Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫১

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫১

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ হ্যাভ দে স্লেপ্ট টুগেদার? ‘
ইয়াজের গুরুগম্ভীর ধমুকে কন্ঠের পরিপ্রেক্ষিতে ফোনের ওপাশ থেকে কোনো শব্দ শোনা গেলো না। পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে যেনো। নূরির জবাব না পেয়ে আরেক দফা চেঁচিয়ে উঠলো ছেলেটা।
—’আনসার মি…হ্যাভ দে স্লেপ্ট টুগেদার লাস্ট নাইট?’
দাঁতে দাঁত পিষে শক্ত হয়েই ছিলো মেয়েটা। তবুও এমন কন্ঠস্বরে কাঁপতে বাধ্য হলো। কম্পিত হলো নরম হাতখানা। চোখবুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নূরি। সে জানবে কি করে কাল রাতে ঈশান -তিতিরের মধ্যে কিছু হয়েছে কি-না!
ভরদুপুরে বেলা রোদ মাথায় ছাঁদে এসে দাড়িয়েছে। ভার্সিটির ক্লাস ছিলো না আজকে। নিশি একাই গিয়েছে সে কারণে।
সদ্য ভাতঘুম দিয়েছিলো সে। আচমকা ফেনের কর্কশ শব্দে উঠে এসে দাড়িয়েছে ছাঁদে। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের সাথে নিজ ঘরে আরাম আয়েশে গল্প করা যায়। এর মতো লোকের সাথে নয়। তাছাড়া সে-সময় তার মা ঘর গোছাচ্ছিলো।
নূরি স্বাভাবিক গলায় জবাব দিলো,

—’সেটা তো আমার জানার কথা নয়। রোজ রোজ কি ওদের জিজ্ঞেস করবো, ওরা একসাথে শুয়েছে কি-না? ‘
তেতে উঠলো ইয়াজ। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ওভারস্মার্ট সাজবার চেষ্টা করবে না, জান। যেটা যেটুকু করতে বলবো। সেটা ততটুকুই বুঝবে আর করবে৷ তাতেই হবে ৷ কেমন? তোমার ভাই আর তিতিরপাখিটা কাল তোমাদের দিদার আশ্রমে ছিলো না রাতে। এই ঝড়জলের রাতে দুই কপোত-কপোতী কোথায় রাত্রি যাপন করে এসেছে খবর চাই আমার। ‘
নূরি শুনে যায় উন্মাদের মতো কন্ঠস্বর। একদমে সবটুকু বলে থামে লোকটা।
—’ওরা স্বামী স্ত্রী, ইয়াজ। ওরা কোথায় যায়,কোথায় রাত কাটায়। কিভাবে কাটায়। সেটা বারবার আমাকে কেনো জানাবে?’
ইয়াজ দমবার পাত্র নয় মোটেই। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
—’জানাবে না। ঘরের খবর কে জানায়। কেউ না। জানবে তুমি। যেভাবে পারো।’
—’তোমার কি ধারনা? তুমি এতো হাইপার হচ্ছো কেনো আজকে৷ ওদের বিয়ের অনেকদিনই হয়েছে। ওরা চাইলে যখন তখন কাছে আসতে পারে। এটাই স্বাভাবিক নয় কি?’

ইয়াজের মাথা দপদপ করে উঠলো। পারে না, ওই মেয়েটা অন্যের ছোঁয়া পেতে পারে না। সম্ভবই নয়। এতদিন অজানা কারণে তার বিশ্বাস ছিলো ঈশান তিতিরকে স্পর্শ করেনি। তার প্রমানও পেয়েছে। নূরি নিজেও বলেছে। তিতিরের মুখের স্বীকারোক্তিই ছিলো। কিন্তু… নিজের চোখে দেখা। ওদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে ধীরে। তার ঠিক করে রাখা লোকগুলো শুধুমাত্র জানাতে পেরেছে গতরাত্রে দেওয়ান দের আশ্রমে ছিলো না ঈশান -তিতির। ইয়াজ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। দেওয়ান বাড়ির ছেলেমেয়েদের রেগে বোঝানো সম্ভব নয় কিছু। এদের ঠান্ডা মাথায় বশে আনতে হয়। ঠান্ডা সুরেই বললো,
—’ শোনো, জান। তোমার বোনকে আমি চিনি কবে থেকে জানো? ওকে যখন তোমার বাবা, বড় চাচা আর তোমার ভাই মিলে দিনাজপুর রেখে এসেছিলো। হোস্টেলে রেখে আসলো তারা, তারপর থেকে ওর ওপর নজর আমার। ওর নাড়ি নক্ষত্রর খেয়াল রেখেছি তখন থেকে। শকুনের দৃষ্টিতে রেখেছি। ও মেয়েকে আমি চিনি। একই ভাবে তোমার একমাত্র ভাইয়ের বিষয়টাও আসে। তাকেও আজ কাল থেকে চিনি না আমি। বহু বছরের সন্ধি আমাদের। তোমরা বাড়ির মানুষ যতটুকু জানো, আমি তার থেকেও কয়েকগুণ ভালো চিনি তোমার ভাই-বোনদের। ‘
নূরি চোখ বুঁজে থাকে। অসহ্য লাগে এসব কথা তার। আগেও শুনেছে কয়েকবার। ইয়াজ যে এ জীবনে তাকে কখনো ভালোই বাসেনি, সেটা লোকটা ক্ষনে ক্ষনে মনে করিয়ে দিতে তৈরি৷ নূরি শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,

—’তাহলে? তোমার এতো বছরের প্রেডিকশন কি বলছে? হ্যাভ দে স্লেপ্ট টুগেদার? তিতির মিথ্যা বলেছে আমাকে?’
নূরির কথা হতে দেয় না। সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে ওঠে ইয়াজ। ব্যাগ্র কন্ঠে বলে,
—’উহু, ডোন্ট সে এনিথিং। আমার তিতির মিথ্যা কথা বলতে পারে না। ও যা বলার সত্যি বলেছে।’
—’আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, গতকালের খোঁজ তোমার নেওয়া উচিত ইয়াজ। আর জানতে পারলে আমাকেও একটু কষ্ট করে চটজলদি জানিয়ো ফুপু প্লাস খালামুনি কবে নাগাদ হতে পারবো।’
ফোন কেটে দিলো নূরি। সে জানে এই নিয়ে ইয়াজের রাগ মস্তিষ্কে চেপে বসবে। বসুক। খাঁচায় আটকা পাখির মতো ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে ডানা ঝাপটাতে ভালো লাগে না সবসময়। ধৈর্য, মনের জোর সায় দেয়না সবসময়। ক্লান্ত লাগে বেশ! জানা নেই ঈশান -তিতিরের সম্পর্কের অগ্রগতি কতটা, কতদূর এগিয়েছে। তবে ইয়াজকেও যে সে বাধা দিয়ে বেশিদিন রাখতে পারবে না তাও জানা কথা। লোকটা অতি ধূর্ত। কোনো না কোনো ভাবে ঠিক সব কিছুর তলানিতে পৌছেই যাবে। এই যেমন গতকাল তিতির আর ঈশান যে আশ্রমে ছিলো না সেটা জেনে ফেলেছে!

বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। ঈশান তিতির কে নিয়ে যখন আশ্রমে ফিরলো তখন বারোটা সম্ভবত । এখন খরখরে রোদ উঠেছে। কেউ বলবে না গতকাল রাতে এরকম উথাল-পাতাল ঝড় ,বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তার প্রেডিকশন ভুল নয়। তিতির আর সে কাছাকাছি থাকলে প্রকৃতি বোধহয় হুমড়ি খেয়ে পরে রোমান্টিক ওয়েদার তৈরি করে দিতে। তবে রোদের তীব্রতা অনুযায়ী এখন গরম কম। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া যাকে বলে আরকি! ঈশান আশ্রমের ম্যানেজার সাহেবকে কল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তাদের এদিককার জিনিসপত্র গুলো নিয়ে যেতে। ঈশান তিতিরকে নিয়ে ফিরেছে। মেয়েটার শরীরে সকাল থেকে তীব্র জ্বর। গাঁ কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে আরকি। হাঁটাচলার অবস্থাতেও ছিলো না। এতোটা পথ কোলে করে বয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে ছেলেটাকে।

ঝড়ে, বৃষ্টিতে ভেঙেচুরে যাওয়া ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করতে পাখিরা ভীষন ব্যাস্ত। গতকালের তান্ডবে মানুষকূলের আহামরি ক্ষয় ক্ষতি না হলেও পাখিদের অবস্থা বেহাল। ভর দুপুর বেলাও কিচিরমিচির শুনতে পাওয়া যাচ্ছে সে-সবের। চন্দ্রা দেওয়ান কয়েকবার এসে দেখে গিয়েছেন নাতনি কে। এতোটা জ্বরের উৎপত্তি কোথা থেকে তা টের পাচ্ছেন না তিনি।
তিন চার বার এসেও জিজ্ঞাসা করার জন্য ঈশান কে পায়নি সে। বউকে শুয়িয়ে রেখে সে বেচারা ফোনে মহাব্যাস্ত। বৃদ্ধা বিরক্ত হচ্ছেন এ যাত্রায়। এ আবার কেমন কথা! মেয়েটা চোখতুলে তাকাতে অবধি পারছে না। ফর্শা মুখটা জ্বরের তাড়নায় টকটক করছে।
ঈশান ব্যাস্ত হাতে কল করে যাচ্ছে পরিচিত ডাক্তারকে। রিতুকে ফোনে পাচ্ছে না তখন থেকে। অথচ বিষয়টা নিয়ে আলোচনার জন্য এক রিতু ছাড়া কারোর সাথে কথা বলতেও কেমন রুচিতে বাঁধছে। এবার দিদার ডাকে ঘরে ফিরলো ঈশান। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। বৃদ্ধা হাত দিয়ে ইশারা করলেন ঈশানকে বসতে। সে নিজে হুইলচেয়ারে। খানিক দুশ্চিন্তা করলেই হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে আসে বৃদ্ধার। ঈশান বসতেই প্রশ্ন ছুড়লেন তিনি।

—’মেয়েটার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ডাক্তার ডাকছো না কেনো? তোমাদের অফিসের কাজ এখানেও এতোটা দরকারি? ‘
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে । সে তো ডাক্তারের খোঁজই করছিলো । শান্ত কন্ঠে বললো,
—’ডাক্তারকে কল করছিলাম। ‘
—’তা এখনো আসছে না কেনো? ফিরেছো সেই কখন, এখনো একটা ডাক্তার জোগাড় হলো না!’
ঈশান বিরক্ত মুখে বলে,
—’তোমার এখানে যা নেটওয়ার্কের ছিড়ি। কি করে কলে পাবো কাউকে। সেই চেষ্টাই তো করে যাচ্ছি তখন থেকে।’
বৃদ্ধা কথা বাড়াতে পারেন না। এদিক কার নেটওয়ার্কের অবস্থা সত্যিই বেশ শোচনীয়। পাহাড়ি এলাকা, তার ওপর বর্ডারের কাছাকাছি। ঠিকঠাক নেটওয়ার্ক পাওয়া দুষ্কর। চিন্তিত মুখে বললেন,
—’তবে? এখন কি করবে?’
—’ ওকে নিয়ে জার্নিও করা যাবে না। আরও অসুস্থ হয়ে পরবে। দেখি, রিতুকে মেসেজ করেছি। কল লাগে কি-না দেখতে হবে। না হলে কাউকে পাঠাতে হবে শহরে।’
বৃদ্ধা ধুম মেরে বসে রয় নাতনির দিকে তাকিয়ে। মেয়েটার মুখ কেমন চুপসে গিয়েছে। ঈশানের চোখমুখও শুকনোই লাগছে।

—’বৃষ্টিতে ভিজেতে দিয়েছো কেনো? ও তো চাইবেই। বৃষ্টি ভালোবাসে কি-না মেয়েটা। তাই বলে রাত করে ভেজার মানে হয়!’
দিদার হা-হুতাশের জবাব দিতে পারে না ঈশান। জবাব থাকলে তবে তো দেবে! এরকম ভেঙেচুরে জ্বর আসার একটা কারণ না হয় বৃষ্টি। বাকি কারণ তো আর ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে শব্দ করে বেজে উঠলো ফোনটা৷ রিতুর ফোন! একবার রিং হতেই ছো মেরে ফোনটা তুললো ঈশান। রিতুও মেসেজ টা পাওয়া মাত্র কল করেছে। ঈশানের এরকম ইমারজেন্সি মেসেজ, মানে কিছুতো একটা সমস্যা নিশ্চয় আছে!
—’রিতু? শোন । তিতিরের ভীষন জ্বর আজ ভোর থেকে বুঝলি। সারাদিনেও জ্বর নামেনি একটুও। এগারো টার দিকে একশ এক ছিলো এখন…মিনিট পনেরো আগে মেপেছি। একশ তিন। সারাদিন বিছানায় অচেতনের মতো পরে আছে। আমরা এসেছি দিদার আশ্রমে। ওর শরীরের এই অবস্থায় জার্নি করে শহরে ফিরতেও পারছি না। আবার এখানেও তো তেমন অভিজ্ঞ ডাক্তার নেই। তাছাড়া… ‘
একদমে কথাগুলে গড়গড় করে বলে এক সেকেন্ডের বিরতি নিলো ঈশান। পরক্ষণেই ঝট করে বললো,
—’তাছাড়া কথাটা তোকেই বলতে চাচ্ছিলাম। আই মিন তুই ছাড়া আর কেনো ডাক্তার চাচ্ছিলাম না আরকি।’
রিতু গভীর মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে কথাগুলো। ঈশান থামতেই সে-ও ব্যাস্ত কন্ঠেই শুধালো,
—’গেলি ঘুরতে। ওখানে গিয়ে জ্বর বাঁধিয়ে নিলো কেমন করে!’
ঈশান একনজর দেখলো চন্দ্রা দেওয়ানের দিকে। ঠোঁট টিপে উঠে গেলো সেখান থেকে। সোজা এসে দাড়ালো বেলকনিতে। গলার স্বর অস্বাভাবিক খাদে নামিয়ে বললো,

—’ বৃষ্টি তে ভিজেছিলো। আর…’
—’আর?’
—’আর…’
রিতু অধৈর্য হয় খানিকটা।
—’আর আর করছিস কেনো শুধু! আর কি? বৃষ্টিতে ভিজেছিলো। তারপর।’
ঈশান খানিকক্ষণ ইতস্তত করে সত্যি বলতে। এমন একটা বিষয় নিয়ে অন্যের সাথে আলাপ আলোচনায় বসতে হবে। ব্যাপার টা কেমন একটা না! মেয়েটা ভোগাবে আজীবন। ঈশান কন্ঠস্বর বড্ড নির্বিকার করে বললো,
—-’ জ্বর কেনো এসেছে, এটার ব্যাখা শুনে কি করবি?একেক ভাবে জ্বর এলে তার কি আবার একেক রকম ওষুধ নাকি? একই তো ওষুধ সব জ্বরের। বল এখন। প্যারাসিটেমল এ কাজ হচ্ছে না। কি করবো?’
—’হেয়ালি করিস না। যেটা জানতে চাচ্ছি জবাব দে। ডাক্তার আর উকিল, এই দুজনের কাছ থেকে কিচ্ছু লুকাতে হয়না। খুলে বল।’
ঈশান পরেছে মহাবিপদে। করিডর থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে বিছানায় পরে থাকা কাতর তিতিরকে দেখলো। অতঃপর ইতস্তততা কাটিয়ে কন্ঠস্বর নামিয়ে বললো,

—’আমরা গতরাতে একসাথে ছিলাম আরকি।’
—’সে-তো থাকবিই। হাসবেন্ড ওয়াইফ একসাথেই তো …’
কথার তালে তালে নিজের কথাটুকু বলে থমকে গেলো রিতু। চট করে মাথায় খেললো কিছু একটা। এদিক থেকে কপালে উঠলো চোখজোড়া। নিজের হতভম্বতা কাটিয়ে মিনমিন করে শুধালো,
—’হাসবেন্ড-ওয়াইফ টাইপের একসাথে থাকা?’
চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি ঈশানের। গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
—’হু।’
—‘ডু ইউ গায়েজ…. মানে ইন্টিমেট? আই মিন মেয়েটার সাথে…’
—‘এতো প্রশ্ন করছিস কেনো! বললামই তো হ্যা। ডাক্তারের কাছে লুকালাম না। হয়েছিলাম ইন্টিমেট। এখন বল কিসে মেয়েটার জ্বর কমবে।’
এদিক থেকে হাতে মুখ চাপা দিলো রিতু। ফিক করে হেসে ফেলতে ইচ্ছে হলো। তাদের ঈশান অবশেষে বউকে নিজের করে নিলো! রিতুর চাপা হাসির শব্দ না চাইতেও কানে আসছেই ঈশানের। ছেলেটা গমগমে কন্ঠে বললো,

—’ এখন কি করবো সেটা বল। সাথে ভিজেছেও। জ্বর সকাল থেকে। সেন্স নেই প্রায়। কিছুতেই কমছে না।’
রিতু কিয়ৎক্ষন সময় নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। কিছুতেই হতে পারছে না। অতঃপর মুখ ফসকে বলেই ফেললো,
—’দোস্ত, বউ মানিস না, মানবি না। ভালোবাসিস না, ভবিষ্যৎ এও কখনো বাসবি না। বলতে বলতে এমন ভালোবাসা বাসলি। বউ সেন্স এ নেই সকাল থেকে! একশ তিন জ্বরে কাবু করে ফেলেছিস!’
—’ এখন বাড়তি কথা তুই বলছিস। ওষুধ বল জলদি।’
রিতু নিজেকে সামলায়। এ নিয়ে পরে মজা নেওয়া যাবে। তার আগে ডাক্তারের কর্তব্যটা পালন করা উচিত। একে একে যা যা প্রয়োজন সব ওষুধপত্রের নাম লিখে নিলো ঈশান। ফোন কানে গুঁজেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দ্রা দেওয়ানের ম্যানেজারের হাতে ধরিয়ে দিলো কাগজখানা। চটজলদি বেড়িয়ে পরলো সে।
—’শোন, ওষুধের পাশাপাশি এক কাজ কর। এখন তো দুপুরবেলা। গোটা শরীরটা মুছিয়ে দে একটু। আর কপালে জলপট্টি দে কিছুক্ষণ। খানিক হলেও আরাম পাবে। আর…’
—’আর?’
—’একটু ভদ্রলোক হ…বাস্তবে যেমন দেখাস, আদতে তা তুই না। বোঝা যাচ্ছে আজকাল। তোর বউয়ের জন্য এক বালতি সমবেদনা। এ নিয়ে পরে গ্রুপ ডিসকাশন হবে। কেমন?’
রিতু আর ধমক খাওয়ার জন্য ফোন কানে ধরে রাখলো না। খট করে কেটে দিলো। ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো ফোনের দিকে তাকিয়ে। এই মেয়ে এখন মাইকিং না করলে হয়। কোনোভাবে নিয়াজ, নাঈমদের কানে গেলে! কফিনের শেষ পেরেক পোতা হয়ে যাবে। ছেলেমেয়ে গুলো আর কোনোদিক থেকে ক্ষেপানো বাদ রাখবে না। ইশশ, যাচ্ছে তাই কান্ড।

চোখের সানগ্লাস টা মাথার ওপর তুলে দিয়ে যাত্রী ছাওনির পাশে দাড়িয়ে রয়েছে রুষা। খানিক আগেই সিলেট এসে পৌছেছে। এখান থেকে হোটেল যাওয়ার জন্য বুক করে রাখা উবার এখনো এসে পৌছায়নি। এই গরমে, খা খা করা রৌদ্রের মধ্যে ভর দুপুর বেলা এভাবে অপেক্ষা করতে বিরক্ত সে।
একটু দূরেই দু’দুটো নেড়ি কুকুর গা ঘেঁষাঘেষি করে ঝিমাচ্ছে। বাস স্ট্যান্ডে মানুষ জনের সমাগম খানিকটা কমই এখন। এই সময় অবশ্য এরকম থাকাই স্বাভাবিক।
রুষা নিজের কাঁধের ব্যাগে হাত রাখতেই ঠিক সামনে এসে থামলো একটা বাইক। বাইক আরোহী হেলমেটের গ্লাস তুলতেই দৃশ্যমান হলো অবাক হওয়া আখিজোড়া। রুষা ভ্রু জোড়া কুচকে তাকিয়ে আছে। লোকটা চেনা চেনা লাগছে কি? হতে পারে। কথা বলে উঠলো লোকটাই সর্বপ্রথম। মাথার হেলমেট খানা খুলে হাস্যজ্বল কন্ঠে বললো,

—’কি ম্যাডাম! আপনি?’
তাহমিদ কায়েস! রুষার মুখের বিরক্ত কেটে গেলো খানিকটা। মুখ ঢাকা থাকায় চিনে উঠতে পারেনি এতক্ষণ। নরম গলায় বললো,
—’কেমন আছেন?’
—’ভালো। হঠাৎ এখানে?’
—’একটু কাজে।’
—’গন্তব্য কোথায়? নিশ্চয় দেওয়ান বাড়ি?’
রুষা চট করে জবাব দিতে পারে না। সামান্য সময় নিয়ে নরম গলায় তেই বলে,
—’সে-রকমই। তা আপনার অগ্রগতি কতদূর? ‘
তাহমিদের কপালে দু’দুটো ভাজ পরলো। প্রশ্নাত্মক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—’কিসের বলুন তো?’.
—’দেওয়ান বাড়ির জামাই হওয়ার?’
—-’ওহ!’
শব্দ করে হেসে ফেললো যুবক। হাতের উল্টো পিঠে কপালের ঘামটুকু মুছতে মুছতে বললো,
—’একটু সময় লাগবে তাদের। মেয়েকে এখনই বিয়ে দিতে চাছে না।’
হাসি মিলিয়ে যায় রুষার মুখের।
—’আপনি কি সত্যিই প্রস্তাব নিয়ে…’
—’গিয়েছিলাম তো। ‘
—’কি বলেছে ওনারা?’

—’তিতিরের বড় দুবোন আছে আরও। তাছাড়া বাড়ির কোনো ছেলেমেয়েরই এখনো বিয়ে হয়নি৷ বলা যায় বিবাহযোগ্য হলেও তিতির সবার ছোট। তাই এখনি ভাবছেন না তারা। যদিও আমাকে সরাসরি না-ও করেনি। তবে সময় চেয়েছেন।’
সংক্ষেপে আরও অনেক কথাই জানালো তাহমিদ কায়েস।
স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে রুষা। তিতিরের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছে। আর গোটা বাড়ির সকলে এমন নাটক করে দিয়েছে৷ সাথে ঈশানও! নিজেদের বিয়ের কথাটা পাঁচকান করতে চায়না ছেলেটা। এটা কি বউয়ের জন্য সতর্কতা থেকে নাকি নিজেকে গোপন রাখতে! রুষা শান্ত গলায় বলে,

—’কোথাও যাচ্ছিলেন?’
—’ ফিরছিলাম। বলেন তো ড্রপ করে দেই। ওদিকেই যাবেন তো নাকি?’
পাঁচ সেকেন্ড থেমে থেমে ভাবলো কিছু একটা মেয়েটা। বড়সড় ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে নির্দ্বিধায় এসে বসলো বাইকে। ধরে বসতে বলতে হলো না। তাহমিদ না বলতেও রুষা একপ্রকার আষ্টেপৃষ্ঠেই ধরলো ছেলেটাকে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে এলো ছেলেটার। রুষা কে সরে বসতে বলা উচিত নাকি, বিষয়টায় মেয়েটার আবার আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে কি-না বুঝে উঠতে পারলো না সে।
রিভার ভিউ হোটেল। স্থানীয় একটি ফোর স্টার হোটেল এটা। শহরে থেকে খানিকটা বাইরের দিকেই। তবে বেশ নামডাক। বাইরে থেকে এদিকটায় আসা প্রায় সকল মাথাতোলা লোকজনই থাকার জন্য এটাই বেছে নেয়। ফাঁকা পাওয়া খুবই দুষ্কর। তবে রুষার আসার পরিকল্পনা ছিলো আরও কয়েকদিন আগে থেকেই। সুতরাং রুমের বুকিং ও দিয়েই রাখা। তাহমিদ রুষাকে নামিয়ে দিয়ে দেরি করলো না। বাইক দৃষ্টির আড়াল হতেই রুষা বাঁকা হেসে ঢুকে গেলো ভিতরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হোটেলের গেটের ভিতরে ঢুকতে দেখা গেলো তাহমিদ কে। পায়ের গতি ধীর করে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে যতক্ষণ, ততক্ষণে রুষা সমেত লিফট টা উচে যাচ্ছে ওপরের দিকে।
তাহমিদ কে দেখেই রিসেপশনিস্ট অতি বিনয়ের সাথে জানালো সব রুম বুকড।

—’রুম নিতে আসিনি৷ একটা তথ্য লাগতো।’
—’জ্বী বলুন।’
—’সবে যে ভদ্রমহিলা বুকিং এ উঠলো। তার সম্পর্কে।
—’সরি স্যার, আমরা আমাদের গেস্টদের তথ্য অন্য কাউকে জানাতে পারি না।’
—’কিন্তু আমাকে পারেন। এবং বাধ্য।’
মহিলাটির মুখে প্রশ্ন জাগলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকানোর মাঝেই নিজের পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ডেস্কে রাখলো সে। মহিলাটি হাতে তুলে নিলো সেটা। নামধাম, পদবি দেখে বড় বড় হয়ে এলো চোখজোড়া। এবং নমনীয় হয়ে গেলো সাথে সাথেই। ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’সরি স্যার। আগে জানালে এতো দেরি করতাম না। কি জানতে চান বলুন কাইন্ডলি।’
তাহমিদ অমায়িক হাসলো। ডেস্কের ওপর হাতের ভর দিয়ে দাড়ালো। হাসি হাসি মুখে বললো,

—’ মেয়েটা আপনাদের রেগুলার গেস্ট। তাই তো।’
—’জ্বী স্যার।’
—’বরাবরই একাই ওঠে।’
—’আজকাল একা ওঠে। ‘
—’আজকাল মানে! আগে অন্য কারোর সাথে উঠতো?’
মহিলা কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ফেললো। মিহি কন্ঠে বললো,
—’ স্যার ওই নামটাও কনফিডেনশিয়াল। উনি প্রায় মাস দুয়েক আর আসেন না সাথে। মানে ম্যাডাম একা নিজের নামেই রুম বুক করেন।’
তাহমিদের মুখের হাসি এতক্ষণে বিলীন হয়েছে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললো,
—’পুলিশের কাছে লুকিয়ে আর কোথায় গিয়ে মুখ খুলবেন ম্যাডাম! অযৌক্তিক কথা বাড়াবেন না। বলে ফেলুন।’
—’ঈশান আরশাদ দেওয়ান। ‘
থমকালো তাহমিদ। ভুল শুনলো কি-না সেটাও একটা বিষয়। পুলিশের চাকরিতে ক্রিমিনালদের পিছু ছুটতে ছুটতে, আজকাল বোধবুদ্ধিও কমে গেছে বেশ খানিকটা৷ তার ওপর বাড়তি হিসেবে আবার অভিনয়েও তো নাম লেখাতে হয়েছে। খাকি পোষাক ছেড়ে ফরমাল পরে যেতে হয় মাস্টারগিড়ি করতে। মহা ঝামেলার কারবার। কানে কম শোনাই স্বাভাবিক। প্রশ্নটা সে পুনরায় করলো,

—’আর কার নামে বুক করা থাকতো বললেন?’
—’ঈশান আরশাদ দেওয়ান। খোঁজ নিলে সহজেই জানতে পারবেন স্যার। এখানকার প্রভাবশালী পরিবার দেওয়ান রা৷ বলা চলে ওদের মাধ্যমে পুরো এলাকা চলে আরকি। তাদেরই বাড়ির বড় ছেলে। এক ডাকে চিনবে সকলে।’
তাহমিদ টের পেলো ভুল শোনেনি সে। যা শোনার স্পষ্ট শুনেছে। ছোট্ট করে বললো,
—’ ওদের মধ্যে সম্পর্ক টা কি? ‘
—’সেটা তো আমাদের জানা নেই স্যার।’
—’লিগ্যালি ম্যারেড না হলে কোনো কাপলকে রুম দিয়ে দেন আপনারা?’
—’ন্যাশনাল আইডি থাকলেই দেওয়া হয়। তাছাড়া… ‘
মহিলার বাক্য বিরতিতে বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে তাহমিদ বললো,
—’তাছাড়া এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের ছেলের রুমের সন্ধানে আসে। না দিলে হোটলেই উড়ে যাবে। তাই না?’
রিসেপশনিস্ট মহিলাটি জবাব দিতে পারে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়। তাহমিদ গম্ভীর গলা প্রশ্ন ছোড়ে,

—’ এই আসা যাওয়ার শুরু কবে থেকে?’
—’বছর খানেক।’
—’রেগুলার আসতো?’
—’নাহ স্যার। কালেভদ্রে। ঈশান স্যার এখানে থাকে না। রুষা ম্যাডামও নয়। এর আগে দু এক বার আসতো রুষা ম্যাডাম। তবে একা নিজের নামের বুকিং দিতো না। ঈশান স্যারের নামও থাকতো। ‘
—’আপনি বললেন, শেষ দু মাস হলে একা নিজের নামের বুকিং দেয়?’
—’জ্বী আপনি আমাদের ফাইল দেখতে পারেন।’
মহিলাটি নিজের হাতের ফাইলটি এগিয়ে দিলো তাহমিদের দিকে। এর আগে তিনবার দু’জনের নামের এন্ট্রি ছিলো। একটা ডাবল বেডরুমের। এখন যেটাতে উঠেছে মহিলা। তবে শেষ তিনবার একা, নিজের নামে। তাহমিদের কপালে ভাজ পরলো কয়েকটা। যদিও রুষার থেকে শুনেছিলো তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়৷ তবে বিয়ের আগে যাতায়াত! অনেক কিছুই জানার অজানা রয়ে গেছে। যেমনটা রয়ে গেছে দেওয়ান বাড়ির ভিতরের খবর। তেমন এই মেয়ের বিষয়ে। আরও টুকটাক তথ্য সংগ্রহ করলো রিসেপশনিস্টের থেকে। তবে এই মূহুর্তে যেটা গরম খবর সেটা হলো ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সাথে এই মেয়ের এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হোটেল রুমে একসাথে বুকিং দেওয়া,এক রুমের!
রুষার সম্পর্কে ড্রাগ সাপলাইয়ের তথ্য পেয়েছে সে আরও মাস আটেক আগে। মেয়েটার একার কাজ নয় বেশ বোঝা যায়। কোনো পাকা হাতের কাজ৷ বিন্দুমাত্র বাড়তি তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি এতদিনেও। বাধ্য হয়ে রুষার বয়ফ্রেন্ড ঈশান আরশাদের পিছু নিয়ে এসে পরেছে এইখানে। মেয়েটার ওপর কোনো বড় হাতের ছায়া আছে, এদিকে দেওয়ানদের কথায় এলাকা চলে৷ দুইয়ে দুইয়ে চার মিলছে কি? মিলছে তো।
ফাইলটার দু চারটে ছবি তুলে মহিলার দিকে ঠেলে দিতে দিতে বললো,
—’ফাইলটা তুলে রাখুন। আরও প্রয়োজন হতে পারে। আর একটা কথা৷ আমাকে যা যা তথ্য দিয়েছেন, ভুলেও আর কারোর কাছে মুখ খুলবেন না।’
পকেটের চশমা চোখে দিতে দিতে বেরিয়ে এলো হোটেল লবি থেকে। গেটের কাছে গিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো। শব্দ তুলে বাইক চোখের আড়াল হলো দ্রুতই। হোটেলের সপ্তম তলার দক্ষিণের করিডরে রেলিঙে দাড়িয়ে রুষা। মুখজুড়ে রাজ্যের ব্যাঙ্গ ঘোরাফেরা করছে তার।

ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর। সকালের তুলনায় গরমটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। অথচ তিতিরের জ্বরের তীব্রতায় রুমের ফ্যান, এসি সব বন্ধ করে রাখা। জানালাটাও চাপিয়ে দিতে হয়েছে। ঈশান পানি নিয়ে এসেছে। মেয়েটার শরীর মুছিয়ে দেওয়া দরকার। এদিকে জ্বরের ঘোরে ঠকঠক করে কাঁপছে মেয়েটা। ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে। কমে আসার কথা জ্বরটা।
ঈশান বিছানার কিনারায় বসে মিহি কন্ঠে ডাকলো তিতিরকে। কয়েকবারের ডাকে সামান্য নড়েচড়ে উঠলো। তাকাতেও পারছে না।
—’একটু উঠিয়ে বসাই? শরীরটা মুছিয়ে দেই। জ্বর তো নামছে না।’
তিতির সাড়া দিতে পারে না। ঈশানের কথাগুলো শুনেছে বলেও মনে হলো না। ঈশান অপেক্ষা করলো না আর। দু হাতে আলতো করে তুলে বসালো মেয়েটাকেও। উত্তপ্ত নরম শরীরটা নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। তিতিরের ঘুমন্ত মাথাটা ঢলে পরলো ঈশানের ঘর্মাক্ত বুকে৷ ছ্যাত করে উঠলো যেনো সেখানটা। অস্বাভাবিক গরম। বুকের ভিতর অস্বস্তি হচ্ছে ঈশানের। মেয়েটার অবস্থা দূর্বিষহ। বৃষ্টিতে ভিজতে চায়নি মেয়েটা। তার ওপর তার করা অত্যাচার। সারারাত সহ্য করেছে মুখ বুঁজে।
ঈশান নিজের পুরুষালি খসখসে হাত ছুয়িয়ে দিলো তুলতুলে গালে। শান্ত গলায় ডাকলো পুনরায়।

—’তিতির? একটু সোজা হয়ে বসতে হবে তো। শরীর মুছিয়ে দেই।’
তিতির বুঝি এতক্ষণে সামান্য খেয়াল করতে পারলো। খুব কষ্ট মিটমিট করে তাকালো। কথা বলার জন্য পাতলা ঠোঁট জোড়া নাড়ালো৷ শব্দ বের হলো না।
—’বলতে হবে না কিছু। আমি সব করে দিচ্ছি। দেখি জামাটা…’
দূর্বল হাতটা কোনো মতে ছোঁয়ালো ঈশানের কবজিতে। মানা করতে চাইলো।
—’কি হয়েছে। বাঁধা দিচ্ছিস কেনো? রিতু পইপই করে বলেছে তোরা শরীরটা মুছিয়ে দিতে। ‘
—’আ-আপনি? ‘
—’কি আমি?’
—’আ-আ-আপনি করবেন?’
একহাতে তিতিরকে আগলে গোটা ঘরে নজর বুলালো ঈশান। পিঠের দিক থেকে জামার চেইনটা একটানে খুলে দিতে দিতে বললো,

—’গোটা ঘরে আমি ছাড়া আর কে আছে?’
—’দ-দরকার নেই। থাকুক এমন।’
—’ডাক্তার বলেছে দরকার আছে। তুই মানা করছিস কেনো? তোকে দিয়ে করাচ্ছি কিছু? যা করবো আমিই করবো। আমি আছি তো নাকি?’
তিতিরের বিধ্বস্ত মুখের আদল পরিবর্তন হলো না। ঠোঁট উল্টে এলো। কান্না পাচ্ছে। মাথা যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে। থামা থামা কন্ঠে বললো,
—’আ-আপনি…আপনার জন্যই তো এ অবস্থা। ‘
ঈশান ততক্ষণে কাঁধের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলেছে জামার অংশ টুকু। কাঁধের ওপর শব্দ করে চুমু আঁকলো।
বাকিটুকুও খুলে ফেলতে ফেলতে বললো,
—’এখন সব দোষ আমার? যতবার জিজ্ঞেস করেছি কষ্ট হচ্ছে নাকি? থেমে যাবো কি-না। ততবারই দু হাতে আকঁড়ে ধরে স্পর্শ গভীর করে চেয়েছে কে? আমি না তুই? তোর কথা ভাবিনি আমি?’
জ্বরের ঘোরে বোধহয় ঈশানের কথা বোধগম্য হলো না মেয়েটার। দুপুরের খাবার খায়িয়ে ওষুধ খায়িয়েছে বেশ খানিক্ষন হয়েছে। এখন শরীর ছুঁয়ে মনে হলো জ্বর বোধহয় কমেও এসেছে খানিকটা। ঘাম ছাড়ছে শরীরে। জ্বর ছাড়ার লক্ষন। ঈশান অনাবৃত করলো রমনীর সর্বাঙ্গ। তিতির হুশে থাকলে নিশ্চিত অসভ্য বলে বসতো। মেয়েটা বাঁধা দিচ্ছিলো! হাহ্! বাঁকা হাসলো ঈশান। পিঠের ওপর লেপটে থাকা ইনারের হুক খুলতে খুলতে, অন্য হাতে মেয়েটাকে নিজের খুব কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললো,

—’কাল রাতের পরও আমি ছুঁয়ে দিলে লজ্জা পাচ্ছিলি? হুম? নেহাৎ বোকামি নয় কি এটা? তোর কোন জিনিসটা দেখা বাকি আছে,স্পর্শ করা বাকি আছে। ছুঁয়ে আদর দেওয়া বাদ আছে? হ্যা? তোকে সবসময়, সব মূহুর্তে, সব ভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার অধিকার আছে আমার। আজীবন থাকবে। শুধু আমার থাকবে।’
তিতিরের ফ্যাকাসে হয়ে থাকা ওষ্ঠাপুট নিজের ওষ্ঠাগত করে নিলো ঈশান। হাসঁফাস করে উঠলো মেয়েটা। ঈশান কিয়ৎক্ষন নিজের কাজ অবহ্যত রেখে তারপর মুখ তুললো। মিটিমিটি তাকিয়েছে আবার মেয়েটা৷ ঈশান হাস্কিস্বরে বললো,
—’হুশে কি আছিস? নাকি আদর পেতে হুশ খোয়ানোর অভিনয় করছিস?’
—’গরম লাগছে।’

ঈশান খেয়াল করলো এইটুক সময়ের মধ্যেই মেয়েটার শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। কপাল গাল ঠেকাতেই টের পেলো তপ্ততা কমে এসেছে বেশ খানিকটা। ঈশানের নিজেরও গরম লাগছে। যতটা না প্রকৃতির গরমে, তার থেকেও বেশি তিতিরকে অনাবৃত দেখে। বুকের ভিতর ছোটাছুটি করছে।
ঈশান দৃষ্টি সরায়। হা করে শ্বাস টানে। তোয়ালে ভিজিয়ে মুছে দেয় রমনীর মখমলের মতো শরীরটা। তিতিরের দৃষ্টি ঈশানে নিবদ্ধ। কেমন ঘোলা চোখে তাকিয়ে আছে। ঈশান তাকায় না। দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে বারবার। তিতির জ্বরের ঘোরে থাকলে সর্বনাশ ঘটাতে ব্যাস্ত থাকে। এই মূহুর্তে ওর ডাকে সাড়া দেওয়া মানে মেয়েটার ওপর অত্যাচার করা। সাথে নিজের ওপরও। না তো মেয়েটা তাকে সামলাতে পারবে, আর না তো সে পুরোটা সময় কাছে পাবে মেয়েটাকে৷ আগুনে ঘি ঢালতে শোনা গেলো তিতিরের এলোমেলো কন্ঠস্বর।

—’আমার গরম লাগছে।’
ঈশান তাকায় মেয়েটার দিকে। ওই দৃষ্টি ঈশানের আবেগ নিয়ে খেলছে এখন। তিতিরের নগ্ন দেহ আকড়ে ধরে বসা ঈশান। মেয়েটা যেনো একটা তুলোর বস্তা৷ নড়াচড়া নেই। অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। এসির রিমোটে চাপ দিয়ে ঈশান ধমকে ওঠে এ যাত্রায়।
—’ আমার অবস্থা দেখেছিস। ঘেমে-নেয়ে মরে যাচ্ছি গরমে। এতো ঘ্যানঘ্যান করছি আমি? ‘
—’তুলুন আমাকে। মাথা ঘুরছে।’
ঈশান দু’হাতে তুলে ডান পায়ের উরুর ওপর বসায় মেয়েটাকে। তিতিরের দূর্বল হাতে যেনো জোর ফিরেছে খানিকটা। তবে সে হাত ঈশানকে মেরে ফেলার পায়তারা জুড়েছে। হাত বুলাচ্ছে ঈশানের বুকে। কেমন দুখি কন্ঠে বললো,
—’গরম লাগছে? ঘেমে গিয়েছেন তো। শার্টটা খুলছেন না কেনো?’
এই স্পর্শই কি কম? আরও কিছু খুলতে হবে! ঈশান জবাব দেয় না। ভেজা তোয়ালে দিয়ে আলগোছে মুছে ফেলে পিঠের দিকটা। তিতিরের আঙুলগুলো তখনো ঈশানের বোতামে খোটা খুটি করছে। ঈশান দাতে দাঁত পিষে বললো,

—’ শার্ট খুললে আরও অনেক কিছু খুলে ফেলতে মন চাইবে। এখনি চাচ্ছে। কাইন্ডলি বোঝার চেষ্টা কর। দয়া কর আমাকে। মেরে ফেলবি। কাল কয়েকবার খুন করেছিস, তারপর আজকে নিজে বিছানায় পরে আছিস গোটাটা দিন। আজ নিজেই সহ্য করতে পারবি না। আমার গরম লাগছে। লাগতে দে। তোর জ্বর কমুক। সুস্থ হ দ্রুত। প্রথম রাত কাছে পেয়েছি। তারপর এমন শুরু করলে কেথায় যাই বল তো আমি। একটু অস্থির মনকে শান্ত হতে দিতে কয়েকটা দিন সঙ্গ দিতে হয় তো নাকি? অত্যাচারি কি সাধে বলি!’
তিতির এসব কথা কানেই তোলে না যেনো। তার নরম হাত এরইমধ্যে ঈশানের কয়েকটা বোতাম খুলে ফেলেছে। গোটা বুকে আঙুলের আঁকিবুঁকি করে হাত কোমড়ের কাছে যেতেই খপ করে চেপে ধরলো ঈশান। ধমকে উঠলো গম্ভীর গলায়,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫০

—’থাপ্পড় খেতে না চাইলে সিডিউস করা বন্ধ। শরীর সহ্য করতে পারে না, অথচ মনের এনার্জির কমতি নেই। আমাকে জ্বালাতে পোড়াতে জন্ম হয়েছিলো তোর। আজ নিশ্চিত আমি।’
ঈশানের ধমকে বেশ অপমানিত বোধ করলো তিতির। হাত সরিয়ে ফেললো। দূর্বল হাত শরীর ঢাকার কিছু একটা খুঁজতে ব্যাস্ত। পেলো না। ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখে তার অত্যাচারির গাল ফুলানো। এদিকে বিদ্রোহ করছে সর্বাঙ্গ। রাগ করার যুক্তি কি! কাছে চাইলে হবে এখন? ও নিজে সহ্য করতে পারবে! পারবে না। অথচ শখ ষোল আনা। শখ না..তাকে ভষ্ম করার, খুন করার অস্ত্র ওগুলো। আর কিছুই না।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here