Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪০

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪০

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪০
জাবিন ফোরকান

সমস্ত শরীরে কম্বল পেঁচিয়ে গত আধ ঘণ্টা যাবৎ বিছানায় মোচড়া মুচড়ি করছি আমি। গুঙিয়ে উঠে কখনো মুখ ঢাকছি, কখনো বালিশে মাথা গুঁজে বিনা কারণে চিৎকার করছি। হাসপাতাল থেকে গতকাল বাসায় এসেছি। এর মধ্যেই আমার এমন আচরণ যে মীরার কাছে পাগলামি মনে হচ্ছে তা স্পষ্ট।
মীরা নতুন করে ক্যাফে বিজনেসে ফিরেছে। দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশনের দায়িত্ব সে আমার অবর্তমানে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সকল কাজে নিজেকে অভ্যস্থ করে বাসায় ফিরে আমার এমন অবস্থা দেখে বেচারী দ্বিধায় পরে গিয়েছে। বিছানার এক কোণায় বসে সে জোরপূর্বক কম্বল সরিয়ে আমার মুখ নিজের আজলায় তুলে শুধালো,

“কি হয়েছে তোর? বল তো আমাকে!”
ঠোঁট ফুলিয়ে হতাশা এবং লজ্জায় গুঙিয়ে উঠলাম।
“কিছু হয়নি। যাহ!”
“আমি এসে থেকে দেখছি তুই কই মাছের মতন ছটফট করছিস বিছানায়। ব্যথা হচ্ছে কোথাও?”
“উন্নাহ্!”
“তবে?”
পুনরায় কম্বল টানতে চাইলেও মীরা দিলোনা। অগত্যা উপায়ন্তর না পেয়ে বান্ধবীর কোলে মুখ গুঁজে পরে থাকলাম। আমার মাথায় শান্তনার হাত বুলিয়ে সে যখন সাত পাঁচ ভাবছে, তখন আমি মরছি নিজের জ্বালায়। এই মুখটা আমি ওই লোকটার সামনে দ্বিতীয়বার আনবো কিভাবে? কি জঘণ্য! কি লজ্জাজনক স্মৃতি!

সেদিন রাতে:-
ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ আজ মাদকীয় হয়ে উঠেছে। উত্তপ্ত ত্বক, উত্তেজিত শরীর। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ যেন বৃষ্টিধ্বনির সঙ্গে সঙ্গত করেছে। আমাকে কোলে নিয়ে সামান্য নড়ে ওঠার চেষ্টা করতেই জায়দানের মাথাটা ঠাস করে গাড়ির ছাদে গোত্তা খেলো।
“আউচ!”
নেশা কেটে গিয়েছে এমন ভঙ্গিতে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম আমি। স্বামী আমার ছ ফুট সাড়ে তিন। স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির ভেতর তাকে সাবধানে নড়াচড়া করতে হয়। উপরন্তু এমন বৈদ্যুতিক মুহূর্তে সে নিজেকে না নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, না তো রুখতে পারছে। তাকে নিজের মাথা ঘষতে দেখে আমি ফিক করে হেসে দিলাম।

“হেহে! আরেফিন টাওয়ার!”
“খুউব হাসি পাচ্ছে তোমার? তাইনা?”
“তোমার জন্য কোম্পানির স্পেশাল গাড়ি লঞ্চ করতে হবে। হাতির সাইজের!”
উপহাসের কথাটা শেষ করতে না করতেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম প্যাসেঞ্জার সিটের উপর শোয়া অবস্থায়। সমস্ত গাড়ি কাঁপিয়ে নড়েচড়ে আমার উপর ঝুঁকে এলো জায়দান। নিজের সুদীর্ঘ হাত পা কিছুতেই সে মেলতে পারছেনা। কখনো জানালায় গোত্তা খাচ্ছে তো কখনো অন্য সিটের সঙ্গে। তবে সে বদ্ধপরিকর এই সংকীর্ণ স্থানেও নিজের খায়েশ মেটাতে। কাছ থেকে কোথাও তীব্র হর্ন বাজিয়ে একটা বাস ছুটে গেলো। আমি কেঁপে উঠলাম,
“জায়…দান? আমরা রাস্তায়…”
“গাড়ির জানালায় ৭০% টিন্ট আছে। কেউ দেখবেনা।”
ফিসফিস করে ঝুঁকে এসে পুনরায় আমার ঠোঁটের দখল নিলো সে। আমার হাত বয়ে চললো তার উন্মুক্ত পিঠজুড়ে। নখের আঁচড় কাটতে লাগলো প্রিয় খাতায় পেন্সিলের দাগ দেয়ার মতন করে। হিসিয়ে উঠে আমার ঠোঁট কামড়ে ধরলো জায়দান। পরক্ষণে উঠে বসে নিজের প্যান্টের বেল্টের দিকে হাত বাড়ালো। অতি দ্রুত এক টানে সেটি খুলে ছুঁড়ে ফেললো ড্রাইভিং সিটে। এমন দৃশ্যে লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম আমি। আমার ত্বক লালচে হয়ে উঠেছে। ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে উন্মুক্ত বুকের উপরাংশ জুড়ে। ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ঘোলাটে দৃষ্টিতে বান্দাকে দেখলাম। কি হতে যাচ্ছে?
জায়দান ঝুঁকে এলো আবারো। এদিক সেদিক গোত্তা খেলো তার শরীর, কেঁপে কেঁপে উঠলো গাড়ি। যেন বাউন্সিং ম্যাটে উঠেছি আমরা। দৃশ্যটা বাইরে থেকে কেমন লাগতে পারে ভেবেই আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল!

“আমি সাথে করে কিছু আনিনি।”
ফিসফিস করলো সে আমার কানে। কিসের কথা বলছে আমি বুঝতে পারছি, নাকি পারছিনা নিজেও জানিনা। তার ঠোঁটের স্পর্শ আমার বুক পেরিয়ে নেমে গিয়েছে উদর অবধি। পরনের জামা খানিকটা উপরে তুলে উদরজুড়ে সে খেলিয়ে দিচ্ছে ভালোবাসার ঢেউ। শিউরে উঠলাম আমি। ঠোঁট কামড়ে ধরলাম দাঁতে। গাড়ির দুলুনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়লো আমার মাথার চক্কর। শরীর গুলিয়ে উঠল আমার একেবারে হঠাৎ করেই।
জায়দান নিজের ঘোরেই আছে। আমার ঘাড়ে নিজের প্রশস্ত হাত চেপে শরীরটা তুলে ধরে সে গলায় মুখ ডোবালো। পরক্ষণে অতি যত্ন নিয়ে আমায় স্পর্শ করতে করতে শুধালো,
“মাই ওয়াইফ? ক্যান আই মেইক লাভ টু ইউ রাইট নাউ?”
“ওয়াক! ওয়াআআক!”

অতঃপর যা হলো, অত্যন্ত লজ্জাজনক। নিজেও বুঝলাম না কি হলো! আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলো বমির তাড়নায়! জায়দানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে ছিলাম, সবটা কোথায় গিয়ে পড়ল তা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা। যতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হাঁপাচ্ছি, ততক্ষণে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে আমার শরীরের অপরিপাককৃত খাদ্যে।
গাড়ির অতি মৃদু হলদেটে আলোয় দেখলাম, জায়দান ঠাঁয় বসে আছে। তার বুক বেয়ে উরু গড়িয়ে গাড়ির সিট অবধি ছড়িয়ে গেছে সবকিছু! ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে সে আমার দিকে। খানিকটা বিস্মিত, তবে অভিব্যক্তি স্বাভাবিক। তাতে কোনো ঘৃণা কিংবা অভক্তির লেশ অবধি নেই। বরং, আমার ঘাড়ে জোরালোভাবে সে রাখলো নিজের হাত, নিয়ন্ত্রণে আনলো আমার কাঁপুনি। যেন এইমাত্র আমি বমি করে তার গা ভাসিয়ে দেইনি এমন এক নির্বিকার অথচ বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“খারাপ লাগছে কোথাও? হঠাৎ বমি হলো যে?”

লজ্জা, সংকোচ, নিজের প্রতি ভয়ানক রাগে চোখ ঠিকরে অশ্রু বেরিয়ে গেলো আমার।
“মীরার হাতের বিরিয়ানী পেয়ে এক প্লেট বেশি খেয়ে ফেলেছি! কড়া ওষুধ, গাড়ির দুলুনি আর তুমি! উয়া!”
মুখ গুঁজে দিতে চাইলাম স্বামীর বুকে, লুকিয়ে পড়তে চাইলাম। অথচ সেই অবস্থাও রাখিনি! পুরোই ল্যাপ্টালেপ্টি অবস্থা! ছিঃ! আবার বমি পেয়ে গেলো আমার। জায়দান আমার চুলগুলো খানিকটা মুঠি পাকিয়ে ধরলো যেন হেলে না পড়ি,
“আরো বমি করবে?”
বাইরে যাওয়ার জন্য মুখ চেপে ধরে দরজার দিকে হাত বাড়ালাম, কিন্তু সময় পেলাম না। আরো এক বেগে নুয়ে পড়লাম। বিসর্জন দিলাম সবটা ওই লোকের কোলের উপর। অথচ জায়দান সরলোনা। বরং আমাকে আগলে রাখলো, পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে সাহস দিলো,

“ইটস ওকে। ইটস ওকে মাই ওয়াইফ, লেট ইট আউট, আ’ম হেয়ার।”
আমি যতক্ষন না শান্ত হলাম, জায়দান ততক্ষণ আমায় ধরে বসে থাকলো। যখন শরীর ঠিকঠাক হলো, গাড়ির বক্সে রাখা পানির বোতল থেকে পানি নিয়ে আমায় কুলি করিয়ে, পান করিয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। গাড়ির অবস্থা দেখার মতন নেই আর। রংধনুতে ডুবিয়ে দিয়েছি কিনা! আমি ভেতরে বসতেও পারলাম না। বাইরে বেরিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। জায়দান নিজের জ্যাকেট আমার গায়ে ছড়িয়ে দিলো। খেয়াল করলাম ঝমঝম বৃষ্টির ফায়দা হিসাবে বান্দা ইতোমধ্যে নিজের শরীর পরিষ্কার করে ফেলেছে। এবার ছুঁড়ে ফেলা শার্টটা বৃষ্টিতে ভিজিয়ে সে ছুটে গেলো ব্যাকসিটে। ভেতরটা কোনরকম পরিষ্কার করলো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহাম্মকের মতন শুধু দেখে গেলাম অপরাধী ভঙ্গিতে। জায়দান যখন কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছে, তখনি তার ফোনটা বেজে উঠল। অদূর থেকে দেখলাম, রিসিভ করে কথা বলছে সে।
“অপেক্ষা কর। আমি গাড়িটা ওয়াশ করিয়ে পাঠিয়ে দেবো।”

বর্তমান।
অট্টহাসিতে ঘর কাঁপিয়ে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে মীরা। বিছানায় শুয়োপোকার মতন কম্বল পেঁচিয়ে বসে ভ্রু কুঁচকে অত্যন্ত বিরক্তভরে নাটক দেখছি আমি। হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছে বান্ধবী, দাঁতগুলো ইচ্ছা করছে হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেই!
“হাহাহা…সাবিন..সাবিন রে তুই সেরা! তুই জায়দান ভাইয়ার গায়ে বমি করে দিয়েছিস? সিরিয়াসলি! হাহাহা…!”
“সব তোর বিরিয়ানির দোষ!”
গর্জে উঠলাম আমি। বালিশে মুখ গুঁজে হাত পা ছুঁড়তে লাগলাম বাচ্চাদের মতন। অবশ্যই মীরাকে আমি বিশ্লেষণ কাটছাঁট করে বলেছি, বমির অংশটাই বেচারীর মনে ধরেছে।
হাসতে হাসতে চোখ থেকে পানি বেরিয়ে গিয়েছে মীরার। সেটা মুছে হামাগুড়ি দিয়ে ফ্লোর থেকে বিছানায় উঠে এলো সে। আমার কম্বল টেনে উবু হয়ে থাকা কচ্ছপের মতন পিঠে চাপড় দিয়ে আরেক দফায় শাকচুন্নি মার্কা হাসি হেসে মীরা বলল,

“জায়দান ভাইয়ার জায়গায় আমি হলে তোকে আরেকবার নতুন করে ডিভোর্স দিতাম!”
“তুই যে খচ্চর, তাই!”
“সাবিন…হাহাহা…বমি…আজ থেকে তোর নাম, বমিচন্দ্র স্যাভেজসাগর!”
“মীরা! সিগারেটের বাচ্চা চুপ কর!”
ক্রোধে হুংকার ছুঁড়ে মীরার মুখ চেপে ধরলাম, ঠিক তখনি,
ডিং ডং।
কলিং বেলের আওয়াজ। জমে গেলাম আমি। মীরা তখনো খেক খেক করে হাসছে।
“দরজা খোল তুই। ভুলেও আমাকে ডাকবি না!”
বলেই কম্বল মুড়ি দিয়ে আছড়ে পড়লাম বালিশের ভেতর। মীরা মাথা ঝাঁকিয়ে ম্রিয়মাণ হাসি নিয়ে উঠে গেলো। পায়ের আওয়াজ শুনলাম শুধু। অতঃপর দরজা খোলার শব্দ। কোনো কথাবার্তা বা অন্যকিছু শুনলাম না। পায়ের আওয়াজও আর এলোনা। তবুও বিনা কারণে কাঁপতে লাগলাম কম্বলের ভেতরেও। কেন যে সমস্ত মুখ আমার টকটকে লাল হয়ে উঠছে বুঝলাম না।
পিনপতন নীরবতা। একসময় সন্দেহ হলো, কম্বল সরিয়ে দেখব নাকি ঐ সিগারেটের বাচ্চাটা করছেটা কি! কিন্তু সাহস করতে পারলাম। ঢোক গিলে যখন নিজের চিন্তায় ডুবে আছি, তখনি সজোর এক টানে নিজের উপর থেকে কম্বল সরে যেতে অনুভব করলাম। প্রতিক্রিয়া হিসাবে কাঁচুমাচু মুখ তুলে কৌতূহল এবং চমক নিয়ে তাকালাম। রুমের উজ্জ্বল আলোয় দৃশ্যমান হলো সুদর্শন মুখটি। সুদর্শন সে শুধুমাত্র আমার কাছে।
গাঢ় সবুজ এবং কালোর চেক স্যুট পরনে। গলায় ঝুলছে কালো টাই। চুল পরিপাটি, চোখে রিমলেস চশমা। ঠোঁটে কোমলতার ছোঁয়া। ভার্সিটি থেকে এসেছে সন্দেহ নেই। মোহনীয় বাদামী দৃষ্টি মেলে আমায় অতি সাধ নিয়ে বুঝি দেখলো স্বামীর চোখজোড়া।
খানিকটা ঝুঁকে এলো জায়দান। আমার লজ্জায় লাল টুকটুক মুখটি নিজের হাতে তুলে সযত্নে কপালে ঠোঁটের আদর দিয়ে সে বলল,
“গেট রেডি মাই ওয়াইফ। আ’ম টেকিং ইউ হোম।”

দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশনের ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে। শুধুমাত্র ভাইরালের দমে নয়, বরং নিজেদের খাবারের গুণ, মান, স্বাদের কারণে ধীরে ধীরে ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আজকাল আয়দানের বেশিরভাগ সময় কাটে সাবিনের ক্যাফের সামনেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি সে এই স্থানেই ঘুরঘুর করে। কখনো কাস্টমারদের আনাগোনা দেখে। কখনো বা সাহস করে কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরের দৃশ্য পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে। ভাগ্যে থাকলে কখনো মীরার দেখা পায় সে। কাজে ব্যস্ত, কাউন্টারের পিছনে। সুদর্শনার মোহনীয় রূপ আয়দানকে বারংবার সম্মোহিত করে। ঠিক তেমনি অন্তর ভাঙে নিদারুণ এক যন্ত্রণা। এই রমণী আর কখনো তার হবেনা!

আজও তেমনটাই করছে আয়দান। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে। মীরা কিছুক্ষণ আগেই ক্যাফেতে এসেছে। দূর থেকে সালোয়ার কামিজ পরনে অপ্সরীকে দেখেছে সে এক ঝলক। ওটুকুই বা কম কিসে? রাস্তার অপর প্রান্ত ফুটপাথের উপর একটি কংকর নিয়ে খেলা করছে সে। মনে শান্তি নেই, চোখে ঘুম নেই। রাতে দু চোখ বুঁজলেই অসহনীয় দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। অপরাধবোধ, নিজের প্রতি ঘৃণা এবং চরম আত্মগ্লানিতে ভেঙে পড়েছে আয়দান। অথচ তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, তার মা, জেসমিনই তাকে বুঝতে পারেনা! তিনি বারবার বলেন, আয়দান ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছেনা, আগের মতন স্ফূর্তি করছেনা বিধায় তার স্বাস্থ্যের এই অবস্থা। প্রতিনিয়ত সুস্বাদু খাবার রান্না হয়, আয়দানের সকল পছন্দের রান্না। অথচ মা জননী জানেনই না ওই ফাঁকা বাড়ি নামক হোটেলে তার ছোট ছেলের মন টেকেনা! ওই সুস্বাদু খাবারের স্বাদ তার জীভ আর উপভোগ করতে পারেনা! এত অশান্তি, এত অপরাধবোধ নিয়ে সে যাবে কোথায়?
হতাশায় অতি জোরে কংকরে লাথি দিতেই সেটি গড়িয়ে গিয়ে থামলো একজোড়া পায়ের সামনে। আয়দান মুখ তুলে দেখলো। অদূরে দন্ডায়মান এক মধ্যবয়স্ক নারী। পরিপাটি শাড়ি পরনে, কপালে বড় একটি লাল টিপ এবং সিঁথিতে গাঢ় করে টানা সিঁদুরের রেখা। মুখটা কেমন যেন স্নিগ্ধ। কিছু মানুষের মধ্যে বুঝি জন্মগত মা মা ভাব থাকে। মহিলাকে কেন যেন আয়দানের তেমনি মনে হলো। কংকরটাও তার পায়ের কাছে গিয়েই থেমেছে। মহিলা খেয়াল করেনি, দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে রাস্তার দিকে। বোধ হয় গাড়ি বা রিকশার অপেক্ষায় আছে।

আয়দান পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো। মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে তাকালো রাস্তার দিকে। বুকের ভেতর কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে তার। মাঝে মধ্যে চেনা মানুষের থেকে বুঝি অচেনা মানুষই বেশি আপন হয়ে ওঠে। অচেনা মানুষের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার সহজ। আয়দান জানেনা কেন হঠাৎ করেই সে মহিলাকে জিজ্ঞেস করে বসলো,
“আপনি অস্থিরতায় ভুগলে কি করেন, দিদি?”
মহিলা খানিকটা অবাক হয়ে তাকালো আয়দানের দিকে। স্পষ্টত অপরিচিত কারো কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আশা করেননি। তবে মুহূর্তেই কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলো। চোখেমুখে ফুটলো বিজ্ঞের ভাব।
“তুমি অস্থিরতায় ভুগছো, নাকি অশান্তি?”
আয়দান বিস্মিত হলো। এতটা সহজ প্রত্যুত্তর আশা করেনি সে। মহিলার তাকে পাগল ভাবার কথা ছিল। অথচ সে ভাবছেনা।

“অস্থিরতা, অশান্তি এবং অপরাধবোধ। নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে বড় ক্রিমিনাল মনে হয় আমার।”
মহিলা আয়দানের কথা শুনল নিঃশব্দে। আরেফিন কনিষ্ঠ জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকালো সুদূরে, দৃশ্যমান ক্যাফের দেয়ালের পানে।
“আপনার কখনো এমন মনে হয়েছে দিদি?”
“প্রত্যেক মানুষেরই হয়। তুমি একা না।”
“না দিদি। আমি অনেক খারাপ একটা মানুষ। উঁহু, আমি হয়ত মানুষ ট্যাগটা গায়ে লাগানোর যোগ্যই নই।”
“এত বড় পাপী তুমি?”
“জি।”
“তবে প্রায়শ্চিত্ত করো।”
“এই পাপ এতই ভয়ানক যে এর প্রায়শ্চিত্তই হয়না।”
মৃদু হাসলেন মহিলা। আয়দানের দিকে তাকালেন সরাসরি। কেন যেন তার হাসিটা ভীষণ নিষ্পাপ ঠেকলো আয়দানের দৃষ্টিতে।
“আমরা সবাই সৃষ্টিকর্তার সন্তান, তাইনা ভাই?”
আয়দান কিছু বললোনা।

“সন্তান যদি তোমার দুয়ারে আসে, তুমি তাকে ফিরিয়ে দেবে?”
স্থির হয়ে চেয়ে রইলো আয়দান। মহিলা ততক্ষণে হাত উঁচিয়ে একটি রিকশা থামিয়েছে। পা উঁচু করে উপরে উঠে বসলো সে। হাতের ব্যাগ নিজের কোলে রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে আয়দানের দিকে তাকালো সে। মন্থর হাসলো।
“আমি অস্থির হলে তার কাছেই যাই। অদ্ভূত শান্তি মেলে তার দর্শনে, সঙ্গে মেলে উপায়।”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৯

এটুকুই। রিকশাচালক রিকশা চালানো শুরু করতেই ধীরে ধীরে সড়ক বেয়ে আড়াল হয়ে গেলো বাহন এবং তাতে বসা মহিলা উভয়েই। আয়দান চোখ মেলে সবটা দেখলো। মনের ভেতর কেমন যেন শিথিলতা ভর করেছে।
দূরের এক মসজিদে তখনি এশার আযান পড়লো। আয়দান অতি মৃদু সেই সুরেলা আহ্বান শুনে ঘুরে তাকালো। একটি ঢোক গিললো সে। অতঃপর শেষ একবার পিছনের ক্যাফের দিকে তাকিয়ে উল্টো ঘুরে রাস্তা পেরিয়ে এগোলো মসজিদের পথে।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here