Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩
জাবিন ফোরকান

“ এভরিথিং ক্লিয়ার। এনি ডাউটস, স্টুডেন্টস? ”
গ্যালারি ক্লাসে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা সকলে প্রায় একযোগে নিঃশব্দে মাথা নাড়লো। জায়দান হাতের মার্কারপেন টেবিলে রেখে পিছনের প্রজেক্টর বোর্ডের স্লাইড সরিয়ে ভিন্ন স্লাইড দেখিয়ে মাউথপিসে বললো,
“ তাহলে এটা তোমাদের নেক্সট প্রোজেক্ট। আমি অলরেডি টিম সিলেক্ট করে দিয়েছি। আই এক্সপেক্ট দ্যা বেস্ট ফ্রম ইউ অল। আর নিরুপমা, তোমার নেক্সট লেকচার শেষে আমার অফিসে যোগাযোগ করবে। প্রোজেক্ট ম্যাটারিয়ালগুলো নিয়ে নিও। ”
“ জ্বি প্রফেসর। ”
সি আর, নিরুপমা একদম সামনের গ্যালারি থেকে মাথা দুলিয়ে তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানালো। জায়দান নিজের মার্কারপেন এবং ল্যাপটপ তুলে প্রজেক্টর বোর্ড বন্ধ করে বাইরের দিকে পা বাড়াতেই সকল শিক্ষার্থী একযোগে বলে উঠলো,

“ আসসলামু আলাইকুম, প্রফেসর। ”
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম। ”
বাইরে পা রাখতেই ভেতরের গুঞ্জন স্পষ্টত কানে এলো তার। কয়েকজন মেয়ের উচ্ছল কন্ঠস্বর।
“ নিরু! কি লাকি রে তুই! প্রফেসরকে কতবার করে দেখতে পারিস সি আর হওয়ার বদৌলতে! ”
“ এসব উল্টাপাল্টা কথা বন্ধ কর। উনি আমাদের শিক্ষক, গুরুজন। ”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। তুই তো বলবিই এসব। ভাবছি পরেরবার সি আর হওয়ার লিস্টে আমিও নাম লেখাবো। ”
এমন মন্তব্য প্রায়শঃই শুনতে হয় জায়দানকে। তবে তাতে তার বিশেষ কিছু যায় আসেনা। দুনিয়াবি কার্যকলাপের প্রতি তার আগ্রহবোধ শূন্যের কোঠায়। মুখের উপর কেউ তার ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করলেও তার মাঝে লজ্জাবোধ কিংবা খুশি কোনো অনুভূতিরই প্রভাব পড়বেনা। তার চেহারার গাঁথুনি সবসময় একইরকম থাকে। হাজার খুশির সংবাদ, কিংবা হাজার দুঃখের সংবাদ শুনলেও তার মাঝে পরিবর্তন আসে খুবই ক্ষীণ। আলাপ, আলোচনা – সমালোচনা, গুঞ্জণ, গুজব, সবকিছুই তার মাঝে অনুভূতি সৃষ্টি করতে অক্ষম। এমন কিছু মানুষ আছে পৃথিবীতে, যাদের জন্ম থেকেই বড্ড কমপ্যাশনের অভাব। জায়দান ঠিক তেমন একজন মানুষ।
করিডোর ধরে ধীরে ধীরে নিজের অফিসের দিকে এগোলো জায়দান। আশেপাশে অনেক শিক্ষার্থীর কোলাহল। এলিভেটরের সামনে অপেক্ষমাণ বেশ কয়েকজন। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় এটি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। কানাডা থেকে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ের উপর পি এইচ ডি সমাপ্ত করার পর দেশে সেটেলড হওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও পারিবারিক চাহিদার কারণে আসতে হয়েছে তাকে। পরিবারের বড় ছেলে দূরে থাকলে সেটা নাকি অভিজাত সমাজে সম্মানহানীর কারণ।

তাকে এগিয়ে যেতে দেখে প্রায় সকল শিক্ষার্থীই পদে পদে সালাম দিচ্ছে। জায়দান শুধু হালকা মাথা দুলে এগিয়ে যাচ্ছে। রমণীদের আলাদা নজর তার চোখে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু বিশেষ কোনো আগ্রহবোধ আসছেনা। হাঁটার মাঝখানেই ল্যাপটপ খুলে সে আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা ফাইল ডাটা ট্রান্সফার শুরু করলো। সময় ক্ষেপণে সবসময়ই বাঁধ সাঁধে তার মস্তিষ্ক।
॥ আগামীকাল। সন্ধ্যা ৭:৩০। অ্যাস্থেটিক্স রেস্তোরাঁ, বনানী ॥
কাজের মাঝখানে হঠাৎ করে ই মেইল উইন্ডোজে ভেসে ওঠায় জায়দানের হাঁটার গতি খানিক কমে এলো। নির্বিকার ভঙ্গিতে সে পরীক্ষা করলো। ই মেইল আইডির নাম, আরওয়া এহসান ১০৫৬ অ্যাট জি মেইল ডট কম।
প্রথমবার দেখা হওয়ার পর দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সম্পূর্ণ ভার জায়দান মেয়েটির উপর ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিলো, দ্বিতীয়বার সে কোথায়, কখন দেখা করতে চায় তা জানাতে। আরওয়া অবশ্য তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ চেয়েছিল, কিন্তু সে দেয়নি। এক বাক্যে বলেছে, ই মেইলে যোগাযোগ করতে। জায়দান জানে, মেয়েটি হতবাক হয়েছে। হয়ত রাগও করেছে। কিন্তু তার কিছু করার নেই। সে মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে একদমই অপছন্দ করে। তার পরিবার এবং বন্ধুরা বাদে কলিগদের কাছে অবধি তার ব্যক্তিগত আইডি, কিংবা অন্য কোনো যোগাযোগের মাধ্যম নেই। অবশ্য জায়দান এক হোয়াটসঅ্যাপ বাদে অন্যকিছু ব্যবহার করার প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী। ইন্সটাগ্রামে তার ঢোকা হয় মাসে একবার।
হাঁটতে হাঁটতে খানিক অসুবিধা হচ্ছে বিধায় জায়দান একপাশের বেঞ্চে বসে থাকা দুইজন শিক্ষার্থীর পাশে বসে পড়লো। তারা খানিক সম্মান দেখিয়ে সরে বসলো। তাতে বিশেষ বাতিক নেই প্রফেসরের। হাঁটুর উপর ল্যাপটপ রেখে দ্রুতহাতে টাইপ করলো সে। দুটো শব্দ।

“ ওকে। ডান। ”
ফিরতি ই মেইল পাঠিয়ে জায়দান হোয়াটসঅ্যাপে নিজের একেবারে ছোটবেলার সবথেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিসিরকে মেসেজ করলো।
॥ ভালো একটা অনলাইন পেইজ দেখে আমার তরফ থেকে একটা ফুলের বুকে অর্ডার দিয়ে রাখিস। আগামীকাল বিকালের মধ্যে যেন বাসায় পৌঁছে দেয় ॥
মিসির দেখেছে কি দেখেনি, তার প্রতি আগ্রহ নেই জায়দানের। নিজের বন্ধুর নামটার রহস্য তার মনে পড়ল হঠাৎ করেই। মিসিরের মা নাকি দেশের বিখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলী চরিত্রের বিশাল ভক্ত ছিলো। হুমায়ূন আহমেদ কে, তা জায়দান জানে তবে লেখকের কোনো বই তার পড়া হয়নি। ক্লাস ফাইভে থাকতে সে প্রথম যে বই নিজের টাকায় কিনেছিল, সেটা ছিল কোয়ান্টাম ফিজিক্স। তার জীবনে এমন অদ্ভূত নামের দুইজন মানুষ আছে। এক তার বন্ধু মিসির স্বয়ং, অন্যজন…..
মস্তিষ্ককে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে জায়দান। তাই নামটা স্মৃতিতে আসার আগেই চিন্তাশক্তিকে থামিয়ে দিলো সে। ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠতে নিলো। ঠিক তখনি পরিচিত এক যান্ত্রিক কন্ঠস্বর তার কানে ঠেকলো।
— কুত্তার অওলাদকে কি বলে জানিস? কুত্তার বাচ্চা!

মাথা ঘুরিয়ে তাকালো জায়দান। যে দুজন শিক্ষার্থী বেঞ্চে বসে ছিলো, তারাই নিজেদের ফোনে কোনো ভিডিও দেখছে। চোখের চশমা খানিকটা ঠিকঠাক করে নাকের উপরে টেনে জায়দান দেখার জন্য ঝুঁকে এলো নিঃশব্দে। শিক্ষার্থী দুজন ভীষণ অবাক হলেও কোনো কথা বললোনা, উল্টো সে ভালোমত দেখতে পায় মতন করে ফোনটা ধরলো।
স্ক্রীনে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটা ভিডিও দেখা যাচ্ছে। কোনো এক দূর্ঘটনা অঞ্চলের। আর এর একদম কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে করতে একটা ছেলেকে জুতাপেটা করতে থাকা মেয়েটাকে চিনতে তার কোনো সমস্যাই হলোনা। এই মুখ সে আজীবনে ভুলতে পারবেনা।
সাবিন। তার প্রাক্তন স্ত্রী।
অকথ্য ভাষায় রীতিমত অশ্রাব্য শব্দগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সাবিনকে দেখা যাচ্ছে নির্দয়ভাবে একজন ছেলেকে মারধর করতে। উপরে ক্যাপশন দেয়া, ‘পিৎজা বেঁচতে গিয়ে খাবারের বিরুদ্ধে লো কোয়ালিটি অভিযোগ পাওয়ায়, রাস্তায় লোকজন ডেকে ভদ্রলোক গ্রাহককে হেনস্তা করা এক জঘণ্য মহিলা।’ পেইজের নাম মেনশন করে দেয়া আছে ভিডিওর কমেন্ট বক্সে। সেখানে হাজার হাজার মানুষের অকথ্য ধরণের মন্তব্য।

“ এটা কি? কখনকার ঘটনা? ”
জায়দান প্রশ্ন করতেই শিক্ষার্থীদের একজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
“ খুব বেশি কিছু জানিনা। ফেসবুকেই দেখলাম। আজকে দুপুরের ঘটনা। এই মহিলা নাকি পিৎজা ডেলিভারি দিতে গিয়েছিল, কিন্তু কাস্টমার আশানুরূপ হয়নি বলে মন্তব্য করায় রেগেমেগে তাকে জুতো খুলে মারধর শুরু করে। কাস্টমার বাজে রিভিউ দেবে মন্তব্য করলে তাকে রাস্তায় টেনে এনে নাটক সাজায়। এরপর নাকি ওই বেচারার গাড়িও ভেঙে দিয়েছে। ”
“ আমি বুঝিনা মানুষের এত দেমাগ কিসের? দুইদিনের একটা পেইজ খুলে নিজেকে বিরাট ব্যবসায়ী মনে করে বোধ হয়। পেইজটা রিপোর্ট মেরে পাবলিক নষ্ট করে দিলে ভালো হবে। তবেই এদের হুশ হবে। সামাজিক ইনফ্লুয়েঞ্জা কোথাকার! নাটক করে ভাইরাল হওয়ার ধান্দা! ”
শিক্ষার্থীদের কথা শুনে জায়দান কোনো মন্তব্য করলোনা। শুধু ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো,

“ ভিডিওর লিংকটা আমার ই মেইলে পাঠাও। ”
শিক্ষার্থী দুজন অবাক হয়ে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলেও কোনো কথা বললোনা। চুপচাপ প্রফেসরের আজ্ঞা পালন করলো। তাদের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় অবশ্য জায়দান নেই। সে হাঁটতে হাঁটতে পুনরায় নিজের ল্যাপটপ খুলেছে। এবার ই মেইল সে পাঠালো ক্লাসের সি আর নিরুপমার কাছে।
॥ আজ আমার অফিসে আসার দরকার নেই। আমি বাসায় চলে যাচ্ছি। প্রোজেক্ট ম্যাটারিয়াল আগামীকাল লেকচারের সময় তোমাকে দিয়ে দেবো ॥
ফিরতি কিছুর অপেক্ষা না করে ল্যাপটপ বন্ধ করে লম্বা পায়ে হেঁটে নিজের অফিসে পৌঁছলো জায়দান। সবকিছু গুছিয়ে টেবিলের পাশ থেকে নিজের হেলমেট তুলে নিয়ে মাথায় জড়াতে জড়াতে পার্কিং এরিয়ার দিকে এগোলো। অপেক্ষমান তার বাইক। বাহনটিতে চেপে বসে পকেট থেকে রাইডিং গ্লাভস দুটো বের করে হাতে জড়ালো। তারপর হ্যান্ডেল চেপে ইগনিশনে চাপ দিলো। ব্র্যাকের গেট বেয়ে যখন তার বাইক বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন বিনা কারণেই কিছু শিক্ষার্থীর দৃষ্টি তাকে অনুসরণ করলো। বাইক চালানো মানুষের কোনো অভাব না থাকলেও এখন প্রফেসর পেশায় থাকা মানুষের দৈনিক ব্যবহার্য বাহন হিসেবে জিনিসটা অনন্য ধাঁচের। জায়দান ক্রমশ হাতের চাপ বাড়ালো, সঙ্গে বৃদ্ধি পেলো গতি। বায়ুর ঝাঁপটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়তে লাগলো তার গলায় ঝুলতে থাকা টাই।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে। সময় এখন রাত আটটা। ছোট ছেলেটা তার দুপুরে বাসায় ফিরেছে কাটা গাল এবং ছোট ক্ষত নিয়ে। বরফ এবং ওষুধ লাগিয়ে দেয়ার সময় কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে ছেলেটা শুধু মিটিমিটি হেসেছে। ওইদিকে বড় ছেলে, যে কখনো সন্ধ্যার আগে ভার্সিটি থেকে ফেরেনা, সে দুপুরের পরপরই ফিরে সেই যে নিজের স্টাডিরুমে ঢুকেছে, বের হওয়ার নামগন্ধ নেই। আজকের দিনটা কেমন যেন অশুভ লাগছে তাই জেসমিন শিকদারের। ডাইন ইন টেবিলে বসে প্রাইভেট শেফের দক্ষ হাতে বানিয়ে দেয়া কফির স্বাদ আস্বাদন করছেন তিনি। ব্যাপারটা হলো কি? যুক্তিগুলো মিলিয়ে উঠতে পারছেন না জেসমিন।
“ ভাইয়া! ”
হঠাৎ করে সমস্ত ডুপ্লেক্স বাড়ি কাঁপিয়ে তোলা ছোট ছেলের হুংকার শুনে জেসমিন এতটাই চমকে উঠলেন যে মগ থেকে কফি ছলকে পড়লো তার সিল্কের ম্যাক্সির উপর। তৎক্ষণাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে পোশাক ঝাড়তে লাগলেন তিনি। কাজের মেয়েটা দৌঁড়ে এসে টিস্যু দিয়ে তার পোশাকে বসে যাওয়ার আগেই কফির দাগ মোছার চেষ্টায় লিপ্ত হলো। থপথপ করে শব্দ হলো ভীষণ। তারপরই দুই তলার সিঁড়ির দোরগোড়ায় দেখা মিললো জেসমিনের ছোট ছেলে আয়দানের। গালে এখনো ব্যান্ডেজ। পরনে কোনো জামা নেই। শুধু একটা কালো ট্রাউজার নিচু হয়ে ঝুলছে কোমরে। সেখানে চিকচিক করছে সিলভারের তৈরি একটি ওয়েস্ট চেইন।

“ মাম্মি! ভাইয়া কোথায়? আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর ভাইয়া বাসায়, কোথায় বলো এক্ষুণি! ”
“ শান্ত হ আগে। কি হয়েছে আমাকে বল। ”
জেসমিন কাজের মেয়েকে দূরে ঠেলে ছোট ছেলের দিকে এগোতে চাইলেন কিন্তু ছেলে তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিলো। নিজেই সিঁড়ি বেয়ে ভীষণ ক্রুব্ধ ভঙ্গি এবং ক্ষীপ্র গতিতে নেমে এলো। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে আবারও গর্জন করে উঠলো,
“ ভাইয়া! কাম দ্যা ফাক আউট অওর….! ”
“ অওর? গনা কি*ল মি? ”
শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠটি সকলকে ক্ষণিকের জন্য জমিয়ে দিলো। ঘুরে দেখলো সবাই। বাড়ির লিভিং রুমের দুইপাশে সিঁড়ির মতন পেঁচানো দুইটি সিঁড়ি। একটি বেয়ে একটু আগে আয়দান নেমে এসেছে। দ্বিতীয় সিঁড়ির একদম মাথায় দন্ডায়মান দেখা গেলো জায়দানকে। পুরোদস্তুর বাইরের পোশাক পরনে। কালো ফরমাল শার্ট এবং প্যান্ট, তার উপরে একই বর্ণের ব্লেজার। চোখের মোটা কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে নির্বিকার ঘোলাটে বাদামী দৃষ্টি। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।
বড় ভাইকে দেখার সাথে সাথে উন্মাদের মতন ছুটে গেলো আয়দান। সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,
“ সোশ্যাল সাইট থেকে ভিডিওটা তুমি সরিয়েছ! ”
জায়দানের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলোনা। ওই একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে খানিক এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা চুল ব্যাতিত আর কোনো খুঁতের দেখা পাওয়া গেলোনা তার মাঝে। যেন জীবন্ত এক ভাস্কর্য। জবাব না পেয়ে আয়দান হঠাৎ করেই হেসে উঠলো। হতাশায় হাত মুখে চেপে ঘষতে ঘষতে চাপা ক্রোধ এবং জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বললো,

“ অবশ্যই তুমি করেছ। ইউ আর দ্যা ড্যাম সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট অব আওয়ার ফ্যামিলি! ”
জেসমিন হতবাক হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাজের মেয়ে রোজিনার দিকে তাকালেন। মেয়েটিও তার মতই দ্বিধান্বিত। কারোরই কিছু জানা নেই, কি হচ্ছে তা সম্পর্কে। জায়দান ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো, পকেট থেকে নিজের হাতঘড়ি বের করে হাতের কব্জিতে জড়াতে জড়াতে বললো,
“ ভিডিওটা ফলস ইনফরমেশন ছড়াচ্ছিল। স্যোশাল মিডিয়া সিম্পলি সেটাকে টেকডাউন করেছে। ”
“ ফলস ইনফরমেশন! সিম্পলি! আর ইউ ইন ইওর রাইট মাইন্ড অওর হোয়াট? ”
জায়দান কোনো জবাব দিলোনা। নিজের ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। উচ্চতার হিসাবে ছোট ভাইয়ের থেকে সে গুণে গুণে দেড় ইঞ্চি লম্বা।
“ আরে! এখানে কি হচ্ছে? তোদের একজন অন্তত বলবি আমাকে? ”
জেসমিনের কন্ঠস্বর দুই ভাইয়ের দৃষ্টি বিনিময়ের মাঝে ছেদ ঘটালো। আয়দানের দিকে এগিয়ে তার বাহু চেপে ধরে তিনি শুধালেন,

“ কি হয়েছে? আমাকে বল। ”
“ আরে মাম্মি! ওই স্লাটটাকে আজকে একটা উচিত শিক্ষা দিয়েছিলাম! কিন্তু তোমার গুণধর বড় ছেলে, ন্যায়ের অবতারের মনে হয় নিজের কালনাগিনী এক্সের কষ্ট সহ্য হয়নি। দিলো সব বরবাদ করে! ”
জেসমিন ভ্রু কুঁচকে জায়দানের দিকে তাকালেন। সামান্য বিতৃষ্ণা ফুটলো তার ধবধবে ফর্সা তুলতুলে চেহারায়।
“ জায়দান! আয়দান এসব কি বলছে? তুমি ঐ মেয়ের সঙ্গে জড়িয়েছ কোনোভাবে? তুমি জানোনা ওই মেয়ে কত্ত বড় একটা ফাজিল! ”
জায়দানের মাঝে কোনো পরিবর্তন এলোনা। নির্লিপ্ত দৃষ্টি ভাইয়ের উপর থেকে সরিয়ে মায়ের উপর ফেললো সে।
“ রং ইয রং। এক্ষেত্রে তোমার ছোট ছেলের অন্যায় ছিলো। সেই ওভারস্পিডিং করেছে। আব্বু ওকে যে ইমপোর্টেড ল্যাম্বরগিনি গিফট করেছে, সেটার চোদ্দটা বাজিয়েছে। যদি ওর বোকা মস্তিষ্ক এটা না ধরতে পারে, যে ওর গাড়ি কিংবা ঝাপসা হলেও ওর যতটুকু শরীর ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল তা ওর পরিচয় শনাক্তের জন্য মোর দ্যান এনাফ, তার দায়ভার আমাদের পরিবারের নয়। তবুও সম্মানটুকু আব্বু আর তোমারই যেতো, আম্মু। ”
ছেলের বিশ্লেষণ শুনে জেসমিন থেমে গেলেন। পাল্টা কোনো জবাব দেয়ার মতন কিছু খুঁজে পেলেন না। ছোট ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকালেন তাই। আয়দানের ক্রোধ হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গিয়েছে। সে এবার খিলখিল করে হাসছে। মাথায় দুহাত চেপে সে হাসতে হাসতে বললো,

“ ওহ ফাক! এটা তাহলে তুমি রেপুটেশনের জন্য করেছ? থ্যাঙ্কস ব্রো! ”
“ আয়দান। তোর বিবেচনাবোধহীন স্বভাবটা কি কখনো বদলাবে না? ”
জেসমিনের প্রশ্নে কানে হাত দিয়ে জিভ কামড়ালো আয়দান।
“ উপস, সরি মাই বিউটিফুল মাদার। ”
“ সরিটা তোমাকে আজ আরেকজনকে বলতে হবে। ”
জায়দানের শীতল কন্ঠস্বর মা ছেলের স্নেহ বিনিময়ের মাঝে হস্তক্ষেপ করলো। আয়দান জেসমিনের কাঁধে হাত জড়িয়ে বড় ভাইয়ের চোখের দিকে চেয়ে ঠোঁটে হাসি নিয়েই বললো,
“ হাহা! কার কাছে আবার? ”
জায়দান জবাব না দিয়ে পাশে ঘুরলো। একপাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা রোজিনাকে আদেশ করলো,
“ আয়দানের বেডরুম থেকে ওর একটা টি শার্ট আর হুডি নিয়ে এসো। বাইরে ঠান্ডা বাড়তে শুরু করেছে। ”

নিজের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছি আমি। রুমের জানালা হাট করে খোলা। নভেম্বরের রাতের কনকনে বাতাস প্রবেশ করছে ভেতরে। হাফ হাতা টি শার্ট গায়ে থাকায় সেই হাড়হীম করা বায়ু আমার শরীরের রোম খাড়া করে দিচ্ছে। তবুও বিশেষ নড়চড় নেই। মনে হচ্ছে বুঝি শীতের প্রকোপটা শরীরে নয়, পড়েছে আমার মনে।
আমার হোমমেড পিৎজা বিক্রির অনলাইন পেইজটা মানুষের মাত্রাতিরিক্ত রিপোর্টের কারণে সাসপেন্ড হয়ে গিয়েছে। আগে থেকে যে অর্ডারগুলো ছিলো, সেগুলোও সব ক্যানসেল করে দিয়েছে কাস্টমারেরা। গরম গরম তৈরী করা পিৎজাগুলো বক্স ছাড়াই অত্যন্ত অবহেলায় পড়ে আছে ডাইন ইন টেবিলে। খোলা জানালা বেয়ে আসা দুইটি মাছি ভনভন করছে সেখানে। অন্যদিন হলে হাইজিন মেইনটেইন করার জন্য উঠেপড়ে লাগতাম। জানালা অবধি বন্ধ রাখতাম। কিন্ত আজ, কিছুই বোধ হচ্ছেনা। আমার ঠিক বিপরীত পাশের বিছানায় চুপটি করে বসে আছে মীরা। কম্বল জড়িয়ে সে নিজের শীত নিবারণ করে রেখেছে, তবুও আমায় জানালা আটকাতে বলছেনা।
নিজের ভাগ্যের প্রতি নিজেরই চরম হাসি পেলো আমার। দীর্ঘ দশটা মাস যাবৎ তিলে তিলে গড়ে তোলা নিজের সবটুকু জীবিকার অবলম্বন একটা দিনেই গুঁড়িয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণভাবে। সঙ্গে মানুষের বাঁকা দৃষ্টি। পেইজ সাসপেন্ড হওয়ার আগে ইনবক্সে যেসব মেসেজ এসেছে তা আমার সমস্ত শরীরে সূচ ফুটিয়ে দিয়েছে যেন। নিজেকে সত্যিই কেন যেন পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অস্তিত্ব মনে হচ্ছে আমার।
আমি অপরাধী। বহু পাপ করেছি এই ঠুনকো জীবনে। তাই বোধ হয় রহমানুর রহিম আমায় এমন শাস্তি দিচ্ছেন। এই শাস্তি হয়ত আমার প্রাপ্য।

“ স্কুটিটাও আর ঠিক করা যাবেনা না? ”
মীরা নৈঃশব্দ্য ভেঙে মিনমিন করে উচ্চারণ করায় আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম।
“ ইঞ্জিনটাই গুঁড়িয়ে গিয়েছে। ওটা ঠিক করতে যা লাগবে, তার তুলনায় নতুন একটা কিনে নেয়াই শ্রেয়। ”
বিছানা ছেড়ে নেমে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে খানিক ঝাঁকিয়ে বুঝি ভরসা দেয়ার চেষ্টা করলো মীরা।
“ সাবিন। বেশি চিন্তা করিস না। কয়েকটা দিন তো। তুই বাসায় থাক। আমার ইনকামে আমাদের দুইজনের চলে যাবে। আমি দেখছি, তোর জন্য কোথাও কাজের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। একদম মন খারাপ করিস না, আমি আছি না? ”
মীরাকে এই মুহূর্তে কি বলা উচিত মাথায় আসলোনা আমার। তার দুহাত ধরে খানিকটা চেপে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ধরে রেখেই বললাম,

“ আমার জন্য এত চিন্তা করিস না। তুই না বলেছিলি তোর কেকের জন্য জিনিস কিনতে যেতে হবে? প্লীজ যা। যদি তোর ইনকামেই চলতে হয়, তাহলে তো তোকে মন দিয়ে কাজ করতে হবে বল? নিয়ে আয়। আজ আমিও তোকে বেকিংয়ে সাহায্য করবো। ”
বান্ধবীর চোখে পানি ছলকে উঠলো। ঝুঁকে আমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে সে বললো,
“ তুই এত্ত শক্ত একটা মেয়ে, আমার সাবিনটা কত্ত সাহসী! আমি বদদোয়া দিচ্ছি, ওই শয়তানদের কোনোদিন ভালো হবেনা তুই দেখে নিস! তোর মতন একটা চমৎকার মেয়ের সঙ্গে এত খারাপ হতেই পারেনা। ”
চমৎকার? আমি?
মলিন হাসলাম শুধু। মীরা কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরী হয়ে বেরোলো। ইতস্তত করলেও আমিই ঠেলে জোর করে পাঠালাম। তারপর আগের মতন চুপচাপ ভেতরে ঢুকে জানালার কাছে গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সমস্ত শরীর হিম প্রবাহে ধীরে ধীরে বরফখন্ডে পরিণত হতে লাগলো আমার।
“ ড্যাড। তুমি ঠিকই বলতে। একদিন আমি বুঝবো জীবন কতটা কঠিন! আজ আমি সত্যিই বুঝেছি ড্যাড, সত্যিই বুঝেছি। ”
আনমনে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম আমি। চোখে জমতে চাওয়া অশ্রুগুলো জমতে পারলোনা। আড়ালে থাকলো এক শক্ত নারীত্বের দেয়ালের ওপারে। ঠিক কতক্ষন কেটেছে আর হিসাবে রইলোনা। দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দে মনোযোগ আকর্ষিত হলো আমার। মীরা এসে পড়েছে? এত জলদি? অবাক হয়ে এগোলাম। খুলে দিলাম দরজা।

“ তোকে না বলেছি নির্দ্বিধায় যেতে? আমি একদম ঠিক আ….”
মুখের কথা মুখেই আটকে রইলো আমার। শব্দগুলো যেন গলার ভেতরে দলা পাকিয়ে গেলো। বুকের ভেতর ভয়ানক এক মোচড় দিয়ে উঠলো। তীব্র আলোড়ন ছড়িয়ে পড়লো শরীরের প্রতিটি রোমকূপজুড়ে। এই আলোড়ন শীতের নয়।
জায়দান আরেফিনের উপস্থিতির।
আমার প্রাক্তন স্বামী। আজ আবারও দন্ডায়মান আমার মুখোমুখি। ঠিক সেদিনের মতন। পার্থক্য শুধু সেদিন সে ছিলো দরজার এপাশে, আমি ওপাশে।
ওই গভীর বাদামী নয়নে দৃষ্টি মিলিত হলো আমার। নির্লিপ্ত সাগরমাঝে একরাশ বাদামী প্রশান্তি। চশমার লেন্সের অপর প্রান্ত থেকে চেয়ে আছে আমার দিকে। যেন আমাকে নয়, দেখছে আমার ভেতরের রূহকে। অজান্তেই দরজার হাতলে সজোরে চেপে বসলো আমার হাত। একটি শক্ত ঢোক গিললাম। আমার হৃদয়ে আরম্ভ হলো নিদারুণ ঘূর্ণিপাক। তবে সেই ঘূর্ণিপাকের মাঝে অগ্ন্যুৎপাত ঘটলো ক্রোধের আগ্নেয়গিরির, যখন দেখলাম জায়দান একা নয়। তার পাশে, সামান্য পিছনে অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে হুমকিস্বরূপ ভঙ্গিতে দাঁড়ানো,
আয়দান!

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২

এবার মনে পড়েছে কেনো ওই বান্দার চোখ দুটো আমার চেনা চেনা লাগছিলো। আমার প্রাক্তন স্বামীর অতি চরিত্রবান গুণধর ভাই কিনা! যে নিজের বড় ভাইয়ের বিয়ের সময়ও বিদেশ থেকে দেশে আসার প্রয়োজনবোধ করেনি। নাম শোনা বাদে সরাসরি পরিচয় হয়নি কোনোদিন।
আমার ভ্রু জোড়া তীব্র কুঞ্চন ধারণ করতেই ভেসে এলো প্রাক্তনের সেই সুপরিচিত নির্বিকার প্রশান্ত কন্ঠস্বর।
“ মে উই, কাম ইনসাইড, সাবিন? ”
চোখ ফিরিয়ে ওই বাদামী গহ্বরে আকুল তাকিয়ে রইলাম আমি। মীরা বাদে এই প্রথম অন্য কোনো কন্ঠে নিজের অপছন্দের নামটা মধুর শোনালো আমার কানে।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here