Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

_____”ভালোবাসি তিতির।আমি তোকে খুব ভালোবাসি।”
_____”এতদিন বলেননি কেনো তাহলে এটা।আমি কত শুনতে চেয়েছি জানেন?”
_____”এইতো এখন
বললাম।ভালোবাসি,ভালোবাসি,ভালোবাসি।”
_____”আমিও ভালোবাসি ঈশান ভাই। খুব ভালোবাসি।”

আচমকা ঈশান সরে গেলো তিতিরের থেকে।জড়িয়ে ধরা মানুষ হুট করে এমন সরে যাওয়ায় চমকে গেলো তিতির।নিজের বসা ছেড়ে উঠে দাড়ালো।ঈশান ততক্ষণে সরে গেছে বেশ খানিকটা।রুম ছেড়ে বারান্দার দিকে পৌছেছে।তিতির কাছে যাওয়ার আগেই ঈশান এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো।তিতিরের পাখির খাচা খুলে দিলো।টিয়া পাখির জোড়া ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চোখের পলকে চোখের আড়াল হলো।তিতির আর্তনাদ করে উঠলো।পাখিজোড়া তার ভীষন প্রিয়,সব সময়ের সঙ্গি।ঈশান ওভাবে পাখি দুটোকে কেনো ছেড়ে দিলো।তিতির দৌড়ে যাচ্ছে বারান্দার দিকে।কি আশ্চর্য!যেখানে কয়েকপা এগোলে সে বারান্দায় পৌছুবে,সেখানে অন্ততকাল ধরে দৌড়ুছে,বারান্দা পাচ্ছে না।ঈশান পাথরের মতো নির্বিকার দাড়ালো রেলিং ঘেষে।হঠাৎ তিতিরকে অবাক করে ঈশান কেমন কাত হয়ে গেলো পিছন দিকে,কি ঘটছে বুঝতে পেরে চিৎকার করে হাত বাড়ালো ঈশানকে ধরতে।সম্ভব হলো না।তার আগেই রেলিং ছেড়ে পরে গেছে ঈশান।তিতির এখনো সেই আগের জায়গাতেই দাড়ানো।চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সে।সামনে এগোতে না পারার আক্ষেপে পাগলপ্রায় সে ঈশান!ঈশান তো পরে গেলো।এতো উঁচু থেকে!সে বাচাতে পারলো না,তার সমানেই ঘটলো সব।কি আশ্চর্য! আরেক সমস্যা তিতির ঈশানের নাম ধরে ডাকতেও পারছে না।কতবার চেষ্টা করছে,গলা দিয়ে সামান্য আওয়াজ টুকু হচ্ছে না।চোখজোড়া থেকে অনর্গল গড়িয়ে পরছে নোনাজল।বহু কষ্টে সে পৌছালো অবশেষে বারান্দায়। রেলিং ধরে ব্যাস্ত হয়ে ঝুকতেই দেখলো ঈশান পরে যাচ্ছে।ভাবলেশহীন ভাবে তাকানো তার দিকে।তিতির এবারে জোরেশোরে চিৎকার করে উঠলো,শব্দও হলো গলা দিয়ে,

_____”যাবেন না আমাকে ছেড়ে,ঈশান ভাই…”
লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো তিতির।হাত দুটো এখনো সমানে কাউকে আকড়ে ধরে রাখতে চাচ্ছে।বারান্দার গ্লাস বন্ধ পেয়ে থমকে গেলো তিতির।স্তব্ধ হয়ে গেলো।আশেপাশে ব্যাস্ত চোখে তাকালো।ঘরময় অন্ধকার। সে তার বিছানায়।বালিশ ভিজে একাকার। স্বপ্ন দেখছিলো সে।খাচাটা বারান্দায় গ্লাস এর সামনে ঝোলানো।পাখি জোড়া একে অপরকে ঘেষে ঝিমুচ্ছে।

তিতির জোরে জোরে শ্বাস নিলো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার।পাশ ফিরে বেড সাইট টেবিলের ড্রয়ার হাতড়ে ইনহেলার বের করে নিলো।টানলো দু -তিনবার।গলাটা শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।বুকের বা পাশ টা এখনো লাফাচ্ছে।পানি খাওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই খালি জগ,বোতল চোখে পরলো।দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।দু হাতে এলোমেলো চুলগুলো পিছনো ঠেলে মুখ ডললো।ঘড়ির টিকটিক শব্দ হচ্ছে উত্তর পাশের দেয়াল থেকে।অন্ধকার এ দেখা যাচ্ছে না।বিছানা হাতড়ালো সেলফোন খুজতে।পেলো বালিশের নিচে।ফোনে দুইটা বাজে।ঘুমিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি।ঘুমের সাথে সাথেই স্বপ্ন টা সম্ভবত দেখা শুরু করেছিলো।চোখ বুজে মাথা ঠেকায় বিছানার হেডবোর্ডে। অস্থির লাগছে। কেনো দেখলো এহেন স্বপ্ন! ঈশান তাকে ভালোবাসি বলছে!হাসি পেলো তিতিরের।এসব স্বপ্ন কল্পনাও করে না সে।তাও দেখছে।অবচেতন মন এসব ইশারা করছে বুঝি তাকে!ঈশান কোথা থেকে আসবে।ঈশান তো আজ ঢাকা গেছে।কবে ফিরবে তাও জানা নেই তার।বড় মামনী কে জানিয়েছে কি এক জরুরি কাজ,ঈদেও আগে আসার চেষ্টা করবে।চেষ্টা! ঈদের আগে! এটা কোনো কথা।বাড়ির সকলে আপসেট একপ্রকার। রাইসুল সাহেব তো চিল্লাপাল্লা করেছেন কয়েকদফা স্ত্রীর সাথে। মাঝখান থেকে রাহেলা দেওয়ান পরেছে বিপদে।স্বামী আর ছেলের টম অ্যান্ড জেরির ঝগড়ায় সে মধ্যস্ততা করতে তৈরি সবসময়।

তিতির বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়।পানির বোতল হাতে দরজা খুলে বের হয়।শরীরটা কাঁপছে! দুঃস্বপ্ন গুলো তার পিছু ছাড়েনা।বাবা মা চলে গেছে কিভাবে এই কাহিনি শোনার পর থেকেই এই সমস্যা টা তার শুরু হয়েছে।সে বহু আগে থেকে।ডিপ্রেশন এ থাকলে বেশি হয় এ ধরনের স্বপ্ন। আজকাল প্রায়ই হচ্ছে। এ মাসে প্রায় রোজই দেখেছে এ ধরনের দুঃস্বপ্ন।

দরজা খুলে সিড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো পানির জন্য। ফ্রিজ খুল ঠান্ডা পানি মেশালো নিজের বোতলে।ডাইনিং এ বসে খেলো কয়েকঢোক।ড্রিম লাইট জ্বলছে বাড়িজুড়ে।সবাই ঘুমে নিশ্চয় এই সময়!তার ঘুম ছুটে গেছে।এখন সাহরির আগে আর ঘুম ধরবে না।কেউ একজন সাথে থাকলে ছাদে গিয়ে হাওয়া খেতো সে।তা সম্ভব নয়,কেউ নেই জেগে।অগত্যা এসব অদ্ভুত চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে নিজের ঘরে এলো সে।এপাশের দিকে সে আপাতত একাই।ঈশান পাশের রুমে না থাকা মানে সম্পূর্ণ ফাঁকা এই উত্তরের সাইট।নিশি,নূরি,নয়ন সকলের রুম দোতলার দক্ষিণ দিকে।তিতির দরজা আটকে বসে বিছানায়।দম বন্ধ লাগছে।ঈশানকে ফোন করবে একবার! পৌছুলো কি না।সময় দেখলো আবার।পৌছায় নি হয়তো।কয়েক ঘন্টার পথ।এতো রাতে কি এমন দরকার ছিলো যে যেতেই হতো।এতই যখন তাড়া ছিলো তাহলে তাকে নিয়ে আবার ওই নদীর ধারে কে যেতে বলেছিলো।তিতির বারান্দার থাই গ্লাস খুলে দিয়ে আসে।বাইরে প্রচুর বাতাস।ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া। বিছানায় পা ভাজ করে বসলো।আচ্ছা ঈশান কি তাকে কিছু বলতে নিয়ে গিয়েছিলো সেখানে!আজ তো হিসেব মতে তার হাড্ডি মাংস আলাদা করার কথা ছিলো ঈশানের।তা করলো না কেনো ঈশান!তিতির এর মাথা কাজ করলো মা।গা এলিয়ে দিলো বিছানায়।

বিশাল বাড়ির এসি কামড়ায় স্যালাইন দেওয়া রুষার। ঘুমুচ্ছে গভীর ঘুমে।কিছুক্ষণ আগেই ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।চারতলা বাড়ির নিচে গাড়ি এসে থামলো একটা।দারোয়ান সালাম ঠুকে গেট খুললো,ব্যাক্তিটি গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে উঠে এলো দোতলা তে।দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো।ঘুমন্ত মেয়েটাকে দেখলো।
কেমন বাচ্চা বাচ্চা মুখখানা।দরজা আটকে চেয়ার টেনে পাশেই বসলো।মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো কয়েকবার।তাকলো রুষার হাতের দিকে।কনুই অবধি দাগ।সূচের ফুটো জায়গায়,জায়গায়..অজস্র।
_____”আমাদের ভালো থাকা হলো না কেনো!হু?কি দোষ ছিলো আমাদের? আদৌ দোষ ছিলো কি?ছিলনা। ওটা ভুল ছিলো না।জাস্ট অ্যাক্সিডেন্ট ছিলো।যার মাশুল আমাদের দিতে হচ্ছে। তাইনা!সব ঠিক করে দেবো আমি।সব…এই যন্ত্রণা থেকে শীগ্রই মুক্তি এনে দেবো আমি।কথা দিলাম।”
রুষা ঘুমের ঘোরে মাথায় রাখা হাতটা টেনে নিলো।মুখে হাসি দেখা গেলো।হাতটায় আলতো চুমু খেলো ঘুমের ঘোরেই।শক্ত করে ধরে রেখেই ঘুমে দেশের পারি দিলো।

সাজিদ গভীর ঘুমে মগ্ন।পাশে একই অবস্থায় অনিমা ঘুমাচ্ছে।তিন কামড়ার ফ্ল্যাট বাসার অপরদিকের কামড়ায় নিয়াজ ঘুমে।মূলত তারা একই বাসায় থাকে ঢাকাতে।নিয়াজ এর অফিস সাজিদ এর বাসা থেকে দশ মিনিটের পথ।বন্ধু কে অন্য কোথাও একা থাকতে দেওয়ার মানেই হয়না।বিগত কয়েক বছর হলো একসাথেই থাকে তারা।সাজিদের ফোন শব্দ করে বাজছে।অনিমার ঘুম আগে ভাঙলো।বিরক্তি মাখা চোখে তাকালো।এদিকওদিক হাতড়ালো ফোনটা খুজতে। পেলোনা।কুমিড়ের মতো ঘুমানো সাজিদ কে ধাক্কা দিলো কয়েকবার।ঘুমের ঘোরে বিরক্তি সূচক শব্দ করে আবার ঘুমে মগ্ন হলো সে বেচারা।ফোন টা কোথায় সেটা টের পেলে তাও দেখা যায়।
।নিয়াজ বিরক্তি মুখে ঢুলতে ঢুলতে ড্রিয়ং রুমের সোফার ওপর পরে থাকা সাজিদের ফোনটা হাতে নিলো।চোখ ডলতে ডলতে গিয়ে ধাক্কা দিলো ওদের বেড রুমে।ঘুমন্ত কন্ঠে ধমকে উঠলো,

____”শালা ফোনটা ভেঙে ফেলবো।ধর নিয়ে যা।”
বাইরে নিয়াজের গলা শুনে ফোনের অস্তিত্ব টের পেলো অনিমা। গলা উচিয়ে ডাকলো নিয়াজকে।
____”খোলা আছে।আয় ভিতরে।”
নিয়াজ দরজা ঠেলে ঢুকলো ভীতরে।ততক্ষণে সাজিদ পিটপিট করে তাকিয়ে উঠে বসেছে।
ক্রমাগত ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। নিয়াজ রাগের মাথায় ছুড়ে মারতে চাইলো ফোনটা।মারলো না।আলতো ঢেল দিয়ে ফোনটা রাখলো সাজিদের পায়ের কাছে।আঙুল তুলে সতর্ক করলো দ্বিতীয় বার ফোন যেনো লাউডে দিয়ে এমন যেখানেসেখানে ফেলে না আসে।সাজিদ সেসবে কান দিলো না।চোখ ডলে তাকালো ফোনের দিকে।থানা থেকে ফোন।এতো রাতে!বিরক্তিকর। ফোনটা কানে তুললো।কথা বললো সময় নিয়ে।বলার থেকে বেশি শুনেই যাচ্ছে।ভ্রু কুচকে এসেছে তার।আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো,

____”হোয়াট!কখন!”
নিয়াজ সবেই বেরিয়ে গেছিলো ওদের রুম থেকে।সাজিদ এর উত্তেজিত কন্ঠে আবার ঘরে ঢুকলো।অনিমাও আগ্রহ চোখে তাকানো সাজিদের দিকে।সাজিদ হু হা করে যাচ্ছে।মুখের ঘুমের রেশ মাত্র আর নেই।দ্রুত পায়ে উঠে দাড়ালো বিছানা থেকে কানে এখনো ফোনটা ধরাই।
____”আমি আধঘন্টায় পৌছাছি।”
ফোন রেখে মাথা নাড়লো দুদিকে হতাশায়।নিয়াজ জিজ্ঞেস করলো,
____”কি হলো!”
____”ফোর্থ রে**প।”
কথাটা কানে আসতেই নিয়াজ,অনিমা একসাথে চিৎকার করে উঠলো প্রায়,
____”হোয়াট!”
চোখাচোখি হলো তিনজনের।অনিমা বিছানা থেকে নেমে আসলো।ব্যাস্ত হয়ে স্বামী কে জিজ্ঞেস করলো,
____”কোথায়? কবে?”
____”হয়েছে ঢাকতেই। পুরান ঢাকায় লাশ পাওয়া গেছে বুড়িগঙ্গার ওপাশে।কিন্তু… “
নিয়াজএর ও ঘুম ছুটে গেছে।টনটনে গলায় বলল,
____”কিন্তু? “
সাজিদ তাকালো দুজনের দিকেই।গম্ভীর গলায় বললো,
____”মেয়েটা আমাদের এলাকার।খুন টা রাতে হয়েছে।লাশটা নিয়ে আসা হয়েছে আজ রাতেই।তারপর ফেলা হয়েছ এখানে।”
____”পোস্ট মর্টেম হয়েছে?”
নিয়াজের কথায় মাথ নাড়লো সাজিদ।

____”হয়নি।মেয়েটা নিখোঁজ ছিলো কাল বিকেল থেকে।পরিবার ভেবেছে কোনো বন্ধু বান্ধব এর কাছে গেছে।তবে এশার নামাজ পরে খোজ না পাওয়ায় পুলিশে জানায়,আজকে সদরঘাট থাকা লাশ উদ্ধার করেছে মেয়েটার।সম্পূর্ণ নেকড অবস্থায়।ধারনা করা হচ্ছে রে***।তারপর মার্ডার।বাকিটা পরে জানা যাবে।মেয়েটা আমাদের হারু স্যারের মেয়ে,সুবর্না।”
অনিমা,নিয়াজ দুজনের মুখই চুপসে গেছে।সাজিদ বের হবে।দ্রুত বাথরুম এ গেলো।এ নিয়ে এটা চতুর্থ রে** কেস সাজিদের। আগের তিনটে আনসলভ বলা চলে একপ্রকার। কারণ আসামি ধরা পরেনি।তিনটি খুনের স্টাইলই এক।প্রথমে রে**প করা হয় তারপর গলা টিপে হত্যা।তদন্ত চলছে এ নিয়ে।এরি মধ্যে চার নম্বর! গা শিওড়ে ওঠে অনিমার।নিয়াজ গম্ভীর মুখে বসেছে চেয়ারটায়।সাজিদ দ্রুতই তৈরি হয়ে নেয়।নিয়াজ উঠে দাড়ায়,

_____”যাবো তোর সাথে? “
মাথা নাড়ে দুদিকে সাজিদ। অনিমাকে দেখিয়ে বলে,
____”তোর বোনকে দেখ।আমি আসছি।ও একা ভয় পাবে আজকে।”
নিয়াজ মাথা নাড়ে,গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে যায় সাজিদ। আগামীকাল তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিলে।পরিকল্পনা টা জলে ডুবলো হয়তো।
অনিমা বিছানায় গিয়ে পা তুলে বসলো।চিন্তারত নিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
_____”তোর কি ধারনা?সাসপেক্ট সাইকোপ্যাথ?অর সিরিয়াল কিলার!”
নিয়াজ চিবুক ডলে।ভ্রু জোড়া কোচকানো।তার মাথাতে হাজার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।গম্ভীর গলায় বলে,
____”দুটোই।তার থেকে বড় কথা।সে সবাইকে একপ্রকার চ্যালেন্জ ছুড়ে দিচ্ছে টের পাচ্ছিস!”
____”কেমন সেটা?”
____”একই ধরনের সবকিছু। চার চারটা খুন হলো কমবেশি একই বয়সের সব মেয়েগুলো।এতদিন দূরে ছিলো এবার তে আমাদের ওই ছোট্ট গ্রামে।বুঝতে পারছিস!সাজিদ দায়িত্বে।ওর এলকায় ঘটনা টা করে চ্যালেন্জ ছুড়লো না কি?তোর মনে হয় না সেটা?”

অনিমা মাথা নাড়ে,চোখে মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট। সাজিদ এর পোস্টিং এখানে হওয়ার পর দুটো কেস এসেছে একই রকম।যদিও দুটোই ভিন্ন ভিন্ন এলকার।তবে লাশ ঘুরেফিরে একই জায়গায় পাওয়া যায়।ওপর থেকে বিশেষ ভাবে সাজিদ কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেসটার জন্য। বিগত এক বছর হলো এই কেস নিয়ে পাগলপ্রায় সাজিদ।একেরপর এক একই ঘটনা রিপিট হচ্ছে। এতদিন এদিকটায় থাকলে এখন তাদেরই এলাকায়! নিজেদের পরিচিত সবার জন্য চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার জোগাড়।
নিয়াজ চোখমুখ শক্ত করে উঠে গেলো,অনিমা জানে বেচারা কি ভাবছে।খানিকপর নিজের ফোন টা নিয়ে এসে বসলো ড্রয়িং রুমে।অনিমা বেরিয়েছে। নিয়াজ ফোন হাতে চোখ বুজে বসা সোফায়।অনিমা রিমোট হাতে টিভিটা ছেড়ে দিতে দিতে বললো,
_____”ভাবিস না এতো।নিশিকে কল কর।আমি চা করে আনি।”
নিয়াজ মুখ তোলে।সময় দেখে।এতো রাতে মেয়েটাকে কল করবে!ঘুমটা নষ্ট হবে।আবার মনটাও মানছে না তার।যে মেয়ে খুন হয়েছে নিশির ভার্সিটির ফাইনার ইয়ারের স্টুডেন্ট। অর্থাৎ নিশির ব্যাচমেট।মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে নিয়াজ এর।সাতপাঁচ না ভেবে কল করে মেয়েটাকে।দু বার কল কেটে তিনবারের বার কল রিসিভ হলো।নিশি ওপাশে ঘুমে কাতর।অস্ফুটস্বরে উত্তর নিলো।নিয়াজ এর বুকটা জ্বালাপোড়া করছে।

_____”নিশি…
_____”হুমম..…
_____”বিরক্ত করলাম খুব?”
_____একদম না।”
_____”মিসড ইউ।”
নিয়াজ এর এমন কন্ঠে ঘুম ছেড়ে গেলো নিশির।ঝটপট বিছানায় উঠে বসলো।ব্যাস্ত হয়ে বললো,
_____”কিছু হয়েছে?নিয়াজ?”
নিয়াজ জোরে জোরে শ্বাস নেয়।মিহি গলায় বলে,
____”সুবর্না নামে কাউকে চেনো?”
নিশি অবাকই হয় এতো রাতে সুবর্ণার খোঁজ করায়।চিনবে না কেনো!তারই ব্যাচমেট।তাছাড়া একই এলাকার তার।
____”চিনি তো…ওইযে মেইনরোড এ উঠতে ওপাশে যে একতলা বাড়ি টা।ওদেরই তো।আমার ব্যাচমেট।সেম ডিপার্টমেন্ট। “
খানিক থামলো সে।নিয়াজ ও চুপ করে রইলো।তার মানে সুবর্ণার এতোবড় একটা ঘটনার কথ াজানা নেই ওদের।গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললো,
____”সি ইজ নো মোর।”
আতকে উঠলো নিশি।নো মোর মানে কি!আজ সকালে ক্লাসেও দেখা হয়েছিলো মেয়েটার সাথে। ভালো স্টুডেন্ট। তবে বেশ ইনট্রোভার্ট।

____”মানে কি!”
একেএকে যতটুকু জানে ঘটনা খুলে বললো নিয়াজ
নিশি যেনো আকাশ থেকে পরলো।ডুকরে কেঁদে ফেললো।অভাবনীয় বিষয় এটা।স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
____”মার্ডার হলো এখানে!লাশ সদরঘাটে!মানে কি”
____”আর কিছু জানতে পারিনি।সাজিদ গেছে।পরে যা জানতে পারি জানাবো।”
নিশি কেঁদেই যাচ্ছে।নিয়াজ এর মনে হলো এতো রাতে মেয়েটাকে কথাটা বলে আপসেট না করে দিলেই পারতো।কিন্তু তার অস্থির লাগছিলো। নিশির সাথে এখন কথা বলতে না পারলে দম আটকে আসতো তার।খানিক নিজেকে ধাতস্থ করে শুকনো গলায় বললো,
_____”আপাতত বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই কেমন?আমরা কাল যেতে চেয়েছি।দেখি সাজিদ আসুক।কেস এর মোড় কোনদিকে যায়।তুমি নূরি,তিতির,তমা ওদের কেও বলে দেবে একদম যেনো বাইরে না বের হয়।কেমন?অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয় যেহেতু। “
নিশি নাক টানলো।ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,

____”ভাইয়া বারবার নিষেধ করে গেছে আমাদের বাইরে না যেতে।আমরা কেউ শুনি না।এসব কারনেই হয়তো।”
____”কোথায় গেছে ঈশান!”
নিশি অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
____”ঢাকাতেই তো গেলো।বলেনি তোমাদের? “
নিয়াজ অবাক হয়।এমনিতে দু একদিন এর জন্য ঢাকা আসলে ঈশান বরাবরই তাদের বাসাতেই ওঠে।আর তারা সকলেই কখন কোথায় যাওয়া আসা করে সবসময় একে অপরের কাছে আপডেট থাকেই।চিন্তার ভাজ পরে নিয়াজের কপালে।

____”কবে এসেছ?”
____”কবে মানে!বলো কখন..।রাতে রওনা দিয়েছে তো।সাড়ে এগারোটার দিকে সম্ভবত। “
আরও অবাক হলো নিয়াজ।সন্ধ্যার পরে গ্রুপ কলে আড্ডা দিয়েছে তার কিছুক্ষণ। ঈশান অবশ্য সবটা সময় কলে ছিলো এমন টা নয়।তারপরও একবারও তো বললো না ঢাকা আসার কথা!অনিমা,সাজিদ জানে কি!তবে নিশি কে এতোসব প্রশ্ন করলো না।নরম গলাতে বললো,
_____”ঈশান তোমাদের জন্য চিন্তা করে তাই বলেছে।বুঝতে পারছো এখন!তাছাড়া এখন তো প্রমান পেলেই ভয় পাওয়াটা অমূলক নয় কিন্তু। যেহেতু এতগুলো একইরকম এর মার্ডার,তারওপর খুনি ধরা পরেনি।তার ওপর আজকের এতোবড় ইন্সিডেন্ট টা ঘটলো একদম নিজেদের সাথেই বলা যায়,চোখের সমানে।সতর্কতার চূড়ান্ত থাকতে হবে কিন্তু। কেমন?আমি জলদি চলে আসবো।টেনশন না করে এখন ঘুমাও।”
নিশির সাথে আরও দু চার মিনিট কথা শেষে ফোন রাখলো নিয়াজ।অনিমা নিউজ চ্যানেলে দিয়ে গেছে।সেই খবরই দেখানো হচ্ছে। অনিমা দু কাপ চা নিয়ে এসে বসলো সোফায়।এক কাপ নিয়াজের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বললো,
____”কথা হলো? “
____”হু।”
____”সাজিদ ফিরুক।চিন্তা করিস না দ্রুতই বাড়ি ফিরবো।নাকি কাল তুই যাবি আমরা না হয়…
নিয়াজ থামিয়ে দিলো অনিমা কে।মাথা নাড়লো দু দিকে।

____”চাপ নেই।ওদের সকলের ভার্সিটি অফ আজ থেকে।বাড়িতেই থাকবে।তাছাড়া সতর্ক তো করলামই।আর ঈশান…
ঈশানের কথা বলতে গিয়ে থমকালো নিয়াজ।চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অনিমার দিকে ফিরলো
গম্ভীর গলায় বললো,
____”ঈশান ঢাকা আসছে বলেছে তোদের কিছু?”
অনিমা চমকালো।মাথা নাড়লো দুদিকে।
____”না তো।”
____”ঈশান ঢাকা এসেছে আজ রাতে।”
____”বলিস কি!উঠেছে।কোথায়!”
সময় দেখলো নিয়াজ।সাহরীর সময় হয়ে এসেছে।চারটে বাজে।সাড়ে এগারোটায় রওনা দিলে আরও ঘন্টাখানেক আগে পৌছানোর কথা ওর।
____”জানিনা।কল করবি নাকি?”
____”সকালে করি।এসে ঘুমুচ্ছে নিশ্চয়ই। “

কথাটা বললেও চিন্তা রয়েই গেলো।রুষা কে নিয়ে হাজার একটা চিন্তায় থাকে তারা।রুষা এখন ঢাকাতে আছে।মহা সমস্যার ব্যাপার স্যাপার।এর মধ্যে কোন কাজে ঈশানকে ঢাকা আসতে হলো হিসেব মিলছে না।ঈদের বাকি আর ছয় দিন।এদিকে ঈশানের অফিস থেকে তো নাকি রিজাইন করে নিয়েছিলো সে।তাহলে!নিজের কোম্পানির কোনো কাজে আসতেই পারে।চায়ে চুমুক দিয়ে টিভির পর্দায় চোখ রাখলো দুজন।ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে।লাইভে দেখানো হচ্ছে লাশ উদ্ধার, কোথায় লাশ পাওয়া গিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।সাজিদ কেও দেখতে পাওয়া গেলো ফোর্সে।তাকে দেখতেই সাংবাদিক রা ঘিরে ধরলো একপ্রকার। দু এক কথার সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে সাজিদ সরলো সেখান থেকে।শহরের উত্তপ্ত অবস্থা হয়ে যাবে কাল দিন হওয়া মাত্রই।বুঝতে বাকি রইলা পরিস্থিতি দেখে।

হাতের ঘড়িখানা খুলে মায়ের রুমে ঢুকলো রাহাত।রানী বেগমের অবস্থা স্থিতিশীল। ঈদের তিনদিন পর আবার সিঙ্গাপুর এর ফ্লাইট। আবার ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হবে।রানী বেগমের পাশেই ঘুমুচ্ছে তাকে দেখাশোনা করার জন্য যে মেয়েকে রাখা হয়েছে।মেয়ে টি খুব কাজের।সাতকুলে কেউ নেই,রানী বেগম সুস্থ থাকাকালীন নিয়ে এসেছিলো মেয়েটাকে। সেই সাথে তাদের সাথেই থাকে।এতদিন পাসপোর্ট ভিসা সময় মতো না হওয়ার কারণে দেশের বাইরে যাওয়ার সময় মেয়েটিকে নিতে পারছিলো না তারা।তবে এবার সে ঝামেলা মিটেছে।রাহাত খানিকটা নিশ্চিন্ত এখন।সে পুরুষ মানুষ। মাকে সামলাতে একজন মহিলা মানুষ এর খুব দরকার হয়।মায়ের গায়ের চাদর টা ভালোমতো।টেনে নিজের ঘরে এসে ঢুকলো।শরীরটা বেশ ক্লাম্ত।অফিস,মাকে নিয়ে এতো টেনশন সবকিছুর চাপে জর্জরিত সে।দরজা আটকে শার্ট খুলে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়।গোসল করে লম্বা একটা ঘুম দরকার।ঘাড় কাত করে টেবিলের ওপর তাদের ফ্যামিলির ফটোর পাশাপাশি রাখা তিতিরের ফটো ফ্রেম টা হাতে নিলো।এটায় তিতির বারান্দায় দাড়ানো।দিনাজপুর থাকতে তারা তো পাশাপাশি বিল্ডিং এ থাকতো…সেখানেই কোনো এক বৃষ্টির দিন তিতিরের বৃষ্টিভেজা একটা ছবি।ছবিটা তার ভীষন প্রিয়।আরও একটা ছিলো তার মানিব্যাগে।সেটা কোনো ভাবে হারিয়ে গিয়েছে।রাহাত ছবিটা বুকে চেপে ধরে।সবকিছুর মাঝে থেকে এক সেকেন্ড এর জন্য এই পরীটাকে সে ভুলতে পারে না।ভিতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।চোখের সামনে ওই একটা মেয়ের মুখ ভেসে ভেসে বেড়ায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহাত।বিছানা ছেড়ে উঠে বসে তোয়ালে হাতে বাথরুম এ ঢোকে।

যতবার তিতিরের মুখ ভেসে ওঠে সেদিনের বলা তিতিরের সবগুলো কথা,শব্দ কানে এসে বাড়ি খায় তার।মাথা যন্ত্রণা শুরু করে।দুনিয়ার আর কোনো কিছু ভাবতে পারে না সে।তার একটু গাফিলতির জন্য তার পরী এখন অন্য কারোর স্ত্রী! কি করে এই কঠিন সত্যি টা মেনে বাচবে সে! সজোরে আঘাত করলো দেয়ালে।একবারেই ক্ষান্ত হলো না।ক্রমাগত বেশকয়েকটা আঘাত করলো।হাত ফেটে রক্ত গড়িয়ে পরছে।শাওয়ার জোরেশোরে ছেড়ে রাখা,পানির সাথে ভেসে যাচ্ছে রক্ত। মেঝের দিকে তাকালো।সাদা টাইলসের ওপর পানি রক্তলাল।দু হাত দেয়ালে রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিলো।দম আটকে আসছে।মেয়েটাকে চাই তার।এতদিন এ একটা কথা সে বুঝে গেছে,তিতির ছাড়া এ জীবন সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বাচতে পারা তার জন্য সম্ভব নয়।পারবে না সে।এত বছরের ভালোবাসা অন্যের করে দিয়ে এভাবে ছন্নছাড়া জীবন তার চলবে না একদমই চলবে না।রাহাত দু হাত মাথার চুল পেছনে ঠেলে দেয়।হাত জ্বালাপোড়া করছে,তবে তার বুকের বা পাশের ব্যাথার কাছে এটা নগন্য মাত্র। হাত উল্টে তাকিয়ে রইলো সে কাটা জায়গাগুলো দিকে।
রক্ত এখনো গলগলিয়ে পরছে।হাত টা আলগোছে ঠেকালো কপালে।রক্তে মাখা হাতটা কপালে রাখতেই পানির কনার সাথে রক্তও গড়িয়ে পরলো চোখমুখে।চোখের পানিতে ভাসলো একই সাথে মুখটা।রক্তলাল হলো আখিজোড়া।

______”তিতির আমার,পুরোটা আমার।আমি একতরফা প্রেমিক হয়ে আগাছা হয়ে পরে থাকবো না।সিনেমা নয় এটা!হিরোরা এসে ম্যাজিক করে চোখের পলকে, অন্য জনের এত বছরের ভালোবাসা কেড়ে নেবে আর আমি সেটা কেঁদে কেঁদে মেনে নিয়ে বললো “তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেধো ঘর।”
উহু,নেভার।পসিবল না এটা।আমার তোমাকে চাই পরী,অ্যাট অ্যানি কষ্ট…তুমি নিজ ইচ্ছায় আসবে,আসতেই হবে..”
রাহাত শ্বাস ছাড়ে জোরে জোরে।ওপর দিকে মাথা হেলিয়ে মুখ তোলে।চোখবুজে অনূভব করে পানির স্পর্শ।
_____”ভিলেন তারা যারা হিরোর থেকে কেড়ে নেয় তার হিরোইন কে।তুমি আমার ছিলে,আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে তোমাকে।সুতরাং তোমাকে আমার জীবনে ফেরত আনতে চাওয়ায় আমি ভেলেন!এটা কেমন হিসেবের গড়মিল হয়ে গেলো না!ছয় বছর ভালোবাসলাম আমি,এক মাসের মধ্যে বউ করে নিলো অন্য জন।আর আমি তোমাকে নিজের করতে চাইলে আমি খারাপ!কেনো!দ্যাট’স নট ফেয়ার পরী।তোমার গল্পে আমি হিরো হয়ে এনট্রি নিয়েছিলাম,শেষ অবধি হিরোই জিতবে।মাঝখানে যারা আসে তারা প্যারাসাইট,তারা ভিলেন।তুমি আমার,শুধু আমার…”

ভোরের আলো ফুটেছে ধরনী জুড়ে। হোটেল রুমের সফেদ বিছানায় এলোমেলো ভঙ্গিতে পরে আছে ঈশান।গতরাতে সব কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে ভোরই হয়ে গিয়েছিলো। ঘুমিয়েছে সবে মিনিট পয়তাল্লিশ হয়তোবার।শব্দ করে ফোন বেজে যাচ্ছে।অসহ্য লাগছে ঈশানের।হাত বাড়িয়ে বেশ কয়েকবার কেটেও দিয়েছে কল,তারপরও বেজেই যাচ্ছে।রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য লাগলো তার।ফোন কানে নিলো।ওপাশ থেকে শোনা গেলো তার পিতৃদেব এর গমগমে কন্ঠ।

____”ফোন কাটার সাহস হয় কি করে তোমার।কতবার কল দিচ্ছি হিসেব আছে?”
এমন ধমকে কন্ঠে আরও দ্বিগুণ মেজাজ খারাপ হলো ঈশানের।একে তো সাজ সকালে কল দিয়ে ঘুমের চব্বিশ টা বাজিয়ে দিয়েছে,তার ওপর চোটপাট করছে।নিজের ডাবল গমগমে গলা বললো,
____”আমাকে শান্তিতে না থাকতে দেওয়ার শপথ গ্রহন করেছেন আপনি।”
রাইসুল দেওয়ান ক্ষেপে গেলো।সারাবেলা পরে পরে ঘুমানো এখনকার জেনারেশন এর একটা বাজে স্বভাবে পরিনত হয়েছে। মুখেমুখে তর্ক করাটা তো একটা ফ্যাশন।এ ছেলে তার এক কাঠি ওপরে।
____”দিনদুনিয়ার খবর রাখো তুমি?”
ঈশান বিরক্ত কন্ঠে বললো,
____”নিজে সুস্থ থাকলে বাপের নাম।আমি মরে দুনিয়া খবর রেখে লাভ কি! “
রাইসুল সাহেব তেতে উঠলেন।দরকারি কথাটাই অদরকারী ঠেকলো রাগের চোটে।
_____”এলাকায় আমার একটা সম্মান আছে তো নাকি!”
____”আমি কখন বললাম নেই।”
__-_”তাহলে গ্রামে এত বড় একটা সমস্যা তুমি কোথায়!”
ঈশান অবাক সুরে বললো,

____”,সম্মান আছে আপনার।সমস্যায় আমাকে দরকার।কেনো? “
____”বেয়াদব এর মতো কথা বলবে না।গ্রামে একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে গেছে।বিকেলের মধ্যে বাড়ি ফিরবে।ওখানে তোমার এ সময়ে কি কাজ আমার তো মাথায় ঢুকছে না।”
____”আমি কয়েকদিন ফিরতে পারবো না।আপনারা সামলে নিন।”
রাইসুল দেওয়ান ধৈর্য হারা হলেন।ছেলেটা মহা ত্যাড়া।কঠিন গলায় বললো,
____”হারু মাস্টার কে চোনো তো নাকি?তোমার শিক্ষক। ওনার মেয়ে মার্ডার হয়েছে।মার্ডার এর আগে মেয়েটাকে অসম্মানিত করা হয়েছে।বুঝতে পারছো কি বলছি?এলাকার জন্য কত বড় একটা দুঃসংবাদ এটা?তারপরও বলবে তোমার কাজ নেই এখানে আসার?হ্যা?”
চোখ মেললো ঈশান।তড়াক করে উঠে বসলো।সে কি ঠিক শুনলো!গলা পরিষ্কার করে বললো,
____”নিশি,নূরিদের একটাকেও বাড়ির বাইরে অ্যালাও করবে না।ইটস অর্ডার।আমি আসছি।”
বাবাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কাটলো ঈশান।ফোনটা বিছানায় একপ্রকার ছুড়ে দিয়ে চোখমুখ ডললো।মাথার চুল টানলো,অসহ্য ব্যাথা হচ্ছে,রাতে এতো ঝড়ঝক্কির ফল।ফোন এ কারোর নাম্বার ডায়াল করলো।গম্ভীর গলায় বললো,

____”পোস্টমর্টেম এর রিপোর্ট পুলিশের কাছে পৌছেছে?”
____”রিপোর্ট দুপুরে আসবে স্যার।”
____”পুলিশের হাতে যাওয়ার আগে আমার চাই।
____”কাজ হয়ে যাবে।”
____”তোমাদের ওদিকে কি অবস্থা? বডি?”
____”অল ডান।”
____”দেখেছে কেউ।”
____”কাকপক্ষী তেও না।”
____”খোঁজ পাওয়া গেছে?”
____”,আর একটা দিন লাগবে।”
____”ওকে।”

বিছানা ছেড়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বের হলো ঈশান।আজকে আর ঘুমটা হলো না।আবার এতটা পথ ড্রাইভ করে যেতে হবে।ক্লান্ত লাগছে তার।আচ্ছা নিয়াজদের আজ ফেরার কথা!ওরা ফিরবে কি!অবশ্য না ফিরতে পারারই কথা।সাজিদ নিশ্চিত আটকে গেছে কেসটা নিয়ে।ঝটপট নিয়াজ কে কল করলো আবার।
নিয়াজ, অনিমা,সাজিদ সোফায় বসা।সাজিদ সবেই ফিরেছে থানা থেকে।ইন্সিডেন্ট টা নিয়ে আলোচনা করছে।খুটিনাটি সব শুনছে নিয়াজ আর অনিমা।নিয়াজ ঈশানের বিষয়টাও জানিয়েছে সাজিদ কে।আচমকা ঈশানের কল আশা করেনি তারা কেউই।একটু পর তারাই কল করতে চাচ্ছিলো।চোখাচোখি হলো তিনজনের মধ্যে। নিয়াজ কল তুললো।ঈশান ল্যাপটপে টাইপ করতে ব্যাস্ত একই সাথে।নিয়াজ কল রিসিভ করতেই লাউডে দিয়ে আবার চোখ রাখলো ল্যাপটপে।

_____”বাড়ি ফিরছিস আজ তোরা?”
_____”তুই কোথায়?”
_____”জানিসই তো।প্রশ্ন করছিস কেনো।”
নিয়াজের হাত থেকে ততক্ষণে ফোন নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে সাজিদ।গম্ভীর গলায় বললো,
____রুষার লাস্ট লোকেশন সদরঘাট দেখাচ্ছিলো।”
ঈশান মোটেই চমকালো না।গম্ভীর গলায় জবাব দিলো,
____”ফিরছিস কি আজকে?নাকি আটকে গেলি।”
সাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে,গম্ভীর গলাতেই জবাব দেয়
____”ফিরবো।আমাকে ওখানে তদন্ত করতে পাঠানো হলো।ছুটিতে যেতাম বাড়ি,সেটা এখন অন-ডিউটিতে যাবো।এই পার্থক্য। “
ঈশান বাঁকা হাসলো।

____”দ্যাটস গুড।এক কাজ করে।তোর থানার গাড়িটা থাকুক। আমার টা তে চল।”
____”আসবি বলিস নি কেনো!”
____”পুলিশ বন্ধু!সবেতেই জেরা!”
____”তুই রুষার সাথে দেখা করেছিস? “
____”নিয়াজ কে দে।”
সাজিদ বিরক্ত হয় বারবার ঈশানের হেয়ালিতে।
____”কথা এড়িয়ে যাচ্ছিস কেনো ঈশান।কিছু জিজ্ঞেস করছি তো।”
ঈশান শব্দ করে হাসে।বাকা গলায় বলে,
____”ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর থেকে কৈফিয়ত চাচ্ছিস! “
____”কৈফিয়ত নয়।তুই জানিস সবটা কেনো জিজ্ঞেস করছি।জানিস না?
____”জানি।”
____”তাহলে!”

____”যেটা ঘটেছে সেটা ঘটারই ছিলো।চাপ নিচ্ছিস কেনো! পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।সো ডোন্ট প্যানিক।তৈরি হয়ে নে।বাবা দ্রুত যেতে বললো,হারু স্যারের মেয়ের বিষয়টা নিয়ে পুরো গ্রাম আপসেট।তোর তদন্তও তো জলদি শুরু করা উচিত! “
সাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই ঈশানটার সাথে মাঝেমধ্যে কথা বলাই দুষ্কর।
____”রোজা আছিস?”
____”এক গ্লাস পানি খেয়ে।”
____”আমার থেকেও দুর্গতি তাহলে।ওকে।রেডি হচ্ছি আমরা।গাড়ি নিয়ে চলে আয় আমার বাড়ির সামনে।হোয়াইট রেডিসনে উঠেছিস তো?”
হেসে ফেললো ঈশান।সে জানতো সাজিদ অলরেডি খোঁজ নিয়ে ফেলেছে তার।

রাইসুল সাহেব গম্ভীর মুখে ভাইদের নিয়ে বসে আছে।পুরো গ্রামে একপ্রকার আতঙ্ক ছড়িয়ে গিয়েছে।যদিও বেশিরভাগ মানুষই বলছে মেয়েরই দোষ ছিলো,পালিয়ে গিয়েছিলো প্রেমিক এর সাথে। তবুও,নিজেদের বাড়িতে চার চারটে বড় বড় মেয়ে,রিশা রোশনি না হয় সবে স্কুলে পড়ে।নিশি,নূরি,তিতির,তমা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। বাহিরে অহরহ যাতায়াত এর প্রয়োজন পরে তাদের। তার মধ্যে তিতির তো থাকে দেশের সেই আরেক পাশে।বাবা মায়ের মন এতো সহজে সবটা মেনে নিয়ে চুপ থাকে!বাড়ির গিন্নিরা সবাই আতঙ্ক মুখে মেখে বাড়ির কাজকর্মে ব্যাস্ত।ছেলেমেয়ে গুলো কেউ ওঠেনি এখনো।উঠলে সবাইকে একসাথে বসিয়ে আজকের পর থেকে একা একা ঘোরাঘুরি, স্কুল,কলেজ যাওয়ার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।রাহেলার শরীর থরথর করে কাপছে খবরটা শোনার পর থেকে।মেয়েটাকে সে চেনে।নিশির বন্ধু ছিলো না মেয়েটা,তবে এ গ্রামের কাকে না চেনে তারা।তাছাড়া মেয়েটা যথেষ্ট ভদ্র,সভ্য।গ্রামের কোনো অনুষ্ঠানে কখনো অন্য সবার মতো হৈ-হুল্লোড়, বেলাল্লাপনা করতে দেখেনি।মায়ের সাথে সাথে থাকতো।গত বছর তাদের বাড়িতে রোজায় ইফতার আয়োজন এ দেখেছিলো শেষ বার।ভাবতেই বুকটা মুচড়ে উঠছে।তিতির আর তমা টা কাল অতো রাতে একা একা ফিরছিলো।ঈশানের কথা না শুনে বড্ড ভুল করেছে তারা।মেয়েদুটোর কিছু হয়ে গেলে।ঈশান না হয় নিয়ে এসেছে,কিন্তু… কিন্তু ওখানে যতক্ষণ ছিলো তখন যদি আল্লাহ না করুক..গায়ে কাটা দিচ্ছে তার।জা”য়েদের সাথে সাহরীর সময় খবরটা শোনার পর থকে এটা নিয়ের আলাপ করে যাচ্ছেন তিনি।
ঈশান আসলে দরকার হলে মেয়েগুলোকে আচ্ছা করে ধমক দিয়ে দিতে বলবে।বিষয়টা আর মোটেই হেলাফেলা করার অবস্থায় নেই।

তিতির ঘুম থেকে উঠলো তখন বেলা বারোটা পার হয়ে গেছে।রাতে ঘুম হয়নি।সাহরী খেয়ে একেবারে সেই যে শুয়েছে।এখন অবশ্য ফ্রেশ লাগছে বেশ খানিকটা।ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই চোখ পরলো বসার ঘরে পরিবার এর সকলের দিকে!চোখ কপালে ুওঠার মতো অবস্থা। মামা রা কেউ অফিসে যায়নি!এমন কি নয়ন ভাই ও না।নূরি,নিশি,তমা সেখানে বসা।তিতিরকে দেখে রাইসুল সাহেব হাতের ইশারা করলেন কাছে গিয়ে বসতে।তিতির বসলোও বড় মামা কে ঘেষে।মাথায় হাত বুলালেন তিনি।
_____”মাথা যন্ত্রণা করে কি আজকাল?”
_____”,মাঝেমধ্যে তো করেই।আজ করছে না মামা।”
রাইসুল সাহেব মলিন হাসে।গম্ভীর গলাতে বলেন,
____”ঈশান ফিরলে জলদি ভাবে ডাক্তার এর কাছে যাবে।কেমন?এই কথাটা যেনো আমাকে আর একবারও বলতে না হয়।”
তিতির মাথা ঝাকায়। বাড়ির সকলে তার এই সমস্যা নিয়ে চিন্তিত।কতবার যে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে চায়,যাওয়াই হয়না।তা অবশ্য নিজের জন্যই হয়না।

____”একটা অ্যক্সিডেন্ট হয়েছে মা গ্রামে।সুবর্না কে চিনবে কি?”
মনে করার চেষ্টা চালালো তিতির।মনে পরলো না।তবে তমা,নূরি দুজনেই চেনে মেয়েটাকে।তিতির দুদিকে মাথা নাড়লো।
____”চিনি না তো মামা।”
____”এখানে সেরকম থাকোনি তো।বিধায় চিনতে পারছো না।তোমার ঈশান ভাই…
রাইসুল সাহেব মুখ ফসকে ঈশান ভাই বলে ফেলতে গিয়ে চুপ করলেন।গিন্নিরা মুখে শাড়ির আচল চাপা দিলো।রাইসুল সাহেব গলা পরিষ্কার করে বললো,
____”ঈশানের শিক্ষক ছিলো মেয়েটার বাবা।আমাদের গ্রামেরই,নিশির ক্লাসমেট।মেয়েটা মারা গিয়েছে।বলতে পারো মেরে ফেলা হয়েছে।তোমরা বাড়ির কেউ না বলে,গার্জেন না নিয়ে আপাতত কয়েকদিন একটা পাও বাইরে রাখবে না কেমন?”
তিতির অবাক চোখে তাকিয়ে রয়।তাদের এলাকা শান্তির এলাকা নামে পরিচিত। সেখানে জলজ্যান্ত একটা মেয়ে!ভাবা যায়!তবে কোনো ধরনের প্রশ্ন করলো না সে। সে অলরেডি লেট নিচে নামতে তার মানে সবাই সবটা জানে।তমার থেকে ওপরে গিয়ে শুনে নেবে ক্ষন।

ঘরময় পায়চারিতে ব্যাস্ত নূরি।সকাল থেকে ইয়াজ কে কলে পাচ্ছে না সে।আজকে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিলো।সে বেচারা কালকে ফিরে যাবে।নানা দিকের ব্যাস্ততায় আবার কবে দেখা হবে বলা মুসকিল। অথচ আজকে বের হতে পারছে না।এরকম একটা বিচ্ছিরি ঘটনায় ঘটে গেলো।আজকে কোনো যুক্তিতেই বের হওয়া সম্ভবই হবে না।তারমধ্যে ঈশান ফিরছে,এরই মধ্যে বের হতে চাওয়া আর সেচ্ছায় আত্মাহুতি দেওয়া একই বিষয়।কালকে তিতির,তমাকে নিয়ে যতটা টেনশনে পরে গেছিলো তারা,আজকে আবার সে বের হলে কেলেঙ্কারি ঘটবে একটা।ফোন করে যে জানিয়ে দেবে সে গতিও নেই!আশ্চর্য মানুষ একটা। ফোন না ধরার কি আছে।

নূরির আজকাল সবকিছু অসহ্য লাগে।এমন একটা সম্পর্কে আটকে পরেছে সে,না সেটা থেকে বের হওয়া সম্ভব আর না তো মানসিক শান্তিতে সেখানে বাঁচতে পারছে।তিন বছরের সম্পর্ক।মুখের কথায় ভেঙে ফেলা যায়?বারান্দায় উচু করে বাধা দোলনায় গা এলিয়ে বসে সে।বাইরের কড়া রোদ এসে গায়ে লাগছে। অবাক করার বিষয় তার মোটেও গরম লাগছে না।কপালে হাত দিলো নিজের,জ্বর কি না বুঝতে চেষ্টা করলো। বোঝা গেলো না।

ঈয়াজের সাথে প্রথম পরিচয় সম্ভবত ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের স্টাডি টুরে গিয়ে।এতগুলো দিন একসাথে তারা।আজকাল ইয়াজের এতো উদাসীনতা ভাবায় তাকে।বিয়ের আগে সব ধরনের সম্পর্ক হারাম,এই একটা লাইন বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত সে।অন্তত কোনোভাবে বিয়ে টা করে রাখলেই এতো মানসিক চাপটা আর লাগতো না।নিজের পরিবার কে সে চেনে।ইয়াজ কে না মানার মতো ছেলে সে নয়।সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ভালো পরিবার, বাবা, মা দুজনেই ভালো চাকরি করে।সুন্দর গোছানো সবকিছু।ইয়াজের সময় চাই,নূরি ভেবে পায়না বিয়ে করার জন্য আর কি কি গুছিয়ে নিতে হয়!সে তো এখনি তার সব দায়িত্ব নিতে বলছে না।এইযে সময় অসময় ইয়াজ তাকে কাছে চায়।সেও মেয়ে, তারও শরীর আছে।ইচ্ছে তারও হয়।কিন্তু এভাবে বিয়ের আগে বারবার জোরজবরদস্তি করে কাছে টানা…নূরি বলতে গেলে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। কারোর কাছে বলার উপায় নেই আর না তো নিজে নিজে সহ্য করতে পারে আজকাল।

তিতির তমা গোল হয়ে বসে আছে বারান্দায় থাই গ্লাস এর সামনে মেঝেতে।বারান্দায় রোদ বিধায় বাইরে বসেনি।তবে রোদ হলেও বেশ ঠান্ডা বাতাস আসছে এখানে।দুজনেরি চুল খুলে দেওয়া।গোসল করে যোহরের নামাজ পরে শুকাচ্ছে চুল।এতক্ষণ ধরে জোর আলোচনা চলছিলো সুবর্ণার বিষয়টা নিয়ে।আপাতত সে আলোচনায় ভাটি পরেছে।তমার এক হাত তিতিরের লম্বা চুলগুলো হাত নিয়ে পেচাচ্ছে।হেলান দেওয়া দেয়ালের সাথে। উদাশ গলায় বললো,
____”কাল বড় ভাইয়া কিছু বললো না কেনো বলতো।”
তিতির ঠোঁট উল্টায়।মুখ বাকিয়ে বলে,
____”আমি কি করে জানবো।”
____”তাহমিদ স্যার কে দেখেও কিছু বললো না!”
____”কি বলবে!”
তমা শব্দ করে হাসে।এক হাতে তিতিরের গাল টানে।বাঁকা গলায় বলে,

____”খেয়াল করিসনি কিছু এটা খবরদার বলবি না।”
তিতির তমার দিকে তাকায় না।বাইরে তাকিয়ে থাকে।তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা টা গেছে। সে রাস্তার ওপাশ থেকে যতদূর চোখ যায় খালি ধানখেত।উদাশ দৃষ্টি সেদিক রেখে বলে,
____”খেয়াল করার মতো কিছু ছিলো!”
তমা হতভম্ব হয় তিতিরের কথায়।
____”ছিলো না মানে।একদিকে তোর নতুন আশিক তোর চিন্তায় গদগদ,অন্য দিকে বড় ভাইয়া রাগে,জেলাসিতে জ্বলছিলো পুরো।অবশ্যই দেখেছিস তুই।মিথ্যা বলিস না।”
তিতির জবাব দিতো পারে না।সত্যি সে খেয়াল করেছে। খুব করেছে।মুখে বললো,
____”ওটা তো তার নিষেধ সত্ত্বেও বেড়িয়েছিলাম বলে।

তমা মৃদু থাপ্পড় দেয় তিতিরের বাহুতে…
____”যখন তুই তাহমিদ স্যার কে ভাইয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে থেমে গেলি মনে হলো বড় ভাইয়া তোকে কাঁচা খেয়ে ফেলতে চায়।”
তিতির মুখ ভেঙায়।যত্তসব আদিখ্যেতা। ভালোবাসেনা অথচ অন্য কারোর সাথে দেখলে রাগারাগি করবে।
____”কাল রাতে কোথায় নিয়ে গেছিলো সেটা বল তুই।আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম।”
তিতির তাদের গন্তব্যের কাহিনি জানালো।তমাও অবাক হলো বেশ।তাদের এখানকার আশেপাশে যে অমন কোনো জায়গা আছে জানা ছিলো না তার।গদগদ হয়ে বললো,
_____”বেশ নিরিবিলি না?”
মাথা নাড়ে তিতির। দু হাতে চুল গুলো পিছনে ঠেলে দেয়।ভেজা চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পরছে।
তমা যেনো আরও উৎসাহী হলো
তিতিরের কাছে ঘেষে বসলো।
____”কিছু হয়েছে তোদের মধ্যে হু?ভাইয়া যে পরিমাণ রেগে ছিলো।মুভিতে যেমন,হিরো রা রেগে গেলে রোমান্স করে।তেমন কিছু…
মুখ চেপে ধরে তমাকে থামিয়ে দিলো তিতির।ধমকে উঠলো,
_____”পাগল তুই।চুপ কর।তোর ভাই হিরো?হিরো লাগে?ভিলেন।আস্ত ভিলেন।ফালতু লোক।”
তমা হাসে।

____”সামনে বলতে পারবি?”
____”না পারার কি আছে।”
____”তুই ব্লাশ করছিস কেনো।বল বল কি হয়েছে? “
তমা একপ্রকার কোলের ওপর উঠে আসছে তিতিরের।তিতির দু’হাতে ঠেলে সরালো ওকে।কাল রাতে কিছু হয়েছিলো তাদের!উহু হয়নি তো।জাস্ট ওইটুকু কোলেই তো তুলেছিলো আর…আর কি! বাজে লোকের বাজে বাজে কথা।তিতিরের এতটুকু মনে পরতেই কান দিয়ো গরম ধোয়া বের হলো।মুখে বললো
____”কিচ্ছু হয়নি।হবেও না।অযথা তিল কে তাল বানাস না তো।”
তমা মুখ ভেঙ্গায়।বাঁকা গলায় বলে,
____”কিছু হয়নি,কিছু করিনি,ভালোবাসিনা,সম্ভব নয় কিছু; এসব বলতে বলতে একদিন হুট করে বলবি বাবু কে কোলে নে তো তমা।তোর বড় ভাইয়া নিজের আন্ডারওয়্যার খুজে পাচ্ছে না দিয়ে আসি।”
তিতির লজ্জায় লাল হয়ে গেলো তমার উল্টাপাল্টা কথায়।তমা খিলখিল করে হেসে ফেললো তিতিরের মুখের অবস্থা দেখে।তিতির ধমক দিতো চেয়েও দিতে পারলো না।

____”বাবুর নাম ঠিক করেছিস? হ্যা?ছেলে না মেয়ে।কে কোনটা চাস?”
____”আহ তমা!থামবি!”
____”ঢং করবি না।এই ডায়লগ যদি তুই আমাকে না দিস একদিন। আমার নাম পাল্টে রাখবি।সেদিন আমি কিন্তু বাবুকে কোলে নেবো না।তোদের রোমান্সের সময় বাবুকে মাঝখানে দিয়ে আমি ভাগবো।”
তিতির আর বসে থাকতে পারো না।কান ঝ্যানঝ্যান করছে তমার এই কথাগুলো।উঠে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই হাত টেনে নিজের গায়ের ওপর ফেললো তমা।গলা জড়িয়ে নিয়ে বললো,
____”লজ্জায় লাল হয়ে লাভ নেই।মারামারি করতে করতে একদিন দুজন ছুটবি বাচ্চাদের মারামারি থামাতে।সেদিন বেশি দেরি নেই বলে দিলাম।”

____”অসম্ভব কথাবার্তা। থাম তো।”
তমা শব্দ করে হাসছে।হাসির চোটে চোখ দিয়ে পানি গড়ায়।ফিচেল গলা য়বলে,
____”তাহলে এক কাজ করি।তাহমিদ স্যার কে বিয়ের প্রস্তাব আনতে বলি।আমি সিওর ভদ্রলোক একপায়ে খাড়া। নাচতে নাচতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হবো দেখিস।”
তিতির আরেকদফা থাপ্পড় মারে তমা র হাতে।তবে মুখে আর কিছু বলে না।চোখ বুজে পরে থাকে তমার কাধে।তমা অনবরত হাসছে তাকে খেপাতে পেরে।আর সে!সে কি ভাবছে!তমার কথাগুলো মাথায় ঘুরছে।বাচ্চা! এ কথা এর আগে নিশি,নূরিও বলেছে।এসব অলীক কল্পনা বই আর কিছু নয়।তসর আর ঈশানের বাচ্চা!এও সম্ভব! এ জীবনে নয়।যেখানে একটা সুস্থ স্বাভাবিক সংসারই হচ্ছে না সেখানে এতো উচ্চাভিলাষীর মতো আশা করা সম্পূর্ণ বোকামি।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৯

চোখ আচমকা টলমল করে ওঠে তিতিরের।সংসার জীবন নিয়ে প্রতিটা মেয়ের কতকত স্বপ্ন থাকে, তার কি ছিলো না!ছিলো তো।হাজার স্বপ্ন ছিলো।ঈশানকে ভালোবেসে ফেলেছে এটা বোঝার পর সে স্বপ্ন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো আর।সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে একটা সুন্দর সংসার এর কল্পনা করা কি তার অন্যায়!ছোট ছোট বাচ্চা ঘুরে বেড়াবে,আধো আধো গলায় তাকে মা ডাকবে ঈশানকে বাবা…
আজীবন বুঝি এভাবেই কল্পনায় বেচে থাকতে হবে তাকে!একতরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা বুকে গেঁথে বাঁচতে হবে!

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০ (২)