স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮ (২)
সানজিদা আক্তার মুন্নী
সেদিন তৃষ্ণা কে বাড়িতে নিয়ে এসে ওয়াসেম এমনভাবে ভর্ৎসনা করেছিল যে, তৃষ্ণা কোনো কোনোভাবেই কোনো কিছু বুঝাতে পারেনি ওকে। একেবারে নির্বাক, হতবুদ্ধি হয়ে শুধু শুনেই গিয়েছিল ওয়াসেমের চিল্লানি সে।
ওই ঘটনার পর থেকে ওয়াসেম আর তৃষ্ণার সাথে বেশি কথা বলে না। একই ছাদের নিচে থাকা, একই টেবিলে খাওয়া, তবু দুজনের মাঝখানে অলক্ষ্য এক দেয়াল তৈরি হয়ে আছে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তৃষ্ণাও তাকে এড়িয়ে চলে ভুলেও তার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। এই দমবন্ধ করা গুমোট পরিবেশই এখন তাদের দৈনন্দিন ভাষা, যেখানে অকথিত অভিমানই একমাত্র সংলাপ।
আজ বাড়িতে সিতুজা আর ইব্রাহিম সাহেব নেই। পুরো বাড়িটা জুড়ে নেমে এসেছে এক অজানা স্তব্ধতা। চারপাশ এতটা শান্ত, দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটাও কানে বাজে। আর প্রকাণ্ড খাঁখাঁ করা বাড়ির মাঝে উপস্থিত শুধু দুজন মানুষ, ওয়াসেম আর তৃষ্ণা।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে তৃষ্ণা বসার ঘরে বসে টিভিতে একটি পাকিস্তানি নাটক দেখছিল। পর্দায় চলছে কোনো এক পরিবারের টানাপোড়েনের গল্প। সিতুজার সাথে বসে বসে এসব দেখা তারও একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া এই অলস দুপুরে করার মতো তেমন কিছু নেইও। জানালার কার্নিশ গলে ভেতরে ঢুকছে দুপুরের ঝলমলে রোদ, আলোর রেখায় ভাসছে ধূলিকণা। সময় থমকে আছে ঘরের এককোণে।ঠিক এই মুহূর্তে সদর দরজা খোলার শব্দ ভেসে আসে। দুপুরের খাবার খেতে বাড়িতে ফেরে ওয়াসেম।শব্দটা কানে আসতেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। ধরা পড়ে যাওয়া কোনো অপরাধীর মতো তড়িঘড়ি করে টিভিটা বন্ধ করে দেয় সে। এরপর শব্দ না করে, পায়ের আওয়াজ লুকিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়, বোঝাতে চায় সে এই ঘরে ছিলই না। ওয়াসেম বসার ঘরের লাগোয়া ওয়াশরুমে ঢোকে। জলের ছলাৎ শব্দ ভেসে আসে কিছুক্ষণ। হাত-মুখ ধুয়ে এসে সে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। রোদে পোড়া, ঘামে ভেজা চেহারায় নেমে এসেছে ক্লান্তির গাঢ় ছায়া।
রান্নাঘরে ফ্রিজ খুলে লেবু বের করে তৃষ্ণা লেবুর শরবত বানায়। এরই মাঝে সে বারবার ভাবে, আজ হঠাৎ মাঝদুপুরে ওয়াসেম কেন ফিরল! এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত নিয়ে সে বসার ঘরে আসে। গ্লাসের বাইরের দিকটায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমেছে, তৃষ্ণার আঙুলে লেগে আছে হিমেল স্পর্শ। ওয়াসেমের দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরে শান্ত, প্রায় নিষ্প্রাণ স্বরে সে বলে, “শরবত।”
একটি শব্দ। এর চেয়ে কম কিছু বলা যায় না, আর বেশি বলার সাহসও তার নেই।ওয়াসেম একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকায় তৃষ্ণার দিকে। দৃষ্টির অতলে কী লুকিয়ে আছে, রাগ, অভিমান, নাকি অন্য কিছু, তা পড়ার সাধ্য তৃষ্ণার নেই। পরক্ষণেই আচমকা, কোনো দ্বিধা ছাড়াই তৃষ্ণার ওড়নার আঁচলটা টেনে নিয়ে নিজের ভেজা মুখটা মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে, “মা কবে আসবে বলে গেছে?”
এমন আকস্মিক আচরণে তৃষ্ণা কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে যায়। ওড়নার আঁচলটা ওয়াসেমের মুঠোয় আটকে থাকায় সে এগোতেও পারে না, পিছোতেও পারে না। দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ রেখে নিচু গলায় সে উত্তর দেয়, “আগামীকাল বিকেলে আসবেন বলেছেন।”
তৃষ্ণার হাত থেকে শরবতের গ্লাসটা নিতে নিতে হঠাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত এক প্রশ্ন করে বসে ওয়াসেম, “তোর পিরিয়ড শেষ হয়েছে?”
কথাটা কানে যেতেই তৃষ্ণার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক ঝটকায় সমস্ত রক্ত মুখে এসে জমে। এমন প্রশ্ন সে কল্পনাও করেনি, অথচ ওয়াসেম কী অবলীলায় বলে ফেলল! তীব্র লজ্জায় দৃষ্টি অবনত করে অস্ফুট, কাঁপা স্বরে তৃষ্ণা জিজ্ঞেস করে, “আপনি জানলেন কী করে?”
গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে তৃষ্ণার দিকে তাকায় ওয়াসেম। তার কণ্ঠে কোনো বিকার নেই। আকাশ জুড়ে মেঘ জমেছে ঠিকই, তবে বৃষ্টির কোনো ইঙ্গিত নেই। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে, “যেভাবেই জানি না কেন, তোকে যে প্রশ্নটা করেছি তার উত্তর দে।”
তৃষ্ণা লজ্জায় দু-কদম পিছিয়ে যায়। তার বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটা তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে। গলা বুজে আসে তার, কোনোমতে ঠোঁট গলে বেরোয় উত্তর, “হ্যাঁ, শেষ।” এরপর আড়ষ্ট অস্বস্তির মুহূর্তটা কাটাতে তড়িঘড়ি করে বলে, “আমি খাবার দিয়ে আসছি, টেবিলে দেব?”
গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে ওয়াসেম বলে ওঠে, “আজ তোর হাত দিয়ে খাব। যা, খাবার এখানেই নিয়ে আয়।”
কথাটা শুনে তৃষ্ণার ভেতরে বিরক্তির এক সূক্ষ্ম ঢেউ খেলে যায়। নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া? এসব স্বাভাবিকতার ওপর তো কবেই ধুলো জমেছে! আজ হঠাৎ এই আবদার কেন? তবুও মুখে কিছু না বলে চুপচাপ রান্নাঘর থেকে খাবার বেড়ে নিয়ে আসে সে। ভাত, তরকারি সাজানো একটা প্লেট, যার ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে তার না-বলা অসংখ্য প্রশ্ন।
এরই ফাঁকে ওয়াসেম টিভি অন করে একটি অ্যাডাল্ট মুভি প্লে করে দেয়। সচরাচর এসব সে দেখে না, তৃষ্ণা জানে। আজ তার কেন এমন ইচ্ছে হলো, কে জানে!
তৃষ্ণা খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ওয়াসেমের পাশে বসে, তবে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে। ব্যবধানটুকুই তার শেষ প্রতিরক্ষা, পার না হওয়ার মতো সীমারেখা। সূক্ষ্ম দূরত্বটুকু খেয়াল করে ওয়াসেমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। তৃষ্ণা ধীর হাতে ভাত মেখে ওয়াসেমের মুখে তুলে দিতে থাকে। আঙুলে ভাতের উষ্ণতা, আর মাঝে মাঝেই ওয়াসেমের ঠোঁটের অপ্রত্যাশিত স্পর্শে তার হাতটা কেঁপে ওঠে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে কাঁপুনি লুকাতে।
হঠাৎ টিভির পর্দার দিকে চোখ পড়তেই তৃষ্ণা ছ্যাঁত করে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বুকের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবে, কীসব দেখছে লোকটা! একটুও ঘেন্না লাগে না?
তৃষ্ণাকে ওভাবে চোখ-মুখ কুঁচকে থাকতে দেখে ওয়াসেম ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কী রে, কী হলো? চোখ-মুখ কুঁচকে আছিস কেন?”
তৃষ্ণা ভেতরের সবটুকু সাহস একত্র করে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। গলায় একরাশ অস্বস্তি আর অনুরোধ মিশিয়ে বলে, “এগুলো সরান তো, কেমন অস্বস্তি লাগছে।”
কথাটি শুনে ওয়াসেম রিমোট চেপে টিভিটা বন্ধ করে দেয়। পর্দা নিভে যেতেই ঘরটা আবার নিজস্ব আবহে ফিরে যায়। পরক্ষণেই ওয়াসেম এক ভিন্ন দৃষ্টিতে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন হাসি আছে, আবার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ইঙ্গিত। ধীর কণ্ঠে সে বলে, “চল বন্ধ করলাম। কিন্তু তুই বাস্তবে আমাকে এর অনুভব করানোর সুযোগ দিবি তো?”
কথাটার গূঢ় অর্থ তৃষ্ণার মাথায় ঢোকে না। অথবা ঢোকে, কিন্তু সে বুঝতে চায় না। না বুঝে, কিংবা না বোঝার ভান করে সে মাথা নিচু করে থাকে। দুজনের মাঝের দূরত্ব আরও কমে আসে। এমন পরিবেশ, যেখানে দুটো মানুষের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। বাইরে দুপুরের কড়া রোদে কোথাও একটা পাখি ডাকছে বিরহ-কণ্ঠে, জানালার পর্দাটা হালকা হাওয়ায় দুলে ওঠে আনমনে।
এর কিছুক্ষণ পর, অন্য কোনো দিনের মতো নয়, ওয়াসেম সামান্য ঝুঁকে এসে তৃষ্ণার কপালে আলতো করে একটি চুমু এঁকে দেয়। অকপটে, কোনো কথা ছাড়াই। বহুদিন ধরে জমে থাকা অভিমানের জমাট বরফে ফাটল ধরেছে এই প্রথম। আর ফাটল বেয়ে কে জানে, হয়তো উঁকি দিচ্ছে বসন্তের প্রথম আভাস।
নাজহা বাচ্চাদের নতুন সুন্দর পোশাক পরিয়ে দিচ্ছে। আজ বাড়িতে উৎসবের আমেজ, সিমরান আর রুদ্রের বিয়ের পাকা কথা হবে আজ।
ভোর থেকেই শিকদার বাড়িতে তুমুল হইচই। উঠানে বাঁশের প্যান্ডেল খাটানোর কাজ চলছে, নিচতলার বড় হলঘরে টানানো হয়েছে আনকোরা পর্দা। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ঘি আর তেজপাতার ম-ম সুবাস। কর্তা নারীরা ব্যস্ততায় গলা চড়াচ্ছেন, কাজের লোকেরা ডানে-বাঁয়ে ছুটোছুটি করছে। চারপাশের এত কোলাহলের মাঝেও নাজহার কামরাটি একেবারেই শান্ত এক বিচ্ছিন্ন প্রবালদ্বীপ। জানালার পর্দার ফাঁক গলে সকালের রোদ এসে পড়েছে খাটের ওপর গুছিয়ে রাখা নতুন কাপড়ের স্তূপে। মেয়ের জন্য ক্রিম কালার ফ্রক আর দুই ছেলের জন্য একই রকম সাদা-নীল পাঞ্জাবি রাখা আছে সেখানে।
সবকিছু ঠিকঠাকমতো এগোবে ভেবেই এত বিপুল আয়োজন। তৌসির ইন্ডিয়া থেকে ফিরলেই বিয়ের সানাই বাজবে, এমনটাই শুনেছে নাজহা। রুদ্র তো এখানেই থাকে, তার নিজস্ব আপন ঠিকানা নেই। সে আজীবন এই বাড়িতেই থেকে যাবে বিধায় গোটা অনুষ্ঠানের সাজসজ্জা শিকদার বাড়ির তরফ থেকেই হচ্ছে।
নাজহা মেয়েকে গাউন পরিয়ে দিচ্ছে। আঙুলগুলো ফ্রকের কাজের ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে, পেছনের চেইনটা টেনে দিচ্ছে ধীরেসুস্থে। অথচ তার মনটা বড্ড বিষণ্ণ। এই বিষণ্ণতার আসল কারণ সে নিজেও পুরোপুরি ঠাওর করতে পারে না। এই যে নাজহা তৌসিরের সাথে এখন আর আগের মতো রাগারাগি করে না। বাচ্চারা দৌড়ে বাপের কাছে ছুটে গেলেও আটকায় না, বরং কোলে নিতে দেয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে নিগূঢ়, অসম্পূর্ণ কাহিনি আছে। ঘটনাটি মাসখানেক আগের। সেদিন দুপুরের পড়ন্ত বেলার ম্লান আলোটুকু নাজহার মস্তিষ্কে গেঁথে আছে। নাযেম চাচা তাকে ছাদে একা পেয়েছিলেন। শুকনো কাপড়ের লাইনের ওপারে দাঁড়িয়ে তিনি অনেকটা সময় নিশ্চুপ ছিলেন, এরপর ডেকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন তাকে। সেদিন তিনি তাকে পুষ্পের কথা জানিয়েছিলেন। কীভাবে সব জানতে পেরেছিলেন, কীভাবে লড়াই করেছিলেন, সব খুলে বলেছিলেন। এরপর দেখিয়েছিলেন মৃত্যুর আগের বীভৎস পুষ্পর পচন ধরা শরীরটা। নাজহা আজও স্মৃতির পাতায় ঐ দৃশ্যের দুর্গন্ধ টের পায়। গলা ভারী করে, চোখে জল নিয়ে বয়স্ক মানুষটি বলেছিলেন, “মা, তুমি তৌসিরকে দোষ দিও না। আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভীষণ অসহায়। আম্মা আমাদের সবাইকে আটকে রেখেছে। ঐদিন তোমাকেই মারার কথা ছিল। তৌসির তোমার বদলে তোমার চাচাকে বলেছে। মারা বলতে তোমার লাশ বলি দেওয়ার কথা ছিল। তুমি এসবের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝবে না। শুধু জেনে রাখো, আমরা সবাই পরিস্থিতির শিকার।”
ঠিক এতটুকুই তিনি বলতে পেরেছিলেন। বাকি কথাগুলো নিজের ভেতরেই চেপে গিয়েছিলেন, মুখ ফুটে উচ্চারণ করলেই হয়তো মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ত।
এরপর থেকেই নাজহা, ইকরা আর সিমরান মিলে বিবিজানের ওপর নজরদারি শুরু করে। আর ঠিক তখনই চোখে পড়ে ছোট ছোট অমীমাংসিত রহস্য, যেগুলো আগে কখনো কারও ভাবনায় আসেনি। মাঝরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একদম ভোরের দিকে ফিরে আসেন তিনি। ওনার পোশাকে লেপ্টে থাকে মাটি আর পোড়া ছাইয়ের উৎকট গন্ধ। বাড়িতে মানুষজন মেরেকেটে বিশ থেকে ত্রিশ জন হবে, অথচ প্রতিদিন রান্না হয় চল্লিশ কিংবা ষাট জনের। বাড়তি খাবারগুলো কার পেটে যায়, তা কেউ জানে না। পচা মাংসের প্যাকেট নিয়ে বাইরে যাওয়া, আবার মিষ্টির বাক্সে পুরো ফ্রিজ ভরে রাখা। মিষ্টিগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে গেলেও কেউ মুখে তোলে না। এসবই আসলে কালো জাদুর অংশ, যা এখন নাজহা খুব সহজেই মেলাতে পারে।
ঠিক এই কারণেই তৌসিরের ওপর আর আগের মতো ক্ষোভ জন্মায় না নাজহার। অথচ এখন ঠিক কী করা উচিত, তা তার জানা নেই। মানুষটাকে সে পুরোপুরি ক্ষমাও করতে পারছে না, আবার কোনো অভিযোগও তুলছে না। পুরো বিষয়টা তার কাছে আজও পরিষ্কার নয়। সে শুধু সত্যের খণ্ডিত অংশটুকু জানে, তৌসির হয়তো সত্যিই পরিস্থিতির শিকার। নাযেম চাচা নাজহাকে সতর্ক করেছেন, বাইরের কাউকে কিছু জানাতে কঠোরভাবে বারণ করেছেন। তিনি শুধু চেয়েছেন, ওরা সুখে থাকুক। অন্তত ওদের একটা সুন্দর সংসার গড়ে উঠুক।
নাজহা মেয়েকে তৈরি করে এবার ছেলেদের পাঞ্জাবি পরিয়ে দেয়। নাওয়াবের গলার বোতাম আঁটতে গিয়ে আচমকাই থমকে যায় সে। বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাতেই তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে। এসব কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায়, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে আসে। বাইরে সবার মুখে হাসিখুশি ভাব, আলপনা আঁকা হচ্ছে, চলছে নতুন জীবনের আনন্দময় আয়োজন। অথচ এই বাড়ির দেয়ালজুড়ে লেপ্টে আছে এক অভিশপ্ত অন্ধকার ছায়া, যা ভেতরের প্রতিটি মানুষকে অশুভ মায়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
নাজহা তিনজনকে সাবধানে বিছানায় বসিয়ে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখের জলের আর কোনো বাঁধ মানে না। টুপটুপ করে নোনা জল ঝরে পড়ে বাচ্চাদের নতুন পোশাকে দাগ ফেলে দেয়, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তার সমস্ত সত্তা জুড়ে শুধুই ভয়, এক অজানা, অন্ধকার, নাম না জানা আতঙ্ক। ভয়ংকর ডাইনি বুড়ি, বিবিজান! যার চোখে অহর্নিশ জ্বলে পৈশাচিক আগুন, যে রাতের আঁধারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, পচা মাংস নিয়ে ছুটে চলে অপরিচিত কোনো গন্তব্যে, যেখানে মানুষের দৃষ্টি পৌঁছায় না, যেখানে চলে শুধু অন্ধকারের সাথে অন্ধকারের লেনদেন। ওই বুড়ির বিষাক্ত নজর যদি তার বাচ্চাদের ওপর পড়ে? যদি এদের ছোট্ট প্রাণগুলো নিয়ে ছিনিমিনি খেলে?
“ইয়া আল্লাহ,” নাজহা ডুকরে কেঁদে ওঠে, বুকের ভেতরটা ভাঙনের মতো কেঁপে ওঠে তার, “আমার বাচ্চাগুলারে তুমি হেফাজত করো মাবুদ। ঐ ডাইনির নজর থেকে এদের দূরে রাখো।”
ঠিক তখনই সশব্দে দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে তৌসির। পরনে তার সাদা পাঞ্জাবি, অবিন্যস্ত চুল, আর চোখেমুখে পরিচিত বেপরোয়া দাম্ভিকতা। ঘরে ঢুকতেই সে ঘোষণার সুরে বলে ওঠে,
“এই নাজহা, তোর তো সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শুরু হবে। আগামী দু’মাস পর থেকে ভার্সিটি যাবি। আমি কথা বলে রাখছি সব জায়গায়। ভিসির সাথেও কথা বললাম, এক্সাম দিতে পারবি, কোনো সমস্যা হবে না।”
তৌসিরের গমগমে কণ্ঠস্বর শুনে নাজহা তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে নেয়, অভ্যাস হয়ে গেছে তার, এই বাড়িতে অশ্রুও লুকিয়ে ফেলতে হয়। বাচ্চাদের বিছানায় সাবধানে বসিয়ে শুকনো গলায় জবাব দেয়, “দিব। কিন্তু এদের কী করব?”
তৌসির গায়ের পাঞ্জাবিটা এক টানে খুলে সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলে। ভেতরে পরা সাদা গেঞ্জিতে তার সুঠাম কাঁধ আর বুকের প্রশস্ত গঠন স্পষ্ট। বিছানার দিকে এগিয়ে এসে বসতে বসতে সে এক চিলতে বাঁকা হাসি হেসে বলে,
“ওদের আমি রাখমু, সমস্যা কী? যদি ইন্ডিয়া থেকে বাঁইচা ফিরি, তবে তুই পরীক্ষা দিবি ইনশাআল্লাহ।”
‘ইন্ডিয়া থেকে বেঁচে ফিরি’, কথাটা কানে যেতেই নাজহার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, ঠিক অন্ধকার কুয়োয় ভারী পাথর ফেলে দেওয়ার মতো। এই লোকটা এত অনায়াসে মৃত্যুর কথা বলে কীভাবে? এমন ভাবে বলে যে মৃত্যু সম্ভবত তার কোনো পুরোনো পরিচিত প্রতিবেশী, যার সঙ্গে নিয়মিত তার সালাম-কলাম বিনিময় হয়! কিন্তু নাজহা মুখে কিছু প্রকাশ করে না। শুধু মাথা নেড়ে অস্ফুট স্বরে বলে, “হুম।”
সে বিছানা থেকে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে “আম্মি” লেখাটা দেখেই নাজহার শুকনো ঠোঁটে এক টুকরো স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে, যার ভোরের কুয়াশায় ফোটা এক ফোঁটা শিশিরের মতো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু বড্ড আপন।
ফোন রিসিভ করে সে হাসিমুখে বলে, “আসসালামু আলাইকুম। কী অবস্থা আম্মি?”
ওপাশ থেকে নাওলার নরম কণ্ঠ ভেসে আসে, “এই তো আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো? বেবিরা কী করছে?”
নাজহা ঝটপট ব্যাক ক্যামেরায় বাচ্চাদের দেখায়। “এই দেখো, ওরা আর কী করবে? ওদের তো সুখের জীবন, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, আর কোলে চড়া। বিন্দাস লাইফ!”
ওপাশে নাওলার মৃদু হাসি দিয়ে বলেন,
“সবারই এমন বিন্দাস জীবন ছিল একসময়। ওরা ঘুমায় ঠিকমতো?”
“হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ, ঘুমায়।”
নাওলার বলেন,
“মাশাল্লাহ। “জানো, তুমি আর তোমার ভাইকেও আমি এভাবেই রাত জেগে বড় করেছি। তুমি তো ঘুমোতেই না, সারা রাত কাঁদতে। তোমার কান্নার চোটে বাড়ির সবাই উঠে যেত। রাতের বেলায় তোমার চাচ্চুরা, ফুফুরা এসে তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরত। তোমার বাবার চেয়ে তোমার চাচ্চুরাই তোমাকে বেশি ভালোবাসত।”
ছোট চাচ্চুদের কথা মনে পড়তেই নাজহার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে, চোখ আবার ভিজে আসে। মলিন গলায় সে বলে, “বাসত না আম্মি, এখনো বাসে। বিয়ে হয়ে বাচ্চার মা হয়ে যাওয়ার পরও ছোট চাচ্চুরা কল দিলে বাচ্চাদের মতো কথা বলে। বাদ দাও এসব। তোমার কী অবস্থা, ভাইয়া কী করে?”
নাওলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, তাঁর দীর্ঘশ্বাসে একাকী সংসারের সব ক্লান্তি পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। “কী আর করব! আমার হাসবেন্ড ইতালিতে, তাই সংসারের সব চাপ এখন আমার ওপর। আর তোমার ভাই তো রুম থেকে প্রয়োজন ছাড়া বেরই হয় না। কাল বকেছি খুব, বললাম বাইরে যা, ফ্রেন্ডদের সাথে মিশ, ডেট কর! ওর বয়সী ছেলেরা ক্লাবে যাচ্ছে, পার্টি করছে, যৌবন উপভোগ করছো আর ও ঘরের কোণে বসে আছে!”
মায়ের এই অত্যাধুনিক চিন্তাধারার সাথে নাজহা কখনোই তাল মেলাতে পারে মহাশয়। কড়া গলায় সে বলে, “না, ওসব না করে ঘরে থাকাই ভালো। অবাধ্য হওয়ার চেয়ে নাদান হয়ে থাকা অনেক ভালো। ওকে ওর মতো ছেড়ে দাও। তোমার ছেলে-মেয়েদের অবস্থা কী?”
“ওরা ভালো আছে, নিজেদের পড়াশোনা করছে। তবে ওরা জেদ ধরেছে বাংলাদেশে যাবে। ওদের বাবাকে বারবার বলছে।”
“তো নিয়ে আসো, ঘুরেফিরে যাও।”
“কোথায় আসব বলো তো? কোনো আত্মীয় আছে?”
মায়ের এই প্রশ্নটা নাজহার বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে যায়। আত্মীয়! এই এক শব্দটাই তো এখন সবচেয়ে বড় বিভীষিকা। নাজহা কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে যখন চুপ করে আছে, ঠিক তখনই পাশ থেকে তৌসির ফোঁড়ন কেটে ওঠে,
“আমাদের বাড়িতে আসতে ক, সমস্যা কী?”
নাজহা সজোরে তৌসিরের বাহুতে একটা ধাক্কা দেয়। চোখেমুখে তীব্র বিরক্তি নিয়ে এমনভাবে ওর দিকে তাকায়, মনে হয়
দৃষ্টি দিয়েই হয়তো তাকে ভস্ম করে ফেলবে। কিন্তু ফোনের ওপাশে মা আছেন, তাই কণ্ঠে কৃত্রিম মিষ্টতা এনে বলে, “আ, আসতে পারো। আমার শ্বশুরবাড়িতে কোনো সমস্যা নেই, এখানেই থাকতে পারো। আমার হাসবেন্ড বলল তোমাদের আসতে।”
কথাটা বললেও ভেতরে ভেতরে নাজহা কাঁপছে, মনে হচ্ছে তার নিজের জিভেই মাকে ডেকে এনেছে এই মরণফাঁদে। মা এই বাড়িতে এলে বিবিজানের বিষাক্ত নজর তাঁর ওপর পড়বে না তো? এই কালোজাদুর জঘন্য জালে তার নিজের মা-ও জড়িয়ে গেলে কী উপায় হবে? না, না, এটা হতে দেওয়া যায় না!
নাওলা সহজ গলায় বলেন, “আচ্ছা দেখি, ও আসুক, তারপর কী হয়।”
“আচ্ছা দেখো। ভাইয়াকে নিয়ে এসো। আমি এখন রাখি আম্মি, বাড়িতে বিয়ের আয়োজন তো, অনেক কাজ।”
“ওকে ওকে, টেক কেয়ার ইয়োরসেলফ সুইডি।”
কল কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই নাজহার মুখের কৃত্রিম হাসিটা কর্পূরের মতো উবে যায়। ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে সে ঝট করে তৌসিরের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে তার রাগের আগুন, ভ্রু কুঁচকানো, শ্বাসে শ্বাসে স্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে ক্রোধ।
“আপনাকে পণ্ডিতি করতে কে বলেছে? সব জায়গায় গায়ে পড়ে কথা বলতে চলে আসেন কেন?”
তৌসির সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে, এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে দেয়। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে পরিচিত ত্যাড়া হাসি, যেটা দেখলে নাজহার রাগ গিয়ে সোজা মস্তিষ্কে আঘাত করে। সে বলে,
“আমি কোথায় কার জায়গায় ভাব নিলাম? আমি তো আমার বউয়ের জায়গায় কথা বললাম!”
‘বউ’, শব্দটার সাথে জুড়ে দেওয়া ঐ অশ্লীল গালি! নাজহার রাগ এবার সপ্তমে চড়ে যায়। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তৌসিরের দিকে ঝুঁকে পড়ে, নিজের হাঁটু বিছানার ওপর তার কোলের কাছে ঠেকিয়ে, দু’আঙুলে তৌসিরের থুতনি শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
“নিজের এই বিষাক্ত জবান এবার বন্ধ রাখুন!”
তৌসির ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায়। নাজহার মুখটা এত কাছে যে, ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস তার মুখে এসে পড়ছে। রাগে নাজহার ফরসা গাল দুটো লাল হয়ে গেছে, চোখ দুটো ছলছল করছে, কপালে কয়েক গাছি চুল লেপ্টে আছে ঘামে। রাগে আর আবেগে তাকে আজ আরও সুন্দর, আরও জ্বলন্ত দেখাচ্ছে। তৌসির কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে নিজের দুটো হাত নাজহার কোমরে রাখে, শক্ত করে ধরে রাখে যাতে সে পড়ে না যায়। তারপর নাজহার চোখের অতল গভীরে তাকিয়ে ধীর, নরম ও শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“বিশ্বাস কর কৈতরি, আমি ভালো কথাই বলতে চাই। কিন্তু ঐ কথা গলা পর্যন্ত আইসা গালিতে রূপান্তর হইয়া যায়। এইটা কি আমার দোষ?”
‘কৈতরি’, এই একটা মাত্র ডাক। শুধু এই একটা ডাকেই নাজহার জমে থাকা সব রাগ নিমিষে গলে জল হয়ে যেতে চায়। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে,
“শরীরে হাত লাগাবেন না। ঘৃণা করি আমি আপনাকে, বুঝতে পারলেন?”
কথাটা তৌসিরের বুকে সরাসরি আঘাত করে। কিন্তু সে হাসে। একটা তিক্ত, যন্ত্রণাময় হাসি, এমন হাসি যেখানে দাঁত বেরিয়ে থাকে, অথচ চোখ দুটো ভিজে ওঠে। তারপর হঠাৎ করেই নাজহাকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসে, নিজের মাথাটা লুকিয়ে রাখে নাজহার বুকে। একটা ক্লান্ত পথিকের মতো, এক অভিশপ্ত, নরকে বন্দী মানুষের মতো, যার মুক্তি নেই, যে জানে তার কোনো মুক্তি নেই। ভারী, ব্যথাতুর গলায় সে বলে ওঠে,
“আমি ঐটারই যোগ্য, কর ঘৃণা।”
এই ছোট্ট একটা লাইনে নাজহার বুকের ভেতরটা কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে চিরে দেয়। এই লোকটা, এই বাধ্য, অভিশপ্ত লোকটা কি সত্যিই শুধু ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য? নাযেম চাচার কথাগুলো আবার কানে বাজে, “আমরা বাধ্য।”
কিন্তু তৌসিরের সাথে এই আবেগঘন মুহূর্তের আয়ু খুব বেশিক্ষণ টেকে না, দুর্গম পথে ক্ষণিকের বিশ্রামের পরপরই আবার পুরোনো মুখোশ। পরক্ষণেই সে তার পূর্বের রূপে ফিরে আসে। বুকে মাথা রাখা অবস্থাতেই তার হাত দুটো নাজহার কোমর বেয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দেয়। ঠোঁটে অসভ্য, বাঁকা হাসি নিয়ে ও বলে,
“আহহ কৈতরি, তোর বুকটা তো ভীষণ নরম।”
বলে সে নিজের কাজে মগ্ন হয়ে যায়। নাজহা চোখ বড় বড় করে হতভম্ব হয়ে যায়। এক সেকেন্ড আগে যে লোকটা এত কষ্ট নিয়ে কথা বলছিল, যার চোখে জমে ছিল অকথিত যন্ত্রণা, সে এই মুহূর্তে এমন করতে পারে? সে দ্রুত তৌসিরের চুল দু’হাতে চেপে ধরে টেনে নিজের থেকে সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তৌসির নাছোড়বান্দা। নাজহা চূড়ান্ত অসহায়ত্ব নিয়ে ডুকরে ওঠে,
“আল্লাহ! তুমি এই নাদান বান্দারে বাচ্চা কেন দিলে?! একে তো নিঃসন্তান রাখার দরকার ছিল! এ তো আমাকে মেরে ফেলল! একে তো এর নিজের যন্ত্রণা, তার ওপর আবার তিন সন্তানের ধকল! ”
রাত এগারোটা। কাজ থেকে ফেরার পর ওয়াসেমকে যত্ন করে রাতের খাবার খাইয়ে, নিজেও কোনোমতে দু-মুঠো মুখে তুলে সংসারের এলোমেলো টুকিটাকি গুছিয়ে নেয় তৃষ্ণা। তারপর ওযু সেরে ভেজা পায়ে ঘরে প্রবেশ করতেই তার চোখ আটকে যায়। বিছানায় আধশোয়া হয়ে ওয়াসেম আনমনে ফোন ঘাঁটছে। তার মুখের ওপর ঠিকরে পড়েছে স্ক্রিনের ভোঁতা নীলচে আলো, আলো-আঁধারিতে তার চোয়ালের রেখা আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে।
তৃষ্ণা নিঃশব্দে সুইচ টিপে ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়। অন্ধকার ঢেউয়ের মতো নেমে আসে ঘরজুড়ে। শুধু ফোনের ম্লান আভায় ভেসে থাকে দুজনের দুটি ছায়া। অত্যন্ত সন্তর্পণে বিছানায় উঠে সে একপাশে আলগোছে শুয়ে পড়ে। তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন অকারণেই অস্বাভাবিক বেগে বেড়ে যায়। খাঁচায় বন্দি কোনো পাখি বোধহয় প্রথমবার ডানা মেলার চেষ্টা করছে। দুজনের মাঝখানে সীমানাপ্রাচীরের মতো বিভক্ত করে রাখা একটি বালিশ যা নরম তুলোর ভেতর জমে থাকা এতদিনের সব না-বলা দূরত্বের প্রতীক।
কিছুক্ষণ চারপাশ নিথর হয়ে থাকে। শুধু দুজনের শ্বাসের সরু শব্দ, যা ক্রমে ভারী হয়ে ওঠে। দূর সমুদ্রে জোয়ার আসার মতো শব্দ। এরপর তৃষ্ণা আড়ষ্ট হাত বাড়িয়ে ওয়াসেমের পাশ থেকে কাঁথাটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। হাতটা কাঁপছে তার নিজেরই অজান্তে, নিজের এই কাঁথা টানার আড়ালে লুকিয়ে রাখা অন্য কোনো আকুতি হয়তো হাতটি নিজেই বুঝতে পারছে। আমতা আমতা করে সরু, ভাঙা স্বরে সে বলে ওঠে,
” কাঁথাটা…
ওয়াসেম হাতের ফোনটা ধীরে একপাশে সরিয়ে রাখে। অতঃপর সে ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তৃষ্ণার দিকে। অন্ধকারেও তার দৃষ্টির আগুন অনুভব করে তৃষ্ণা উষ্ণ, তীক্ষ্ণ, দীর্ঘদিনের সংযমে পোড়া এক ক্ষুধার্ত চাউনি এই চাওয়া। আচমকাই, তৃষ্ণার হাত থেকে কাঁথাটা কেড়ে নিয়ে অন্যপাশে ছুড়ে ফেলে ওয়াসেম । তার বজ্রাঘাতের মতো এই কাণ্ডে তৃষ্ণার সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে, রক্ত হিম হয়ে আসে শিরায় শিরায়। সে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই মাঝখানের সীমানা-বালিশটাও এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় ওয়াসেম। দুজনের মাঝে আর কোনো প্রাচীর নেই, কোনো ছুতো নেই, কোনো অজুহাত নেই।
তৃষ্ণা রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে এক লাফে উঠে বসে। জড়তা মাখানো, কাঁপা কণ্ঠে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে,
” এটা সরাচ্ছেন যে!”
তার ঘাবড়ে যাওয়া মুখশ্রী দেখে ওয়াসেমের ঠোঁটকোণে মুচকি হাসি ফোটে। আজ তার হাসিতে মেশে আছে দুষ্টুমি আর অতল আদরের রেষ। পরক্ষণেই তৃষ্ণার চিকন কোমর জড়িয়ে ধরে এক হ্যাঁচকা টান দেয় সে। আর তৃষ্ণা নিঃশক্ত হয়ে পড়ে যায় তার প্রশস্ত, উত্তপ্ত বুকের ওপর। ঠিক মনে হচ্ছে ঝরাপাতা এসে পড়েছে অগ্নির বুকে। ওয়াসেমের হৃৎস্পন্দের বন্য তাল, ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে তৃষ্ণার কানে, তার নিজের হৃদয়ের সঙ্গে মিশে যায় এক নতুন ছন্দে। তৃষ্ণার কপালে, গালে আদরের চিহ্ন এঁকে দিতে দিতে ওয়াসেমের ঘোরলাগা, খাঁখাঁ গলা ভেসে ওঠে, “সরাচ্ছি, কারণ সরানোর প্রয়োজন। এত দূরত্বে তো আর সংসার হয় না, তৃষ্ণা!”
কথাগুলো বলতে বলতেই ওয়াসেমের হাত অত্যন্ত সন্তর্পণে তৃষ্ণার কামিজের ভেতর প্রবেশ করে। তৃষ্ণার উন্মুক্ত কোমরে তার আঙুলের আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিতে থাকে। অপ্রত্যাশিত, তীব্র শিহরণে তৃষ্ণার প্রতিটি রোমকূপ কেঁপে ওঠে, তার শরীরজুড়ে বয়ে যায় অগ্নিস্রোত শীতল অথচ দগ্ধ, ভয়ংকর অথচ মধুর। অজানা শঙ্কায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে তার গলা। অবাধ্য ছোঁয়া আটকাতে সে মরিয়া হয়ে ওয়াসেমের হাতটা চেপে ধরে। তবে চেপে ধরার মধ্যেও অস্পষ্ট আকুতি লুকিয়ে আছে, যা সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে “না না না।”
কিন্তু ওয়াসেম আজ অন্য কোনো ঘোরে আচ্ছন্ন মনে হচ্ছে সে কোনো জাদুর বশে, দীর্ঘ ক্ষুধার জাগরণে আছে। সে তৃষ্ণাকে অতি যত্নে বালিশের ওপর শুইয়ে দেয়। একটি ভঙ্গুর ফুলকে পাথরের বেদিতে রাখার মতো। এরপর তার ওপর ঝুঁকে পড়ে ধীর, নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে। তৃষ্ণার গলায় জড়িয়ে থাকা ওড়নাটা সরিয়ে দেয়। সরিয়ে দিয়ে নিজের তপ্ত ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দেয় তৃষ্ণার প্রশস্ত কপালে। চুম্বনের ধারা কপাল থেকে নেমে আসে তার চোখে, গালে, যা গরম হয়ে জ্বলছে লজ্জার নিভৃত আগুনে তার নাকের ডগায় এবং পরিশেষে তার কম্পিত অধরপল্লবে। উন্মত্তের মতো, দীর্ঘ সংযত আকাঙ্ক্ষার বান ডেকে, তৃষ্ণার ওষ্ঠাধর নিজের দখলে নেয় ওয়াসেম। এবং সে এমনভাবে তৃষ্ণা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুয়াতে থাকে যে মনে হচ্ছে বহুকালের তৃষ্ণার্ত পথিক অবশেষে পৌঁছেছে তার অভিলষিত ঝর্ণাধারায়।
তৃষ্ণার কণ্ঠনালী একেবারে শুকিয়ে আসে। অজানা আতঙ্ক আর তীব্র শিহরণের সন্ধিক্ষণে এক হাতে সে বিছানার চাদর মুঠো করে খামচে ধরে। তার আঙুলগুলো সাদা হয়ে ওঠে চাপে, মুঠোর ভেতর সে ধরে রাখতে চাইছে নিজের বিলীয়মান অস্তিত্ব। অন্য হাতে প্রাণপণে সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ওয়াসেমের কাঁধ। ডুবে যাওয়া মানুষের শেষ ভরসার মতো, ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে অজানা অতল তলে। ওর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড পাগলা ঘোড়ার মতো ধুকপুক করে ওঠে, নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে খণ্ড খণ্ড, অস্থির, গরম। ভাঙা বাঁশির অসম সুরের মতো। ওয়াসেমের উন্মত্ত চুম্বনের ধারা ঠোঁট থেকে নেমে আসে তৃষ্ণার শুভ্র গ্রীবা বেয়ে। তার প্রতিটি স্পর্শে তৃষ্ণার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়, প্রতিটি মুহূর্তে তার সমস্ত প্রতিরোধ মোমের মতো গলে যেতে থাকে স্পর্শের অগ্নিতে।
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৭
আচমকাই এক হাতে তৃষ্ণার কামিজের গলাটা মুঠোর ভেতর আটকে ওয়াসেম সজোরে একটা টান দেয়। এক টানেই পোশাকটা ছিঁড়ে দু-খণ্ড হয়ে যায়। ছিঁড়ে যাওয়ার মৃদু শব্দে ভেঙে পড়ে এতদিনের সব বাঁধন, দূরত্ব, অকথিত সংকোচ, লজ্জার প্রাচীর। পরক্ষণেই ওয়াসেম তার তপ্ত ঠোঁটজোড়া নামিয়ে আনে তৃষ্ণার উন্মুক্ত বক্ষে। যেখানে পাগলা বেগে থেমে থেমে নাচছে তার হৃৎপিণ্ড। ভয়ার্ত পাখি প্রথমবার চিনে নিচ্ছে আকাশের বিস্তার।
