সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫
জাবিন ফোরকান
“ এটা আমার জন্য? ”
তাজা টিউলিপের বুকেতে নাক ডুবিয়ে সুঘ্রাণ গ্রহণ করতে করতে শুধালো আরওয়া। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দান শুধু নিঃশব্দে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। সামান্য হেসে আরওয়া বললো,
“ ধন্যবাদ। আপনি কিভাবে জানলেন আমার টিউলিপ পছন্দ? ”
“ জানতাম না। এখন জানলাম। মেয়েরা জিনগতভাবে ফুলের প্রতি অধিক আকর্ষিত থাকে। আর টিউলিপ অ্যাস্থেটিক হিসাবে সমাদৃত। আপনি প্রথমদিন হালকা গোলাপী বর্ণের কামিজ পরে এসেছিলেন। আপনার হ্যান্ডব্যাগে টিউলিপের রিং ঝোলানো ছিলো। ”
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আরওয়া। লোকটা কি ডিটেকটিভ? উঁহু, অবশ্যই প্রফেসর। তাহলে এতকিছু খেয়াল করলো কখন? আর করলেও, গাণিতিক হিসাব কষার মতন করে ব্যাপারগুলো কিভাবে মেলালো সে? অদ্ভুতুড়ে স্বভাবটা বিনা কারণেই কৌতূহলী করে তুললো আরওয়াকে।
“ রেস্টুরেন্টে বসতে ইচ্ছা হচ্ছেনা আজ। হাঁটা যাক? ”
আরওয়ার প্রস্তাবে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখালোনা জায়দান। ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে নিঃশব্দে প্রশস্ত ফুটপাথ বেয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। আরওয়া দ্রুতই তার পাশে যোগদান করলো। সন্ধ্যার সময়টা রং বেরঙের বাতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বনানীর অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে মানুষের ভীড় তুলনামূলক কম বিধায় অদূরের যানবাহনের মন্থর আওয়াজের চাইতে নীরবতা বেশি কানে লাগছে। শনশন ঠান্ডা হাওয়া অন্তরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
“ তো আপনি ব্র্যাকে আছেন কত বছর যাবৎ? ”
জায়দান উত্তর করতে সময় নিলোনা।
“ এক বছর মতন। ”
“ এর আগে কোথায় ছিলেন? ”
“ নর্থ সাউথে। ”
“ প্রফেসর? ”
“ না। অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর। পরে ব্র্যাক আমাকে প্রফেসর হিসাবে অফার করে। ”
“ বয়সের হিসাবে আপনি বেশ দ্রুতই প্রফেসর পদে উঠে এসেছেন বলা যায়। জিনিয়াস ছিলেন বোধ হয়। ”
এই মন্তব্যের কোনোপ্রকার উত্তর দিলোনা জায়দান। ‘জিনিয়াস’ টাইটেলটা শোনা এই প্রথম নয় তার জন্য।
প্রথমবার শুনেছিল ক্লাস সিক্সে থাকতে। কোডিং ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াডে সারা দেশে প্রথম হয়েছিল সে। তখন থেকেই জিনিয়াস শব্দটা আষ্টেপৃষ্টে গেঁথে গিয়েছে তার নামের সঙ্গে। দেশসেরা ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটি বুয়েটে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়াশোনার সময়ে এই অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়। পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে এম এস সি এবং ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো, কানাডা থেকে পি এইচ ডি। ঝুলি ভর্তি তার অর্জনে।
তবে কখনোই এতসব অর্জনের ভীড়ে নিজেকে বিশেষ কিছু মনে হয়নি তার।
জায়দানকে চুপচাপ হয়ে যেতে দেখে আরওয়া বুঝলো, লোকটা অন্যদের মতন নিজের অর্জন শো অফ করতে পছন্দ করেনা। কিংবা, শো অফ বিষয়টা সম্পর্কেই তার আগ্রহ নেই। নিজের হাতে যত্নে ধরে রাখা ফুলের বুকেটার দিকে তাকিয়ে আরওয়া বললো,
“ আমার সম্পর্কে আপনার মতামত কি? ”
“ আপনি বুদ্ধিমতী। হুটহাট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হন না। ভাবনা চিন্তা করে সময় নিয়ে বিচার করার মনোবল আছে। ”
সম্ভাব্য স্বামীর কাছ থেকে এমন দ্বিধাহীন নির্ভুল উত্তর শুনে আরওয়া নিজের হৃদয়ে সামান্য উষ্ণতা টের পেলো। দুই কদম দ্রুত হেঁটে জায়দানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে শুধালো,
“ এবং আপনার সম্পর্কে আমার মতামত কি জানেন? ”
“ জানিনা। ”
“ আপনি রহস্যময়। নিজের ভাবনা নিজের কাছে রাখতেই পছন্দ করেন। অন্য কাউকে জানার আগ্রহ আপনার মাঝে নেই। আপনি অনুভূতি দিয়ে ভাবেন না, ভাবেন লজিক দিয়ে। অর্থাৎ, আপনি মস্তিষ্কচালিত মানুষ। ”
“ ভালো পর্যবেক্ষণ। ”
জায়দান তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোলো। নিজের মাঝে অদ্ভূত ধরণের হতাশা টের পেলো আরওয়া। মানুষ এতটাও প্রতিক্রিয়াহীন কিভাবে হয়? খানিকটা উঁচু গলায়ই পিছন থেকে সে ডেকে উঠলো,
“ আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছেন কেন? ”
থামলো প্রফেসরের পদক্ষেপ। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উল্টো ঘুরে দাঁড়ালো। চশমার লেন্সের আড়ালে বাদামী নয়নজোড়া সামান্য জ্বলজ্বল করে উঠলো সোডিয়াম বাতির আলোয়।
“ আম্মুর আপনাকে পছন্দ। তাই। ”
দুই পা এগিয়ে মুখোমুখি হলো আরওয়া। ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ নয়নে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো।
“ আর আপনার প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন কেন? ভালোবেসে? ”
পুরুষটিকে নাড়িয়ে দেয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হলো। জায়দানের চেহারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলোনা। ওই একই অভিব্যক্তি নিয়ে সে দেখলো আরওয়াকে। ঠোঁট কাঁপলনা। রমণী ভাবলো, এই প্রশ্নের অন্তত কোনো জবাব সে পাবেনা। কিন্তু জবাব এলো। অপ্রত্যাশিতভাবেই।
“ আব্বুর ইচ্ছায়। ”
থ হয়ে রইলো আরওয়া। ক্ষণিকের জন্য নির্বাক হয়ে পড়লো। অতঃপর অতি ক্ষীণ এক সূক্ষ্ম হাসি খেলে গেলো তার গ্লস দেয়া ঠোঁটের মাঝে।
“ আপনি তো বেশ অদ্ভুত মানুষ! প্রথমবার বিয়ে করেছেন আব্বুর ইচ্ছায়, এবার বিয়ে করতে চাইছেন আম্মুর ইচ্ছায়। আপনার নিজের ইচ্ছা বলতে কিছু আছে? ”
সফল হলো আরওয়া। নগণ্যপ্রায় সময়ের জন্য হলেও জায়দানের ধোঁয়াটে বাদামীর মাঝে অব্যক্ত এক ঝাপসা অনুভূতির ছোঁয়া দেখতে পেলো সে। তবে নির্বিকারতার প্রলেপে অতি দ্রুতই তা মিলিয়ে গেলো। জায়দান উল্টো ঘুরে দাঁড়ালো। একটা কালভার্টে এসে পড়েছে তারা। নিচে চলাচল করছে সরু এক খাল। রেলিংয়ে হাত রেখে ঝুঁকলো সে। শনশনে হাওয়া এসে এলোমেলো করতে লাগলো তার জেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল।
“ ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী বিয়ে করা নবীজীর সুন্নত। জীবনে চলার জন্য একজন সঙ্গী দরকার। যতই মুখে ভিন্ন বলা হোক না কেন, একজন সঙ্গী ছাড়া মানুষ দিনশেষে একাকী। পরিবার অসম্পূর্ণ থাকলে সেখানে জীবন বলে কিছুর অস্তিত্ব থাকেনা। ”
“ আপনার কথাগুলো শোনাচ্ছে সমাজ বইয়ে পড়া পরিবার প্রয়োজনীয়তা টপিকের মতন। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই? ”
জবাব দিলোনা জায়দান। স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো অজানার পানে। কেন যেন লোকটার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হুট করেই হারিয়ে ফেললো আরওয়া। মিশ্র একটা অনুভুতি কাজ করছে তার মাঝে। পুরুষ মানুষ সে কম দেখেনি জীবনে। কিন্তু জায়দানকে সে হাজার চেয়েও বিশ্লেষণ করে উঠতে পারছেনা। লোকটা কেমন যেনো অধরা। তাকে খারাপ লাগেনা। আবার বিশেষভাবে ভালোও লাগেনা। সাধারণের মাঝেও অনন্য ধরণের সত্তা। যার সঙ্গে কথা বললে মনে হয় অজস্র দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে তার অস্তিত্বের চারিপাশে। সেই দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতা কি কোনোদিন হবে আরওয়ার?
মানুষ তো বরাবর নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষিত। তবে আরওয়া কি জেনে বুঝে বি*ষ পান করার সিদ্ধান্ত নেবে? নাকি থাকবে অজানা অমৃতের অপেক্ষায়? যে অমৃতের স্বপ্নে দিবারাত্র বিভোর থাকে মানবহৃদয়।
মৃদু শীষ বাজানোর শব্দে আরওয়া হঠাৎ করেই নিজের গভীর ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে পদার্পণ করলো। শীতল হাওয়া তার খোলা চুল মুখের চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে টের পেয়ে সেসব গুছিয়ে কানের পিছনে গুঁজে সামনে তাকালো সে। কালভার্টের অপর পাশে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তিনজন যুবক গোছের ছেলে। দুজন সিগারেট টানছে, একজন গলায় ঝোলানো সিলভারের চেইন নিয়ে টানাটানি করতে করতে ঠোঁট ফুলিয়ে শীষ বাজিয়ে যাচ্ছে। তার সূচারু দৃষ্টি বরাবর আরওয়ার দিকেই নিবদ্ধ। অত্যন্ত বিশ্রীভাবে তা তাকে পর্যবেক্ষণ করছে অনুভব করে কেমন গা গুলিয়ে উঠলো রমণীর। নিজের ওড়নাটা গলা থেকে টেনে সমস্ত বুকে ভালোভাবে ছড়িয়ে যেই না উল্টো ঘুরেছে সে, তখনি শক্ত বুকের মাঝে খানিক ধাক্কা খেলো।
“ আউচ! ”
মাথা তুলে সুউচ্চ পর্বতের ন্যায় দন্ডায়মান জায়দানকে দেখলো সে। হিল পরিহিত অবস্থায় লোকটার কাঁধ অবধি উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছে আরওয়া। যথারীতি জগতের সবথেকে নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি মাখা চেহারায় তাকালো জায়দান, তার চোখের দিকে। তারপরই ঘটালো অবিশ্বাস্য ঘটনাটি।
নিজের পরিধানের খাকী বর্ণের ব্লেজার খুলে নিয়ে সেটি আরওয়ার কাঁধে ছড়িয়ে দিলো জায়দান। গিলে ফেললো পোশাকটি রমণীকে, একেবারে হাঁটু অবধি।
“ ঠান্ডা হাওয়া বাড়ছে। এভাবে খোলা গায়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ঠান্ডা লাগবে। ”
জায়দান শুধুমাত্র ঠান্ডার কারণে কাজটি করেনি সেটা বুঝতে আরওয়ার রকেট সাইন্স জানার প্রয়োজন নেই। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি চিরচির করে উঠলো। সূক্ষ্ম এক তরঙ্গ খেলে গেলো অস্তিত্বজুড়ে। জায়দান এতটা কাছাকাছি যে উষ্ণ হয়ে উঠছে মুহূর্তটা। সেই উষ্ণ লাজের প্রভাব ছুঁয়ে যাচ্ছে আরওয়ার গালগুলোকে।
অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর শীষ জোরালো হলো আরো। একেবারে বিনা কারণেই কেমন অট্টহাসি ভেসে এলো উদ্ভটভাবে। জায়দান আরওয়ার মাথার উপর দিয়ে তাকালো। নিজের পকেটে হাত ভরে বের করে আনলো ফোন। কৌতূহলী আরওয়া খানিক বিস্ময় নিয়ে তাকে কোনো নাম্বার ডায়াল করতে দেখলো। খানিক বাদে ফোনটা কানে ঠেকালো জায়দান। অপ্রয়োজনীয় জোর দিয়ে অনেকদূর শুনতে পারা যায় মতন করে খানিকটা উঁচু গলায় বললো,
“ আসসালামু আলাইকুম, ওসি সাহেব। জ্বি, থানায় আছেন? খুব ভালো। হুম….আমি বনানীতে। হ্যাঁ, ২০৪ নম্বর রোড, ওই কালভার্টটাই। পেট্রোলিং টিম আছে? জ্বি জ্বি, পাঠিয়ে দিন। ধন্যবাদ। ”
জায়দান ফোন কাটতেই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটি ঘটলো। ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো হঠাৎ করেই উল্টো ঘুরে এগোতে লাগলো। সিগারেটগুলো রাস্তার পাশে ফেলে পা দিয়ে পিষে প্রথমে হেঁটে গেলো, তারপর রীতিমত দৌঁড়ে আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার। সেদিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো আরওয়া। তারপরই দৃষ্টি ফেরালো জায়দানের দিকে। হাতের ফোন বান্দা পকেটে ভরে আরওয়ার হতভম্ব দৃষ্টি খেয়াল করে জানালো,
“ কি ভেবেছিলেন? রাস্তার মাঝে একা মানুষ ওদের সঙ্গে মারামারি করবো? বুদ্ধি থাকতে শক্তি খরচের কারণ দেখিনা। অবশ্য আপনারা মেয়েরা রেডফ্ল্যাগ ছেলেদের দাদাগিরি পছন্দ করেন। সরি, ইফ আই ডিড নট মিট ইওর এক্সপেক্টেশন্স। ”
খিলখিল করে হেসে উঠলো আরওয়া। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে আলতো ভাবে জায়দানের বাহু স্পর্শ করে হাসিমুখে ব্যক্ত করলো,
“ ইট সিমস্ আই গট আ গ্রীন ফ্ল্যাগ জেন্টলম্যান ইন মাই লাইফ। ”
কনকনে হাওয়া ঝাঁপটা দিয়ে গেলো। উভয়ের মাঝে তা শীতলতার বদলে ছড়িয়ে গেলো উষ্ণতা।
প্রগাঢ় ঘুমে ভেঙে আসছে চোখের পাতা। কম্বলের নিচে গুটিশুটি দিয়েও ঘুমে মাথা ঢুলছে আমার। আরেকটু হলেই দিন দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে হারিয়ে যাবো স্বপ্নের দেশে। কিন্তু একটা জ্বালাময়ী চেতনা আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
জায়দান আরেফিন।
বান্দার সাথে গত কয়েকদিন যাবৎ একটানা ই মেইলে যোগাযোগ হচ্ছে আমার। পিৎজা বিজনেসের পেইজটা ফেরত আনার জন্য সে কাজ করছে। তার জন্য হরহামেশাই নানা তথ্য একে অপরের সঙ্গে আদান প্রদান করতে হচ্ছে। সন্ধ্যা অবধি জায়দান ভার্সিটিতে থাকে। সময় পাওয়া হয় রাতেই। আজকাল রাত হলেই তাই আমার ফোন হাতে নিয়ে চাতক পাখির মতন বসে থাকতে হয়।
বিবাহিত থাকাকালীনও আমরা একে অপরের সঙ্গে এই মাত্রায় কথা বলেছি কিনা মনে পড়ছে না। বলিনি হয়তো বা। এমনও দিন গিয়েছে, যেদিন একই রুমে বাস করা এবং ঘুমানো সত্ত্বেও জায়দানের সঙ্গে আমার একটাও বাক্য বিনিময় হয়নি। তখন প্রয়োজন ছিলোনা। এখন প্রয়োজন আছে। এই প্রয়োজন যেদিন শেষ হয়ে যাবে, সেদিন কি হবে?
আপাতত ভাবতে চাইছিনা।
॥ যেটা দিয়েছিলে, সেটাই তোমার পেইজের পাসওয়ার্ড ছিলো শিওর?॥
জায়দানের ই মেইলের নোটিফিকেশনে চোখ কচলে ফোনের দিকে তাকালাম। একটি নিঃশ্বাস ফেলে বিরক্তি নিয়ে ফিরতি মেইল পাঠালাম।
॥ হ্যাঁ। আমার পেইজের পাসওয়ার্ড ওটাই ছিলো ॥
আমি পাঠানোর সাথে সাথেই ই মেইলে রিপ্লাই এলো,
॥ তাহলে কাজ করছে না কেনো?॥
ঝুঁকে পড়লাম ফোনে, রিপ্লাই দিলাম,
॥ তা আমি কি জানি?॥
সময় রাত তিনটা চব্বিশ। ফোনের চার্জ ৩%। সেই সন্ধ্যা থেকে হাজারখানেক হয়ত ই মেইল বিনিময় হয়েছে আমাদের মাঝে। জায়দান খুঁটিনাটি এক দুই শব্দে জিজ্ঞেস করছে। জবাব দিতে আর ফিরতি মেইলের অপেক্ষা করতে করতে আমার মেজাজ এখন সীমাহীন। যেকোনো মুহূর্তে আছাড় দিয়ে ফোনটা ভাঙতে পারি। মেইলে যোগাযোগ করাটা কষ্টকর। বিশেষ করে টানা কয়েকদিন যাবৎ একই ভোগান্তি পোহানোয় আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে।
ই মেইলের কোনো উত্তর আসছে না দেখে আমি দাঁত কিড়মিড় করে কম্বলের নিচে শুয়ে টাইপ করলাম,
॥ হয়েছে?॥
মিনিট দুই বাদে ই মেইলে উত্তর এলো।
॥ না ॥
মীরা যদি পাশে ঘুমিয়ে না থাকতো, আমি নির্ঘাত এক চিৎকারে গোটা এলাকার মানুষদের উঠিয়ে দিতাম। ফোনটা আছড়ে ফেললাম সত্যিই, ম্যাট্রেসে বাউন্স হয়ে নিঃশব্দে সেটা বালিশের উপর পড়ে থাকলো। ফুঁসতে থাকলাম রাগে। হিংস্র সিংহীর মতন ঘড়ঘড় করতে করতে ফোনটা হাতে নিলাম। চার্জ এখন ২ পার্সেন্ট।
॥ জাউড়ার ঘরের জাউড়া! মজা নেস আমার সাথে? আমি কি পেঁচার বউ পেঁচি নাকি রে তোর ই মেইলের ঠেলায় সারা রাত জেগে কাটিয়ে দেবো? আমি গেলাম! তুই থাক ব্যাটা তোর ই মেইলের গুষ্টি নিয়ে! তোর ই মেইল আমি চু***….॥
শেষ ই মেইলটা হড়বড় করে টাইপ করতে করতে শেষে এসে থমকে গেলাম। জায়দানের পক্ষ থেকে আরেকটি নতুন ই মেইল এসেছে।
॥ তোমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা দাও ॥
জমে গেলাম আমি। আহাম্মকের মতন ফোনের স্ক্রীনের দিকে চেয়ে থাকলাম। আমি কি ঠিক পড়ছি? নিশ্চিত হতে বারকয়েক মেইলটা পড়লাম। না, ঠিকই তো দেখাচ্ছে। যেটা লিখছিলাম, সেটা মুছে নতুন একটা মেইল লিখলাম, নিজের নাম্বার লিখে সেন্ড করে গর্ধবের মতন বসে থাকলাম থম মেরে। কি আশ্চর্য! আমার বুক এমন ধুকপুক করছে কেনো?
জায়দান হুট করে আমার হোয়াটসঅ্যাপ কেনো চাইছে? কোনো কাজে লাগবে কি? নাহলে তো তার মতন মানুষের এমনটা করার কথা না। হ্যাঁ, তাই হবে হয়ত। পেইজ ঠিক করতে হয়ত বা কোনো কারণে কাজে লাগবে। মনকে এমনটাই বিশ্বাস দিচ্ছিলাম। তবে সেই বিশ্বাস গুঁড়িয়ে গেলো কিছুক্ষনেই।
কতক্ষণ পার হলো টের পেলাম না। মোবাইল ১ পার্সেন্ট চার্জের হুশিয়ারী দিলো। সেই সাথে হোয়াটসঅ্যাপে এলো একটি অজানা নাম্বার থেকে মেসেজ। ফোনের উপর ঝাঁপিয়ে পরে কাঁপা কাঁপা দুহাতে ইনবক্স খুললাম। হাতের মাঝে ফোনটা থরথর করে এমনভাবে কম্পিত হতে লাগলো যে ঝাপসাভাবে পড়তে পারলাম শুধু,
॥ ই মেইলে মেসেজ আদান প্রদান করা সময়সাপেক্ষ। রাত হয়েছে, ঘুমাও। বাকি কাজ আগামীকাল হবে॥
স্থির চেয়ে রইলাম আমি। বিষয়টাকে মাঝরাতে আমার কেমনভাবে নেয়া উচিৎ?
শালা এক মেসেজে ঘুম উড়িয়ে বলছে ঘুমাও! তুই ঘুমা! তোর বদের গুষ্টিকে ঘুমাতে বল হার্ট অ্যাটাক কোথাকার!
পরদিন।
আমার ঘুম ভাঙলো ফোনের রিংটোনের আওয়াজে। ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠলাম। রুমের পর্দা টেনে দেয়া। কটকটে রোদ এসে ঢুকছে ভেতরে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলাম সময় এখন সাড়ে এগারোটা। এতক্ষণ ঘুমিয়েছি! টেবিলের উপর ঢাকনা দেয়া নাস্তা চোখে পড়ছে, বুঝলাম মীরা ভার্সিটি যাওয়ার আগে তৈরি করে রেখে গিয়েছে। লাফিয়ে উঠতে গিয়ে পা হড়কে পরে গেলাম। পাপোস থেকে হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে ফোনটা পেলাম চার্জিং স্টেশনে। দ্রুত প্লাগ খুলে কানে ধরলাম।
“ হ্যালো? ”
“ জ্বি। আমি কি পিৎজা স্টেশনের সঙ্গে কথা বলছি? ”
পিৎজা স্টেশন আমার পেইজের নাম। একটা উত্তেজনা ঘিরে ধরলো আমাকে সঙ্গে সঙ্গে। দ্রুত জবাব দিলাম।
“ হ্যাঁ। আমি পিৎজা স্টেশন থেকে বলছি। কিভাবে সাহায্য করতে পারি স্যার? ”
“ আমার অর্ডার ছিলো। চারটা লার্জ পিৎজা। ”
কথা বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে নোটপ্যাড টেনে লিখতে শুরু করলাম।
“ জ্বি, চারটা লার্জ। ”
“ দুটো পেপারোনি, আর দুটো মাশরুম। একটা মাশরুমে কোনো ক্যাপসিকাম দেবেন না, অ্যালার্জি পারপাস। ”
“ অবশ্যই। কখন লাগবে? ”
“ আজ বিকাল তিনটার মধ্যে। ”
অর্ডার এবং ডেলিভারি অ্যাড্রেস টুকে নিয়ে ফোন কাটলাম। হাতের নোটবুকের দিকে প্রসারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। সেই ঘটনার পর থেকে এই প্রথম অর্ডার আমার! পেইজ এখনো একটিভ না হলেও অর্ডার করার নাম্বার আগের কাস্টমারদের কাছে আছে। সেখান থেকেই কোনোভাবে পেয়েছে হয়ত। দারুণ রকমের উত্তেজনা ঘিরে ধরলো আমায়। অবশেষে হয়ত আবারো সবকিছু আগের মতন স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ ধীর নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নিলাম। শরীর হঠাৎ করেই উৎফুল্ল লাগছে। ঠোঁটে মৃদু হাসি মেখে ফোনের দিকে তাকাতেই গতকাল রাতে হোয়াটসঅ্যাপে আসা মেসেজটায় চোখ পড়লো। হাসিটুকু উধাও হয়ে গেলো। এর পরিবর্তে অদ্ভুতুড়ে এক অনুভূতি ভর করলো হৃদয়জুড়ে। ডিভোর্সের পর জায়দানের ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার আমি ব্ল্যাকলিস্টেড করে ডিলেটই দিয়ে দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ ইতস্তত করলাম। অবশেষে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে নাম্বারটা তুলে মোবাইলে সেভ করলাম। কন্ট্যাক্ট নেইম চাইতেই মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আসার আগে টাইপ করলাম,
॥ হার্ট অ্যাটাক ॥
ঠোঁটে মুচকি হাসিটি ফিরে এলো। নিজের আচরণে নিজেই লজ্জা পেয়ে দ্রুত ফোন রেখে বাথরুমের দিকে গেলাম। কাজে লাগতে হবে।
ফ্রেশ হয়ে মীরার বানানো নাস্তা খেতে খেতে পিৎজা তৈরির কাজ সেরে ফেললাম। প্রায় দুটো বেজে গিয়েছে। স্কুটি নেই, লোকেশনে যেতে সময় লাগবে বিধায় আগেভাগে বেরিয়ে পড়লাম। লোকাল বাস এবং টেম্পোর ধকল কাটিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন তিনটা বাজতে মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মোবাইল বের করে ঠিকানা দেখতে দেখতে রাস্তা ধরে এগোলাম। হলুদাভ বর্ণের রংচটা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে কল দিলাম কাস্টমারকে।
“ জ্বি স্যার, আমি বিল্ডিংয়ের সামনে এসেছি। ডেলিভারিটা যদি নিয়ে যেতেন। ২৬৫০ টাকা ক্যাশ অন ডেলিভারি। জ্বি। ”
কাস্টমার আসছে বলায় ফোন কেটে অপেক্ষা করা শুরু করলাম। সামনে সড়কপথ। তিনটার রাজধানী ভীষণ ব্যাস্ত। মাথার উপরে সূর্যের তাপ ধীরে ধীরে কমে আসছে। কর্মব্যস্ত শহরবাসী ছুটছে আপন আপন গন্তব্যে। ব্যাগ কাঁধে ছেলেমেয়ের দল যাচ্ছে কোচিং সেন্টারে। জনজীবনের দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
“ ঐতো। ওই মা*গী! ”
উত্তেজিত কন্ঠস্বর কানে আসতেই পাই করে ঘুরে দাঁড়ালাম। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো খুব ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি বুঝি। একদল যুবক গোছের ছেলেপেলে। সঙ্গে দুজন মেয়েও আছে। যারপরনাই আধুনিক পোশাক আশাক পরনে। হাতে হাতে মোবাইল ফোন। একজনের কাছে ডি.এস.এল.আর ক্যামেরা অবধি রয়েছে।
“ এইটাই ওই পিৎজা স্টেশনের বেয়াদব মহিলাটা! কাস্টমারদের সাথে যা তা ব্যবহার করে। ”
“ ধর! ধর ইনফ্লুয়েঞ্জাটাকে! ”
আমি যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবো তার সুযোগই হয়ে উঠলোনা। কেউ একজন পিছন থেকে আমার খোঁপা বাঁধা চুলের গোছা খামচে ধরলো। আরেকজনের হাত আঁকড়ে ধরলো দুই কাঁধ। ঝটকা দিয়ে উঠলাম,
“ কি আশ্চর্য্য! আপনারা কারা? কি চান? ছাড়ুন আমাকে! ছাড়ুন বলছি! ”
“ খুব দেমাগ না তোর? জুতার বাড়ি দিবি ভদ্রলোকদের? বে*শ্যা একটা! দুই টাকার মুরোদে আসমানের পরী হয়ে গেছিস না? ”
“ পাবলিকের মাইর খাইতে পয়সা লাগেনা, তোর মতন মা*গীদের অহংকার লাগে! ”
“ আহহহ! ”
পিৎজার প্যাকেটগুলো গড়াগড়ি খেলো মাটিতে। মানুষের পায়ের চাপে পিষে গেলো শ্রম দিয়ে বানানো প্রত্যেকটি খাবার। চিনচিনে যন্ত্রনায় আমার পিঠ ছেয়ে গেলো। পরনের টি শার্ট, ইউনিফর্ম জ্যাকেট টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। চুল ধরে টানছে কেউ, তলপেটে কারো ঘুষি এসে লাগছে। মুখের ভেতর নোনতা র*ক্তের স্বাদ পাচ্ছি। দৃষ্টি ঝাপসা।
মানুষের ভীড় চারপাশে। একটা মানুষও এগিয়ে এসে আমায় ধরছেনা। হেনস্তাকারীদের আটকাচ্ছে না। বরং সকলের হাতে হাতে শুধু মোবাইল ফোন। লাইভে লাইভে ছড়িয়ে দেয়া মোব জাস্টিস। যে জাস্টিসের আদও কোনো আইনী বৈধতা নেই। তাতে কি? আমরা মানুষেরাই তো বিচারক। জীবনে এতটা অসহায় বোধ হয় আমার সেদিনও লাগেনি নিজেকে, যেদিন ড্যাড সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে আমাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিল। সেদিন তো অন্তত আমার অসহায়ত্বের দিকে চেয়ে হাসার মতন কেউ ছিলনা। আজ আছে। হাজার হাজার চোখ আজ খায়েশ মিটিয়ে আমার অধঃপতন দেখছে। তাদের হাতের ওই চারকোনার জাদুর বাক্সটা ধারণ করে যাচ্ছে প্রতিটা দৃশ্য। প্রতিটি আঘাত, প্রতিটি বাজে স্পর্শ এবং প্রতিটি র*ক্তবিন্দু। কারো সর্বনাশ আজ কারো চরম বিনোদনের খোড়াক।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোর বেয়ে উন্মাদের মতন ছুটে যাচ্ছে মীরা। সমস্ত শরীর ঘেমেনেয়ে একাকার। মুখে তীব্র চিন্তার আখ্যান। হাতে শক্ত করে ধরে রাখা নিজের ব্যক্তিগত ফোন। কাঁধে ঝুলতে থাকা ভার্সিটির ব্যাগ। এদিক সেদিক হন্যে হয়ে খুঁজে অবশেষে সে ঠিকানা খুঁজে পেলো। নারী ওয়ার্ডের একদম কোণায় সব শেষের বেডটি।
বেডের উপরে বসে আছে সাবিন। কপাল এবং থুতনিজুড়ে ব্যান্ডেজ। দুজন নার্সের একজন তার একটি পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে ব্যস্ত। অপরজন ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইনের ব্যাগ লাগাচ্ছেন। সাবিনের মুখ থমথমে। তাতে কোনোপ্রকার অনুভূতির ছিটেফোঁটা নেই। কেমন যেন মলিন আবহ। নিষ্প্রাণ দুই চোখের অর্ধেক ব্যান্ডেজে ঢেকে গিয়েছে। একটি গাল অস্বাভাবিক রকমের ফুলে আছে।
মীরার বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে গেলো। বেডের কাছে গিয়ে ধপাস করে সে বসে পড়লো মেঝেতেই। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৪
“ দোস্ত! আমার সাবিন রে! এসব কি হলো? কেনো হলো? ”
কান্নার দমকে দমকে কেঁপে উঠলো মীরার শরীর। অথচ সাবিনের মাঝে কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়া দেখা গেলোনা। ফাঁপা মারবেলের মতন চোখ দুটো চেয়ে রইলো শূণ্যের উদ্দেশ্যে।
