Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ১৫

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৫

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৫
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

তিতির বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে।নানুআপুর ঘর থেকে আসার পর থেকে এভাবেই শুয়ে আছে।বালিস ভিজে উঠেছে চোখের পানিতে।না চাইতেও সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ইশানের বলা কথাগুলো কানে ভাসছে।
ইশান ভাই সত্যি এটা ভাবে,সে বোঝা?কই আগে তো কখনো বুঝতে দেয়নি।তাহলে কি বাড়ির সকলেও তাকে তাই ভাবে!মুখ ফুটে বলেনি শুধু।কোনো একদিন বাড়ির সবাই ও তাকে এভাবে বলবে!বুকের ভেতরটায় কষ্ট হচ্ছে খুব।এতো কষ্ট হওয়ার কারণ টাও সে টের পাচ্ছে হালকা হালকা।কথাটা ইশান ভাই বলেছে বলে!তিতির ফুপিয়ে উঠলো।
ইশান এর প্রতি তার অন্য রকম অনূভুতির হদিশ পেয়েছে সে।তার অবচেতন মন বারবার প্রকাশ করেছে সেটা।মস্তিষ্ক ও আজকাল তাই বলছে।ইশান এর প্রতি সে দুর্বল হয়ে গেছে।না চাইতেও হয়ে গেছে।কিন্তু ইশান ভাই!সে তো তাকে পছন্দই করে না।একদমই করে না।করলে আজ এভাবে রিঅ্যাক্ট করতো!কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার।রাহাত ভাইকে দেওয়া কথা তার বুকের ভিতরটায় সুচের মতো খোচাচ্ছে আরও।রাহাত ভাইকে সে বড় মুখ করে কথা দিয়ে এসেছিলো।তখন তো রাহাত ভাইয়ের প্রতিও তার ফিলিংস না থাকলেও আর কারোর প্রতিও ছিলো না।এখানে এসে ইশান ভাইয়ের ওপর সে… ভাবতে পারছে না কিছু।

তারওপর যখন বুঝতে পারলো ইশানের দিক থেকে অনীহা টা,তখন থেকে বোধহয় অপরাধবোধ টা বেশি হচ্ছে। সে এরপর না পারবে রাহাত ভাইয়ের সাথে থাকতে আর এমন চলতে থাকলে না সে ইশান এর সাথে ভালো থাকবে।একজন তাকে যায়,অথচ তিতির তো তাকে চায়না,ভালোইবাসেনি।যা ছিলো তা সম্মান। আর একজনকে সে চায়।যে কিনা তাকে চায়না।ভালোবাসা তো দূর,হয়তো সে নজরে কখনো দেখেইনি।তার জন্য পরিবার এ এতো অশান্তি।কি করা উচিত তার।
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।নিশি বা নূরি এসেছে।এর আগেও বেশকয়েকবার এসে ডেকে গেছে।পরে খুলছে বলে কাটিয়ে দিয়েছে বারবার।এবারও ওদেরই আশা করেছে সে।তাই গলা হালকা উচিয়ে বললো,”একটু পর আসছি বড়পু।”
“নিশি না আমি।দরজা খোল মা।”।রাহেলা দেওয়ান এর গলা।এ ডাক সে এড়িয়ে যেতে পারবে না।উঠে বসলো বিছানায়।আয়নার সামনে গিয়ে চোখমুখ মুছে নিলে।স্বাভাবিক হয়ে দরজা খুললো।বড় মামী দাড়িয়ে আছে।” “এসো বড় মামনী।”
রাহেলা দেওয়ান ভিতরে ঢুকলো।দরজা আটকে তিতির এর হাত টেনে নিয়ে এসে বসলো বিছানায়।শাড়ির আচল দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিলেন।

“কাঁদছিলি কেনো বোকা মেয়ে।”
তিতির মাথা নিচু করে ফেললো।”কাঁদছিলাম না তো।”
রাহেলা দেওয়ান মলিন হাসলেন।মেয়েকে টেনে নিয়ে বুকের সাথে চেপে রাখলেন।কপালের ওপর থেকে আলতো হাতে চুলগুলো গুছিয়ে পিছনে দিলেন।চুমু খেলেন সেখান টায়।মৃদু গলায় বললেন।”তোর মা যখন মারা যায়,তোর তখন দু বছর পূর্ণ হয়েছে।সেই সেদিন কোলে করে নিয়ে এসেছিলাম এ বাড়িতে।আমি,তোর বাকি মামনী রা ছোট্ট পুতুল এর মতো আগলে রেখেছি সবসময়। একমিনিট চোখের আড়াল করিনি।তোর কখন কি চাই,কি ভালোলাগে,কিসে খারাপ লাগে। সব বুঝি আমরা।আমার কাছে লুকাচ্ছিস কেনো।পেটে ধরিনি,কিন্তু আঠারো বছর বুকে আগলে মানুষ করেছি।এই বুকের ভিতরটাই জানান দেয় আগলে রাখা আমার পাখিটার মনের খবর।”
তিতির এবার আর নিজেকে সংযত করতে পারলো না।কান্না আটকাতে পারলো না।দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বড় মামনীর কোমড়।বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেদে উঠলো।নাক টেনে টেনে বললো,”আমি তোমাদের কাছে বোঝা মামনী?”

রাহেলা দেওয়ান এর বুকটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো।এ মেয়ে বলে কি।কল্পনায় ও ভাবতে পারে না সে এ কথা।বাকিরাও না।”কখনো না মা।ইশান তো রাগের মাথায় বলেছে।ওটা ধরে থাকলে হয়।”
“কেনো বলবে এ কথা।যতই রেগে থাক না কেনো।রাগের মাথায় মনের কথা সে বলে ফেলেছে।”
রাহেলা আবার চুমু দিলেন কপালে।”না মা।তুই তো জানিস ও ছোটবেলা থেকে অমন।ওর ওপর কেউ কোনো মত চাপিয়ে দিলে সেটাতে ওভাবে রিঅ্যাক্ট করে।উল্টোপাল্টা বলে।তোর মামা তো ওর বাপ।তার সাথে কিভাবে রাগ করে দেখিসনি?”
তিতির এর কান্না কমলো খানিকটা।নাক টানলো বারবার।

“এবার বল তো মা।শুধু কি ওই কথায় মন খারাপ। নাকি তোর নানুআপু যেটা বলেছে সেটার জন্যও…তুই রাজি না,আমার ছেলের বউ হবি না?
তিতির লজ্জা পেলো একটু।বড় মামনী তার শাশুড়ী হবে। এটা বড় মামনীই জানতে চাচ্ছে সে রাজি কিনা।মুখ আরও গুজলো রাহেলার বুকে।রাহেলা দেওয়ান হাসলো।দু হাতের আজলায় মুকটা তুললো তিতির এর।কেঁদেকেটে,সাথে লজ্জায় মুখটা লাল টকটকে হয়ে গেছে।চোখের পানি মুছিয়ে দিলেন সযত্নে।থুতনি ধরে মুখটা তুললেন।তিতির চোখ তুললো না।

“কিরে বললি না তো।ইশান এর রাগ পরলেই ও রাজি হবে।সে আমি জানি।আমার কথা ওর দিদার কথা ও ফেলবে না।তখন ওর বাপ ওভাবে না বললে ও তখনই রাজি হতো।তোর মামার সাথে এমনিই ওর মনোমালিন্য তার ওপর ওভাবে বলেছে তাই আরও রেগে গেছে। ওর বিষয় আমি দেখবো।তুই তোর টা বল।”
তিতির কি বলবে।সত্যিই সে চাইছে বিয়েটা।সে ইশান কে চাইছে।কিন্তু রাহাত ভাই।বড় মামনী কে বলবে সে কথা!বলা উচিত? নাকি তাতে আরও সবটা হিতে বিপরীত হবে।বুঝতে পারছে না সে।বিয়েটা হয়তো হবেই, এবং সেটা ইশানের সাথেই এটা তার মন বলছে।মাঝখান থেকে রাহাত ভাইয়ের কথা শুনে বাড়ির সবাই আবার কি ভাববে তাকে।বাড়ির কাউকে না বলে সোজা রাহাত ভাইয়ের সাথেই কথা বললে কেমন হয়।তিতির ইশান কে পছন্দ করে,এটা শুনলে রাহাত ভাই নিশ্চয়ই বুঝবে তাকে।মনে একজনকে রেখে আরেকজনের নামে কবুল কিভাবে পরবে।তার চেয়ে ভালো রাহাত ভাইকে বুঝিয়ে বললে সে বুঝে যাবে বিষয়টা।তাই বড় মামনী কেই না বলার সিদ্ধান্ত নিলো সে।মাথা নাড়লো দুদিকে।

“আমার সমস্যা নেই মামনী।তোমাদের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। কিন্তু ইশান ভাই…”
“ওর টা আমরা দেখবো।আর ভাই টাই ডাকাডাকি বন্ধ কর এখন থেকে।স্বামী হবে আজ বাদে কাল।ভাই ডাকলে চলে?”
তিতির লজ্জায় মিয়িয়ে গেলো জাপটে ধরলো রাহেলা দেওয়ান কে।রাহেলা দেওয়ান হাসলেন।নিশ্চিন্ত হলেন।বুকের ওপর থেকে একটা পাথর তো অন্তত নামলো।ইশান কে সে ঠিক বুঝিয়ে ফেলবে।তিতির কে ভালো না বাসার কোনো কারণ নেই।আজ বাসে না কাল বাসবে।বাসতে তো ইশান বাধ্যই।এ মেয়ের মুখজোড়া রাজ্যের মায়া।এমন মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায়।
“চল খাবি চল।”
তিতির মাথা নাড়লো।”তুমি যাও।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”.
রাহেলা দেওয়ান মাথায় হাত বুলিয়ে নেমে গেলেন নিচে।রাত দশটা বাজে।ইশানটা এখনো ফেরেনি।ফোনটাও বন্ধ বলছে।যদিও জানে নিয়াজ এর বাড়িতে আছে।নিয়াজই জানিয়েছে অনেক আগেই।তারপরও চিন্তা হচ্ছে। একবার শাশুড়ীর ঘরে যেতে হবে।উনিও দরজা আটকে বসে আছে।বাড়ির সবার সাথে সবার মান অভিমান এর পালা চলছে।কে কার সাথে কত বেশি মান অভিমান করে থাকতে পারে।আর তাদের গিন্নিদের হয়েছে যত জ্বালা।সবার অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে জীবন শেষ।

দেওয়ান বাড়ি আজ কেমন গুম ধরে আছে।যেনো ঝড় বয়ে যাওয়ার প্রকৃতি যেমন গুমোট ধরে নিরব হয়ে যায় সে অবস্থা আজকে।নয়ন টা অফিস থেকে ফেরেনি,বিধায় বাড়ির এত বড় খবর জানে না সে।জানার পর কেমন ভাবে নেবে বিষয়টা এ নিয়েও চিন্তার কারণ আছে বইকি।আপাতত রাসেদ দেওয়ান আর রিক্তা দেওয়ান এই নিয়েই চিন্তিত।এ বাড়ির কমবেশি সবাই বুঝতে পারতো তিতির এর প্রতি নয়ন এর আলাদা টান।আলাদা যত্ন। অভিজ্ঞ নজর এড়াতো না কারোরই।যদিও নয়ন কখনো মুখ ফুটে বলেনি।তবুও। অবশ্য ভুল হলেও হতে পারে তাদের চিন্তাভাবনা।কে জানে হয়তো বোন হিসেবেই এতো যত্ন করতো।সেটাই যেনো হয়।মনপ্রাণে সে দোয়া করে যাচ্ছেন এখন রাসেদ আর রিক্তা দেওয়ান।
রীনা দেওয়ান ছোট ছেলেমেয়ে গুলো খায়িয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়ে এসেছেন।নিশি, নূরি থ মেরে বসে আছে ঘরে।বাড়ির বড়রা সবাই ড্রয়িং রুমে সোফায় চিন্তায় মগ্ন। রাইসুল দেওয়ান নিজের ঘরে।ছেলের ওপর রেগে আছে সেটা স্পষ্ট। চন্দ্রা দেওয়ান দরজা আটকে বসে আছে।কারোরই খাওয়াদাওয়া হয়নি।রাহিয়ান সাহেব তাকালো স্ত্রীর দিকে।

“বড় ভাবি কোথায়?”
“তিতির এর কাছে।”
“ইশান কে ফোনে পেয়েছো?”
“নাহ।”
তাকালো মেজো ভাইয়ের দিকে।রাসেদ সাহেব ও দু দিকে মাথা নাড়লো।পাবে কিভাবে ফেনটা তো সুইচ অফ।রাহেলা দেওয়ান কে সিড়ি ভেঙে নামতে দেখা গেলো।একপ্রকার ছুটে গেলো রিক্তা আর রীনা দেওয়ান।
“তিতির ঠিক আছে?কি বললো ও?”
রাহেলা দেওয়ান হালকা হেসে আস্যস্ত করলো বাকিদের। “বুঝিয়ে বলেছি।ইশানের কথায় কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা।বিয়েতে আপত্তি নেই।”
সবাই হাফ ছেড়ে বাচলো একপ্রকার। এইসময় তিতির এরও বিয়েতে দিমত থাকলে আরেক অশান্তি হতো।দুজনকে মানাতে মানাতে সবার অবস্থা খারাপ হয়ে যেতো।
“ভাবি,মা কে ডেকেছো?”
রাহেলা দেওয়ান মাথা নাড়লো দুদিকে।”ডাকিনি।খাবার নিয়ে একেবারে ডাকবো,একেবারে ওষুধ খায়িয়ে তারপর আসবো।রীনা খাবার আন তো।”

রীনা দেওয়ান সাথে সাথে রান্নাঘরে গেলো শাশুড়ীর খাবার বাড়তে।খাবার নিয়ে ওপর গেলেন রাহেলা দেওয়ান।কড়া নাড়লেন শাশুড়ীর দরজায়।এর আগে কখনো দরজা আটকে রাখেন না তিনি।আজ আটকেছেন।বেশ অভিমান করেছেন।রাহেলা পাশের টেবিলে খাবারের থালি রেখে বেশ কয়েকবার ধাক্কালেন দরজা।কেনো সাড়া পাওয়া গেলো না ভিতর থেকে।এবার বুকের ভিতর টা দুরুদুরু শুরু করে দিয়েছে।এমন তো হয় না কখনো। শব্দ করে দরজা ধাক্কালেন।রীনা দেওয়ান চলে এসেছে।পাশের রুম থেকে নিশি,নূরি বেড়িয়ে এসেছে।সবাই চিন্তিত গলায় ডাকলেন বৃদ্ধা কে।এবারও নিশ্চুপ।ভিতরে কিছু একটা ঘটেছে সেটা বুঝতে আর কারোর সময় লাগলো না।নিশি দোড়ে এগিয়ে গেলো সিড়ির মাথায়।নিচে সোফাতে বসে থাকা চাচা দের ডাকলেন।নিশির গলার আওয়াজে বেড়িয়ে এলেন রাইসুল দেওয়ান ও।দশ মিনির টানা ডাকডাকিতেও দরজা খুললেন না তিনি।নূরি হন্তদন্ত হয়ে কল করলো নয়নকে।নয়ন জানালো মিনির দশেক এর ভিতর বাড়ি ঢুকছে।তারপর কল করলো নিয়াজ এর ফোনে।নিয়াজ ফোন ধরলো।

“নূরি?”
“নিয়াজ ভাই।বড় ভাইয়া কোথায়?
“ ইশান তো এখানেই।তোমার কি হয়েছে হাপাচ্ছো কেনো।”
“দিদা দরজা খুলছে না নিয়াজ ভাই।বড় ভাইয়াকে দ্রুত আসতে বলুন।কিছু একটা হয়েছে হয়তো।”
“আমি এক্ষুনি ইশান কে নিয়ে আসছি।টেনশন করো না।”
নূরি ফোন কেটে দৌড়ে গিয়ে জানালো সবাইকে।মধ্যবয়স্ক তিন ভাই মিলেও দটজা নারাতে পারলেন না।বয়সের ভাজ এসে গেছে শরীরে।এ বয়সে কি আর এতো শক্তপোক্ত দরজা ভাঙ্গা মুখের কথা।নিয়াজ এর বাড়ি দেওয়ান বাড়ি থেকে হাটা পায়ে ত্রিশ মিনিটের রাস্তা।বাইকে আসায়।সাত আট মিনিটে এসে পৌছুলো।সদর দরজায় দেখা হয়ে গেলো নয়নের সাথে। কেউ কোনো কথা বললো না।ছুটে গিয়ে ঢুকলো বাড়ির ভিতর।ইশান এর সাথে,নাইম আর নিয়াজ আছে।নয়নকে সাথে নিয়ে চারজন মিলে মিনিট তিনেক এর মধ্যেই ভেঙে ফেললো দরজা।চন্দ্রা দেওয়ান বিছানায় কাত হয়ে পরে আছেন।সবাই চিৎকার করে উঠলো।ইশান,নয়ন পালস চেক করলো।দ্রুত কোলে তুলে নিলো ইশান।নয়নের গাড়ি রাস্তাতেই রাখা।ধরাধরি করে এনে তোলা হলো গাড়িতে।রাহেলা দেওয়ান, রিক্তা দেওয়ান শাশুড়ীর মাথা কোলে নিয়ে বসলেন।রীনা দেওয়ান কে রেখে যাওয়া হলো বাড়ির ছেলেমেয়ে গুলোর কাছে।ইশানের গাড়ি বেড়িয়ে যেতেই কর্তারা আরেকটা গাড়িতে বেড়িয়ে গেলো,নিয়াজ আর নাইম বাইকে।
নিশি,নূরি, রীনা দেওয়ান কাঁদতে কাদতে ঢুকলো বাড়িতে।তিতির মাথা ব্যাথায় শাওয়ার নিচ্ছিলো।ঘর থেকেই বাড়ির নিরবতা খেয়াল হলো।নিচে সদর দরজার কাছে দেখতে পেলো কান্না রতো বোনেদের আর ছোট মামনীকে।বুঝতে পারলো না কিছু।ছুটে নিচে আসতেই তাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললো নিশি,নূরি।জানতে পারলো নানুআপুর অসুস্থতার কথা।মাত্র তিন দিন হলো হাসপাতালে থেকে বাড়ি আনা হয়েছে,এরই মধ্যে আবার… নিজেকে সামলাতে পারলো না তিতির।সবকিছুর জন্য নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। হাঁটু ভেঙে বসে পরলো মেঝেতে।কাঁদতে লাগলো চিৎকার করে।

চন্দ্রা দেওয়ান এর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।আইসিইউতে রেয়েছেন।অপারেশন করা হচ্ছে। সবার চোখমুখ শুকিয়ে গেছে।ইশান থ হয়ে বসে আছে।অপরাধ বোধে মাথা শূন্য হয়ে আসছে।তার দিদার এই অবস্থার জন্য সে দায়ি।সম্পূর্ণ সে দায়ি।তখন যদি রাগের মাথায় ওভাবে কথা না বলতো।আজ হয়তো দিদার এ অবস্থা দেখতে হতো না।মাথার চুল খামচে ধরলো দু হাতে।অসহায় লাগছে তার।নিয়াজ কাধে হাত রেখে বসলো পাশে।
ইশান মুখ ডললো দুহাতে।চোখ লাল হয়ে গেছে।”
“আমার দোষ নিয়াজ,সবটা আমার জন্য। আমি যদি তিতির কে বিয়েতে তখন রাজি হয়ে যেতাম দিদা…”
“তোর দোষ নেই ইশান।আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।ঠিক হয়ে যাবে।”
“জানিনা আমি,কিচ্ছু জানিনা।অসহায় লাগছে।কখনো ক্ষমা করতে পারবো না নিজেকে দিদার কিছু হলে।”
“কিচ্ছু হবে না দিদার।কিন্তু ইশান তোর তিতির কে বিয়ে করতে অসুবিধা কেনো। ওর মতো মেয়ে সত্যি পাবিনা তুই।”

ইশান থমকে গেলো খানিকটা।কেনো চায়না বিয়ে করতে সেটা কিভাবে বলবে সবাইকে।তার কাছে তিতির এর যে ছবিগুলো আজকে এসেছে,সেসব নিজের চোখে দেখার পর কিভাবে ওমন একটা মেয়েকে বউ করার কথা ভাববে সে।
সকাল বেলা ঘুম ভেঙছিলো টানা কয়েকটা মেসেজের শব্দে।বিরক্ত হয়ে মেসেজ চেক করতে গিয়ে থ হয়ে গিয়েছিলো সে।তিতির এর বেশ কয়েকটি ছবি।একটা ছেলের সাথে। অন্তরঙ্গ অবস্থায়। মাথা ঝিমঝিম করে উঠেছিলো তার।যন্ত্রনা হচ্ছিলো বুকটায়।কিভাবে বলবে সেসব কথা বাড়ির সকলে,বাড়ির মেয়ের এসব কথা জানতে পারলে সহ্য করতে পারবে বাড়ির কেউ।পারবে না।
রাহেলা দেওয়ান এগিয়ে এলেন ছেলের দিকে।তাকে আসতে দেখে মা ছেলের কথা বলার সুযোগ দিয়ে নিয়াজ উঠে গেলে।রাহেলা দেওয়ান বসলেন ছেলের পাশে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“এতো রাগ ভালো না বাপ।সবসময় বলি আমি।”
“মা দিদার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ি।”
“মা অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আমি আর তোর বাবা আগে থেকেই জানতাম।তোর ভালো হবে জেনেই আমরা দ্বিমত করিনি।”
“মা কিন্তু তিতির কে…”
“তিতির লক্ষী মেয়ে,ঘরের মেয়ে। ঘরের মেয়ে ঘরে থাকবে এতে ক্ষতি কি।”
“মা বিষয়টা সেটা নয়।তিতিরেরও তো অন্য কেউ পছন্দ থাকতে পারে!”
“তোর সেসব ভাবতে হবে না।আমার তিতির এর সাথে কথা হয়েছে।ওর তেমন পছন্দের কেউ নেই।”
মায়ের কথা শুনে ইশান অবাক হলে।এটা বলেছে মেয়েটা?কেউ নেই!ছিহ্ এতো বড় মিথ্যা বলতে মুখে আটকায়নি ওর।রাগে গা রিনরিন করে উঠলো তার।
“তোর দিদার বয়স হয়েছে। আল্লাহ জানে হায়াৎ আর কতদিন। আমদের ও বয়স হচ্ছে। কারোরই জীবনের বিশ্বাস নেই বাপ।আজ আছি কাল নাও থাকতে পারি।তাছাড়া আমিও মনেপ্রাণে চাই তুই তিতির কে বিয়ে করিস।এটা এখনও আমারও তোর কাছে অনুরোধ। রাখবি না?”
ইশানের নিজেকে অসহায় লাগছে।বাড়ির প্রিয় মানুষ রা সব এভাবে জোর করছে।কিভাবে ফেরাবে সবাইকে।কিন্তু ওই মেয়েকে মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। ইশান চুপ করে রইলো।রাহেলা দেওয়ান খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে।উত্তর পেলেন না কোনো।অপারেশন শেষ,ডাক্তার বেড়িয়ে এসেছেন।সেদিক তাকিয়ে ছুটে গেলেন সেদিকে।
ইশান ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো।

“ডাক্তার এভরিথিং ওকে?”
“উমমম।ওকে বলতে পারছি না এখনি মাই সান।অপারেশন শেষ হয়েছে।বয়স হয়েছে তো।এ বয়সে হার্ট অ্যাটাক।ঝুকি তো আছেই।জ্ঞান না ফেরা অবধি বলা যাচ্ছে না কিছু।আল্লাহর কাছে দোয়া করো সবাই।আর জ্ঞান ফিরলে ওনাকে যথাসম্ভব চেষ্টা করবে কোনো মানসিক প্রেশার না দেওয়ার।একদমই ক্ষতি হয়ে যাবে।”
মাথা নাড়লো সবাই।ডাক্তার চলে গেলেন।রাইসুল সাহেব ছেলের দিকে তাকালেন না একবারও।ছলছল চোখ নিয়ে বসলেন।রাহেলা দেওয়ান গিয়ে বসলেন স্বামীর পাশে। ইশান বুকে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে রইলো।প্রায় ঘন্টাতিনেক এর মধ্যে জ্ঞান ফিরলো চন্দ্রা দেওয়ান এর।বাড়ির সবাই ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন।নার্স এসে খবর দিতেই খুশির জোয়ার বয়ে গেলো সবার মধ্যে।আরও বেশ কিছুক্ষন পর ভিতরে যাওয়ার পারমিশন দিলো ডাক্তার।
চন্দ্রা দেওয়ান চোখ খুললেন।ছেলেরা এগিয়ে গেলেন মায়ের দিকে।
“মা শরীর ভালো লাগছে এখন?”
মৃদু হাসার চেষ্টা করলেন যেনো।কথা বললেন না।রাহেলা দেওয়ান ইশানের দিকে তাকালো।ইশান এগিয়ে গেলো দিদার দিকে।পাশের টুল এ বসলো।আলতো হাতে টেনে নিলো দিদার হাতখানা।চন্দ্রা দেওয়ান তাকিয়ে দেখলো।
“দিদা সরি।রাগ করেছো?আর হবে না এমন।সত্যি। “

চন্দ্রা দেওয়ান অসহায় হাসলেন,মৃদু গলায় বললেন, “আমার দোষ দাদুভাই।আমি বুড়ো মানুষ। জমে মানুষ এ টানাটানি চলে আমাকে নিয়ে।আমার কি আর এখন তোমাদের জীবনে দখলদারি চলে?চলেনা।”
দিদার অভিমান কমেনি। ইশান হাতে চুমু খেলো।
“তুমি ভেবো না দাদুভাই। ও বোঝা তোমার ঘাড়ে ঝুলাবো না।এবার আল্লাহ বাড়ি অবধি যাওয়ার আয়ু দিলে বোঝা তোমাদের ঘাড় থেকে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নেবো আমি।”
ইশান এর বুকটা চিনচিন করে উঠলো।তিতির কে সে এভাবে বলতে চায়নি।এখন বারবার মনে করে দেওয়ায় খারাপ লাগছে তার।তাছাড়া অন্য কারোর কাছে.. কথাটা বোধহয় খারাপ লাগলো তার।
পরমুহূর্তেই আবার মনে পরে গেলো সেই মেসেজ এর কথা।চোখ বন্ধ করে খানিক ধাতস্থ করলো নিজেকে।
“দিদা বলছি তো সরি।আমি তোমাকেও ওভাবে বলতে চাইনি অন্য কাউকেও না।রাগ কনট্রোল করতে পারিনি।যা বলবে তাই হবে।শুনবো যা বলেছো,করবো বিয়ে।”
চন্দ্রা দেওয়ান খুশি হলো।চোখ ছলছল করে উঠলো।গড়িয়ে পরলো দু ফোটা চোখের পানি।তবে প্রকাশ করলেন না। কিচ্ছু বললেন না।মুখ ঘুরিয়ে রাখলেন অন্য দিকে।ইশানের ঘাড়ে হাত রেখে এখন আর কিছু বলতে নিষেধ করলেন রাসেদ দেওয়ান।ইশানও চুপ করলো।নার্স এসে বের হয়ে যেতে বললেন সবাইকে।একে একে ঘর খালি করলো সবাই।

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৪

“তুই সত্যি বিয়েটা করবি বাপ?”
রাহেলা দেওয়ান শাড়ির আচলে চোখ মুছলেন।ইশান মাকে জড়িয়ে ধরলো।”আমার মা, দিদা চাইছে যখন।রাজি না হয়ে উপায় আছে।করবো।”
রাহেলা দেওয়ান ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন খুশিতে।উপস্থিত সবার মধ্যে হৈ হৈ পরে গেলো।ইশান হাসলো।পরিবার এর খুশির জন্য যেনেবুঝেও বিষ গিলতে হচ্ছে তাকে।সবকিছুর শোধ সে তুলবে ওই ছলনাময়ী মেয়ের থেকে,ঠিক সময় মতো।

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৬