাদের রেলিং ধরে নিঝুম আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত কারো ছুটে আসার শব্দে ছাদের নিরবতা ভেঙে গেল।
সে চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল—হুমা হাঁফাতে হাঁফাতে ছাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, আর তার পেছনেই আনুমানিক তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক অচেনা ভদ্রলোক। দুজনেই চরম তড়িঘড়ি করে ছাদ পর্যন্ত দৌড়ে এসেছে বলে ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছে।
দুজকে এভাবে দেখে মেহুল ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে শুধাল, “এভাবে হাঁফাচ্ছিস কেন হুমা? কী হয়েছে?”
হুমা ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে বুকে হাত দিয়ে বলল, “তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস মেহু! আমি তো নিচে তোকে না পেয়ে সারা বাড়ি খুঁজে খুঁজে হয়রান! ফোনটাও তো রুমে বেডের ওপর ফেলে রেখে এসেছিস।”
”কেন রে হুমা, কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?”
মেহুলের কথাটা শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে ভদ্রলোকটি ব্যাকুল কণ্ঠে আকুল হয়ে বলে উঠলেন, “আপনি নাকি ডাক্তার? প্লিজ একটু নিচে চলুন না! আমার আম্মা হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন… প্লিজ একটু দেখুন!”
কথাটা শোনামাত্রই মেহুলের ভেতরে থাকা কর্তব্যপরায়ণ চিকিৎসকের সত্তাটা মুহূর্তে জেগে উঠল। নিজের হৃদয়ের সমস্ত বিষাদ আর ব্যক্তিগত কষ্টগুলোকে এক নিমেষে দূর করে দিয়ে সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে ওনাদের পেছনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
পাশের বিল্ডিংয়ের তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে ঢুকতেই দেখা গেল মধ্যবয়সী এক নারী বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন, চেহারায় চরম অস্বস্তি। মেহুল তড়িঘড়ি হুমাকে দিয়ে নিজের ফ্ল্যাট থেকে জরুরি মেডিকেল কিট আনাল। হুমা আনতেই
মেহুল পরম যত্নে মহিলাটির পাশে বসে একের পর এক ব্লাড প্রেসার, পালস আর সুগার মেপে পুঙ্খানুপুঙ্খ চেকআপ শুরু করল। আর পাশে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ভদ্রলোক, ওনার স্ত্রী এবং হুমা।
পরীক্ষা শেষ করে স্ট্রেথোস্কোপটা নামিয়ে রেখে মেহুল সবাইকে আস্বস্ত করে মিষ্টিকণ্ঠে বলল, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওনার ব্লাড সুগার বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে আর সেই সাথে প্রেসারটাও হঠাৎ হাই হয়ে গেছে। এ কারণেই এত অস্বস্তি আর মাথা ঘোরার সমস্যাটা হচ্ছিল।”
ভদ্রলোকের স্ত্রী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “এখন কী করব ডক্টর?”
মেহুল প্রেসক্রিপশন প্যাডে দ্রুত কিছু জরুরি ওষুধের নাম লিখে বাড়িয়ে দিল, “ওষুধগুলো এখনই খাইয়ে দিন। আর ওনাকে এখন একদম শান্ত পরিবেশে প্রপার রেস্টে থাকতে দিন, কাল সকালে যেন একবার রেগুলার চেকআপের জন্য হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়।”
অতঃপর চিকিৎসার কাজ শেষ করে মেহুল আর হুমা যখন বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই ভদ্রলোকের স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে জোড়াজুড়ি শুরু করলেন—”আহা ডক্টর এত রাতে ডেকে এনে আপনাদের এত কষ্ট দিলাম! অন্তত একটু মিষ্টি আর নাস্তা না খেয়ে কিছুতেই যেতে দেব না।”
মেহুল মৃদু হেসে বিনয়ের সাথে না করতে গেলেও মহিলাটির নাছোড়বান্দা অনুরোধে শেষমেশ তারা এক কাপ করে গরম চা খেতে রাজি হলো।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকেই ভদ্রলোকের স্ত্রী কৌতুহলী হয়ে মেহুলকে জড়িয়ে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন—”আপা, আপনি কোন হসপিটালে আছেন? কতদিন হলো এই সোসাইটিতে এলেন?”
মেহুল নিজের সম্পর্কে খুব একটা কথা বলতে পছন্দ করে না, তাই সে মৃদু হেসে সংক্ষেপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পাশে থাকা চঞ্চল হুমা যেন পুরো সুযোগটা লুফে নিল! সে আগ্রহ নিয়ে চা-এর কাপ হাতে গল্প জমিয়ে তুলল—মেহুলের চট্টগ্রাম থেকে রাজবাটীতে পদার্পণ, এরপরে হাসপাতালের কাজের অভিজ্ঞতা আর মেহুলের মেধা ও সততার প্রশংসা করতে করতে এক নিঃশ্বাসে যেন অনেক কিছু বলে ফেলল!
এদিকে মেহুল শুধু পাশে বসে হুমার বাচ্চাদের মতো আগবাড়িয়ে কথামালা শুনে লাগল। অতঃপর একসময় চা খাওয়া আর গল্পগুজব শেষে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেহুল আর হুমা নিজেদের ফ্ল্যাটে যখন ফিরে এলো। রুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে মেহুল হুমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “তুই কি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেছিস হুমা? একদম অপরিচিত একটা মানুষের সামনে নিজেদের সব কথা এভাবে উজাড় করে বলতে হয়?”
হুমা এক গাল হেসে বলল, “আরে শান্ত হ মেহু! এরা তো আমাদের একই বিল্ডিংয়ের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীদের সাথে একটু সখ্য থাকা তো ভালো রে! বিপদ-আপদে দিনশেষে ওরাই তো আগে এগিয়ে আসবে, বল?”
মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সুসম্পর্ক ভালো। তবে এত বেশি সখ্যও ভালো নয়, হুমা। অতিরিক্ত প্রকাশে পরে হিতে বিপরীত হতে সময় লাগে না।”
মেহুলের কথার ভেতরের সূক্ষ্ম সাবধানবাণীটুকু বুঝতে পেরে হুমা আর কথা বাড়াল না, শুধু একটা বোবা হাসি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
পরদিন সকালে মেহুলের ব্যস্ততা যেন তুঙ্গে। আজ হাসপাতাল আর হুমার কিছু বিশেষ কাজের জন্য দুজনকেই একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। তাই রান্নাঘরে মেহুল নিজ হাতেই হুমাকে দ্রুত কাজে সাহায্য করে দিচ্ছে।
দুজন যখন থালাবাসন গুছানো আর নাশতার আয়োজনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই মূল দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
হুমা হাতের কাজ ফেলে গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে দেখল—গতকাল রাতের সেই অসুস্থ মধ্যবয়সী মহিলাটি আর ওনার ছেলের বউ হাসিমুখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন!
”আসুন, ভেতরে আসুন আন্টি! এখন কেমন আছেন?”—হুমা অমায়িক হেসে ওনাদের ভেতরে বসার ঘরে নিয়ে এলো।
ওনাদের বসতে দিয়ে হুমা আপ্যায়নের জন্য নাশতার কথা বলতেই মহিলাটি হাত উঁচিয়ে না করে দিলেন, “না না মা, নাশতা লাগবে না। আমি এখন মোটামুটি ভালো তাইতো আমরা এতো সকালে শুধু ডক্টর মেয়েটার সাথে একটু দেখা করতে আর কিছু কথা বলতে এলাম।”
জ্বী জ্বী অবশ্যই কথাটি বলেই হুমা আর দেরি না করে ভেতরের রুমে গিয়ে মেহুলকে ডেকে আনল। হুমা ডাকতেই মেহুল অ্যাপ্রোনটা গুছিয়ে হাসি মুখ নিয়ে ড্রয়িংরুমে এলো। পরম আদরে জিজ্ঞেস করল, “আন্টি! এখন শরীর কেমন লাগছে আপনার? মাথা ঘোরাটা কমেছে?”
”হাঁ মা, তোমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে রাত থেকেই একদম সুস্থ বোধ করছি,”—মহিলাটি অত্যন্ত গভীর নজর দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেহুলকে দেখতে লাগলেন। গতকাল রাতের মেয়েটিকে দেখেছেন আর তখন থাকে তার মনে এক সুপ্ত উদ্দেশ্য কাজ করছে—তার ছোট ছেলেটার জন্য এই সুন্দর, গুণবতী ডক্টর মেয়েটিকে তার পছন্দ হয়েছে। তাই তো আজ সকালেই তিনি বড় বউকে সাথে নিয়ে সোজা হাজির হয়েছেন বিয়ের প্রস্তাবের প্রাথমিক কথাবার্তা বলতে!
মহিলাটি বেশ উৎসাহ নিয়ে একে একে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “তা মা, তোমার দেশের বাড়ি কোথায়? পড়ালেখা কোথা থেকে শেষ করেছ? বয়স কত হলো তোমার… আর বিয়ে করেছ নাকি মা?”
মেহুল সৌজন্য বজায় রেখে হাসিমুখেই শান্তভাবে উত্তর দিল, “জি আন্টি, পড়াশোনা চট্টগ্রামেই। আর না, বিয়ে আমি করিনি।”
মেহুলের মুখে ‘বিয়ে করিনি’ কথাটা শোনার সাথে সাথেই মহিলাটির চোখ-মুখ আনন্দে চকচক করে উঠল! তার মনে হলো, এ যেন একদম পারফেক্ট একটা ম্যাচ! তিনি আরও কিছু মিষ্টি কথা বা বিয়ের প্রসঙ্গ তোলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ভেতরের রুম থেকে এক দুধের শিশুর সুতীক্ষ্ণ কান্নার শব্দ ভেসে এলো!
মহিলাটি চমকে গিয়ে নিজের ছেলের বউয়ের দিকে তাকালেন। বউটি তার দিকে তাকিয়ে অতঃপর অবাক হয়ে শুধাল, “বাচ্চার কান্নার শব্দ আসছে না ? এ বাড়িতে বাচ্চা এল কোথা থেকে?”
মেহুল আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে উঠে গিয়ে ভেতরের রুমে গেল। কিছুক্ষণ পর কোলজুড়ে শান্ত, শুভ্র রূপের দুআকে আগলে নিয়ে হাসিমুখে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো সে।
একজন অবিবাহিত ও সিঙ্গেল তরুণী মেয়ের কোলে এভাবে হুট করে এক ফুটফুটে বাচ্চা দেখে মহিলাটি আর ওনার ছেলের বউ যেন আকাশ থেকে পড়লেন! ওনাদের সমস্ত উৎসাহ মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। ওনাদের চোখ দুটো বিস্ময়ে আর অবিশ্বাসে গোল গোল হয়ে গেল।
মহিলাটি বুক কাঁপানো এক ধাক্কা খেয়ে কপালে হাত দিয়ে তীব্র কৌতুহল আর থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে উঠলেন, “মা… এই বাচ্চাটা কার?”
মেহুল বুকে জড়িয়ে থাকা দুআর মায়াবী গাল দুটোতে আলতো করে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী গলায় সোজা জবাব দিল—
”আমার বাচ্চা, আন্টি! আমাদের মেহেরবা দুআ।”
কথাটা শোনামাত্রই মহিলাটি আর ওনার ছেলের বউ হাঁ করে নিষ্পলক চোখে কতক্ষণ মেহুল আর ওই কোলের বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রইলেন! অবিবাহিত একটি মেয়ের ঘরে বাচ্চা রয়েছে—এই সত্যটি জানার পর ওনাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পাত্রী হিসেবে মেহুলকে পছন্দ করার সমস্ত স্বপ্ন এক নিমিষে চুরমার হয়ে গেল।
চরম অস্বস্তি, লজ্জা আর থমথমে মুখ নিয়ে ওনারা আর একটি কথাও বাড়ালেন না; বরং তড়িঘড়ি কোনোমতে আমতা আমতা করে ফ্ল্যাট থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন!
এদিকে মহিলাদের এমন আকস্মিক ও অদ্ভুত আচরণে বিদায় নেওয়া দেখে মেহুল আর হুমা কিছুটা অবাক হলো। তবে বিষাদ কিংবা কৌতূহলে সময় নষ্ট করার বিন্দুমাত্র সুযোগ আজ তাদের হাতে নেই। দুজনকেই দ্রুত নিজ নিজ গন্তব্যে বেরোতে হবে, তাই বিষয়টি নিয়ে আর অতিরিক্ত মাথা ঘামাল না তারা।
পুরো দিনটা মেহুলের বেশ স্বাভাবিক ও কর্মমুখর কাটল। আজ হুমার একটা বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকায় ছোট্ট দুআ সারাদিন মেহুলের কাছেই হাসপাতালে ছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কোলজুড়ে থাকা নিষ্পাপ রাজকন্যাটার অমায়িক মুখের দিকে তাকিয়ে সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই উবে গেল তার। এক অদ্ভুত ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে দিনশেষে মেহুল যখন নিজেদের আবাসিকের চত্বরে প্রবেশ করল।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘনিয়ে এলো অপ্রত্যাশিত এক ঝড়!
সোসাইটির মূল চত্বরে পা রাখতেই আচমকা একদল মহিলা এসে মেহুলের পথ আটকে দাঁড়াল। তাদের দেখেই মেহুল উৎসুক চোখে থমকে দাঁড়াল। সবাই একই সোসাইটির চেনা-পরিচিত মুখ, আর তাদের ঠিক মাঝখানেই বিষাক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন সকালে মেহুলের ফ্ল্যাটে যাওয়া সেই অসুস্থ মহিলাটিও।
হটাৎ করেই চারপাশের পরিবেশটা একমুহূর্তে থমথমে হয়ে উঠল। হঠাৎই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন প্রবীণ মহিলা চিবুক উঁচিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন—
“তা মেয়ে, শুনলাম তোমার নাকি বিয়েই হয়নি! তা এই বাচ্চার আমদানি হলো কোথা থেকে?”
আরেকজন বলে উঠলো,— “বিয়ে ছাড়াই পেট বাজিয়েছ নাকি! আজ কাল তো আবার এস ফ্যাশন।”
তীক্ষ্ণ, ধারালো কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের গায়ে।
এদিকে একজনের কথা শেষ হতে না হতেই পাশের জন মুখ টিপে কুৎসিত হেসে সায় দিলেন। সেই সাথে চোখের কোণে নোংরা ইঙ্গিত ফুটিয়ে যোগ করলেন, “আরে ভাবি, বোঝেন না কেন? আজকাল তো এসবই ট্রেন্ড! বিয়ে ছাড়া বাচ্চা। এখনকার মেয়েদের কি আর লাজ-লজ্জা, হায়া-শরম বলে কিছু আছে? বিয়ের আগে কত জনের সাথে যে… ছিঃ! ভাবতেই ঘেন্না লাগছে।”
কথা এখানেই থামল না। কলোনির জমে থাকা কুৎসিত আড্ডায় আরও একটু ঘি ঢেলে দিয়ে তৃতীয় আরেকজন মহিলা বলে উঠলেন, “ঠিক বলেছেন ভাবি। এই সব মেয়েদের জন্যই সমাজটা দিনদিন রসাতলে যাচ্ছে। এমন কলঙ্কিনী মেয়ে যদি এই কলোনিতে থাকে, তবে তো আমাদের নিজেদের মেয়েদের ওপরও এর খারাপ প্রভাব পড়বে। নষ্ট হতে কতক্ষণ!”
কথাটা শেষ করেই সেই মহিলা তীব্র অবজ্ঞায় চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডক্টর মেহুল ইকবালের দিকে। রীতিমতো জেরা করার সুরে চ্যাঁচাতে লাগলেন, “তা এই বাচ্চার জন্মদাতা কে, তা তো নিশ্চয়ই জানো? নাকি সেই খবরটাও রাখোনি?”
এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবার এই নোংরা, অপমানজনক কথাবার্তাগুলো একাই হজম করছিল মেহুল। অথচ এই নিথর ও শান্ত থাকাটা মেহুলের চেনা স্বভাবের সাথে বিন্দুমাত্র যায় না! পরিস্থিতি যদি আগের মতো হতো, তবে এতক্ষণে এই অনধিকার চর্চাকারী মুখরা মহিলাগুলোর সমস্ত ঔদ্ধত্য চূর্ণ করে হাতে ধরিয়ে দিত সে। বুঝিয়ে দিত তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পরিণাম কতটা ভয়ানক হতে পারে!
কিন্তু বর্তমানে তার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তার বাহুডোরে জড়িয়ে আছে এক পরম পবিত্র আমানত, বুকের ভেতর এক অন্য পৃথিবীর বিপুল দায়িত্ব।
পরিস্থিতি যখন চরম সীমা লঙ্ঘন করে বিষিয়ে উঠতে শুরু করল, তখন মেহুল আর নীরব থাকতে পারল না। তপ্ত ও কড়া জবাব দেওয়ার জন্য সে যেই না মুখ খুলতে যাবে—
অমনি, ‘উঁয়া-উঁয়া…’!
এক অদ্ভুত জাদুকরী সুধাময় শব্দে মেহুলের শ্রবণেন্দ্রিয় স্তব্ধ হয়ে গেল। এক অতি মৃদু, নিষ্পাপ কান্নার আকুল সুর ভেসে এলো তার কোল থেকে।
মুহূর্তেই মেহুলের জ্বলন্ত, রাগান্বিত আঁখিজোড়া নরম হয়ে নেমে এলো নিজের বাহুডোরের দিকে। সেখানে, সুতি কাপড়ের নরম ভাঁজে পরম শান্তিতে মুখ লুকিয়ে জড়িয়ে আছে এক ফোঁটা ছোট্ট, মোলায়েম এক প্রাণ—তার মেয়ে দুআ!
মুহূর্তের ভেতর মেহুলের জন্য যেন পৃথিবীর সমস্ত কুৎসিত কোলাহল, চারপাশের নোংরা মানসিকতা আর অপবাদগুলো এক পলকে ফিকে হয়ে গেল ওই মাসুম, মায়াবী মুখটার কাছে।
মেহুলের রক্তিম ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পরম ভালোবাসায় ভরা এক চিলতে অমায়িক হাসি। পরক্ষণেই নিজের তর্জনী দিয়ে অতি সাবধানে, পরম মমতায় সে ছুঁয়ে দিল শিশুটির তুলতুলে নরম গাল।
অতঃপর কলোনির ওই উৎসুক আন্টিমহলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে অত্যন্ত স্পষ্ট, ধীর অথচ তেজস্বী স্বরে মেহুল বলে উঠল—
“ওর বাবা কে, তা আমি জানি না। আর সেটা জানার কোনো প্রয়োজনও বোধ করছি না, আন্টি!”
আকস্মিক এই বাক্যে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আন্টিমহল যেন পায়ের তলার মাটি হারিয়ে ফেললেন! এক অবিবাহিত মেয়ের মুখে এমন নির্ভীক ও সোজা কথা!
একজন নাদুস-নুদুস গোছের আন্টি উত্তেজনার চোটে এক পা এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠলেন, “জানো না মানে? আমাদের সাথে ফাজলামো পেয়েছ? কেমন মেয়েছেলে তুমি যে নিজের সন্তানের বাপের নাম জানো না! তা এই পিতৃহীন জারজ বাচ্চাকে বড় করবে কীভাবে শুনি? সমাজ কোন চোখে দেখবে একে?”
‘জারজ’ শব্দটা কানে লাগতেই মেহুলের চোখের মণি দুটো আবারও চাবুকের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে জ্বলে উঠল! সে নিজের ডান হাত উঁচিয়ে সবাইকে থামার কঠোর ইশারা করল। তার সেই ক্ষিপ্র, গম্ভীর ও রাজকীয় ভীতিপ্রদ ব্যক্তিত্বের সামনে মুহূর্তেই পুরো চত্বর নিশুতি রাতের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল!
মেহুল কড়া চোখে সবার দিকে তাকিয়ে দাপুটে গলায় আওড়ালো—
“আমি ওকে জন্ম দিইনি আন্টি! সত্যি বলতে আমি ওকে কুঁড়িয়ে পেয়েছি, আমার স্রষ্টা আমাকে উপহার দিয়েছেন। তাই ওর বাপের পরিচয় আমি জানি না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ওর মা! এই পুরো পৃথিবীর চেয়েও পবিত্র ওর পরিচয়। ও আমার জান, আমার ‘পুঁচকু’…”
কথাগুলো বলে মেহুল কোলজুড়ে থাকা ছোট্ট প্রাণটির নড়তে থাকা কচি দেহটির দিকে পরম স্নিগ্ধতায় তাকাল। তারপর উপস্থিত বিষাক্ত জনতার দিকে এক ঝলক কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলে উঠল—
“আর আমার একমাত্র পরিচয়… আমি আমার এই কুট্টুসের আম্মি!”
চারপাশের পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকা জনতার ভিড়ে মেহুল তার আদরের ফুটফুটে বাচ্চাটিকে বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর সগর্বে, গটগট করে নিজের বিল্ডিংয়ের দিকে হেঁটে চলে গেল। আর পেছনে পড়ে রইল একদল হাঁ করে থাকা জ্যান্ত মূর্তি, যাদের এতক্ষণের নোংরা কুৎসার বিষাক্ত বেলুন এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বিজয়ের বেশে চলে গেল এক নির্ভীক মেহুল!
এদিকে বাসায় ফেরা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ফোঁস ফোঁস করে একাধারে বকে চলেছে হুমা। আজ সারাদিন নিজের ভীষণ জরুরি আর ব্যস্ত কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে তার বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাসার নিচে পা রাখতেই বিল্ডিংয়ের দারোয়ানের মুখ থেকে বিকালের সেই চত্বরের অপ্রীতিকর ঘটনার সবটা শুনে তার মেজাজ একদম তুঙ্গে উঠে গেছে! ফ্ল্যাটে ঢোকার পর থেকেই সে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের মুখ থামায়নি।
সোফায় পা তুলে বসে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হুমা বলল, “সমস্যাটা কী ওই অসভ্য মহিলাগুলোর বল তো? আমাদের লাইফ, আমি আর তুই যেভাবে ইচ্ছে লিড করব! তাদের তাতে এত মাথাব্যথা কিসের? আর কোন সাহসে তোকে নিচে ওভাবে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে অপমান করল?”
মেহুল রান্নাঘরের দিক থেকে ডাইনিং টেবিলে থালা গুছাতে গুছাতে অত্যন্ত শান্ত গলায় জবাব দিল, “ইচ্ছে হয়েছে, তাই বলেছে… তুই বাদ দে তো এখন!”
”কিসের বাদ দেব আমি?” হুমা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল, “তোকে নিয়ে তারা এত নিচু মানের, বাজে কথা বলবে কেন? আমার ফ্ল্যাট, আমার উপার্জনের টাকা, আমার জীবন! আমি কাকে নিয়ে থাকব না থাকব—এসব ভাবতে তাদের কে বলেছে শুনি?”
মেহুল ট্রেতে ভাতের ডিশটা নিয়ে এসে বলল, “আরে হুমা এবার শান্ত হ, আর তুই তো জানিসই আমি তো আর ওদের কথা গিলে ঘরে ফিরিনি! যা বলার স্পষ্ট ভাষায় কড়া উত্তর দিয়ে তবেই এসেছি।”
হুমা তা-ও শান্ত হলো না, কপালে হাত দিয়ে আফসোস করে বলল, “উফ! কেন যে আমি আজ তোর সাথে ছিলাম না! আমি থাকলে আজ একেকটার জুতো দিয়ে মুখ ঘসে দিতাম, বুঝতো তখন!”
হুমা বকতেই থাকল, তার রাগের কোনো ইতি টানা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে মেহুল জোর করে তাকে টেনে এনে ডাইনিং টেবিলে ভাত খেতে বসাল। মেহুল নিজে আজ সময় বের করে যতখানি পেরেছে বেশ গুছিয়ে কয়েক পদের রান্না করেছে। কিন্তু থালায় খাবার নিয়েও হুমার রাগ যেন কমছিল না, সে প্রতিটা লোকমা মুখে নেওয়ার সাথে সাথে ওই মহিলাগুলোর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগল।
একসময় দুজনের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। মেহুল আর হুমা যখন থালাবাসন আর টেবিল গুছিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই ভেতরের রুম থেকে দুআর সুতীক্ষ্ণ কান্নার সুর ভেসে এলো।
আর শব্দ পেয়ে হুমা সাথে সাথে মেহুলের হাত থেকে ডিশগুলো নিজের হাতে নিয়ে নিয়ে বলল, “তুই গিয়ে পুঁচকুকে সামলা মেহু, টেবিল আর কিচেন আমি গুছিয়ে রাখছি।”
মেহুল আর দ্বিধা না করে তড়িঘড়ি নিজের রুমে চলে গেল। ঘরে গিয়ে দেখল দুআ কোলবালিশের একপাশে হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদছে। মেহুল মমতাভরে তাকে কোলে তুলে নিল, তারপর হালকা গরম ফিডারে দুধ বানিয়ে তাকে খাইয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল। পুঁচকুটা পেট ভরে দুধ খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার নিঝুম ঘুমে তলিয়ে গেল।
ঘুমাতেই মেহুল তাকে বিছানার মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে সাবধানে শুইয়ে দিল। তারপর পাশের টেবিল থেকে ল্যাপটপটা টেনে এনে কোলে নিয়ে খাটে বসল। হাসপাতালের কিছু জরুরি পেশেন্ট হিস্ট্রি, কেস স্টাডি আর নিজস্ব গবেষণার কিছু কাজ বাকি পড়ে ছিল।
ঘড়ির কাঁটা তড়তড় করে এগিয়ে চলল। রাতের নিস্তব্ধতায় শুধু ল্যাপটপের কিবোর্ডের খটখট শব্দ ভেসে আসছে। এভাবে প্রায় অনেকটা রাত গড়িয়ে যখন শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল।
মেহুল ল্যাপটপের সব ফাইল সেভ করে, ল্যাপটপটা বন্ধ করে ঘুমানোর উদ্দেশ্যে শুতে যাবে—ঠিক তখনই মিষ্টি দুআ হঠাৎ তার পিটপিটে দুটি মায়াবী চোখ মেলে জেগে উঠল!
জেগে উঠেই সে দু-হাত ছড়িয়ে খেলবে আর কোলে উঠবে বলে ফাজিল ভঙ্গিতে শব্দ করতে শুরু করল।
মেহুল তাকালো দৃশ্যটা দেখে একটা মিষ্টি নিশ্বাস ফেলে হেসে ফেলল সে। আজ আর তার ঘুমানো হলো না! অতঃপর শান্ত ভঙ্গিতে দুআকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতায় পুরো রুমজুড়ে ধীরে ধীরে পায়চারি করতে শুরু করল সে।যাতে হুমার ঘুম না ভাঙে…
এদিকে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা তখন পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে নিয়েছে। ঘরের ভেতরের আবছা আলোর মায়াজাল আর জানালার বাইরে রাতের হিমেল হাওয়া। শেষপ্রহরে ঘুম না আসায় মেহুল তার ছোট্ট কলিজার টুকরো দুআকে কোলে নিয়ে এসে বসল জানালার পাশের সেই কাঁচের মুখোমুখি।
রাতের সেই স্নিগ্ধ জানালার পাশে বসে, কোলের অবুঝ শিশুটির দিকে চেয়ে নিজের জীবনের জটিল প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির সমীকরণগুলো যেন নিঃশব্দে কষতে শুরু করল মেহুল। জীবনের কত শত ঝড়, কত না-পাওয়ার বেদনা আর অতীত আক্ষেপ ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে!
হঠাৎই মেহুল গভীর ভালোবাসায় কোলের পুঁচকু দুআর তুলতুলে গাল দুটোতে নিজের নাক ঠেকিয়ে পরম মমতায় ফিসফিস করে বলে উঠল—
”জানিস পুঁচকু… আমি তোকে খুব আদরে বড় করব! খুব আদরে… কখনো কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র অভাব তোকে স্পর্শ করতে দেব না। নিজের গর্ভে জন্ম না দিয়েও যে নিঃস্বার্থ মা হওয়া যায়, আমি পৃথিবীর বুকে তা প্রমাণ করব! সবাইকে দেখিয়ে দেব—মেহুল ইকবালও একজন সার্থক মা হতে পারে… ঠিক যেমনটা হয়েছিল আমার মোহনা মা!”
কথাটা বলতে বলতেই মেহুলের বুক চিরে একটা দীর্ঘ তপ্ত নিশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে একপলক জানালার বাইরের ঘুটঘুতে আঁধারের দিকে তাকিয়ে, তারপর আবার দুআর নিষ্পাপ মায়াবী মুখের দিকে নজর ফিরিয়ে এক চিলতে মুচকি হাসল। অতি করুণ অথচ তীব্র ভালোবাসায় ভরা সেই হাসি।
মেহুল ধীর ও ভারি গলায় আওড়ালো—
”সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত তোর আর আমার জীবনের ভাগ্যটা একই বিষাক্ত কালিতে লিখেছেন পুঁচকু… তাই তো এত বড় পৃথিবীর ভিড়ে আমাদের দুজনের এমন অলৌকিক দেখা হওয়া।যের পরিহাসে তোর পরিবার তোকে ডাস্টবিনে ফেলে এসেছিলো। আর আমাকে কোথায় ফেলেছিলো বলতে পারবি?
মেহুল একটু থামল। তার গলার স্বর কান্নায় ভিজে ভারী হয়ে এলো। সে বাচ্চার কচি থুতনিতে নিজের আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল—
”আমাকে ফেলে রেখেছিল এক বিচ্ছিরি নর্দমার কালো নোংরা ময়লার ভেতর! তবুও দেখ… মরিনি আমি, একদম বেহায়ার মতো বেঁচে আছি আজও! জানিস… সেদিন হয়তো আমিও মরেই যেতাম, হয়তো রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুর-বিড়ালগুলো এসে আমার মাংস খুবলে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ফেলত! যদি না আমার বাবা ঠিক সময়ে সেখানে গিয়ে পৌঁছাতেন…”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩০
বলতে বলতে মেহুল নিজের ফর্সা থুতনির দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল। সেখানে অতি সূক্ষ্ম একটি কেটে যাওয়ার পুরনো দাগ স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।
মেহুল বাচ্চার নিষ্পাপ মুখের ওপর নত হয়ে মৃদু হেসে ফিসফিস করল—
” এই যে দেখ… আমার এই থুতনিতে যে ছোট কাটা দাগটা দেখছিস না? এটা সেই অন্ধকার স্মৃতিরই একমাত্র জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী! এক ভয়াবহ, নিষ্ঠুর বাস্তবতা ভরা স্মৃতির নির্মম চিহ্ন……যা আমি আজও বহন করে চলি।”
