সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৮+৮৯
neelarahman
হুমায়ূন রহমান দুপুরে লাঞ্চের সময় ছেলের ক্যাবিনে বসে আছে ।ছেলের খালি কেবিনে বসে বারবার সাদাফের কথা মনে করছে ।ফজলুলের সামনে চায়না দুর্বলতা দেখাতে তাই চুপচাপ ছেলের ক্যাবিনে বসে ছিল হুমায়ুন রহমান । ফজলুর রহমান বড় ভাইয়ের ক্যাবিনে গিয়ে খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছেন কোথায় থাকতে পারে তাই উনিও চলে আসলেন সাদাফের কেবিনে।
ফজলুর রহমান কেবিনে প্রবেশ করতেই হুমায়ূণ রহমান মাথা তুলে তাকালেন ।তারপর বললেন ,”কিছু বলবি ?”
ফজলুর রহমান ভাইয়ের দিকে তাকালেন ।একদিনেই চেহারাটা মলিন হয়ে গেছে ।বললেন ,”না ভাইজান ।এখনো লাঞ্চ করেননি ?লাঞ্চ অর্ডার করেছি দুই ভাই এখানে বসে খাব।”
ফজলুর রহমান এখনো তাকিয়ে আছে হুমায়ুন রহমানের দিকে তবে হুমায়ুনুর রহমানের মাথা নিচু করে বসে আছে। হ্যাঁ না কিছুই বললো না ।ফজলুর রহমান খানিক থেমে আবার বললেন ,”ভাইজান আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হুমায়ূন রহমান ফজলুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,” না তোর উপর আমার কোন রাগ নেই ।তুই তোর জায়গায় ঠিক আছিস তবে সত্যি কথা বলতে ছেলেটার জন্য আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে ।আর তাছাড়া কখনো ওর সাথে আমি গলা চওড়া করে কথা পর্যন্ত বলিনি কিন্তু গতকাল চড় মেরেছি তারপর থেকে আমার ভালো লাগছে না কোন কিছু।
তবে সত্যি তোর উপর আমার কোন রাগ অভিমান কিছুই নেই ।মেয়ের বাবা হিসেবে তুই যা করেছিস তাই একদম ঠিক করেছিস।”
ফজলুর রহমান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”মেয়ের বাবা হয়ে না ভাইজান সাদাফের বাবা হয়ে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ।সাদাফ যা করেছে ভুল করেছে ।সাদাফ ভালো করেই জানতো আমরা আজ হোক কাল হোক ওদের বিয়ে করিয়ে দিব তাই সমাজের কথা চিন্তা করে আমাদের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করা উচিত ছিল।নূরকে ভুলভাল বুঝিয়ে একা একা বিয়ে করাটা ঠিক হয়নি ওর।
নুরকে আপনি আমার চেয়ে ভালো করে চিনেন ।সাদাফ হয়তো এমন কিছু বলেছে যার জন্য নূর আপনার আমার কথাও ভাবতে ভুলে গিয়েছে ।বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে ।কিন্তু বিয়েটা তো হয়তো দেরি হলেও হত।
আমাদের ছেলে মেয়ে আমরা নিশ্চয়ই ওদের সুখ রেখে অন্য কিছু কথা ভাবতাম না কিন্তু পরিবার-পরিজন আত্মীয়-স্বজনের কাছে সাদাফ আমার মাথাটা নিচু করে দিয়েছে ভাইজান ।সবাই মুখ তুলে বলবে আমার মেয়ে একা প্রেম করে চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে করে ফেলেছে বাবা-মাকে না জানিয়ে ।আমাদের লালন পালনের উপরে আঙুল উঠবে ভাইজান ।আমাদের ছেলে আমাদেরই মেয়ে অথচ এক বাড়িতে থেকেও আমরা ওদেরকে ভালো-মন্দ বুঝ দিতে পারিনি মানুষ এটাই বলবে।”
হুমায়ূন রহমান জানে ফজলুর এর প্রত্যেকটি কথাই সঠিক ।সেজন্যই ছোট ভাইয়ের প্রতি কোন রাগ বিদ্বেষ নেই হুমায়ূন রহমানের ।তাই বললেন ,”আচ্ছা এখন এসব কথা রাখ আসলে ক্ষুধা পেয়েছে চল খাওয়া-দাওয়া করি ।”
হুমায়ন রহমান টপিকটা বাদ দিতে চাইলেন উনার আর কিছুই ভাবতে ভালো লাগছে না ।ভাইয়ের কথাও সঠিক মনে হচ্ছে এদিকে ছেলের জন্য খুব খারাপ লাগছে।
গাড়ী চলতে চলতে একটি বিরিয়ানি দোকানের সামনে থামালো সাদাফ।নুর জিজ্ঞেস করল ,”এখানে থামালেন কেন ? লাঞ্চ করবেন ?”
সাদাফ বললো ,” না কয়েক প্যাকেট বিরানি কিনে নিয়ে যাব ফ্রেন্ডসদের জন্য।ওরা আছে সবাই ফ্ল্যাটে ।ওখানে খাবো ।তুইও খাবি চল ।”
নূর কিছু মনে করল না ।ফ্রেন্ডসদের কথা বলেছে তাই ভাবলো নতুন বাড়ি নিয়েছে তাই হয়তো ফ্রেন্ডসদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে নিয়ে গাড়ির পিছনে রেখেই ড্রাইভ করতে শুরু করল সাদাফ।নুর জিজ্ঞেস করল ,”কে কে এসেছে ?” সাদাফ বলল ,”চল গেলে দেখতে পারবি কে কে এসেছে ।”
ঠিক বিশ মিনিট ড্রাইভ করে ধানমন্ডি নিজের বাড়ির সামনে চলে আসলো সাদাফ নুর।
নুর বাড়িটিকে দেখে এক নজরে পছন্দ করে ফেলল ।বাইরেটা খুব সুন্দর ।জিজ্ঞেস করল ,”কোন ফ্লোরে ?”
সাদাফ বলল ,”টপ ফ্লোর।”
বাড়ির মালিকের একটা ফ্ল্যাট আছে ।মাঝেমধ্যে মালিক নিজে এসে থাকে আর এর থেকে নিচে পাই নি তবে লিফ্ট আছে সমস্যা নেই আয়।”
১০ তলা বিল্ডিং এর 9 তলায় থাকছে সাদাফ । লিফ্ট আছে তাই নূরের কোন টেনশন হলো না ।সাদাফ খাবারে প্যাকেট গুলো নিয়ে নূরকে বললো ,”আয় আমার সাথে ।”
নুর হেঁটে হেঁটে লিফ্ট পর্যন্ত চলে আসলো।
নূরের আজ কেমন যেন খুশি খুশি লাগছে মনের মধ্যে।
গতকাল রাত থেকেই সাদাফের সাথে কথা বলার পর সাদাফ যখন নুর কে মিসেস সাদাফ বলেছিল তখন থেকেই কেমন যেন নূরের মিসেস সাদাফ ফিলিংস চলে আসছে ।মনে হচ্ছে এটা যেন সত্যি ওর শ্বশুর বাড়ি। আজ প্রথম শ্বশুরবাড়িতে আসলো।
নুরের মুচকি মুচকি হাসি দেখে সাদাফ বললো ,”কি হলো হাসছিস কেন এভাবে একা একা ?”
নুর বললো না কিছুনা।
সাদাফ ভালো করে লক্ষ্য করলো নূরকে ।দুই পাশে দুই বেণী করা স্কুল ড্রেস পড়া কে বলবে এই ছোট্ট মেয়েটা ওর বউ ?আশেপাশে মানুষ দেখলেও তো মনে হয় নারী নির্যাতন মামলা দিয়ে দিবে শিশু আইনে মামলা হয়ে যাবে।
মনে মনে ভাবতেই হাসলো সাদাফ। কবে বড় হবে এই পিচ্চি মেয়েটা? বয়সে পিচ্চি ঠিক আছে মোটামুটি সাইজেও পিচ্চি ।চিকন চাকন শুকনা ছোটমোটো একটা মেয়ে দেখে মনে হয় না যে ১৭ রানিং। যে কেউ দেখলে বলবে সর্বোচ্চ ১৫ বছর চলছে।
নুর লিফ্ট এর চারিদিকে এদিক-ওদিক তাকানো শেষে হঠাৎ সাদাফের দিকে তাকিয়ে বলল ,”কি দেখছেন আমাকে এমন করে?”
সাদাফ মুচকি হেসে উত্তর দিল না কিছু দেখছে না ।কি করে সাদাফ বলবে নুরের সবকিছুই দেখছিল ।সাদাফ নুরের শরীর থেকে শুরু করে ওর আচার-আচরণ সবকিছু দেখছিলো।এটা বললে এখন লজ্জা পাবে মেয়েটা তাই সাদাফ চুপ করে রইল।
লিফ্ট আট তলায় এসে থামতেই লিস্ট থেকে ওরা নেমে গেল ।সামনে গিয়ে চারটা ফ্ল্যাট দেখতে পেল নুর।সাদাফ ডান দিকে ২য় টি তে কলিং বেল টিপলো ।
সাথে সাথে এসে দরজা খুলল সাবা ।নূরের চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গেল ।সাবা কেন ভিতর থেকে দরজা খুলবে ?কেন যেন নূরের নারীসত্তা এটা মেনে নিতে পারছে না?
সাবা আপু নূর এর আগে এই বাসায় আসলো এই বাসায় তো নুরের আগে আসার কথা ছিল ।সাবা আপু কেন এসে ঘর গোছাবে ? সাদা আপু কেন সাদাফ ভাইয়ের বেডরুম গুছাবে ?এটা মোটেও মেনে নিতে পারছে না নূর ।নূর চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল ।
সাবা বুঝতে পারল নুরের মানসিক অবস্থা যেহেতু সাবা ও একটি মেয়ে তাই সাদাফ কে বলল ,”ভিতরে আয় ।”
সাদাফ নুরের হাত ধরে চুপচাপ ভিতরে প্রবেশ করল ।নুর আর এদিক ওদিক তাকিয়ে ফ্ল্যাটের কোন কিছুই দেখছে না ।আশেপাশে কয়েকজন বন্ধু আছে তাও খেয়াল করলো না।সোহান এসে নূরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল ,”হায় নুর আমি সোহান ।সাদাফের সাথে আমেরিকা ছিলাম ।”
নুর উপরের দিকে তাকিয়ে সোহানকে হাই বললে সোহান নুরের দিকে তাকালো।নুর কে কেমন যেন অন্য মনস্ক মনে হল সোহানের কাছে।
সোহান সাদাফের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে ?সাদাফ নুরের দিকে খেয়াল করল ।আসলে নূরের মনটা কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগছে ।কি হতে পারে? একটু আগেও তো সব ঠিক ছিলো।হঠাৎ করে খেয়াল আসলো ও কি সাবাকে দেখে কোন ভাবে মাইন্ড করেছে বা মন খারাপ করেছে?
সাদাফ মনে মনে ভাবল আর লুকোচুরি নয় আজ সত্যি কথা সব বলে দিবে তাই সাবার হাতে বিরিয়ানি প্যাকেট গুলো দিয়ে নুর কে নিয়ে চলে গেল রুম দেখানোর জন্য ।আসলে কথা বলতে চাচ্ছে তাই সবার সামনে থেকে নুরকে ভিতরে নিয়ে চলে গেল।
রুমের ভিতর যেয়ে রুমের দরজা চাপিয়ে সাদাফ নুরের দিকে তাকিয়ে বলল ,”কি হয়েছে মন খারাপ ?কিছু হয়েছে আমাকে বল?”
নুরের ভীষণ রাগ উঠেছে তাই আজ আর নিজেকে কন্ট্রোল না করে সাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে ফেলল ,” সাবা আপু এখানে কেনো?আমার আগে এই বাসায় কি করে?”
নূরের প্রশ্নে সাদাব অবাক হয়ে গেল ।নূর প্রশ্ন করছে ?সাদাফ বলল ,”নতুন বাড়ি গুছিয়ে দেওয়ার জন্য এসেছে ।সব ফ্রেন্ডসরা যেমন এসেছে ও সেভাবে এসেছে ।কিন্তু তোর কি হয়েছে তুই এমন করছিস কেন?”
নুর বলল ,”ঘর গোছানোর জন্য মানুষ প্রয়োজন হলে আমাকে বলতে পারতেন রিমা আপুকে বলতে পারতেন সাইমন ভাইয়া ও তো ছিল ।আমরা করে দিতে পারতাম ।সাবা আপুকে কেন আসতে হবে?”
সাদাফ বুঝতে পারছে কোথাও কিছু একটা ভুল অবশ্যই হয়েছে সাদাফের ।সাদাফ নুরের দিকে তাকিয়ে বলল ,”আমার দিকে তাকা নুর। আমি আসলে এত কিছু ভেবে ওদেরকে বলিনি ওরা সবাই আমার ফ্রেন্ডস তাই ওদেরকে বলেছিলাম ঘর গুছিয়ে দিতে ।তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম সবকিছু গোছানোর পর।”
নূর সাদাফের দিকে তাকিয়ে বলল ,”এটাও কি সারপ্রাইজ হতো না আপনি আমাকে গোছানোর জন্য ডাকতেন ?আমার স্বামীর ঘর আমি গুছিয়ে দিতাম?”
নূরের মুখ থেকে স্বামী কথাটি শুনে সাদাফ অবাক হয়ে গেল ।আসলে এই কথাটি তো মাথায় আসেনি সাদাফের ।নূরের সংসার নূরকে দিয়ে তো গোছানো যেত !
কিন্তু সাদাফ তো সবসময় নুরকে ছোট মনে করে ভেবেছো কিছু করতে পারবে না আর বন্ধুরা যেহেতু যেচে বলেছে আমরা গুছিয়ে দিব তাই সাদাফ না করেনি।
সাদাফ বুঝতে পারছে না এখন নূরকে কি বলবে ?নূরের কথাও যুক্তি আছে ।এই দিক দিয়ে ভেবে দেখেনি সাদাফ। যেহেতু সাদাফ বলেছিল সাবাও ওকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চায় স্বাভাবিক নূরের জেলাস ফিল হবেই ।বাড়িতে ঢুকে যদি সাবা কে গেট খুলতে দেখে স্বাভাবিক রিয়েকট করবেই ।নুরের জায়গায় সাদাফ থাকলে ভয়ঙ্কর কিছু করে ফেলতো।
নওরিন আফরোজ এবং সামিহা বেগম ছেলেমেয়েদের খাইয়ে রান্নাঘরে দুজন কাজ করছে ।নওরিন আফরোজ এর মনটা ভীষণ খারাপ সামিহা বেগম দেখলেন খেয়াল করলেন কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন ,”ভাবি মন খারাপ করো না।
দেখো আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে ।ছেলেমেয়েগুলোকে আল্লাহ এক করে দিয়েছে ভুলে করুক আর সঠিক করুক আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম ।এটলিস্ট তুমি আর আর আমি তো চেয়েছিলাম ।কিভাবে ছেলে মেয়ের সংসারটাকে ভালো করা যায় এখন সেটা ভাবতে হবে মন খারাপ করে বসে থাকার সময় না ভাবি।”
নওরিন আফরোজ বললেন ,”নারে ছেলেটার জন্য আসলে খারাপ লাগছে সে ছয়টা বছর তো বাহিরে থেকে এল আর কয়টা দিনই বা হয়েছিল এসেছে বল ?এখন আবার বাহিরে চলে গেল তবে ফজলুরকে আমি দোষ দেই না ছেলেটা না বলে বিয়ে করে ভুল করেছে।
ফজলুরের কথায়ও যুক্তি আছে ।নুরের ১৮ বছর হয়নি আর তাছাড়া একই বাড়িতে থাকে একা একা বিয়ে করা মানে বাপ চাচা কাউকে সম্মান না দিয়ে নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটিয়েছে ।যার জন্য একা একা বিয়ে হয়ে গেছে । মানুষ আত্মীয় স্বজন রাত কানাঘুষা করবে।অথচ আমরা যদি অনুষ্ঠান করে বিয়ে করাতাম তাহলে কেউ ১০ কথা বলতে পারতো না ।মেয়ের বাবা তো বুঝতে পারি মেয়ের সম্মানের কথা চিন্তা করেই উনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আমিতো ভাবছি তোর ভাইয়ের কথা গতকাল রাতে তো প্রায় অনেক জ্বর এসেছিল সারা রাত একটু সেবা যত্ন করার পর ঘুমানোর পর ঠিক হয়েছে ।তুই তো জানিস সারা বাড়ির মধ্যে ছেলেটা সবচাইতে বেশি সখ্যতা উনার সাথে ।এমন কোন কথা নাই যে বাবার সাথে শেয়ার করে না ।সেই ছেলের গায়ে হাত তুলেছে উনি সহ্য করতে পারছেন না ।যে ছেলের সাথে রাগ করে কথা বলতে পারে না সেই ছেলের গায়ে হাত তুলেছে তা মানতে পারছে না।
নওরিন আফরোজ একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আচ্ছা নুরের কি অবস্থা? ওকি একটু নরমাল হয়েছে ?স্কুল থেকে তো শুনলাম সাদাফ বাইরে নিয়ে যাবে ।এ কথা যেন আবার কেউ না জানে।
টেনশন থেকে বের হয়ে ছেলেমেয়ে দুইটা একটু ঘুরাঘুরি করুক জীবনটা ইনজয় করুক ।টেনশন করার জন্য আমরা আছি কি বলিস?”
সামিহা বেগম বললেন ,”তা আর বলতে টেনশন দেওয়ার জন্যই তো মেয়েটা তবে আমার এখন টেনশন শেষ ভাবি কি বলবো আমি যে কি খুশি মেয়েটা আমার এখন চোখের সামনে থাকবে আর দশটা ভুল করলেও আমি দশটা কথা বললেও তোমরা একটা কথা বলবে না সেটা আমি জানি ।যে যাই বলুক আমি কিন্তু ভীষণ খুশি সাদাফকে মেয়ের জামাই হিসেবে পেয়ে ।আমি তো ওকে আগে থেকে জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম।
উনিও কয়দিন পর মেনে যাবে উনি সাদাফকে অনেক ভালোবাসে ।শুধু একটু রাগ করেছে রাগ কন্ট্রোল করতে পারেনি ।দেখবে সুর সুর করে নিজে সবার আগে গিয়ে সাদাফ কে নিয়ে আসবে।”
এদিকে ছাদে বসে কথা বলছে রিমা ও সাইমন ।হঠাৎ রিমা বলল ,”আচ্ছা সাদাফ ভাইয়া এখন কি করছে ?কেমন আছে নুর আছে সাথে তাই না ?কি ভীষণ মজা বিয়ের পর প্রথম দিন বাইরে ঘুরতে গিয়েছে।”
সায়মন বলল ,” নুর তো এই প্রথম বিয়ের পর সাদাফ ভাইয়ের সাথে একা কোথাও গেল তোর তো আমাকে শুকরিয়া আদায় করা দরকার । উঠতে বসতে ধন্যবাদ দেওয়া দরকার ।তোকে আমি কতগুলো টাকা খরচ করে ঘুরিয়ে আনলাম।”
রিমা বলল ,”কতগুলো টাকা মানে ?মাত্র চার পাঁচ হাজার ।আর তার মধ্যে আমার আর আমার ভাইয়ের টাকা সব।”
সাইমন বললো,” এইতো শুরু হয়ে গেলো খোটা। টাকাটা ভাইয়া আমাকে দিয়েছে তার মানে এটা আমার ছিল ।তোর পিছনে খরচ করার জন্য দেয়নি ।এজন্যই বলে মেয়েদের পিছনে দুই হাত ভরে খরচ করলেও লাভ নেই এরা নিমক হারাম জাতি।আর মাত্র চার পাঁচ হাজার টাকা ?তোর কিপটা বাপেরা তো আমাকে চার পাঁচ হাজার টাকা মাসে দেয় না ।হাত পাততে হয় তোর ভাইয়ের কাছে।
আর এখন লজ্জার কথা কি বলবো ?তোর ভাইয়ের তো সমন্দি হয়ে গেলাম ।আমি এখন কিভাবে হাত পাতবো ?বলা যাবে ভাইয়া আমাকে তিন হাজার চার হাজার টাকা দেন ?ছোট বোনের জামাই বলে কথা!”
রিমা সায়মনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ।না এই ব*লদের কিছু হবে না ।অনেকক্ষণ রিমা কে চুপচাপ থাকতে দেখে সাইমন বললো ,”কি হয়েছে কি নিয়ে টেনশন করছিস?”
রিমা বলল ,”আচ্ছা আমাদের কি ব্রেকআপ করে ফেলা উচিত? দেখনা ভাইয়াকে তোমার আব্বু বের করে দিল তোমাকেও তাহলে আমার আব্বু বের করে দিবে ।দুজনই যদি বাড়ির বাহিরে থাকো তাহলে আমরা কি করব ?”
সাইমন রিমার দিকে তাকিয়ে বলল ,”কি আর করবি ডিসকো ডান্স করবি। আসলে মুরুব্বীরা যা বলে তা ঠিক বলে ছেলেদের অধঃপতনের পিছনে মেয়েদের হাত থাকে।
আর আমাদের দুই ভাইয়ের তো শুধু হাত না হাত পা মাথা পুরা শরীরই আছে।”
সাদাফ নুরের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে ।তারপর নীরবতা ভেঙে বললো,”আই এম সরি নূর ।কথাটা বুঝার চেষ্টা কর ।আমি এত কিছু বুঝিনি ভেবেছিলাম তোকে সারপ্রাইজ দিব ।”নূরের চোখ ছলছল যেকোনো মুহূর্তে পানি ঝরে পড়বে ।হঠাৎ এমন সময় দরজা নক করলো সাবা।
নূর তাকাল দরজার দিকে ।তাকিয়ে দেখল সাবা আপু।সাথে সাথে নূর চোখে পানি আড়াল করার চেষ্টা করল ।মাথা নিচু করে ফেলল ।সাদাফের দিকে তাকিয়ে সাবা বললো,” সাদাফ তুই বাইরে যা আমি একটু নুরের সাথে কথা বলব ।”
সাদাফ বলল ,”কিন্তু সাবা……..
সাবা বলল ,”জা না সাদাফ যা করার তুই করেছিস এখন বাকিটা আমাকে দেখতে দে।”
নুর অবাক হয়ে গেল ।ভাবলো কি কথা বলবে সাবা আপু নূরের সাথে ?সাবা আপু কি সব কথা শুনে ফেলেছে ?লজ্জায় তাকাতে পারছে না নূর উপরে।
সাদাফ বাইরে চলে গেল ।যাওয়ার আগে একবার নূরের দিকে তাকালো ।খুব খারাপ লাগছে সাদাফের ।সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল খুশি করতে চেয়েছিল উল্টো মেয়েটাকে দুঃখী করে ফেলল ।
যাওয়ার সময় দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে সোহানদের সাথে সোফায় গিয়ে বসে পড়লো সাদাফ।
সাবা নুরের দিকে তাকিয়ে নূরের থুতনি ধরে মুখটা উপরে তুলে বললো,”তুমি জানো তুমি আমার থেকে কত বছরের ছোট?”
নুর অবাক হয়ে তাকালো সাবার দিকে ।সাবা নূরের চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,”তুমি আমার থেকে গুনে গুনে দশ বছরের ছোট।”
নুর বুঝতে পারছে না সাবা আপু কি বলবে তাই জানার জন্য তাকিয়ে রইল সাবা আপুর দিকে ।সাবা বললো,” তুমি জানো সাদাফ তোমাকে কখন থেকে ভালবাসে ?”
নুর অবাক হয়ে গেল ।সাবা আপু জানে সাদাফ ভাই নুরকে ভালোবাসে ?নুর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপচাপ চেয়ে রইল কিন্তু চোখ যেন বলছে নূর জানতে চায় ।
সাবা বলতে শুরু করলো।,”যেদিন থেকে তোমার জন্ম হয়েছে তোমাকে প্রথম কোলে নিয়েছে বিশ্বাস করবে না সাদাফ তোমাকে সেদিন থেকে ভালোবাসে ।আর এ কথা আমরা প্রত্যেকটা মানুষ জানি প্রত্যেকটা বন্ধু জানি।
সাদাফ তোমাকে কোলে নিয়ে যখন স্কুলে আসতো তখন থেকে জানি।সাদাফ তোমার ধরে যখন কলেজে আসত তখন থেকে জানি ।যখন সাদাফ বিদেশ চলে যায় আমরা তখন থেকে জানি।
সাদাফের ভালোবাসার সাদাফের তোমার জন্য কষ্ট পাওয়ার সাদাফের বিরহের সবকিছু প্রত্যেকটা বিরহের সাক্ষী আমরা।সাদাফের সারাজীবনের অপেক্ষা তুমি।
সাদাফের বয়স ২৭ প্রায় শেষের দিকে আর তোমার ১৭ রানিং ।বুঝতে পারছ সাদাফ তোমাকে ১৭ বছর ধরে ভালবাসে আর আমরা ১৭ বছর ধরেই জানি ও তোমাকে ভালোবাসে।
আর বোকা মেয়ে সাদাফ বললো আমরা একটু দুষ্টুমি করলাম আর তুমি মেনে নিলে ?আমার বয়স কত তাহলে ?আমার বয়স ২৭ বছর তোমার কি মনে হয় এখন আমার বিয়ে হয়নি ?আমি সাদাফের জন্য অপেক্ষা করেছি ?আর সাদাফ আর আমার যদি সম্পর্ক থাকতো তাহলে কি সাদাফ ছয় বছর বিদেশে থাকতো আমাকে ফেলে?”
নুর হঠাৎ বললো,” তাহলে আপনি যে বললেন সাদাফ ভাই আপনাকে ভালোবাসে আপনাকে প্রপোজ করেছিল?”
সাবা মুচকি হাসলো নূরের বাচ্চামো দেখে ।১০ বছরে ছোট একটা মেয়েকে ভালোবাসা বুঝাচ্ছে ।সাবা নিজের উপরে হাসলো ।তারপর বললো,” ওগুলো সাদাফ তোমাকে ভালোবাসা বুঝানোর জন্য করেছে ।সাদাফের উপর তোমার যে অধিকার সেটা বুঝে নেওয়ার জন্য করেছে ।তুমি যে সাদাফ কে ভালোবাসো সেটা তোমাকে অনুধাবন করানোর জন্য বলেছে। সহজ ভাষায় ও তোমাকে জেলাস ফিল করাতে চেয়েছে ।আর দেখো না কাজ হয়েছে ।সেদিন থেকে তুমি জ্ব*লে পু*ড়ে ম*রছো সাদাফের জন্য ।তার আগে হয়তো তুমি এতো বুঝতেও পারোনি সাদাফ যে তোমাকে এত ভালোবাসে। তুমি যে সাদাফকে এত ভালোবাসো সেটাই কি তুমি বুঝতে পেরেছিলে ?যেদিন তুমি জানলে আমার সাথে সাদাফের সম্পর্ক সেদিন থেকে তোমার ভিতরে সাদাফের জন্য ভালোবাসা অনুভূতি তুমি বুঝতে পেরেছ।
আর সেই অনুভূতি বোঝানোর জন্যই সাদাফ মিথ্যে নাটকটুকু করেছিল ।এরপর ঘটনা ক্রমে সত্য কথাটা তোমাকে আর বলা হয়নি ।আর For your kind information madam আমার বিয়ে হয়ে গেছে তাই আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৬+৮৭
এবার আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না নুর।এবার যেন খুশির কান্না ছুটলো।দুখের কান্না আটকে রাখতে পারলেও খুশির কান্না আটকে রাখতে পারল না নুর।ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিল নুর ।বাইরে থেকে হঠাৎ সাদাফের কানে আসলো নূরের কান্নার শব্দ ।সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেল সাদাফ।
