সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪
জাবিন ফোরকান
“ আহ্….”
সমস্ত শরীরজুড়ে অদ্ভুতুড়ে এক প্রস্রবণ খেলে যাচ্ছে আমার। এমন এক সুতীব্র সুখ এবং বেদনার মিশ্র অনুভূতি কেমন হবে তা সহস্রবার কল্পনা করা সত্ত্বেও বাস্তবে এসে কোনো মিল দাঁড় করাতে পারছিনা। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে লতানো শরীর। বুকের উপর চাপ লাগছে কোমল স্পর্শের। অনুভব করতে পারছি, উরুর নিচের অংশ বেয়ে গড়িয়ে যাওয়া উষ্ণ তরলের উপস্থিতি।
“ জায়…জায়দান..! ”
সুগভীর অনুভূতির আলোড়নে জমা অশ্রু দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। ওই মুখটা আলতোভাবে ভাসছে নয়নমাঝে। মুখজুড়ে চিকচিকে ঘামের ফোঁটা রুমের ক্ষীণ হলুদাভ আলোয় জ্বলজ্বল করছে স্বর্ণের ন্যায়। কপালে লেপ্টে যাওয়া চুলের গোছা ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার কপাল। মনে হচ্ছে চোখের সামনে কোনো স্বপ্ন ভাসছে। আমার ভালো লাগা উচিৎ। প্রচন্ড ভালো লাগা। অথচ বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। ভ্রু কুঁচকে এলো যাতনায়। ফিসফিস করে বললাম,
“ ব্যথা লাগছে। ”
জায়দান নড়াচড়া বন্ধ করে দিলো তৎক্ষণাৎ। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে লাগলো। ওই ঘন বাদামীর মাঝে নিদারুণ এক কোমলতা ভাসতে দেখলাম আমি। ঝুঁকে এসে আমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে আলতো কিছু আদুরে চুমু খেলো নব্য বিবাহিত স্বামী আমার। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে দারুন লড়তে হচ্ছে তাকে। আমার পাশের বিছানার চাদর সে এতটা জোরে মুঠো পাকিয়ে চেপে ধরে রেখেছে যে তার আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
“ সরি। দ্যা পেইন শ্যুড গো বায় নাউ। ”
নরম কণ্ঠটি একেবারে আমার অন্তরে গিয়ে লাগলো বুঝি। জায়দানের ঠোঁট আমার ঠোঁট ছেড়ে গাল, কপাল এবং চিবুকে আদর বুলিয়ে গেলো। বিয়ের প্রথম রাতে স্ত্রীকে যত্নে রাখার মাঝে কোনো কমতি নেই তার। কিন্তু আমার সহ্য হলনা। একটুও না। আমার সঙ্গে তো এমনটা হওয়ার কথা ছিলনা!
আমার এই লোকটার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলনা। ড্যাম ইট! ড্যাম ড্যাড! ড্যাম হাসব্যান্ড! ড্যাম এভরিথিং!
জায়দান সামান্য একটু নড়লো। তাতেই আমি তার খোলা পিঠ খামচে ধরে চেঁচিয়ে উঠলাম,
“ আই সেইড ইট হার্টস! শুনতে পাওনি তুমি? ”
আমার দৃষ্টি থেকে সব ধোঁয়াশা দূর হয়ে ঝড়লো শুধু প্রলয়ংকরী আগুন। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামলো এক ফোঁটা ঘৃণার অশ্রু। দেখুক এই লোকটা! ভালোমত দেখুক আমি তাকে কতটা ঘৃণা করি!
জায়দান খানিক মুহূর্ত একদম নিঃশব্দে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। একটি ঢোক গিললো সে। গলায় উঁচু হয়ে থাকা অ্যাডামস অ্যাপল অংশটি বেশ খানিক নড়ে উঠলো। তারপরই আমার দুপাশ থেকে হাত সরিয়ে উঠে বসলো সে। সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে কম্বল টেনে নিজের শরীর আবৃত করে ফেললাম। জায়দান আমায় কিছুই বললোনা। চুপচাপ বিছানা ছেড়ে উঠে একপাশে রাখা সিল্কের রোবটা শরীরে জড়িয়ে বাথরুমে চলে গেলো। বাসর রাতের ফুলেল সজ্জিত বিছানায় একা পরে রইলাম আমি।
মুখে তীব্র ক্রোধ, বুকে এক আকাশসম অভিমান। ড্যাড আমার সঙ্গে এমনটা করতে পারলো? বয়স কি খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল আমার? এইতো সেদিনই না কনভোকেশন হলো? তারপর একটা বছরও কি ঠিকমত পেরিয়েছে? কোথাকার কোন বন্ধুর ছেলের সঙ্গে আমায় ধরে বেঁধে দিয়ে দিয়েছে! এই লোক আর আমি? কিভাবেই বা ভাবতে পারলো ড্যাড যে আমি কোনোদিন এই লোকটাকে স্বামী হিসাবে মেনে নেবো? বেশ ড্যাড। তুমি তোমার মেয়ের সঙ্গে খেলতে চাইছো তো? ভুলে যেওনা আমিও তোমার র*ক্ত। তোমার সঙ্গে আমি তোমার মতন করেই খেলবো!
কতক্ষণ একা একা ভাবনায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলাম টের পাইনি। বাস্তবে ফিরলাম বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে। জায়দান বেরিয়ে এসেছে। পরনে একটা ট্রাউজার শুধু। প্রশস্ত বুক বেয়ে পানির ফোঁটা গড়াচ্ছে। চেহারা যথারীতি শান্ত। এই লোককে আমি খুব বেশিদিন দেখছিনা। কিন্তু যতদিন দেখেছি, তার মধ্যে কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি। যান্ত্রিক রোবট যেন। যে অনুভূতিতে নয়, চলে নিজের সেট করা প্রোগ্রাম অনুযায়ী।
জায়দানের হাতে একটি সিরামিকের পাত্র এবং নরম তোয়ালে। রুমের ভেতর এগিয়ে এসে সে টেবিলে ঝুঁকলো। নিজের চশমাটা তুলে নিয়ে চোখে দিলো। পিছন থেকে তার পিঠে নখের আঁচড়গুলো স্পষ্ট দেখলাম আমি। কিছুক্ষণ আগে যে খামচে দিয়েছি, তা বেশ বাজেভাবেই ক্ষত করে ফেলেছে। অনুশোচনা হলো?
একটুও না। বেশ হয়েছে! আরো করুক আমাকে বিয়ে!
চশমা এক আঙুলে নাকের ডগা থেকে খানিকটা উপরে তুলে জায়দান বিছানায় এসে বসলো। নাইটস্ট্যান্ডে সিরামিকের পাত্রটি রাখতেই দেখলাম তাতে হালকা গরম পানি রয়েছে। স্বামী আমার নিঃশব্দে কম্বলটা সরালো। আরেক দফায় খেঁকিয়ে উঠতে গেলাম,
“ অদ্ভুত পুরুষ তো তুমি! মানা করার পরেও কথা শোনো না! এত লালসা তোমার নারীদেহের প্রতি? ”
আমি জানি, যেকোনো পুরুষ মাত্রই আমার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধ দেখানো উচিত। অতিরিক্ত রাগী হলে দুই চারটা চড় থাপ্পড় দেয়া অসম্ভব না। তবে জায়দান আমার কথার কোনো উত্তরই করলোনা। আলতো করে আমার পা নিজের কোলে তুলে নিলো। নরম তোয়ালেটা গরম পানিতে ভিজিয়ে ভালোমত নিংড়ে সেটি দিয়ে মুছে দিতে লাগলো আমার উরু। মনোযোগী তার বাদামী নয়নজোড়া। চশমার উপর ছড়িয়ে রইলো হালকা ভেজা এলোমেলো চুলের ডগা। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম। এমন আচরণের অর্থ উদঘাটন করতে পারলাম না।
আমার দুই পাই একদম গোড়ালী অবধি ভালোমত মুছে দিয়ে জায়দান উষ্ণ ভেজা তোয়ালেটা আমার তলপেটে রাখতে রাখতে নিচু গলায় বললো,
“ দুঃখিত। আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা ব্যথা পাবে।”
আমার কি যেন হয়ে গেলো। আঙুল তুলে নিজের মাথায় চেপে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললাম,
“ তোমার মাথার স্ক্রু ঢিলা? ”
জায়দান আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমায় পুনরায় বিছানায় শুইয়ে দিলো। ঝুঁকে কপালে অতি আলতোভাবে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে জানালো,
“ শুভরাত্রি। ”
সারাদিনের বিয়ের ব্যস্ততায় আমার শরীর এতই ক্লান্ত ছিলো যে আমি খুব বেশি তর্ক করারও সুযোগ পেলাম না। কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুম আমায় গ্রাস করলো। বাসর রাতের প্রহর তখনো চলমান। অথচ সেথায় অর্ধসমাপ্ত অভিসার।
সেদিনের পর থেকে জায়দান আর কোনোদিন আমার কাছাকাছি আসেনি।
বর্তমান।
কিচেন থেকে বেরিয়ে এলাম ছোট্ট একটি ট্রে হাতে। জায়দান আমার বিছানার একপাশে বসে আছে। দৃষ্টি আবদ্ধ নিজের কোলে গুটিয়ে রাখা হাতের মাঝে। হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে অভিজাত এক ভঙ্গিতে বসমান সে, নিষ্প্রাণ ভাস্কর্যের মতন। অন্যদিকে আয়দান চেয়ারে দুইদিকে দুই পা ছড়িয়ে মুখ উল্টোদিকে করে বসে আছে। মাথা ঘুরিয়ে চারপাশের সকল খুঁটিনাটি দেখছে। চোখমুখজুড়ে ভাসছে এক কুটিল অভিব্যক্তি। আমি নিশ্চিত, এই ছেলে আমার জীবনযাপনের অবস্থা দেখে মনে মনে খুব বিনোদিত হচ্ছে।
আমি এগিয়ে গেলাম। খানিক ঝুঁকে ট্রে জায়দানের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
“ ব্ল্যাক কফি, নো সুগার। ”
জায়দান চশমার আড়াল থেকে একনজর ট্রে তে রাখা ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগটি দেখলো। তারপর হাত বাড়িয়ে সেটি নিলো।
“ থ্যাংকস। ”
ট্রে একপাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম আমি। নির্দ্বিধায় বললাম,
“ চেয়ারে বসে থাকা বদমাইশটার জন্য আমার বাসার পানিও হারাম। ”
তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেখালো আয়দান। এত জোরে লাফিয়ে উঠলো যে চেয়ারটা ঠকঠক করে মেঝেতে আওয়াজ করতে লাগলো।
“ চুন্নি! তোর বাসার পানির ট্যাংকিতে আমি মুতি! ”
“ আয়দান! ”
ধ্বনিত হলো জায়দানের শীতল কন্ঠস্বর। নির্লিপ্ত এক সতর্কবাণী যেন। আয়দান দাঁতে দাঁত পিষে ধপাস করে পুনরায় চেয়ারে বসে পড়লো। ভ্রু কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো আমার দিকে। আমি নিশ্চিত, ওই চোখ ব*ন্দুক হলে সহস্র বু*লেট আমায় বিদ্ধ করতো সহসাই। তাতে কি? আমি কি কম যাই? পাল্টা চোখে বজ্রপাত নিয়ে তাকালাম আমিও। নাটকি কোথাকার! তোকে ভয় পাই ভেবেছিস?
কফির মগ ট্রেতে রেখে জায়দান আমার দিকে ফিরলো। বললো,
“ আমি কোনো ভণিতা করে তোমার আর আমার দুজনের কারো সময়ই নষ্ট করবোনা। আয়দান যা করেছে, তার জন্য শুধুমাত্র ও নয়, আমিও তোমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। ”
“ আমি একটুও দুঃখ প্রকাশ করছি না। সব ভাইয়ার নাটক। বেশরম বেটি, তোর সঙ্গে যা করেছি, বেশ করেছি! সুযোগ পেলে আবার করবো! ”
দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললাম আমি। না না, এই ছেলেকে ঠাটিয়ে আরো দুটো দিলে কেলেংকারী হয়ে যাবে। কিন্তু মন তো কিছুতেই মানতে চাইছেনা। চেয়ার দূরে ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে আয়দান সিগন্যাল টাওয়ারের মতন আমার উপর ঝুঁকে এলো। লম্বাটে অবয়ব জুড়ে তার ক্রুর আবাহন। আরেফিন বংশটাই উচ্চতায় সীমাহীন। বাপ, দুই ছেলে, একেকটা আইফেল টাওয়ার গোছের। এজন্য আমি জায়দানকে হরহামেশাই টাওয়ার বলে ক্ষেপানোর চেষ্টা করতাম। লোকটা অবশ্য তাতে কোনোদিন বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
“ শালা! তোর দুঃখ কি আমি ঝোলায় ভরে রাখবো? নাকি তোর দুঃখ পেলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেমে যাবে মনে করিস? ওই দুঃখ আমার গলির টোটোও চাটেনা! ”
“ টোটো? ”
আয়দানের ধবধবে ফর্সা লালচে চেহারায় দ্বিধার প্রলেপ দেখে বিস্তর হাসলাম। ঠোঁট বাঁকিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বললাম,
“ আমার বাসার নিচের গলিতে থাকে, রাস্তার কুত্তা। আসার সময় তোর পিছন কামড়ে ধরেনি তো! ওটার আবার ধলা পোল্ট্রির উপর খুব লোভ! ”
“ ইউ গডড্যাম মাদার ফাদার সাইকো উইম্যান! ”
আয়দানের আগ্রাসী চিৎকারের বিপক্ষে জায়দানের ভরাট কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।
“ এনাফ। ”
ফুঁসতে ফুঁসতে ভাইয়ের দিকে ঘুরে তাকালো বান্দা। হাত উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো,
“ তুমি দেখছোনা ভাইয়া? এই শালীর ঘরের শালী আমাকে কিভাবে অপমান করছে? তুমি কি কালা নাকি? এরপরও বলবে ওর কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ? ”
“ হ্যাঁ। কারণ শুরুটা তুমি করেছ। ”
আয়দান বুঝি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। রাগে ঠোঁট কাঁপা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলোনা সে। জায়দান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। সরাসরি ভাইয়ের চোখের দিকে চেয়ে বললো,
“ বারবার তুমি ভুল করবে আর সেই ভুলের চিহ্ন পিছনে পিছনে আমি সাফ করে আসবো ভেবে থাকলে বোকার স্বর্গে বাস করছো। ওকে সরি বলো। ”
দুহাত সজোরে মুঠো পাকালো আয়দান। সমস্ত শরীরে ক্রোধতরঙ্গ খেলে যাচ্ছে তার। বুকে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি মেখে চেয়ে রইলাম আমি। নিঃশব্দে। বেশ লাগছে দৃশ্যটা। দাঁত কিড়মিড় করে আয়দান বিড়বিড় করলো,
“ সসস…সও…রি…”
“ কি বললি? শুনতে পেলাম না। ”
ঝুঁকে কানে কনিষ্ঠা আঙুল চালিয়ে ভান ধরলাম আমি। তাতে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে আয়দান দ্বিতীয় দফায় সামান্য একটু জোরে বললো,
“ স… রি। ”
“ অ্যাহ্? ”
ধৈর্য্যের বাঁধ বোধ হয় ভেঙে গেলো ছেলেটার। এবার আমার মুখ চেপে ধরে কানের কাছে চিৎকার করে উঠলো,
“ সরি! সরি! আমি অনেক সরি! আর কতবার শুনতে চাস ইবলিশের নানী? ”
আরেকটু হলে বোধ হয় কান থেকে র*ক্ত উঠে আসবে। তবুও অট্টহাসি হেসে উঠলাম আমি। তাতে অহংবোধ গুঁড়িয়ে যাওয়ায় আয়দান ধাক্কা দিয়ে আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো। নিজের বড় ভাইয়ের দিকে একনজর তাকালো অগ্নিদৃষ্টিতে। তারপর উল্টো ঘুরে বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলো হনহন করে। পিছনে দরজাটা এত জোরে আটকে দিয়ে গেলো যে শব্দে কেঁপে উঠলো চারপাশ।
“ দরজা ভেঙে গেলে তার ক্ষতিপূরণ কি তোর বাপ দেবে শা….”
বলতে বলতে জিভে কামড় দিয়ে আটকে ফেললাম নিজেকে। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে আড়চোখে জায়দানের দিকে তাকালাম। শান্তশিষ্ট লোকটি বোধ হয় এত উচ্চবাচ্যে ভীষণ বিরক্ত। চশমা খুলে চোখের উপরের ভ্রু ঘষছে আঙুলের ডগায়। ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতি হয়ত বা।
আয়দান বেরিয়ে যেতেই এক প্রগাঢ় নীরবতা ভর করলো আমাদের দুজনের মাঝে। হঠাৎ করেই অনুভূত হলো, আমি আমার প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে একান্তে আছি, বহুদিন বাদে। বিষয়টা আজ থেকে কিছুদিন আগেও আমার জন্য ছিলো অসম্ভব। অথচ তাই কেমন জটিলভাবে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। চুপটি করে আমার বিছানার পাশের মীরার বিছানায় বসে পড়লাম। জানালার দিকে তাকিয়ে আনমনে পা দোলাতে লাগলাম। শীতের প্রভাবটা আর গায়ে লাগছেনা। দূর থেকে শনশনে হওয়া বইবার আওয়াজ মিশ্রিত হলো দেয়ালঘড়ির কাঁটার তালের সঙ্গে। অদ্ভুত এক নীরবতা ছেদনকারী সুরের মেলবন্ধন।
বিছানার ফ্রেমের ক্যাচ করে হালকা আওয়াজে সরাসরি না তাকিয়েও বুঝলাম জায়দান বসেছে। মুখ ঘুরিয়ে নীরবে তাকালাম। কফির মগে চুমুক দিয়ে নিঃশব্দে কিছু ভাবছে মনে হলো। ওই চশমার লেন্সে প্রতিফলিত হচ্ছে ধোঁয়াটে বাষ্প। ভেতরের বাদামী সমুদ্র চিকচিক করছে। ডিভোর্সের পর স্বপ্নে আমাকে সবথেকে বেশি তাড়িয়ে বেড়ানো দুটো অস্তিত্বের একটি ওই নয়নজোড়া। যা এককালে ছিলো আমার বড়ই অপ্রিয়। এখন, বিশেষ কোনো অনুভূতিহীন।
কফি সুস্থিরভাবে সমাপ্ত করে মগ ট্রেতে নামিয়ে রাখলো জায়দান। তারপর সুদীর্ঘ নৈঃশব্দ্য ভেদ করে বললো,
“ আই ক্যান রিকভার ইওর পেইজ। তুমি চাইলে আমি তোমার বিজনেস পেইজ ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাবো। আর স্কুটির ব্যাপারটা। আমাকে মডেলটা জানালে ভালো হয়। নতুন স্কুটি কিংবা টাকা, তুমি যেটা চাইবে সেটাই হবে। ”
স্থির চেয়ে রইলাম মানুষটার চোখের দিকে। কথাগুলো সে কি সুন্দর নির্লিপ্তভাবে বলছে! আচ্ছা, সে কি সত্যিই এতটাই অনুভূতিশূণ্য? আমাকে দেখে তার একটুও কষ্ট হচ্ছেনা? কিংবা রাগ? অথবা ভিন্ন কিছু? সামান্য কোনো অনুভূতি? সংসারজীবনে যতদিন মানুষটার সঙ্গে কাটিয়েছি, কোনোদিন তাকে মনখুলে হাসতে দেখিনি। একবার দুইবার ঠোঁটের কোণ দুটো সামান্য একটু উঁচুনিচু হতে দেখেছি, ওইটুকুই তার হাসি। আর কান্না? যেনো অশ্রু নামক শব্দটি তার অভিধানেই নেই। মানুষ কি এতটাও শীতল রক্তের নির্বিকার প্রাণী হতে পারে?
জানা নেই। তবে জায়দান পারে। তাই তাকে মানুষ কম রোবট বেশি মনে হয় আমার কাছে।
একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। মাথা দুলিয়ে বলে উঠলাম,
“ ইটস ফাইন। আমার স্কুটি কিংবা টাকার প্রয়োজন নেই। তুমি যদি পারো, শুধু আমার বিজনেস পেইজটা ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করো। এটুকু যথেষ্ট। ”
জায়দান খানিকক্ষন আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর তর্ক ছাড়াই মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে বললো,
“ ঠিক আছে। তোমার পেইজ ডিটেইলস আমার ই মেইলে পাঠিয়ে দিও। ”
“ এখনো সবাইকে জি মেইল ঠিকানা দিয়ে বেড়াও? পুরাতনটাই তো, তাইনা? ”
আমার ঠোঁটে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটলো। শুনতে হাস্যকর হলেও জায়দানের স্ত্রী থাকাকালীন অবস্থায়ও আমার কাছে তার কোনো ব্যক্তিগত আইডি ছিলোনা। যোগাযোগের মাধ্যম ছিলো দুটো। ফোন নাম্বার, যাতে কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার লিঙ্ক নেই, এবং ই মেইল।
“ পুরাতনটাই। ”
এক শব্দে উত্তর দিয়ে উঠলো জায়দান। নিজের ব্লেজার খানিকটা টেনে ঠিকঠাক করছে দেখে বুঝলাম বান্দা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি কোনো বাঁধা দিলাম না। বুঝতে পারছিনা, বুকের ভেতরের অনুভূতিটা ঠিক কেমন। দরজার দিকে পা বাড়িয়ে হাতল ধরে টেনে খুললো জায়দান। তবে বাইরে পা রাখলনা। উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার খানিক জবুথবু হয়ে থাকা অবয়বের দিকে চেয়ে শুধালো,
“ একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি? ”
মাথা তুলে তাকালাম আমি। চোখ পিটপিট করলাম।
” করো। ”
জায়দান চোখ ঘুরিয়ে প্রথমবারের মতন আমার এক রুমের ছোট বাসাটা দেখলো। একটা বড়সড় রুমের মাঝেই একপাশে দুটো ছোট ছোট বিছানা এবং অন্যপাশে ডাইন ইন টেবিল। লাগোয়া রান্নাঘরে দুটো ওভেনই প্রায় অর্ধেক জায়গা নিয়ে নিয়েছে। এদিক সেদিক ছড়িয়ে আছে বেকিংয়ের জিনিসপত্র। আমার পরনের পোশাকগুলো চেয়ার আর জানালার গ্রিলে ঝুলছে। একটি গোছানো পড়ার টেবিল একদম এক কোণে যেটা মীরা ব্যবহার করে। সবকিছুই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো সে। তারপর জিজ্ঞেস করলো অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটি।
“ দেনমোহরের টাকাগুলো কোথায়? ”
মনে হলো, বুঝি আমার অন্তরটাই সম্পূর্ণ জমে গিয়েছে। একটা সুতীব্র শারীরিক ব্যথা অনুভব করলাম। ছটফট করে উঠলো কিছু একটা। দেনমোহর? চল্লিশ লাখ টাকা। যেটার প্রতিটি পয়সা জায়দান আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তার প্রশ্ন অমূলক নয়। কিন্তু এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবো আমি?
মুখে ক্রোধ ফুটলো। বিছানার চাদর আকড়ে ধরলাম আমি। ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলে উঠলাম,
“ নান অব ইওর বিজনেস! ”
জায়দান স্থির চেয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু গলায় বললো,
“ নান অব মাই বিজনেস, নট এনিমোর। ”
উল্টো ঘুরে দরজার বাইরে পা রাখলো সে। আমার কি যেনো হয়ে গেলো। বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে উন্মাদের মতন দরজার কাছে ছুটে এলাম। সিঁড়ি বেয়ে যখন পায়ে পায়ে নিচে নামতে দেখলাম প্রাক্তন স্বামীকে, অন্তরের তীব্র চাহিদায় প্রশ্নটা করেই বসলাম,
“ তুমি কি সবার জন্যই এক? যদি এমন কিছু অপরিচিত কারো সঙ্গে হতো, তাহলেও কি তুমি আয়দানকে নিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতে যেতে? ”
শেষ সিঁড়ির ধাপে থমকে গেলো জায়দান। মাথা তুলে আমায় দেখলো। চশমার লেন্সের ওপাশে থাকা বাদামী নয়ন বুঝি শরীর ভেদ করে পৌঁছে গেলো অন্তর অবধি। নির্বিকার জবাব দিলো সে,
“ আমি আর তুমি অপরিচিতই, সাবিন।”
—আজকের পর থেকে আমরা একে অপরের কাছে অপরিচিত।
যেন নিজের কথাটাই ভেসে এলো আমার কানে। সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে নিচে তাকিয়ে রইলাম। জায়দান আর দাঁড়ালোনা। হালকা পদশব্দ তুলে ধীরে ধীরে নেমে গেলো সিঁড়ি বেয়ে। আড়াল হয়ে গেলো আমার দৃষ্টিসীমার। এই সীমানার মাঝে আর কখনো তাকে দেখব কিনা, জানা নেই।
সত্যিই আমরা অপরিচিত। অতীত হোক বা বর্তমান, একে অপরকে কোনোদিন আমাদের চিনে ওঠা হয়নি।
গলির মুখের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে ঝগড়ায় মেতেছে মীরা। মেজাজটা তার খিঁচে আছে এমনিতেই। সারাটা দিন সাবিনের ঘটনা নিয়ে যা তোলপাড় হলো তারপর এই ঝামেলাটুকু একদমই সহ্য হচ্ছেনা।
“ কি অদ্ভুত কথা বলছেন মামা? যখন রিকশায় উঠলাম তখন বললেন, যা ভাড়া তাই দিতে। এখন ত্রিশ টাকার রাস্তার ভাড়া চাইছেন সত্তর টাকা? এক ধাক্কায় দ্বিগুণেরও বেশি? ”
“ রাত হইসে। আপনারে আমি এরপরও নিয়া আসছি একলা মেয়ে মানুষ দেইখা। এইভাবে গরীবের পেটে লাথি দেয়ার চেষ্টা করবেন না আফা। সত্তর টাকার থেকে একটা পয়সাও আমি কম নিতে পারমু না। ”
রিকশাওয়ালার কন্ঠ অনড়। তাতে ভীষণ ক্ষেপে গেলো মীরা। তবুও জোরপূর্বক শান্ত রাখলো নিজেকে, ধীরে ধীরে বলার চেষ্টা করলো,
“ দেখুন মামা। আমার কাছে চল্লিশ টাকাই আছে। ঠিক আছে? আর আমি আপনাকে বলিনি আমি একলা মেয়ে, অনেক রাত এরপরেও আমাকে এখানে নিয়ে আসতে। আমি জিজ্ঞেস করেছি যাবেন কিনা, আপনি বলেছেন হ্যাঁ। এখন কথা ঘোরানো তো ভালো লোকের মত হলোনা। ”
“ তাইলে আমারে খারাপ লোক মনে করেন। সমস্যা নাই। চল্লিশ টাকা দিয়া আমি কি করবো? জানিনা এটা আপনি আমার সত্তর টাকা দেন। নইলে…”
“ নইলে কি করবি? ”
পুরুষালী হুমকিপূর্ণ কন্ঠস্বরটি নির্জন রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হলো নিশাচরের ডাকের মতন। তৎক্ষণাৎ মাথা কাত করে তাকালো মীরা। ছ ফুটের ঊর্ধ্বে এক ছায়ামানবকে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধ্বক করে উঠলো। আঁধার ছেড়ে আলোতে আসতেই মুখটা পরিষ্কার হলো। ধবধবে ফর্সা, গালে ব্যান্ডেজ। মুখের ভেতর কিছু একটা চিবিয়ে চলেছে, বাবল গাম নাকি অন্য কিছু বোঝার উপায় নেই। সোজা হেঁটে রিকশাওয়ালার কাছে এলো সে। মীরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
“ আপনে কেডা? এই বিষয়ে মাতেন কেনো ভাই? ”
ছেলেটি চোখ ঘুরিয়ে রিকশাওয়ালাকে আপাদমস্তক দেখলো। চোয়াল নড়ছে তার চিবানোর কারণে। চুপচাপ পকেটে হাত ঢুকিয়ে দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট বের করলো সে। তারপর এগিয়ে রিকশাওয়ালার পুরাতন শার্টের পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে সে বললো,
“ এইযে তোর ভাড়া। আর এটা বকশিশ! ”
বলার সাথে সাথে রিকশাওয়ালার চোয়াল বরাবর সজোরে ঘুষি বসিয়ে দিলো ছেলেটা। তাতে লোকটা ছিটকে গিয়ে রাস্তায় আছড়ে পড়লো। আঁতকে উঠলো মীরা। ভয়ে দুইপা পিছিয়ে গেলো লাফিয়ে। রিকশাওয়ালা নিজের মুখ দুহাতে চেপে ধরে বিস্ফা*রিত দৃষ্টিতে তাকালো সামনে। দিকজ্ঞান দিশাহারা হয়ে আর্জি জানালো,
“ আমি গরীব মানুষ, আমারে ছাইড়া দেন ভাই। ”
ছেলেটাকে দ্বিগুণ ক্রোধান্বিত মনে হলো। পা তুলে তার কোমর বরাবর সজোর লাথি হাঁকিয়ে গর্জন তুললো,
“ গরীব? শালা, মানুষের সাথে বাটপারি করার সময় মনে থাকেনা? আমি গরীব, আমি গরীব বলে সিমপ্যাথি তো খুব কামাতে পারিস। আর বৃষ্টির দিনে তোদের ভাড়া হয়ে যায় তিনগুণ! মুমূর্ষু রোগী দেখলে তো কথাই নেই! রিকশা ভাড়া নাকি প্লেন ভাড়া চাস হুশে থাকেনা না? তোদের জন্যই ছোটলোক শব্দটা গা*লি হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়েছিল, রাস্কেল!”
রিকশাওয়ালা বেচারা এবার হাউমাউ করে কেঁদেই ফেললো। মীরা এগিয়ে এলো। চিন্তাভাবনা না করেই ছেলেটার বাহু চেপে ধরে তাকে সরিয়ে আনলো।
“ মিস্টার, আপনি একটু শান্ত হন। সব ঠিক আছে। এই মামা, আপনি যান তো এখান থেকে প্লীজ! ফার্দার কারো সাথে বাটপারি করার চেষ্টা করবেন না! ”
রিকশাওয়ালাকে দ্বিতীয় কিছু বলতে হলোনা। দ্রুত সে নিজের রিকশায় উঠে বসে উন্মাদের মতন প্যাডেল চালিয়ে দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেলো। ছেলেটি তখনো ফুঁসছে লক্ষ্য করে মীরা নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে ছোট পানির বোতলটা বের করে কর্ক খুলে এগিয়ে দিলো।
“ একটু পানি পান করে নিন। ”
ছেলেটি ঝট করে তার হাত থেকে বোতল নিয়ে মুখে পুরে দিলো। পুরোটা শেষ করে ফিরিয়ে কর্ক আটকে ফিরিয়ে দিলো। তার চোখের দৃষ্টিটা একটু শান্ত হয়েছে। মীরা নরম গলায় বললো,
“ আপনাকে ধন্যবাদ। আসলে আপনি শেষের কথাগুলো ঠিকই বলেছেন। তবে ওনাকে ওভাবে আঘাত না করলেই ভালো হতো। ”
“ এত দয়ার সাগর মাদার তেরেসা হতে হয়না। জীবনে মাঝে মাঝে হিটলার হওয়ার দরকার আছে। ”
বিরূপ মন্তব্যটি মীরাকে বিব্রত করে দিলো। তবে সেটির প্রকাশ ঘটালোনা সে। ছেলেটির মুখপানে খানিকক্ষণ চেয়ে বললো,
“ আ…ম, আপনার কোনো বিকাশ বা নগদ নাম্বার থাকলে একটু দিন। আপনার টাকাটা আমি পাঠিয়ে দেবো কালকের মধ্যেই। ”
ছেলেটির মুখ থেকে ক্রোধ সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেলো। একগাল হাসলো সে। ভীষণ প্রফুল্ল দেখালো সেই হাসি। মীরা বুঝি ক্ষণিকের জন্য সম্মোহিত হয়ে গেলো।
“ বিকাশ নগদ তো নেই। তবে আপনার ইনস্টাগ্রামটা পেলে যোগাযোগ থাকবে। যখন খুলবো, তখন নাহয় দেবো? ”
মীরা কেন যেন সামান্য লজ্জাবোধ করলো। ছেলেটা তার উপকার করেছে। তাছাড়া কিছুক্ষণ আগে তার বলা কথাগুলো ক্রুর হলেও সত্য ছিলো। ভালো লেগেছে তার, অস্বীকার করা যায়না। তাই মীরা নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তাকে দিলো। ছেলেটি নিজের ফোনে সেটি টুকে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো,
“ আপনার নামটা? ”
বাঁকা হাসলো ছেলেটি। হুডির পকেটে ফোন ভরে রেখে জবাব দিলো,
“ জায়দান! ইউ ক্যান কল মি, জাস্ট জান!”
ছেলেটার শেষ বাক্যে মীরা প্রতিক্রিয়া করার সুযোগও পেলনা। এর আগেই ইঞ্জিনের গর্জন তুলে পাশে হাজির হলো একটি বাইক। রাতের আলো আঁধারির মাঝে ভালোমত দেখার সুযোগও হলোনা। বাইকের পিছনে চেপে বসলো ছেলেটি। ব্লেজার পরিহিত আরোহী অপর একটি হেলমেট বাড়িয়ে দিলো তার দিকে। সেটি মাথায় দিয়ে মীরার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে ঘুরে বসলো সে। বাইকটি থেমে থাকলোনা। ঠিক যেমন করে এসেছিল, তেমন করেই মীরাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো নির্জন সড়ক বেয়ে। গলির মুখে হলদেটে স্ট্রিট লাইটের আলোয় দাঁড়িয়ে মনে মনে নামটি আওড়ালো মীরা,
“ জায়দান। ”
বাড়িতে ফিরে নিজের বেডরুমে ঢুকে সর্বপ্রথম একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো জায়দান। নিজের ব্লেজার এবং হাতঘড়ি খুলে নিয়ে রাখলো বিছানায়। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এসি চালু করে মিনি ফ্রীজের দিকে এগোলো। ভেতর থেকে একটা কোল্ড ড্রিংকের ক্যান নিয়ে শব্দ করে খুলে চুমুক দিলো। কন্ঠ বেয়ে নেমে গেলো শীতল ঝাঁঝালো তরল।
কাউচের সামনে টি টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার স্টুডেন্টদের টেস্ট পেপার শিট। প্রায় সব দেখা শেষ হয়ে গেলেও হাতে গোণা কয়েকটি বাকি আছে।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩
কাউচ এড়িয়ে ড্রিঙ্কস হাতে মেঝেতেই বসে পড়লো জায়দান। চোখের চশমা ঠিকঠাক করে কলম তুলে নিলো। একটা পেপার কাটা শেষ হতেই টেবিলের মাঝ বরাবর পরে থাকা মোটা চামড়ার মলাটের ভিন্টেজ গোছের ডায়েরীটা নজরে এলো তার। লম্বা হাত বাড়িয়ে সেটি টেনে কাছে নিলো। মাঝ বরাবর একটি খালি পৃষ্ঠা খুলে কোনো কারণ ছাড়াই স্থির তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকলো। দীর্ঘক্ষণ।
অতঃপর তার কলম উঠলো। খসখসে শব্দ তুলে টানা টানা প্যাচানো হাতের লিখায় ফুটে উঠলো ইংরেজি ভাষার একটি বাক্য।
॥ শি রিমেম্বার্স মাই কফি প্রেফারেন্স।
— ৮ নভেম্বর ২০২৫॥
