Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৭
তানিয়া হুসাইন

সব কিছু প্রস্তুত।প্রাইভেট জেট আর কালো গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অ*স্ত্রভর্তি বক্স একের পর এক তোলা হচ্ছে ।লোকেরা শেষবারের মতো নিজেদের অ*স্ত্র চেক করছে।চারদিকে শুধু ধাতব শব্দ,
আজকের দিন সাধারণ কোনো দিন না।
ভীর নিচে এসে দাঁড়ায়।
তার পরনে কালো শার্ট, হাতে গ্লাভস, কোমরে লোডেড গা*ন।চোখেমুখে সেই পরিচিত নির্মমতা।সব কিছু ঠিকঠাক,সব প্রস্তুত।শুধু বেরিয়ে যাওয়ার পালা
কিন্তু ভীরের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাপছে হঠাৎ।

সামনে এগোতে যেয়েও পা থেমে যায় ভীরের।কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে।
একটা অজানা অস্থিরতা বারবার বুকের ভেতর ছটফট করছে।সে গভীর শ্বাস নেয়। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।কিন্তু পারছে না।তার মাথার ভেতর শুধু একটাই মুখ ভেসে উঠছে ইশায়া।
সকালের সেই ভয় পাওয়া চোখ কাঁপতে থাকা শরীর,
আর তাকে দেখেই আতঙ্কে পিছিয়ে যাওয়া।
বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র একটা চাপ অনুভব হয়।
সে জানে এই মুহূর্তে ইশায়ার সামনে গেলে সে আরো ভয় পাবে।
হয়তো তাকে দেখেই কেঁদে উঠবে, তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। সে জানে সবকিছু।
তবুও কেন যেন, না দেখে যেতে পারছে না সে।
ভীর নিজেকে থামায়।কিন্তু সে জানে একবার তাকে না দেখে গেলে।মিশনে গিয়েও সে শান্তি পাবে না।
তার ভেতরের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে আটকাতে পারে না ভীর নিজের পথ বদলে রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
করিডোরের আলো ভীরের মুখে পড়ছে।
তার কঠিন চেহারার আড়ালেও আজ অদ্ভুত এক ক্লান্তি স্পষ্ট।
প্রতিটা পা ফেলতেই বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠছে তার।
ভীর কখনো কাউকে নিয়ে এভাবে ভাবেনি।
কখনো কারও ভয়, কান্না কিংবা অভিমান তার ভেতর এভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করেনি।
কিন্তু ইশায়া তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
আর সেই দুর্বলতার কাছেই এখন আবার ফিরে যাচ্ছে ভীর।

____ইশায়া চুপচাপ রুমের এক কোণে বসে আছে।
দুই হাঁটুর ভাঁজে মুখ গুঁজে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।তার মনে হচ্ছে এতদিন সে কোন অন্য জগতে ছিলো এখন হুট করে বাস্তবে ছিটকে পড়েছে। সকালের এই দৃশ্যটা-ই যেন তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে এনেছে। এটা দেখার পর থেকে-ই সে ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে। মাথার ভেতর হাজারটা শব্দ একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে।সে কিভাবে সব ভুলে গিয়েছিল?কিভাবে এতদিন নিজেকে বুঝিয়েছে যে সব ঠিক হয়ে যাবে।নিজেকেই নিজের কাছে ঘৃণ্য লাগছে ইশায়ার।
দু’হাতে নিজের চুল খামচে ধরে সে।তার পুরো শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে।
একসময় কাঁপা হাতটা ধীরে গিয়ে থামে নিজের পেটের উপর।
তার গর্ভে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটা.. সেও কি একদিন এই অন্ধকারের অংশ হয়ে যাবে। এই ভাবনাটাই ইশায়ার বুক কাঁপিয়ে তুলে।
এই অন্ধকার, এই র*ক্ত, এই ভয়ংকর জীবন
এসবের মাঝে সে কিভাবে নিজের সন্তানকে আগলে রাখবে?
না.. না.. এটা কিছুতেই হতে দিবো না আমি।
চোখ বন্ধ করেই ফিসফিস করে ওঠে ইশায়া,

___আমার জীবন নষ্ট হয়েছে… কিন্তু আমি আমার বাচ্চার জীবন নষ্ট হতে দিব না.।
এমন সময় রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে ভীর।
তার উপস্থিতিতে চারপাশের সবাই সম্মান দেখিয়ে সরে যায়।ইশায়া মুখ তুলে তাকায়।
ভীর ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসতে নিলে ইশায়া তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়।
ভীর থেমে যায়।তারপর হাত বাড়িয়ে কাছে আসতে বলে।
ইশায়া দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভীর শান্ত কণ্ঠে বলে,
___Come here. Fast.
ইশায়া আরও এক পা পিছিয়ে যায়।
ভীরের চোখ সরু হয়ে আসে।
___দ্রুত আসো। আমাকে যেতে হবে।কাজ আছে।
ভীরের ফোন বেজে ওঠে।
বেরোতে হবে তার এখন সময় হয়ে গেছে।
কিন্তু ইশায়া এখনো দূরে দাঁড়িয়ে তার এই অবাধ্যতা ভীরের মেজাজ আরও খারাপ করে দেয়।এতো প্রেশার এর মাঝে এই মেয়েটা তাকে শান্তি দেয় না এক দন্ড ও।
ভীর এবার নিজেই এগিয়ে যায়।
ভীরকে কাছে আসতে দেখে ইশায়া আতঙ্কে মাথা নাড়তে থাকে।বারবার না বোঝাতে থাকে।কিন্তু ভীর থামে না।
হঠাৎ করেই ইশায়া চিৎকার করে ওঠে,

___আমাকে ছুবেন না! আমাকে ছুবেন না!
এই নোংরা হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করবেন না!
ভীর দাঁতে দাঁত চাপে,
এই মেয়েটা যাওয়ার সময় উল্টাপাল্টা কথা বলে ইচ্ছা করেই তার মাথা গরম করে দিচ্ছে।
রাগে ভীর এগিয়ে যেতে নিলেই ইশায়া পাশের একটা ফ্লাওয়ার ভাস তুলে তার দিকে ছুড়ে মারে।
ভীর দ্রুত সাইডে সরে যায়।
ভাসটা তার গায়ে লাগে না, কিন্তু তার মেজাজ পুরোপুরি খারাপ হয়।
ভীর শক্ত গলায় বলে ওঠে ,
___আমাকে রাগিও না, ইশায়া।ভালো হবে না।
ইশায়া আতঙ্কিত চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
কাঁপা কণ্ঠে আবার বলে ওঠে,

___আসবেন না… আমাকে ছুবেন না,এই হাতে আমাকে ছুলে আমি মরে যাবো।দেখতে পারবেন না আর আমাকে… আমার বাচ্চাকেও দেখতে পারবেন না আপনি।
এই কালো ছায়া আমি আমার বাচ্চার উপর পড়তে দিব না,প্রয়োজনে আমি নিজেই ওকে…
নিজের বাচ্চাকে নিয়ে এমন কথা সহ্য করতে পারে না ভীর।তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে এগিয়ে এসে ভীর ইশায়ার গালে ঠাসসস করে থাপ্পড় বসায়।
ইশায়ার মুখ একপাশে ঘুরে যায়।তার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে ওঠে।
কিন্তু ঠিক পরের সেকেন্ডেই ভীর বুঝতে পারে সে কী করে ফেলেছে। হাত মুঠো হয়ে আসে তার।নিজের চুলে হাত চালিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে।রাগে মাথা ব্যাথা করছে তার।সে এটা করতে চায়নি।এমনিতেই ইশায়ার উপর হওয়া আক্রমণ…
তার উপর এই মিশনের চাপ,আর এখন ইশায়ার মুখে এসব কথা সব মিলিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
নিজেকে জোর করে সামলে নিয়ে তাকে বুকে টেনে নিতে চায়।
কিন্তু ইশায়া ধাক্কা দিয়ে সরে যায়।কান্না করতে করতে মাথা নাড়তে থাকে।

____না… না…না কাছে আসবেন না,
ইশায়ার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।সে ঠিকমতো নিঃশ্বাসই নিতে পারছে না।
ভীরের চোখে মুহূর্তেই ভয় নেমে আসে।
সে তাড়াতাড়ি পানি এনে ইশায়ার সামনে বসে পড়ে।
ভীর পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয়।কিন্তু ইশায়া সেটা নেয় না।সে শুধু মাথা নাড়িয়ে না না করতে থাকে।
ভীর এবার একটু দূরে সরে গিয়ে নিচু গলায় বলে,
___ওকে… আসছি না আমি।
তুমি শ্বাস নাও , স্লো…শ্বাস নাও,
কিন্তু ইশায়া কিছু শুনছে না।সে আতঙ্কের মাঝেই ডুবে গেছে।
কান্না করতে করতে ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
___আপনি যদি আমার কাছে আসেন,আমি সত্যি মরে যাবো দেখবেন,সত্যি মরে যাবো।আপনি আর আমাকে দেখতে পারবেন না। আর পারবেন না দেখতে,শেষ দেখা দেখে নেন।
ইশায়ার কথাগুলো ভীরকে অস্বাভাবিকভাবে নাড়িয়ে দেয়।তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
শ্বাস ভারী হয়ে আসে।

___ সে বুঝতে পারেইশায়া তাকে ভয় পাচ্ছে।
আর সেই ভয়টা এতটাই গভীর যে, মেয়েটা মৃ*ত্যুকেও ভয় পাচ্ছে না।
সে কিছুতেই ইশায়াকে শান্ত করতে পারছে না।
আর সাহস হয় না তার কাছে যাওয়ার।সাহস হয় না শক্ত করে একবার বুকে জড়িয়ে ধরার।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ভীর শেষমেশ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ভীর রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ইশায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা শরীরটা গুটিয়ে নিয়ে ঠান্ডা মার্বেলের উপর শুয়ে পড়ে।কান্নাগুলো বুক ফেটে শব্দ বের হতে থাকে তার।বিশাল রুমটা নিস্তব্ধ।
শুধু ভেসে আসছে তার কান্নার শব্দ।
এদিকে ভীর দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।
ইশায়াকে এভাবে রেখে যেতে তার মন চাইছে না।
ভীর নিজেই বিরক্ত হয়ে ওঠে নিজের উপর।কাজের জন্য তাকে প্রায়ই বাইরে থাকতে হয়।মাসের পর মাস সে দেশের বাইরে কাটিয়েছে।
মৃ*ত্যু, র*ক্ত, যুদ্ধ এগুলোই তার জীবনের অংশ।
তাহলে আজ কেন এমন লাগছে?কেন বুকের ভেতরটা এত ছটফট করছে?কিন্তু সে জানে, তাকে যেতেই হবে।এটাই তার প্যাশন।ভীর কখনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে আসেনি।আর এবারও আসবে না।যারা ইশায়াকে টার্গেট করেছে তাদের শেষ না করা পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না সে।ওদের বাঁচিয়ে রাখার মানে হচ্ছে আবার ইশায়ার দিকে বিপদ এগিয়ে আসা।আর সেটা আমি কিছুতেই হতে দিবে না।আমার প্রানের উপর কোন আচ আমি আসতে দিবো না।যেতেই হবে তাকে…
না হলে এই অবস্থায় কখনোই সে ইশায়াকে ফেলে যেত না।
হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ ইশায়ার শেষ কথাগুলো মাথায় ভেসে ওঠে তার।

___এই নোংরা হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করবেন না।
ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।যাওয়ার সময় বেয়াদব মেয়েটা যা করলো, সে যখনই সবকিছু একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করে,
ঠিক তখনই এমন একটা ঘটনা ঘটে আবার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
ভীর বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে একবার গভীর শ্বাস নেয়।
তারপর আর কিছু না ভেবে সোজা এগিয়ে যায় নিজের প্রাইভেট জেটের দিকে।
চারপাশে তার লোকজন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
ভীর উঠতেই একে একে সবাই উঠে পড়ে।কিছুক্ষণের মধ্যেই জেটের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।ইঞ্জিনের বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে।জেট রানওয়ে ছেড়ে সামনে এগোতে শুরু করে।জেট চালু হওয়ার পর থেকেই ভীরের ভেতরের অশান্তিটা আরও বেড়ে যায়।
একবার নিচের দিকে তাকায়।শহরটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।এই প্রথমবার কোনো মিশনে বের হয়ে তার মন পিছনে পড়ে আছে।
কিন্তু ভীর অনুভূতির কাছে হার মানার মানুষ না।
চোখের দৃষ্টি আবার কঠিন হয়ে ওঠে তার।
পরের টার্গেটের কথা মাথায় আনতেই তার মুখে ফিরে আসে সেই ভয়ংকর নির্দয়তা।

_____তাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা গড়িয়ে যায়।আলো তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে।
নিক ভীরকে বলে ওঠে,
___ব্রো… আজ না গিয়ে একদিন ডিলে করলে হয় না?
ভীর শক্ত গলায় বলে ওঠে,
___নো। আজই শেষ হবে এই গেইম।ফিরতে হবে আমাকে প্যালেসে।
তার চোখে তখন ভয়ংকর ঠান্ডা আগুন।
ওদের শেষ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি লাগবে না। আজ রাতেই হবে যা হওয়ার।
ভীরের কণ্ঠ এতটাই দৃঢ় যে এরপর আর কেউ কিছু বলেনি।
জায়গাটা সান লুসিয়ানো ভ্যালি।কিন্তু ভীর সেখানে যায়নি।তার পরিকল্পনা একেবারে নিখুঁত।সে আগে যায় কালাব্রিয়া রাভেনা ক্লিফে।সব কিছু হিসেব করেই এগোচ্ছিল ভীর।তার প্ল্যান সব দিক নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ঠিক মধ্যরাতে আক্রমণ করবে সান লুসিয়ানো ভ্যালিতে।
এমনভাবে আঘাত করবে, যাতে তার জিৎ নিশ্চিত থাকে।আর তার দখলদারিত্ব আরও একটি রাষ্ট্রের উপর জায়গা পায়।
ভীর কখনো হুট করে কিছু করে না।সে যুদ্ধ শুরু করার আগেই জয়ের পথ তৈরি করে রাখে।আর এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
কিন্তু ভীরের পিছনে তার-ই মানুষ তার সাথে কি করছে সে নিয়ে বিন্দুমাত্র ও ধারণা নেই তার।

___ ভীর মনে করছে সব কিছু তার প্ল্যান মতোই এগোচ্ছে।প্রতিটা চাল তার নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু এবার জীবনে প্রথমবারবে মতো ভুল সে।কারণ এবার খেলার বোর্ডে আরেকজনও চাল দিচ্ছে।
আর অজান্তেই ভীর ধীরে ধীরে হাঁটছে তাদের সাজানো ফাঁদের ভেতর।ডাবল গেইম চলছে।
আর তারা ঠিক সেটাই করছে , যেটা ওরা চাচ্ছে।
মধ্যরাতের মিশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে দ্রুত।
বিশাল টেবিলের উপর ছড়িয়ে রাখা ম্যাপ।
কোথা থেকে আক্রমণ হবে, কে কোন পজিশনে থাকবে, কোন টিম কোথায় যাবে কে কি করবে সব কিছু নিয়ে আলোচনা চলছে।ডিয়েগো বারবার রুট চেক করছে।নিক অ*স্ত্র রেডি করছে তার।সান্তিয়াগো গার্ডদের নির্দেশ দিচ্ছে।সবাই ব্যস্ত আসন্ন লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে।
ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে ম্যাটিয়াস গার্ডদের খাবারে বি*ষ মিশিয়ে দেয়।
তার ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে ওঠে।তাদের এত দিনের পরিকল্পনা আজ সফল হওয়ার পথে।

___অর্ধেক কাজ শেষ,
নিচু স্বরে নিজেকেই বলে সে।এখন বাকি কাজ লুকা আর মাতেও এর।
____অন্যদিকে মাতেও আর লুকা নিজেদের প্ল্যান অনুযায়ী এগোতে থাকে।
হাজার হাজার সশস্ত্র গার্ড নিয়ে তারা পুরো জায়গাটা ঘিরে ফেলছে। কালাব্রিয়া রাভে*না ক্লিফ পুরো জায়গাটা তারা ঘিরে ফেলে। চারদিক নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।
____হঠাৎ দ্রুত পায়ে দৌড়ে আসে সান্তিয়াগো।
তার মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক।বস…. ওরা এখানে!
কথাটা শুনা মাত্র মুহূর্তেই স্থির হয়ে যায় সবাই।
নিক, ডিয়েগো, রাফা সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
যে জায়গায় তাদের আক্রমণ করার কথা সেখানে তাদের জায়গায় উল্টো শত্রুরা আগে থেকেই পৌঁছে গেছে।
তারা এখানে এই খবর ওরা পেল কীভাবে?
এক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশ থমকে যায়।
কিন্তু এখন এসব ভেবে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
কারণ ওরা কেউই পিছু হটার মানুষ না।ভীর নিজের ব*ন্দুকটা হাতে নেয়।তার চোখে ভয়ংকর স্থিরতা।

____অ্যাটাক।
শুধু একটাই শব্দ। আর পরের মুহূর্তেই চারপাশ কেঁপে ওঠে গু*লির শব্দে।
অন্ধকার রাতের বুক চিরে একের পর এক গু*লি ছুটে যেতে থাকে।
দুই দিক থেকেই শুরু হয় ভয়ংকর সংঘর্ষ।কেউ আশ্রয় নিয়ে গু*লি চালাচ্ছে, কেউ সামনে এগিয়ে আক্রমণ করছে।মাটিতে পড়ে যাচ্ছে একের পর এক দেহ।
নিক ঠান্ডা মাথায় একের পর এক শত্রুকে শেষ করছে।ডিয়েগো নিজের টিম নিয়ে বাম দিক সামলাচ্ছে।লুইস আহত হয়েও থামছে না।
আর ভীর সে পুরো যু*দ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে ভয়ংকর ছায়া।তার চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই।
শুধু একটাই লক্ষ্য আজ সব শেষ করবে সে।
রাত যত গভীর হচ্ছে সংঘর্ষ তত ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।
ভীরের লোকেরা একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।কেউ বুক চেপে ধরছে, কেউ শ্বাস নিতে পারছে না।চারপাশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।নিকো প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
সে দ্রুত সামনে গিয়ে একজনকে ধরে ঝুঁকতেই থমকে যায়।লোকটার মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে।
চোখ উল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
নিকোর বুকের ভেতর ধাক্কা লাগে,

___শিট… বি-ষ!
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে।স্পেশাল ফোর্স, কিলার ইউনিট আর আরও গার্ড আনাতে বলে।
কিন্তু ভীর শক্ত গলায় বলে ওঠে,
___ওদের আসতে অনেক দেরি হবে। আমাদের হাতে এত সময় নেই।
তার চোখ তখনও স্থির সামনে।
___যা করার… আমাদেরকেই করতে হবে।কথাগুলো বলতেই ভীর সামনে এগিয়ে যায়।
একা।চারদিক থেকে গু*লি ছুটে আসছে, অথচ সে থামছে না।
এক হাতে বড় ধাতব ছু*ড়ি, অন্য হাতে লোডেড গা*ন।সে যুদ্ধক্ষেত্রের এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন।একটার পর একটা শত্রুকে শেষ করতে করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে ভীর।
তার চোখে কোনো ভয় নেই।শুধু ভয়ংকর রাগ আর ধ্বংসের আগুন।
ডিয়েগো চিৎকার করে ওঠে,
___বস! আপনি চলে যান! এদিকটা আমরা সামলে নিচ্ছি!
কিন্তু ভীর কিছুই শুনছে না।সে আরও সামনে এগিয়ে যায়।গু*লির শব্দে কেঁপে উঠছে পুরো কালাব্রিয়া।
ঠিক তখনই নিক দ্রুত এসে ভীরের এক হাত চেপে ধরে।
তার চোখে স্পষ্ট অনুরোধ।
___ব্রো… তুমি পেছনের জঙ্গল দিয়ে চলে যাও। ওইখানে গাড়ি আছে। এদিকটা আমি দেখছি।
ভীর হাত ছাড়িয়ে নেয়।
নিক একদিকে শত্রুদের গু*লি করছে, অন্যদিকে মরিয়া হয়ে ভীরকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।
___ব্রো… একবার ইশায়ার কথা ভাবো!
তার গলা কেঁপে ওঠে।

___তোমার বেবির কথা ভাবো,ওদের তোমাকে প্রয়োজন।
এক মুহূর্তে ভীরের চোখে ইশায়ার মুখটা ভেসে ওঠে।তারপরই সেই অনুভূতিকে চাপা দেয় নির্মম বাস্তবতায়।
ভীর দাঁতে দাঁত চেপে কাটকাট গলায় বলে ওঠে,
___যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো কাপুরুষ আমি নই।
তার কণ্ঠে কঠিন দৃঢ়তা।
চারদিকে গু*লির শব্দ, আগুনের ঝলক আর মৃ*ত্যুর আর্তনাদ।সান্তিয়াগো এখনো লড়াই করে যাচ্ছে।শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত লাগলেও সে থামেনি।
একটার পর একটা শ*ত্রুকে শেষ করছে।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিচিত ছায়ার উপর,ম্যাটিয়াস।
প্রথমে বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারে না সান্তিয়াগো।এগিয়ে যায় সে পরের মুহূর্তেই তার বুক কেঁপে ওঠে ম্যাটিয়াস।
তাদের নিজেদের লোকদেরই মারছে।
যাদের সাথে বছরের পর বছর একসাথে কাজ করেছে,র*ক্তের থেকেও গভীর সম্পর্ক তাদের সাথে।এক এক করে তাদেরই শেষ করে দিচ্ছে সে।তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
চারপাশের বিশৃঙ্খলার মাঝেও একসময় চোখাচোখি হয়ে যায় দুজনের।সেই মুহূর্তে সান্তিয়াগো সব বুঝে যায়।
বিশ্বাসঘাতকতা।পুরোটা সময় ম্যাটিয়াস তাদের সাথেই ছিল। তাদেরই মৃ*ত্যুর পথ তৈরি করছিল নিঃশব্দে।
বিষয়টা বুঝতেই ম্যাটিয়াসের ঠোঁটে একটা ভয়ংকর হাসি ফুটে ওঠে।
সেই হাসিতে কোনো অনুশোচনা নেই।
কোনো দ্বিধা নেই,শুধু নির্মমতা।
সান্তিয়াগো কিছু বলতে যাবে তার আগেই বিদ্যুতের মতো দ্রুত গতিতে ম্যাটিয়াস হাতে থাকা ছু*রিটা সোজা তার পেটে ঢুকিয়ে দেয়।

___সান্তিয়াগোর শরীর কেঁপে ওঠে।তার মুখ দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে আসে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে যায় অবিশ্বাসে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, এই মানুষটাই তাকে আঘাত করেছে।
ঠিক তখনই দূরে ভীরকে দেখতে পায় সান্তিয়াগো।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছটফট করে ওঠে।
কাঁপা হাত ওঠায় সে ভীরের দিকে ইশারা করার চেষ্টা করে।
ঠোঁট কাঁপছে তার,কিছু বলতে চাইছে
কিন্তু তার আগেই ম্যাটিয়াস শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরে।
তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও ছু*রিটা সান্তিয়াগোর পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়।
এবার আরও গভীরভাবে।সান্তিয়াগোর শরীর কেঁপে ওঠে।তারপর চোখ জোরা বন্ধ হয়ে যায়।
____যারা সেই খাবার মুখে তুলেছে, তারা অনেক আগেই প্রাণ হারিয়েছে।
মৃ*ত্যু ধীরে ধীরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।সংখ্যায় অনেক কম হওয়ার পরেও ভীরের লোকেরা হার মানেনি।

র*ক্তাক্ত শরীর নিয়েও তারা লড়াই করে যাচ্ছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
কারও চোখে ভয় ছিল না,ছিল শুধু আনুগত্য আর শত্রুকে উপহাস করার দুঃসাহস।
চারপাশে ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে বাতাস।
ঠিক সেই সময় রাফা ছুটে এসে সান্তিয়াগোর খবর জানায়।খবরটা শুনে নিক চোখ বন্ধ করে ফেলে।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে যায়।
সান্তিয়াগো এতদিনের বিশ্বস্ত সহচর, ছায়ার মতো পাশে থাকা মানুষ এখন আর নেই।
ডিয়েগোর মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে আসে।
চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।
আর ভীর তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ভয়ঙ্করভাবে।

চোখের গভীরে জমে ওঠে দহন, নীরব আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে।
ডিয়েগো, নিক আর এনরিকো ভীরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ।
তাদের একটাই লক্ষ্য যেভাবেই হোক ভীরের গায়ে যাতে কোন আঁচড়টুকুও না লাগে।
ভীর তাদের অস্তিত্ব, তাদের শেষ ভরসা।
নিক আবারও করুণ গলায় বলে ওঠে,
___ও ব্রো, চলে যাও না প্লিজ,তোমার একটু কিছু হলে আমি মরে যাব।প্লিজ ব্রো তুমি চলে যাও।
তার কণ্ঠ কাপছে।চোখে ছিল আতঙ্ক, যা জীবনে কখনো প্রকাশ পায়নি।বরারবর-ই কঠোর হিংস্র ব্যক্তিত্বের মানুষ নিক।
কিন্তু ভীরের বেলায় আসলে…
ভীর নিকের কাঁধে চাপড় দেয়।পরিস্থিতির ভয়াবহতার মাঝেও তার কণ্ঠ শান্ত।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৬

____কিছু হবে না… রিল্যাক্স।
কিন্তু ভীরের এই.আশ্বাসেও শান্ত হতে পারে না নিক।
তার বুকের ভেতর অজানা ভয় ক্রমশ বিষের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
জীবনে এই প্রথম সে ভয় পাচ্ছে।তবে নিজের জন্য নয় ভীরের জন্য।
ভীরের কিছু হয়ে গেলে ধ্বংস হয়ে যাবে তার পুরো পৃথিবী।এই পৃথিবীতে যদি সে কাউকে আপন মানে তাহলে সেটা ভীর।
আর তার জন্য সে সবকিছু করতে পারে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here