Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (২)
রুপান্জলি

সময়টা বিকেলের কাছাকাছি। এখনো অর্পনার রুমজুড়ে চলছে বন্ধু-বান্ধবের আড্ডার রেশ। ওরা আজ অনেকটা সময় নিয়েই অর্পনাকে সঙ্গ দিচ্ছে। এত আনন্দের একটা মুহূর্ত হওয়া সত্ত্বেও দ্বীপ এখনো বাড়ি ফিরেনি। তারা চলে গেলে যদি অর্পনা এটা নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকে, সেই ভয়েই ওকে সঙ্গ দিচ্ছে সবাই। এমনিতেই তো মেয়েটা কাউকে আপন মানতে চায় না। সবার প্রতি কত শত অভিযোগ তার। বন্ধু-বান্ধবদের প্রতিও তার এক আকাশ সম অভিযোগ রয়েছে। এই তো বছর তিনেক আগের কথা। পাঁচ বন্ধুর মাঝে বরাবরই নির্লিপ্ত ছিল অর্পনা। কাউকে পরোয়া করত না। কে থাকল, কে না থাকল, তাতে যেন তার কিছুই আসে-যায় না। সবাইকে নিজের হুকুম মতো চলতে বাধ্য করত। কাউকে জীবনে রাখার জন্য কিংবা কারও মন রক্ষার্থে কিছুই করেনি কোনোদিন।

অর্পনার এই হাবভাব দেখে একটা সময় খুব রাগ হয়েছিল তাদের। ভেবেছিল, অর্পনা বোধহয় অহংকারের বশেই সবার সঙ্গে এমন ব্যবহার করে। তারপর সবাই মিলে অর্পনাকে ঠিক করতে পরিকল্পনা সাজায়। অর্পনা যখন তাদের কিছুই মনে করে না, তখন সবাই মিলে কয়েক দিন ওকে এড়িয়ে চলবে। অর্পনা যদি সত্যিই ওদের ভালোবাসে, তাহলে ঠিক নিজের মনের অহমিকাকে কবর দিয়ে তাদের কাছে ছুটে আসবে। কিন্তু হলো তার উল্টো। ওরা এড়িয়ে চলায় অর্পনাও এড়িয়ে চলতে শুরু করল। কারও দিকে ফিরেও তাকায় না। একটা সময় ভার্সিটিতে আসাও ছেড়ে দেয়। হয়তো অর্পনাকে তারা এড়িয়ে চলছিলো, কিন্তু সেটা ছেড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল না। শুধু দূরে দূরে থেকে তারা যে অর্পনার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অর্পনাকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছিল।

কিন্তু যখন দেখল কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসছে না, অর্পনা আগের থেকেও বেশি উগ্র হয়ে উঠেছে, তখন তারা আবারও অর্পনার কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তন্মধ্যে তাদের কাছে হুট করেই একদিন আরশাদ জামান এলেন। অনুরোধ করলেন যেন ওরা সবসময় অর্পনার সঙ্গে থাকে। ওদের সঙ্গে থাকলে মেয়েটা একটু প্রাণবন্ত থাকে।
তারা সেদিন আরশাদ জামানের কাছ থেকেই জানতে পারল, অর্পনা যখন ছোট ছিল তখন থেকেই তার মা-বাবা আলাদা থাকেন, যার ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। এই কথা জানার পর আর ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায়ের পরোয়া করেনি তারা। জোর করে অর্পনাকে ফিরিয়ে এনেছিল নিজেদের জীবনে। একপ্রকার আঠার মতো লেগে ছিল ওর সাথে। বন্ধুত্বের এই সাড়ে তিন বছরে তারা অর্পনাকে আর একবারের জন্যও এড়িয়ে যায়নি, একা ছেড়ে দেয়নি। সবসময় আগলে রেখেছে। অর্পনা যা বলেছে তাই শুনেছে। এটা তাদের পক্ষ থেকে অর্পনাকে করা কোনো দয়া নয়; বরং তারা অর্পনাকে ভালোবাসে। একদম শুরু থেকেই ভালোবেসেছিল বলেই নিজেদের মনের মতো করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন দেখল সেটা সম্ভব নয়, তখন তারা সবাই অর্পনার মনের মতো হওয়ার চেষ্টায় মেতে উঠল।

আজও পর্যন্ত তারা অর্পনার কথা মতোই চলে। ও যা করতে পছন্দ করে তাই করে। কিন্তু অর্পনাটা বুঝে না। সে আজও সেই তিন বছর আগের কথা ধরে রেখেছে। তাদেরকেও আপন ভাবে না বোধহয়। না ভাবুক, সমস্যা নেই। আজ তাদের আপন মনে না হলেও একদিন না একদিন ঠিক বুঝবে,শুধু আরশাদ জামান কিংবা দ্বীপ মির্জাই নয়, ওর বন্ধুরাও ওকে অসম্ভব রকমের ভালোবেসেছিল।
ঘড়ির কাঁটা ৪টা ছুঁতেই ঘরের বাইরে থেকে ভারী পদচারণার শব্দ ভেসে এলো। এই পদচারণা খুব ভালো করেই চেনে অর্পনা। দ্বীপ জোহান মির্জা এসেছে।

রুমের দরজা ধীরে ধীরে খুলতেই আলোচনা করতে থাকা চার মূর্তি দরজার দিকে তাকাল। দ্বীপকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। হাতভর্তি মেডিকেল ফাইল, পরনে এখনো গতকাল রাতের সেই পোশাক। পোশাকটাও বেশ এলোমেলো। ক্লান্ত মুখটাতে ধুলো জমে আছে বোধহয়। ফর্সা রংটাও কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
এই ফ্যাকাশে মুখটার দিকেও তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না অর্পনা। তীব্র অভিমানে গোমড়া হয়ে বসে রইল। তবে অরুণ, পল্লব, রাত আর ইরা কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করল। দ্বীপও বোধহয় আশা করেনি ওরা এখানে থাকবে। দুই পক্ষের অস্বস্তি দূর করতে দ্বীপ সবার উদ্দেশে ক্ষীণ হেসে হাতের ফাইলগুলো ফাইল শেলফে রেখে ওয়াশরুমে চলে গেল। দ্বীপ চলে যেতেই অরুণ, রাত, ইরা ও পল্লব উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ দ্বীপ ছিল না বলে তারা অর্পনাকে সঙ্গ দিয়েছে। এখন যেহেতু দ্বীপ চলে এসেছে, সেহেতু বাড়ি ফেরা যাক।

অর্পনা অবশ্য ওদের আরও থাকতে বলেছিল, কিন্তু কেউ রাজি হলো না। ইরার জরুরি একটি ডেলিভারি রয়েছে। পরশু এক লোকের স্ত্রীর জন্মদিন। সেই লোক তার স্ত্রীর জন্মদিনে উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য ইরাকে দিয়ে স্ত্রীর একটি সুন্দর ছবি আঁকিয়েছে। সেটাই এখন কুরিয়ার অফিসে গিয়ে দিয়ে আসতে হবে। ইরা যেহেতু এখনো তেমন বড় কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি, আয়ও কম; তাই এসব কাজ সে নিজেই করে। আশপাশে কোথাও পার্সেল দিতে হলে নিজেই দিয়ে আসে, আর দূরে হলে কুরিয়ার অফিসে জমা দিয়ে দেয়।অরুণ আর পল্লবও আজ ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। আসরের পর সামনের স্টেডিয়ামে বিশাল মাপের একটি ফুটবল ম্যাচ রয়েছে। সেখানেই একটি দলের হয়ে খেলবে দুজন। রাত অবশ্য থেকে যাবে। সন্ধ্যার দিকে আরশাদ জামান ও সুহাসিনী আসবেন। উনারা যখন ফিরবেন, রাত তখন তাদের সঙ্গেই ফিরবে। অর্পনা একবার চেয়েছিল সবাইকে এগিয়ে দিতে, কিন্তু ওরা মানা করে দিল।

এই শরীরে বারবার নিচে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অরুণরা বেরিয়ে যেতেই দুজন মেইড দুহাত ভর্তি শপিং ব্যাগ নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই ভেতরে আসার অনুমতি চাইল। অর্পনা ইশারায় অনুমতি দিতেই ব্যাগগুলো রেখে চলে গেল তারা। তারপর আরও দুইজন মেইড এলো। একজনের হাতে ফল ও জুস, অন্যজনের হাতে বিশাল ট্রেতে সাজানো নানা রকম খাবার। নিশ্চয়ই রোমানা বেগম ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য পাঠিয়েছেন। অর্পনা তাদেরও ভেতরে আসার অনুমতি দিল। মেইডরা খাবার রেখে চলে যেতেই রুম ছেড়ে বারান্দায় চলে গেল অর্পনা। আপাতত তার দ্বীপের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না।নিচেই চলে যেত, কিন্তু বসার ঘর ভর্তি মানুষ। তার ওপর মাথাটাও খুব ঘুরছে। পড়ে-টড়ে গেলে যদি আবার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়!

পাক্কা বিশ মিনিট সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো দ্বীপ। খিদে পেয়েছে বেশ। কাল রাত থেকে পেটে একফোঁটা দানাও পড়েনি। পানিও খাওয়া হয়নি বোধহয়। রুমে এসে অর্পনাকে না পেয়ে খুব একটা অবাক হওয়ার প্রয়োজন মনে করল না দ্বীপ। নিশ্চয়ই মেয়েটা খুব রাগ করেছে। অভিমান করেছে কি? করাটাই বা কি অস্বাভাবিক? এত মূল্যবান একটা সময়ে দ্বীপ অর্পনার পাশে ছিল না। স্ত্রী হিসেবে অর্পনার অভিমান করাটা যেন ফরজ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বীপ চুল মুছতে মুছতে ঘাড় বাঁকিয়ে অর্পনার দিকে তাকাল। সুইমিং পুলের পাশে ডিভানের উপর বসে আছে। এই প্রথম বোধহয় শঙ্কায় ভুগল মানব,, কীভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। তাই গলা উঁচু করে কয়েকবার ডাকল। কিন্তু রমণীর কোনো ভাবান্তর হলো না। অনেক ডাকাডাকির পরও যখন অর্পনার তরফ থেকে কোনো উত্তর এলো না, তখন এক লহমায় সব শঙ্কা যেন উবে গেল। দ্বীপের রাগের পারদ এমনিতেই সবসময় টগবগ করে। এই মুহূর্তে যেন হুট করেই সেই পারদে আগুন জ্বলে উঠল। সে হাতে থাকা তোয়ালেটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে হনহন করে এগিয়ে গেল বারান্দায়। কোনো বাক্যব্যয় না করেই ডিভানে বসে থাকা রমণীকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল।দ্বীপের এই কাণ্ডে হকচকিয়ে গেল রমণী। তবুও মুখ ফুঁড়ে একটা টু শব্দও বের করল না।

,,দ্বীপ অর্পনাকে রুমে এনে বিছানায় ছুড়ে ফেলতে নিয়েও ফেলল না। কীভাবে ফেলবে? এই মেয়ে তো এখন আর একা নয়। তার পেটের ভেতরে বেড়ে উঠছে দ্বীপ মির্জার কার্বন কপি। তাই মায়া দেখিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার কোণায় বসিয়ে দিলো,, সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিলো অর্পনা। ভুলেও তাকাবে না এই লোকটার দিকে।বিষয়টা বুঝতে পেরে দ্বীপ ও ধীর গতিতে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। ঘাড়টা সামান্য কাত করে উঁকি দিয়ে দেখল রমণীর অভিমানী চোখ জোড়া। এই চোখে ছলছল করা পানি থাকলে রমণীকে বোধহয় আরও বেশি সুন্দর লাগতো। দ্বীপের ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই মনোবাসনা পূরণ হলো। মুহূর্তেই চোখের পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠল রমণীর অক্ষি যুগল। দ্বীপ সেটা লক্ষ করে নরম স্বরে শুধাল,

— রাগ করেছো?
,,,অর্পনার তরফ থেকে কোনো উত্তর এলো না। ফিরেও তাকাল না। চোখজোড়া বারান্দার প্রবেশ পথের পাশে ঝোলানো পর্দায় নিবদ্ধ। উত্তর না পেয়ে মানুষটা আবার শুধাল,— অভিমান করেছো?
এই পর্যায়ে অর্পনার চোখে জমে থাকা পানিটুকু টুপ করে গাল বেয়ে নেমে এলো। তবুও চোখের পাতা কাঁপল না। যেদিকে তাকিয়ে ছিল, এখনো সেদিকেই তাকিয়ে আছে। দ্বীপ এক বুক ক্লান্ত নিশ্বাস ছেড়ে নরম স্বরে বলল,— আমার কাছে সবার আগে তোমার নিরাপত্তা, তারপর বাকি সব। আমি ফলের চেয়েও বেশি গাছকে প্রাধান্য দিই। গাছ থাকলে ফল প্রতি বছরই আসবে, না আসলেও সমস্যা নেই। কিন্তু গাছ না থাকলে আমি কীভাবে বাঁচব? তুমি ছাড়া আমার কি হবে?
দ্বীপের এই কথায় চুপ থাকতে পারল না রমণী। দৃষ্টি আগের জায়গায় স্থির রেখেই শক্ত কণ্ঠে শুধাল,
— এখন ফলের ভবিষ্যৎ কী? এবরশন?

শব্দটা শুনেই দ্বীপের বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। সে দ্রুত অর্পনার মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরলো,, অর্পনা জেদ দেখিয়ে জোর পূর্বক মুখ ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু মানবের তাতে ভাবাবেগ হলো না। নিজেও জোর করে মেয়েটার মুখ টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনলো তবে অভিমানিনী মানবের দিকে তাকাবেনা বলে একেবারে চোখ বুঝে নিলো। দ্বীপের যে কি হলো, অনেকটা সময় নিয়ে দেখলো অভিমানিনীর মুখটা। এমন নয় যে সে এবরশন করার কথা একবারো ভাবেনি। ভেবেছে,, কিন্তু এখন কেনো যেনো শুনতে বড্ডো কষ্ট হচ্ছে। সকালবেলা বাবা হওয়ার সংবাদ শুনে ভীষণ অস্থির হয়ে গিয়েছিল সে। একদিকে সন্তান, অন্যদিকে বেঁচে থাকার উৎস। কাকে রেখে কাকে বেছে নেবে? অগত্যা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা বিভিন্ন দেশের কার্ডিওলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট ও গাইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে সে।

বারবার নিশ্চিত হয়েছে এই সময়ে অর্পনা কোন ওষুধ খেতে পারবে, কোনটা খেতে পারবে না। ঔষধে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না, অর্পনা সুস্থ থাকবে কি না, এবং তাকে নিরাপদ রেখেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনা সম্ভব কি না। সব আলোচনা ও পর্যালোচনার পর যখন ডাক্তাররা জানালেন, অর্পনাকে সুস্থ রেখেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনা সম্ভব, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মানব,, তীব্র খুশিতে কি রেখে করবে ভোবেই পাচ্ছিলো না। যার ফল স্বরুপ পৃথিবীতে কে আসবে না জেনেই ছুটে গিয়েছে শপিং মলে,, অনাগত সন্তানের জন্য হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে এসেছে,, সঙ্গে বাচ্চার মায়ের জন্যও কিনেছে অনেক কিছু। এরপর বিহান ও মেধার সঙ্গে দেখা করতে গেল। লিটল মির্জার সঙ্গে দেখা করে ফিরতে ফিরতেই এখন বিকেল চারটা। কখনো কাউকে কইফিয়ত না দেওয়া দ্বীপ ধীরে ধীরে অর্পনার সামনে সবকিছুর ব্যাখ্যা করল। দীর্ঘ বাক্য ব্যায়ের পর দ্বীপ কেমন করে সুধালো — তাকাবে না আমার দিকে?

,,, অর্পনা চট করেই চোখ মেলে তাকাল। ভাঙা কণ্ঠে শুধাল — আপনার কাছে বাচ্চার থেকেও আমি বেশি ইম্পর্ট্যান্ট?
দ্বীপ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করল না। উঠে গিয়ে একটা শপিং ব্যাগ থেকে মাঝারি সাইজের একটা বক্স বের করল। বক্সটা নিয়ে এসে আবার মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অর্পনার পাশে বক্সটা রেখে খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো প্লাস্টিকের নাইফ, ছোট্ট একটা ক্যান্ডেল আর আধা পাউন্ডের একটা চকলেট-ভ্যানিলা মিক্সড ফ্লেভারের কেক।চকলেটের পাশে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা “”Have a Good Journey, My Blood Velora”” আর ভ্যানিলার পাশে লেখা “”Happy 5 Weeks, Little Mirza”” কেকের লেখাগুলো পড়ে বিস্মিত নজরে তাকাল অর্পনা। দ্বীপ অর্পনার অনুমতির অপেক্ষা না করেই ওর হাত টেনে প্লাস্টিকের নাইফটা ধরিয়ে দিল। তারপর কেকের এক পাশ কেটে এক টুকরো কেক তুলে অর্পনার মুখের সামনে ধরে বলল,

— আমার কাছে শুধুই তুমি ইম্পর্ট্যান্ট। বাকি সব মরীচিকা। সেটা নিজের ঔরসজাত সন্তান হোক কিংবা পুরো পৃথিবী।
অর্পনার মনে জমে থাকা অভিমানটুকু কোথায় যে মিলিয়ে গেল, কে জানে! সে নিজেও এক টুকরো কেক তুলে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিল। কখনো কেক না খাওয়া ছেলেটা বউয়ের কথায় আজ তৃতীয়বারের মতো মুখে কেক তুলে নিল। অর্পনা জামান যদি এরপরও কখনো বলে তাকে কেউ ভালোবাসেনি, তাহলে দ্বীপ মির্জা বলবে অর্পনা জামান ভালোবাসার মানেই বোঝে না। আগের দ্বীপ আর বর্তমানের দ্বীপের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য সেটা কি খেয়াল করেছে রমনি? আগের দ্বীপ মির্জা নিজের মর্জিমতো অন্যকে চালাতে পছন্দ করত, আর এখনকার দ্বীপ মির্জা অর্পনার মর্জি রক্ষা করার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।
এরপরও কি রমণীর চোখে অভিযোগ মানায়? একদমি মানায় না। কেকটা মুখে তুলতেই হঠাৎ গা গুলিয়ে উঠল দ্বীপের। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্পনা যেন বিষয়টা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল— কী ব্যাপার? মা হব আমি, আর বমি পাচ্ছে আপনার? আজব তো।
দ্বীপ বহ কষ্টে কেকটুকু গিলে নিয়ে অর্পনার গাল টেনে বলল, — আমিও তো বাবা হব। মায়েদের বমি পেলে বাবাদের কি বমি পেতে পারে না?

দ্বীপের কথায় ফিক করে হেসে ফেললো অর্পনা। হাত উঁচিয়ে এলোমেলো করে দিল লোকটার মাথার ভেজা চুল। দ্বীপ সেই হাতখানা খপ করে ধরে হাতে চুম্বন করলো। পরপর ঝুঁকে এসে অর্পনার পরনের জামাটা একটু করে টেনে ধরলো। মুহূর্তেই উন্মুক্ত হলো হলুদবর্ণের চিকন উদরখানা, যেখানে অসংখ্য কাটা-ছেঁড়ার দাগ রয়েছে। কী যে ভয়ঙ্কর দেখতে পেটখানা, তবুও যুবক কেনো যেনো এই পেটেই আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য খুঁজে পায়। এই উদরখানাকেই তলোয়ারের সরু ডগার ন্যায় বাঁকা এবং উজ্জ্বল মনে হয়। অর্পনা কেমন একদৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে। দ্বীপ ধীরে ধীরে ঝুঁকে গিয়ে অর্পনার উদরে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো। অনেকটা সময় নিয়ে চুমু আঁকল সেখানে। অর্পনা তীব্র অনুভূতিতে চোখ-মুখ খিঁচিয়ে নিয়ে দ্বীপের চুল খামচে ধরলো। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর মুখ তুলে চাইল দ্বীপ। দুজনার অবস্থাই নাজেহাল, অথচ অর্পনা এখন অসুস্থ। দ্বীপ তড়িঘড়ি করে দূরে সরে গেল। এই হালকা-পাতলা শীতের মাঝেও দুজন কেমন ঘেমে-নেয়ে একাকার।
নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে দ্বীপ এদিক-ওদিক তাকিয়ে চুলে ব্যাক ব্রাশ করে লম্বা লম্বা শ্বাস টানলো। স্টাডি টেবিলের উপর থেকে রিমোট নিয়ে এসি অন করে ১৬-তে দিল।

অপরদিকে অর্পনা কী করবে ভেবে না পেয়ে হাত বাড়িয়ে সবগুলো শপিং ব্যাগ কাছে টানলো। সে নিজেকে ধাতস্থ করে শপিং ব্যাগগুলো চেক করলো। ছেলে-মেয়ে উভয়ের ড্রেস, টাওয়েল, প্যাম্পার্স, নানান পদের টয় আরও কত কী এনেছেন লোকটা। অর্পনার জন্য ম্যাক্সিও এনেছে, দেখা যাচ্ছে। এত দ্রুত এসব আনার কোনো মানে খুঁজে পেল না মেয়েটা। লোকটা কি সারাজীবন পাগলই থেকে যাবে? আর কোনোদিন সুস্থ হবে না? অর্পনা একে একে সবগুলো টয় দেখতে দেখতে বললো
— আরণ্যকের জন্য কিছু আনেননি?
দ্বীপ বোধহয় এই নামের মালিককে ঠিক চিনতে পারেনি, তাই ভ্রু গুটিয়ে শুধালো—
— আরণ্যক? হু ইজ হি?

— আমাদের লিটল মির্জার নাম আরণ্যক ওয়াহিদ মির্জা। শাশুমা আর ছোট আবু মিলে ঠিক করেছেন। ওনারা ঠিক করেছেন বললে ভুলই হবে, তখন বসার ঘরে সবাই বসে ছিল। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে এই নামটায়। অতঃপর এটাই সিলেক্ট করা হলো। নামটা সুন্দর না?
বলেই দ্বীপের দিকে তাকালো অর্পনা। দ্বীপ চোখের ইশারায় সায় জানালো। লোকটার চোখে-মুখে এখনো তীব্র অস্বস্তি। অর্পনার খুব হাসি পেল। দ্বীপ যখন কাছে আসতে চেয়েও আসতে পারে না, নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে, তখন দ্বীপের হাবভাবে অর্পনার কী যে হাসি পায়, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। দ্বীপকে কিছুটা সহজ করতে অর্পনা সবগুলো শপিং ব্যাগ একসাথে জড়ো করতে করতে রাগান্বিত কণ্ঠে বললো— মন চাইলো আর নিয়ে আসলাম। এখন এসব আমি কোথায় রাখবো? আপনার ঘর কিংবা কাবার্ড রুম, কোথাও কি এসব রাখার জন্য জায়গা রয়েছে?

দ্বীপ আগের ন্যায় এদিক ওদিক তাকিয়ে থেকেই বললো— নতুন একটা আসবাব আনিয়ে দিবো। ওখানে শুধু বেবির ড্রেস, টয় আর প্রয়োজনীয় সবকিছু রেখো। তাও রাগারাগি করো না, শরীর খারাপ হবে।
,,,অর্পনা নাক কুচকে শপিং ব্যাগগুলো দুহাতে ঝাপটে ধরল, উদ্দেশ্য স্টাডি টেবিলের উপর রেখে দেওয়া। পরে আসবাব আনলে না হয় সাজিয়ে রাখবে। অর্পনা শপিং ব্যাগগুলো ঝাপটে ধরে কয়েক পা এগোতেই ছুটে এসে ধরে ফেলল দ্বীপ। শপিং ব্যাগ ধরে টান দিতেই দ্বীপের শক্ত পায়ের সাথে পা বেঁধে পড়ে যেতে নিল অর্পনা। দ্বীপ তড়িঘড়ি করে ধরে রাখা শপিং ব্যাগগুলো ছেড়ে অর্পনার কোমর আঁকড়ে ধরল। সহসা ব্যাগগুলো শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল। প্রথম দিকে অর্পনা ভয় পেলেও কিছু সময় পর দুজনের অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে ফেলল। দ্বীপ একদৃষ্টিতে অর্পনার দিকেই তাকিয়ে ছিল, ওকে এভাবে হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল— হাসছো কেন?

অর্পনা আরও একবার নিজেদের অবস্থানটা পরখ করে নিল। একদম সিনেমাটিকভাবে অর্পনা পিছন দিকে হেলে আছে আর দ্বীপ তার কোমর আঁকড়ে ধরে ওর দিকে ঝুঁকে আছে। অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে নিজেদের অবস্থানের দিকে ইশারা করে বলল—
— আপনি আর আমি অপরিচিত হলে এই মুহূর্তে আপনি আমার প্রেমে পড়ে যেতেন।
দ্বীপ কেমন মোহিত দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইল। অবাধ্য লোকটা কেমন বার কয়েক চোখের পলক ফেলে আওড়ালো — পড়িনি কে বলেছে?
— পরেছেন?

দ্বীপ উত্তর করল না, কোমরে থাকা পুরুষালি হাতের চাপ বাড়িয়ে দিল। পিছনের দিকে হেলে থাকা অর্পনার দিকে আরও খানিকটা ঝুঁকে গেল। দ্বীপের আচরণে অলিখিত সর্বনাশ টের পেয়ে ভয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নিল অর্পনা, তবে সর্বনাশ কেউ ঠেকাতে পারল না। অবাধ্য দ্বীপ ধীরে ধীরে অর্ধাঙ্গিনীর নরম ওষ্ঠযুগল নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। পরম যত্নে আস্বাদন করতে লাগল অদৃশ্য মধু মিশ্রিত সুধা। ধীরে ধীরে দ্বীপের অবাধ্য আচরণ বাড়তে লাগল। স্বামীর এই অবাধ্য স্পর্শে কাতর অর্পনা ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করেও এক চুল ছাড়াতে পারল না। একটা সময় চেষ্টা করতে করতে কেমন মিইয়ে গেল, ধীরে ধীরে সে নিজেও সায় দিতে থাকলো স্বামীর বিপরীতে। সেভাবেই থেকে অর্পনাকে কোমর আঁকড়ে ধরে উপরে তুলে নিল দ্বীপ । অর্পনা খেই হারিয়ে শক্ত করে ধরল দ্বীপের কাঁধের অংশ । দ্বীপ কয়েক কদম এগিয়ে বিছানার কাছে পৌঁছাল। অর্পনার নরম শরীরটা বিছানা ছুঁতেই দ্বীপকে ঠেলে সরাতে চাইলো অর্পনা। টিকতে না পেরে দ্বীপ বিরক্তিতে চাপা শব্দ করে বলল— কি সমস্যা? মার খাবি?

অর্পনা দ্বীপের বুকে সজোরে ঘুষি বসিয়ে তেজী কণ্ঠে বলল— কি করছিলেন? মেরে ফেলবেন নাকি? এখনই তো দমটা আটকে যেত!
দ্বীপ যেন সেসব কানেই তুলল না, উল্টো নিজের অবাধ্যতা বজায় রেখে অস্ফুট স্বরে বলল—
— একটু স্যাক্রিফাইস কর জান, আমার ভালো লাগছে না।
( একজন বার বার বলছিলে, দ্বীপ অর্পনার নাকি রোমান্টিক মুহুর্ত দেইনা। এইযে দিলাম, হেপি)

সন্ধ্যা নাগাদ আরও একদফায় মেহমানের আগমন ঘটলো মির্জা বাড়িতে। অর্পনার বাবার বাড়ির লোকজন এসেছে। এখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত সাড়ে আটটা। শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরুতে যাচ্ছে, এখনো পর্যন্ত ছেলেটা নিচে নামেনি। এটা কোনো কাজ? বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ছেলের রুমে নক করলেন মাহিদ মির্জা। কয়েকবার নক করতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল রুক্ষ মানবের ঘুম-ঘুম স্বর— কে? ভিতরে আসুন।

,,,মাহিদ মির্জা ভেতরে ঢুকলেন। দ্বীপ মাত্রই গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে উঠে বসেছে। চোখে-মুখে এখনো ঘুমের রেশ। কাল সারা রাত ঘুমায়নি, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাইরে থাকার দরুন শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল। তাই সন্ধ্যা থেকে এখনো পর্যন্ত ঘুমে বিভোর ছিল মানব। বাবাকে রুমে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়ালো। সম্পূর্ণ এলোমেলো বিছানাটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মানব, ঠোঁট চেপে অস্বস্তি কাটাতে চাইলো। মাহিদ মির্জা অত কিছুতে মনোযোগ না দিয়ে ছেলেকে কর্কশ স্বরে শুধালেন—
— তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছে, আড়াই ঘণ্টা পেরুতে যাচ্ছে। নিচে নামলে না কেন?
দ্বীপ বাবার দিকে ফিরে তাকালো। মাহিদ মির্জা এখন ক্র্যাচ ছাড়াই হাঁটতে পারেন। মানুষের মন-মেজাজ খুশি থাকলে বোধহয় শরীর ও দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। এইতো, গতো ছয় বছরেও সুস্থ না হওয়া মানুষটা ছেলে আর ছেলের বউকে পেয়ে দের বছরেই কেমন সুস্থ হয়ে উঠলেন। দ্বীপ নরম স্বরে প্রতিত্তোর করলো — ক্লান্ত ছিলাম, আব্বু।

,,নিজের থেকেও লম্বা, বলিষ্ঠ ছেলেটার দিকে মনোযোগ দিলেন মাহিদ মির্জা। এই ছেলেটা উনার। এই তো সেদিন রাহিতা জানালো, ও মা হবে আর মাহিদ মির্জা বাবা। কত মধুর মুহূর্ত ছিল সেই সময়টা। আজ কিনা সেই ছেলে বাবা হতে যাচ্ছে! ভাবতেই তো পারছেন না তিনি। হয়তো ছেলেটার বয়স ৩২ পেরিয়ে ৩৩-এ পৌঁছাতে যাচ্ছে, কিন্তু উনার কাছে তো এখনো এটা সেই জোহান, যে গুটি গুটি পায়ে আব্বু আব্বু করে এগিয়ে এসে গলায় ঝুলে পড়তো। কাঁধে উঠে বায়না করতো, মসজিদ যাবো। নামাজে সিজদা দেওয়ার সময় গলায় ধরে ঝুলে থাকতো। সেসব কথা মনে পড়তেই ছেলেকে আকস্মিক জড়িয়ে ধরলেন মাহিদ মির্জা। বাবার কাণ্ডে হকচকিয়ে গেল দ্বীপ। সেও কী মনে করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আব্বুকে। নরম স্বরে ডাকলো— আব্বু!!

মাহিদ মির্জা হাসলেন। ছেলের পিঠে চাপড় মেরে বললেন— বাবা হচ্ছো, বাবা। বাবা শব্দটার মানে জানো? বাবা হচ্ছে একটি গাছ, যে সর্বক্ষণ সন্তানদের ছায়া দেয়। একটা হাতিয়ার, যা বরাবর সন্তানদের রক্ষা করে। আর একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, যা সর্বদা, সকল পরিস্থিতিতে সন্তানদের পাশে থাকে। আমি দোয়া করি তুমি আমার থেকেও ভালো বাবা হও, আর আমার নাতি তোমার থেকেও অধিক জেদি, একরোখা আর বেপরোয়া হোক।
বাবার বলা প্রথম কথাগুলোতে দ্বীপ মুগ্ধ হলেও শেষের কথাটাতে চোখ-মুখ শক্ত করে নিলো। কণ্ঠে কাঠিন্যতা ঢেলে বললো— আমাকে তুমি অভিশাপ দিলে, আব্বু?
দ্বীপের কথায় ঠোঁট উল্টালেন মাহিদ মির্জা—— এটা অভিশাপ ছিল নাকি? হলে হলো, অভিশাপই দিলাম। তুমি আমাকে জীবনে কম জ্বালিয়েছো? এবার তুমিও জ্বলবে। আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ আমার নাতি নেবে।

দ্বীপ কেমন অসহায় কণ্ঠে ডাকলো— আব্বু!!
মাহিদ মির্জা শব্দ করে হেসে ফেললেন। ছেলেকে ছেড়ে কাঁধ পেঁচিয়ে ধরে নিচের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন— থাক, দুঃখ পেয়ো না। প্রকৃতির নিয়ম তো এটাই। এক বয়সে তুমি বাবার সাথে বাদরামি করবে, আরেক বয়সে তোমার ছেলে-মেয়ে তোমার সাথে বাদরামি করবে। এতে এত মন খারাপ করার কী হলো?
মাহিদ মির্জা ভেবেছিলেন ছেলে বোধহয় এক্ষুনি আরও একবার অসহায় স্বরে আব্বু বলে ডাকবে। অথচ হলো তার বিপরীত। মাহিদ মির্জার ত্যাদড় ছেলে এক হাতে উনার কাঁধ পেঁচিয়ে ধরলো। চট করেই বলে বসলো এক অলিখিত সত্য— এখন বুঝতে পারলাম দাদু কেন বারবার বলতো, “মাহিদরে, তোর ছেলেটা একদম তোর উপর দিয়ে গিয়েছে।” তুমিও নিশ্চয়ই আমার মতো বাদর ছিলে? দাদুকে খুব জ্বালাতে, তাই না?
খুক খুক করে কেশে উঠলেন মাহিদ মির্জা। ছেলের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেন— হারামজাদা ছেলে!! বাবার সাথে মশকরা হচ্ছে?
দ্বীপ মাথা নেড়ে সায় জানালো, মানে হচ্ছে। মাহিদ মির্জা ফের চোখ রাঙাতেই দ্বীপ শয়তানি হেসে বললো— থাক, মন খারাপ করো না। ছেলের কাছে অতীত ফাঁস হয়ে গিয়েছে বলে মন খারাপ করতে হবে? আমরা আমরাই তো।

দুই মেয়েকে দুপাশে নিয়ে সোফায় বসে আছেন আরশাদ জামান। অর্পনাকে একটার পর একটা নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে চলতে হবে, কিভাবে কী করতে হবে সব। অর্পনা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। রাত্রিও বাবার কাঁধে মাথা রেখে শুনছে সেসব। এই প্রথম বারের মতো বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে এলো সুহাসিনী। রাত আর অর্পনা একই বয়সী হলেও দুমাসের তফাত থাকার দরুন অর্পনাকে বড় আর রাতকে ছোট হিসেবে ধরা হয়। ইদানীং আরশাদ জামান আর সুহাসিনীর সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। সম্পর্কটা ভালোবাসাপূর্ণ না হলেও বন্ধুত্বপূর্ণ বলা চলে। আরশাদ জামান একজন মানুষ, বাবা, ডিটেকটিভ হিসেবে যেমন পারফেক্ট, তেমনি স্বামী হিসেবেও অত্যন্ত পারফেক্ট। দায়িত্বজ্ঞানে একটুখানিও খামতি নেই। তবে অর্পনার সাথে সুহাসিনীর সম্পর্কের কোনো উন্নতি নেই। এমনও নয় যে অর্পনা সুহাসিনীকে পর মনে করে। আগে যেমন উনাকে রাতের মা মনে করতো, এখন আর সেই ভাবনাটা নেই। বাবার ওয়াইফ হিসেবে যথেষ্ট রেসপেক্ট করে, ভালো-মন্দের খেয়ালও রাখে। এই মেয়েটার প্রতি বড্ড কৃতজ্ঞ সুহাসিনী। মেয়েটা চেয়েছে বলেই উনার মেয়েটা আরশাদ জামানের মতো একজন বাবা পেলো।
সুহাসিনীর ভাবনার মাঝেই দ্বীপকে নিয়ে নিচে নেমে এলেন মাহিদ মির্জা। দ্বীপকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন আরশাদ জামান। অর্পনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন

— রাত অনেক হয়েছে, মাম্মা। এবার বাড়ি ফিরাটা জরুরি। নিজের আর বেবির খেয়াল রেখো।
অর্পনা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাতেই দ্বীপের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। দুজন মুখোমুখি হতেই দ্বীপ কেমন নাক কুঁচকালো, আরশাদ জামানও তাই করলেন। মুখটা পাংশুটে করে বললেন— আমার মেয়েকে দেখে রাখতে পারবে, নাকি সাথে করে নিয়ে যাবো?
দ্বীপ যেন কথাটার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করলো না। উল্টো আরশাদ জামানের দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো— একটা বেয়াড়া, সন্ত্রাস, একরোখা ছেলেকে মেয়ের জামাই হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন, অথচ আজ সেই সন্ত্রাস ছেলেটাই আপনার মেয়ের বাচ্চার বাবা। আজব না ব্যাপারটা?
,, দ্বীপের কথায় দাঁতে দাঁত চেপে ধরলেন আরশাদ জামান।ছেলেটার সাথে একটু ভালো মন্দ কথা বলতে এসেছিলেন কিন্তু এই ছেলে তো সুধরাবার নয়। সারাক্ষণ কিভাবে উনাকে খোচা মূলক কথা শুনানো যায় সেই পায়তারা করে। এরকম বিরক্তিকর জামাই কোন পাপে উনার ভাগ্যে জুটলো কে জানে? মেয়েটা কি আর বিয়ে করার জন্য ছেলে পেলো না?

— কী হলো? তাকিয়ে আছো কেন? খাও!
দ্বীপের এহেন কথায় আবারও সামনে তাকালো অর্পনা। তারা বর্তমানে রেস্টুরেন্টে আছে। সাথে অরুন, রাত, ইরা, পল্লব, আরাফাত, পরশী, আরিবও আছে। এই সবার জন্যই খাবার অর্ডার করেছে দ্বীপ। একটা আর দুটো খাবার নয়, রেস্টুরেন্টে যত ধরনের আইটেম আছে সব রাখা হয়েছে এখানে। এগুলো শেষ হলে আরও আনা হবে। পরশী আর আরিবটা ঠিকমতো খেলেও পাঁচ মূর্তি অবাক হয়ে দ্বীপ আর বিহানের দিকে তাকিয়ে। ওদের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখেই দ্বীপ ওদেরকে আবারও খাওয়ার নির্দেশ দিলো। অর্পনা কেমন ভ্রু কুঁচকালো। বমি পাচ্ছে। এত এত খাবার সামনে রেখেও অর্পনা যে নিজেকে কীভাবে ঠিক রেখেছে, এটা একমাত্র সে নিজেই জানে। দ্বীপ আবারও চোখ রাঙাতেই অর্পনা ব্যতীত সবাই খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। অর্পনাকে খেতে না দেখে বিহান শুধালো—
— খাচ্ছো না কেন? দ্রুত করো। উদ্ভাবনের সময় হয়ে যাচ্ছে।
অর্পনা বুঝলো না কিসের উদ্ভাবন, তাই উল্টো প্রশ্ন করলো— উদ্ভাবন? কিসের উদ্ভাবন?
বিহান ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বললো— একটু পরেই টের পাবে। দ্রুত খাও।

পরিচিত রোডে গাড়ি চলতে দেখে কেমন বিচলিত নেত্রে দ্বীপের দিকে তাকালো অর্পনা। এটা তো কাইসার বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা। দ্বীপ হঠাৎ ওদের সবাইকে কাইসার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে কেন? কয়েকবার প্রশ্ন করলেও দ্বীপ কিংবা বিহানের থেকে কোনো উত্তর এলো না। চার মূর্তি আর পরশী, আরাফাত, আরিব খেয়ে-দেয়ে একেকটা ফুলো ঢোল হয়ে আছে। নিশ্বাস নেওয়ার ফুরসতটুকুও পাচ্ছে না কেউ। অর্পনা ওদের অবস্থা দেখে দ্বীপকে দু-চারটে কথা শুনিয়ে দিলো, তবুও লোকটা পাত্তা দিলো না। অর্পনার কী যে রাগ লাগছে, প্রকাশ করার নয়। চলতি পথে কাইসার বাড়ির পাশে রমরমা বাজার দেখে আরও অবাক হলো অর্পনা। এখানে আবার বাজার হলো কবে? এই কয়েক মাসে পরিচিত পথটার এতটা পরিবর্তন অর্পনাকে ভাবিয়ে তুললো। দ্বীপ মির্জা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আবার কোন নতুন পরিস্থিতির সাথে পরিচয় করাবেন উনি? অর্পনার মনের দীর্ঘ প্রশ্নের উত্তর মেটাতে গাড়ি থামালো দ্বীপ। এই পর্যায়ে যেন বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছালো পঞ্চমূর্তি। যেই জায়গাটাতে কাইসার প্যালেস ছিল, সেখানে সারি সারি আকারে দাঁড়িয়ে আছে ৪২টা পাবলিক টয়লেট। ২১টা পুরুষদের আর ২১টা মহিলাদের। পরশী, আরাফাত আর আরিব তো এই জায়গাটাকে চেনে না। আগেও চিনেনি, এখনো চেনে না। তাই তারা উৎসুক দৃষ্টিতে মেজো ভাইয়ার দিকে তাকালো। পরশী বিহানের উদ্দেশ্যে শুধালো— ভাইয়া, আমরা এখানে কেন এসেছি? কোনো কাজ আছে?
বিহান কিছু বললো না। ওদেরকে নামার জন্য ইশারা করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। একে একে সবাই বেরুলো। দ্বীপ বেরিয়ে যেতেই অর্পনাও বেরিয়ে এলো।

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো জায়গাটা। আগে এখানে বিশাল একটা প্যালেস ছিল। কত সুন্দর ছিল বাড়িটা! এই বাড়িটাতেই অর্পনা একা একা ঘুরে বেড়াতো। খাবার টেবিলে বসে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা অসম্ভব সৌন্দর্যের অধিকারী মানবকে দেখতো।সময়-সুযোগ পেলে সেই মানবের ঘরেও উঁকি-ঝুঁকি দিতো। পিছন পিছন হাঁটতো। যেখানে মানব পায়ের পাতা ফেলতো, সে সেই জায়গাটা মার্ক করে নিজেও পায়ের পাতা ফেলতো। একই রঙের টি-শার্ট, ট্রাউজার পরার চেষ্টা করতো। কত কত পাগলামি মিশে ছিল এই বাড়িটায়। আজ কোথায় সেসব? কিছুই নেই। কিশোরী অর্পনা আজ যুবতী হয়েছে, একজনের স্ত্রী আর তার সন্তানের মা হয়েছে। সুদর্শন মানবটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে, যার খোঁজ সিদ্ধার্থের কাছেও নেই। আর সেই প্যালেসটা, কিছু মাস আগে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে এখন কতটা জঘন্য রূপ নিয়েছে।পৃথিবীতে সব সৌন্দর্য কেন দীর্ঘস্থায়ী হয় না? অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝে শোনা গেল বিহানের সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা অদ্ভুত একখানা বাক্য —

— খাওয়ার পর যথেষ্ট সময় পেরিয়েছে। এবার যার যার ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন, দ্রুত যাও। তোমাদের মাধ্যমেই এগুলো উদ্ভাবন করা হোক।
বিহানের কথায় তাজ্জব বনে গেল সকলে। এই ওয়াশরুমে পাঠাবে বলে সবাইকে এভাবে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলালো? তার মানে বিহান তখন এই উদ্ভাবনের কথাই বলেছিল? বিষয়টা বুঝতে পেরে অর্পনা হুট করেই হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়লো। পরশী, আরাফাত আর আরিব কিছুই বুঝলো না। তারা তো কিছুই জানে না।ছোট্ট আরিবের সত্যিই ওয়াশরুমে যাওয়া প্রয়োজন। ও বোকার মতো চলে গেলো পুরুষ টয়লেটের দিকে। ওকে যেতে দেখে অর্পনার হাসির তোপ আরও বাড়লো। সে এবার হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে হাঁটু মুড়ে বসল। বাকি চার মূর্তির অবস্থাও তাই। একেকজন হাসতে হাসতে একে অপরের উপর ঢলে পরছে। পল্লব হাসতে হাসতে বললো—

— ভাই! সারাজীবন শুনে এসেছি স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবেসে মহল বানায়। আজ ২৪ বছর বয়সে এসে জানতে পারলাম, স্ত্রীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে স্বামী শত্রুর বাড়িতে পাবলিক টয়লেট ও বানায়। ওপস! এটাতো ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা উচিৎ,, এর থেকে মারাত্মক রিভেঞ্জ আর কিছুতেই হতে পারেনা। ইট্স অ্যা ফাইনেস্ট রিভেঞ্জ এভার।
,,, পল্লবের কথায় এবার পরশী আর আরাফাত ও না বুঝেই কেমন হেসে উঠলো,, বিহান ও ফিক করে হেসে দিলো। এটা সত্যি ই বারাবাড়ি ছিলো। কিন্তু কিছুই করার নেই,, দ্বীপ মির্জার আদেশ বলে কথা। পূরন তো করতেই হবে।

মাঝে কেটেছে পাঁচটি মাস। আজ বুধবার। বৃহস্পতিবার বাদ, শুক্রবার দিন রাত্রি আর অরুণের বিয়ে। এই তো গতকালই অষ্টম সেমিস্টার শেষ হলো। কথা ছিল, এক্সাম শেষ হওয়ার পর বিয়ের ডেট ফিক্সড করার জন্য অরুণের বাবা-মা আসবে। কিন্তু অরুণটা পাগল। সে পরীক্ষা দিয়েই বিয়ে করবে, করবে মানে করবেই। ছেলেটার পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে অরুণের বাবা-মা গত সপ্তাহেই এসে তারিখ দিয়ে গিয়েছেন। আরশাদ জামানও মানা করতে পারেননি। মানা করে কী হবে? যেখানে ছেলে-মেয়ে দুজনেই একে অপরকে ভালোবাসে, সেখানে উনার আপত্তি করাটা খাটে না।

,,ঢাকা শহরে বিয়ের আয়োজন মানেই কমিউনিটি সেন্টার, নয়তো বাড়ির ছাদ। রাতের বিয়েতে দুটোই ব্যবহার করা হবে। আজ মেহেদি আর কালকের গায়ে হলুদটা ফ্ল্যাটের ছাদে করা হবে। আর বিয়ের অনুষ্ঠানটা হবে কমিউনিটি সেন্টারে। অগত্যা সেই মাফিক সকাল থেকেই ছাদের বৃহদাংশ সাজানো হয়েছে। এখনো সাজানোর কাজ চলছে। এতে চরম বিরক্ত অর্পনা। ওদিকে নিচে রাতকে সাজানো প্রায় শেষ, কিছুক্ষণ বাদেই ওকে এখানে আনা হবে। অথচ লাইটিংয়ের অনেকাংশই এখনো বাকি। অর্পনাকে এতটা বিরক্ত দেখে কাজ রেখে এগিয়ে এলেন আরশাদ জামান। মেয়েকে টেনে চেয়ারে বসিয়ে নিজেও পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। বিয়েটা রাত্রির হলেও কখন কী করতে হবে, কোনটা কীভাবে হবে, খাবারের কী মেনু হবে, কাকে দাওয়াত করতে হবে, কাকে ফোনে আর কাকে সামনাসামনি দাওয়াত করতে হবে, রাত্রির সাজ কেমন হবে, কে সাজাবে, সবটাই ইরা আর পল্লবের মাধ্যমে করাচ্ছে অর্পনা। কাজগুলো ইরা আর পল্লব করলেও তদারকি সেই করছে।

এমনকি অরুণদের বাড়িতে পাঠানো গিফটগুলোও সে নিজেই সিলেক্ট করে দিয়েছে। যেন সত্যিই অর্পনা রাতের বড়ো বোন, আর এক বড়ো বোন দায়িত্ব নিয়ে তার ছোট বোনের বিয়ের তদারকি করছে। মেয়ের এই দায়িত্ববোধে শতবার অবাক হয়েছেন আরশাদ জামান। বছর দুই আগের সেই অর্পনা আর আজকের অর্পনার মাঝে কত ফারাক! একটা বিরক্তিকর ছেলে এসে উনার মেয়েটাকে কেমন দায়িত্ববান করে তুললো। ভাবা যায় এসব? আরশাদ জামানের ভাবনার মাঝেই হনহন করে ছাদে এলো দ্বীপ। হাতে কাগজের দিয়াশলাই। কোনো বাক্যব্যয় ছাড়াই দ্রুত গতিতে অর্পনার ওড়নার আঁচলে দিয়াশলাইটা বেঁধে দিতে দিতে ধমকের স্বরে বললো— এটা সাথে রাখতে ভুলে যাস কেন? থাপ্পড় খাবি? এই বিয়ের চক্করে আমার বাচ্চা আর তোর কোনো ক্ষতি হলে তোর বাপকে টপকে দিতে দুবার ভাববো না আমি।

,,, বলেই আবারও যেই গতিতে এসেছে, সেই গতিতেই হনহন করে লিফটের দিকে চলে গেল। দ্বীপের কথায় আহাম্মকের মতো পাপ্পার দিকে তাকালো অর্পনা। আরশাদ জামান ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কত বড় সাহস এই ছেলের! উনার সামনে এসে উনাকে মারার হুমকি দিয়ে চলে যায়! নেহাতই ছেলেটা মেয়ের জামাই, নয়তো উনি যে এই ছেলেকে কী করতেন তা নিজেই জানেন না। বিরক্তিকর ছেলে একটা।

,,,পাপ্পার মুখের অবস্থা দেখে অর্পনা ঠোঁট টিপে হাসলো। বর্তমানে তার প্রেগন্যান্সির পাঁচ মাস চলছে। পেটটা অন্যান্য মেয়েদের তুলনায় একটু বেশিই ফোলা, যার ফলে রোমানা বেগম বারবার করে বারণ করেছেন যেন সন্ধ্যার পর বাইরে না থাকে। আর যদি থাকতেও হয়, তাহলে যেন সাথে দিয়াশলাই রাখে। এতে করে বদনজরে পড়ার আশঙ্কা কম থাকে।বরাবর শাশুড়ির কথা মান্য করলেও আজ কিভাবে কিভাবে যেন দিয়াশলাই সাথে রাখতে ভুলে গিয়েছে অর্পনা। অথচ লোকটা ঠিকই খেয়াল রেখেছে। মানুষটার এই হুটহাট কেয়ার করার সাথে তুই-তুকারি করার স্বভাবটা খারাপ লাগে না অর্পনার। বরং কেমন যেন শান্তি শান্তি ফিল হয়। লোকটাকে বড্ড আপন আর নিজের মনে হয়৷
,, শুভ্র রঙের ম্যাক্সিতে আবৃত থাকা অর্পনা পাপ্পার দিক থেকে নজর সরিয়ে আবারও প্যান্ডেলের দিকে নজর দিল। ডেকোরেশনের ছেলেটাকে লাইটিংয়ে আবারও ভুল করতে দেখে ধমকে উঠলো রমণী—

— ওইদিকে একটা লাইট দিন। এত অলস কেন আপনারা? সাউন্ড সিস্টেমের লোক কোথায়? একটু পরেই আমার বোনকে আনা হবে। ভিডিওর সময় প্রোপার সং প্লে না করতে পারলে সাউন্ড সিস্টেমের লোক ভাড়া করার মানে কী? উনাকে ডাকুন। এই ক্যামেরাম্যানটা আবার কোথায় গেল? এখানেই তো ছিল। পাপ্পা! কই গিয়েছে, দেখেছো?
আরশাদ জামান আঙুলের ইশারায় প্যান্ডেলের অপর পাশে দেখালেন। অর্পনা চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। পল্লব ক্যামেরাম্যানের সাথে কথা বলছে। কোন দিকে কী হবে, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ক্যামেরা ধরতে হবে, সবটা পাই টু পাই বুঝিয়ে দিচ্ছে। অর্পনা ওদের কাছে গিয়ে পল্লবের ফোনটা নিয়ে অনাহিতা আপুকে কল করলো। উনি নাকি আজ আসতে পারবেন না, একেবারে কাল এসে বিয়ে খেয়ে তারপর যাবেন।
অর্পনা ফোন করে আসার জন্য রিকোয়েস্ট করলো, কিন্তু রমণী নিষেধ করে দিয়েছেন। অনাহিতার বাচ্চার নাকি তুমুল জ্বর। এরূপ কথা শুনে আর জোরাজুরি করতে পারলো না অর্পনা। এমনিতেই তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ফ্ল্যাটের একতলা, দুইতলা আর চারতলার পরিবার, সাথে পল্লবদের পরিবার ব্যতীত তাদের দিকে আর কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। আপাতত তাদের নিয়েই রাতের বিয়ের ছোট্ট আয়োজন। অর্পনা ফোন রাখতেই পরশী আর অহমিকা ছুটে এলো। পরশীর কোলে আরণ্যক। মেয়েটা অর্পনার সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো—

— ভাবি! অরণ্যকে একটু রাখো। মেজো ভাবি ফুলের ডালা সাজাচ্ছে। আমার আর অনাহিতারও কাজ আছে।
অর্পনার নিতে হলো না। বড় আম্মুকে দেখেই কোলে যাওয়ার জন্য হামলে পড়লো আরণ্যক। ছেলেটা অকারণেই অর্পনার পাগল। কোলে এলে যেতেই চায় না। বিহানের কোলে থাকলেও তার কাছে আসার জন্য কান্নাকাটি করে। এ নিয়ে বিহানের কী যে রাগ! খালি বলে, অর্পনা নাকি তার ভাই, বোন, বউ, ছেলে সবাইকে বশীকরণ যাদু করেছে। অর্পনা সেসব পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। বিহানকে সে গোনেই না।
অর্পনা ধীরে ধীরে আরণ্যককে কোলে নিলো। কোলে আসতেই ছেলেটা কেমন কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিল। ঘুমাবে বোধহয়। অর্পনা পিঠে চাপড় মারতে মারতে ক্যামেরাম্যানকে তাড়া দিল। এই প্রথমবার শাড়ি পরেছে পরশী। মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ 

মনেই হচ্ছে না সে একজন উনিশ ছুঁইছুঁই কিশোরী। একদম পরিপক্ব নারী লাগছে তাকে। তবে এই নারীত্ব পল্লবকে টানলো না। সে নিজের মতো ক্যামেরাম্যানের সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। পরশী কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মানবের পানে। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে অনাহিতাকে নিয়ে নিচে চলে গেল। হয়তো সবাই জানে পরশী বাচ্চা। হ্যাঁ, পরশী বাচ্চা, তবে সেটা শুধুই আপন মানুষদের কাছে। সত্যি অর্থে সে অতটাও অবুঝ নয়। পল্লবের কথার মানে আর চোখের ভাষায় এতদিনে অনেক কিছুই জেনে গিয়েছে পরশী। তাই লোকটাকে সময় দিচ্ছে সে। একটু সময় নিক, সামলে উঠুক। সারাজীবন তো আর একা থাকতে পারবে না, তাই না? একদিন তো বিয়ে করবেই। পরশী না হয় সেই একদিনের অপেক্ষায় রইলো।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here