Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯ (২)
রুপান্জলি

সময়টা বিকালের মধ্যভাগে। সূর্য তখন পশ্চিমা আকাশে ঢুলু ঢুলু অবস্থায়, আকাশে লেপ্টে রয়েছে লালিমা। ধীরে ধীরে কুয়াশাচ্ছন্ন হচ্ছে ধরনী। উত্তর হতে আসা হিমেল হাওয়া শরীরে ক্ষীণ গতিতে কাঁপন ধরাচ্ছে। দিনটা শুক্রবার হওয়ার দরুন সরকারি নিয়মে আজ রমনা পার্ক বন্ধ। এমতাবস্থায় সরকারি লোক কিংবা অনুমতি ব্যতীত পার্কের ভিতরে প্রবেশ করা নিষেধ। তবে সেই বিধি-বিধান মানার ফুরসত পেল না অরুন। গাড়ি নিয়ে একপ্রকার ছুটে এসেছে রমনা পার্কের সামনে। মাথাটা গরম, অদম্য রাগ চেপে আছে তাতে। সে হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেটের কাছে আসতেই পার্কের নির্দিষ্ট গার্ডের পরিবর্তে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মির্জা বাড়ির গার্ডদের দেখে খুব একটা অবাক হলো না। অর্পনা যেহেতু এখানে এসেছে, সেহেতু এটুকু সিকিউরিটি অবশ্যই থাকবে। দ্বীপ জোহান মির্জার ওয়াইফকে তো আর এমনি এমনি রাখা যায় না। অরুনকে এগিয়ে আসতে দেখে গার্ডগুলো সহসা গেট খুলে দিল। অরুনও কোনো কিছুর পরোয়া না করে হন্তদন্ত পায়ে ভিতরে ঢুকে ইরাদের ফোনে কল করল। কোথায় আছে জানতে চাইলে ইরাদ তার অবস্থানরত জায়গার নাম বলল। অরুন কানে ফোন রেখেই যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে গেল সেদিকে।

,,, বাবা-মা জোরপূর্বক বৃষ্টির সাথে বিয়ে দেওয়ায় তাদের সাথে খুব একটা সখ্যতা নেই অরুনের। কথা-বার্তাও হয় না বললেই চলে। যতটা হয়, ততটা বৃষ্টির সাথে। এর বাইরে অরুন তাদের সাথে কোনো রূপ কথা-বার্তা বলে না। ইতালিতে থাকা কালীন বৃষ্টিকে নিয়ে যেমন আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে থাকত, তেমনি বাংলাদেশে এসেও বাড়িতে না গিয়ে নিজের টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। অরুনের মা-বাবা বারবার রিকোয়েস্ট করার পরও বাড়ির দিকে পা বাড়ায়নি ছেলেটা। বৃষ্টিও কখনো অরুনের কথার বাইরে যায়নি। অরুন যখন যা বলেছে, তাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। এমনকি অরুন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তার বেড টি দেওয়া থেকে শুরু করে রাতের ব্ল্যাক কফিটা পর্যন্ত বৃষ্টিই এগিয়ে দেয়। মেয়েটাকে কষ্ট দেবে বলে বাড়িতে এক্সট্রা করে হেল্পিং হ্যান্ডও রাখেনি অরুন। সেই সঙ্গে দিন-রাত তার করা অবহেলাগুলো তো আছেই। বেশ কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টিকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছিল। এমনকি গতকাল রাতেও তীব্র জ্বরে ভুগেছে মেয়েটা। তবে অরুন কিছুই জিজ্ঞেস করেনি, খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। মাঝরাতের দিকে মেয়েটা যখন তীব্র জ্বরে ঘোঁতঘোঁত করছিল, তখন বিরক্ত হয়ে ওকে রুম থেকে ধমকে বের করে দিয়েছিল অরুন। এরপর থেকে মেয়েটাকে আর দেখতে পায়নি সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে অরুনের তেমন একটা ভাবাবেগ হয়নি।

ডাইনিংয়ে ব্রেকফাস্ট রেডি দেখে খেয়ে-দেয়ে আবারও রুমে গিয়ে বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়েছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ার দরুন অফিসে যাওয়ার কোনো তাড়া ছিল না। অগত্যা এক ঘুমেই দুপুর পেরিয়ে বিকালের আগমুহূর্ত পর্যন্ত পার করে দিয়েছে। ঘুম থেকে উঠেও বৃষ্টির কোনো দেখা পায়নি। অন্যদিন হলে মেয়েটা দুপুর নাগাদই ওয়াশরুমে গিজার ছেড়ে মৃদু স্বরে অরুনকে ডাকাডাকি করত। বিষয়টা নিয়ে এবার ভাবনায় পড়ল অরুন। কোথায় গেল মেয়েটা? বাড়িতে নেই নাকি? নাম ধরে ডাকল কয়েকবার, তবে কোনো উত্তর এল না। এই পর্যায়েও বিষয়টাকে তেমন একটা পাত্তা দিল না অরুন। ভাবল, হয়তো রান্নাঘরে কিংবা অন্য রুমে আছে। সে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে আবারও ডাইনিংয়ে গেল। তখনই টনক নড়ল মানবের। সকালবেলা ব্রেকফাস্ট শেষে সে ডাইনিং টেবিল যেমনভাবে অগোছালো করে রেখে গিয়েছিল, এখনো তেমনি অগোছালো হয়ে পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সকাল থেকে এই ঘরে সে ব্যতীত আর কারোর পদচারণ পড়েনি। অরুন এবার বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস হলো। আবারও বৃষ্টির নাম ধরে ডাকল কয়েকবার। সাড়া না পেয়ে ফোন ঢুকাল বৃষ্টির নম্বরে। তবে ওপাশ থেকে ফোন বন্ধ বলছে। অরুনের কেমন মেজাজ খারাপ হলো। কই গিয়েছে কু*ত্তার বাচ্চায়? সামনে পেলে একদম মেরে কেটে একশা করে দেবে।

পরক্ষণেই মাথায় এলো, বাড়িতে যায়নি তো? বিষয়টা মাথায় আসতেই তৎক্ষণাৎ কল বসাল চাচাতো বোনের নম্বরে। তবে ওপাশ থেকে কোনো সৎ উত্তর পেল না। চাচাতো বোন জানাল, বৃষ্টি অরুনদের বাড়িতেও যায়নি। এই পর্যায়ে রাগ ভুলে চিন্তিত হলো অরুন। এই শহরে বৃষ্টি নতুন। পথঘাট ভালো করে চেনে না, এমনকি এর আগে বাংলাদেশেও আসেনি কখনো। এই অচেনা শহরে কই গেল মেয়েটা? কোথাও হারিয়ে যায়নি তো? কিছু একটা মনে আসতেই ইরাদকে কল করল অরুন। তবে ওপাশ থেকে ব্যস্ত বলছে। চিন্তিত অরুন সময় নষ্ট না করে কল কেটে আবার অর্পনাকে কল করল। ওপাশ থেকে কল ধরতেই অরুন যখন বৃষ্টির কথা জিজ্ঞেস করল, তখন অর্পনা শুধু একটা কথাই বলল, "রমনা পার্কে আয়। যা কথা হওয়ার, এখানেই হবে।" অগত্যা ছুটে এসেছে সে। তাড়াহুড়ো করে ইরার বলা জায়গা মোতাবেক পার্কের মাঝামাঝি দিকটায় আসতেই পার্কের টুলে বসে থাকা বৃষ্টিকে দেখতে পেল। তার সাথে ইরাদও বসে আছে। অর্পনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে দ্বীপের সাথে ভিডিও কলে মত্ত। অনেকটা দূরে প্রকৃতি আর অরণ্যক বালি নিয়ে খেলছে। বৃষ্টি ইরাদের কাঁধে মাথা রেখে একমনে ছেলে-মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে। বেয়াদবের বাচ্চাকে এভাবে রিল্যাক্সড বসে থাকতে দেখে রাগে ফেটে পড়ল অরুন। তেড়ে গিয়ে হাত ধরে টান বসাতেই চমকে উঠে দাঁড়াল বৃষ্টি। তরুণের চোখে-মুখে রাগের দাবানল। দাঁতে দাঁত পিষে তাকিয়ে আছে নাজুক মেয়েটার পানে। এই পুরুষকে মারাত্মক ভয় পায় বৃষ্টি। তাই বেশিক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। সহসা নজর স্থির করল মাটিতে। তৎক্ষণাৎ নাজুক কিশোরীর হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরল মানব। মুহূর্তেই ব্যথায় ককিয়ে উঠল মেয়েটা। সহসা অরুনের হাত থেকে বৃষ্টিকে ছাড়াতে অরুনের হাত টেনে ধরল ইরাদ। সেকেন্ডের গতিতে অরুনের দৃষ্টি ঘুরে গিয়ে ইরাদের দিকে স্থির হলো। রাগের তোড়ে মানবের চোখের শিরার রং বদলে লাল রং ধারণ করেছে। দৃষ্টিতে যেন দাবানল ছুটছে। ইরাদকে বাধা দিতে দেখে খেঁকিয়ে উঠল মানব

— হাত ছাড়, ইরাদ। রাগাস না।
,,, ইরাদ ছাড়ল না। বরং অরুনের হাত থেকে বৃষ্টির হাতটা ছাড়িয়ে বৃষ্টিকে টেনে নিজের পিছনে নিয়ে দাঁড় করালো। পরপর অরুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে আওড়ালো—রাগারাগির প্রয়োজন নেই। চল, ঠান্ডা মাথায় কথা বলি। এখানটায় বস।
,,, বলেই বসার টুলের দিকে ইশারা করল। অরুন এখনো ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে। ভয়ের তোড়ে মেয়েটা ইরাদের পিছনে গুটিশুটি মেরে লুকিয়ে পড়ল। বিষয়টাতে আরও রেগে গেল অরুন। মেয়েটা তার বন্ধু-বান্ধবের কাছে কী প্রুভ করতে চাচ্ছে? সে খারাপ? এই মেয়ের খোঁজ-খবর রাখে না? অবহেলা করে? অরুনের কণ্ঠস্বর শুনে কল কেটে ওদের দিকে এগিয়ে এলো অর্পনা। অরুনের দৃষ্টিকে খুব একটা পরোয়া করল না ইরাদ। কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা কাগজের খাম বের করে অরুনের দিকে এগিয়ে দিল—এখানে ঠান্ডা মাথায় বস আর এটাতে একটা সাইন করে দে।

,,, অরুন আবারও বৃষ্টির থেকে চোখ সরিয়ে ইরার দিকে তাকালো। ইরাদ এখনো খামটা বাড়িয়ে রেখেছে। কেমন দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে খামটা হাতে নিল মানব। শুধালো—কী এটা?
,,, ইরাদ উত্তর করার আগেই প্রতিউত্তর করল অর্পনা— খুলে দেখ। ওয়েট, আমি হেল্প করছি।
,,, বলেই খামটা টেনে হাতে নিল। ধীরে ধীরে খাম ওপেন করে ভিতর থেকে কাগজটা বের করে অরুনের সামনে মেলে ধরল। মুহূর্তেই গম্ভীর দৃষ্টিতে সেদিক পানে তাকালো মানব। অর্পনা সোজাসাপ্টা বিষয়টা ক্লিয়ার করল— নরমালি একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনতে যেমন বাবা-মা দুজনের প্রয়োজন পড়ে, তেমনি সেই বাচ্চাকে ধ্বংস করতে হলেও বাবা-মা দুজনেরই সাক্ষর, আই মিন অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। বৃষ্টি অনেক আগেই বন্ডে সাইন করে দিয়েছে। এবার তুইও করে দে। আমাদেরকে আবার হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।

,,, অর্পনার কথায় কেমন থতমত খেয়ে গেল ছেলেটা। কাগজটা ভালো মতো পড়তেই বুঝল এটা অ্যাবরশন বন্ড। মুহূর্তেই অবাক দৃষ্টিতে অর্পনার পানে তাকালো ছেলেটা। বোকার মতো শুধালো— হোয়াট? কিসের বন্ড? কিসের ধ্বংস? কিসের বাচ্চা? কী বলছিস, মাথা ঠিক আছে?
,,, ইরাদ কেমন শব্দ করে হাসল। ওর হাসির শব্দে আবারও ইরার দিকে তাকালো অরুন। এদের আচরণ, কথা-বার্তার মানে বুঝতে পারছে না ছেলেটা। কী বলছে এরা? কেন বলছে? এসবের মানে কী? দ্বিধাগ্রস্ত অরুনের প্রশ্নাত্মক দৃষ্টির বিপরীতে ইরাদ উপহাসভরা কণ্ঠে আওড়ালো— তরা পুরুষজাত বড়ই অদ্ভুত জানিস? তরা ভালোবাসিস না, অথচ কাছে ঠিকই আসিস। প্রিয়জন মনে করিস না, প্রয়োজন মনে করিস না, অথচ প্রয়োজনটা ঠিকই মিটিয়ে নিস। তরা নারীদের নিকৃষ্ট ভেবে আঘাত করিস, আর আমরা নারীরা তা অলঙ্কার মনে করে গলায় বেঁধে রাখি।বৃষ্টির কপালটা একদম আমার মায়ের মতো জানিস?

আমার বাপ ছিল অমানুষ। একটা জীবনে আমার মাকে সম্মান দেওয়া তো দূরের কথা, একটুখানি ভালো ব্যবহার পর্যন্ত করেনি। শুনেছি, পুরুষ যখন পতিতার কাছে যায়, তখনও নাকি পতিতার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। অথচ আমার বাপ ওই মুহূর্তেও আমার মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করেনি। আমি ছোট্ট ইরাদ, মায়ের পাশে শুয়ে থাকতাম। তখন তো এসব বুঝিনি। যেদিন বুঝেছি, সেদিন শুধু পুরুষজাতকে ঘৃণাই করেছি। ভেবেছি, সব পুরুষ বোধহয় এতোটাই জঘন্য হয়। কিন্তু যখন কলেজে এসে তদের সাথে দেখা হলো, তকে আর পল্লবকে পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, এই পৃথিবীতে এমনও পুরুষ আছে, যারা নারীদের শুধু অত্যাচারই না, আগলে রাখতেও জানে। তুই আমার সেই ভরসাটা ভেঙে দিলি? মেয়েটার কী দোষ? বল, ওর বয়স কত? মাত্র আঠারো। মেয়েটা বিয়ের কী বুঝে? সংসারের কী বুঝে? স্বামীর কী বুঝে? তাও তর সংসার করে যাচ্ছে। দিনে তিন বেলা তর সামনে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। সারাদিন নিয়ম করে তর অবহেলা, খারাপ ব্যবহার সহ্য করে যাচ্ছে। ওর কী খুব ঠেকা পড়েছিল এসব করার? তর বাবা-মা তকে ভালো রাখবে বলে একটা নিষ্পাপ প্রাণকে তর সাথে বেঁধে দিল। তর তো ওকে আগলে রাখার কথা ছিল। অথচ গতকাল সারা রাত জ্বরে কাতরানোর পর গোঙানির শব্দ শুনে ওকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিস। তর একটু-ও মায়া হলো না? মানুষ হিসাবে ও না?আচ্ছা! তখনও কী খারাপ ব্যবহার করিস? যখন ওর খুব কাছে থাকিস? তুইও কি আমার বাপের মতো, অরুন?
ইরাদের বাকি কথাগুলো কতটা ইফেক্ট ফেলেছে জানা নেই, তবে লাস্টের প্রশ্নটা যেন অরুনের বক্ষ ছেদ করে দিল। কেমন আনমনেই নিজেকে শুধালো, আমি কি সত্যিই অমানুষ? ইরাদ লম্বা লম্বা দুটো দম নিয়ে ফের বলতে শুরু করল—

— তর বউ প্রেগন্যান্ট। পরশীর গায়ে হলুদের দিন যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, ওটা এই কারণেই ছিল। অথচ আজ তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে, তুই কিছুই জানিস না। কেন জানিস না? তর বউ তকে বলার সাহস পাচ্ছে না। পাছে না তুই এই বাচ্চাটাকেই অস্বীকার করে দিস। সব জানার পর আমার মনে হচ্ছে তদের বাচ্চার ভাগ্যটাও আমার মতোই হবে। আমি চাই না আরও একটা ছোট্ট ইরাদ বাবার হাতে মাকে প্রতিনিয়ত অবহেলিত, অত্যাচারিত হতে দেখে অকালেই নিজেকে হারিয়ে ফেলুক, বেঁচে থেকেও শতবার মরে যাক। বিষয়টাতে বৃষ্টিও একমত, সেও এই বেবি রাখতে চায় না। তুইও নিশ্চয়ই রাখবি না? সুতরাং সাইন করে দেওয়াটাই বেটার অপশন।

,,, ইরাদের বলা এতগুলো কথা একসাথে গ্রহণ করতে পারল না অরুন। সে আড়চোখে একবার ইরাদের পিছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল। এই মেয়েটা তার বাচ্চার মা হচ্ছে? কিন্তু…! নিজেকে সামলাতে না পেরে হুট করেই ঘাসের ওপর বসে পড়ল অরুন। সুস্থ সবল শরীরখানা ঘাসের ওপর পড়তেই ইরাদ আর অর্পনা গাঢ় দৃষ্টিতে অরুনের দিকে তাকাল। বৃষ্টিও কেমন ইরাদের পিছন থেকে উঁকি দিয়ে কান্নাভেজা দৃষ্টিতে অরুনের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়াচ্ছে শুধু। এমন নয় যে অরুন বরাবর বৃষ্টির কাছে যায়। যা হয়েছে, সেটা ভুলবশত নেশার ঘোরে। সেদিন মেয়েটা বাধা দেয়নি, বরং আরও প্রশ্রয় দিয়েছিল অরুনকে। সেই এক রাতের ভুলে এই অনাগত সন্তান। কতটা কাম্য ছিল অরুনের? সে এখন কী করবে? কোথায় যাবে? রাত্রির পর আর কাউকে ভালোবাসা কি আদৌ তার দ্বারা সম্ভব? অথচ ইরাদের পিছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটা তার বাচ্চার মা। জীবনটা বুঝি এমনই? অরুনের বড্ড আফসোস হলো। সে কেন পল্লবের মতো ফেরারি হতে পারল না? কেন ভবঘুরে অরুন হতে পারল না? হতে পারলে হয়তো জীবন তার সাথে এই নিষ্ঠুর খেলাটা খেলতে পারত না। মনে একজন আর জীবনে অন্যজনকে রাখতে হতো না। নিয়তি এত কদাকার কেন? রাত্রিটা কেন চলে গেল তাকে ফেলে? গেল যখন, সাথে নিল না কেন? অরুনের চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে কী করবে এখন? ওই অনাগত বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে? বাচ্চাটার তো কোনো দোষ নেই। সে তো জানেই না, সে তার বাবার করা ভুলের ফল। সে হয়তো ভাবছে, তার বাবা-মা একে অপরকে ভালোবেসেই তাকে পৃথিবীতে আনছে। অরুনের পৃথিবীটা কেমন ধোঁয়াটে ঠেকল। তখনই অরুনের দিকে ছুটে এলো সাড়ে চার বছরের ছোট্ট অরণ্যক আর সাড়ে তিন বছরের প্রকৃতি। এই দুটো বাচ্চার একটা স্পেসিফিক গুণ আছে। এরা চলতি পথে কেউ কারোর হাত ছাড়ে না। বরাবর একে অপরকে আগলে রাখতে তৎপর। প্রকৃতি জোহান মির্জা আর অরণ্যক ওয়াহিদ মির্জা মিলে-মিশে ঠিক যেন আরও এক জোড়া জোহান-বিহান। অরণ্যক প্রকৃতির হাত ধরে ছুটতে ছুটতে অরুনের সামনে এসে দাঁড়াল। অরুন একভাবে তাকিয়ে রইল তাদের ছোটার দিকে। তারও বুঝি এমন নাদুস-নুদুস দেখতে একটা ছেলে অথবা মেয়ে হবে? ছুটে এসে পাপ্পা বলে গলা জড়িয়ে ধরবে? ভেবেই অরুনের দুলায়মান পৃথিবী কিছুটা শান্ত হলো। অরণ্যক প্রকৃতিকে নিয়ে এসে অরুনের সামনে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো—

— আঙ্কেল! তুমি ধুলোয় বসেছ কেন? ওঠো, ময়লা লাগবে তো। (অর্পনার দিকে তাকিয়ে) চ্যাম্প! আঙ্কেলের কী হয়েছে? আঙ্কেল কি অসুস্থ?
,,, ছেলের পরিপক্ব কথায় আজকাল অবাক হয় না অর্পনা। তার কেন যেন মনে হয়, এই বাচ্চাটা বড় হলে বাবা-চাচা কারোর মতোই হবে না। তার আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব থাকবে। খুব ধৈর্যশীল আর বুঝদার হবে এই ছেলে। অরণ্যকের প্রশ্নে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝাল অর্পনা, মানে অসুস্থ না। অরণ্যক কেমন এদিক-ওদিক তাকিয়ে পরিবেশ আয়ত্ত করতে চাচ্ছে, অথচ প্রকৃতির শান্তি নেই। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অনেক কিছু বুঝে নিয়েছে। বুঝে নিয়েই টপ করে অরুনের হাত টেনে ধরল। এক হাতে অরুনের হাত টেনে, আরেক হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে বৃষ্টিকে দেখিয়ে তাড়া দিয়ে বলল— ও অলু মামু, উতো না? ময়লা লাব্বে তো। দেকো, বিত্তি আনতি কান্না কচ্চে। তোমলা কি জগ্গা কলেছো? মাম্মাকে নালিশ কব্বো? পিত্তি (পিটানি) দিবো?

,,, প্রকৃতির বুঝ-অবুঝ কথার মারপ্যাঁচে ফিক করে হেসে ফেলল অরুন। ফুলো ফুলো গালটা টেনে দিয়ে বলল — না মা, আমরা ঝগড়া করিনি। আমাদের পিট্টি দিও না। পিট্টি দিলে আমরা ব্যথা পাব।
প্রকৃতি মাথা ঝাঁকিয়ে আবারও আঙুল তুলে বলল— তায়লে কি তোমলা আবাল জগ্গা কব্বে?
,,,, অরুন মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ করল। প্রকৃতি বেশ খুশি হলো। খুশি মনে ভীষণ তাড়া নিয়ে অরুনকে টেনে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে। অরণ্যও শামিল হলো তাতে। দুজন মিলে-মিশে টানাটানি করে যখন হাঁপিয়ে উঠল, তখনই উঠে দাঁড়াল অরুন। ছেলে-মেয়ে দুটো কী যে খুশি হলো! তারা টেনে-হিঁচড়ে অরুন মামুকে তুলতে পারল যে! কত গর্ব করার একটা বিষয় হলো না? অরুনকে তুলে দিয়ে অরণ্যক প্রকৃতির হাত ধরে বলল— ন্যাচার! চল, আমরা আবার খেলতে যাই।

,,, প্রকৃতি কিছুক্ষণ সবাইকে দেখে আবারও লাফাতে লাফাতে অরণ্যের হাত ধরে আগের জায়গায় চলে গেল। অর্পনা আবারও ছেলের প্রতি সন্তুষ্ট হাসল। বড়দের কথার মাঝে যে থাকতে নেই, সেটা ভালো মতোই শিখিয়েছে মেধাপু। ছেলেটা এই বয়সে এতটা বুঝদার না হলেও পারত। বাচ্চা দুটো চলে যেতেই অরুন সরাসরি ইরাদের পিছনে দাঁড়ানো কিশোরীর দিকে তাকাল। অরুনের সাথে চোখাচোখি হতেই ভয়ে সিটিয়ে গেল মেয়েটা। ইরাদের পরনের কমলা রঙা শাড়ির আঁচলখানা মুঠো করে ধরে চোখের পানি ছেড়ে দিল।অরুনের ঠোঁটে কেমন মলিন হাসি ফুটল। সে হাত বাড়িয়ে নরম স্বরে ডাকল নিজের নিয়তিকে— আয়, এদিকে আয়।
,,,, বৃষ্টি কেমন অবাক বনে গেল। লোকটা তাকে ডাকছে? ইরাদ বৃষ্টির হাত ধরে টেনে সামনে এনে দাঁড় করাল। মেয়েটা এখনো ভয় পাচ্ছে। চোখে টলমল করা পানি। কান্নার তোড়ে চোখের পাতা দুটো ফুলে আছে। ফর্সা হওয়ার দরুন নাকটা টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। পরনে পেঁয়াজ রঙা হাফ সিল্ক শাড়ি। চুলগুলো বেণি করা। অনেকটা সময় পেরিয়েছে বোধহয়, তাই চুলগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। লম্বায় অরুনের বুক থেকে কিছুটা উঁচুতে। এই প্রথম নিজের নিয়তিকে সূক্ষ্ম নজরে দেখল অরুন। এর আগে কোনোদিন দেখা হয়নি। বৃষ্টিকে এখনো ভয় পেতে দেখে অরুন হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির সরু চিকন হাতটা হাতের আজলায় নিয়ে ধীরে ধীরে ওকে কাছে টেনে আনল। কপালে, গালে খরখরে হাতটা ছুঁইয়ে নরম স্বরে শুধালো— জ্বর কমেছে? ঔষধ খেয়েছিস?

,,,, মেয়েটা কেমন দ্বিধা-সংকোচে বিভোর। উত্তর করতে পারছে না। কোনো রকমে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাল ঔষধ খেয়েছে। তৎক্ষণাৎ আবারও এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল অরুনের নিয়তির চোখ থেকে। তা ছিটকে পড়ল নিয়তির গলার ভাঁজে জ্বর পরীক্ষা করতে থাকা অরুনের হাতটাতে। হাতে গরম জলের আবির্ভাব ঘটতেই গলা থেকে হাত সরিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বৃষ্টির চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল— কাঁদিস না। তর বাচ্চার কিছু হবে না। আমি তদের আগলে রাখব।
,,, বৃষ্টি কেমন ঠোঁট ভেঙে ফুঁপিয়ে উঠল। গালে থাকা অরুনের হাতটা কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁতে চেয়েও সাহস পেল না। বিয়ের পর একটা বছরে কখনো নিজ থেকে অরুনকে ছোঁয়ার অনুমতি পায়নি মেয়েটা। একই ঘরে থেকেও দুজনার মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল। ভুলক্রমেও যদি খাবার দেওয়ার বেলায় অরুনের সাথে হালকা স্পর্শ লাগত, সাথে সাথে ধমকে উঠত কঠোর লোকটা। তাই আজও স্পর্শ করার সাহস পাচ্ছে না। বিষয়টা বুঝতে পেরে অরুন নিজ থেকেই মেয়েটার হাত আঁকড়ে ধরল। আরও শব্দ করে কেঁদে দিল মেয়েটা। ফুঁপাতে ফুঁপাতে ভাঙা স্বরে আওড়ালো— আমি তোমাকে ভালোবাসি, অরুন ভাই। আমায় ভালোবেসো না, আমাদের অংশটাকে ভালোবাসবে?
,,, অরুন দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বৃষ্টির মাথায় আলতো করে চুমু খেল। মুহূর্তেই অরুনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল অরুনের নিয়তি। যেই নিয়তি তার কাম্য ছিল না। অথচ তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব গর্ভে ধারণ করে বসে আছে নিয়তিটা। কে বলে সংসার করতে ভালোবাসার প্রয়োজন? কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়তির বেড়াজালে ভালোবাসা ছাড়াও সংসার হয়েই যায়।

,,,, সময়টা ২০১৭।
আব্রাহাম তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের লাস্ট পর্যায়ে। কিছুদিন আগেই টেস্ট এক্সাম শেষ হলো। এখন আবারও রি-টেস্টের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠানটি প্রাইভেট হওয়ার দরুন প্রতিষ্ঠানটিতে একটার পর একটা এক্সাম লেগেই থাকে। তার ওপর সামনে এইচএসসি এক্সাম। অগত্যা এই সময়টাতে পড়ালেখায় তীব্র মনোযোগ রাখতে হয়। আব্রাহাম ছেলেটা যেহেতু পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিল, ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট র‌্যাঙ্ক করা তার স্বভাব। সহসাই সারাদিন, রাতে যতটা সময় পায়, তার ম্যাক্সিমাম সময়টাতেই পড়ালেখায় ডুবে থাকে। এর মানে এই নয় যে সে বাহ্যিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। পড়ালেখা, বন্ধু-বান্ধব, পরিবারসবটা মেইনটেইন করার বেলায় বড্ড নিখুঁত সে। আব্রাহামের বাবা একজন ব্যবসায়ী, মা কলেজের লেকচারার। তারা দুই ভাই, এক বোন। বড় ভাই তখন ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট, বড় আপু জগন্নাথে পড়েন। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ার দরুন পরিবারে তার কদর একটু বেশি। বড় ভাই-বোনের আদরের বাচ্চা যাকে বলে।

,, টেস্ট এক্সাম শেষ হলে কোচিং করা ব্যতীত কলেজে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তবে কোচিং করে সময় নষ্ট করার সময় নেই আব্রাহামের। সে বরাবরই কোচিংয়ে অনুপস্থিত থেকে বাড়িতে পড়াশোনা করে। সেদিন দিনটা ছিল বুধবার। আব্রাহাম কলেজে এসেছিল রি-টেস্টের জন্য ফি জমা দিতে। জমা দিয়ে অ্যাকাউন্ট রুম থেকে ফিরে আসার বেলায় ক্লাস ফোরের ফাঁকা ক্লাসে একটা নয়-দশ বছরের বাচ্চাকে কান্না করতে দেখে পা-যুগল থমকে গেল। বাচ্চাটা প্রথম সারির নিচু বেঞ্চটাতে বসে উঁচু বেঞ্চে মুখ গুঁজে কাঁদছিল। পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম। লম্বা চুলগুলো বার্বি কাট করে দুই ঝুঁটি করা। মুখ গুঁজে থাকার দরুন চেহারা দেখার ফুরসত নেই। আব্রাহাম ভাবল, হয়তো বাচ্চাটাকে কেউ মেরেছে। তাই ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে বাচ্চাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কান্নার তোড়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে মেয়েটা। আব্রাহাম অত্যন্ত নমনীয় স্বরে ডাকল — এই যে, বাচ্চা! কাঁদছ কেন? কে মেরেছে?
,,, কর্ণকুহরে পুরুষালি কোমল স্বর পৌঁছাতেই চোখ তুলে তাকাল বাচ্চা মেয়েটি। বড় বড় পাপড়িবিশিষ্ট চোখ দুটোতে তখনো টইটম্বুর করা পানি। ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। অতিরিক্ত ফর্সা হওয়ার দরুন ফুলে-ফুলো গাল দুটো লাল রং ধারণ করেছে। সরু চিকন নাকটা গালের চেয়ে বেশি লাল রঙে রঞ্জিত হয়েছে। ঠিক যেন কাশ্মীরি আপেল। আব্রাহামের কোমল দৃষ্টিতে এবার মুগ্ধতার ছড়াছড়ি। বাচ্চারা কাঁদলে বুঝি এত কিউট লাগে? তার তো চোখই সরছে না। বাচ্চাটি কোলে থাকা ব্যাগটা বুকে চেপে ধরে ছোট ছোট হাতে গাল মুছে উত্তর করল — মারেনি, কিন্তু মারবে।

,,, আব্রাহাম অকারণেই ঝুঁকে গেল মেয়েটার দিকে। সামনাসামনি হাঁটু গেড়ে বসে শুধাল — কে মারবে? কী হয়েছে, আমাকে বলো।
,,, বাচ্চাটি বড্ড সরল-সাধাসিধে। সবাইকে মুহূর্তেই আপন ভেবে নেয় বোধহয়। নয়তো এইটুকু আলাপে নিজের প্রবলেম শেয়ার করা তো সবার কাজ নয়। বাচ্চাটি কোলে রাখা ব্যাগ থেকে লাক্স কালারের মার্কশিটটি বের করে আব্রাহামের সামনে মেলে ধরল। সেখানে চকচক করছে দুটো সাবজেক্টে লাল কালির দাগ, মানে ফেল করেছে। বাচ্চাটি মার্কশিট থেকে চোখ সরিয়ে আবারও আব্রাহামের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই চোখ ভরে গেল পানিতে। পলক ঝাপটানোর সাথে সাথে পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। মেয়েটি নাক টেনে উত্তর করল — পরশী তো পড়ালেখায় খুব একটা ভালো না। মাথায় গোবর, ব্রেইনও হাঁটুতে, তাই তার রেজাল্ট খুব খারাপ হয়। এটা তো আম্মু বুঝে না। খালি বকে, মারে আর পানিশমেন্ট দেয়। পরশী আবারও দুই সাবজেক্টে ফেল করেছে। আজ বাড়ি গেলে আম্মু খুব মারবে। আমি বাড়ি যেতে চাই না।
,,, মেয়েটার কথা শুনে বড্ড আশ্চর্য হলো কিশোর। কাউকে এভাবে নিজের নাম নিয়ে কথা বলতে প্রথম দেখছে সে। আবার নিজের বদনাম নিজেই করছে। আব্রাহামের মুগ্ধ হওয়ার সাথে সাথে হাসিও পেল, তবে হাসল না। একটা বাচ্চা মেয়ে কাঁদছে, আর সে কিনা বাচ্চাটির সামনে হাসবে? কী বাজে ব্যাপার! আব্রাহাম পরশীর মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিল। আশ্বস্ত ভরাট কণ্ঠে বলল— প্রভা ম্যামকে চিনো? তোমাদের গণিত ক্লাস করেন! (পরশী মাথা ঝাঁকাল, মানে চেনে।) ওই প্রভা ম্যাম আমার আম্মু। আমি আমার আম্মুকে বলব তোমার আম্মুকে যেন কল করে বুঝিয়ে বলে, তোমাকে যেন পানিশ না করে, কেমন? কেঁদো না।

,,, এই অল্প কথাটুকুই কেমন অবোধের ন্যায় বিশ্বাস করে নিল মেয়েটা। দুহাতে গাল মুছে বলল— সত্যি বলবে?
,,, আব্রাহাম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল— হুম, একদম!
,,, বড্ড খুশি হলো ছোট্ট পরশী। তাড়াহুড়ো করে মার্কশিটটা ব্যাগের ভিতর রেখে উঠে দাঁড়িয়ে আব্রাহামের হাত টেনে ধরল। দ্বিধা নিয়ে উঠে দাঁড়াল আব্রাহাম। কিছু জিজ্ঞেস করতে নেবে, তখনই পরশী এক গাল হেসে বলল— আমার বড় ভাইয়া বলেন, কারোর থেকে এমনি এমনি কিছু নিতে নেই, দিতেও নেই। সবকিছুতেই একটা বিনিময় থাকতে হয়। তুমি আমার উপকার করবে বলেছ, তাই আমিও তোমাকে কিছু দিতে চাই। চলো ক্যান্টিনে যাই। আজকে তোমাকে আমার টাকায় খাওয়াব।

,,, আব্রাহাম কেন যেন আপত্তি করতেই পারল না। এগিয়ে গেল পরশীর পিছু পিছু।
অতীতের এক ঝলক স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠতেই তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আবার হাতে থাকা অ্যালবামে নজর স্থির করল পরশী। এই অ্যালবামটি আব্রাহামের, তবে ম্যাক্সিমাম ছবি পরশীর। পুরো অ্যালবামজুড়ে শুধু পরশীয়া মির্জা আর পরশিয়া মির্জা। পরশীর দশ বছর বয়স থেকে শুরু করে আজকের বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত অনেক ছবি আছে মোটা অ্যালবামটায়। প্রতিটি ছবির নিচে ছোট ছোট করে লেখা Kasmerri apple। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আব্রাহামের কাছে পরশীর এমন এমন ছবি আছে, যা সে নিজেও কোনোদিন তোলেনি। সহসাই বোঝা যায়, আব্রাহাম সেই প্রথম সাক্ষাতের পর থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত তাকে স্টক করেছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে আরও একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল মেয়েটা।
,,,তার আর আব্রাহামের বিয়ে হয়েছে আজ তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। একটা মানুষের পক্ষে তার ভালোবাসাকে কতটা আগলে রাখা সম্ভব, জানা নেই পরশীর। তবে সে শুধু জানে, আব্রাহামের মতো করে কেউ তাকে আগলে রাখতে পারত না। এর থেকে বেশি আগলে রাখা যায় না। ভালোবাসার মানুষ পেলে বুঝি মানুষ এমনই করে? অথচ এত এত ভালোবাসার বিনিময় স্বরূপ কিছুই দিতে পারছে না পরশী। ইদানীং তার বড্ড অপরাধবোধ কাজ করে। কেন সে আব্রাহামের জীবনটা নষ্ট করে দিল?

পরশীর গভীর ভাবনার মাঝেই লাইট অফ করে দিল আব্রাহাম। আকস্মিক আলো নিভে যেতেই চোখ তুলে তাকাল পরশী। ভ্রু কুঁচকে নিতেই সাবধান করল আব্রাহাম — একদম ভ্রু কুঁচকাবে না, আমার হৃদয় কাপে।
,,,মুহূর্তেই ড্রিম লাইট জ্বলে উঠল। পরশীর কুঁচকানো ভ্রুটা শিথিল হয়ে এলো মুহূর্তেই। আব্রাহামের কথার বিপরীতে কথা বলার ভাষা পেল না মেয়েটা। কী বলবে? আব্রাহামের প্রেম-বাক্যের বিপরীতে পরশীর কিছুই বলার নেই। আব্রাহাম এগিয়ে এসে পরশীর হাতে থাকা অ্যালবামটা আলতো করে বন্ধ করে দিতেই পরশী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। আব্রাহাম ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল — অনেক দেখেছ। আপাতত ঘুমাও। রাত জেগে চোখের নিচে কালি পড়ে গেলে তোমার ভাইয়ারা ভাববে আমি তাদের বোনকে অযত্নে রেখেছি।
,,, বলতে বলতে অ্যালবামটা নিয়ে সাইড ড্রয়ারে রেখে দিল। পরপর এগিয়ে এসে পায়ের তলায় থাকা কম্ফোর্টারটা খুলে পরশীর কোমর পর্যন্ত ঢেকে দিতেই পরশী দ্বিধাভরাট কণ্ঠে শুধালো — আপনি তখন থেকেই আমাকে ভালোবাসতেন?
,,,, আব্রাহাম পরশীকে রেখে ওপাশ দিয়ে বিছানায় উঠে পরশীর পাশাপাশি বসে উত্তর করল — নাহ! তবে ভেবেছিলাম, বউ বানালে তোমাকেই বানাব।

,,, ফের প্রশ্ন করল পরশী — তাহলে ভালোবাসা?
,,, আব্রাহাম উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে কিছুক্ষণ ভাবল। অনেক ভেবেও যখন উত্তর পেল না, তখন সরল স্বীকারোক্তি দিল — জানি না। কখন, কোথায়, কীভাবে হয়ে গিয়েছে। ভালোবাসাটা আসার বেলায় আমার পারমিশন নেয়নি।
,,, বলেই অমায়িক হাসল ছেলেটা। সাজিয়ে রাখা কুশনগুলোর থেকে কোলবালিশ নিয়ে মাঝখানে রাখতে নিতেই বাধা দিল পরশী। মাথা নিচু করে নিচু স্বরে বলল — আপনি চাইলে আপনার অধিকার বুঝে নিতে পারেন। আমি আপনার অধিকার থেকে আপনাকে বঞ্চিত করে পাপ কামাতে চাই না।
,,, আব্রাহাম কেমন শব্দ করে হেসে কোলবালিশটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানায় গা হেলিয়ে শুয়ে পড়ল। আব্রাহামের হাসির শব্দ শুনে ভড়কে গেল পরশী। এখানে হাসার কী হলো? লোকটা কি তাকে উপহাস করছে? পরশীর মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তরস্বরূপ হাসি থামিয়ে নিজের বুকের দিকে ইশারা করল আব্রাহাম। মানে পরশীকে তার বুকে মাথা রেখে শোয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। পরশী কেমন ইতস্তত দৃষ্টিতে তাকাল। সে বলল, আর লোকটা রাজি হয়ে গেল? একবারও ভাবল না, এসবে সত্যি সত্যিই পরশীর ইচ্ছা আছে কিনা? পুরুষ মানুষ আসলেই খারাপ। পরশীকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আব্রাহাম আবারও ইশারা করল বুকে মাথা রেখে শোয়ার জন্য। পরশী আর কী করবে? বলে ফেলেছে না? এখন তো অস্বীকার করার জো নেই। সে হাসফাঁস করতে করতে আব্রাহামের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। মুহূর্তেই গলা সমান কম্ফোর্টার টেনে পরশীকে জড়িয়ে ধরল মানব। বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল — আগে ভালোবাসো, তারপর সব হবে।
,,, বলেই দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আব্রাহাম। অকারণেই পরশীর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কে বলে পুরুষ মানুষ দেহের পাগল? আব্রাহামের মতো কিছু পুরুষ ভালোবাসার পাগলও হয়।

রাত ১২টা বেজে ২৫।
বারান্দায় রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অর্পনা। দৃষ্টি ঘন আধারের পানে স্থির। পরনে আকাশি রঙা শাড়ি, গায়ে কারুকাজ করা শাল। মনটা বেশ ভার। সন্ধ্যা নাগাদ দ্বীপের সাথে অল্পবিস্তর কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কারণটা অবশ্য তেমন মারাত্মক নয়। রাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে হয়তো সন্ধ্যা থেকেই ডিস্টার্বড ছিল দ্বীপ। বিষয়টা অর্পনা বুঝতে পারেনি। ডিনারের পর রুমে এসে দ্বীপকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ভেবেছিল, উনার বোধহয় মাথাব্যথা করছে। তাই আবারও বেক করে নিচ থেকে কফি এনে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিতেই, ভুলবশত সেটা ফসকে গিয়ে দ্বীপের হাতের ওপর পড়ে যায়। সে নিয়েই ধমক দিয়েছিল লোকটা। যদিও এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অর্পনা কখনো রাগ করে না। মানুষের জীবনে প্রবলেম আসতেই পারে, মন-মেজাজ খারাপ থাকতেই পারে। সুতরাং এটুকু ব্যাপারকে আহামরি কিছু মনে করার প্রয়োজন মনে করল না। কিন্তু বিপত্তি বাধল তখন, যখন অর্পনা তাড়াহুড়ো করে মলম এনে দ্বীপের হাতে লাগিয়ে দিতে নিতেই আরও একটা অকারণ ধমক দিল দ্বীপ। দ্বিতীয়বারের মতো ধমক খাওয়ার পর অর্পনার আর কিছু বলতে ইচ্ছা হলো না। দ্বীপ যেহেতু কাছে যাওয়ায় বিরক্ত হচ্ছে, সেহেতু সে নাহয় দূরেই থাকল। সে দূরে থাকলে যদি দ্বীপ ভালো থাকে, তাহলে দ্বীপের ভালো থাকা দীর্ঘস্থায়ী হোক।

সন্ধ্যায় দুজনার মাঝে যেই দূরত্বটুকু তৈরি হয়েছিল, সেই দূরত্বটুকু গোছানোর প্রয়াস করেনি লোকটা। অর্পনাও যায়নি যেচে পড়ে কারোর মনোযোগ পেতে। বর্তমান সময়টা ঘুমানোর। লোকটা কী করছে, সে বিষয়ে ধারণা নেই অর্পনার। তবে প্রকৃতি অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছে। ওকে ঘুম পাড়িয়েই এখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে। রুমে যেতে ইচ্ছা করছে না। কেউ মূল্য দিতে না চাইলে তার পেছন পেছন ঘুরাঘুরি করা তার স্বভাব নয়। হয়তো তাকে পেতে কিছুটা ছলাকলা করেছে, তার হতে গিয়ে কারোর হৃদয় টুকরো করেছে; কিন্তু তার সামনে কোনোদিন তার জন্য পাগলামি করা হয়নি। অর্পনার কেন যেন আজ নিজের জন্য দুটো গানের লাইন আওড়াতে ইচ্ছা করল, যেই লাইনের প্রতিটি শব্দ অর্পনার জীবনের সাথে অদ্যপ্রান্ত মিলে যায়। মেয়েটা খোলা আকাশে নাক ঠেকিয়ে লম্বা শ্বাস টানল। মুহূর্তেই উত্তর হতে আসা জড়ো হিমেল হাওয়া চোখে-মুখে এসে ঠেকতেই আনমনে বিড়বিড়ালো রমণী—

তর কারণে ভুললাম আমি গোত্র, জাতি, কুল,
কাঁটার সাথে করলাম সন্ধি, পায়ে পিষে ফুল।
আগুন জেনেও পুড়লাম আমি, দিলাম তাতে ঝাঁপ,
তর আমার প্রেমে ছিল রে বন্ধু, ছিল পুরোটাই পাপ!!
অর্পনার আওড়ানো গানের রেশ কোথায়, কতটা, কী পৌঁছেছে জানা নেই। তবে গানের লাইনটুকু ফুরোবার সাথে সাথেই পাশে এসে দাঁড়াল অর্পনার কাঙ্ক্ষিত মানুষটা। অর্পনার একটা হাত রেলিংয়ের ওপর রাখা ছিল, যা শীতের তোপে অনবরত মৃদু হারে কাঁপছে। মানুষটা সেই হাতের পাশাপাশি নিজের বাম হাতখানা রাখল। শুধু নামমাত্রই দূরত্ব রয়েছে হাত দুটোর। আর এক চিমটি পরিমাণ এগুলেই মিলন ঘটবে তাদের। অর্পনা আড়চোখে দেখল পাশাপাশি রাখা দুটো হাত। পরক্ষণেই তীব্র অভিমানে নজর সরিয়ে নিল। পাশে দাঁড়ানো মানবটি কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে মানবির দিকে তাকিয়ে রইল। ভিতরটা কেমন হাসফাঁস লাগছে। এই প্রথম কথা গুলিয়ে ফেলছে মানব। কিভাবে কী শুরু করবে, বুঝে পাচ্ছে না। অগত্যা কথা না পেয়ে কিছুটা দ্বিধাভরা কণ্ঠেই বলল — রাত অনেক হয়েছে, কেউ কি ঘুমাতে যাবে? রুমের লাইট অফ করে দিতে চাচ্ছিলাম।
অর্পনা আগের ন্যায় অন্ধকারে নজর স্থির রেখে শান্ত ভঙ্গিতে প্রতিত্তোর করল — লাইট অফ করার হলে করে ঘুমিয়ে যাওয়া উচিত। আমি কাউকে বাধা দেইনি।
অর্পনার উত্তরে দ্বীপ প্রশান্ত হলো। সে তো ভেবেছিল এই মানবি তার ওপর অভিমান করে কথার উত্তরই দেবে না। তাও ভালো, উত্তর দিয়েছে। তবে দুজনার মাঝে হওয়া বর্তমান কনভারসেশনটা অকারণেই ভালো লাগল দ্বীপের। তাই এমন করেই ত্যাঁছড়া বাক্যে উত্তর করল — রুমের লাইট অফ করার পর কেউ ভয় পেলে, তার দায় আমার নয়।
ক্ষীণ হাসল অর্পনা — রাতের জোনাকিকে আধারের ভয় দেখানো বোকামি।

— এত পাকা কথা না বলে ঘুমাতে গেলেই হয়
— আমার যখন ইচ্ছা হবে, তখন ঘুমাব।
দ্বীপ এই পর্যায়ে অর্পনার সাথে মিশে দাঁড়াল। হাত দুটোর মাঝেও এখন আর দূরত্ব নেই। অর্পনার ছোট ছোট আঙুলগুলোর ফাঁকে দানব লোকটার দানবীয় আঙুলগুলো জায়গা নিয়েছে, চেপে ধরেছে রেলিংয়ের সাথে। সেভাবেই থেকে দ্বীপ কিছুটা রাগমিশ্রিত কণ্ঠে আওড়াল — কাউকে নিজের ডিসিশন নিজে থেকে নেওয়ার পারমিশন দেওয়া হয়নি। আমার মনে হচ্ছে, ঘরে যাওয়া উচিত। এই মুহূর্তে ঘরে যাওয়া হোক।
এতোকিছুর পরেও শান্ত অর্পনা। দূরে যাওয়ার পায়তারা করেনি। যাকে স্বেচ্ছায় নিজের জীবনের সাথে জড়িয়েছে, তার থেকে দূরে যাওয়া কতটা যুক্তিদায়ক? অর্পনা দ্বীপের কথার ভিত্তিতে নাকচ করে বলল — আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমার পাপ্পাও নেয়নি কোনোদিন।
দ্বীপ কপাল গুটিয়ে তাকাল রমনির পানে। কেমন কাটকাট গলায় উত্তর করল — আমি কারোর পাপ্পা নই, আমি কারোর হাসবেন্ড হই। সম্মান দিয়ে কথা বলা হোক।
— তাই বলেই তো অকারণ ধমক দেওয়া যায়।

এই পর্যায়ে অর্পনার কণ্ঠটা কেমন ভেঙে এল। হাতটাও সরিয়ে নিতে চাইল দ্বীপের হাতের বাঁধন হতে। ভুলবশত এই হাতটাতেই গরম কফি পড়েছে। যার দরুন অর্পনা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল লোকটা। অর্পনার বুকটা কেমন ধক করে উঠল, তবে কোনো রিয়্যাকশন দেখাল না। হাত ছাড়ানোর প্রয়াস না চালিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে-মুখে দারুণ বিষাদ, অভিমানে বুকের পাটাতনে কাঁপন ধরেছে। বড্ড কাঁদতে ইচ্ছা করছে আজ। ইম্ম্যাচিউর ওয়াইফগুলোর মতো তার বুকে মাথা রেখে কেঁদে কেঁদে তার নামেই নালিশ জানাতে ইচ্ছা করছে। পাশে দাঁড়ানো মানবটি অর্পনার ভঙ্গুর মনটাকে পড়তে পারল বোধহয়। সময় নষ্ট না করে অর্পনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তেই মুচড়ে উঠল রমনি। থাকবে না এই অদ্ভুত লোকটার বাহুবন্ধনে। দ্বীপও নাছোড়বান্দা। অর্ধাঙ্গিনী যে আজ ভীষণ মন খারাপ করেছে, সেই মন খারাপ মেটাতে হলে একটুখানি কষ্ট তো করতেই হবে। দুজনার মাঝে অনেকটা সময় নীরব যুদ্ধ চলল। অর্পনা নিজেকে ছাড়াতে চাচ্ছে আর দ্বীপ অর্পনাকে আটকে রাখতে চাচ্ছে। অথচ যুদ্ধ শেষে জিতে গেল দানবীয় শক্তির অধিকারী লোকটা। দুহাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়ে নিজের সাথে বেঁধে রেখে লোকটা কেমন কাতর কণ্ঠে শুধাল — আমার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছো?

অর্পনা উত্তর করল না। কাঠ হয়ে মিশে রইল আপন মানবের বুকে। দ্বীপ কণ্ঠে একরাশ অনুতাপ ঢেলে আওড়াল— দুঃখিত, মিসেস!! আর কখনো কোনো কারণে ধমক দেব না তোমায়। আমি খুব, খুব সরি।
তবুও টলল না মানবি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বোধহয় এখনো অভিমান কমেনি। দ্বীপ ক্ষণিক ভেবে অর্পনাকে ছেড়ে দিল। পরপর অর্পনাকে জোরপূর্বক নিজের দিকে ঘুরিয়ে আদুরে কণ্ঠে শুধাল — আজ তোমায় বুকের ওপর নিয়ে ঘুম পাড়াই?
অরূপ কথায় না চাইতেও বড়ো আশ্চর্য হলো অর্পনা। ঠোঁট ফুঁড়ে আনমনেই বেরিয়ে এলো — মানে?
দ্বীপ উত্তর করল না। বরং রমনিকে বারান্দায় রেখেই রুমে চলে গেল। ফিরে এলো হাতে কম্ফোর্টার নিয়ে। অর্পনা কেমন দ্বিধাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কী করতে চাচ্ছে এই লোক? দ্বীপ সুইমিং পুলের কাছে এগিয়ে গিয়ে পুলের পাশে রাখা দোলনাতে কম্ফোর্টার বিছিয়ে দিল। পরপর যেই গতিতে এগিয়ে গিয়েছিল, সেই গতিতেই অর্পনার সামনে এসে দাঁড়াল। এই পর্যায়ে ভ্রু গুটিয়ে নিল অর্পনা। কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার আগেই ওর দিকে ঝুঁকে এলো দ্বীপ। গলার দিকে ইশারা করে বলল — গলা জড়িয়ে ধরো।

কী করবে ভেবে পেল না মানবি। সে তো কিছু বুঝতেই পারছে না, কী করতে চাচ্ছে এই লোক। অর্পনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ নিজেই অর্পনার হাত দুটো টেনে গলার ভাঁজে রাখল। পরপর আলতো করে কোলে তুলে নিল ওকে। সেভাবেই থেকে এগিয়ে গিয়ে অর্পনাকে নিয়ে দোলনায় বসে পড়ল। পরপর কম্ফোর্টার টেনে ঢেকে দিল দুজনার শরীর। দ্বীপের কাণ্ডে কী যে অবাক হলো অর্পনা! লোকটা কীসব করছে! এখানে এভাবে দোলনায় ঘুমানো আদৌ কি সম্ভব? মনে প্রশ্ন জাগতেই প্রশ্ন করে বসল অর্পনা—
— কী করছেন? এভাবে আদৌ দোলনায় ঘুমানো যায়?
দ্বীপ কম্ফোর্টারটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে কোনো বাক্যব্যয় ছাড়া অর্পনার মুখটা নিজের গলার ভাঁজে রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উত্তর করল—

— দোলনাতে ঘুমাবে কেন? তুমি আমার বুকের ওপর ঘুমাও।
আপন পুরুষের গলার ভাঁজে নাক ঠেকতেই মোহিত হয়ে পড়ল অর্পনা। পুরুষালি ঘ্রাণে কেঁপে উঠল রমনির নাসারন্ধ্র। এক হাতে খামচে ধরল মানবের পরনের স্যান্ডো গেঞ্জি। গলা থেকে মুখ সরিয়ে আধো-উন্মুক্ত বুকে ঠোঁট ছুঁইয়ে শুধাল — আর আপনি কোথায় ঘুমাবেন?
অর্পনার ওষ্ঠের ছোঁয়ায় দ্বীপের ভিতরে কেমন কম্পন সৃষ্টি হলো। নিজেকে স্থির রাখতে পারল না মানব। সহসা বুকের সাথে চেপে ধরল অর্পনার মাথাটা। ধীর স্বরে প্রতিত্তোর করল — তোমাকে বুকে নিয়ে ঘুমাব।
দ্বীপের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে মনে মনে কূটিল হাসল অর্পনা। আরও একটু জ্বালাতে হাত চালাল দ্বীপের লোমশ বুকে। ধীরে ধীরে ভেজা চুম্বন করতে লাগল তাতে। মুহূর্তেই অনুভূতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে মানব ফিসফিস করে আওড়াল — নিজের সর্বনাশ নিজে থেকে ডেকে এনো না। দোলনায় আছি বলে একটুকরো ছাড় দেওয়া হবে না তোমায়।
দ্বীপের হুঁশিয়ারিতে থোড়াই কেয়ার করল রমনি। সে মত্ত রইল জ্বালাতন করার প্রচেষ্টায়। এই পর্যায়ে দ্বীপ নিজেও খেই হারাল। অ্যাকশনের বিপরীতে যেই না রি-অ্যাকশন দিতে নেবে, অমনি রুমের ভিতর থেকে শোনা গেল প্রকৃতির ডাক। মেয়েটা কাঁদো কাঁদো স্বরে ডাকছে — মাম্মা!! পাপ্পা!! তোমলা কোতায়? পকিতি তোমাদেল পাচ্চে না। মাম্মা!! ও মাম্মা!! পাপ্পাগো!! পাপ্পা!!

মেয়ের অনবরত ডাক কানে এসে বাড়ি খেতেই ফের দাঁতে দাঁত চাপল মানব। বিড়বিড় করে আওড়াল — বাপের সুখ সহ্য করতে না পারা চৌবাচ্চাটা উঠে পড়েছে।
দ্বীপের কথায় ঠোট টিপে মৃধু হাসলো অর্পনা। মানুষটার এরকম থতমত রূপ অর্পনাকে বড্ড আনন্দ দেয়। অর্ধাঙ্গিনীর অভিব্যাক্তি মোটেও পছন্দ হলো না দ্বীপের। তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজের অনুভূতি আয়ত্তে এনে মেয়ের উদ্দেশ্যে উত্তর করল — পাপ্পা ইজ হেয়ার, সুইটহার্ট। বারান্দায় আসো।
প্রকৃতি “মাম্মা, পাপ্পা ” বলে ডাকতে ডাকতে চোখ কচলাতে কচলাতে বারান্দার দরজার কাছে এসে উঁকি দিল। মাম্মা-পাপ্পাকে আরাম করে দোলনায় শুয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল মেয়েটার। দ্বীপ কম্ফোর্টার সরিয়ে হাত এগিয়ে দিয়ে মেয়েকে ডাকল — কাম হেয়ার, সুইটহার্ট!!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯

কাঠবিড়ালির বাচ্চার মতো এক ছুটে বাবা-মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। দ্বীপ কখনোই মেয়েকে নিজ থেকে কোলে নেয় না। বরাবর মেয়েকে নিজ থেকে কোলে ওঠার জন্য প্রশ্রয় দেয়। প্রকৃতি নিজ থেকেই স্বভাবসুলভ কাঠবিড়ালির বাচ্চার মতো বেয়ে বেয়ে পাপ্পার কোলে উঠে বসল। মুহূর্তেই মেয়েকে টেনে বুকের ওপর শুইয়ে দিল দ্বীপ। পরপর কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে দিল অর্ধাঙ্গিনী ও মেয়ের নরম শরীরখানা। অর্পনা মেয়েকে আরেকটু টেনে নিজের কাছাকাছি নিয়ে এলো। প্রকৃতি পাপ্পার বুকে মাথা ঠেকিয়ে মাম্মার গলা জড়িয়ে বলল — ও মাম্মা!! আছকে কি পকিতি আল মাম্মা পাপ্পা একানে থাব্বে?
অর্পনা মাথা ঝাঁকিয়ে মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বলল — হুম!! আজ প্রকৃতির পাপ্পা আমাদের বিছানা। প্রকৃতি আর তার মাম্মা আজ এই বিছানায়ই ঘুমাবে।
প্রকৃতি কেমন দ্বিধাভরা দৃষ্টিতে মুখ উঁচিয়ে পাপ্পার দিকে তাকাল। ঘুম-ঘুম পলক ঝাপটে শুধাল— — পকিতি আল মাম্মা গুমালে পাপ্পা দুক্ক পাবে না?
নিজের জন্য মেয়েকে চিন্তিত হতে দেখে আনন্দে দ্বীপের বুকটা ভরে উঠল। এই অনুভূতিটা প্রকাশ করার ভাষা জানা নেই মানবের। সে কেমন আপ্লুত দৃষ্টিতে মেয়ের পানে তাকাল। মুখ নামিয়ে শক্ত চুম্বন করল মেয়ের ছোট্ট কপালটায় — নিজের ভার বহন করতে কষ্ট হয় না, সুইটহার্ট!! তোমরা তো আমার নিজের। তোমার মাম্মা আমার অর্ধাংশ, আর তুমি আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৭০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here