সাঁঝের মায়া পর্ব ৬২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
ভরদুপুর বেলা দেওয়ান বাড়ির সকল পুরুষ মানুষ বাড়িতেই আজ। সচরাচর এমনটা কখনো হয়না। আজকে ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণও আছে বইকি। থানা থেকে লোক এসেছে। চলমান ঘটনা গুলো নিয়ে রাইসুল দেওয়ানের সাথে আলাপ আলোচনা করতে। আপাতত দৃষ্টিতে সাইকো অথবা হোমিসাইকাল ম্যানিয়াক বা যাই বলা হোক না কেনো– লোকটার টার্গেট যে এই এলাকা সেটা তারা দিব্যি বুঝতে পারছে। বসের পাশে চোখমুখ কুঁচকে, অত্যন্ত গুরুগম্ভীর মুখে বসে আছে সাজিদ। তার মুখোমুখি সোফাতেই ঈশান বসা। একটা বারের জন্যও বন্ধুর দিকে তাকাচ্ছে না সে। খুন টা একটা সময় ঢাকায় হতো, ঈশান তখন ঢাকাতে। এখন লাগাতার এখানে হচ্ছে। কারণ ঈশানও এখানে। এসব হাবিজাবি একগাদা কুচিন্তা মাথায় এসে ভির জমাচ্ছে সাজিদের। গায়ের মধ্যে বিরবির করতে থাকা পোকাটাকে, জেনে বুঝেও হাত ছুঁয়িয়ে বের করতে না পারার যে কি পরিমাণ মানসিক যন্ত্রনা, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ছেলেটা। এই যেমন এই মূহুর্তে তার পকেটে একটা গুপ্ত প্রমান আছে। তাদের পেশাগত দিক থেকে ভাইটাল এলিমেন্ট যাকে বলে আরকি। অথচ সে একজন দূর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারের মতো কাজ করে যাচ্ছে অনবরত। পুলিশের লোক হয়েও,প্রমান লোপাটের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আলাপ আলোচনা দীর্ঘ হলো বেশ। দুপুরের খাবার আয়োজনও করে ফেলেছেন রাহেলা। এইরকম ভরদুপুর বেলা অতিথি দের খালি মুখে কি করে যেতে দেয়। খাওয়াদাওয়ার পর্ব যখন চুকলো তখনও খাবার টেবিলে বেশ গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছেই। বাড়ি গিন্নিরা বাদে সব মেয়েরা ওপরের ঘরগুলোতে। নূরি, নিশি ভার্সিটিতে। বাকিরা স্কুলে। বাড়িতে আছেই এক তিতির। ঈশান অফিস থেকে ফিরে, ওপরে যাওয়ার সময় টুকু অবধি পায়নি। মেয়েটা ঘুমুচ্ছে সম্ভবত। না হলে করিডরে হলেও একনজর দেখা পেতো ঈশান। এতো জোরেশোরে কথা হচ্ছে, সে শব্দেও তা নামা উচিত।
বেসিং এ হাতখানা ধুয়ে মুছে পিছন ফিরতেই থ মেরে থাকা একখানা শ্যামলবরণ মুখ নজরে এলো ঈশানের। বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো হাতখানা ধুয়ে ফেলতে। সাজিদ এগোলো, পানির কল টা ছেড়ে হাত ভেজাতে ভেজাতে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ তোর কি মানিব্যাগ খোয়া গেছে?’
ঈশানের হাস্যজ্জল মুখটা এ যাত্রায় বেশ সিরিয়াস দেখালো। ন্যাপকিনে হাতটা মুছে ফেলতে ফেলতে বললো,
—’ মানিব্যাগ? পেয়েছিস তুই?’
সাজিদ সোজাসাপটা জবাব দেয়না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে,
—’ হারিয়েছে কি? ‘
ঈশান এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললো,
—’ খেয়াল নেই।’
সাজিদ হাসলো সামান্য। নিজেও হাতটা মুছে পকেট থেকে একটা কালো ওয়ালেট বার করতে করতে বললো,
—’ যার ওয়ালেটে বউয়ের ছবি থাকে, সে ওয়ালেট হারালে অবশ্যই মনে থাকার কথা। ‘
ঈশানের মশ্রীন কপালে ভাজ পরলো গোটা তিনেক। চোয়াল শক্ত হলো। জিবে ঠোঁট ভিজিয়ে শীতল গলায় শুধালো,
—’ কার ছবির কথা বলছিস?’
রাহাতের মুখের হাসিও মিলিয়েছে ততক্ষণে। ওয়ালেট টা ঈশানের দিকে না বাড়িয়ে, নিজের হাতেই খুলতে খুলতে বের করলো এক শাড়ি পরা অপ্সরার ছবি। লাল শাড়ি পরা হাস্যজ্জল একটা ছবি। ভ্রু কুচকে ফেললো ঈশান। সাজিদ ওয়ালেটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললো,
—’ ছবিটা নাঈমের তোলা। তোদের বিয়ের দিনের ছবি। মনে আছে? মনে না-ও থাকতে পারে। বউয়ের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিসই বা কবে।’
ঈশান নিজের ডান ভ্রু টা উঁচিয়ে শুধালে,
—’ ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকাই না?’
—’ মনে তো হয়না।’
—’ ঘরের খবর কেউ বাইরে লিক করে?’
—’ সেটাই তো প্রশ্ন। ভালোবাসা প্রকাশে এতো গোপনীয়তা কেনো তাহলে? কেনো তাহমিদ একজন পুলিশ অফিসার, অথচ সে কলেজ টিচার হয়ে তোর বউয়ের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে এলেও, বাঁধা দিস না তুই? কেনো বউয়ের বিয়ে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তোর আলাপ চলে?’
ঈশান পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো দেয়ালের উঁচু পিলারটার সাথে। দু হাত বুকে আড়াআড়ি ভাজ করতে করতে বললো,
—’ সবাই এই এক বিষয় নিয়ে পরেছে কেনো? বাবা, তুই, মা, দিদা! একসাথে লেগেছিস আমার পিছনে।’
সাজিদ নিজের হাতের ওয়ালেট টা বন্ধ করে আরেকদফা ধরলো ঈশানের সামনে। বিদেশ থেকে এক্সপোর্ট করা ব্যাগ এটা। অত্যন্ত দামি। এক দেখায় বলে দিতে পারে সেটা। তবে সেটা কোনো বিষয় নয়৷ ঈশানের চোখ গিয়ে আটকালো সাজিদের আঙুল ছোঁয়ানো জায়গাটায়। একটা ছোট্ট ইংরেজি অদাক্ষর। সাজিদ সেটাই আঙুল ছুঁয়িয়ে ঈশানকে ঈশারা করছে দেখতে। ছোট্ট করে সোনার পাতে লেখা ‘ I ‘ সাজিদ হালকা গলায় বললো,
—’ আই ফর ঈশান। ভিতরে তিতিরের ছবি। ওয়ালেট টা আর কার হবে? কার এতে বড় কলিজা — ঈশান আরশাদের বউয়ের ছবি নিজের ওয়ালেটে রাখবে। ওহ্ সরি সরি। কেউ তো আবার জানেই না তোর ম্যারেটাল স্ট্যাটাস। রাখতেই পারে সে হিসেবে।’
ঈশান বাঁকা হাসে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিত্তোর করে,
—’ রাখতেই পারে।’
এ যাত্রায় ঘনিয়ে এসে দাড়ালো সাজিদ। হাতের ওয়ালেট খানা পকেটে গুঁজে রাখতে রাখতে বললো,
—’ এতোটা দুরত্ব কবে তৈরি হলো আমাদের?’
—’ কিসের দুরত্ব? ‘
—’ হয়নি বলছিস?’
—’ নাহ্।’
—’ আমি দেখতে পারছি হয়েছে। ‘
—’ তোর মনের ভুল।’
সাজিদ নিজের পকেটে হাতখানা রাখলো। সেদিকে ইশারা করে শীতল কন্ঠে শুধালো,
—’ লাস্ট মার্ডা’রের জায়গা থেকে এই ওয়ালেট টা পাওয়া গিয়েছে। এর ব্যাখ্যা কি তাহলে?’
ঈশান হাসলো। স্বাভাবিক গলাতেই বললো,
—’ অনেক ব্যাখ্যাই হতে পারে।’
—’ পারে না। যেকোনো ঘটনার একটা মাত্র ব্যাখা হয়। হাজারটা না। এসব কি হচ্ছে ঈশান? আমাকে বল। তুই এইসবে কোত্থাও নেই, অথচ আমি সব জায়গায়, সব প্রমানে তোকে দেখতে পাচ্ছি। এর কারণ কি? উত্তর কি? দিবি কি? প্রশ্ন গুলো জট পাকাতে পাকাতে মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে। চোরাবালিতে ডুবছি রীতিমতো। আমার ট্রান্সফার হবে ঈদের পর। সেটা তুই করাচ্ছিস। সে খবর আমার কাছেও আছে। কেনো? এখানে আমি তদন্ত করি এটা কেনো তুই চাসনা? কি সমস্যা? ‘
ঈশানের স্বাভাবিক মুখ অন্ধকার হয়ে এসেছে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। শান্ত সুরেই বললো,
—’ সেটা বের করার দায়িত্ব তোর। তুই পুলিশ। এই কেসের দায়িত্ব তোর। আমি জবাব দেবো কেনো!’
—’ দায়িত্ববোধ তো আরও অনেক কথাই বলছে।’
–-’ কি বলছে? আমাকে গ্রেফতার করতে? ‘
—’ সুবর্ণার যেদিন মা’র্ডার হয় ওদিন তোর বাইক নিয়ে ঘটনা স্থলে ছিলি তুই? তোর বাইকের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। তোর শার্টের বোতাম, তোর ওয়ালেট এমনকি…’
ঈশান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—’ এমনকি?’
সাজিদের চোখজোড়া আচমকাই ছলছল করে উঠলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ ভিকটেমের নখে যে ব্লাড স্যাম্পল…হয়তো খামচে ধরেছিলো মেয়েটা। সেই ব্লাড স্যাম্পল টেস্ট করেও আঙুল তোর দিকে তুলতে হয়। ডিএনএ রিপোর্ট বলছে একই ব্লাড গ্রুপ, শরীরে একই রোগ। এতো কো ইন্সিডেন্ট কি করে হচ্ছে? সব কিভাবে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে। ‘
মশা মশকরা বা হেয়ালির পর্যায়ে নেই আর কিছু। ঈশানের চোখমুখ অস্বাভাবিক ভাবে স্থির হয়ে আছে। ছেলেটার মাথায় কি চলছে, সেটা ক্ষুনাক্ষরেও সাজিদের টের পাবার কথা নয়। ঈশান এ যাত্রায় মুখ খুললো।
—’ তাহলে এরেস্ট করছিস না কেনো আমাকে?’
—’ তুই পাগল, উন্মাদ। অহংকারে ডুবে থাকা একটা মানুষ। তোর কোনো বয়ান নেই? বলার কিচ্ছু নেই? তুই হেয়ালিতে ফেলে দিচ্ছিস সব?’
—’ কি শুনতে চাস?’
সাজিদ দু’হাতে নিজের চুল খামচে ধরলো। রক্তিম হয়ে উঠছে শ্যমবরণ মুখটা। বন্ধুর দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় শুধালো,
—’ আমি যা যা বললাম। যা এলিগেশন তোর নামে। সে-সব নিয়ে কেনো কিছু বলছিস না তুই? কেনো? বল এসব ভুল, অন্য কোনো কারণ আছে এসবের পিছনে।’
—’ যে কারণই থাকুক। আমি অপারগ। এসব তুই ভাব। যা করার কর। তোর দায়িত্ব যা বলে সেটাই কর। আমি এর মধ্যে কিচ্ছু বলতে পারবো না। কিন্তু আমাকে মুখ খোলাতে বাধ্য করতে পারিস না তুই। হ্যা, যদি লকাপে নিয়ে যাস, তখন হয়তো বাধ্য হবো। সেটাও তো করছিস না।’
সাজিদ অসহায় হয়। রাগে, দুঃখে দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। এই ছেলেটা কি তাদের সম্পর্ক ভুলে গেছে? পুলিশ আর আসামীর বাইরে যুগ যুগের সম্পর্ক ওদের। ভাই, বন্ধু, সহচর যেটাই বলা হোক না কেনো। তাকে এভাবে, এমন একটা কেসের মামলায় চাইলেই এরেস্ট করা যায়? অন্য রা হয়তো পারবে, সাজিদ নয়৷ সম্ভবই নয়। সাজিদ নিজেকে সামলে নিলো বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে। দৃঢ় গলায় বললো,
—’ আমি রিজাইন করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই কেস টা কনটিনিউ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোর যা ইচ্ছে তুই কর, যেভাবে খুশি সামলা সব।’
ঈশান আহত দৃষ্টি ফেলে এবারে। এতক্ষণের আলোচারিতায় এই প্রথম খানিকটা অন্য রকম লাগলো তাকে। সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ আবেগে জীবন চলে না। ‘
সাজিদ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পিছু ফিরে তাকালো না আর, না তো ঈশানের কথায় থামলো। দ্রুত পায়ে বের হয়ে যেতে যেতে বললো,
—’ না চললো। তুই যুক্তিবাদী। যুক্তি নিয়ে বিশ বাচ্চার বাপ হ। দেশের ফুটবল, ক্রকেট, হকি সব টিম তোর বাচ্চারা গঠন করুক।’
হাতের গরম পানির কেটলি টা সজোরে গিয়ে ঠেকলো ইয়াজের বাঁ হাতের ওপরে। গরম পানি তে তৎক্ষনাৎ ঝলসে গেলো জায়গাটা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন লোক ছুটে এগিয়ে আসার আগেই ইয়াজ হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাদের। তার বদলে নিজেই টেবিলের ওপরে রাখা শীতল পানির জগ কাত করে ধরলো নিজের হাতের ওপর। জায়গাটা এক মূহুর্তের মধ্যে অস্বাভাবিক লালবর্ণ ধারন করেছে। মিনিট দশেকের মধ্যে ফোস্কা উঠে যাবে।
কপাল কুঁচকে হাতের ওপর পানি ঢালতে ঢালতে সামনের রমনীর দিকে তাকালো। শীতল গলায় বললো,
—’ তোমাকে বলেছি জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি জিনিসটা শিখবে না। ছোটবেলা থেকে এই স্বভাব দেখে এসেছি। বাড়ির মেয়ে, সবসময় পোলাইট থাকবে। এরকম ঔদ্ধত্যতা শিখেছো কেনো? এগুলো চরম বেয়াদবি। ‘
কাটা ঘায়ে আরও নুনের ছেটা পরলো যেনো। একহাত চুরি পরিহিত একটা হাত এতক্ষণ ঠেকানো ছিলো টিভি ক্যাবিনেটের ওপর। ইয়াজের কথা শেষ হতে না হতেই বিশাল টিভিখানাও মেঝেতে সজোরে আছড়ে পরলে। কাচ ভাঙার বিকট শব্দ বারি খেলো চারদেয়ালে। ইয়াজ মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে। টিভিটার দিকে তাকিয়ে হাতাশায় মাথা নাড়লো। হাতের ফাঁকা হয়ে যাওয়া পানির জগখানা টেবিলে রাখতে রাখতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার লোক দুটোতে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ বরফ নিয়ে এসো। আর দরজা টা লক করে যাও। সে ঘুমিয়েছে। জেগে যাবে। গতকাল সারারাত ঘুমায়নি।’
লোকদুটো চলে যেতেই ইয়াজ এগিয়ে এলো কাচ ডিঙিয়ে। ঠান্ডা সুরেই বলে উঠলো,
—’ বোকার মতো করলে হবে না, রুষা। ওই কাজের মেয়ে একটা স্লা’ট। রাস্তা থেকে তুলে আনা স্লা’ট। ওর গর্ভে মির্জা বাড়ির সন্তান থাকতে পারে না। এটা একটা কনমসেন্স। ‘
ইয়াজের কথায় দাত কিড়মিড় করে উঠলো রুষা। হাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরা একটা ফুলদানি। যখন তখন সেটা ইয়াজকে উদ্দেশ্য করে ছুড়ে দিতে পারে। এতটুকু বিশ্বাস আছে এই মেয়ের ওপর। রুষা তেঁতো গলায় চেঁচিয়ে উঠলো একপ্রকারে।
—’ কাজে মেয়ে, স্লা’ট – এদের সাথে শুতে ভালো লাগে। আর তারপর সেই গর্ভে সন্তান আসলে এতো সমস্যা? তখন মির্জা বাড়ির সম্মান কোথায় থাকে? ‘
ইয়াজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতখানা এগিয়ে, রুষার হাতের বাঁধনে থাকা ফুলদানিতে ছোয়ালো। সেটা সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় আরকি। শান্ত গলায় বললো,
—’ ভাই আমি তোমার। বেয়াদবের মতো চেঁচাবে না।’
—’ মানি না তোমাকে ভাই হিসেবে। বেয়াদব কাকে বলছো? বেয়াদবি বলো বা নির্লজ্জতা, সব তো তোমার থেকেই শেখা। এতোটা ভালোবাসো তিতির কে? যে, অন্য নারীর সাথে দিনের পর দিন রাশলীলা করতেও লজ্জা লাগলো না, বিবেকে বাঁধলো না। হুম? ভালোবাসা কাকে বলে জানো? ‘
ইয়াজ বাঁকা হাসে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় বোনের দিকে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই এমন মেয়েটা। কারোর ধার ধারে না। একমাত্র তার কাছে পোষ মানতো, আজকাল সেটাও হতে চাচ্ছে না।
—’ তোমার যুক্তিতে ভালোবাসা কি? তাকে ড্রা’গ কেসে ফাঁ’সিয়ে দিতে গিয়ে, ফাঁ’সাতে না পারা? এটাকে ভালোবাসা বলছো? হাস্যকর নয় কি? ওকে তুমি ফাঁসাতে পারোনি,নিজের বোকামির জন্য। নিজের অপারগতার জন্য। আর সেই ব্যার্থতা কে ভালোবাসা নামকরণ করে দিব্যি এক বিবাহিত পুরুষের পিছনে কেঁদে মরছো। তাহলে?’
রুষা শব্দ করে হেসে ফেললো। ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ একই যুক্তি তো তোমার ক্ষেত্রেও খাটে। তিতিরকে মা”রতে গিয়েছিলো, পারোনি, তারপর সেটাকে প্রেম বলে…’
—’ উফফ, সবেতে তিতিরকে টানবে না। আই জাস্ট হে’ট দ্যাট।’
রুষা চোখ বুঝে শ্বাস টানলো জোরে জোরে। আজকেই বাড়ি ফিরেছে। ফিরেই কাজের মেয়েটার এই অবস্থা দেখে হত-বিহবল হয়ে বসে আছে। তীব্র জ্বরে ছটফট করছে মেয়েটা, গায়ে অসংখ্য মা’রের দাগ। কালসিটে পরে গিয়েছে। সবই ইয়াজের করা। সবের মধ্যে বজ্র হুংকার দেওয়া সংবাদ– মেয়েটা অন্তসত্ত্বা। মা হতে চলেছে, তাও ইয়াজের সন্তানের।
রুষা হাঁ করে শ্বাস টানলো। নিজেকে ধাতস্ত করলো বোধহয়। তীক্ষ্ণ, সরু দৃষ্টিতে ইয়াজের শীতল মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করে আচমকা বলে উঠলো,
—’ এই মেয়ে ছাড়া আর কারোর সাথে একই কাজ করেছো তুমি? ‘
—’ করতেও পারি।’
—’ কোথায় তারা?’
—’ বাচিয়ে রাখা উচিত? ‘
—’ মিতুকে বাচিয়ে রেখেছো কেনো?’
—’ তুমি জানো সেটা।’
—’ তিতিরকে তুলে আনলেই পারো। একটা জলজ্যান্ত মানুষের প্রক্সি দেওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক কিছু না। ধোঁকায় কতদিন চলবে?’
—’ যতদিন না তিতির নিজ ইচ্ছেতে আসে আমার কাছে।’
আরেকদফা হেসে ফেললো রুষা। দু’হাতে মুখচাপা দিয়ে অনবরত হেসেই যাচ্ছে মেয়েটা। চোখে পানি এসে পরেছে হাসির তীব্রতায়৷ ইয়াজের দিকে এমন ভাবে তাকালো, যেনো এর থেকে হাসির জোক, সে এর আগে কখনো শোনেনি। ইয়াজ অবশ্য স্বাভাবিক। ফুলদানিতে হাত চেপে স্বাভাবিক ভাবেই বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। রুষা কোনোমতে হাসি আটকে বলে উঠলো,
—’ সে গুড়ে বালি, ইয়াজ মির্জা। সে গুড়ে বালি। ওদের প্রেমকাহিনী দেখেছেন আপনি? আমি দেখেছি। একে অপরে হীর আর রানঝা হতে রাজি, কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ।’
—’ তুমি অপেক্ষায় আছো কেনো?’
—’ আপনি যে আশায় অপেক্ষায় আছেন।’
—’ তাহলে নির্লজ্জ দু’জনেই দেখাচ্ছি। ‘
—’ মানি তো সেটা।’
—’তাহলে, এক কাজ করাা যেতেই পারে। ভালো কিছুর জন্য এতটুকু করা উচিতই।’
রুষা ভ্রু নাচায়। গম্ভীর গলায় শুধায়,
—’ কি?’
—’ ঈশান কে জানিয়ে দাও আমি তোমার কে। তারপর উত্তেজিত দেওয়ান সাহেবকে আর একটু উত্তেজিত করো। যেভাবে সম্ভব। বাকিটা আমি সামলে নেবো। একদিক বাচাতে গেলে আরেকদিক ডুববেই। দেওয়ান সাহেবের সেই ডুবন্ত অংশে, তিতিরও ডুববে। ডুবতে বাধ্য। আর তখন সেই ডুবন্ত অংশের মাঝি হবো আমি। ঠিকাছে? ‘
উত্তাল হৃদয়কে শান্ত রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই। কোনো এক অশুভ চিন্তা ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্ক জুড়ে। সব কিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, এবং সেটা চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃতি দু একদিন তান্ডব ঘটানো বন্ধ রাখলেও, তান্ডব আদতে থামছেই না। গম্ভীর মুখে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে শার্টের বোতাম গুলো লাগাচ্ছে ঈশান। হেয়ার জেল নিয়ে চুলে আঙুল গুলো ব্যাকব্রাশ করার মাঝেই তিতির ঢুকলো ঘরে। হাতে ব্ল্যাক কফির ধোঁয়া ওঠা মগটা। ঈশানকে এই অসময়ে বাইরে যাওয়ার পায়াতারা করতে দেখে ভ্রু গোটালো। হাতের মগটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে শুধালো,
—’ এখন কোথায় বেরোচ্ছেন?’
ঈশান নিজের চিন্তায় এতটাই ডুবে ছিলো সে। তিতিরের ঘরে আসাটা খেয়ালই করতে পারেনি। চমকেই তাকালো একপ্রকার। তিতির পায়ের কদম ফেলে ড্রেসিং টেবিলে দু’হাতে ভর রেখো বসলো। ঈশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
—’ বাব্বাহ্। এতো জোরে জোরে নূপুরের ঝংকার তুলতে তুলতে ঘরে এলাম, সেই শব্দ কর্ণগোচর হয়নি দেওয়ান সাহেবের! এটা মানা যায়? আজকাল বউয়ের উপস্থিতি টের পান না বুঝি?’
ঈশান মুচকি হাসে মেয়েটির কথায়। হাত বাড়িয়ে পারফিউমটা গায়ে ছড়াতে ছড়াতে খানিকটা ফিচেল গলায় বলে,
—’ পুরান হয়ে গিয়েছে বউ। আগের মতো অনূভব করতে পারি না।’
চোখ রাঙালো তিতির। বুকের আড়াআড়ি হাত দু’খানা ভাজ করতে করতে ঘাড় বাঁকিয়ে বললো,
—’ নতুন দরকার আরেকটা?’
—’ ধর্ম মতে আরও চারটে করতে পারবো? নাহ?’
তিতিরের মেজাজ এক মূহুর্তে আসমানে উঠলো। লোকটা তাকে ক্ষেপাতে ওস্তাদ। তবে রাগ টা উচ্চস্বরে কিছু বলে প্রকাশ করলো না। বরঞ্চ বাঁকা গলায় বললো,
—’ ধর্ম তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছে। কই মাসের পর মাস, সেটা তো পরতে দেখি না! এক শুক্রবারে খালি নাম কিনতে সেজেগুজে আতর মেখে,মসজিদে ঢু মারা ছাড়া।
আসল হাদিস জানেন কয়টা? পুরুষ মানুষ আর কোনো হাদিস দিতে পারুক, চাই না পারুক। চারটা বিবাহ করার হাদিস গর্বের সাথে শুনিয়ে দেবে। সত্যতা যাচাই প্রয়োজন পরে না। ভন্ডদের সর্দার একেকজন। হিসেব মতে, এক বউও জোটা উচিত না, এরকম ভন্ডদের। চারটা তো দূরে থাকুক। ‘
ঈশানের মাথায় এতক্ষণ যাবৎ ঘুরতে থাকা চিন্তাগুলো কখন দূর হয়ে গিয়েছে, টেরই পায়নি ছেলেটা। এই একখানা মায়বী মুখের দিকে তাকিয়ে পুরো দুনিয়াকে পিছনে ফেলে আসা যায়। তিতিরের কথায় শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে আবার সেই হাসি সংবরণ করারও বৃথা চেষ্টা করলো। বউটা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঈশান মেয়েটার দু’পাশে হাতে ভর রেখে ঝুঁকে এলো একেবারে। নাকের ডগায় আলতো কামড় দিয়ে বললো,
—’ জেলাস, মিসেস দেওয়ান? ‘
তিতির ঠোট উল্টে দু’হাত ঈশানের বলিষ্ঠ বুকে ঠেকিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো। ঈশান সরলো না। বরং ভেজা ঠোঁট ছুঁয়িয়ে দিলো মেয়েটার কানের লতিতে। ফিসফিস করে বললো,
—’ জেলাস হলে বলুন। আর সেটা না হলে হাদিস মানা যায় কি-না একটু ভেবে দেখি।’
তিতির কপালে ভাজ ফেলে বিরক্ত মুখে বললো,
—’ এসব ভালো লাগে না কিন্তু। ‘
ঈশানের মুখে তখনও দুষ্টুমির আভা স্পষ্ট। তিতির টেরও পাচ্ছে সেটা। তারপরও তর্ক করেই যাচ্ছে। ঈশান দুরত্ব বাড়াতে দেয় না। দু’জনের শ্বাস-প্রশ্বাস এসে বারি খাচ্ছে একে-অপরের সাথে। ওভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েই হাস্কিস্বরে শুধালো,
—’ কোন সব?’
—’ এই বিরক্তিকর মজা মশকরা। ‘
—’ কি মনে হয় শুনলে।’
—’ আপনাকে খু’ন করতে।’
—’ সে-তো রোজ করিস। এখনো হচ্ছি। এইযে আমি কাছে আসায় তোর হৃদস্পন্দন তোলপাড় শুরু করেছে।।শ্বাস ফেলছিস ঘনঘন,ঠোঁট কামড়াচ্ছিস অনবরত। রাগ করে গাল ফুলাচ্ছিস। আমার ম’রণ হয় তো এখান। নিয়ম করে খু’ন হয়ে যাই। ‘
তিতির সত্যিই ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। ঈশানের শরীরের এই কড়া পারফিউম এর ঘ্রান অস্থির করে তাকে। বরাবরের মতোই কাবু হয়েছে। যদিও কোনো ভাবে ঈশানের স্পর্শ লেগে নেই। তবুও অস্থির লাগছে। শরীর শিরশির করছে। তিতির তেঁতো গলায় বিরবির করে বললো,
—’ নাটকবাজ।’
—’ বউ যে নায়িকা। স্বামীকে নাটকবাজ না হলে চলে?’
—’ কোথায় যাচ্ছিলেন সেটা বলুন।’
—’ সন্দেহ?’
—’ হ্যা তাই।’
—’মেয়েটা খুব একটা সুন্দর না যদিও। ‘
ভ্রু জোড়ার মাঝে সরু ভাজ পরলো। সে কি বললো, আর ঈশান কি জবাব দিলো। বিরক্ত মুখে শুধালো,
—’ কোন মেয়ে?’
—’যার সাথে ডেটে যাচ্ছি। একটু কফি খাবো, মুভি নাইটে যাবো, একটু হাত ধরে …’
এতক্ষণ বিরক্তি মুখে ঈশানের মশকরা গুলো গলাধঃকরণ করে যাচ্ছিলো মেয়েটা। এই লাইনটায় মেজাজ বিগড়ালো। দু হাতে শার্টের কলার চেপে, হেঁচকা টেনে বললো,
—’ ফাইজলামি করার জন্য হলেও এসব কথা বলবেব না। অনেকক্ষণ সহ্য করছি। দশটা খু’ন করে আসুন, বসে আপনার কৈফিয়ত শুনবো। কিন্তু নারীঘটিত কিছু ঘটালে, বলতে আসার আগে হাতে ডিভোর্স লেটার নিয়ে আসবেন। অন্য নারী ছুঁয়ে এসে, তিতির কে স্পর্শ করার সাহসও করবেন না। জা’ন নিয়ে নেবো, না হয় নিজেকে শেষ…’
কথাটা শেষ করতে পারে না মেয়েটা। সজোরে কা’মড় পরলো পেলব গালে, দাগ বসে গেলো তৎক্ষনাৎ। ঈশান হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ আমার ভুল। বেশি বলে ফেলেছি। কিন্তু তুইও এবার সেটা করছিস। আমাকে চিনিস না তুই? হুম? জানিস না তোর ঈশানকে? আর কতবার বলবো তুই ছাড়া কখনো কারোর ঠোঁটে ঠোঁট রাখিনি। অন্য গভীর ভাবে ছোঁয়া তো দূর। তোকে ছুঁয়ে সর্বপ্রথম নারীদেহের ভাজ আবিষ্কার করেছি। নিজ হাতে, নিজ চোখে। আমার কাছে বাদবাকি সব নেশা ঠুনকো। সে-সব নেশা চাইলেই ছেড়ে দেওয়া যায়। যেমন করে তোর এক কথায় সিগারেট ছেড়েছি। কিন্তু, একমাত্র দেহের ঘ্রান, তোকে গভীর ভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার, তোকে অপলক দেখার নেশা। সুতরাং ভয় দেখাবি না বিচ্ছেদের। এরকম লেম মজা মশকরা আমি জীবনে করবনা। সরি, আজকের জন্য। তুই কখনো বলবি না আর ডিভোর্সের কথা। খুন আমিও করতে পারি কিন্তু…
শহুরে জীবনধারায় সন্ধ্যা হলেই নিয়ন বাতিতে আলোকিত থাকে চারিদিক। দিনের আলো নেভার সাথে সাথেই কৃত্রিম আলো জ্বালার প্রতিযোগিতায় নামে একেকজন। আশেপাশে ব্যাস্ত ব্যাস্ত ভাব। একজন আরেকজনকে ঠেলে আগে যাওয়ার চিন্তায় ব্যাস্ত। এই গরমের মধ্যেও, মানুষ জনের কমতি নেই রাস্তাঘাটে। একতলা একটা কফি শপে একগাদা মানুষজনের ভিরভাট্টার মধ্যে বসে আছে ঈশান আর নাঈম। মুখচোখ গম্ভীর দু’জনেই। সাজিদ সত্যিই রিজাইন লেটার জমা দিয়ে দিয়েছে, এরইমধ্যে। নাঈম সেই তথ্যই জানাচ্ছিলো এতক্ষণ। ঈশানের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, এই মূহুর্তে কি ভাবছে ছেলেটা। অপলকভাবে তাকিয়ে আছে হাতের কফির মগটার দিকে। সেই যে একটা চুমুক দিয়ে কাপটা লাগাতার ঘুরিয়ে যাচ্ছে, কফি এতক্ষণ টান্ডা জল হয়ে যাওয়ার কথা।
নাঈম ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ তোর বোনের যে ইয়াজের সাথে এখনো যোগযোগ আছে সেটা জানলি কি করে?’
—’ ওই জানিয়েছে। ‘
—’ কি জানিয়েছে? এখনো ভালোবাসে ওই ছেলেকে?’
—’ না।’
—’ তাহলে সরে আসতে ভয় পাচ্ছে কেনো?’
—’ যে ভয় আমি পেতাম।’
নাঈম নিজের হাতের গরম কফিতে চুমুক লাগায়। মিহি গলায় বলে,
—’ আমাকে কি করতে হবে এখন?’
—’ ওর ভরসা হতে হবে। আমি ভাই ওর। আর বাকি কেউ কিচ্ছু জানে না। তুই বাদে। তুই ছাড়া ওকে কেউ বুঝবে না।’
নাঈম হাসে। হাতের কাপটা টেবিলে রেখে, হাত পা ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে,
—’ শুধু ভরসা? সব হতে চাই আমি ওর। কিন্তু তোর বোন না? বড্ড জেদি।’
ঈশান কিন্তু হাসলো না বন্ধুর খোঁচায়। বরং চিন্তিত মুখেই আউরালো,
—’ ক্ষততে আঘাত করলে, সেই ক্ষত কখনো সারে না। ও যতদিন ওই ছেলের সংস্পর্শে থাকবে, ততদিন জীবনেও ভুলতে পারবে না ওকে। হতে পারে ভালোবাসেনা,কিন্তু যখনই আবার কাউকে ভালোবাসডে যাবে। ওই মানুষ টার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠবে। নূরিরও তার ব্যাতিক্রম নয়। ‘
—’ আমি জানি সেটা। এখন কি করতে চাস?’
—’ নূরি, তিতির দু’জনেই অনিরাপদ। আমি কিচ্ছু বোঝাতে পারবো না সাজিদকে। ও রিজাইন করলেও, আমি মুখ খুলতে পারবো না। ‘
—’ জানি সেটা। ও তোকে বড্ড বিশ্বাস করে। কিন্তু সব প্রমান ওর হাতে। ‘
—’ আমি যেকোনো সময় এরেস্ট হবো। এলাকা ছাড়তেও পারছি না মেয়ে দুটোর জন্য। তাছাড়াও পারতাম না। এক মূহুর্ত এখান থেকে যাওয়ার উপায় নেই আমার। তিতিরের ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে আমার। বুঝতে পারছিস? এমন সময় সাজিদ বা পুলিশের মাথা বিগড়ানো মানে আমার কফিনে পেরেক গেঁথে দেওয়া। আমি একটু চোখের আড়াল হলে মেয়ে দুটো বিপদে।’
—’ ইয়াজকে নিয়ে অগ্রগতি কতদূর?’
নাঈমের প্রশ্নে কিছু একটা জবাব দেবে তার আগেই একটা কড়া লেডিস পারফিউমের ঘ্রান একদম কাছ থেকে টের পেলো। কথা বলতে মুখ খুলতেও থমকালো ঈশান। এতক্ষণ যাবৎ মলিন হয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষের মুখের আদল পরিবর্তন হলো। জ্বলজ্বল করে উঠলো চোখজোড়া। উচ্ছাসে নয়, সম্ভবত রাগে। নাঈম খেয়াল করেনি তখনো। তবে পাশের চেয়াটা টেনে বসতেই থমকালো সে-ও। বিগত তিন চার মাস যাবৎ রুষার সাথে যোগাযোগ নেই তাদের। আজকে এখানে, এভাবে মেয়েটাকে দেখে থমকালোই সে। রুষা নিজের কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের কোনায় রাখতে রাখতে অমায়িক হাসলো। হালকা গলায় বললো,
—’ বহুদিন পর দেখা হলো। হুম? নাঈম? কেমন আছিস?’
নাঈম একপলক তাকালো ঈশানের দিকে। জবাব দেওয়ার আগেই,কথা বলে উঠলো ঈশান। রাশভারি গলায় বললো,
—’ তোর এখানে কি কাজ?’
হেসে উঠলো রুষা। হাত দিয়ে ওয়েটার কে ডাকলো ইশারা করে। ঈশানের দিকে না তাকিয়েউ বললো,
—’ নাউ আই লাভড্ দ্যাট। তোমার মুখে তুই এ অভ্যস্ত আমি। তুমি, আপনি এসব পর পর লাগে। এই যেমন, তোমার বউকে এখনো তুই করে ডাকো। একমুহূর্তের জন্য নিজেকে ওর জায়গায় বসিয়ে কল্পনা করতে বেশ লাগলো।’
অস্বাভাবিক বিরক্ত দেখালো ঈশান কে। নাঈমেরও মেজাজ খারাপও হয়েছে বইকি। ঈশান একপেশে হেসে, বিদ্রুপের সুরে বললো,
—’ কাক ময়ূরপুচ্ছ লাগালেই কি, ময়ূর হতে পারে?’
অপমানটা গায়ে লাগলো না রুষার। মুখের হাবভাবে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। ওয়েটার কে একটা ক্যাপাচিনো অর্ডার দিয়ে সোজা হয়ে বসলো। দু হাত ভাজ করে টেবিলে রেখে ঝুঁকলো সামান্য।
—’ ওটা আলাদা করে হতে হয় না। জায়গার কেরামতি সবই। বিয়েটা আমার সাথে হলে ময়ূর আমি, আর কাক তিতির হতো।’
—’ বিয়েটা তোর স্বপ্নে হতো।’
আরেকদফা বাঁকা হাসলো রুষা। ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ তা ঠিক। ছলনা তো তুমিও করেছো। ‘
ঈশান উঠে যেতে উদ্ব্যৎ হতেই রুষা হাত বাড়ালো, সম্ভবত ঈশানের কবজি আকড়ে ধরতে চাইলো। তার আগেই ছিটকে হাত সরালো ঈশান। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি। বউ পছন্দ করে না এসব।’
রুষার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো এবারে। তবে চেঁচামেচি করলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—’ বোসো। কাজের কথা আছে।’
—’ সময় নেই।’
—’ ইয়াজ মির্জা কে নিয়ে। তোমারই লাভ, তোমার বউয়েরও ভালো।’
রুষার মুখে ইয়াজের নাম শুনে চোখাচোখি হলো নাঈমের সাথে। নাঈম ইশারা করলো তাকে বসতে। রুষার সাথে ইয়াজের কানেকশন আছে। এটা জানতে বাকি নেই তাদের। সুতরাং ভুলভাল, ছলনা যাই করুক মেয়েটা। কিছু একটা উপকার হলেও হতে পারে।
নিজের চেয়ারটা টেনে আর একটু সরিয়ে নিলো ঈশান। গম্ভীর হয়ে বসলো।
—’ দ্রুত।’
রুষা নিঃশব্দে নিজের ফোন বের করলো। সঙ্গে একটা ফাইল। দুটোই ঈশানের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
—’ ইয়াজ মির্জার পাখা কেটে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কি এটা?’
ঈশান থমকায়। শ্বাস আটকে আসে তার। নাঈমের অবস্থাও তাই। একদমে সম্ভবত শেষ হলো ভিডিওটা। ফাইলগুলোর অবস্থাও তাই। ওপরের পাতাটা দেখেই স্তম্ভিত হয় দু’জন। নাঈম হাত বাড়িয়ে এগিয়ে নেয় সে-সব। এক-এক করে উল্টেপাল্টে দেখে। ঈশানের মুখ কঠিন হয়ে আছে। চোখ বুজে হিসেব কষে কিছু একটার। রাশভারি কন্ঠে শুধায়,
—’ এনাফ এতটুকুই। কিন্তু এমনি এমনি তো দিচ্ছিস না। রিজন কি? কি চাস? এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে তুই নিজেও ফাঁসবি। সে ভয় নেই?’
—’ রিজন আছে। ঠিক বলেছো।’
—’ তার আগে একটা কথার জবাব চাই। কে হয় ইয়াজ মির্জা তোর? সেটার জবাব চাই আগে। কি সম্পর্ক ওর সাথে? ‘
নাঈমও শিরদাঁড়া সোজা করে বসেছে। আশেপাশের কোলাহল কমছে খানিকটা। এতক্ষণের মতো ভিরভাট্টা আর নেই। রুষা ফোঁস করে বলে ওঠে,
—’ ভাই।’
আরেকদফা থমকানোর দশা নাঈমের। সে কল্পনাও করেনি রুষা ইয়াজ ভাইবোন হতে পারে। তবে ঈশানকে দেখে মনে হলো না চমকেছে। যেনো আন্দাজ করেইছিলো সে। ঈশান শীতল গলায় বললো,
—’ সেম ব্লাড?’
—’ একই বাবা মা।’
—’ নিজের ভাইয়ের পিছনে যে মেয়ে ছুড়ি মারতে পারে, সে আমাকে সাহায্য করবে? এটা মানা উচিত? ‘
রুষা মৃদু হাসলে। কৃত্রিম প্রসাধনীর ছোঁয়ায় রক্তিম ঠোঁট জোড়া প্রস্যস্ত হয়।
—’ শত্রুর শত্রু, তেমার বন্ধু হয় সম্পর্কে। সাহায্য চাই কি-না?
—’ স্বার্থ ছাড়া এক কদম চলিস না তুই। কি চাস পরিবর্তে?’
রুষা বড্ড দৃঢ় ভাবে উত্তর দিলো এটা। কাপ টা ঠেলে সরিয়ে রুঢ় গলায় বললো,
—’ তোমাকে।’
—’ কোনো জনমে সেটা সম্ভব নয়৷ আমি বিবাহিত ‘
—’ সত্যিই কি?’
রুষার এহেন প্রশ্নে কপালে ভাজ পেলে থাকায় ঈশান। নাঈম থ হয়ে বসে আছে। এই রুষাকে চেনে না সে। রুষার এমন রুপ আগে কক্ষনো সামনা-সামনি দেখাড সৌভাগ্য হয়নি তার। ঈশান দু’হাতে নিজের চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে জবাব দিলো,
—’ মিথ্যা হলেও কি?’
—’ তুমি আমার।’
এ যাত্রায় শব্দ করে বিদ্রুপের হাসি হাসলো ঈশান। ডানে বায়ে মাথা নেড়ে মুখে আফসোসের শব্দ করে বাঁকা গলায় বললো,
—’ একদম বউপাগল পুরুষ আমি। বউয়ের কথায় রেললাইনে বডি, মাথা দুটোই দিতে পারি। যা বলেছিস এই অবধিই সীমাবদ্ধ রাখ । আমার মিসেসের সমানে বলার সাহস দেখাস না। জীবন মূল্যবান। ধড়ের প্রানটা অন্যের স্বামীর দিকে দিয়ে, খোয়ালে ভালো দেখায় কি? বউ আমার রনচন্ডী হয়ে বলি চড়াবে তোর।’
রুষা তীক্ষ্ণ চোখে দেখে ঈশানের মুখে তার বউয়ের নামের ফুলঝুরি।
—’ এতো প্রেম?’
—’ নিঃসন্দেহে। ‘
—’ বিচ্ছেদ হবে না বলছো?
—’ চান্সই নেই। হালাল সম্পর্কের জোর জানা নেই তোর। খোদা এক্ষেত্রে তোর সহায় হবে না। সত্যি, মিথ্যা যদি হোক।দুনিয়া তছনছ হয়ে যাক। আমি তিতিরের। ওই ছাড়া এই একজীবনে আমি ঈশান আরশাদ, আর কেনো নারীকে স্পর্শও করবো না। ভালোবাসা তো দূরের কথা।’
—’ আমি যদি বলি ঈশান আরশাদ তার কথার খেলাপ করতে বাধ্য হবে। ‘
ঈশান একপেশে হাসলো। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের পকেট থেকে ছোট্ট একটা আগ্নেয়াস্ত্র দেখালো। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ এটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে শুট করে দেবো। আমার বউয়ের বিধবা জীবন চলবে, বেইমানীর জীবন না। ‘
ছোট কর্তার ঘর থেকে উচ্চ স্বরে পড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। রিশা, রোশনি, রাফিকে পড়াচ্ছেন মুক্তা দেওয়ান। নিচে রাতের রান্নায় ব্যাস্ত বাকি গিন্নিরা। অফিস থেকে কর্তারাও ফিরেছে সবেই। হাতমুখ ধুয়ে চা নিয়ে বসেছে বসার ঘরে। টিভিতে সংবাদ চলছে। সে-সব নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে জোরেশোরে। আগামীকাল চন্দ্রা দেওয়ানকে আনতে যাওয়ার কথা। সেসবের কথাও হচ্ছে। নিশি, নূরি একসাথে ভার্সিটির এসাইনমেন্ট করছে তাদের ঘরে। নিজের বই নিয়ে এতক্ষণ সেখানেই ছিলো তিতির। সবেই নিজের ঘরে এসেছে। ঈশান ফেরেনি এখনো। মানুষ টা এসে তাকে ঘরে না দেখলে, রাগারাগি করে। বারান্দায় পাখির খাঁচা টায় রাতের জন্য দানা পানি দিয়ে দরজা ভেজিয়ে সবেই ঘরে এসেছে তিতির। রুমের আলো জ্বালা হয়নি। হাতে তখন পাখির খাবারগুলো ছিলো। ড্রেসিং টেবিলের ওদিকটায় একটা পুরুষ অবয়ব দেখে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে আসতে আসতে ডেকে উঠলো তিতির।
—’ আলো জ্বালেননি কেনো? মাত্র এলেন?’
তিতির সুইচবোর্ডে চাপ দিতেই আলোকিত হলো ঘরখানা। পায়ের যন্ত্রণা এ বেলা বেড়েছে খানিকটা। অনেকটা হাটাহাটি করেছে আজকে, এ ঘর সে ঘর। এখন আর পায়ের পাতাই ফেলতে পারছে না। ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে পিছু ফিরতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো মেয়েটা। দু’হাতে মুখ চাপা দিয়ে কোনোমতে চিৎকার আটকালো নিজের। আশ্চর্য গলায় ডেকে উঠলো,
—’ নয়ন ভাই!’
নয়ন দাঁড়িয়ে আছে ওদিকটায়। উদভ্রান্তের মতে চেহারা। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। টকটকে লাল হয়ে আছে আখিজোড়া। অফিসের পোষাকই গায়ে। তবে মোটেই মনে হচ্ছে না, অফিস থেকে এসেছে। শার্টের বেতাম গুলো এলোমেলো হয়ে লাগানো। গলার টাইটা ঝুলে আছে বেশ এলোমেলো হয়ে। তিতিরের দিকে টলতে টলতে দু কদম এগিয়ে এসে বললো,
—’ আমাকে দেখে এতো চমকাচ্ছিস কেনো, মণি? আগে তো এমন করতি না।’
—’ তুমি এভাবে কথা বলছো কেনো,ভাইয়া? কিছু খেয়েছো?’
নয়ন হাসে। হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁট ডলতে ডলতে বলে,
—’ তোর নামের বি’ষ। ‘
থমকায় তিতির। আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। দরজাটা হাট করে খোলা। পুরো বাড়ির মানুষই জেগে আছে। সবাই নিচেই বসা৷ এরককম অবস্থায় মানুষ টা ওপরে এলো কি করে! নয়ন টলছে রীতিমতো। তিতিরের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়না– কিছু খেয়েছে নয়ন। জড়তায় কুঁকড়ে ওঠে মেয়েটা। সেদিন গার্ডেনে নূরির বলা কথাগুলোর পর থেকেই সে এড়িয়ে চলে নয়নকে। যতটা সম্ভব দুরত্ব রাখে। আজকে আচমকা সোজা বেডরুমে চলে আসায় মাথা ভনভন করে উঠলো তিতিরের। তিতির ওখান থেকেই ব্যাকুল গলায় বললো,
—’ তুমি ঠিক নেই, ভাইয়া। রুমে যাও। আমি ছোটপু কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। মামা রা কেউ দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
নয়ন থ মেরে ভাবলো কিছু একটা। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবুক গলায় বললো,
—’ তাহলে দরজা টা লক করে দিয়ে কথা বলি?’
আৎকে ওঠে তিতির। এই প্রথম নয়নের সাথে অনিরাপদ বোধ করছে সে। তিতির মানা করার মধ্যেই হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো নয়ন। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু হাতে জড়িয়ে ধরলো। ফুঁপিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। তিতির দু’হাতে ঠেলে সরাতে চাইলো ছেলেটাকে। নয়ন ছাড়লো, তৎক্ষনাৎ ই ছাড়লো। তিতির দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেছে। নয়নের বুকটা বোধহয় দুমড়েমুচড়ে উঠলো। কম্পিত হাতজোড়া এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
—’ অ্যাম সরি, মণি। আ- আমি…আমি জড়িয়ে ধরতে…’
তিতির ছিটকে পিছিয়ে যায়। ফুঁপিয়ে কেদে ওঠে, ব্যাকুল গলায় বলে ওঠে,
—’ সম্পর্ক বদলেছে, ভাইয়া। একসময়ে নিজের ভাই হিসেবে তোমাকে জড়িয়ে নিতে একফোঁটাও জড়তা কাজ করতো না আমার। কিন্তু আজকের টা বি’ষ লাগলো। গায়ে আ’গুন ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। আর ছোঁবে না দয়া করে।’
চূড়ান্ত আঘাত পেলো বোধহয় নয়ন। ছলছল চোখে বললো,
—’ আমার স্পর্শ তোর বি’ষ লাগলো,মণি? গায়ে আগু’ন লাগিয়ে দেওয়ার মতো অসহ্য লাগলো।’
তিতিরের শরীর থরথর করে কাঁপছে। কান্না আটকে কোনোমতে বললো,
—’ বোনের নজরে তুমি আমাকে স্পর্শ করোনি ভাইয়া। ‘
—’ তোকে আমি বোনের নজরে কখনো দেখিনি।’
—’ আমি তোমাকে নিজের ভাই মেনেছি। এখন তোমার ভাইয়ের বউ। আমার তোমার সম্পর্ক কতটা সম্মানের জানো সেটা? আর তুমি কি-না! ছিহ্।’
তিতিরের মুখের এইটুকুন কথা সহ্য হলো না নয়নের। টলতে টলতে নিজেকে কোনোমতে সামল নিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেললো। দু-হাত মুখে চেপে আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা,
—’ খোদা তোকে আমার করে পাঠালো না কেনো,মণি? অন্যেরই যদি হবি, সেটাই বা আমারই ভাইয়ের বউ কেনো? না তো এই ১০ বছরের দহন থেকে বের হতে পারছি। আর না তো তোকে অন্যের সাথে দেখার যন্ত্রনা সহ্য করতে পারছি। এতো তীব্র পাপের সম্পর্ক কেনো তৈরি হলো তোর আমার? দিদা কেনো তোকে আমার হাতে তুলে দিলো না? আমি তো মরে যাচ্ছি। তুই আমার ভাইয়ের বউ। তোর দিকে নজর দেওয়াও পাপ। কিন্তু আমি সামলাতে াপরছি না নিজেকে। ১০ বছরের ভালোবাসা ৩ মাসে ভোলা সম্ভব? তাও সেই নারীকে চোখের সমানে নিজের ভাইয়ের সংসার করতে দেখে? সম্ভব? তুই বল এ পা’পের সমাপ্তি কোথায়?’
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬১
তিতির দু’হাতে মুখ চাপা দিয়ে নিজের কান্না আটকাতে মরিয়া। নয়নের এই আর্তনাদে আরেক দফা ঝংকার তুলে ফুঁপিয়ে উঠলো। কান্নার তীব্রতায় থরথর করে কাপছে শরীর। আচমকাই পদশব্দ জোড়ালো হলো দরজার সামনে। তিতির চমকে তাকাতেই হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। ওপাশের মানুষটা কতক্ষণ দাড়িয়ে বোঝা গেলো না। শুধু আশ্চর্য মাখা কন্ঠে ডেকে উঠলো,
—’ নয়ন!’
