Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ ছেলের বউকে আরেক জায়গায় নিয়ে বিয়ে দেবে! মানে কি? পাগল হয়ে বসে আছো তুমি । ‘
স্ত্রী’র হতভম্ব কন্ঠস্বরেও মুখাবয়বের কোনো পরিবর্তন হলো না রাইসুল সাহেবের। বরং আরেকটু কঠিন হলো পর মূহুর্তে। ফোঁসফোঁস করছেন ভদ্রলোক। কর্কশ গলায় বললেন,
—’ দেবো । অন্য জায়গাতেই বিয়ে দেবো । তিতির আমার ছেলের বউ হয়েছে এতদিনে। তার আগে ওর পরিচয় অন্য । ও আমার মেয়ে, তারপর ছেলের বউ। ‘
—’ তিতির তোমার মেয়ে, তবে পরিচয় পালটেছে। ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে, সেই সম্পর্কের সমীকরণ এখন ভিন্ন। চাইলেই তুমি সেটা ভুলে বসতে পারো না শুধুমাত্র রাগ-জেদের বশে। ‘
—’ কোনটা রাগ-জেদ? যা হচ্ছে সব তোমার গুনধর ছেলের জেদ আর মিথ্যা কথার জন্য হচ্ছে।
মেয়েটা মৃ ত্যু সয্যায় কাতরাচ্ছে। ওর গর্ভের সন্তান, দেওয়ানদের বংশধর আমার নাতি-নাতনি…আর কমাস পর দুনিয়ার আলো দেখতো। আমার দেওয়ান বাড়ি খুশিতে ভরে উঠতো। কেনো হলো না সে-সব? কেনো সে সুখ আমাদের ঘরে ধরা দিলো না? তোমার ছেলের জন্য। তোমার ছেলের এই সংসার, বউ, সম্পর্ক – এসবের প্রতি গাফিলতির জন্য। ‘

রাহেলা ব্যাতিব্যাস্ত হয়। বড্ড অসহায় বোধ করে। উপস্থিত সকলের অবস্থাই একই। ভদ্রলোক আচমকাই রেগে গিয়েছেন অতিরিক্ত। তাকে এখন বোঝানোর সাধ্য কার! তাকে কে বোঝাবে, মৃ ত্যু সয্যায় একা তিতির নেই। ঈশানও আছে। বাচ্চাটা একা তিতিরের নয়, ঈশানও সেই সন্তানের বাবা। সুতরাং যন্ত্রনার ভাগিদার ও-উ! দু’জনেরই কেউই জানেনা এত বড় একটা সংবাদের কথা। রাহেলা স্বামীর হাত আঁকড়ে ধরলো। শান্ত হাতে বললো।
—’ ঈশানের কিছু যায় আসে না? বাচ্চা টা ওরও।’
—’ যায় আসে না। ‘
আর্তনাদ করে উঠলো রাহেলা। বিরবির করে শুধালো,
—’ বাপ হতো আমার ছেলেটা। আর তুমি বলছো কিচ্ছু যায় আসতো না! মাথা ঠিক আছে তোমার? ‘
—’ আছে। ঠিক আছে। ওর এই পেশা আমার পছন্দ ছিলো না। বিপদ সবসময় ওত পেতে থাকে। মিনিটে মিনটে শত্রু তৈরি হয়। নিজের প্রানের নিশ্চয়তা থাকে না, পরিবারের মানুষের নিরাপত্তা থাকে না। তাহলে? ওর কি একটাবারের জন্য এসবে জড়ানোর আগে আমাকে, বা আমাদেরই সবাইকে জানানো উচিত ছিলো না? ঠিক আছে আমাদের পারেনি জানাতে…তোমাকে আর মা কে জানিয়েছিলো। নিজের বউটাকে জানাতে পারতনা? ‘

—’ হয়তো ভালো কিছু ভেবেই জানায়নি।’
—’ ও আসলে তিতিরের পরোয়াই করেনি কখনো। আমারই ভুল। বিয়েতে রাজি হওয়ায়ই পাপ হয়েছে আমার। মেয়েটাকে ও কখনো মানে নি। মন থেকে মানলে, ভালোবাসলে ওর পেশার সাথে কখনো বউ-সন্তানকে গুলিয়ে ফেলতো না। আজ ওর জন্য ওর বাচ্চাটা মা*রা গেলো।’
আরেকদফা আর্তনাদ করে উঠলো রাহেলা। রিক্তা হেঁচকি তুলে কেদে ফেলে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই তাকে আটকালো নূরি, নিশি। রাহেলাই বোঝাপড়া করুক স্বামীর সাথে। রাহেলা হতভম্ব গলায় বললো,
—’ তুমি কি বলছো না বলছো একবিন্দুও ভেবে বলছো না? আশ্চর্য! সন্তানের মৃ*ত্যুর জন্য, সন্তানের বাপকে দায়ী করছো। ঈশান এটা শুনলে, সঙ্গে সঙ্গে ম*রে যাবে অপরাধবোধে। এত বড় কথা বলার আগে মুখে লাগাম টানো। আর ভালোবাসা নেই? আমার ছেলে তিতির কে ভালোবাসে না? গুরুজন তুমি। সম্পর্কে শশুর হও। এতো গুলো মানুষের সামনে বাচ্চাকাচ্চার মতো একটা বুলি আউরিয়ে গেলে। ভালোবাসার চিহ্নই আসছিলো দুনিয়াতে। আমাদের মেয়েটা, ঈশানের ভালোবাসার চিহ্নি ধারন করেছিলো ওর পেটে। দু’জন দু’জনকে কতটা ভালোবাসে, সেটা হয়তো আমরা দেখিনি, টের পাইনি। কিন্তু যেটাই হোক, তৈরি হয়েছিলো ওদের মধ্যে। ‘
দম ফেললো রাহেলা। রাইসুল দেওয়ান কপালে গুটিকয়েক ভাজ ফেলে তাকিয়েই আছেন। রাহেলা উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলো বেশ। শান্ত করলো নিজেকে। স্বামীর আরেকটা হাত আঁকড়ে মুখোমুখি হলো। ছলছল করছে চোখজোড়া। নরম গলায় বললো,

—’ ঈশানের সম্পর্কে উল্টোপাল্টা খবর গুলো যখন আমাদের কাছে আসছিলো, একটাবারের জন্যও তিতিরের মধ্যে কোনো দ্বীধা কাজ করেনি কিন্তু। একটাবারের জন্য ও ঈশানকে অবিশ্বাস করার কথা ভাবেনি। মনে আছে সেদিন গুলোর কথা? ভালোবাসা না থাকলে ওরকম কিছু অপবাদের পরও স্বামীকে বিশ্বাস করা যায় না। নামাজে পরে খোদার কাছে স্বামীর সুস্থতা কামনা করা যায়না। ‘
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো ভদ্রলোক। স্ত্রীর হাত আলগোছে ছাড়িয়ে নিয়ে পাঞ্জাবি টেনেটুনে ঠিক করতে করতে বললেন,
—’ তোমার ছেলের দিক বলো কিছু? সে কি করেছে? তার দু একটা অবদান বলো? ভালোবাসার প্রমাণ দাও? ‘
হাত দিয়ে মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করলেন তিনি। বাঁকা গলায় বললো,
—’ আমি অবুঝ নই। বয়সের ভারে থুরথুর করা বৃদ্ধও নই। ঈশান আমারও ছেলে। তবে তিতিরও আমার মেয়ে। আমার একমাত্র মৃ*ত বোনের দেওয়া আমানত। আমি কিছুতেই নিজের ছেলের জন্য তিতিরকে হারাতে পারবনা। ওর ক্ষতি করতে পারবনা। তোমার ছেলের সাথে থাকলে ও কখনো একটা সুস্থ, স্বস্তির সংসার পাবে না। আজ প্রথম বাচ্চা হারালো এত ভয়ংকর ভাবে। পরে আবার হবে। বারংবার হবে। তার দায় কে নেবে? দু’ফোটা চোখের জল ফেললেই ক্ষতি উঠে আসবে না। তার থেকেও বড় কথা…’
রাইসুল দেওয়ান উপস্থিত সকলের দিকে নজর বুলালেন। নাঈম, নিয়াজ, অমিততের দিকে বাঁকা দৃষ্টি তাক করে তেঁতো গলায় বললেন,

—’ সে নিজের পেশার প্রতি খুবই সৎ। এতটাই সৎ যে– বাবার সাথে যুদ্ধ করে ঘর ছেড়েছিলো এককালে, বাবার কঠের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, দিনের পর দিন মিথ্যা বলে চাকরিটা করে গিয়েছে। এখন তার আরও নামডাক…আর বউয়ের প্রতি ওর অনিহা! সেটাও দেখলাম। মনে হয় না– বিচ্ছেদে তারও খুব একটা আপত্তি থাকবে। ‘
—’ থাকবে না? ‘
—’ নাহ । বড়জোর কি বলবে জানো? সেই প্রথম বারের মতো। বাড়ি ছাড়বে। সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইবে। করুক। তাতেই ভালো। ‘
এতক্ষণ ভাই ভাবির কথা মাঝে কোনো হস্তক্ষেপ না করলেও। আর চুপ করে থাকতে পারলেন না রাসেদ দেওয়ান। গুটিগুটি পায়ে ভাইয়ের পাশে এসে দাড়ালেন। বিনয়ের সাথে বললেন,
—’ এখন কি এসব বলা বা ভাবার সময়, ভাইজান? আমাদের ছেলেমেয়ে গুলোর জীবন এখনও সংকটাপন্ন। যে সিদ্ধান্তঃই নাও, সেটার উপযুক্ত সময় এটা নয়। একদম নয়। তিতির মা কে সামলাতে হবে, ঈশান কেও। এত বড় এক ধাক্কা দুজনের জন্যই সমান। এখন থাকুক এসন। খোদাকে ডাকো। শোকে পাথর হয়ে, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হওয়া যাবে না। ‘

মাঝারি একটা ছিমছাম কেবিন। বাইরের কোনো ধরনের আওয়াজ ভিতরে প্রবেশের উপায় নেই মোটেই। বিশেষ মানুষদের জন্য বিশেষ ভাবেই বানানো হয়েছে এটা। রাহাতকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানটায়। কেবিনের বাইরেসহ, গোটা হাসপাতালই পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে। রাহাতের শরীরের কোনো গু*লিই সেরকম গভীর ক্ষতি করতে পারেনি। বেশ কয়েকটা গু*লি লাগলেও, সেগুলো বের করে ফেলা হয়েছে। অপারেশনও শেষ হয়েছে ঘন্টাদেড়েক এর মাঝেই। এখান থেকে সুস্থ হওয়া মাত্রই জেলে নিয়ে যাওয়া হবে ওকে। ওপরমহল থেকে এরকমই নির্দেশ। বহু তাম ঝাম করে তবেই রিপোর্টার দের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
—’ ম্যাডাম, কোনোভাবে এটা জানাজানি হলে, আমার চাকরি তো থাকবেই না। বরং আমাকেও ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হবে। বিশ্বাস করুন। আমি পারবনা এটা করতে। ‘
চোখ উল্টালো রুষা। হাতি কাঁদায় পরলে চামচিকাও লাথি মারে টাইপের ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। একটা সময় যে যে লোকগুলো, তাদের কথায় উঠবোস করতো, বলার আগেই তৈরি থাকতো কাজ করে দিতে– তারাই আজকে রঙঢঙ বেশি করছে যেনো। টাকাপয়সার লোভও যেনো হচ্ছে না এদের। নিজের হাতের টাকাট বান্ডেলটা লোকটার হাতে গুঁজে দিতে দিতে রুশা বললো,

—’ এতটাকা আগে কখনো একসাথে দেখেছেন? আজ দেখছেন। এত বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করে বোকারা৷ আপনি নিশ্চয় এতো বড় বোকা নন। ‘
পুনরায় মানা করে দিলেন হাবিলদার। ভয়ার্ত মুখে এদিকওদিক তাকালো। কেউ এসে পরলে ফেঁসে যাবে বড্ড। বাথরুমের কথা বলে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে তবেই সরেছে রাহাতের কেবিনের। লোকটা অসহায় গলায় বললো,
—’ আমি টাকা নিতে পারবনা ম্যাডাম। আপনি দয়া করে জোর করনেন না। ওপর মহল থেকে করা নিষেধাজ্ঞা আছে ওনার পরিবারের সাথে যোগাযোগ না করার। আমি আপনাকে সাহায্য করেছি এটা জানলে…’
—’ নিজের পরিবারের মায়াও কি হচ্ছে না? ‘
—’ পরিবার নিয়ে ভয় দেখাবেন না, ম্যাডাম। ‘
—’ গলার জোর বড্ড বেরেছে। ‘
—’ তা নয় ম্যাডাম। ‘
—’ ভয় পাওয়া উচিত। ভয় পান। তাছাড়া আমি তো আর বেশি সময় নেবো না। জাস্ট দেখা করবো। ওকে নিয়ে কি আমি পালাচ্ছি? ‘
লোকটা অসহায় হয়ে আছে বড্ড। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না যেনো। কাচুমাচু মুখটা রক্তশূণ্য হয়ে আছে যেনো। সাতপাঁচ ভাবলো বেশ কিছুক্ষণ। রুষা তার জবাবের অপেক্ষাতেই রয়েছে। দু’ভাইবোনকে এর আগেও বহু কাজে সাহায্য করতে হয়েছে তাকে। এদের ক্ষমতা জানা আছে তার। তাই পরিবারের কথা তোলায় ভয়ও হলো বেশ। বছ কানেক আগে, তারই এক কলিগ এদের অমান্য করায় প্রান হারিয়েছিলো নিজের। নিজেরও রিটায়ারের বয়স হয়ে এসেছে। ঘরে তিন তিনটে বিবাহ উপযুক্ত মেয়ে হয়েছে।
ঘরের ভিতরটায় মৃদু আলো। রাহাতের জ্ঞান ফিরেছে কি-না সেটা বোঝা গেলো না দরজা থেকে। রুষা নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে বেডের পাশে বসতেই শুনতে পাওয়া গেলো পুরুষালি কন্ঠস্বর। ভীষন দূর্বল ভাবে বললো,

—’ তুমি এখানে কেনো? ‘
—’ ভাইই…’
ফুঁপিয়ে উঠলো রুষা। ভাইয়ের হাতটায় হাত ছোঁয়ালো নিজের । ডান হাতের কবজিতেও ব্যান্ডেজ। একটা গু*লি ওখানেও লেগেছিলো। রাহাত নিভু নিভু চোখটা একটু গাঢ় করে খোলার চেষ্টা করলো। রুষা গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,
—’ কেনো করলে এরকম, বলোতো? কিভাবে তোমাকে বাঁচাবো আমি এখন? ‘
—’ তিতির? ‘
রুষার মুখচোখ শক্ত হয়৷ হাতের বাঁধন আলগা করে।
—’ হসপিটালে৷ ‘
—’ কেমন আছে ও? ‘
—’ খবর নিতে পারিনি। ‘
রাহাত চোখ বুঝলো। চোখের কার্নিশে গড়িয়ে পরলো লোনাজল। ব্যাথায় মুখটা নীল হয়ে আছে। শরীর অবশ। এখনো বল ফিরে পায়নি। জ্ঞান ফিরেছে খানিক আগেই। ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,

—’ আ-আমি শুট করেছি আমার পরীকে…আ-আ-আমিই। ‘
রুষা স্থির হয়ে থাকে। তার ভাইয়ের করা গু*লি যে ঈশানের গায়েও লেগেছে, এ খবরও পেয়েছে সে। তবে ভাইয়ের ওপর রাগ আসলো না এই মূহুর্তে। যদিও খবর কানে আসা মাত্র মস্তিষ্ক জ্বলে উঠেছিলো তার। তবে ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে শান্ত হয়েছে বুকটা। তিন ভাইবোনের মধ্যে রুষা মেজো। রাহাত বড় হওয়ার নিমিত্তে আজীবন আগলে রাখতো ছোট দু’জন কে। একটা সময় রাহাত ব্যাস্ত হলো ব্যবসায়, তখব রাকিনের ভার তার ওপরই ছিলো। নিজের হাতে বড় করেছিলো ছোট ভাইটাকে। হোক, তার মৃ*ত্যু ঈশানের হাতে। শুরুতে ঘৃনা করলেও, সময়ের সাথে ঘৃনা, প্রতিশোধ সব মুছে জন্ম নিয়েছে একবুক ভালোবাসা। তবে দ্বিতীয় বার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলে সামলাতে পারতনা নিজেকে। একে একে নিজের পরিবার টা উজার হতে দেখতে পারতনা সে। রাহাতের বিপি আপ ডাউন করছে টের পেতেই শান্তনা দিয়ে উঠলো রুষা। এই মূহুর্তে ছেলেটাকে বেশি হাইপার হওয়া যাবে না মোটেই। একবার সুস্থ হলে, একটা বুদ্ধি বাতলানো যাবে।

—’ তিতির সুস্থ আছে। ওটা একটা মিস্টেক ছিলো। তুমি ইচ্ছে করে গু*লি করোনি। ‘
—’ আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি আ-আমার পরীকে একদম কষ্ট দিতে চাইনি। আ-আমি এটা কি করে ফেললাম! ‘
—’ ভাই, এখন এসব নিয়ে হাহাকার করার সময় নয়। ‘
—’ তুমি এখানে কি করে এসেছো৷ চলে যাও। বাইরে পুলিশের পাহারা। সবাই মিলে একসাথে জেলে আটকা থাকতে চাও? মা’কে কে দেখবে?’
—’ মায়ের কাছে মিতু আছে।’
—’ ওই মেয়েটা কি করবে? মা’কে আগলে রাখতে পারবে? তুমি গিয়েছিলে মায়ের কাছে?’
—’ কেউ যদি মা’কে আগলাতে পারে, সেটা তুমি আর মিতুই পারে, ভাই। ‘
রাহাত চুপ করে রয়। কম আলোতেও চোখে পরে ভাইয়ের কপালের শিরা দপদপ করতে।
—’ বের হতে হবে আমাদের। ‘
—’ সে চিন্তা আমার আছে, রুষা। তুমি চলে যাও। তোমাকেও পেলে, গ্রেফতার করা হবে। ‘
—’ কি করবে তুমি? একটু সুস্থ হলেই এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হবে তোমাকে। ‘
—’ জানি।’
—’ তাহলে? ‘
—’ মা’কে নিয়ে তুমি সিঙ্গাপুর চলে যাও। এদিকটা আমি সামলে নেবো। ‘
—’ মিতুর ভিসায় একটু সমস্যা…’
রাহাত বিরক্ত হলো যেনো। কর্কশ গলায় বললো,
—’ ওর সাথে আমাদের সাধ কি! ‘
অবাক চোখে তাকালো মেয়েটা। একপলক বাইরের দিকে নজর দিয়ে চাপা গলায় বললো,
—’ মিতুর সাথে আমাদের কি! এটা প্রশ্ন করছো? ‘
—’ করছি। ‘
—’ ও প্রেগন্যান্ট। ‘
—’ তো? ‘
রাহাতের চোখেমুখে একবিন্দু অনূভুতি দেখতে পাওয়া গেলো না। রুষা আহত হলো খানিকটা। যত যাই হোক। মিতু মেয়েটার প্রতি তার মায়া আছে। সবকিছুর উর্ধ্বেও ওই মেয়ের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা জমা আছে তাদের। রাহাত রাগ বা অনীহা নিয়ে যাই বলুক না ক্যানো– তাদের মা রাণী মির্জা এক সেকেন্ডও থাকতে পারে না মেয়েটাকে ছেড়ে। এখন বিষয়টা গভীর হয়েছে আরও। মিতু অন্তঃসত্ত্বা। রাহাত মানুক বা না মানুক– মির্জাদের বংশধর রয়েছে মেয়েটার পেটে। এরকম মূহুর্তে মেয়েটাকে একা রেখে চলে যাওয়ার মানেই হয় না কোনো। অন্তত সে পারবে না। কিছুতেই না।
—’ তোমার সন্তান ওর গর্ভে। ‘
—’ মে*রে ফেলতে বলেছি। ওই ঝামেলা খতম করতে বলেছি বহু আগেই। কেনো করতে দাও নি তুমি? তোমার আশকারায় ওই বাচ্চাটাকে এখনো পেটে নিয়ে ঘুরছে ও৷ ‘
রুষা ভাইয়ের এই রুপটায় স্তম্ভিত হয় প্রতিবার। একজনের প্রতি এক আকাশ সমান ভালোবাসা, অন্য জনের প্রতি ঠিক ততটাই ঘৃনা – অনীহা। তিতিরকে গভীরে ছুঁতে পারেনি কখনো। অথচ এই মেয়েটা রাহাতের সন্তানের মা। তারপরও, না আছে এই সন্তানের প্রতি একবিন্দু টান, না আছে সন্তানের মায়ের প্রতি। রুষা টলে না মোটেই। শান্ত গলায় বলে,

—’ মা জেনে গিয়েছে মিতুর প্রেগন্যান্সির বিষয়টা। ‘
বিষ্ফরিত চোখে তাকালো রাহাত। মা জানে মানে কি! মিতুকে – রাণী মির্জা তিতির মনে করে। সেই বুঝেই এতোটা আগলে রাখে।
—’ কেনো জানিয়েছো? পাগল তোমরা? ‘
—’ আমি বা মিতু কেউ জানাইনি। মা একাই টের পেয়েছে।’
রাগে ফোঁসফোঁস করে উঠলো রাহাত। শরীরের বল থাকলে হয়তো চিরাচরিত স্বভাবমতো কিছু একটা ছুড়ে ফেলতো। যদিও, বোন আর মায়ের সমানে রাহাতের কঠিন রুপ প্রকাশ পায়না কোনোদিন।
—’ বাচ্চাটাকে আমার চাই না, রুষা। একদম চাই না। আর না তো ওই স্লা’ট কে। মে*রে ফেলো। দু্টোকেই। এতদিন মায়ের কথা ভেবে শুধু মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। তারও দরকার নেই। দুটোকেি বিদায় করো। আমার মা’কে আমি যেভাবে সম্ভব বুঝিয়ে নেবো। সাত দিনের মধ্যে দেশ ছাড়বে। ছাড়াট আগে অবশ্যই ঝামেলা টাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে যাবে। তুমি যদি না করো, আমি করবো। করবোই। সুতরাং আমার কাজটা সহজ করো। যাও…’

দিনের আলো নিভে গিয়েছে ঘন্টা চারেক হলো। রাত বাড়ছে। বাইরে তান্ডব বইছে। গোটা দিনই আবহাওয়া বিরুপ। সন্ধ্যার পর থেকেআ রও তান্ডব চলছে। খবরে দেখাচ্ছে নিম্নচাপ বয়ে যাচ্ছে সমুদ্রুপকূল দিয়ে। এই রেশ থাকবে বেশ কয়েকদিনই। দেওয়ান বাড়ির যারা যারা হাসপাতালে এসেছিলে, কেউ-ই ফিরে যায়নি। হোটেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ছেলেমেয়ে গুলোকে এখানে ফেলে কেউ-ই যেতে রাজি নয়। বহু চেষ্টা করেও তাদের একজনকেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ঈশান – তিতির কারোরই জ্ঞান ফেরেনি এখন অবধি। পাশাপাশি তিনটে ইমারজেন্সি কেবিনে রাখা হয়েছে ঈশান রাহাত আর তিতিরকে। সাজিদের জ্ঞান ফিরেছিলো। তবে ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দেখা করতে দেওয়া হয়নি কাউকে।
এ বেলা গরম কমেছে বৃষ্টির কারণে। এই এক স্বস্তি। একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছে সবাই। অনিমাকে অবশ্য একটা কেবিনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, তার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে। মেয়েটা একপ্রকার উন্মুখ হয়ে রয়েছে। যেতেই যাচ্ছিলো না। এখানেই, সাজিদের কেবিনের সামনেই বসে থাকায় বায়না জুড়েছিলে। তবে রাহেলা, রিক্তা সহ সবাই মিলে বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠানো হয়েছে । মাঝরাত, ঈশানের স্যালাইন পাল্টাতে সবেই রুমে ঢুকেছে নার্স। ঢুকতেই গোঙানোর শব্দ কানে ভেসে এলো। পেশেন্ট এর যে জ্ঞান ফিরছে টের পেতেই ছুটলো ডাক্তার কে খবর দিতে। বিরবির করে কিছু একটা বলে যাচ্ছে হয়তো। ফ্যাকাসে পাতলা ঠোঁটজোড়া নড়ছে। ডাক্তার এসে দেখে গেলেন বেশ সময় নিয়ে। পুরোপুরি জ্ঞান এখনো ফেরেনি। সকালের আগে ফিরবেও না। তবে ভয় কেটেছে স্বামী স্ত্রী দুজনেরই।

পরের দিনও আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে দেখা গেলো না বিন্দুমাত্র। গোটা রাতই থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। ঝড় ও হয়েছে কয়েকদফা। বাইরের পরিবেশ যে কি সেটা বোঝা যাচ্ছে না, হাসপাতালের ভিতর থেকে। আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা লেগে আছে। গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। ভোর পেরিয়ে, সকাল। সকাল পেরিয়ে বেলা বাড়ছে। বাইরের পরিবেশ দেখে সেটা বোঝার উপয়ান্তর নেই। ভর সন্ধ্যা বেলার মতো মনে হচ্ছে। ডাক্তার ভিজিটে এসেছেন। সাজিদের রুমে ভিজিট করে এখন ঈশানের কেবিনে। পরিবারের কাউকে এখনো অবধি এলাউ করেনি ডাক্তার। তবে জানিয়েছে তিনি অবস্থা বুঝে নিশ্চয় একবার দেখা করার সুযোগ দেবে।
—’ তিতিইর…’
ঈশানের মুখে গোটা রাতের পর, এখনই প্রথম স্পষ্ট কোনো শব্দ শুনতে পাওয়া গেলো। ডাক্তার সাহেব কান খাড়া করে ফেললেন। হার্টবিট দ্রুত হচ্ছে পেশেন্টের। খানিকটা ঝুঁকে আরেকদফা শোনার চেষ্টা করলেন। না করলেও চলতো, ঈশান বেশ স্পষ্টতই উচ্চারণ করেছে।

—’ কি বলছেন? আবার বলুন…’
ঈশান শব্দ করলো তৎক্ষনাৎ। আগের বারের থেকেও স্পষ্ট গলায় ডেকে উঠলো,
—’ তিতিইইইর…’
—’ আছে। ভালো আছে উনি। ‘
ঈশান বেশ সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে চোখ মেললো। ঘোলা লাগছে সবকিছু। নিজের শরীরের কোনো কিছুর অনূভুতি বুঝতে পারছে না। এনেস্থিসিয়ার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিলো। সেটার রেশ এখনো কাটেনি। চোখের সামনে ডাক্তার আর নার্সকে ওভাবে ঝুঁকে থাকতে দেখে, শুকনো ঢোক গিলে বললো,
—’ তিতিইর…আ-আমার বউ…’
মাথা ঝাঁকালেন ডাক্তার সাহেব। ওকে শান্তনা দিয়ে বললেন,

—’ আছে। ভালো আছে। আপনি হাইপার হবেন না। ‘
—’ কোথায় ও? ‘
—’ পাশের কেবিনে। ‘
—’ কেমন আছে? ওরও গু*লি লেগেছিলো…ও..’
ডাক্তার সাহেব ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ হাইপার হচ্ছেন আপনি। কিচ্ছু হয়নি ওনার। ঠিক আছে। ‘
—’ সত্যিই? ‘
—’ আমি ডাক্তার। আপনাকে মিথ্যা বলবো? ‘
ঈশান মুখটা কুঁচকে ফেললো। হাত-পা নাড়াতে পারছে না। টেরই পাচ্ছে না সেগুলোর অস্তিত্ব। মুখের অক্সিজেন মাস্কটা সরিয়ে কথাগুলো বলার সুযোগ দিচ্ছিলেন ডাক্তার। শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে তার। নার্স হাত বাড়িয়ে মাস্কটা পরিয়ে দেওয়ার আগেই, চোখের ইশারায় মানা করলো ছেলেটা। জিবে ঠোঁট ভিজিয়ে বিরবির গলায় বললো,
—’ আর আমার বাচ্চা? ‘
ডাক্তার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় নার্সের দিকে। ওনি নিজে তিতিরের ট্রিটমেন্ট করেছেন না। সুতরাং বাচ্চার বিষয়টা তার জানাশোনার বাহিরে।

—’ বাচ্চা? ‘
হাঁপাচ্ছে ঈশান। ভীষন সমস্যা হচ্ছে শ্বাস নিতে। কোনো মতে বললো,
—’ আ-আমার বাচ্চা… আমার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। ওরা? কেমন আছে দু’জন। ‘
নার্সও মাথা নেড়ে বোঝালো, এ বিষয়ে সে-ও কিছু জানে না।
—’ উনি সুস্থ আছে। সে হিসেবে সবই ঠিক থাকবে। আপনি হাইপার হবেন না। আমরা দেখছি।’
একপ্রকার জোর করেই মাস্ক টা পরিয়ে দেওয়া হলো ঈশানকে। ডাক্তার সাহেব সময় নিয়ে দেখে, সব ওষুধ গুলো দিয়ে দিলেন। ঈশান অনুরোধ করলো তিতিরের সাথে দেখা করানোর জন্য। নার্স খোঁজ নিতে গিয়েছে। মেয়েটার জ্ঞান ফেরেনি। এক কেবিনে নিয়ে আসা সম্ভব নয় এখনো। তবে বাচ্চাটার কথা জানাতে ডাক্তার কে সরিয়ে আনলো খানিকটা। চাপা গলায় জানালো দুঃসংবাদ টা। হত-বিহবল হলো ডাক্তার। অসহায় চোখে তাকালো ঈশানের দিকে। ছেলেটা বড্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাচ্চার খবর পেতে মরিয়া। তবে পেশেন্টের এমন অবস্থায় যে কিছুতেই বাচ্চার খবর দেওয়া সম্ভব নয়, সেটাও জানেন তিনি। এগিয়ে আসতেই, ঈশান ভাঙা ভাঙা শব্দ উচ্চারণ করে বললো,

—’ আ-আমাকে দেখা করান। ‘
—’ এটা এখন পসিবল নয়, স্যার। আপনি জানেন। আপনার ওয়াইফ ঘুমিয়ে এখনো। পরিবার এর সাথে দেখা করাতে পারি। আর ওনার ঘুমের ওষুধের ডোজ শেষ হলে, নিশ্চয় দেখা করাবো। ‘
বিরক্তির আওয়াজ করলো ছেলেটা। চোখবুঁজে নিলো।
—’ আমার পরিবার? ওরা এসেছে? ‘
—’ এসেছে। ‘
—’ আমার মা…’
—’ এসেছেন।’
—’ ডাকুন ওনাকে। ‘
রুগীকে উত্তেজিত করা যাবে না মোটেই। তবে সে চেষ্টা সফল হচ্ছে না। ঈশান হাসফাস করছে রীতিমতো। পাশের স্ক্রিনে ফলাফল খারাপের দিকে যাচ্ছে ক্রমাগত। নার্স দেরি করে না। রাহেলা কে ডেকে নিয়ে আসে মিনিট তিনেক এর মাঝেই। সবাই বাইরেই ছিলো। সকালে কোনোমতে নাস্তা করানো হয়ছে একেকজনকে জোরজবরদস্তি করে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ছেলেমেয়ে গুলোর সুস্থতাড দোয়া করে যাচ্ছিলেন। ঝড়ের গতিতে কেবিনে আসলেন তিনি। আপাদমস্তক নজর বুলিয়েই মুখে আঁচল চাপা দিলেন। এরকম ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়, সন্তানকে দেখলে কোন মার হৃদয় শান্ত থাকে! তবে ভদ্রমহিলার কঠিন ধৈর্য। ঝটপট পানি মুছে একপ্রকার হাসি হাসি মুখে কাছে এলপন ছেলেন। মিহি গলায় ডেকে উঠলেন,

—’ আব্বাআ? ‘
চোখ মেললো ঈশান। মায়ের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে শুধালো,
—’ তিতির? ‘
রাহেলার ধৈর্য শক্তিতে মুগ্ধ হলেন সয়ং ডাক্তারও। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের মা বলে কথা! এতটুকুন ধৈর্য তো থাকাই উচিত। রাহেলা ছেলেটা মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বললেন,
—’ ওউ ভালো আছে। পাশের কেবিনে রাখা হয়েছে। ভয় নেই আর। ডাক্তার বলেছেন সেটা। আমরা দেখা করতে পারলেই, তোর সাথে দেখার করার ব্যবস্থা করে দেবো। ভয় নেই আব্বা। ‘
ঈশান মরিয়া হয় আবারও। হাসফাস করতে করতে বলে ওঠে,
—’ আমার তিতির মা হতে যাচ্ছে, মা। আ-আমার সন্তান আসতে চলেছে। ওকে দেখে রেখো কিন্তু। এই অবস্থায় আমিও এরকম… ওকে একদম নজরে নজরে রাখবে, মা। ‘
বুকের বাঁ পাশে তীর বিঁধল যেনো রাহেলার। ছেলের আর্তনাদ টা বুকে গিয়ে লাগলো। ঠোঁট কামড়ে ধাতস্থ করতে চাইলো। বুক ফেটে কান্না আসছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে রয়েছে যেনো। ঈশান জানতো তিতির মা হবে! কেনো জানলো আগেই! না জানলেই তো ভালো হতো। সন্তর্পণে কয়েকদিনের জন্য হলেও লুকিয়ে রাখতে পারতো। কিন্তু এখন! কি করে এত বড় মিথ্যা বলবে সে ছেলেকে? রাহেলা ফট করে বলে ফেললো,

—’ তুই জানতিস ও মা হবে? ‘
চোখর পলক ওপর নিচ করলো ঈশান। রাহেলা ঠোঁট টিপলো। সময় নিয়ে বললো,
—’ কবে? ‘
—’ হসপিটালের রিপোর্ট… সেদিন… দেখেছিলাম আমি। ‘
রাহেলা ভয়ার্ত গলায় শুধায়,
—’ তিতিরও জানে? ‘
—’ নাহ। ‘
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো রাহেলা। ভাগ্যিস!
—’ মা? মেয়েটার বয়স কম। তার থেকেও বড় কথা খুব ধকল গিয়েছে। বাচ্চাটা ওর শরীরে বড় হবে। তোমরা…’
—’ আমরা আছি তো। তুই এতো টেনশন করছিস কেনো? ‘
—’ কারণ ও আর একা নেই। ‘
রাহেলা কি জবাব দেবে ভেবে পায়না। ছেলেকে আরও কিছুক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করে সাতপাঁচ। তবে ঈশান এই মূহুর্তে তিতিরের কাছে যেতে মরিয়া। ডাক্তার, রাহেলা দু’জনে মিলেও বুঝিয়ে উঠতে পারছে না তাকে।

—’ এতো নাটক করছো কাকে দেখানোর জন্য ? ‘
স্বামীর গম্ভীর কন্ঠস্বর কানে আসতেই চকিত তাকালো রাহেলা। রাইসুল দেওয়ান দেখলেন ছেলেকে। হু হু করে উঠলো বুকটা। ছেলের নীলাভ মুখের দিকে দৃষ্টি তাক করে পুনরায় গম্ভীর গলায় বললেন,
—’ তুমি জানতে তিতির মা হবে? ‘
রাহেলা ছেলেকে রেখে এগিয়ে আসেন স্বামীর দিকে। কবজি চেপে অনুরোধ করে কিছু কঠিন না বলতে।
—’ বাইরে চলো। খবরদার আমার ছেলেকে তুমি কিচ্ছু বলবে না এখন। ওর বাচ্চার কথাও না। ‘
ডাক্তার সাহেবও এগিয়ে এলেন। একপ্রকার আদেশই করলেন সবাইকে বাইরে যেতে। ঈশান উচ্চগলায় আরেকদফা তিতিরের কাছে যেতে বায়না করতেই বাঁধ ভাঙলো রাইসুল দেওয়ানের। চাপা গলায় হুংকার দিয়ে উঠলেন।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১

—’ আমার মেয়েটার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তাররা নিশ্চয়তা দিতে পারছে না এখনো। ওর কিছু হয়ে গেলে ভুলে যাবো, আমি তোমার জন্মদাতা। তোমার বাবা আমি। ‘
ঈশান কপাল কুঁচকে বাবার দিকে তাকাতেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক। তিতিরের অবস্থার অবনতি হয়েছে। এই মাত্র জানিয়ে গিয়েছন ডাক্তার। বাইরে ছন্নছাড়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিয়াজ আরেকদফা ব্লাড কালেক্ট করতে ছুটেছে। ডাক্তার খোদাকে ডাকতে বলেছেন। রাইসুল দেওয়ান সামলাতে পারলেন না নিজেকে। গোটা রাত ধরে যেটুকু রাগ পরে গিয়েছিলো ছেলের ওপর থেকে, সেটা তিরতির করে বাড়লো। চৌষট্টি বছরের পৌঢ় এক পুরুষ, মেয়েসম পুত্রবধূর এই করুন অবস্থা দেখে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়েছে পুরোই। একহাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে বাচ্চাদের মতো ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় অস্পষ্ট বলে উঠলেন,
—’ তোমার জন্য ওর এই হাল। খু*নি তুমি একটা। খু*ন করেছো তুমি। নিজের অংশকে… নিজের অংশ কে খু*ন করেছো। ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here