সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
— ‘ আ-আপনিই…আপনি সুস্থ আছেন ? খোদার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া । আমি তো ভয়ই…’
তিতিরের দূর্বল ঠোঁটজোড়া কথাগুলো শেষ করতে পারে না । তার আগেই আ’গ্রাসী আ’ক্রমণ পরে পাতলা অ’ধরজোড়ার ওপর । মেয়েটার ফ্যাকাসে হয়ে আসা মুখটা রঙ ফিরে পায় আচমকাই । কালি পরে যাওয়া চোখজোড়া সিক্ত হয়ে ওঠে নোনা জলে। ক্যানোলা পরানো হাতটা উচিয়ে স্পর্শ করতে পারে না ঈশানকে। ঈশানই ঝুঁকে, নিজের বলিষ্ঠ শরীরের নিচে আড়াল করেছে মেয়েটাকে। তিতির আজকে মোটেই ছটফট করে না। শান্ত হয়ে থাকে। ঈশানকে নিজের মতো করো অনূভব করতে দেয়, শু’ষে নিতে দেয় নিজের ঠোঁ’টের মিষ্টত্বটুকু।
—’ আমি সুস্থ আছি কি-না, সেই প্রশ্নের জবাব ও তোর ওপর নির্ভর করে, তিতির । তোকে পাচ্ছিলাম না। গোটাটা দিন, পাগলের মতো ছুটেছি এদিক থেকে ওদিক । শেষমেশ কোথায় গিয়ে থামতে হয়েছে জানিস ? শুনতে চাস? ‘
তিতির উঠে বসার চেষ্টা করলো। সাহায্য করলো ঈশানই। দু’হাতে আলতো ছুঁয়ে উঠিয়ে বসালো স্ত্রী কে। নিজেও বসলো বেডের একটুখানি জায়গার মধ্যেই। তিতিরের দু’পাশে দীর্ঘ বেণি। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। ঠোঁট জোড়া শুষ্ক হয়ে থাকলেও, ঈশানের ভেজা আদরে এ বেলা ভিজে উঠেছে। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। ঈশানের শরীরে অসহায় দৃষ্টি বুলালো। কেমন অসুস্থ লাগছে তাকে। ধীর গলায় শুধালো,
—’ কোথায় গিয়েছিলেন? ‘
ঈশান স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। তারপর দম ছেড়ে হাসফাস করে বললো,
—’ যেখানে প্রান হীন মানুষগুলোকে বড্ড অবহেলায় হিমায়িত করে রাখা হয় । শেষ বিদায়ের আগ মূহুর্ত অবধি একটা বেওয়ারিশ মৃ*ত মানুষের স্থান যেথায় । ম*র্গে… ‘
তিতির চকিত হয়ে তাকালো স্বামীর রক্তিম মুখপানে । ঈশানের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া এখন অসহায় দেখাচ্ছে।
—’ ম*র্গে গিয়েছিলাম, তিতির। তোকে খুঁজতে । ওই ঘরটায় কারোর প্রাণ ছিলো না, জানিস? কেউ শ্বাস নিচ্ছিলো না। সবাই ক্লিনিক্যালি মৃ*ত। অথচ একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছিলো ? আমি জীবিত হয়েও শ্বাস নিতে পারছিলাম না তখন। একটা কাফনে মোড়ানো লা*শের সামনে গিয়ে আমাকে বলা হলো, এটা তুই। সনাক্ত করতে হবে আমাকে। ‘
ঈশান নিজের কম্পিত হাত জোড়া বাড়ায় তিতিরের দিকে। নিজের হাতের দিকে ইশারা করে জড়িয়ে আসা গলায় বলে,
—’ এই হাতজোড়া কাফনের কাপড় সরিয়েছে । সেই কাফনের নিচে তুই থাকতে পারিস, এটা ক্রমাগত বলা হচ্ছে আমাকে। আর আমি…’
হা করে শ্বাস টানলো ছেলেটা। ঝুকিয়ে ফেললো মস্তিষ্ক। তিতির তখনো ছলছল চোখে কেবিনের বেডের হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে বসা। ঘুমের ওষুধের তীব্রতায় চোখ ভেঙে আসছে। ঈশানেরা মশ্রিন গালে পানির কনা গড়িয়ে পরতে দেখা মাত্র ঝাঁপিয়ে পরলো স্বামীর বুকে। তৎক্ষনাৎ ঈশানের বাহুবন্ধনীতে আটকা পরলেও, চোখমুখ খিঁচে নিলো ছেলেটা । বাঁ পাশের ক্ষতটায় তখনো কোনো সেবা শুশ্রূষা পরেনি। নিয়াজ কোনোমতে ব্যান্ডেজ করে ব্লিডিং বন্ধ রেখেছে। তবে ঈশানকে মুখ ফুটে বলতে হলো না কিছুই। ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরা মাত্রই শরীরের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা খেয়াল করলো তিতির। মুখ তুললো বলিষ্ঠ বুকের ওপর থেকে। ক্যানোলা বিহীন ডান হাতের তালু চওড়া কপালে ঠেকাতেই বর্ণহীন হলো মুখটা।
—’ আপনার তো অস্বাভাবিক জ্বর, ঈশান ভাই। এই শরীর নিয়ে… ‘
—’ ও কিছু না । জ্বরের ওষুধ ও পেয়ে গিয়েছি তো। এখন সেরে যাবে। নেমে যাবে জ্বর । ‘
ঈশান খানিকটা পিছিয়েই বসতে চাইলো। মেয়েটা আরেকদফা ঝাঁপিয়ে পরলে, তার ক্ষত স্থান থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পরতে দুবার ভাববে না। এমনিতেই ভেজা অনূভুত হচ্ছে। তিতিরের এই শরীরের অবস্থায়, সে মোটেই টেনশন দিতে চাচ্ছে না মেয়েটাকে । তবে ঈশানের সে ইচ্ছে টা পূরণ হলো না। কারণ ছাঁই রঙা শার্টের বাঁ পাশটা, রক্তিম হয়ে উঠেছে । সেদিকে চোখ যেতেই আরেকদফা আতঙ্কিত দেখালো মেয়েটাকে।
—’ এখানে কি হয়েছে? র*ক্ত লাগছে। কি এসব। কি হয়েছে আপনার ? ‘
মেয়েটার ব্যাস্ত হাতজোড়া উঠে এসেছে সেখানটায়। ঈশান লক্ষ্য করলো তিতিরের বাঁ হাতের ক্যানোলায় র*ক্ত উঠে পরেছে। সে হাতটা দ্রুত নিজের হাতে নিয়ে, সেটা ফিক্সড করতে করতে ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ আহ্। আমার গায়ে কিসের র*ক্ত সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে, নিজের শরীরের কথা খেয়াল নেই। এতো ছটফট করছিস কেনো? ‘
—’ আপনি বলছেন না কেনো? কিসের র*ক্ত? ‘
—’ মানুষ খু*ন করে এসেছি। ‘
—’ হেয়ালি করবেন…’
থেমে গেলো তিতির। ঈশান তার হাতের ক্যানোলা ঠিক করতে ব্যাস্ত। কিন্তু মানুষ খু*নের কথাটা কানে আসতেই থমকালো সে। গত রাতের কথা ভেসে উঠলো মানসপটে। ইয়াজ মির্জা একটা ভিডিও দেখিয়েছে তাকে। সেখানেও…গা ছমছম করে উঠলো মেয়েটার। শান্ত গলায় বললো,
—’ আমাকে ছুঁয়ে আছেন, ঈশান ভাই। ‘
—’ হুম, তো? ‘
—’ ছুঁয়েই থাকুন । আর একটা প্রশ্নের জবাব দিন। নাহ, একটা নয়। অনেক গুলো প্রশ্নের। যা এতদিন যাবৎ অজানা আমার। আমার দৃষ্টির অগোচরে যা ঘটে যাচ্ছে। যা আপনি একা বয়ে বেড়াচ্ছেন। জানতে চাই আমি সে-সব। ‘
সরু দৃষ্টি তাক করলো ছেলেটা। হাত সরালো না। চেষ্টাও করলো না। হয়তো বা আন্দাজ করতে পারছে, তিতির এই মূহুর্তে কি প্রশ্ন ছুড়তে পারে। সে-ও বলতেই চায়। এই লুকোচুরি যত দীর্ঘ হবে, আচমকাই যে দুরত্ব তৈরি হবে দু’জনের মাঝে– সেটাও দীর্ঘায়িত হবে । তিতির নড়েচড়ে বসলো খানিকটা। ঈশানের দিকে ঘেঁষে আসতে চাইলো। তবে ঢুলঢুলু দূর্বল শরীরটা সায় দিলো না। ফলসরুপ দুরত্ব ঘুচিয়ে কাছে আসলো ঈশানই। যুবকের মুখজুড়ে আশকারার ছাপ দেখে একপ্রকার স্বস্তিই বোধ করলো তিতির। ঈশানের হাতখানা আর একটু শক্ত করে চেপে দৃঢ় গলায় শুধালো,
—’ আপনি কে ? ‘
—’ কে আমি? ‘
—’ সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। কে আপনি। ‘
—’ তোর হাসবেন্ড। তোর রুহ সঙ্গি। ‘
রুহ সঙ্গী শব্দটা কানে বাজতেই জিজ্ঞাসা আরও প্রবল হলো।
—’ আর? ‘
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ান । বাবা মায়ের নাম বলবো? বংশ পরিচয়? জাত-কুল, ধর্ম – গোত্র? ‘
খানিকটা কড়া চোখেই তাকালো মেয়েটা। চোখ ভেঙে আসছে। এমতাবস্থায় এতো হেয়ালি সহ্য হচ্ছে না তার। কেবিনের বদ্ধ দরজার ওপাশে, ছোট্ট এক টুকরো কাঁচের ওপাশে নিয়াজ কে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। রাহাত নেই। জানিয়ে গিয়েছে মা’কে দেখতে যাচ্ছে। ঈশান আসার মিনিট দশেক আগেই বেড়িয়েছে লোকটা।
—’ আপনি বললেন সময় কম। তাহলে এতো হেয়ালি করছেন কেনো? আমাকে মানুষ বলে মনে হয় না? আপনি বললেন, আপনি আমার হাসবেন্ড, রুহসঙ্গী। এবার একটাবার ভাবুন তো। ভেবে সঠিক জবাব দিন আমাকে। আপনার সম্পর্কে এক আকাশ সমান জিনিস অজানা আমার। এই কথাটা দিনের পর দিন ধরে বলে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত সময় চেয়েছেন। দিন তারিখ ঘুরিয়েছেন। আমাকে হাবিজাবি একগাদা বুঝ দিয়েছেন। মেনে নিয়েছি সবসময়। এমন নয় যে, আমি বুঝতে পারিনি কিছু। সবই বুঝেছি। তবে বিশ্বাসও করেছি ততটাই। আপনি যে এমন কিছু করবেন না, যাতে আমার বিশ্বাস ভাঙে এই আত্মবিশ্বাস টা আমার বরাবরই ছিলো। বিয়ের প্রথম থেকে এসব সহ্য করে আসছি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের তিক্ততা সরিয়ে কাছাকাছি এসেছি। নিজে বহুবার বুঝিয়েছি যতদিন না আপনার মুখে পুরোটা সত্যি জানতে পারবো, ততক্ষণ আমাদের মধ্যের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তৈরি হতে দেবো না। কিন্তু আমিই ব্যার্থ হয়েছি। আপনার ভালোবাসায় বলুন অথবা যাই কিছু। আমি নিজেকে সপেছি আপনার কাছে। পুরোটা। বিলীন করেছি নিজের নারী অস্তিত্ব। যখন আপনি চেয়েছেন, তখনই সায় দিয়েছি। আর প্রতিবার সেই সুন্দর মূহুর্তের পর, আমার একটা প্রশ্নই থাকতো। একটা অনুরোধই থাকতো। সবটা বলুন আমাকে, আমি সত্যিটা জানতে চাই। কে এই ইয়াজ মির্জা, কে-ই বা রুষা। কি সম্পর্ক, কি রেশারেশি ওদের সাথে। যার জের ধরে এতটা, এতটা গভীরে এগিয়েছে সংঘাত গুলো। ‘
দীর্ঘ আক্ষেপ শেষে দম ফেললো মেয়েটা । কান্নার তোড়ে কথা জড়িয়ে আসছে। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে চুপ রইলো কিয়ৎক্ষন।
—’ আপনি আচমকা কিছু না বলে, সেদিন উধাও হয়ে গেলেন । রাতে ফিরলেন না। না তো পরের দিন। আর বাড়িতে পুলিশ আসলো আপনার নামে ওয়ারেন্ট নিয়ে। তা-ও কিসের অভিযোগ! রে*প! ছিহ্। একজন স্ত্রী হিসেবে, এটা কতটা অপমানজনক, বোঝেন আপনি? একবুক বিশ্বাস নিয়ে ওপরে ওপরে স্ট্রং হলেও, আমার ভিতরটা দেখেছেন কি? দেখবেন? জ্বলে গেছে, পুড়ে গিয়েছে। আরও পুড়িয়ে ছাঁই করে দিতে, পরের দিন ডিভোর্স লেটার এসে হাজির। সেটা কবে তৈরি করা? আমরা যেদিন প্রথম…’
নিজেদের প্রথম মধুরাতের কথা মনে করা মাত্রই, এ যাত্রায় ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। ঈশানের হাত ছেড়ে দু’হাতে চেপে ধরলো নিজের মুখ। ঈশান অসহায় হাসলো। সবই জানা তার। মেয়েটাকে শেষ একবার আক্ষেপ প্রকাশের সময় দিতে চাইলো। কান্না থামছে না রমনীর। পাতলা দেহখানা ঝাঁকি দিয়ে উঠছে কান্নার তীব্রতায়। ঈশানের কাছে এ কান্না সহ্য সীমার বাইরের বস্তু। পুরুষালি কঠিন বুকটা কাপে। নিয়ম ভেঙে এলোপাতাড়ি বিট করতে থাকে। শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। লম্বা হাতজোড়া বাড়িয়ে, রমনীর তুলতুলে পাতলা দেহটা জাপটে নিলো নিজের বলিষ্ঠ বুকে। পুরুষালি পারফিউম আর দেহের ঘামের মিশ্রণে তৈরি ঘ্রানটা বুক ভরে টেনে নিলো তিতির। ঈশানের হাতের আঙুলগুলো বিচরন করছে রমনীর এলোমেলো চুলের ভিতর ।
—’ এতোটা বিশ্বাস কি করে করতে পারে কেউ ? হাসবেন্ড রে*প কেসে এরেস্ট হয়েছে জানার পরেও, যে নারীর বিশ্বাসে একবিন্দুও চিড় ধরে না। ডিভোর্স লেটারে হাসবেন্ড এর সই, চিঠি দেখার পরও যে নারী ভুল না বুঝে, উল্টো খোদার কাছে নত হয়ে আর্তনাদ করে। স্বামীর সুস্থতার, ফরিয়াদ জানায় সব বিপদ কেটে যাওয়ার… আমি কি এমন পূন্য করেছি এ জীবনে? যার ফলসরুপ খোদা, তোকে আমার জন্য হালাল করে দিলো? বল তো? ‘
—’ সেসব কিচ্ছু জানি না আমি। কিন্তু আপনার সম্পর্কে সবটা আজকে আমি জানতে চাই।’
—’ এখনো বিশ্বাস আছে? ‘
—’ আমার প্রশ্নের জবাব দিন আগে । কে আপনি? কেনো এতো লুকোচুরি? আমার আপনার বিয়েটা, এটাও কি অতীতের কোনো ঘটনার জের ধরে? নাকি সত্যিই কাকতালীয়ভাবে পরিবার থেকে হয়েছে। আ-আমি…আ-আমি আপনাকে খু*ন করতে দেখেছি। কেনো? কি কারণে এতো নৃশংসতা? হ্যা? ‘
খু*ন করতে দেখেছে মেয়েটা । কে দেখাতে পারে সেটা বুঝতে দেরি হয় না তার। তিতিরকে সোজা করে বসিয়ে আচমকাই একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো। প্যান্টের পিছন দিকটায়, শার্টের নিচে গুঁজে রাখা বন্দুক খানা বের করে সোজা ঠেকালো রমনীর কপালের মাঝামাঝি। হিসহিসিয়ে বললো,
—’ খু*ন করতে দেখেছিস আমাকে । আমি কতটা নৃশংস সেটাও দেখেছিস। তারপরও এই বুকে আছড়ে পরে এতো অভিযোগ জানালি। ভয় করছে না? ‘
একপেশে হাসলো মেয়েটা। দূর্বল হাতটা তুলে স্পর্শ করলো ঈশানের বন্দুক চেপে রাখা হাতের কবজি।
—’ নাহ তো। করছে না । ‘
—’ তোর কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছি। তাও না?’
—’ নাহ। ‘
—’ কেনো ভয় পাচ্ছিস না আমাকে? কি এমন করেছি তোকে। আমার হাতে অস্ত্র দেখেও রুহ কাঁপছে না তোর। খারাপ মনে হচ্ছে না আমাকে? ‘
—’ হচ্ছে না । ‘
—’ বিশ্বাস নাকি ঘৃ নায়? ‘
—’ ভালোবাসায় । ‘
—’ ভালোবাসায় ভুল দেখতে নেই? ‘
—’ ভুল শোধরানো যায় । অন্যায় নয় । কোনটা করেছেন ? ভুল নাকি অন্যায় ? ‘
—’ অন্যায় । ‘
ঈশানের একেরপর এক প্রশ্নের জবাব মন্ত্রমুগ্ধের মতো আউরিয়ে শান্ত হলো দু’জনেই। ঈশানই মুখ খুললো আবারও।
—’ মানুষ হ*ত্যা করেছি আমি। একজন নয়। অনেকজন। ‘
—’ কারণ তারা রে*পিস্ট ছিলো তাই তো? ‘
এতক্ষণ সেরকম গুরুত্ব না দিলেও এবার চমকালোই ছেলেটা। ঘাড় বাঁকিয়ে দরজার দিকে তাকালো। সময় খুবই কম। সে চলেই যাচ্ছিলো। সেসময় তিতিরের জ্ঞান ফেরায় থমকাতে হয়েছে তাকে। ভাগ্যিস জ্ঞান টা তখনই ফিরেছিলো। ঈশান নিজের কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে শুধালো,
—’ কে জানিয়েছে তোকে? ইয়াজ মির্জা? ‘
ডানে – বায়ে মাথা নাড়লো তিতির।
—’ নিজের দোষের কথা কেউ নিজ মুখে স্বীকার করে? ‘
তেলতেলে কপালের মাঝে গোটা তিনেক ভাজ ফেলে তাকিয়ে আছে ঈশান
—’ মানে? ইয়াজ মির্জা স্বীকার করেছে তোর কাছে? ‘
—’ নাহ। ‘
—’ তাহলে? ‘
—‘ আমার আন্দাজ ছিলো সবটা শুরুতে। আমাকে কিডন্যাপ। তারপর ওনার একের পর এক বলা কথাগুলো। আর…’
—’ আর? ‘
—’ ওনাকে আপনি সামনা-সামনি দেখেেন? ‘
মাথা ঝাকালো ঈশান। দেখেছে সে। কয়েকবার দেখা হয়েছে দু’জনের।
—’ গত কালও ভিডিও কলে দেখেছি। ইভেন, তমা এখনো ওর কাছেই আছে। ‘
—’ আমি কিন্তু দেখিনি ওনাকে। আমার সামনে উনি মুখ খুলে আসেনি। কালো কাপড়ে ঢাকা ছিলো। একই ঘরে, অথচ মাঝখানটায় একটা কাচের পারটিশন দেওয়া। দু’পাশে দু’জন। স্পিকার এ কন্ঠ শুনেছি ওনার। এতো লুকোচুরি কেনো আমার থেকে, আন্দাজ করতে পারেন? ‘
আন্দাজ করতে পারে না ঈশান। তিতিরের থেকে লুকিয়ে থাকার মতো কিছু নেই। লুকিয়ে যদি থাকতেই হতো, সেটা ঈশানের থেকে। তবে লোকটা সেটা করেনি। উল্টো ওপেন চ্যালেন্জ ছুড়ে বরাবরই মুখোমুখি হতো তার।
—’ নাহ। ‘
—’ আপনি সব জানেন? ওর সম্পর্কে? ওর কুকীর্তির সম্পর্কে। মানে, আমি যেসব কে আন্দাজ বলছি, সে-সব কি সঠিক? ‘
স্বীকার করতে বাধ্য হলো ঈশান। ধীর কন্ঠে বললো,
—’ সঠিক। ঈয়াজ মির্জাই রে*পিস্ট। ‘
—’ আপনার কাছে প্রমান আছে?’
—’ আছে। ‘
—’ তাহলে ওকে পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেনো? ‘
—’ প্রমান তো ও আমার বিরুদ্ধেও সাজিয়েছে। ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে অনেক কিছু, তিতির। যা অতীত, তা বর্তমানের সাথে খাপ খাওয়ানো বড্ড মুশকিল। প্রমান পরিবর্তন করা খুব সহজ কথা। মিথ্যা খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যর ক্ষেত্রে তা খুব কঠিন। বিগত পাঁচ বছর যাবত যা হয়ে আসছে। তা আমার দু একটা প্রমানে পুলিশ কেনো বিশ্বাস করবে? আমার বিরুদ্ধেও সে-সব প্রমান আছে। ‘
—’ তাহলে উপায়? ‘
—’ সেটাই তো করে যাচ্ছি। আমরা অতীতকে বিশ্বাস না করতে পারি। ভরসা না-ই করতে পারি। কিন্তু চাক্ষুষ প্রমান? সেটা কি? সেটার জোর অনেক। ইয়াজ মির্জার মতো পাকা ক্রিমিনাল কে হটকারিতায় ফসকাতে পারি না আমি। ওর বিরুদ্ধে জোরালো প্রমানগুলো তখনই কাজে দেবে, যখন আমি বর্তমানেও ওকে দোষি প্রমান করতে পারবো। বুঝলি কিছু? অপরাধ করার সময় পাকরাও করবো ওকে আমি। ‘
—’ সেটা কি করে? ‘
—’ সেটাই ভাবছিলাম এতদিন। আচমকা তুই আর তমা ওর ডেরায় আটকা পরে সব গোলমাল করে দিলি । আমার দূর্বলতা ও সবসময় খুঁজে বেড়াতো। এখন জানে আমার দূর্বলতা কি, কে! সেখানেই হাত বাড়ায় ও।’
ঈয়ান শ্বাস ফেললো। তারপর মিহি গলায় ডাকলো,
—‘ তিতির?
—’ হুম। ‘
—’ আমি অন্যায় করেছি। মানুষ হ*ত্যা মহাপাপ…’
বন্ধ চোখজোড়া খুললো মেয়েটা। হাত বাড়িয়ে ঈশানের গালে হাত রাখলো। উষ্কখুষ্ক দেখাচ্ছে মানুষ টাকে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গালভর্তি। নিজের যে যত্ন নেয়না, সেটা এক লহমায় বলে দেওয়া যায়।
—’ রাকিন, ইয়াজ মির্জার ভাই? যাকে আপনি মে*রেছেন? ‘
—’ হ্যা । ওউ রে*পিস্ট। ‘
—’ সেই প্রতিশোধ নিচ্ছে? ‘
—’ হু। ‘
তিতির আদুরে গলায় বললো,
—’মানুষ হ*ত্যা মহাপাপ। রাকিন কে কি মানুষের কাতারে ফেলা যায় ? অথবা ইয়াজ মির্জাকে? ধ*ধর্ষনকারীদের শাস্তি সম্পর্কে অবগত আমিও। ধর্ম বলুন অথবা আইন। খানিকটা জানি আমিও। আপনি অন্যায় করেননি। একজন সত্যিকারের পুরুষ হিসেবে, সাধারান নাগরিক হিসেবে…’
—’ আমি সাধারণ নাগরিক নই তিতির । ‘
—’ আপনি…’
ঈশান মেয়েটার দু-হাত নিজের হাতের মুঠোতে চেপে শুষ্ক চুমু আঁকলো।
—’ এই ইয়াজ মির্জা নামক অভিশাপ আমাদের মাথার ওপর থেকে সরাতে, কাজ করি আমি। দেশের হয়ে। আইনের হয়ে। আইন আমাকে দিয়েছে এই দায়িত্ব। আমি…আমি… শুধু তোর হাসবেন্ড বা দেওয়ান বাড়ির ছেলে নই। এর পাশাপাশি আরও পরিচয় আছে আমার। যেটা আমি জানাতে অপরাগ। আমার পেশাই এটা। ‘
তিতির বিস্ফরিত নয়নে তাকাতেই, টুপ করে মেয়েটার চোখের পাতায় চুমু আঁকলো ঈশান। ফিসফিস করে বললো,
—’ NIB তে আছি আমি। বিগত ছয় বছর যাবৎ। এই কেসটা নিয়ে কাজ করছি শুরু থেকেই। স্পেশাল অপারেশন এটা। সেখানকার সিনিয়র আন্ডারকভার অফিসার আমি। ‘
দম নিলো ঈশান। মেয়েটার পেলব গালের ওপর নিজের খসখসে হাতটা স্লাইড করে বোঁচা বোঁচা নাকের ডগার ওপর, ঠোঁট ছুঁয়িয়ে বললো,
—’ আমি অন্ধকারের মানুষ তিতির। আর তুই? তুই আমার জীবনের জোনাকি। তোর এক টুকরো আলোতে খানিকটা হলেও, শান্তির ছোঁয়া পাই আমি। কিন্তু তুই কিভাবে কবুল করবি এই অন্ধকার কে। আর এই অন্ধকারে মোড়া আমি’কে? ‘
তিতিরের ঘোর তখনো বোধহয় কাটেইনি। শরীর শিরশির করছে শিহরণে। ঈশানের স্বীকারোক্তি তে হত-বিহবল সে। কপালে কপাল ঠেকানো দু’জনের। চোখজোড়া বুঁজে আছে। স্বামীর তপ্ত হাতের আদুরে বিচরন তার পেলব গালে। সেথায় হাত ছুঁয়িয়ে ফিসফিস করে বললো,
—’ জোনাকির অস্তিত্ব অন্ধকার ছাড়া দৃশ্যমান হয়না, ঈশান ভাই। দিনের আলোতে জোনাকির অস্তিত্ব টের পেয়েছেন কখনো ? পান নি। তাই না? পাবেনও না। তাহলে? আমি আপনার জীবনের জোনাকি। তাই তো? অন্ধকার ছাড়া আমার অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে। আপনাকে কবুল। এ জন্ম, পরজন্ম– আজন্মের জন্য কবুল। আপনার রাগ-জেদ, ন্যায়-অন্যায়, সব কবুল। তিন কবুলের সঙ্গী আমি আপনার। আপনাকে বিশ্বাস করে মৃ*ত্যুও কবুল। ‘
সময় পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। বাইরে সাজিদ কি বলে সময় অতিবাহিত করছে জানা নেই ঈশানের। সেদিকে মনও নেই তার। তিতির নিজের হতবিহবলতা কাটিয়ে উঠলো বেশ সময় নিয়ে। ঈশানের এমন একটা সত্যি একদিন তার সমানে এসে হাজির হবে। সেটা কি আন্দাজ করেছিলো কখনো? করেনি তো। একদম করেনি।
নিজের চাকরিজীবন নিয়ে খুটিনাটি একেরপর এক বলে যাচ্ছে ঈশান। আর সে-সব কর্ণগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু একটা৷ তিতির চুপচাপ বসে ভাবলো কিছু একটা। অবচেতন মন এলোমেলো অনেক কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু ধরতে পারছে না সেটা।
—’ আমাকে ইয়াজ মির্জার ছবি দেখাতে পারেন আপনি? ‘
—’ হুম। কেনো? ‘
তিতির ঠোঁট টিপলো। কিছু একটা মনে পরতে গিয়েও পরছে না। চোখ বুজলেই একজোড়া তীক্ষ্ণ অথচ মায়াবী চোখ ভেসে উঠছে তার মানসপটে। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া কেমন অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তৎক্ষনাৎ সিক্ত হচ্ছে। যেনো একই মানুষের দুই রুপ। আগুন আর পানি!
—’ ঈশান ভাই? ছবিটা জলদি দেখান তো। ‘
ঈশানও জলদিই বের করে ছবিটা। ফোনের ফোল্ডার ঘেঁটে একখানা সুদর্শন যুবকের ছবি তিতিরের দিকে বাড়িয়ে ধরতেই বজ্রাহত হলো মেয়েটা। ঝাঁকি দিয়ে উঠলো গোটা টা শরীর। এক মূহুর্তের জন্য দুঃস্বপ্ন মনে হলো সবকিছুই। পাতলা ঠোঁটজোড়া শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়েও থেমে গেলো। কপালের কাটা দাগ! সেই তীক্ষ্ণ চোখ। এতো সহজে কিভাবে ভোলে সে। হতভম্বতার মাঝেই আরেকটা ঝটকা লাগলো। নিজের অবচেতন মন, যে কথাটা বারংবার স্মৃতির পাতায় আনতে গিয়েও আনতে দিচ্ছিলো না। সেটাও স্পষ্ট হলো। এই কাটা দাগ সে দেখেছিলো নদীর তীরে জ্ঞান হারানোর সময়। তমা ছিলো ঠিক তার পাশেই। মেয়েটা তখন বিরবির করে কথা বলছে। তিতির সুস্থ আছে দেখে, এক চিলটে হাসিও ফুটেছিলো মুখে। সে-সময়ই সাক্ষাৎ ফেরেশতার মতো হাজির হয় একজন ব্যাক্তি। ব্যাক্তিটির কপালের বিভৎস কাটা দাগটিই সবার আগে নজরে আসে মেয়েটার। জ্ঞান হারানোর লগ্নে এক মূহুর্তের জন্য ইয়াজ মির্জাকেই মনে করেছিলে সে। আতঙ্কিত হয়েছিলো সে-কারণেই। তবে সে ধারনাকে ভুল প্রমানিত করে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ বড্ড নিরাপর এক ব্যাক্তির কন্ঠস্বর, কানে এসে বেজেছিলো তার। ছোট্ট একটা শব্দ শুনতে পেরেছিলো। “পরীই।”
তিতির ছলছল চোখে তাকালো ঈশানের দিকে। অস্ফুটস্বরে বিরবির করে বললো,
—’ রাহাত ভাই! ‘
বর্তমান—
—’ তোর বাপ এইটা। তারে এতো তোয়াজ করতেছি দেইখা হ্যাবলার মতো তাকায় আছে । চালাক মনে করছিলাম। সিরিয়াল কি*লার যেহেতু। এ তো দেখি আস্ত আহাম্মক। যার পিছনে যুগ যুগ ধরে পরে আছিস, তার আইডেন্টিটি জানিস না? আইন রে আইন চেনায়। চেনোস এইটা কে? ‘
ঘরজুড়ে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে যেনো। তাহমিদের বিতৃষ্ণা মাখা কন্ঠে বাকিরা হেলদোল না করলেও, রাহাত ঠিকই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাহমিদ পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসা তখনো। তিতির দাড়িয়ে ঈশানের ঠিক পিছনটাতেই। চোখেমুখে রাহাতের জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। রাহাত শুকনো ঢোক গিলে কদম বাড়ালো। উপস্থিত সবার বন্দুক তাক করা তার দিকে। ঈশানের মুখোমুখি এসে নিচু গলায় বললো,
—’ আমাকে তিতিরের সাথে একমিনিট কথা বলতে দেওয়া সম্ভব? ‘
—’ নাহ। ‘
মূর্তিমান মানবের মতো জবাব দিলো ঈশান। সাজিদের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করলো। ওদের নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার যে আদেশ টা ছোড়া হয়েছিলো, সেটা দ্রুত কার্যকরের নির্দেশ দিচ্ছে ইশারায়। সাজিদ আর সময় নষ্ট করে না। দু’জন হাবিলদারের সহায়তায় তাহমিদ কে নিয়ে বের হয় ঘর থেকে। সঙ্গে তমা।
—’ সাজিদের সাথে যা । আমি এদিকটা সামলে ফিরবো । ‘
—’ আমি যাবো না আপনাকে রেখে। ‘
তিতির নাকচ করলো তৎক্ষনাত। এখন আর বউকে সোহাগ করার সময় নেই দেওয়ান সাহেবের। অন ডিউটি অফিসার সে। ঘরভর্তি সবাই তার জুনিয়র, তার আন্ডারে।
—’ আমাকে রেখে মানে কি! আমি ডিউটি টে আছি। একজন মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল কে এরেস্ট করবো। একে বাইরে নেওয়া মাত্র প্রেস, মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পরবে। আমি নিজের মুখ রিভিল করতে পারি না। আমি একজন আন্ডারকভার অফিসার। যেভাবে এসেছিলাম, বের হতে হবেও সেভাবে। তোকে আগলাবো কি করে? আমার বউ তুই। এটা জানাজানি হলে, টপ নিউজ হয়ে বসে থাকবো দু’জনে। এটা ঠিক? এতোদিন লুকোচুরি করে কি লাভ তাতে! ‘
তিতির শুনলো। বুঝলো অবস্থাটা। এখন মোটেই আবেগ দেখানোর সময় নেই। তাছাড়া এত এত বন্দুকের নলের মুখ থেকে আর পালানো সম্ভবও নয় রাহাতের। ঈশানের দিকে অসহায় দৃষ্টি তাক করে, সাজিদের পিছু পিছু পা বাড়াতেই, একগাদা বন্দুকের নিশানাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে রাহাত হুমড়ি খেয়ে পরলো তিতিরের পায়ের কাছে। মেয়েটা সবেই পা জোড়া বাড়িয়েছিলো কদম ফেলতে। রাহাতের দু’হাতের বাঁধ
। বিস্ফোরিত নয়নে পিছু ফিরতেই আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা।
—’ আমার জীবনে আগে আসো নি কেনো, পরী। এই ভুল গুলো আমি করতাম না। এই পাপে জড়াতাম না। যে আমি’র গোটা টা জীবন কেটেছে মানুষের লা*শের ওপর দাঁড়িয়ে। একের পর এক মানুষের দেহ থেকে প্রাণ আলাদা করতে দু সেকেন্ড ভাবিনি। সেই আমি থমকে গিয়েছিলাম বছর ছয়েক আগে। তোমাকে মারতেই গিয়েছিলাম। সেটা অস্বীকার করার কোনো রাস্তা নেই। করবোও না আমি। কিন্তু আমার মতো পাষান একটা লোকও সেদিন নিজের নিশানা মিস করেছিলো। হুশ খুইয়ে ছিলো। স্ব-ইচ্ছায়। ‘
তিতির আতঙ্কিত লোচনে একবার তাকালো ঈশানের দিকে। ছেলেটার চোখমুখ পাথর হয়ে গিয়েছে। চেয়াল শক্ত করে কটমট করে তাকিয়ে আছে এদিকটাতেই। রাহাতের দু-হাত তিতিরের পায়ের পাতার ওপর ছোঁয়ানো। তাহমিদ খেদোক্তি ঝেড়ে উঠলো দরজার ওপাশ থেকে। দু’পাশে দুজন হাবিলদার ধরে আছে তাকে। তাদের কাঁধের ওপর ভর করে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরলো। রাহাতের মতো পুরুষকে ওমন করে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পরে থাকতে দেখে যথাপরং বিরক্ত সে। খেদোক্তি ঝেড়ে বললো,
—’ তিতির বলেছিলো, তাকে পেতে হলে বারো ঘাটের জল খাওয়া পুরুষ হতে হবে। এক্সপেরিয়েন্সড থাকা লাগবে! ননসেন্স কোথাকার। ‘
হাবিলদার দু-জনকে ইশারা করে আদেশ ছুড়লো তাহমিদ।
—’ এই চলুন তো। এই লোকটাকে দেখে আমি হতাশ। একটা সিরিয়াল কি*লারের পারসোনালিটি কেনো এতো ছ্যাচড়া হবে। আশ্চর্য। আমি কল্পনা করতাম যে সিরিয়াল কি*লার কে। তার সাথে এক কানাকড়িও মিল নেই। আরেহ্ ভাই। তুই সিরিয়াল কি’লার। তোকে ধরতে গোটা দেশ হুমড়ি খেয়ে আছে। তুই দেশ সহ ইনটারন্যাশনাল নিউজ হচ্ছিস। তুই কেনো একটা মেয়ে মানুষের জন্য হেদিয়ে মরবি! তখন বি* চ বলে গালি দিয়ে এখনো পা ধরে নিজে বেচারা সাজা হচ্ছে! ফালতু যত্তসব। ঈশান স্যার কে সন্দেহ করে তাও একটা মানসিক শান্তি পেয়েছিলাম। ভিলেন হো, তো এয়সা হো। তা না। কোথা থেকে কি এসে হাজির। চলুন, চলুন…’
রাহাতের স্পর্শ থেকে পালাতে, তিতির হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে আসে।
—’ আপনি পাগল হয়েছেন। ভালোবাসার মানে কি বোঝেন? এত কিছুর পরও…’
—’ আমি সব তোমার জন্য করেছি। পরীই। ‘
—’ আমি আপনাকে রে*পিস্ট হতে বলেছিলাম? ‘
—’ আ-আমি তোমাকে ঈশানের আগে থেকে ভালোবাসি। বলো? ছয়টা বছর। তোমার জন্য ইমতিয়াজ থেকে রাহাত হয়ে থেকেছি দিনের পর দিন। নিজের অস্তিত্ব কে ভুলতে বসেছিলাম। নিজের জীবনের কালো দিক মুছে গিয়েছিলো তোমার উপস্থিতিতে। অথচ, আবার সেই ঈশান। ওই একটা মানুষের জন্য আমার সব ধ্বংস হয় বারবার।’
বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটার মুখে। শক্ত গলায় বললো,
—’ খোদার বিচার বলে এটাকে । দিনের পর দিন, মেয়েদের সাথে অন্যায় করে যাবেন। আর আপনার কপালে খোদা সংসার রাখবে? ‘
—’ ঈশান কেনো পেলো সব। ‘
—’ প্রশ্নটা বড্ড বাচ্চাদের মতো হয়ে গেলো না? আপনি আর ঈশান এক? সম্ভব কখনো? আমার সাথে বিয়ের হিসেব বাদ দিন। তার আগের কথা ধরুন। আপনি ক্রিমি’নাল একজন।’
রাহাত তখনো বড্ড ব্যাকুল। তাহমিদের কথাই সত্য। ইয়াজ মির্জাকে এতটা অসহায় রুপে কখনো দেখা যাবে বা আদৌ সম্ভব কি-না। এটা বোধহয় কল্পনাও করেনি কেউ। গোটা কটেজ পুলিশের কবজায়। ঘরভর্তি সব আইনের লোকজন। এরাই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে দিন-রাত এক করে খোঁজ ছিলো এই ক্রিমিনালের ক্রিমিনালের কাঠিন্যের সাথে লড়াই করতে প্রস্তুত হয়েই ছিলো সব। তবে সামান্য এক রমনীর জন্য এরকম হা-হুতাশ করতে দেখবে এটা ভাবেনি। এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও, ঈশান আর স্থির হয়ে থাকতে পারলো না। ডান হাতের পিস্তল খানা রাহাতের মাথায় ঠেকিয়ে, বাঁ হাতের বন্ধনিতে আঁটকে নিলো তিতিরকে। রাহাতের কপালে পিস্তল টা চেপে, হিসহিসিয়ে বললো,
–‘ আমার বউয়ের দিকে বিড়ালের মতো সুড়সুড় করে হাত বাড়ালে, আমি বাঘের আগ্রাসী থাবা দেবো না ? পিস্তলে যে কটা গু লি আছে, তোর ম’স্তিষ্কে গেঁ’থে দেওয়ার আগে আমার বউকে, আম্মা বলে ডাক ।’
রাহাতের চোখেও অগ্নিবর্ষণ হলো যেনো। আকুলতা, ব্যাকুলতা মিলিয়ে গেলো কোথায় যেনো। ঝড়ের গতিতে উঠে মুখোমুখি হলো ঈশানের। হুংকার ছাড়লো একই কন্ঠে।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৯
—’ এতো কনফিডেন্স ভালো না, ঈশান আরশাদ দেওয়ান । একদম ভালো না। থানা অবধি নিয়ে দেখা আমাকে। আচ্ছা ধর নিলি, তারপর? ফাঁ’সি? আমি না-হয় পেলাম না তিতিরকে। কিন্তু তুই? তুই ধরে রাখতে পারবি তো? না-কি কোনো একদিন দেখবি এ সবই মরিচীকা হয়ে গিয়েছে? ‘
ঈশান বাঁকা হাসলো। পিস্তল টা আরেকটু জোরে চেপে ধরতে ধরতে বললো,
—’ মরিচীকা? তুই নিজের টা ভাব? বাস্তব জীবনে তুই কিভাবে টিকে থাকিস, সেটার চিন্তা কর আগে। ‘
