Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৭০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৭০

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৭০
সানজিদা আক্তার মুন্নী

সময়ের নিজস্ব কোনো রং নেই, তবু অপেক্ষার প্রহরগুলো কখনো কখনো বুকের ওপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসে। ঠিক এভাবেই কেটে গেছে তেরোটি দিন। তৌসির, ওয়াসেম এবং ইয়াদ বর্তমানে গুজরাটে অবস্থান করছে। রুক্ষ এই শহরে পা রাখার পর দেখতে দেখতে এগারোটা দিন পার হয়ে গেল। অথচ তাদের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি আস্ত বছরের মতো দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে।

খলিলের মতো এক ধুরন্ধর আর রক্তপিপাসের অন্দরমহলে ঢোকা চাট্টিখানি কথা নয়। তার নাগাল পাওয়া তো দূরের কথা, তার ধারেকাছে ঘেঁষাও মৃত্যুর সমতুল্য। এমন এক ক্ষমতাবান মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করা এবং শেষমেশ তার মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব পাকাপাকি করা পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল খাদের কিনারা দিয়ে চোখ বেঁধে হাঁটার মতো। খলিল অথবা তার সাঙ্গোপাঙ্গরা কখনোই তৌসিরদের আসল চেহারা দেখেনি। আর এই সুযোগটাই তারা কাজে লাগিয়েছে দারুণভাবে। ছদ্মবেশের খাতিরে ইয়াদ ও তৌসির তাদের চেনা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। মুখে নিখুঁতভাবে বসানো কৃত্রিম দাড়ি ও গোঁফ এবং চোখের দৃষ্টিতে অচেনা কাঠিন্য সব মিলিয়ে তারা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুজন মানুষ, যাদের দেখে চেনার কোনো উপায় নেই।

অন্যদিকে ওয়াসেমের রূপান্তরটা চমকে দেওয়ার মতো। তার মুখের চিরচেনা রুক্ষ দাড়ি কামিয়ে, নামীদামি স্যালুনে রূপচর্চা করিয়ে তাকে সাজানো হয়েছে কর্পোরেট দুনিয়ার এক আভিজাত্যে মোড়া ধনকুবেরের আদলে। দামি পারফিউমের সুবাস আর মেপে কথা বলার ঢঙে সে এখন পুরোদস্তুর এক অভিজাত পাত্র। অবশ্য এই রূপান্তরের পেছনে জলের মতো টাকা খরচ করাটা ইয়াদের বুদ্ধি ছিল এসব তৌসিরের একদমই পছন্দ হয়নি। কিন্তু ওয়াসেম ইয়াদ জানত, শিকারির সাজ হতে হয় শিকারের চেয়েও রাজকীয়। তাছাড়া খলিলের প্রাসাদে প্রবেশের পথ তৈরি করাটা তাদের জন্য খুব একটা অসাধ্য হয়নি। কারণ গোটা ভারতজুড়ে ওয়াসেম আর ইয়াদের যে বিস্তৃত ও ভয়ংকর অস্ত্র পাচারকারী সিন্ডিকেট জালের মতো ছড়িয়ে আছে, তার দাপটেই খলিলের সদর দরজায় কড়া নাড়াটা সহজ হয়ে যায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই হিসাব নিকাশে পেশিশক্তির চেয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানিই বেশি কথা বলে।

তারা ইচ্ছা করলেই গ্যাংয়ের অন্য কোনো সুঠামদেহী তরুণকে ধনকুবের পাত্র সাজিয়ে খলিলের ডেরায় পাঠাতে পারত। কিন্তু এই দাবা খেলায় প্রতিটি চাল হতে হবে নিখুঁত। খলিলের দুর্গে শুধু প্রবেশ করাটাই শেষ কথা নয়। প্রথমে তার পাহারায় থাকা সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর হিংস্র লোকগুলোকে কৌশলে হাত করতে হবে, তাদের মগজ ধোলাই করতে হবে এবং সবশেষে চূড়ান্ত আঘাতটি হানতে হবে স্বয়ং খলিলের বুকে। যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে পারে, খসে পড়তে পারে ছদ্মবেশের মুখোশ। এমন মৃত্যুফাঁদে দাঁড়িয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ওয়াসেম ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সমস্ত ঝুঁকি আর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ওয়াসেম নিজেই সেজেছে বর। পাত্রের বাবা মায়ের ভূমিকায় নিখুঁত অভিনয়ের জন্য গ্যাং থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছে একজন ঝানু বয়স্ক নারী ও এক বিশ্বস্ত অনুচরকে। ছকের প্রতিটি ঘুঁটি এখন পর্যন্ত একদম তাদের ইশারায় নড়ছে।
এখন শুধু বিয়ের সানাই বাজার অপেক্ষা। শুরুতে তাদের লক্ষ্য ছিল খলিলের ছোট মেয়ে, কিন্তু ততদিনে তার বিয়ে হয়ে গেছে। অগত্যা তাদের রাডারে ধরা পড়ে বড় মেয়ে। এই বড় মেয়ের গল্পটাও বেশ আলাদা। বিয়ে তারও একবার হয়েছিল, কিন্তু বিয়ের পরপরই তার স্বামী রাতের অন্ধকারে নিজের প্রাণটা হাতে নিয়ে পালিয়েছে। খলিল আর তার বাহিনীর পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা ও নির্মম অত্যাচারে জান নিয়ে না পালিয়ে বেচারার উপায়ই ছিল না। আর পলাতক স্বামীর ফেলে যাওয়া শূন্যস্থানে, খলিলের বড় মেয়ের জীবনের নতুন অধ্যায় হয়েই এবার প্রবেশ করতে যাচ্ছে ওয়াসেম। তবে এটি কোনো সাধারণ বিয়ে নয়, এ হলো এক ভয়ংকর প্রতিশোধের শুরু এবং খলিলের পতন নিশ্চিত করার প্রথম প্রহর।

সবকিছু ঠিকঠাক মোড় নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ওয়াসেম করে বসেছে এক মারাত্মক বোকামি। সে বাড়িতে ঘোষণা দিয়ে এসেছে, সে আরেকটা বিয়ে করছে। তৌসির আর ইয়াদ হাজারবার মানা করেছে, হাতজোড় করে বলেছে এই পাগলামিটা না করতে। কিন্তু ওয়াসেম তো পাথরের গায়ে পানি! সে ঠিকই বলে দিয়েছে। তার যুক্তি শুনতে গেলেও মাথা ঘোরে। বিয়ে তো তাকে করতেই হবে, পরিস্থিতির চাপে যদি সত্যিই অন্য মেয়ের সাথে থাকতেই হয়, তাহলে তৃষ্ণাকে আগেই জানিয়ে দেওয়া ভালো। যা হওয়ার পরে হবে, সে তৃষ্ণাকে ঠিকই বুঝিয়ে মানিয়ে নেবে। এখানে মিথ্যার কোনো দরকার নেই। আর একটি ব্যাপারে ওয়াসেমের পূর্ণ দৃঢ়তা আছে, তৃষ্ণার তো তাকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথাই ওঠে না। মেয়েটা ছিল, আছে, আর থাকবে। এই অন্ধ বিশ্বাসটাই ওয়াসেমের সবচেয়ে বড় ভুল।

কিন্তু কথাটা কানে ঢুকতেই তৃষ্ণার কলিজা খাঁ খাঁ করে উঠছে। এই দহন তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ গত বারোটা দিন ওয়াসেম তাকে যা দেখিয়েছে, তা যেকোনো স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর। ভালোবাসা, যত্ন, একান্তে কাটানো সন্ধ্যে, পুরোনো প্রতিটা ভুলের জন্য চোখ ভিজিয়ে মাফ চাওয়া, সবই একদম নিখুঁত, একদম নিষ্ঠুরভাবে নিখুঁত। আর ওই নিখুঁত বারোদিনের ঠিক মাথায়, আজ সকালে, একই মানুষ বলে গেছে, সে আরেকটা বিয়ে করবে। তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা এখন শুধু মোচড় দিয়ে উঠছে না, মনে হচ্ছে কেউ তার কলিজাটা চিপে ধরে পেঁচিয়ে ফেলছে, একটু ঢিল দিচ্ছে, পরক্ষণেই আবার পেঁচাচ্ছে।
রাত এখন এগারোটা। চারপাশে শ্মশানের মতো সুনসান শূন্যতা। তৃষ্ণা বেলকনির সোফায় বসে আছে, ঠিক বসে নেই, বলা যায়, গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। খলিলকে দেখানোর জন্য ভাড়া নেওয়া ভিলাটায় তৌসিররা উঠেছে। ওয়াসেমও দিনের বেলা ওখানেই কাটায়, শুধু রাতে এখানে ফেরে। কিন্তু আজ সকালে বিয়ের কথা বোমার মতো ফাটিয়ে সে চলে গেছে, আর রাত এগারোটা অবধি তার ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। সারাদিন তৃষ্ণার হাতে একটা কাজও ওঠেনি, চোখের পানি মোছাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তার একমাত্র কাজ। এখনো অশ্রু থামছে না। মুছলেই জমছে, জমতেই গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ তৃষ্ণা আকাশের দিকে মুখ তুলে বুক ফাটিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। কণ্ঠটা মনে হচ্ছে তার নিজেরই নয়,

“আমার সাথেই কেন বারবার এরকম হয়? বলো না, কেন? একটু সুখের নাগাল পেলেই কেন সব সর্বনাশ হয়ে যায়! আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছিলাম? একটু আদর, একটু আশ্রয়, একটা ডাক, কেউ ভালোবেসে তৃষ্ণা বলে ডাকবে, শুধু এইটুকু! এটা চাওয়া কি এত বড় পাপ? তুমি আমার কাছ থেকে আমার বাবা-মা কেড়ে নিয়েছ, আমি কোনো অভিযোগ করিনি। সারাজীবন মানুষের ঘরের কোণে দাসীর মতো বেঁচেছি, টুঁ শব্দ করিনি। এবার যখন একটু সুখ দিলে, তখন কেন এভাবে নির্দয়ভাবে কেড়ে নিলে? কেন শুধু আমার সাথেই এমন হয়! কেন!”
​আকাশ নির্বাক। তার জীবনের সব প্রশ্নের মতো বর্তমান প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই। তৃষ্ণা দুই হাতে নিজের হাঁটু খামচে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে। নখ গিয়ে বসেছে গায়ের মাংসে, সে টেরই পাচ্ছে না। শরীরের ব্যথার কাছে বুকের ভেতরের ক্ষতটা ঢের বেশি যন্ত্রণাদায়ক। চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কলিজাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে, গলা দিয়ে এক ঢোঁক থুতু গেলার মতো শক্তিও অবশিষ্ট নেই। সিতুজা তাকে বুঝিয়েছেন, এসব মেকি, কাজের খাতিরে করছে, ভেতরে বিন্দুমাত্র অনুভূতি নেই। কিন্তু যে মেয়ে ভালোবাসাকে প্রাণের চেয়ে বড় মনে করে, তার কাছে ভান করেও অন্য কারো হাত ধরা কি নির্দোষ থাকে? হৃদয় দিয়ে ভেবেছে সে, মস্তিষ্ক দিয়ে নয়। আর হৃদয় দিয়ে ভাবা মানুষগুলোরই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। তৃষ্ণা কোনো যুক্তিতেই মানতে নারাজ। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে যায়,

​”আমি এই লোককে ঘৃণা করি! ভীষণ ঘৃণা করি! সে আমাকে কেবল ব্যবহার করেছে। আমি বোকা, আমি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বোধ! আমি কী করে ভাবলাম, রাস্তার কুকুরের সাথে কেউ সংসার করবে? রাস্তার কুকুরকে মানুষ দুদিন আদর করে বাড়িতে তোলে, তারপর একঘেয়ে লাগলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। আমি হচ্ছি ঠিক ওই কুকুরটা! আমি ঘৃণা করি তাকে! আমি জানি, তাকে ঘৃণা করার যোগ্যতাটুকুও আমার নেই। ওর দেওয়া ঘরে থাকি, ওর দেওয়া পরিচয়ে পরিচিত হই, এটাও আমি জানি! কিন্তু তাও ঘৃণা করি। সে আমাকে বেঁচে থাকার আলো দেখিয়েছিল, তারপর নিজের হাতেই তা নিভিয়ে দিয়েছে। আগে আমি অন্ধকারে ছিলাম, অন্ধকারকেই চিনতাম। তখন ওই অন্ধকার আমাকে কষ্ট দেয়নি। এখন সে আমাকে আলো দেখিয়ে আবার আঁধারে ফেলে দিল। বর্তমান অন্ধকার আর আগের অন্ধকার এক নয়! এবারের অন্ধকারে আমি বাঁচতে পারব না। সে আমাকে মেরে ফেলেছে, অথচ মরতেও দেয়নি! আমার মতো এতিমকে সে আরও বেশি নিঃস্ব করে তুলেছে। যার হারানোর কিছুই নেই, তাকে হারানোর মতো কিছু দিয়ে তারপর কেড়ে নেওয়া, এর চেয়ে বড় নির্মমতা পৃথিবীতে আর আছে? আমাকে শুধু নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যবহার করেছে! প্রয়োজনে এনেছে, প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এবার আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবে! এখন আমি কী করব? বলো, আমি কোথায় যাব? আমি চলে যাব। হ্যাঁ, ঠিক চলে যাব! ও যদি সত্যি বিয়ে করে বউ নিয়ে আসে, তবে এক দরজা দিয়ে ওরা ঢুকবে, অন্য দরজা দিয়ে আমি চিরতরে বের হবো। রাস্তায় থাকব, পথের ধারে থাকব, পায়ের নিচে যেখানে জায়গা পাব সেখানেই ধুঁকে ধুঁকে মরব। কিন্তু এই পাষাণের সামনে আর কোনোদিন আসব সাসব না! কখনো না! আমাকে আর কেউ ব্যবহার করতে পারবে না! এই পাষাণ আমায় শেষ করে দিল, পুরোপুরি শেষ করে দিল…”
​কথাগুলো বলেই তৃষ্ণার গলা আটকে যায়। দুই হাতে মুখ চেপে ধরে সে অনবরত কাঁদতে থাকে। শব্দহীন, অতলান্ত, মরার আগে মরার মতো এক কান্না। রাত বাড়ছে, বারান্দার বাতাস কনকনে হয়ে আসছে, আর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা পলকহীন দুই চোখ ক্রমে ক্রমে একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্তে জমে উঠছে। ওয়াসেম ফিরবে কি আজ রাতেই? আর ফিরলে, দরজা খুলে যে তৃষ্ণাকে সে দেখতে পাবে, মেয়েটা কি আর আগের তৃষ্ণাই থাকবে?

আগামীকালের অনুষ্ঠান নিয়ে ইয়াদ, তৌসির আর ওয়াসেমের পরিকল্পনার অন্ত নেই। কাগজে-কলমে নয়, বরং মনের ভেতর পাকা হওয়া এক গোপন অভিযানের নকশা এটি। মেহেদীর রঙ শুকানোর আগেই বিয়ের আসর জমে উঠবে, এটাই তাদের মূল ছক। তিনজনের চোখে-চোখে গোপন সই করা অঙ্গীকার। ইতিমধ্যে খলিলের অনেক লোককেই তারা চুপিসারে নিজেদের পাল্লায় ভিড়িয়ে নিয়েছে। নকল বর, নকল বরযাত্রী, সবাই তৈরি। মঞ্চের পর্দা ওঠার আগেই নাটকের সব চরিত্র কুলফি-দরবারের মতো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
সব কাজ গুছিয়ে শ্রান্ত শরীর নিয়ে তিন ভাই এসে বসেছে বাগানে। ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত ঠিক বারোটা। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, তবে আকাশের চাঁদের আলো বাগানের গাছপালার ওপর রুপোলি প্রলেপ ছড়িয়ে দিয়েছে। রাতের নিঝুম পরিবেশে এক অজানা বিষণ্ণতা। বাগানের এক কোণে জ্বলে থাকা টিমটিমে আলো তিনজনের মুখে এঁকেছে বিড়বিড়ে প্রতিচ্ছবি। তিনজনের মাথার উপরেই এখন চিন্তার এক ভারী পাহাড় চেপে বসেছে, যা দৃষ্টির অগোচরে থাকলেও তার ভারে ঘাড় নুয়ে আসছে। তৌসিরের মন ভাসছে হাজার মাইল দূরের কোনো এক বাড়িতে, নাজহা আর সন্তানদের কাছে। যেখানে এই সময়ে হয়তো বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজে নিঝুম রাতটা কেঁপে উঠছে। ওয়াসেম আফসোস করছে নিজের বোকামি নিয়ে। খামোখা মাতব্বরি দেখাতে গিয়ে যে ঝামেলার জাল পাকিয়ে এসেছে সে, তা ভাবলেই তার মেজাজ বোমের মতো ফুঁসছে। গালের পেশিতে তার রাগের স্পন্দন, হাতের মুঠো টানটান। একমাত্র ইয়াদের তেমন কোনো চিন্তা নেই। বউকে ভিডিও কলে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে সে নিশ্চিন্তে নিজের কাজে মন দিয়েছে। তার অন্যদিকে, গত বারো দিনে তৌসির একবারও নাজহার মুখটি ঠিকমতো দেখতে পায়নি। নাজহা ফোন ধরলেও নিজে কথা বলে না। ক্যামেরা শুধু বাচ্চাদের দিকে তাক করে বসে থাকে। ফোন দিলে তৌসিরের মনে হয় স্ক্রিনের ওপারে নাজহা নেই, আছে শুধু একজন অনুপস্থিত হস্তক্ষেপকারী। হুট করে দু-একটা শব্দ ছাড়া কোনো কথাই হয় না, “হুম”, “জ্বি”, “ঠিক আছে”। এই তিনটে টুকরো শব্দ দিয়ে বারো দিনের দূরত্ব আরও হাজার মাইল বেড়ে গেছে। আজ আর তৌসিরের তর সইছে না। বুকের ভেতর অজানা এক খালি টান টানছে তার। মনে হচ্ছে কেউ মনে হয় শক্ত করে কিছু একটা টেনে ধরেছে, ছাড়ছে না। সে নিজের ফোনটা তুলে নেয়, আর সরাসরি নাজহার নম্বরে ভিডিও কল দিয়ে বসে।

আজ অবাক করার দিন! এতদিন ক্যামেরার আড়ালে থাকলেও, আজ নাজহা নিজেই ফোন ধরেছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে এক কমনীয় রূপ। নাজহা বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে, বিছানার সাদা চাদরে তাকে দেখাচ্ছে স্নান-শেষের মেঘের টুকরোর মতো। তার এক বাহুতে ছোট্ট তৌশি মাথা রেখে স্তন্যপান করছে। মায়ের বুকের ভাঁজে গা গুঁজে দেওয়া ক্ষুদ্র তার শরীরটা এক গোছা উষ্ণতা, কোলাহল-বিহীন এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। তার ছোট্ট গোলাপি ঠোঁট দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে মায়ের অস্তিত্ব। তার প্রতিটি টানের সাথে সাথে চিবুকটা নড়ছে নিয়মিত ছন্দে, গলার পেশিগুলো ওঠানামা করছে, আর ভেতর দিয়ে নামছে গলগলে তৃপ্তির ঢল। ঢোক গেলার ঢকঢক শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ওর ঠোঁটের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা দুধ গড়িয়ে এসে গালের ভাঁজে আটকে গেছে। নাজহা তা মোছার তাগিদই বোধ করছে না। খাওয়ার ফুর্তিতে তৌশির চোখ দুটো আধবোজা। ঘুম আর তৃপ্তির মাঝামাঝি এক ঘোরে আচ্ছন্ন সে। মাঝে মাঝে পল্লব মেলে সে মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকায়, নিশ্চিত হতে চায় মা ঠিক জায়গাতেই আছে কি না। তারপর আবার নিশ্চিন্তে চোখ বুজে নিজের কাজে মন দেয়। ফাঁকে থাকা অন্য হাতটা দিয়ে নাজহার অন্য স্তনে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। ছোট্ট পাঁচটা আঙুল মৃদু চাপে খুলছে, আবার মুঠি পাকাচ্ছে। বিড়ালের ছানার মতো আপন জায়গাটা পরখ করে নিচ্ছে অবচেতনভাবেই। কখনো কখনো ত্বকে তার সূক্ষ্ম নখের আলতো আঁচড় পড়লেও নাজহার মুখে কোনো বিরক্তির রেখা নেই, বরং ওই আঁচড়েও তার মাতৃত্বের স্বাদ। অস্ফুট সন্তুষ্টির গোঙানিতে ভরা তৌশির গলা, “আং আং” করে দুধের সাথে সাথে সে একটি সুরও গিলছে, যে সুর পৃথিবীর কোনো বাদ্যযন্ত্রে বাজে না, বাজে শুধু মায়ের কোলে।
দৃশ্যটা দেখেই তৌসিরের ঠোঁটে আপনা থেকেই এক চওড়া হাসি ফুটে ওঠে। এই হাসি চোখের কোণ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া, দিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে নেওয়া এক হাসি। আদুরে গলায় সে বলে, “আমার মাইয়া কী করছে? আর ছেলেরা কই?”

নাজহা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই দীর্ঘশ্বাসে সারাদিনের ক্লান্তি, একার দায়িত্ব আর তৌসিরের অভাব মিশে একাকার। অবসাদ-ভরা কণ্ঠে সে বলে, “ওরা ঘুমিয়ে গেছে, কিন্তু এ মহারানী তো ঘুমাচ্ছেই না।”
বাবার গলা শুনেই ছোট্ট তৌশি মায়ের বুক ছেড়ে দেয়। চেনা কম্পন তার ক্ষুদ্র শরীরে বৈদ্যুতিক স্রোত বইয়ে দেয় নিমেষেই। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা দুধের সাদা রেখাটা মোছার আগেই নিজের নীলচে গোলগোল চোখ দুটো কৌতূহলে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বাবাকে খুঁজতে থাকে সে। শব্দের উৎসটা কোথায়, ওই দিকেই মাথা ঘোরে বারবার। গলায় তার এখনও দুধ গেলার অবশিষ্ট শব্দ, কিন্তু কান শুধু পরিচিত স্বরের খোঁজে। নাজহা তৌশির ঠিক সামনে ফোনটা ধরে মিষ্টি হেসে বলে, “এই দেখো আব্বু এখানে।”
তৌসিরকে দেখতে পেতেই তৌশির নীলচে চোখে খুশির ঝিলিক খেলে যায়, যা ভোরের আলোয় সাঁতার কাটা পুকুরের জলের মতো ঝকঝকে। খিলখিল করে হেসে ওঠে সে, এই হাসিতে তার দাঁতহীন মুখটা পুরো স্ক্রিন ভরে দেয়। দুধে-ভেজা ঠোঁটের কোণে হাসির দুটি টোল পড়ে যায়, হাতের দুটো মুঠি উত্তেজনায় আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয় সে। বাবা কে দেখে তার এই ছোট্ট শরীরে খুশিটা ধরছে না কিছুতেই। তৌসিরের মনে হয়, স্ক্রিন ভেদ করে সে যদি মেয়ের তুলতুলে মুখটা একবার ছুঁয়ে দিতে পারতো! হাতটা অবাধ্যে পর্দার দিকে এগিয়ে যায়, আবার থেমে থাকে। কাঁচের ওপারে তার সারা পৃথিবী, আর এপারে শুধু তার অসহায় আঙুল। এপাশ থেকে অত্যন্ত আদুরে গলায় সে ডাকে, “আমার আব্বুটা কই? এই তো, আব্বু এখানে। আব্বু তাড়াতাড়ি চলে আসবে, আর মাত্র কিছুদিন কেমন?”
নাজহা এবার ফোনটা দূরে সরিয়ে উঠে বসে। নিজের পোশাকের চেইনটা আটকিয়ে খাট থেকে নামতে নামতে বলে, “আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি, আপনি ওদের দেখুন।”

এই বলে সে বিছানার দুপাশে দুটো বালিশ দিয়ে তার মাঝখানে ফোনটা এমনভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে যাতে তৌসির ওদের স্পষ্ট দেখতে পায়। তৌসির একটা দীর্ঘ শ্বাস টেনে, হাজার মাইল দূর থেকে, তার ছেলেমেয়েদের দেখতে শুরু করে। ঘুমন্ত ছেলেদের বুকের ওপর দিয়ে ওঠানামা করছে শান্ত নিশ্বাস। ছোট্ট বুক দুটো দুলুনি ছন্দে উঠছে-নামছে। একজনের গালের কাছে শক্ত মুঠি গুঁজে রাখা, স্বপ্নের যুদ্ধে জিতে আসার প্রস্তুতি মনে হয়। আরেকজনের ঠোঁটে অমাবস্যার তারার মতো মৃদু হাসি ঝুলছে, জানা নেই কোন স্বপ্নদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। আর মেয়ে তো এখনও সজাগ। সে তার নীলচে চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, এই ধরণীর সব কিছু তার কাছে নতুন বিস্ময়। মাঝে মাঝে নিজের হাতের মুঠোটাই তার কাছে মহাজাগতিক রহস্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লালচে চুলগুলো তামার আলোর মতো দীপ্ত, মাথার ওপর ফাঁপড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোলগাল গাল দুটো স্পর্শ করলে মনে হবে হাত ভিজে যাবে, নিশ্বাসের ঝাঁঝরে আলতো করে ফুলছে-বসছে। আর তার নীলচে চোখ দুটো দুই ফোঁটা বিদেশি আকাশ, যে আকাশে এখনও কোনো মেঘ ওঠেনি। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? তৌসিরের মনে হয়, বিছানার ওপর তিনটি জীবন্ত সূর্যমুখী ফুল ফুটে আছে, শীতের রাতে উষ্ণতার গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই গন্ধ স্ক্রিন ভেদ করে এখানেও এসে পৌঁছেছে।

এমন সময় ইয়াদ এসে বসে তৌসিরের পাশ ঘেষে স্ক্রিনে উঁকি দিয়ে বলে, “কই রে? দেখি আমার ভাতিজিকে!”
তৌসির ফোনটা ইয়াদের হাতে ধরিয়ে দেয়। ইয়াদ পর্দার দিকে তাকিয়ে ভীষণ আদুরে গলায় ডাকে, গলাটা এমনই গলে যাওয়া, ঠিক মধুর প্যাকেট চেপে ধরার মতো, “চাচ্চু কই রে? এই যে চাচ্চু!”
ওর গলা শুনে তৌশি এদিক-ওদিক তাকায়। নতুন স্বর, নতুন রহস্য। কিন্তু কাউকে খুঁজে না পেয়ে আবার শান্ত হয়ে যায়। দুটো বর্ণমালাহীন শব্দ গমগম করে ওঠে তার গলা থেকে, তারপর নিজের হাতের আঙুলেই মন দেয়। ঠোঁটে ঢুকিয়ে বুড়ো আঙুল চোষাই দুধের পরের মিষ্টান্ন তার জন্য। ইয়াদ তৃপ্তির হাসি হেসে বলে, “মাশাআল্লাহ! আল্লাহ কী সুন্দর ফুল দিয়েছে রে তোর কোলে। তুই তো জীবনে একেবারে ছক্কা মেরে দিয়েছিস! ব্রিটিশ বউ পেলি, সাথে ব্রিটিশদের মতোই ফুটফুটে তিন-তিনটে বাচ্চাও পেলি একবারে। জীবনে আর কী লাগে তোর?”
ওয়াসেম ইয়াদের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বাচ্চাদের দেখে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে, “মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ! আসলেই কপাল নিয়ে জন্মেছিস তুই, তৌসির।”

তৌসির বুক ভরে হেসে আকাশের দিকে তাকায়। কৃতজ্ঞতায় ভেজা কণ্ঠে বলে, “সবই দয়ালের দয়া।”
ঠিক তখনই স্ক্রিনে নাজহার প্রতিবিম্ব পড়ে। প্রথমে দেয়ালে একটা লম্বা আকার, তারপর মানুষটা। সাথে সাথে ওয়াসেম তৌসিরের হাতে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বলে, “নে, তুই কথা বল, আমরা যাই। আমার আবার বাড়ি ফিরতে হবে।”
তৌসির ফোনটা হাতে নিতেই ইয়াদ ওয়াসেমের কাঁধে হাত রাখে। তাকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে হাসতে হাসতে বলে
, “যা, বাড়ি যা ভাই। বিশ্বাস কর, আজ আর বউয়ের সাথে তোর কিচ্ছু হবে না! হা হা, আমরা একা বউ ছাড়া থাকব কেন তুইও থাক। তুই নিজে থেকে চুদ*নামি করতে করছ এখন যা, নিজের চুদ*নামির ফল ভোগ কর গিয়ে!”
ওয়াসেম ইয়াদের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলে, “আমি তৌসির না যে বউয়ের পায়ে পড়ব। এসবের কোনো দরকার নেই আমার। তুই যা, গিয়ে ঘুমা। আমি গেলাম।”
ইয়াদ ওকে ছেড়ে দিযে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। হাসির রেশ এখনও গলায় ঝুলছে। আর ওয়াসেম চলে যায় গেটের দিকে।

এদিকে নাজহা পোশাক পাল্টে একটা পাতলা টিশার্ট পরে এসে বাচ্চাদের নিয়ে শুয়েছে। কোলকুলি করে তিনটে ছোট্ট শরীর তার চারপাশে গুটি মেরেছে, ঠিক ঘুড়ির সুতোর গুচ্ছর মতো। তৌসির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে, ” ও আমার ছিনাল আমি বাড়িতে থাকলে তো এসব পরিস না। এখন আমি নাই, তাই এসব পরে ঘুরছিস?”
তৌশি আবারও খাওয়ার জন্য কাঁদছে। আগে পেট ভরে খায়নি সে। বাবার গলায়, নতুন শব্দে তার খাওয়াটা বারবার ভেস্তে গেছে। এবার তার কান্নাটা অন্যরকম। চিবুকটা কাঁপছে অবিরত, গোলগাল গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে ক্রোধে-ক্ষুধায়, ঠোঁটের কোণ দুটো নেমে এসেছে এমন বাঁকা অভিমানে যা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব অবিচার তার ওপরই ঝরেছে। মাথাটা সে নাজহার বুকের দিকে ঘোরাচ্ছে খুঁজতে খুঁজতে। নাক দিয়ে ঠেকিয়ে, মুখ খুলে, প্রাণের সুধা খোঁজার ভঙ্গিতে সে উন্মাদ। ফুটফুটে গোঙানি আর চিবুক-কাঁপুনিতে তার অভিযোগ জারি। মাঝে মাঝে কান্নাটা একটু উঁচু হয়ে উঠছে, আবার নেমে আসছে হেঁকে-হেঁকে। সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, “আমি ক্ষুধার্ত, আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।” নাজহা আলতো করে মেয়েকে একটু তুলে নিজের দিকে ঘুরিয়ে, মেয়ের মুখে আবার স্তন গুঁজে দিতে দিতে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি তো একটা আস্ত শকুনি। আর শকুনির নজর থেকে সবসময় বাঁচতে হয়। এখন বাড়িতে শকুনি নেই, তাই নিশ্চিন্তে পরছি!”

দুধ পেতেই তৌশির কান্না কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বন্ধ হয়ে যায়। এক সেকেন্ডের মধ্যে ভাঙা-চোরা অভিমান উধাও, ছোট্ট ঠোঁট দুটো আবার নিজের ছন্দে ফিরে আসে। এবার তার খাওয়াটা আরও মনোযোগী। চোখ বুজে সে শুধু এই এক কাজেই সারা প্রাণ ঢেলে দিয়েছে। ছোট্ট এক হাত দিয়ে মায়ের বুকের কাপড় আঁকড়ে ধরেছে শক্ত করে। তার ঠোঁটের ক্ষুদ্র চাপে নাজহার বুকের ভেতরটা গলে যায়। নাজহা মেয়ের মাথার চুলকিতে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে ধীর ছন্দে। তারই শব্দহীন ঘুম-জোরানো স্পর্শে তৌশির চোখের পাতা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। তার টানের গতি মন্থর, হাতের মুঠো শিথিল, ঠোঁটের কোণে আবারও জমে উঠেছে দুধের সাদা ফেনা।
নাজহার কথা শুনে তৌসির ভান করা অবাক স্বরে বলে, “আমি আবার কী করলাম? আমি কত ভালা মানুষ! তোর দিকে কখনো খারাপ নজরে তাকাইছি আমি বল?”
কথাটা শুনে নাজহা ভ্রু কাঁপিয়ে বলে, “না না, আপনি তাকাবেন কেন? আপনার কি তাকানোর সময় আছে! আপনি কত ভালো মানুষ! এই ভালো মানুষের নজর না পড়েই তো এই তিনজন দুনিয়ায় চলে এসেছে। এরা তো একেবারে আসমান থেকে পড়েছে, তাই না? ফাজলামো বাদ দিয়ে ফোন রাখুন বলছি।”
“না, রাখব না। আরেকটু দেখি।”
“কী দেখবেন?”
“তোকে দেখি। কতদিন হলো তোকে সামনাসামনি দেখি না। মুখের সামনে ধর ফোনটা।”

নাজহা প্রথমে তৌসিরের কথায় পাত্তা দেয় না। মেয়ের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে থাকে। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে ফোনটা বালিশের কাছে এমন একটা অ্যাঙ্গেলে রাখে যাতে তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। তৌসির সোফায় হেলান দিয়ে একেবারে নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার কৈতরির দিকে। নাজহার কালচে সবুজ চোখ, গহীন জঙ্গলের ভেতরের পুকুরের মতো শান্ত। ফর্সা লাবণ্যময় চেহারা, ঘড়ি-না-চেনা ক্লান্তি মাড়িয়েও যার সৌন্দর্য মলিন হয়নি। লালচে-কালো চুলগুলো এলোমেলো। মুখের শান্ত ভঙ্গি, ধারালো নাক আর চিবুক, সবকিছু মিলে তৌসিরের বুকের ভেতরটায় অচেনা এক শূন্যতা তৈরি করছে। কিছু একটা হারিয়ে গেছে, আবার ঠিক হারায়নি। কাছেই আছে, অথচ ছোঁয়া যাচ্ছে না এমন অনূভুতি হচ্ছে।

তৌসির যাওয়ার পর থেকে নাজহার কষ্টটা কতটা বেড়েছে, তা শুধু নাজহাই জানে। তৌসির পাশে থাকলে এই তিনজনকে সামলানো সহজ হয়। দুজনের হাতে দিন-রাত দুই ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু এখন রাতের অন্ধকারে একা হাতে এই তিনটে বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে নাজহার যে নিদারুণ কষ্ট হয়, তা তার ক্লান্ত মুখটা দেখলেই বোঝা যায়। চোখের নিচে হালকা দাগ, ঘুমের ঋণ চোখের নিচে কালো তিলে চাপিয়ে দেওয়া। ঠোঁটের কোণে জব্দ হাসি, যে হাসি হাসার জন্য নয়, সামলে রাখার জন্য। কোমর ব্যথায় টনটন করলেও, যন্ত্রণা ওর তিনজনের জন্য মিশে যায় এক অব্যক্ত ভালোবাসায়। তৌসির কোনো কথা বলে না। সে শুধু পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে তার ভালোবাসার মানুষটির দিকে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৯

পর্দার ওপারেই তার সারা পৃথিবী, আর দূরত্বের এই কয়েক হাজার মাইল আজ তার বুকের মাঝখানে সবচেয়ে বেশি চেপে বসেছে। বাগানের ল্যাম্পপোস্টের আলো তার মুখে নেমে এসেছে অনুজ্জ্বল হয়ে। স্ক্রিনের ওপারে নাজহার চোখ দুটোও হয়তো ভিজে উঠেছে অলক্ষ্যে। কেউ কাউকে কিছু বলছে না, শুধু দুজনের মাঝখানে একটি স্ক্রিন, আর স্ক্রিনের দুই পাশে দুটি বুক। যেখানে একই অপেক্ষার নিশ্বাস পড়ছে, একই তালে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৭১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here