সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৭ (২)
জাবিন ফোরকান
গোঁজামিল, গোঁজামিল, গোঁজামিল
সারাটা জীবন যে পাইলা গোঁজামিল
তোমারে সত্যিকার প্রেমের নামে
দিয়া দিসে বড় গোঁজামিল~
আয়দানের গাওয়া গানের কথাগুলো একনাগাড়ে বেজে চলেছে আমার মাথায়। রিরি করে কাঁপছে সমস্ত শরীর। যেকোনো মুহূর্তে ব্লাস্ট হতে পারি। সন্দেহ নেই আর কোনো। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে অপদস্থ করতেই আয়দান এখানে এসেছে।
কি ভেবেছ চান্দু? আমি তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেব নাকি? তোকে চব্বিশ বাটি ঘোল না খাওয়ালে আমার নাম সাবিন হুসেইন না!
আয়দানের কান্ডকারখানা সমাপ্ত হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। জায়দান তাকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে কি যেন বলছে। দূর থেকে আমি শুধু আয়দানের ঠোঁটের শয়তানি হাসি দেখতে পাচ্ছি। ওই ঠোঁটে ঝামা না ঘষলে আমার শান্তি হচ্ছেনা আজ আর।
হনহন করে হেঁটে কাউন্টারের কাছে পৌঁছালাম আমি। নিচ থেকে বের করে নিলাম বিশেষভাবে প্রস্তুত করে রাখা ছোট্ট ট্রেখানি। মিষ্টির সমাহার, ছোট ছোট লাড্ডু। নীলচে বর্ণের, উপরে সুগার পাউডার ছিটিয়ে রাখা। নিজের নাকের কাছে তুলে সুঘ্রাণ গ্রহণ করলাম প্রাণভরে। মোক্ষম অস্ত্র আমার।
চান্দু, তুমি যদি চলো পাতায় পাতায়, আমি চলি তোমার শিরায় শিরায়।
বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেলেদুলে এগিয়ে গেলাম অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দান এবং আয়দানের দিকে। জায়দানের শান্ত অথচ খানিকটা বিচলিত কন্ঠস্বর কানে এলো,
“সিন ক্রিয়েট হওয়ার আগে আমার সাথে চলো। তোমায় আমি বলেছিলাম, ভদ্র হয়ে থাকতে না পারলে আসার প্রয়োজন নেই। এমন বেহায়াগিরি করে কাকে কি বোঝাতে চাইছ তুমি?”
আয়দান মাথা হেলিয়ে বুকে হাত বেঁধে পরোয়াহীন উদাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন জায়দানের কথাবার্তা তার এক কান দিয়ে ঢুকছে এবং অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
“আমার কথা কানে যাচ্ছেনা বোধ হয়। বেশ, বাসায় চলো এক্ষুণি।”
জায়দান ছোট ভাইকে একপ্রকার আদেশ করে উল্টো ঘুরছিল ঠিক তখনি আমি সামনে উপস্থিত হলাম। একটুর জন্য আমাদের মাঝে ধাক্কা লাগলোনা। বিস্তর এক হাসি ফোটালাম আমি ঠোঁটে।
“এত যাই যাই করছ, এখানে ভালো লাগছেনা বুঝি? কাউকে মিস করছ? আমি আরওয়াকে ইনভাইট করেছিলাম, উনি এলেন না, ব্যস্ত বোধ হয়।”
আমার কথা শুনে জায়দান থ হয়ে গেল। মুখভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলেও ওই দৃষ্টির মাঝে একপ্রকার ক্লান্তিবোধ ফুটে উঠল। নিজের কপালে আঙুল ঘষে প্রাক্তন আমার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল,
“দেখো সাবিন। আমি এই মুহূর্তে ঠিক ঝগড়ার মুডে নেই।”
“মিলাদের মিষ্টি।”
তার কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ট্রেটি তুলে ধরলাম আমি। সামান্য একটু ভ্রু তুলে ট্রের দিকে চেয়ে রইল জায়দান। তবে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি সাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালাম, তাকালাম আয়দানের দিকে। আমার হাসি বিস্তৃত হলো তিনগুণ।
“কিন্তু তুমি তো মিষ্টি খাওনা, আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুই নাহয় একটু মিষ্টিমুখ করুক?”
প্রাণপ্রিয় বন্ধু—শব্দটায় অস্বাভাবিক জোর দিলাম। স্পষ্টত দেখলাম, আয়দানের চেহারায় এক অদ্ভুতুড়ে ঝিলিক খেলে গিয়েছে। লম্বা পায়ে মাত্র এক কদমেই বরাবর আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল বান্দা।
“অবশ্যই প্রাণপ্রিয় বান্ধবী আমার!”
তীক্ষ্ণ চোখজোড়া আয়দানের আমাকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে শেষমেষ আমার চোখে এসে থামল। অতঃপর গিয়ে পড়ল আমার হাতে ধরে রাখা ট্রের উপর।
“নীল লাড্ডু জীবনে এই প্রথমবার দেখলাম! থ্যাঙ্কস!”
অত্যন্ত আয়েশ করে প্লেট থেকে একটি ছোট লাড্ডু তুলে সম্পূর্ণটাই মুখে পুরে দিলো আয়দান। ঠোঁটের চওড়া হাসি লেপ্টে মাড়ির দাঁতের মাঝে মোক্ষম কামড় বসালো। আমি বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে চেয়ে রইলাম।
“উম, মানতেই হচ্ছে, মিলাদের মিষ্টি খেয়ে দোয়া করলাম, তোমার সুন্দর ব্যবসা যদি কয়েক দিনে লাটে না ওঠে, জ্বলে পুড়ে খাক না হয়, তাহলে আমাকেই….!!”
হঠাৎ করেই আয়দানের মুখ জমে গেল। চিবানো বন্ধ করে আমার দিকে প্রসারিত দৃষ্টি মেলে তাকাল। যেন আচমকা বজ্রপাত হয়েছে তার মাথায়। চোয়াল স্থির হয়ে গেল, ঠোঁটের চওড়া হাসি এক নিমিষে উধাও হল।
এক সেকেন্ড…দুই সেকেন্ড…তিন সেকেন্ড।
চার সেকেন্ডের মাথায় আয়দানের ছ ফুটি দানবিক শরীরটা ফ্লোরে আছড়ে পড়ল ধপাস করে। ঝটকা দিতে লাগলো মৃগী রোগীর মতন। কাদার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা কেঁচোর মতন কিলবিল করতে লাগলো। হাত পা বাঁকা হয়ে এলো হলিউড মুভিতে দেখানো জম্বিদের আদলে।
জায়দান একনজর আয়দান আর একনজর আমার হাতের প্লেটের নীল লাড্ডুর দিকে তাকাল।
“দ্যা হেল?”
মেঝেতে কিলবিল করে হড়বড় করে বমি করতে উদ্যোগী হওয়া আয়দানকে দেখতে দেখতে মহা উদ্দীপনায় হেসে আমি প্লেটটা জায়দানকে দেখিয়ে জানালাম,
“ব্ল্যাক ডেথ, পৃথিবীর সবথেকে টক ক্যান্ডি। আমার ৮ টা হাজার টাকা গচ্চা দেয়া আজ স্বার্থক!”
“ইয়াক…ইয়াক…আহহহহহক্ক….!”
দুহাতে গলা চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল আয়দান। যেন বৈদ্যুতিক শক দেয়া হচ্ছে তাকে, এমন ভঙ্গিতে ঝটকার উপর ঝটকা দিচ্ছে তার শরীরটা। থু করে ক্যান্ডিটুকু বাইরে ফেলে দিল আয়দান। অবস্থা বেগতিক লক্ষ্য করে জায়দান হাঁটু গেড়ে বসতে যেতেই তার হাত ধরে ফেললাম আমি।
“কুলাঙ্গার ভাইয়ের জন্য এত দরদ না দেখালে সূর্য একদিন পশ্চিম দিকে উঠবেনা।”
ক্যাফের ভেতরে থাকা কয়েকজন থমকে গিয়েছে দৃশ্য লক্ষ্য করে। অনেকে আবার মুখ টিপে হাসছে। আমি ইশারা করতেই দুজন স্টাফ দৌঁড়ে এলো দ্রুত, আয়দানকে ধরল।
“মিরগী ব্যারামের রোগী। ধরে নিয়ে গিয়ে জুতা-মোজা শোঁকাও সবাই ধরে ধরে। যাও।”
যদিও আয়দানের অবস্থা দেখতে ভীষণ রকমের আনন্দ হচ্ছিল, তবে এটি ঠিক উল্লাসে গা ভাসানোর সময় নয়। তাই জায়দানকে টেনে নিয়ে গেলাম, ক্যাফের ভেতরের প্রাইভেট রুমে।
১০ মিনিট পর।
প্রাইভেট রুমটা মূলত তৈরি করেছিলাম ক্যাফেতে যদি মাঝে মধ্যে খুব বেশি সময় লাগে, তাহলে যেন থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। তাছাড়া, বিশ্রামেরও একটা ব্যাপার আছে। কফি মেশিনে রোস্টেড কোকোবিন দিয়ে কফি তৈরী করতে করতে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে আছি আমি। অপরদিকে জায়দান কিছুটা অস্থির। চেয়ার টেনে বসতে বললেও সে বুকে দুবাহু বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে এবং চারপাশ চোখ ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
“আয়দানের সঙ্গে তুমি ঠিক করনি।”
জায়দানের হঠাৎ মন্তব্যে আমি ক্ষণিকের জন্য থামলাম। ভ্রু কুঁচকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালাম পাশে,
“মানে? তোমার ভাই আমার সঙ্গে যা করছিল, সেসব ঠিক করছিল?”
“কুকুর কামড়ালে কি তুমিও কুকুরকে কামড়াবে?”
“হ্যাঁ।”
জায়দান এতক্ষণ যাবৎ একপাশের শেলফের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমার উত্তর শুনে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল। চশমার অন্তরালে বাদামী নয়নজোড়াকে জ্বলজ্বল করে উঠতে দেখলাম আমি।
“কুকুর যখন খুব বেশি বাড় বেড়ে যায়, তখন সেটাকে শিক্ষা দেয়ার দরকার আছে। নাহলে কুকুর মনে করে, একমাত্র তার দাঁতই ধারালো!”
শব্দ করে কফি মেশিন বন্ধ করলাম। মগ রাখতেই তরল ব্ল্যাক কফি ক্রমশ জমা হতে আরম্ভ করল মগের ভেতর। সেদিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা দুজনই। জায়দান নিঃশব্দ, অপরদিকে আমিও।
দীর্ঘ নীরবতা। আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠেছে। বুঝলাম না কেমন অনুভব করছি। রাগ? ক্রোধ? ভয়? আতঙ্ক? সংকোচ? বিশ্লেষণ করা কষ্টসাধ্য। জায়দান আমার প্রতি আর তেমন কোনো বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে নীরবে কফির মগ তুলে নিলো। দীর্ঘ এক চুমুক দিল। চশমায় গরম কফির বাষ্প ঠেকতেই সেটি এক হাতে খুলে নিয়ে কাউন্টারের উপর রাখল।
“তুমি কি ইনভাইটেশন কার্ডটা খুলে পড়েছিলে?”
প্রশ্নটা অবশেষে উচ্চারণ করেই ফেললাম। জায়দান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। কাউন্টারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কফির মগে মনোযোগ দিল। ভ্রু কুঁচকে ফেললাম আমি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললাম,
“আমি তোমায় কিছু জিজ্ঞেস করেছি, জায়দান।”
“এমন প্রশ্নের কেমন উত্তর দেয়া উচিত, আমার জানা নেই।”
হালকা হাসি ফুটলো আমার ঠোঁটে। জায়দান সরাসরি আমার চোখের দিকে আর তাকাচ্ছেনা। যা বোঝার, আমি বুঝতে পেরে গিয়েছি।
“আমি কিন্তু ওটা মজা করে লিখিনি।”
বলে উঠলাম, তাৎক্ষণিক জবাব এলো প্রাক্তনের পক্ষ থেকে,
“আমি কখন বললাম তুমি মজা করেছ?”
“তাহলে তুমি ধরতে পেরেছ নিশ্চয়ই, আমার উদ্দেশ্য?”
“তোমার উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার মতন সময় এবং ইচ্ছা কোনোটাই আর নেই আমার।”
জমে গেলাম আমি। চোয়াল ফাঁক হলো বিস্ময়ে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম জায়দানের দিকে। নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালো সে, যেন ইচ্ছাপূর্বক আমাকে শোনানোর উদ্দেশ্যেই সে মৃদু আঁচে বললো,
“দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমার এবার সত্যিই যেতে হবে। শুভকামনা তোমার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য। এখন থেকে তুমি তোমার পথে এবং আমি আমার পথে। আশা রাখছি, আর কখনো আমাদের পথ এক হওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা।”
কফি শেষ করার দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলো সে। আমি জানি এরপর কি আসতে চলেছে। ছোট্ট একটা ধন্যবাদ এবং প্রস্থান। জায়দান যে নিজের কথার উপর অটল, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানেনা। সে যখন বলেছে, তখন আমার সামনে অপেক্ষমাণ ভবিষ্যত এটাই।
এটাই হওয়া উচিত। আমাদের দুজনের পথ আলাদা হওয়াটা শ্রেয়। সবকিছুর সহজ সমাধান, নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন জীবনে মনোযোগ দেয়া। জায়দান নিজের মতন এবং আমি আমার মতন। গল্পটা এমন হলেই ঘটবে স্বাভাবিক সমাপ্তি।
কিন্তু এই গল্পটা আমার। আর এই গল্পের সমাপ্তি লেখার দায়িত্বও আমার। লেখকের নয়। আমি গল্পের সেই চরিত্র, যে নিজেকে নিজে লিখে যায়, আমার গল্পে লেখক ক্ষমতাহীন।
সমাপ্তির ওপাড়ে আফসোসের অস্তিত্ব মুছে ফেলা বাঞ্ছনীয়। আমি দুঃসাহসী, আমি নিজের অনুভূতি গোপনে না রেখে প্রকাশ করতে জানি। যদি হয় তবে হোক না হৃদয়ে ভাঙন? এই ভাঙনে ভয় কিসের?
“জায়দান….”
নিজের কন্ঠস্বর নিজেই চিনতে পারলাম না আমি। এতটাই গভীর এবং অনুভূতিসম্পন্ন শোনালো। একপাশে দাঁড়ানো সুউচ্চ টাওয়ার সদৃশ প্রাক্তনকে স্পষ্টত স্থির হতে দেখলাম। ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, তার মুখোমুখি।
“মানুষ স্মৃতির প্রেমে পড়ে, ভালো লাগার প্রেমে পড়ে, পুরুষের প্রেমে পড়ে, নারীর প্রেমে পড়ে, প্রাণীর প্রেমে পড়ে। এই প্রেমে পড়ার কোনো শেষ নেই।”
এক পা অগ্রসর হয়ে ঘাড় টানটান করে ওই বাদামী সমুদ্রমাঝে নিক্ষিপ্ত করলাম নিজের প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টি।
“আমি প্রেমে পড়েছি আমার প্রাক্তনের, আমার অবহেলায় ফেলে দেয়া দাম্পত্য জীবনের।”
এক সেকেন্ডের বিরতি, অপরপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার সময়টুকুও পেলনা। এর আগেই আত্মবিশ্বাসী গলায় বললাম,
“চলো প্রেম করি।”
আমার মুখ থেকে বাক্যটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে জায়দানের মুখ থেকে ছিটকে সকল কফি বেরিয়ে গেলো। সেসব ছিটে এসে পড়লো আমার পরনের টপের উপর। বেচারা কাশতে কাশতে চোখে আঁধার দেখছে বোধ হয়। চেহারা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে খেয়াল করে রুমাল বের করে মুছিয়ে দিতে লাগলাম। কিন্তু জায়দান আমার কব্জি পাকড়াও করে ফেললো। এত জোরে চেপে ধরলো যে হাড়ে গেঁথে গেলো তার নখর।
জীবনে এই দ্বিতীয়বার জায়দানের সদা নির্লিপ্ত চেহারায় তীব্র আক্রোশ এবং বিস্ময়ের সংমিশ্রণ দেখতে পেলাম আমি।
“তোমার মাথা ঠিক আছে, সাবিন? এসব কি উল্টোপাল্টা কথা বকে বেড়াচ্ছ তুমি?”
কেন যেন ভীষণ রাগ হলো আমারও। একটা ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রুমাল জায়দানের মুখ বরাবর ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
“তুমি মনের সাথে লুকোচুরি খেলতে পারলেও আমি পারিনা। ঠিক আছে? আমাদের মাঝে এতকিছু হয়ে গেলো, এরপরও যদি তোমার টনক না নড়ে থাকে তাহলে বলব তুমি চোখ থাকিতে অন্ধ! উপস, তোমার তো আগে থেকেই চশমা আছে! আরেকটা লাগাও!”
“তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইছ?”
“না। প্রেম করতে চাইছি। যেটা বিয়ের আগে আমার ভন্ড মাথা আর বিয়ের পর তোমার বাবু ইস্যুয থাকা আম্মাজানের জন্য করতে পারিনি।”
“ইউ আর ইনসেইন উইম্যান! আই অ্যাম ইওর ড্যাম এক্স হাসব্যান্ড!”
ক্ষীপ্র গতিতে এগোলো আমার হাত। জায়দানের কলার ধরে পাকড়াও করে এক টানে নিজের মুখ বরাবর নুইয়ে আসতে বাধ্য করলাম বান্দাকে। ছিটকে যাওয়া কফির ক্ষীণ ধারা তখনো গড়াচ্ছে তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে। সেই পানে চেয়ে সুগভীর গলায় জানালাম,
“আর আমি সেই মেয়ে যার ঠোঁটের রং তোমার ঠোঁটে আষ্টেপৃষ্টে লেপ্টে আছে। কোনো ওলোলে আলেওয়ালা ডিটারজেন্ট দিয়ে ঘষেও এই রং ওঠাতে পারবেনা।”
জায়দানের মতন মানুষকে বিস্ময়ে হতভম্ব করে দিতে পেরেছি। এর চাইতে বড় বিজয় কি আর হতে পারে? বাঁকা হাসলাম, ওই বাদামী অশান্ত দৃষ্টিতে গেঁথে গেলো আমার নিগূঢ় দৃষ্টি,
“সকলে বিয়ের আগে প্রেম করে, নয়ত বিয়ের পর। আমরা নাহয়, ডিভোর্সের পর প্রেম করব? নতুন ইতিহাস নয় কি তা, মাই ডিয়ারেস্ট হার্ট অ্যাটাক?”
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৭
স্তব্ধ জায়দান। সত্যিই আজ স্তব্ধ সে। চোখেমুখে উপচে পড়া অনুভূতির জোয়ার। বিস্ময়, শঙ্কা, ক্রোধ সবকিছুর সংমিশ্রণ। এত ধরনের মাঝে আমি নজর হাতড়ে একটুখানি ভালোবাসা খুঁজলাম।
“আমি তোমার মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছি, ভালোবাসা কাটলেও মায়া কাটানো যায়না, জায়দান। ”
জবাব এলোনা এই ঘোষণার। এলো শুধু বাদামী সমুদ্রে ভীষণ জলোচ্ছ্বাস।
