সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৫২+১৫৩
neelarahman
সাদাফ কে স্টেজে বসানো হলো। নূর পাশাপাশি বসে আছে ।সাদাফের চোখ শুধু নূরের দিকে নিবদ্ধ ।চোখ যেন সরাতে পারছে না ও ।ছোট্ট পরীটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে কিভাবে পরী টা দিন দিন বড় হয়ে গেল !ভাবতে পারছে না সাদাফ পরীটা আজ ওর অর্ধাঙ্গিনী সকলের সামনে ।সাদাফ যা চুপে চুপে জানত মনে মনে মানতো তা আজ সকলের সামনে স্বীকৃত।
নুর হঠাৎ মাথা তুলে তাকালো সাদাফের দিকে । দেখলো সাদাফ এক দৃষ্টিতে এখনো নূরের দিকে তাকিয়ে আছে ।নুর লজ্জা পাচ্ছে ।চোখ দিয়ে ইশারা করল ।জানতে চাইলো কি ?
সাদাফ বললো ,”কিছু না ।”
কিন্তু তারপরও তাকিয়ে রইল।
নুর ধীরে ধীরে বললো,” সবাই দেখছে চোখ সরান ।”
সাদাফ বললো,” দেখুক ।আমার তাতে কিছু যায় আসে না।”
নুর জানে সাদাফ ভাইকে কোন কিছু বলে লাভ নেই উনার যা ইচ্ছা তাই করবে ।তাই নুর নিজে মাথা নিচু করে ফেলল ।একে একে সবাই এসে হলুদ দিতে লাগলো নূর ও সাদাফ কে।
একে একে সবার হলুদ দেওয়া শেষ হয়ে গেলে শুরু হল ডান্স প্রোগ্রাম ।রিমা নূর সাদাব সাইমন সবার বন্ধু প্রায় একসাথে ফ্লোর যেন মাতিয়ে রাখল ।প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলল এই ফাংশন ।সাবা চুপচাপ বসে আছে হাজবেন্ডের সাথে ।আজকে সাবা ডান্স করবে না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সোহান এসে বললো,” কিরে তুই এত ভদ্র বেশ ধরে এখানে বসে আছিস ?দুলাভাইকে দেখে ভয় পাচ্ছিস বুঝি।”
সাবা বললো,” মোটেও না ।তোর দুলাভাই এমন না ।এমনি ডান্স করছি না আজকে ভালো লাগছে না তাই।”
সাবার হাসবেন্ড নাম হিমেল । বললো,” যাওনা ডান্স করো। সমস্যা নেই ।আচ্ছা চলো আমিও যাচ্ছি ।বন্ধুদের বিয়ে জীবনে একবার ই আসে বার বার আসবে না ।”
বলেই হিমেল সাবার হাত ধরে স্টেজে নিয়ে গেল।
সাদাফ আর নূর বসে রইল ।সোহান এলো সাদাফ এর কাছে । বললো,” তুই বসে থাকলে তো হবে না ।বর কনেকে অবশ্যই ডান্স করতে হবে ।”
বলেই নূর আর সাদাফের হাত দুই হাত দিয়ে ধরে ওদেরকে স্টেজে নিয়ে আসলো ।এসে বললো,” সবাই চুপচাপ দাঁড়াও এখন সাদাফ আর নুর তাপস ডান্স করবে।”
সাদাফ বললো তোদের মত এত উরাধুরা ডান্স আমি করতে পারি না ।নূরের দিকে তাকালো সাদাফ । বললো,” সফ্ট মিফজিকে ডান্স করি কেমন হবে?”
নুর লজ্জা পেল ।নুর তেমন কখনো ডান্স করেনি ।সাদাফ নুরের হাত ধরে মিউজিক বয়দের বললো,” সফট একটি মিউজিক প্লে করার জন্য।”
সবাই গোল করে ঘিরে আছে সাদাফ ও নুর কে।স্টেজের স্পটলাইট এখন নূর ও সাদাফের উপরে।
মিউজিক প্লে করা হলো____
তুমি হো পাস মেরে সাথ মেরে
হো তুম ইউ
জিতনা মেহসুস কারু ইনকো
উতনা হি পা ভি লু……….
নূরকে নিয়ে খুব ধীরে ধীরে হালকা একটু ডান্স করল সাদাফ।যতটুকু না করলেই নয় ।নুর লজ্জা পাচ্ছে ভিষন।মিউজিক শেষ হতেই সবাই করতালি দিয়ে ওদেরকে অভিনন্দন জানালো।
ছাদে এখন মুরুব্বীরা কেউ নেই ।সাদাফ নুরের দিকে তাকিয়ে দেখলো নুর লজ্জা পাচ্ছে।তাই সাদাফ জড়িয়ে ধরল নূরকে ।নূর লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে সাদাফের বুকে এ কপাল ঠিকিয়ে রইল।
সাইমন একটু দূরে সরে গেল ।শত হলেও ছোট বোন তাই আর এখানে দাঁড়ালো না ।রিমা দেখলো সাইমন কোথায় যেন যাচ্ছে তাই রিমা ও পিছন পিছন গেল।
কিছু দূর যেতে সায়মন দাঁড়িয়ে গেল ।পিছনে না ঘুরেই বললো ,”আমি জানতাম তুই ঠিকই আমার পিছনে আসবি।”
বলেই পেছনে তাকালো সাইমন ।দেখলো রিমা দাঁড়িয়ে আছে ।এখন ছাদের এই পাশটায় মোটামুটি অন্ধকার আশেপাশে কেউ নেই ।সায়মন এসে রিমার হাত ধরল ।ধরে বললো,”ঐখানে নূর আর সাদাফ ভাইয়া ছিল ।সাদাফ ভাই আমার বড় হলেও নূর আমার ছোট বোন তাই চলে এলাম।”
রিমা বললো,”জানি ।”
সাইমন রিমার হাত ধরে ছাদের রেলিং এর কাছে নিয়ে দাঁড়ালো ।দাঁড়িয়ে বললো,” দেখতে দেখতে সময় কত এগিয়ে গিয়েছে তাই না ?আর একটা বছর !একটা বছর পর বর আম্মু বলেছে তোর হাত আমার হাতে ধুমধাম করে এভাবে তুলে দিবে।”
কথাগুলো বলেই তাকাল রিমার দিকে ।রিমার লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে।
সাইমন ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে এলো রিমার কাছে ।দুই হাতে আজলে রিমার মুখ টি তুলে বললো ,”আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি রিমা ।একটি বছর কষ্ট করে আমার জন্য অপেক্ষা কর ।একটি বছর পর আমাদের সুন্দর এরকম একটি হলুদ সন্ধ্যা হবে ।আমাদের বিয়ে হবে বাসর হবে ।”
কথাটি বলার সাথে সাথে রিমা চোখ তুলে তাকানো সাইমনের দিকে।
সাইমন মুচকি হাসলো ।হেসে বললো,” এভাবে দেখার কি আছে ?বিয়ে হয়েছে বাসর হবে না ?দেখ না আমি কত সহ্য করছি !তোর আমার বিয়ে তো সেই কবে হয়ে গেছে ।কেউ না জানুক আমি তো জানি তুই আমার বউ। এটলিস্ট আমি অন্তত এটাই মানি তুই আমার বউ।”
রিমা বললো,” আমিও মানি।”
সায়মন বললো,” একটা চু*মু খাই প্লিজ হালকা করে?”
রিমা চোখ বন্ধ করে ফেললো।সখের পুরুষের এমন করুন আবদার কোন নারী যে ফেলতে পারেনা ।রিমা পারলো না ।সাইমন ধীরে ধীরে রিমার ঠোঁটে ছোট্ট করে হালকা একটু পরশ এঁকে দিলো ভালোবাসার।
রিমা চোখ বন্ধ করে ফেলল ।সাইমন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল রিমার দিকে।
রাতের মত গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম প্রায় বারোটা পর্যন্ত চলল ।সবাই যার যার মত নিচে গিয়ে রেস্ট করতে লাগলো ।আজ সাদাফ এবং নুর এক রুমে থাকা নিষেধ ।সাদাফের বন্ধুরা ঠিক করে দিল । বললো কাল যেহেতু বিয়ে আজ আর এক রুমে থাকা ঠিক হবে না ।সাদাফ না চাইলেও বন্ধুতে কথা মানতে হলো আর তাছাড়া সাদাফের রুমে আজ বন্ধুরা মিলে আড্ডা করবে তাই এমনিও সাদাফ চাইলেও যেতে পারবে না।
পরদিন সকাল ৯ টা সবাই ড্রইংরুমে উপরে নিচে যে যেভাবে পারছে নাস্তা করছে ।সাদাফ বন্ধুদের সাথে বসেছে এমন সময় দরজা নক করা শব্দ হলো।
ফজলুর রহমান বাড়িতে নেই তারা বাহিরে গিয়েছে সামিহা বেগম ও নওরিন আফরোজ রান্নাঘরে কাজ করছে ।বাকি বাচ্চাকাচ্চারা সবাই নাস্তা করছিল হাসি ঠাট্টা আনন্দ করছিল।
দরজা নক করার শব্দ হতেই নূর দরজার কাছাকাছি থাকায় নূর দরজা খুলে দেখলো সুন্দরী একটি মেয়ে দাড়িয়ে আছে।পোশাক বেশভূষা দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশি হলেও বাংলাদেশে হয়তো থাকে না।
নূরের বুকের ভিতরটা কেমন যেন খচ করে উঠলো ।নুর আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,” কাকে চাইছেন ?”
আগন্তুকটি বললো,” এটা কি সাদাফদের বাড়ি ?সাদাফের সাথে একটু কথা বলার প্রয়োজন ছিল ।”
নূরের যেন আর বুঝতে বাকি নেই ।তারপরও সন্দেহ দূর করার জন্য বললো,” আমাকে বলুন আর আপনার নাম কি?”
দীর্ঘ সময় দরজার কাছে নুরকে দাঁড়ানো থাকতে দেখে সাদাফ উঠে একটু দূর সামনে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো,” দরজায় কে নূর ?কার সাথে কথা বলছিস ?”
সাদাফের কথা শুনেই নূর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো ।সাথে সাথে আগুন্তক টি ও সাদাবকে দেখল ।দেখে এক দৌড়ে সাদাফের কাছে চলে গিয়ে সাদাফকে জড়িয়ে ধরল।
মুহূর্তের মধ্যে এমন ঘটনায় বোকা হয়ে গেল নুর সাথে সাদাফ যেন আকাশ থেকে পড়ল ।
রুমের সবাই হা হয়ে তাকিয়ে রইলো।সোহান সাবার কাছে গিয়ে বললো,” আধ শেষ তোর বন্ধু।”
সাবা বললো,” এই মেয়ে ঠিকানা পেলো কোথায়?”
কি হলো ব্যাপারটা সাদাফ বুঝে উঠতে পারলো না। সাথে সাথে দুই হাত উপরে তুলে নূরের দিকে তাকিয়ে রইল।
নূর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাদাফের দিকে ।সাদাফ কি বলবে বা কি করবে কোন কিছু যেন বুঝে উঠতে পারছে না ।ও চোখ দুটো শুধুমাত্র নূরের দিকে ।সাদাফ কিছুক্ষণ পর রিহার উদ্দেশ্যে বললো,” কি করছো রিহা ছাড়ো বলছি কেন তুমি আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলে ছাড় বলছি।”
রিহা জড়িয়ে ধরে থাকা অবস্থায় বললো,” আই ওয়াজ মিসিং ইউ ।খুব মনে পড়ছিল তাই চলে এসেছি ।”
সাদাফ বললো,” রিহা প্লিজ লিভ মি ছাড়ো বলছি।”
নুর এখনো তাকিয়ে আছে সাদাফের দিকে ।সাদাফ মেয়েদের সাথে বেয়াদবি বা উচ্চস্বরে কথা বলতে খুব একটা পছন্দ করেনা তারপরও রিহাকে জোর করে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বললো,”কি সমস্যা তোমার ?রিহা তুমি এখানে এসে এভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছো কেন ?আর তোমার মধ্যে আমার কি সম্পর্ক যে মিস করবে ?সরাসরি বাংলাদেশের এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে?”
বলেই সাথে সাথে তাকালো নুরের দিকে ।নূর ধুপ ধাপ পা ফেলে সাদাফকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে এমন সময় সাদাফ বললো,”নূর সো*না প্লিজ আমার কথা শোন ।”
নুর বললো,” ঘরে নিয়ে ডলাডলি করুন এখানে অনেক মানুষ দেখছি।”
সাদাফ তাকালো রিহার দিকে। বিরক্তির চরমসীমায় পৌঁছে গিয়েছে সাদাফ।এই মেয়ের সাথে তো কখনো এই ধরনের সম্পর্ক ছিল না ! কেন আজ এমন একটি ঘটনা ঘটালো তাও নূরের সামনে ।তারপরও সাদাফ নুরের পিছনে যেতে যেতে বললো,” আমার কথাটা একটু শোন নুর প্লিজ।”
নুর ঘাড় ঘুরিয়ে বললো ,”খবরদার আমার পিছনে আসবেন না ।আমি না করে দিচ্ছি ।ওই রিহাকে রুমে নিয়ে যান ।রুমে নিয়ে গিয়ে ডলাডলি করুন ।আমার পিছনে আসার কোন প্রয়োজন নেই ।”
বলেই দৌড়ে গিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল নুর।
সাদাফ অসহায়ের মতো দাড়িয়ে রইলো।
সাদাফ সাথে সাথে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,”দরজা খোল সো*না পাখি ।লক্ষী আমার কথাটা শোন ।প্লিজ দরজা খোল নূর ?দরজা খোল।”
নিচে থেকেই তাকিয়ে আছে রিহা ।রিহা অবাক হয়ে যাচ্ছে সাদাফ কেন একটি মেয়ের জন্য এতটা পা*গল হয়ে যাচ্ছে।
রিহা আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো। পুরো বাড়ি বিয়ের আমেজে সাজানো ।যেন কারো বিয়ে হচ্ছে ।রিহা এখনো জানে না যে সাদাফের বিয়ে হচ্ছে যদিও সাদাফের সাথে রিহার কোন সম্পর্ক নেই ।একটি বছর রিহার সাথে কখনো দেখা হয়নি সাদাফের ।সেদিনের ঘটনার পর থেকে কখনোই দেখা হয়নি কিন্তু রিহা যেন আর তর সইছিল না ।ভেবেছে রিহা এখানে এসে পরিবারের সাথে মিশলে হয়তো রিহাকে মেনে নেবে সাদাফ।
যেহেতু ভালবাসি বলে কোন সম্পর্ক করতে পারেনি তাই পারিবারিকভাবেই বিয়ের জন্য এগোতে চেয়েছিল রিহা কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে ভুল করে ফেলেছে ।অনেক দেরি হয়ে গেছে হয়তো এটি সেই মেয়ে যার জন্য সাদাফ ওকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
রিহা তাকিয়ে রইল উপরে ।সাদাফ দরজা নক করছে ।বলছে ,”নুর প্লিজ দরজাটা খোল ।কথা শোন আমার ।লক্ষ্মী পাখি আমার ।দরজা খোল ।”
নুর বললো,” খবরদার আমার নাম আপনার মুখে নিবেন না ।যান ওই রিহাকে নিয়ে রুমে যান ।রুমে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ঢলাঢলি করুন।”
সাদাফ জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো ,”আমার কোন রিহা টিহার দরকার নেই ।আমার শুধু নুরকে চাই ।ইহকাল পরকাল সব জায়গায় আমার শুধু নুর কেই প্রয়োজন ।নুর ছাড়া আমার চলবে না।”
নুর বললো,” ইহকালে যা আপনার রঙ্গলীলা দেখছি পরকালে আর কি কি দেখবো।পরকালে তো ৭০ টা হুরপরী আপনি লাইসেন্স করে পেয়ে যাচ্ছেন ।লীলা তো সেখানেও কম দেখতে হবে না।”
সাদাফ বললো,” সোনা আমার এই যে আজকে থেকে আমি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাইবো আমার ৭০ টা হুরপরী দরকার নেই ।আমার একটা নূর পরী হলেই চলবে ।আমার আর কিছু দরকার নেই ।ইহকাল পরকাল সবকালে আমার শুধু তোকে চাই সো*না আমার দরজা খোল প্লিজ।”
“আপনার সাথে সম্পর্ক না থাকলে এই মেয়ে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসলো কি করে ?আপনার বাড়ির ঠিকানা পেল কি করে ?আর এই মেয়ের দুঃসাহস হয় কি করে আপনাকে জড়িয়ে ধরার সবার সামনে ?যে মেয়ে সবার সামনে আপনাকে জড়িয়ে ধরতে পারে ৬ বছর আমেরিকা আপনার পিছনে পড়ে ছিল সেখানে কি করেছে সেটা তো আমি কিছুই জানিনা।
যান আমার দরজার সামনে থেকে ।আপনার কথাই এই মুহূর্তে আমার শুনতে ইচ্ছা করছে না ।আপনি আপনার রেহার কাছে যান ।যার সাথে একটু আগে জড়িয়ে ধরে ছলা কলা করছিলেন।”
সাদাফের এবার নিজেরও বিরক্ত লাগল রিহার উপর ।এই মেয়ের সাহস কি করে হয় বাড়ি শুদ্ধ লোকের সামনে ওকে দৌড়ে এসে এভাবে জড়িয়ে ধরার ?আমেরিকায় যেদিন একা বাড়িতে ঢুকে ছিল সেদিন ওতো জড়িয়ে ধরেনি আজ কি হল কেন এরকম করলো অবশ্যই জবাব চাইবে সাদাফ।
কিন্তু তার আগে ওর নুর পাখিকে ঠান্ডা করতে হবে ।তাই বললো,” নূর কসম করে বলছি আমি জানিনা সো*না আমার প্লিজ দরজা খোল।”
নূর দরজা খুলছে না ।সাদাফ অধৈর্য হচ্ছে ।বুক ফেটে যাচ্ছে ।সাদাফের পিছন ফিরে তাকালো । দেখলো রিহা এদিকেই তাকিয়ে আছে ।সাদাফের জিদ লাগছে খুব জিদ লাগছে ।মনে হচ্ছে নিচে গিয়ে মেয়েটাকে চাপকে দাঁতগুলো ফেলে দিবে ।কিন্তু এই মুহূর্তে নূরের দরজার কাছ থেকে সরা যাবে না ।না জানি পা*গলি কি করে বসবে ?সাদাফ বললো,” তুই কি দরজা খুলবি নাকি আমি দরজা ভে*ঙে ফেলবো ?তুই চাচ্ছিস সবাই দেখুক?”
নুর জানে এই মুহূর্তে এসব করা ঠিক হচ্ছে না ।বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন মেহমান সবাই আছে মুরুব্বিরা আছে ।নুর তাই চুপচাপ উঠে এসে দরজা খুলে দিল কিন্তু তাকালো না সাদাফের দিকে।
নুর রাগে গচগজ করতে করতে খাটে গিয়ে বসল ।সাদাফ সেই আগের মতই নূরের পায়ের কাছে বসে জোর করে নূরে পা দুটো ধরে বললো,” সত্যি করে বলছি এই যে তোকে ছুয়ে বলছি ওর সাথে আমার কখনো এরকম ধরনের কোন সম্পর্ক ছিল না ।ও যেদিন আমাকে সরাসরি ভালোবাসি বলেছে সেদিন আমি ওকে প্রত্যাখ্যান করেছি ।বলেছি আমার অন্য একজন আছে যাকে আমি ভালোবাসি। আমি সরাসরি বলেছি আমি আমার নুরকে ভালোবাসি ।যে আমার জন্য বাংলাদেশে আছে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে ।সত্যি করে বলছি ওর সাথে আমার এমন কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কেন এখানে চলে এসে এই কাহিনী করল তুই নিচে চল একসাথে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো।”
নুর মানছে না ।চোখের পানি টই টুম্বুর হয়ে আছে ।শুধু বললো,” এ জায়গায় যদি আমার জায়গায় আপনি হতেন আর আপনার জায়গায় আমি হতাম ?কেউ এসে এভাবে সবার সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতো তাহলে কি করতেন?”
সাদাফ এক মুহূর্ত সময় ব্যয় করল না ।বললো ,”খু*ন করে ফেলতাম যে এসে তোকে এভাবে জড়িয়ে ধরতো আমার সামনে ।তাকে আমি খু*ন করে ফেলতাম ।তুই করলি না কেন ?তুই কেন আমাকে অবজ্ঞা করে উপরে চলে এলি ?তুই ওকে মা*রলি না কেন?
আমার নুরকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা ও ছায়া ও যদি কেউ স্পর্শ করতো আমি ওইখানে ওকে খুন করে ফেলতাম ।তুই কেন অধিকার খাটালি না ?তুই কেন ওর সাথে আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে আসলি?”
নুর তাকালো সাদাফের দিকে ।সাদাফে চোখ মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে সাদাফ মিথ্যা বলছে না ।কারণ একটা মিথ্যাবাদীর চোখ মুখ এরকম হতে পারেনা ।নুর নিজের মুখ দুহাত দিয়ে ঢেকে ঝরঝরিয়ে কান্না করে দিল।
কান্না করতে করতে বললো,”দৃশ্যটা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না ।এখনো পারছিনা ।বারবার শুধু মনে হচ্ছে আমার অসহায়ত্ব আমার অপূর্ণতা এই জন্যই বুঝি এই দৃশ্যটা আমাকে দেখতে হয়েছে।
অধিকার খাটাতে পারিনি কেন যেন মনে হয়েছে আমি তো পরিপূর্ণ না ।আমি তো আপনাকে সেই পরিপূর্ণ সুখ কখনো দিতে পারবো না ।কোন একটা জায়গায় গিয়ে যেন আমি আটকে গিয়েছি ।আমি তো এ বন্ধন থেকে বের হতে পারছি না।”
“আমি তোকে ভালবাসি নূর ।তোকে আমি কোনদিন অপূর্ণ মনে করি না ।যার জন্য আমি পা*গল হয়ে থাকি দিনরাত আমি মুখিয়ে থাকি এক নজর দেখার জন্য সেই মেয়ে তো কখনো অপরিপূর্ণ হতে পারে না ।তাও আবার সে রিহার কাছে যে কিনা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এসেও আমাকে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারবে না কোনদিনও সেই মেয়ের কাছে তুই কিভাবে হেরে গেলি নূর? রিহা যাকে পাওয়ার জন্য এত কিছু করে এখানে চলে এসেছে তাকে তুই না চাইতে পেয়ে গেছিস। তুই জানিস না তুই কবে থেকে পেয়ে গেছিস ?যেদিন তুই পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিস সেদিন থেকে তোর হাতের রেখায় আমার নাম লেখা হয়ে গেছে ।তুই কিভাবে হেরে গেলি ওই মেয়ের কাছে?
যাকে পাওয়ার জন্য ওই মেয়ে নির্লজ্জের মত আমার সাথে এখানে চলে আসলো সেই তোকে পা*গলের মতো ভালোবাসে অথচ তুই তাকে পাওয়ার জন্য এক ফোঁটা সাহস নিচে দেখালি না।
তুইতো অযোগ্য না অযোগ্যতা আমি হয়ে গেছি ।দেখ না তোকে আমি পা*গলের মতো ভালোবাসি কিন্তু আমার ভালোবাসা তোর কাছে প্রমাণই করতে পারছি না ।কি করলে প্রমাণ হবে নুর ?বলতো আমি তোকে পাগলের মতো ভালোবাসি কি করবো প্রমাণ করার জন্য আমি বল?”
সাদাফ নুরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ।নূরের সমস্যাটাও সাদাফ বুঝতে পারল ।জোর করে নূরের হাত দুটো মুখ থেকে সরিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,” সো*না আমার পাখি আমি তোকে অনেক ভালোবাসি নুর ।তুই কখনো নিজেকে অপরিপূর্ণ মনে করিস না ।তোকে পেয়ে যে আমি পরিপূর্ণ এটা কি করে তোকে বোঝাবো নুর ?তোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি ।নিচে চল তোর সামনে সবকিছু পরিষ্কার করে দিব ।তুই ওই মেয়েকে জিজ্ঞেস করবি এটা তোর অধিকার কেন তোর সামনে তোর স্বামীকে এভাবে জড়িয়ে ধরল ?তুই নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করবি।
আজকে আমি না নুর। আজকে আমার উপরে তুই অধিকার খাটাবি ।চল ।”
বলেই সাদাফ দাঁড়িয়ে নূরকে উঠালো ।নুর তাকিয়ে রইল সাদাফের দিকে ।”নুর কাঁদিস না পাখি আমার চল ।তুই গিয়ে জিজ্ঞেস করবি কেন এরকম কাজ করল ?আমি তো ওকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছিলাম ।তাহলে ও কেন আসলো?”বললো সাদাফ।
সাদা নুর কে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিচে নিয়ে আসলো ।রিহা তাকিয়ে রইল নূরের দিকে ।নূরকে রিহা চিনে না কিন্তু বুঝতে পারছে হয়তো এটাই সেই মেয়ে যার জন্য সাদাফ ওকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
নিচে সবাই তাকিয়ে আছে নূর ও রিহার দিকে ।নূর কি বলবে না বলবে সবাই জানতে ইচ্ছুক।
নুর শুধু একটি কথাই বলল ,”যার জন্য আপনি সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এসেছেন এক দেশ থেকে আরেক দেশে এসেছেন সেই লোকের উপরে শুধু আমার অধিকার ।জন্ম থেকে সে শুধু আমার ।মৃ*ত্যুর আগ পর্যন্ত সে আমার থাকবে ।মৃ*ত্যুর পরও সে শুধু আমার থাকবে ।সে আমার স্বামী। আপনি আমার সামনে আমার স্বামীকে জড়িয়ে ধরেছেন ।কি সম্পর্ক আছে আপনাদের মাঝে ?কিসের অধিকার নিয়ে ধরেছিলেন ?আপনার কি মনে হয়নি একজনের বাড়িতে এসে এভাবে একটা পরপুরুষকে জড়িয়ে ধরা মেয়েদের মানুষ কি চোখে দেখবে? বা সেই ছেলেটি যার সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই মানুষ সেই ছেলেটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে?”
রিহা বললো,” আমি সাদাফ কে অনেক ভালোবাসি তাই এসেছিলাম কিন্তু জানতাম না ও বিবাহিত বা বিয়ে করেছে ।তবে হ্যাঁ এটা জানতাম ও তোমাকে ভালোবাসে তারপর আমি এখানে এসেছি এটা আমার ভুল হয়েছে। সাদাব কখনোই আমাকে ভালবাসেনি সবসময় তোমাকে ভালবেসেছে ।আমি ভেবেছিলাম হয়তো এখানে এসে পারিবারিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিলে হয়তো আমি তাকে পাব আমিও তো তাকে ভালোবাসি । ভালোবাসা পাওয়ার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করে দেখেছিলাম ।মৃ*ত্যু পথযাতি মানুষ ওতো খড়কুটো পেয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরে ।জানে বাঁচতে পারবেনা তারপর আকড়ে ধরে।আমিও সেরকম খড়কুটোর মত একটি সম্ভাবনা দেখেছিলাম হয়তো পারিবারিকভাবে প্রস্তাব দিলে আমি সাদাফকে পেতে পারি তাই সে চেষ্টা করেছিলাম আমার ভুল হয়েছে।
আমার ভুল হয়েছে নূর ।প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও ।আমি আর কখনো তোমাদের মাঝখানে আসার চেষ্টা করব না।
আজকের পর থেকে এই যে প্রমিস করে বলছি সবার সামনে ।আমি আর কখনো সাদাবকে চাইবো না কখনো ভালবাসতে চাইবো না ।আমি আমার বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করে ফেলব ।এই যে সবার সামনে প্রমিস করে বলছি ।আমি কি তোমাদের বিয়েটা এটেন্ড করে যেতে পারি ?আজকে যেহেতু বিয়ে বিয়ে টা এটেনড করে না হয় আমি রাতে ফিরে যাব।”
নুর তাকিয়ে রইলো রিহার দিকে ।রেহাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে সত্যি সাদাফ কে অনেক ভালোবাসে ।নুরের যেন মনটা একটু নরম হলো। মানুষ যদি সত্যি কাওকে ভালোবাসে হয়তো এরকম হয়ে যায় ।তাই বললো,”ঠিক আছে বিয়ে এটেন্ড করে যান সমস্যা নেই কিন্তু এটা মনে রাখবেন উনি আমার স্বামী হয়।
আপনি চাইলেও কখনো আমাদের মাঝখানে আসতে পারবেন না ।সেই সুযোগ নেই ।তবে আপনি চেষ্টা করবেন না কথা দিয়েছেন এটা আমি খুশি হয়েছি ।অবশ্যই আমি আপনার জন্য মনে কিছু রাখবো না ।বিয়ে আপনি এটেন্ড করে যেতে পারেন।”
রিহা নুরের দিকে তাকিয়ে বললো,”থ্যাঙ্ক ইউ নুর ।আসলেই তুমি সাদাফের যোগ্য ।ভালোবাসার জন্য আমি কেনো যোগ্য ছিলাম না আজকে বুঝতে পারলাম কেন উনি তোমাকে এত ভালোবাসে?তোমার জায়গায় আমি থাকলে এত বড় মনের পরিচয় দিতে পারতাম না সত্যি ।কিন্তু তুমি কি সুন্দর মেনে নিলে ।এজন্যই সাদাফ তোমার হয়েছে আর আমি এত শত চেষ্টা করেও কখনো পাইনি।”
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ১৫০+১৫১
এর মধ্যেই সাদাফ তাকালো নুরের দিকে ।নূর চোখের পানি মুছে তাকালো সাদাফের দিকে ।
সাদাফ সাথে সাথে সবার সামনে নুরকে জড়িয়ে ধরল ।যেন বোঝাতে চাইলো এই বুকে শুধুমাত্র নূরের স্থান অন্য কারো নয়। যেন কিছু না বলেও রিহা কে উপযুক্ত উত্তর দিয়ে দিল সাদাফ।
