Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২২

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২২

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২২
জাবিন ফোরকান

অ্যাপার্টমেন্টটি নীরব, জনশূন্য। আসবাবের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। দরজার কাছে জুতা রেখে মীরা ভেতরে ঢুকতে নিতেই আয়দান প্রথমে হাঁটু গেঁড়ে বসে তার পায়ে স্লিপার্স গলিয়ে দিল।
“টাইলসের মেঝে ভীষণ ঠান্ডা।”
প্রেমিকের এই যত্নটুকু একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে গেল মীরার। মৃদু লাজমাখা হাসিতে অধর মেতে উঠল তার। উঠে দাঁড়িয়ে আয়দান লাইট জ্বালালো। হলুদাভ বাতির মিষ্টি আভা ছেয়ে গেল লিভিং স্পেসজুড়ে। পরনের হুডি এক টানে খুলে ফেলে আয়দান এগোল কিচেনের দিকে।
“মেইক ইওরসেল্ফ কমফোর্টেবল।”

মীরা নিজের হ্যান্ডব্যাগ কাউচে রেখে আশেপাশে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগল। গুলশানের মতন এলাকায় এমন একটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য কোটির ঘরে হবে। তার প্রেমিকের জন্য অবশ্য বিষয়টি খুব বেশি কঠিন নয়। সে নিজেই জানিয়েছিল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদে আছে, পরিবারও বেশ ধনী এবং প্রভাবশালী। কিভাবে অভিজাত জগতের এমন একজন মানুষের সঙ্গে তার জীবন জুড়ে গিয়েছে মীরা খুঁজে পায়না।
ব্র্যাকের কথা মনে পড়তেই হঠাৎ সাবিন মাথায় এলো। কথায় কথায় হয়ত জেনেছিল, তার প্রাক্তন স্বামীও এমন কোন পদে আছে। যদিও নামটা জানা হয়নি। সাবিন কোনোদিন নিজে থেকে তার প্রাক্তনের সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলেনি, মীরাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কখনও জিজ্ঞেস করেনি। কারণ ওই বিষয়টা সাবিনের একটা কষ্টের জায়গা। একবারই ঢাকা মেডিকেলে তার প্রাক্তন স্বামীকে দেখেছে মীরা। ওইটুকুই।
“তুমি তো বাংলা নিয়ে পড়, তাই ভাবলাম তুমিই আমাকে সবথেকে ভালো সাহায্য করতে পারবে।”
পিছন থেকে কন্ঠস্বরটি ভেসে আসতেই মীরা পিছন ফিরে দেখল আয়দান কিচেন থেকে ফিরে এসেছে। হাতে দুই গ্লাস লেমনেড। শীতের মাঝেও এমন শরবত খেতে খারাপ লাগবেনা, কারণ মীরার গলাটা শুকিয়ে আছে। মোলায়েম হেসে প্রেয়সীর হাতে একটি লেমনেডের গ্লাস ধরিয়ে দিল আয়দান। প্রাণভরে তাকে চুমুক দিতে দেখে জানাল,
“আসলে বিদেশেই পড়াশোনা হয়েছে। তাই বাংলা বিষয়টায় অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছি। রিসেন্টলি স্টুডেন্টদের একটা বাংলা নির্ভর প্রজেক্ট লিড করতে গিয়ে দেখলাম, অনেক ঘাঁটতি আমার জ্ঞানে। তখনি মনে পড়ল, আমার একটা কিটেন আছে।”

মীরার গাল দুটো লাজবোধে লাল হয়ে উঠল। গলা খাঁকারি দিয়ে সে দ্রুত বলল,
“অবশ্যই। আমি তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করব, জায়দান। তবে তার আগে বলে রাখি, তুমি কিন্তু ভীষণ সংসারী! লেমনেড দারুণ হয়েছে।”
“তাই বুঝি?”
মীরা সম্মতিসূচক মাথা দোলালো। আয়দান স্থির চেয়ে রইল তার দিকে। লেমনেডে সিক্ত ঠোঁটদুটো কোমল আভায় চিকচিক করছে। মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝুঁকে এলো সে, নিজের জিভে ছুঁয়ে দিল ওই ঠোঁট। শিউরে উঠল মীরা, জমে গেল সম্পূর্ণ। আয়দান তাকে ছাড়লনা। সময় নিয়ে নিজের জিভ বুলিয়ে গেল ওই ঠোঁটের ভাঁজে, শুষে নিল লেমনেডের বিন্দু সকল। অতঃপর যখন সে বাঁকা হাসি মেখে মুখ ফিরিয়ে আনল, তখন বি*স্ফারিত দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে মীরা। গাল দুটো এখন যেন পাকা টমেটো।
“ইওর লিপস্ আর ভেরি টেস্টি, কিটেন।”

হঠাৎ করেই এত বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের লিভিং স্পেসকে ভীষণ ছোট মনে হতে লাগল মীরার। শীতল আবহাওয়ায়ও উষ্ণতায় ছেয়ে গেল তার সমস্ত অস্তিত্ব। বাকরুদ্ধ চেয়ে রইল সে আয়দানের দিকে। মুচকি হেসে তার হাত থেকে অর্ধসমাপ্ত লেমনেডের গ্লাসটি নিজের হাতে নিয়ে, অন্য গ্লাসটি ধরিয়ে দিল আয়দান। এতক্ষণ যাবৎ মীরা যেখানে চুমুক দিয়ে পান করছিল, ঠিক সেখানে ঠোঁট ছুঁয়ে চুমুক দিতে দিতে বলল,
“লেট মি হ্যাভ দিস।”
মীরা এতটাই লজ্জিত এবং বিব্রত যে আয়দানের দেয়া গ্লাসটি চেপে এক নিমিষে সমস্ত লেমনেড শেষ করে সেটি ঠাস করে কাউচের সামনের টেবিলে রেখে দিল। তারপর ধপাস করে নরম গদিতে বসে পড়ল। আয়দানের দিকে সরাসরি তাকাতে পারলনা।

“তো…তোমার প্রজেক্টে সাহায্য লাগবে বলেছিলে।”
আয়দান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
“উম হুম। পিসি ভেতরের রুমে, যাওয়া যাক?”
মাথা তুলে তাকাল মীরা। ভেতরের রুমে? মানে বেডরুম? খানিকটা ইতস্তত করল সে। তাতে আয়দান ঝুঁকে এলো,
“তুমি আনকম্ফোর্টেবল হলে থাক।”
“না। ঠিক আছে। চলো।”
সটান উঠে দাঁড়াল মীরা। এক হাতে নিজের মোবাইল চেপে ধরে এগোল ভেতরে। আয়দানের পিছু পিছু পৌঁছাল বেডরুমে। অথচ কোনো পার্সোনাল কম্পিউটার দেখতে পেলনা শুধুমাত্র একটি বিছানা এবং ক্লোজেট স্পেস ছাড়া।
“জায়দান…কম্পিউটার…”
দ্বিধান্বিত হয়ে ঘুরে তাকাতেই মীরা আবিষ্কার করল বেডরুমের দরজাটা লক করে দিয়েছে আয়দান। এই প্রথমবারের মতন বিপদসংকেত প্রেরিত হল রমণীর মস্তিষ্কে। ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্টে তারা দুজন।
“জা…জায়..দান…”

কেঁপে উঠল মীরা। হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল তার মাথাটা চক্কর দিতে শুরু করেছে। দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে অজানা কোনো কারণে। আয়দান অত্যন্ত ধীরে শিকারীর ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে লাগল। ঠোঁটে লেগে আছে তীর্যক হাসির রেখা।
“জায়দান! আমার…আমার কেমন যেন লাগছে!”
টলে উঠল মীরা। আয়দান সহসাই তার কাছে পৌঁছে কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলল। নিজের শরীরের সঙ্গে রমণীকে লেপ্টে নিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করল,
“লেট মি হেল্প ইউ দ্যান, মাই গুড লিল কিটেন।”
আয়দানকে চেপে ধরে ফেলল মীরা। শ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে তার। দূরে ঠেলতে লাগল সে পুরুষটিকে, অত্যন্ত দূর্বলভাবে।

“না, আমি..তুমি..এখন না…জায়দান প্লীজ, এখন না!”
অতি মৃদু হাসির আওয়াজ ভেসে এলো মীরার কানে। নিজের প্রেমিককে প্রথমবারের মতন অশুভ লাগল তার। আয়দান ঝুঁকে এলো। তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল মীরার গ্রীবাজুড়ে। শিউরে উঠল মীরা। দূর্বল হাতে খামচি দেয়ার চেষ্টা করল আয়দানের পিঠে। তাতে খিলখিল করে হাসলো বান্দা।
“একা একটা ছেলেকে এত রাতে তার অ্যাপার্টমেন্ট অবধি অনুসরণ করেছ, এখন বলছ ‘না’? আরেন্ট ইউ আ হিপোক্রেট, মীরা!”
আয়দান শরীরটা ছেড়ে দিতেই অতি দূর্বল মীরা হেলে পড়ে গেল বিছানার উপর। লাবণ্যময়ী শরীর তার ছড়িয়ে রইল, বিছানাজুড়ে। অতি ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে ঝাপসা দৃষ্টিতে বিশ্বাস করা প্রেমিককে দেখল সে। নিজের গায়ের টি শার্টটা ধীরে ধীরে খুলে নিল আয়দান। উন্মুক্ত হল তার ঊর্ধ্বাঙ্গ। বেডরুমের মোলায়েম আলোয় তার কোমরে জড়ানো ওয়েস্ট চেইন চিকচিক দ্যুতি ছড়ালো।

হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও মীরা একচুল নড়তে পারলনা। মনে হলো মস্তিষ্কের মতোই তার সমস্ত শরীর স্থবির হয়ে গিয়েছে। আয়দানের লেমনেডের গ্লাসের কথা মাথায় এলো হঠাৎ, অথচ এখন, কিছুই আর করার নেই!
মীরার উপর ঝুঁকে এলো আয়দান। পুতুলের মতন হয়ে যাওয়া প্রেয়সীর ঘাড়ে হাত জড়িয়ে অতি আবেশে তার গ্রীবা, ঘাড় এবং বুকের উপরের অংশজুড়ে বুলিয়ে যেতে লাগল নিজের অধর। গা গুলিয়ে উঠল মীরার, প্রচন্ড ঘৃণায় পেট মোচড় দিল বারংবার। অথচ সামান্যতম নড়তে পারছেনা সে। কন্ঠনালী অবধি রুদ্ধ হয়ে আসছে,
“জা…নো…য়ার!”
একটামাত্র শব্দ বহু কষ্টে উচ্চারণে সমর্থ হলো মীরা। ওইটুকুই। বিপরীতে তীক্ষ্ণ হাসির আওয়াজ শুনতে পেলো। কোমরজুড়ে হাতের চাপ এবং তলপেটে পুরুষালী ঠোঁটের স্পর্শ টের পেলো।
“ইউ আর মাই কোলাট্যারাল ড্যামেজ, কিটেন!”
সম্পূর্ণভাবে অচেতন হয়ে যাওয়ার পূর্বে মীরা সর্বশেষ অনুভব করল বুক ভর্তি বিশ্বাস ভাঙার যন্ত্রণা। এতটাই সুতীব্র সেই যাতনা যে তার অবশ শরীরেও চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নেমে গেল একফোঁটা অশ্রুজল।

আজ ফিরতে মধ্যরাত পার হলো আমার।
ভোররাত ৩ টা। বাসার এক্সট্রা চাবি সবসময় আমার সাথে থাকে। তাই তালা খুলে ভেতরে ঢুকতে সমস্যা হলোনা। ঢুকেই বিদ্ধস্তপ্রায় শরীরটা নিয়ে আছড়ে পড়লাম বিছানায়। আজ ক্যাফের সাপ্তাহিক বাজারের দিন ছিল। আড়ত থেকে জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে করতে এতটা দেরী হতে পারে আগে ভাবিনি। ম্যাজম্যাজে ব্যথায় সমস্ত শরীর টনটন করছে আমার। মাথা থেকে পেঁচানো মাফলারটা খুলে কোথায় ছুঁড়ে ফেললাম জানিনা। এই মুহূর্তে কিছুই চিন্তা করতে ইচ্ছা করছেনা। চোখ দুটো লেগে এলো। কতক্ষণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম টের পেলাম না। যখন কনকনে শীতল বায়ুর স্পর্শে জেগে উঠলাম, তখন দেখলাম মাথার কাছের খোলা জানালা বেয়ে ভোরের কমলাভ আলো চুঁইয়ে পড়ছে ভেতরে। জানালা কখনো খোলা থাকেনা, মীরা বন্ধ করে রাখে ঘুমানোর আগে। তবে আজ…
মীরা?
হঠাৎ করেই মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল। মনে পড়ল, দরজার তালা খুলে ঢুকেছি আমি। অর্থাৎ, মীরা তখন বাসায় ছিলনা। তার তো আমার আগেই চলে আসার কথা! চোখ থেকে সমস্ত ঘুম উবে গেল। এক লাফে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। আমাদের নতুন বাসায় বেডরুম দুটো। বিধায় আমরা এখন ভিন্ন রুমেই থাকি। মীরার রুমের দিকে ছুটে গিয়ে এক ধাক্কায় দরজা খুললাম।

“মীরা?”
বিছানা ফাঁকা। চাদর টানটান করে গোছানো, ঠিক যেমনটা গতকাল সকালে করে গিয়েছিল মেয়েটি। ধ্বক করে উঠল আমার বুকের ভেতরটা। আমার নিজের খুব রাত করে বাসায় ফেরার রেকর্ড থাকলেও মীরার নেই। সে কখনোই রাত ১ টা পার করে ফেরেনি। সেখানে এখন তো ভোর!
হন্তদন্ত হয়ে ছুটলাম নিজের রুমে। কয়েক মুহূর্ত বুঝে উঠতে পারলাম না কি করব, কোথায় যাব। আমার বিশিষ্ট বাতিক আছে। অতিরিক্ত রাগে এবং ভয়ে মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। খানিক দাঁড়িয়ে ভাবলাম। সর্বপ্রথম উচিত মেয়েটার নাম্বারে কল করা। নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করতেই নিজেকে দুই চারটা গাল দিতে ইচ্ছা হল। চার্জ নেই!
দ্রুত ছুটলাম। জট পাকানো চার্জারের তার টেনে খোলার ধৈর্য্য নেই এই মুহূর্তে। সকেটে লাগিয়ে ফোন অন করলাম। ব্যাটারি চার্জ হওয়ার সিগন্যাল ভেসে উঠল প্রথমে। অতঃপর নেট সিগন্যাল আসতেই কয়েকটি মেসেজের নোটিফিকেশন।

আরো প্রায় কয়েক ঘণ্টা আগে মীরা আমাকে একটি ঠিকানা মেসেজ করেছে। সেদিন ক্লাবে গিয়ে মাতাল হয়ে শেষমেষ জায়দান আমায় মিসিরের বাসায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটার পর থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল মীরা। দুজন যদি রাতের বেলা একলা কিংবা অন্য কারো সাথে কোথাও যাই, তাহলে মেসেজে ঠিকানা জানিয়ে রাখি। আমি বলদ গত রাতে এতই ক্লান্ত ছিলাম যে খেয়ালই করিনি। কাঁপতে থাকা হাতে ইনবক্সে গিয়ে মেসেজের ঠিকানাটি পড়লাম।
॥ টেন্থ ফ্লোর, স্যাংকচুয়ারি, মডার্ন রোড, গুলশান ৪৩ ॥
মাথায় হঠাৎ করে বজ্রপাত হলে বোধ হয় মৃ*ত্যুর পূর্বে মানুষ এমন অনুভব করে! একই সঙ্গে হাড়হীম করা ঠান্ডা এবং অসহ্যকর জ্বালাময়ী উত্তাপ। ভেতর থেকে সবটা ধ্বসিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, শুধুমাত্র একটা ঠিকানা দেখে আমি এত ভড়কে যাচ্ছি কেন! কারণটা খুব স্বাভাবিক এবং একইসঙ্গে অস্বাভাবিক।

এটা জায়দানের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের অ্যাড্রেস!
আমাদের বিয়ের কয়েক মাস পর কিনেছিল জায়দান। তবে সেখানে গিয়ে দুই একদিনের বেশি কখনোই থাকা হয়নি আমাদের। সে পারিবারিক বাড়িতেই থাকতে পছন্দ করে, অ্যাপার্টমেন্ট নেয়া হয়েছিল নেহায়েত ইনভেস্টমেন্ট করতে। সেদিন ক্লাব থেকে আমায় জায়দান নিজের ফ্ল্যাটে না নিয়ে মিসিরের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল কারণ ক্লাব থেকে তার বন্ধুর বাসা কাছে।
সেসব এখন ব্যাপার নয়। ব্যাপার হলো,
মীরা জায়দানের ফ্ল্যাটে কি করছে বা কি করেছে সারাটা রাত?
বান্ধবীকে হারানোর আতঙ্ক এবং অদ্ভুতুড়ে এক শীতল ক্রোধের অনুভূতি আমায় গ্রাস করল। কোনটা ছেড়ে কোনটা অনুভব করব? সন্দেহ? ভয়? ঈর্ষা? আতঙ্ক? নাকি রাগ?
দ্রুত মীরার নাম্বারে ডায়াল করলাম। ফোন বন্ধ।
“ফাক!”

কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠলাম। পরক্ষণেই দ্রুত কলার আইডি ঘেঁটে জায়দানের নাম্বার বের করলাম। আমার বৃদ্ধাঙ্গুল কল বাটনে স্পর্শ করার ঠিক আগমুহূর্তে থমকে গেল। ভীষণ দ্বিধায় ভুগলাম। চোখে ভেসে উঠল সেদিনের মীরার ফোন, তার লুকোচুরি এবং শেষমেষ অবাধ্যতা।
মীরা এবং জায়দান।
আমার প্রাণের বান্ধবীর এবং প্রাক্তন স্বামী!
শেষমেষ আমার ওভারথিংকিং মস্তিষ্ক বিজয়ী হলো। এমনভাবে মানুষ বাঁচতে পারেনা। সন্দেহ যদি হয়েই থাকে তবে এর হেস্তনেস্ত আমি আজই করব।
মুখে পানির ঝাঁপটা দিয়ে পোশাক বদলে একটা শার্ট পড়লাম। ভোরের তীব্র ঠান্ডা থেকে বাঁচতে একটা হুডি গায়ে জড়িয়ে টুপিটা দিয়ে মুখ ঢেকে নিলাম। বিছানা থেকে মাফলার তুলে দেখলাম ফোনে ১০% চার্জ হয়েছে। তক্ষুণি সেটা একটানে খুলে নিয়ে ছুট দিলাম বাইরের দিকে।
স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভোরের ফাঁকা সড়কে। আশেপাশে এখনো স্ট্রিট লাইট জ্বলছে। গতি ক্রমশ বাড়ালাম। সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও এই জিনিসের শক্তি কম নয়। সাঁই সাঁই করে ছুটলাম। গলার পাশে মাফলার তীব্রবেগে উড়তে লাগল।

আমার মাথায় সবকিছু জট পাকিয়ে গেল। মস্তিষ্কের দুইপাশ দুই ধরনের যুক্তিতর্কে লিপ্ত হলো।
জায়দানকে আমি ভালোবাসি সেজন্য নয়, বরং মানুষ হিসাবে সে কেমন জানি বিধায় আমার বারংবার মনে হচ্ছে কোথাও একটা কিন্তু রয়েছে। এমনটা হতেই পারেনা! যে পারফেকশনিজমে রীতিমত আসক্ত, সে কিভাবে এমন কাজ করতে পারে? আমার প্রাক্তন স্বামী এবং বর্তমান প্রেমের সঙ্গে এমন চিত্র কোনোভাবে যায়ই না! সে জানে কিভাবে নারীদের সম্মান দিতে হয়। কিন্ত, কিন্তু কোথাও গিয়ে এখন তো আর সে আমার বাঁধনে আবদ্ধ নয়! এই একটা বছরে তার মাঝে কি কি পরিবর্তন ঘটেছে আমি কি জানি? সে আরওয়ার সঙ্গে পারিবারিক চাপে ঘুরতে যেতে পারলে মীরার সঙ্গে কেন নয়?

আর মীরা! সে তো আমার প্রাণের বান্ধবী! না না, পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না ওই নিষ্পাপ, সহজ, সরল হরিণীর মতন মোলায়েম মেয়েটি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যদি করেই থাকত, অ্যাড্রেস পাঠাত কি? কিন্তু মীরাও তো জানেনা আমার প্রাক্তন স্বামী সম্পর্কে। কোনোদিন তার নাম – ধাম – পরিচয় কিছুই জানাইনি ঠিকমত। আমার ভয়াল অতীতকে তার সামনে আসতে দিতে চাইনি। তাহলে মীরার জানার সুযোগ আছে? মেডিকেলে যখন জায়দান গিয়েছিল, মীরা কি আদও তাকে দেখেছে? যদি দেখেই থাকে, তবে আমায় কেন সকালে বলল না আমার প্রাক্তন স্বামী এসেছিল! কিসের লুকোচুরি?
মনে হলো দুই কানে দুই ধরণের সত্তা আমায় কানপড়া দিচ্ছে। একজন নিষ্পাপ, সবকিছু ভালো হিসাবে ভাবতে চাইছে, নিজের আপনজনদের প্রতি বিশ্বাস রাখতে চাইছে। এবং অপরজন জাগতিক জটিলতায় শক্ত হয়ে গিয়েছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার হাসতে খেলতে থাকা জীবনটায় যত ঝড়ঝাঁপটা বয়ে গিয়েছে তাতে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। এই বাস্তব সত্তা আমায় বোঝাচ্ছে, দিনশেষে জায়দান এবং মীরা দুজনই নারী এবং পুরুষ! ক্ষণিকের দূর্বলতা সবকিছু তছনছ করে দিতে যথেষ্ট!

শেষমেষ কে জয়ী হলো টের পেলাম না। নিকুচি করেছি সবকিছুর!
স্যাংকচুয়ারি ভবনের সামনে পৌঁছে স্কুটি পার্ক করে লাফিয়ে নামলাম। হেলমেট ছুঁড়ে কোথায় ফেললাম কে জানে! গোল্লায় যাক হেলমেট! দৌঁড়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়েই ধাক্কা খেলাম কেয়ার টেকার লোকটার সাথে। একদম ভোর ভোর হওয়ায় কেয়ার টেকারের মুখ ফ্যাসফ্যাসে।
“আরে আপনি?”
পাত্তা না দিয়ে দৌঁড়ে গেলাম বুথে, রেজিস্ট্রি বুকে নিজের নাম সাইন করতে করতে দ্রুত বললাম,
“ওয়াইফ অব জায়দান আরেফিন, ফ্ল্যাট টেন বি!”
কেয়ার টেকার হা হয়ে চেয়ে রইল। তার বিস্ময় দেখার জন্য অপেক্ষা করলাম। ছুটে গেলাম এলিভেটরে। অসহ্য ঠেকছে সবকিছু। নিঃশ্বাস আটকে আসছে। যেকোন মুহুর্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলব মনে হচ্ছে। প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। অসংখ্য চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে মস্তিষ্ককে ঝাঁঝরা করে ফেলছে গোটা।
এলিভেটর যতক্ষণে খুলল ততক্ষণে আমার দমবন্ধ অবস্থা প্রায়। থরথর করে কাঁপছে শরীর। প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে নাকি! ভাবার সময় পেলাম না। এর আগেই পৌঁছে গেলাম টেন বি এর সামনে।
হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম দরজা খোলা। হালকা চাপানো। দাঁড়ালাম না আর। দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

ভোর পেরিয়ে সকাল হতে আরম্ভ করেছে। উষ্ণ রোদ ছড়াচ্ছে চারপাশে। অ্যাপার্টমেন্টে তেমন কারো থাকা হয়না বিধায় আসবাবের সংখ্যা হাতে গোণা। একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যতীত কিছুই নেই। কিন্ত কাউচের উপর মীরার হ্যান্ডব্যাগ লক্ষ্য করে মনে হল যেন পৃথিবী থমকে গিয়েছে। সামনেই রাখা দুটো ব্যবহৃত ফাঁকা গ্লাস। তাতে কি ছিল আপাতত ধারণায় আনতে পারছিনা।
ইচ্ছা হলো চিৎকার করে মীরাকে ডাকি। কিন্তু শেষমেষ কি মনে করে যেন ডাকলাম না। আমি নিঃশব্দে এগোলাম বেডরুমের দিকে। বেডরুমের দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত। কেন যেন মনে ভীষণ বাঁধ সাঁধলো। মনে হলো, উল্টো ঘুরে চলে যাওয়া উচিত। যে পথে পা বাড়াচ্ছি তা আমায় শুধুই যন্ত্রণা দেবে। তবুও অবাধ্য অন্তর আমায় টেনে নিলো ধ্বংসের আরো গভীরে।
বেডরুমে প্রবেশ করলাম আমি।
তৎক্ষণাৎ আমার সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত চিন্তা, সমস্ত আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
বেডরুমের একটামাত্র বিছানায় নেতিয়ে আছে মীরা। খানিকটা বিবস্ত্র। আশেপাশে এলোমেলো ছড়ানো চাদর, ওড়না। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে আছে টিস্যু এবং চকচকে প্লাস্টিকের ছোট ছোট ছেড়া মোড়ক। বৈদ্যুতিক শক খেলাম, একবার নয় বারংবার যেন। সবকিছুই হয়ত মানিয়ে নিতাম, তীব্র বিশ্বাসের জোরে সবটা বুকের গভীরে চাপা দিয়ে ফেলতাম। কিন্তু পারলাম না।

পারলাম না কারণ বিছানায় ঠিক মীরার উপর ঝুঁকে আছে আমার প্রাক্তন স্বামী জায়দান। পুরোদস্তুর স্যুট পরনে, চোখে চশমা। যেন সদ্য তৈরী হয়েছে বাইরে যাওয়ার জন্য। তার একটি হাত মীরার কপালে, তা বেয়ে নামলো গলার দিকে, পালসের উপরে।
এতটা আদর?
হ্যাঁ, আমার চিন্তাশক্তিতে দৃশ্যটাকে এমনি মনে হলো।
জায়দান বোধ হয় আমার উপস্থিতি টের পেলো। সেটা কিভাবে জানিনা। চট করে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সে।
তার চোখে যদি আমি বিস্ময়, আতঙ্ক কিংবা সামান্য বিচলন হলেও দেখতাম, তবে হয়ত নিজের মনকে সামাল দিতাম। অথচ নির্বিকার ওই শীতল নয়নে কোনো পরিবর্তন হলোনা। শুধু শান্ত কন্ঠে সে বলল,
“সাবিন। হোয়াটএভার ইউ আর থিংকিং, জাস্ট স্টপ।”
চোখের সামনে লাল দেখতে পেলাম। সেই চিরচেনা ক্রোধ, অতি পরিচিত ভয়ানক আক্রোশ। যে আক্রোশ এককালে আমাকে করে তুলেছিল অধরা, আবার যে আক্রোশেই ঘটেছিল আমার পতন! সেই আক্রোশ ফিরে এলো দারুণ বেগে। তপ্ত মস্তিষ্ক, টুকরো টুকরো অন্তর আর ভাবনা চিন্তার পর্যায়ে নেই।
হনহন করে এগোলাম ভেতরে। জায়দান একচুল নড়লনা, যেন সে জানে কি হতে চলেছে। হাতটি তুললাম আমি। অতঃপর তা সজোরে আছড়ে পড়ল প্রাক্তনের গাল বরাবর।

একটুও মায়া করিনি আমি। এই মানুষটার প্রতি অনুভব করা সকল অনুভূতি একত্রিত হয়ে তীব্র শক্তিসম্পন্ন এক আঘাত তৈরি করেছে। জায়দানের মাথাটা একদিকে হেলে গেল, চোখের চশমাটা খুলে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। গালজুড়ে ভেসে উঠলো আমার পাঁচ আঙুলের দাগ। ওই দাগের দিকে চেয়ে মনে হল, যেন আমি আমার ভালোবাসাটাকে নয়, আঘাত করেছি নিজেকে। শুষ্ক চোখে ভেসে উঠল অশ্রুর স্রোত।
“মাদারফাকিং বাস্টার্ড!”
দাঁতে দাঁত পিষে কাঁপতে কাঁপতে উচ্চারণ করলাম আমি। এর বিপরীতে জীবনে প্রথমবারের মতন জায়দানকে হাসতে দেখলাম।

সমাপ্তির ওপাড়ে বিশেষ পর্ব

হাসি…. জায়দান….!
মাথা হেলিয়ে আমার দিকে তাকাল জায়দান। তার ঠোঁটে লেপ্টে আছে জগতের সবথেকে সুন্দর এক হাসি। ঠোঁটের ফাঁক গলে ঝকঝকে দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে। শব্দ করে হাসছে সে রীতিমত, খিলখিল করে। হাসির তোড়ে সামান্য কম্পিত হচ্ছে তার সুদীর্ঘ শরীর।
“অথচ ভেবেছিলাম, হয়ত তুমি এইবার সত্যিই বদলে গিয়েছ…হাহা..হাহা…”
জীবনে কোনোদিন হাসতে না দেখা মানুষটার হাসিতে যে এতটা দুঃখ খচিত থাকবে, আমি কি আগে কখনো ভেবেছিলাম?

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here