Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৪
তানিয়া হুসাইন

অনেকদিন পর প্যালেসে ফিরেছে ভীর।
এই মিশনটা শেষ করতে তার সময় লেগেছে প্রত্যাশার থেকেও বেশি।
কোটি কোটি টাকার ডিল, আর সমুদ্রপথে চলা অন্ধকার সব হিসাব মিটিয়ে অবশেষে টাকা তার ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়েছে।মিশন শেষ।
কিন্তু ভীরের চোখে সেই সন্তুষ্টি নেই,কোথাও একটা শূন্যতা এতদিন তাকে গিলে খাচ্ছিল।
কালো গাড়ির দরজা খুলে প্যালেসের সামনে নামতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগে তার।চারপাশে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো মাথা নিচু করে সম্মান জানায়।ভীর কারও দিকে তাকায় না।দ্রুত পায়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ে সে।তার হাঁটার ভঙ্গিতেই ক্লান্তি স্পষ্ট।কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়ো আছে আজ। বহুদিন পর সে এমন কিছুর কাছে ফিরছে, যেটা ছাড়া তার এই বিশাল অন্ধকার সাম্রাজ্যও অর্থহীন।দ্রুত পায়ে নিজের রুমের সামনে এসে থামে ভীর।

দরজার হাতলে হাত রেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামে সে।তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই কাঙ্ক্ষিত মুখ।
তার বিশাল বিছানার উপর পা মেলে বসে আছে ইশায়া।তার হাতে কে এফ সি’র চিকেন ফ্রাই।
তাও এক বক্স না বড় বড় দুইটা বক্স পুরো ফাঁকা করার মিশনে নেমেছে সে।দৃশ্যটা দেখে ভীরের কপালে ভাঁজ পড়ে।তার ঠান্ডা চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকে, ইশায়ার গায়ে পড়া আছে তার ব্ল্যাক টি-শার্ট।
ঢিলেঢালা কালো টি-শার্টটা ইশায়ার শরীরে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেছে।
গলার একপাশ একটু নেমে আছে।হাতা কনুই ছুঁয়েছে।মনে হচ্ছে তার অনুপস্থিতিতে তার গায়ের গন্ধ মেখেই ঘুরে বেড়ায় মেয়েটা।ভীর লক্ষ্য করেছে ইশায়া এখন বেশিরভাগ সময়ই তার টি-শার্ট পরে থাকে।
ভীরের জিনিসে হাত দেওয়ার অধিকার এই পৃথিবীতে যদি কারও থাকে, তবে সেটা শুধু ইশায়ার।
ভীর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে।

নিঃশব্দে।চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে।
আগের থেকে শরীর একটু ভরাট হয়েছে ইশায়ার।
মুখে এসেছে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা।তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সৌন্দর্যও।আগের থেকেও অনেক সুন্দর হয়ে গেছে সে। আগের সেই চিকন, ভাঙাচোরা মেয়েটার মাঝে এখন এক পরিপূর্ণ নারীর কোমলতা ফুটে উঠেছে।
ইশায়া সবসময়ই চিকন ছিল।কিন্তু এখন এই সামান্য স্বাস্থ্য তাকে আরও বেশি কিউট, আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।ভীরের চোখ থেমে থাকে তার উপর।
কতদিন পর এই দৃশ্য দেখছে সে।এই মেয়েটাকে ছাড়া সবকিছুই কেমন অর্থহীন লাগে তার এখন।কিছুতেই শান্তি খুজে পায় না আর।
ভীর রুমে ঢুকতেই বাকি সবাই নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।
কেউ এক সেকেন্ডও দাঁড়ানোর সাহস করে না।দরজা বন্ধ হতেই পুরো রুমে নেমে আসে নীরবতা।
ভীরকে দেখে ইশায়া তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে বসে।কিন্তু পা গুটিয়ে বসতে পারে না সে এখন।বসে থাকতে কষ্ট হয়।তবুও নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে।

ভীর কিছু বলে না।একবার শুধু তার দিকে তাকায়।
তারপর আলমারি থেকে জামা-কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ভীর,চুল ভেজা।পড়নে ডার্ক ট্রাউজার, তার প্রশস্ত কাঁধ বেয়ে এখনও পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।স্বভাবতই টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ভীর।এক হাতে ভেজা চুল পিছনে ঠেলে দেয়।তারপর ধীরে ধীরে চুলগুলো সেট করতে থাকে।ইশায়া চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
কারণ একটা জিনিস সে খেয়াল করেছে।
ভীর সবসময় শাওয়ার শেষে পারফিউম ব্যবহার করে।
সবসময় তার শরীর থেকে সেই দামি, ভারী সুগন্ধ ভেসে আসে।
কিন্তু আজ আজ সে পারফিউম দেয়নি।
ইশায়া নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে।
সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে,

___পারফিউম দিলেন না যে?
ভীর কোনো উত্তর দেয় না।
চুপচাপ আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের কাজ করে।
ইশায়া আবার বলে,
___আপনার না কত কোটি টাকার পারফিউম?
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকে ভীর।তারপর মাথা তুলে আয়নার ভেতর দিয়েই ইশায়ার দিকে তাকায়।
সেই চোখে ক্লান্তি,আর ভয়ংকর গভীর কিছু অনুভূতি আছে, যেটা সে কাউকে দেখায় না।
সে নির্লিপ্ত গলায় বলে ওঠে
___তোর নিঃশ্বাসের দাম আমার পারফিউমের থেকেও বেশি।
ভীরের কথার পর ইশায়া আর কিছু বলতে পারেনি।
মেয়েটা চুপচাপ মুখ নামিয়ে আবার নিজের খাওয়ায় মন দেয়।যেন ভীরের উপস্থিতি পুরোপুরি উপেক্ষা করতে চাইছে।
ভীর হাতের টাওয়াল টা দূরে ছুড়ে মারে তারপর এগিয়ে আসে।বিছানার পাশে বসতেই ম্যাট্রেস হালকা দুলে ওঠে,তার শরীরের পরিচিত গন্ধ মিশে যায় পুরো রুমে।ভীর নিচু চোখে তাকায় ইশায়ার হাতে থাকা খাবারের দিকে।দুইটা বড় বক্স প্রায় শেষ।
তার কপাল আবার কুঁচকে যায়।গভীর গলায় বলে ওঠে,

___এসব কী খাও সবসময় উল্টাপাল্টা খাবার?
ইশায়া মুখ তুলে তাকায় না।চুপচাপ খেতেই থাকে।
ভীর এবার বক্সটা আলতো টেনে নিজের দিকে নিয়ে আসে।
___তোমাকে কতবার বলেছি হেলদি খাবার খাবে।
এগুলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
তার গলার স্বর শক্ত,
___বেবির কথা ভাবো না কেন?
বেবি শব্দটা শুনতেই ইশায়ার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ছোট্ট গলায় দোনামোনা করে বলে,
___বেবিই তো খেতে চায় এগুলো।
ভীর ভ্রু তোলে।
ইশায়া মুখ ছোট করে,আমি তো আগে এসব খেতাম না ঠোঁট উল্টে বলে ইশায়া।
ভীর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
___বেবি কি তোমার কানে কানে এসে বলেছে এই কথা?
ইশায়া ঠোঁট ফুলিয়ে চুপ হয়ে যায়।
ভীরের চোখ দুটো ভয়ংকর শান্ত।

___তোমার শরীরে আমার বাচ্চা আছে।রাজভীর এর বাচ্চা নিয়ে ঘুড়ছো।যা মন চায় তাই করলে হবে না।
ভীর সবসময়-ই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যস্ত।
কিন্তু এই একটা প্রাণের ব্যাপারে সে অস্বাভাবিক রকম সাবধান।কারণ জীবনে এই প্রথমবার সে এমন কিছু পেয়েছে, যেটা হারানোর ভয় তাকে সত্যিই দুর্বল করে তুলছে।
___আমি ছিলাম না দেখে যা মন চেয়েছে তাই করেছো।
এখন থেকে তুমি সবসময় রুটিন ফলো করবে।
ইশায়া কিছু বলে না।বলবে ও না সে।
কতবার নিজেকে শাসায় এই লোকের সাথে কোন বাক্য বিনিময় করবে না। তবুও কেন যেন এই মানুষটার সামনে এসে সব এলোমেলো হয়ে যায়।নিজের অজান্তেই কথা বলে ফেলে সে।

_______প্যালেসের করিডোরজুড়ে নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে। বাইরে ঝড়ের শব্দ।
এদিকে জেইন বসে আছে বেলার রুমে।দু’জন সোফার উপর আধশোয়া হয়ে ড্রিংক করছে, সামনে খোলা পিজ্জার বক্স।
রুমজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে অ্যা*লকোহলের গন্ধ।
বেলা অনেকদিন পর একটু স্বাভাবিক হয়েছে।
এখন সে তার আগের মতোই চলে।
জেইন টুকটাক কথা বলে তাকে হাসানোর চেষ্টা করছে। আর বেলা ও মাঝে মাঝে হেসে উঠছে জেইনের কথা শুনে।
ঠিক তখনই কোথা থেকে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে নিক।দরজার শব্দে দু’জনেই তাকায় তার দিকে।নিকের চোখ প্রথমে গিয়ে পড়ে সামনে বসে থাকা জেইনের উপর।তার কপালে ভাজ পড়ে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি থেমে যায় বেলার শরীরে থাকা কাপড়ের উপর।যেটা দেখে নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।চোখ দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে আসে রাগে।
বেলা নিককে দেখে ভিতরে ভিতরে ঘাবড়ে গেলেও সেটা প্রকাশ হতে দেয় না।
নিজেকে শক্ত রেখে ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,

___এভাবে নক না করে কারো রুমে ঢোকা কোন ধরনের অসভ্যতা,হুমমম?
নিক কোনো উত্তর দেয় না।
শুধু মাথা কাত করে জেইনের দিকে তাকায়।
তারপর চুটকি বাজায়।আঙুলের ইশারায় জেইনকে বেরিয়ে যেতে বলে।
__জেইন কিছু বলতে চেয়েও থেমে যায়।কারণ সে জানেএই মানুষগুলো কতটা ভয়ংকর।নিকের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সাহস তার নেই।
সে উঠে দাঁড়ায়।একবার বেলার দিকে তাকায়, তারপর সুরসুর করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
জেইনকে এভাবে চলে যেতে দেখে বেলার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।অজান্তেই মনে পড়ে যায় সেদিনের ক্লাবের ঘটনা।সেই ভয়ংকর রাত।
নিকের চোখের সেই ভয়ানক দৃষ্টি।জেইন বের হতেই
ঠাসসসস বিকট শব্দে দরজা বন্ধ করে দেয় নিক।
শব্দটা এতটাই তীব্র ছিল যে বেলা কেঁপে ওঠে।
তার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে আসে।নিক ধীরে ধীরে তার দিকে এগোতে থাকে।
বেলা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠে,

___সমস্যা কি তোমার?আমরা খাচ্ছিলাম, দেখোনি?
নিক থামে না।তার চোখে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে অধিকার আর রাগের মিশ্র আগুন।
নিচু, কর্কশ গলায় সে বলে,
___খাচ্ছিলি?
ছেলেদের সাথে খাওয়ার এত শখ?তোর এই শখ আমি মেটাচ্ছি দাড়া।
নিকোর পরবর্তী কাজে বেলার বুক কেঁপে ওঠে।
বেলা গোঙায় ছটফট করে নিজেকে ছাড়াতে চায় কিন্তু পারেনা।রাগে, অপমানে,ভয়ে তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠছে।কিন্তু নিকের শক্তির কাছে সে অসহায়। নিকোর কাজ শেষ হলে সে তাকে ছেড়ে দেয়।বেলা হাঁপাতে হাঁপাতে দূরে সরে যায়।
নিক তার দিকে আঙুল তুলে ভয়ংকর গলায় বলে,
___এখানে এসেছিস কেন তুই?কোন সাহসে।
চুপচাপ রুমে চলে যা।না হলে এখন আমি কি করবো তা তোর কল্পনারও বাইরে।
কথাটা বলে নিক কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে বেলার দিকে।
আমি বাইরে যাচ্ছি এসে যেন দেখি তোকে।
নিক বেরিয়ে যেতেই বেলা দ্রুত ওয়াশরুমে যায়।

______ভীরের রুমে সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা জায়গা আছে। বিশাল আকৃতির সেই রুমে কোনো কিছুরই কমতি নেই। সার্ভেন্টরা সবাই সেখানে ডিনার সার্ভ করছে। ইশায়ার জন্য-ই ভীর এখানেই এখন সব কিছুর ব্যবস্থা করেছে,যাতে তাকে সিড়ি বেয়ে নামতে না হয়।
এদিকে ইশায়াকে না চাইলেও গিয়ে ভীরের পাশে বসতে হয়। তার এখন ক্ষুধা নেই মাত্র কিছুক্ষণ আগেই সে এত কিছু খেয়েছে। সার্ভেন্টরা একে একে প্লেটে খাবার সাজিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়।
ভীর খাবার শুরু করে ফর্ক আর নাইফের সাহায্যে ধীরে ধীরে চিকেন আর সবজি কেটে কেটে খাবার মুখে তুলছে।
ইশায়ার জন্য সবসময় আলাদা করে বাংলাদেশি খাবার-ই রাখা হয়। আর এখন তো পুরোপুরি হেলদি খাবার ডাক্তার যা যা নির্দেশ দিয়েছে, সবই অনুসরণ করা হয়েছে। ইশায়াকে খেতে না দেখে ভীর চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। ভীরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়তেই ইশায়া নড়ে বসে।
কিন্তু তবুও তার কিছুতেই এসব খেতে ইচ্ছে করছে না।এখন কিছুই খাওয়ার ইচ্ছে নেই। ভীর ইশায়ার হাবভাব বুঝতে পেরে ইশায়ার চেয়ারসহ তাকে নিজের কাছে টেনে আনে।হঠাৎ এরকম হওয়ায় ইশায়া ভয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে টেবিলে ধরে। ভীর নিজের খাবার পাশে রেখে ইশায়ার প্লেটের দিকে হাত বাড়ায়। যে মানুষটা নিজে কখনো ফর্ক-নাইফ ছাড়া খায় না, সে প্রায়-ই এখন ইশায়াকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।
ভীর সামনে থাকা বাটি গুলো থেকে একে একে সব খাবার তুলে নেয়। ভীরকে এত কিছু নিতে দেখে ইশায়া এবার বলে ওঠে,

___আমি খেতে পারবো না, আমার ক্ষুধা নেই।
ভীর তার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
হ্যাঁ আপনার নাটক দেখার জন্য বসে আছি আমি,চুপচাপ খাও এগুলো না খেলে এই মনিটর আমি একেবারে অফ করে দেবো, তখন ভালো লাগবে?
ভীরের ঠান্ডা হুমকিতে ইশায়া আর কিছু বলার সাহস পায় না। তার কথা মুখেই থেমে যায়। সে বাধ্য হয়ে খাবার মুখে তোলে, না চাইলেও তাকে খেতে হচ্ছে। এক কামড় নিয়ে ইশায়া প্রায় দশ মিনিট ধরে চিবিয়ে যাচ্ছে, তবুও গিলছে না। ভীর ধৈর্য ধরে বসে থাকে ইশায়ার ক্ষেত্রে তার ধৈর্যের কোনো শেষ নেই।
ইশায়া যাই ভাবে ভীর তার উল্টোটাই করে সবসময়।
ইশায়া গিললেই ভীর আবার খাবার তুলে তার মুখে দেয়,
দুই কামড় খেতেই ইশায়া ওয়াক ওয়াক করতে থাকে, সে তৎক্ষণাৎ এক হাত মুখে চেপে ধরে বলে, আমার বমি আসছে, আমি খাবো না।
ভীর তখনও তার মুখের দিকে খাবার এগিয়ে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলে,
বমি হলে হবে, তবুও এই সব খাবার শেষ করতে হবে।
ইশায়া আর কিছু বলে না, আবারও বাধ্য হয়ে খাবার মুখে তোলে।
সে চেয়ারে পা তুলে বসে আছে, এক হাতে পানির গ্লাস।ভীর মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে, আর ইশায়া তা পানি দিয়ে গিলছে,অপর হাতে অনবরত গড়িয়ে পড়া চোখের পানি মুছছে।
ইশায়ার কান্নার দিকে ভীরের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে নিঃশব্দে, স্থিরভাবে তাকে খাইয়ে যায়, পুরো খাবার শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
ভীর ইশায়ার মেডিকেল রিপোর্ট দেখেছে। ইশায়ার শরীর খুবই দুর্বল, বয়সও কম। শারীরিক এবং মানসিকভাবে তাকে এখন অনেক কিছু মেনে চলতে হবে।দিন দিন তার শরীর ভেঙে পড়ছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাওয়া-দাওয়ার দিকে খেয়াল রাখা। ভীর চায় না ইশায়া বা তার বেবির কোনো ক্ষতি হোক।
এ কারণেই সে ইশায়ার সবকিছুর ব্যাপারেই এতটা স্ট্রিক্ট।

_____এভাবেই কেটে যেতে থাকে পরের দিনগুলো।সময় ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছিল সবকিছু।ইশায়ার প্রেগন্যান্সির তখন প্রায় ছয় মাস চলছে, ২৪ সপ্তাহের কাছাকাছি।এই সময়টাতে সে স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারে তার ভেতরে আরেকটা ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব।
হঠাৎ হঠাৎ পেটের ভেতর নরম একটা নড়াচড়া অনুভব হলেই থমকে যায় সে।
চোখ বড় বড় করে হাত রাখে নিজের পেটের উপর।
প্রথম প্রথম সে খুব ভয় পেত।এখন সেই অনুভূতিটাই ইশায়ার সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে।অজান্তেই বাচ্চাটার প্রতি গভীর এক মায়ায় জড়িয়ে গেছে সে।
সবসময় পেটের উপর হাত রেখে আস্তে আস্তে কথা বলে সে।মাঝে মাঝে হাসেও একা একা নিজের কাজে।ইশায়া জড়িয়ে যায় পুরোপুরি তার ভেতরের এই অস্তিত্বের সাথে।তার একাকীত্ব জীবনের যেন সঙ্গী হয়ে আসছে এই জান টা।

তবে এই সময়টাতে ইশায়ার শরীরটাও ভীষণ বদলে যেতে থাকে।সকালে ঘুম থেকে উঠলেই মাথা ঝিমঝিম করা, বমি বমি ভাব, কখনো হঠাৎ কোমরে টান ধরা ব্যথা।তার উপর ভীরের উগ্র ডমেনেটিং আচরন তো আছেই।আস্ত ভীরকে সামলানো কি যেই-সেই ব্যাপার।
সে দুনিয়ার সব নিয়ম মানলেও এই জায়গায় সে এক চুল পরিমান ছাড় দেয়না।
ইশায়ার পায়ের পাতাগুলো ফুলে যায় হালকা।
রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না।শ্বাস নিতেও কষ্ট হয় কখনো কখনো।আর এসবের প্রতিটা মুহূর্তে ছায়ার মতো পাশে থাকে ভীর।ইশায়া এক গ্লাস পানি চাইবার আগেই সেটা তার সামনে এনে দেওয়া হয়।মুখ ফুটে বলতে হয় না চাওয়ার আগেই সামনে হাজির।ভীরের এই পরিবর্তনগুলো খুব চোখে লাগে ইশায়ার।

___ভীর তার কাজ শেষ করে রুমে আসতে আসতে লেইট হয় অনেক। ভীর রুমে এসে দেখে ইশায়া ছটফট করছে।
ভীর জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে,ইশায়া কিছু বলে না।
তাই ভীর টাই টা খুলে শার্টের দুটো বোতাম খুলে দেয়, তারপর তার কাছে গিয়ে বসে চুপচাপ ইশায়ার মাথার হাত বুলিয়ে দেয় ঘুমানোর জন্য।
ঘুমাতে বললে ইশায়া চোখ বন্ধ করে।কিন্তু কিছুক্ষন পর আবার উঠে বসে তার অশান্তি লাগছে।
ইশায়া পায়ে হাত দিয়ে বসে।ভীর বুঝে কি সমস্যা।
ভীর উঠে পায়ের কাছে গিয়ে বসে তার পায়ে হাত বুলিয়ে দেয় আঙুল টেনে দেয়।
ইশায়া অস্বস্তিতে বলে,
__আমি ঠিক আছি।লাগবেনা,ছাড়ুন।
ভীর গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলে,
___চুপচাপ ঘুমাও।
তার কণ্ঠে আদেশ, কিন্তু যত্নটাও লুকানো না।
ইশায়া চুপচাপ শুয়ে পড়ে। ভাবে সে এই মাফিয়া কিভাবে তার পা স্পর্শ করলো।এতো দম্ভ নিয়ে তার পায়ে হাত।ওই আরেকটা জানোয়ার দেখলে এখন-ই হা*র্ট অ্যা*টাক করবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পরে ইশায়া। ভীর ইশায়া ঘুমিয়ে পড়লে সেও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পরে তাকে বুকে নিয়ে,ইশায়ার পেট আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘুমিয়ে পরে।

গুয়াদালাহারার বিকেল আজ অদ্ভুত শান্ত,
আকাশজুড়ে কমলা আর সোনালি রঙের মিশেল। দূরে পাহাড়ের গায়ে শেষ বিকেলের আলো পড়ে এক স্বপ্নময় আবহ তৈরি করেছে। হালকা উষ্ণ বাতাসে দুলছে গাছগুলো। সূর্য তখন ধীরে ধীরে আকাশের বুক বেয়ে নিচে নামছে।কমলা আলোয় ভেসে যাচ্ছে পুরো শহর।
কালো রঙের বিলাসবহুল একের পর এক গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে গুয়াদালাহারার রাস্তা ধরে।
গাড়ির কাঁচের বাইরে তাকিয়ে আছে ইশায়া।
কতদিন পর সে এভাবে বাইরের পৃথিবী দেখছে!
ভীরের প্যালেসে বন্দী জীবনের দেড় বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে তার।
সেই বিশাল খাচার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল তার সকাল, বিকেল, রাত,২৪ টা ঘন্টাহ্যাঁ একবার শুধু গুয়াতেমালায় যাওয়া হয়েছিল।আর যখন স্মৃতি ছিলনা তখন একদিন। তারপর আজ।
আজ আবার সে মুক্ত বাতাসের গন্ধ পাচ্ছে।

রাস্তার দুই পাশে উঁচু বিল্ডিং, ঝলমলে আলো, মানুষের ব্যস্ততা সবকিছুই ইশায়ার কাছে নতুন লাগছে।এই যে রাস্তায় নতুন নতুন স্বাভাবিক মানুষ দেখছে তার ভেতরটা নেচে উঠছে এগুলো দেখে,এই স্বাভাবিক জিনিসগুলো তার কাছে খুব অস্বাভাবিক লাগছে। ভালো লাগছে তার,তার বুক ভরে ওঠে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে।
ইশায়া ভীরকে বলে ফিসফিস করে কিছু।
ভীর কিছু বলে না ইশায়াকে শুধু হাত বাড়িয়ে জানালার কাঁচ একটু নামিয়ে দেয়।
সাথে সাথে ঠান্ডা বাতাস এসে এলোমেলো করে দেয় তার চুল।
ইশায়া চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিশ্বাস নেয়।
মনে হয় অনেকদিন পর সে সত্যি সত্যি বেঁচে আছে।
পাশে বসে থাকা ভীর চুপচাপ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
ইশায়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা ছোট্ট হাসিটা তার চোখ এড়ায় না।ভীর কিছু বলে না।শুধু কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামে গুয়াদালাহারার সবচেয়ে বড় আর অভিজাত হাসপাতালের সামনে।
বিশাল কাঁচের বিল্ডিং আলোয় ঝলমল করছে।

চারপাশে টাইট সিকিউরিটি।
ভীর নেমে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় ইশায়ার দিকে।
ইশায়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে সেই হাতের দিকে তারপর নিঃশব্দে নিজের হাত রাখে ভীরের হাতে।
ভীর শক্ত করে হাতটা ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামায়।
হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই ডাক্তার, নার্স সবাই সম্মানের সাথে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে যায়।
ভীর ইশায়াকে নিয়ে সরাসরি ভিআইপি ফ্লোরে চলে যায় সে।
নরম আলোয় ভরা কেবিনটার পরিবেশ শান্ত।
বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

___ইশায়া বেডের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে। তার এক হাত নিজের পেটের উপর রাখা।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে তার সাথে টুকটাক কথা বলে, চেকআপ করতে শুরু করে।ব্লাড প্রেসার, বেবির হার্টবিট, রক্তের রিপোর্ট,আল্ট্রাসাউন্ড সব করা হয়।
ঘরের নরম আলোয় মনিটরের স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে। সেখানে ছোট্ট বেবিটার হাত-পা নাড়ানোর দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইশায়ার চোখ হঠাৎ ভিজে ওঠে এটা দেখে। মাতৃত্বের অনুভূতি ধীরে ধীরে তাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
ভীর বসে আছে চেয়ারে।
ডাক্তার হালকা হেসে বলেন,
___বেবি খুব ভালো আছে।
কথাটা শুনে ভীরের শক্ত মুখটা একটু নরম হয়ে যায়। এতক্ষণ বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা টেনশন
কমে আসে।
সে কিছু না বলে শুধু মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের অজান্তেই তার দৃষ্টি আটকে যায় ছোট্ট সেই নড়াচড়ার উপর।ডাক্তার আবার রিপোর্ট দেখতে দেখতে বলেন,

___পায়ে হালকা পানি এসেছে। এখন থেকে বেশি হাঁটাহাঁটি করা যাবে না। রেস্ট লাগবে ,আয়রন আর ক্যালসিয়ামের মেডিসিন নিয়মিত নিতে হবে। বেশি স্ট্রেস নেওয়া যাবে না। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে হবে। ফল, দুধ আর প্রোটিন জাতীয় খাবার বাড়াতে হবে। আর প্রতি সপ্তাহে চেকআপ করতে হবে।
ভীর চুপচাপ শুনছে।আর ইশায়া চার পাশে দেখছে।
ডাক্তার ফাইল বন্ধ করে আবার বলেন,
___এখন ছয় মাস মাস চলছে। আর প্রায় তিন মাসের মতো বাকি আছে। সব ঠিক থাকলে নবম মাসের শেষের দিকে বেবি হবে।বেবির পজিশন আর হার্টবিট সব ঠিক আছে।আপনি সাবধানে চলাফেরা করবেন, আর সবকিছু মেনে চলবেন।
___এরমাঝে নিক ঢুকে কেবিনে।
ডাক্তার ভয়ে ভয়ে ভীরকে জিজ্ঞেস করেন,
___আপনার বাচ্চা ছেলে না মেয়ে জানতে চান?
ভীর এক সেকেন্ডও নেয় না।সরাসরি বলে দেয়,
___না।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নিক অবাক হয়ে তাকায়।
__কেনো ব্রো? আমার তো জানার খুব ইচ্ছা করছে।
ভীর শান্ত গলায় বলে,

___না।
আমার সন্তান ছেলে হলেও আমার, মেয়ে হলেও আমার।যাই হোক সুস্থ থাকলেই হবে।
নিক কিছুক্ষণ ভীরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
___তবুও আমি জানি তুমি মেয়ে চাও।
ভীর কোনো উত্তর দেয় না।
সে তখন ডাক্তারের দেওয়া রিপোর্টের লিস্ট দেখতে ব্যস্ত।
নিক আবার বলে ওঠে,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৩

___মেয়ে বেবি তোমার ভালো লাগে তাই না ব্রো?
ভীর এবারও চুপ থাকে।
কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই উত্তরটা লুকিয়ে ছিল।
কারণ ইশায়া নিজেও খেয়াল করেছে, ভীর ফোনে ভিডিওতে যখনই কোথাও ছোট্ট কোনো মেয়েকে দেখে, ভীরের কঠিন চোখদুটো অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যায়।
আর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ইশায়ার পেটের উপর।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৫