Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৩+২৪

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৩+২৪

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৩+২৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“ আরে আমাদের তন্দ্রাবতী ভাবী যে! তবে তন্দ্রা বিলাস শেষ হলো বুঝি আপনার? ”
বলেই সব মেয়েদল উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। মাত্র নিজের রুম থেকে রীতির রুমে পা রেখেছিলো হীরা। সবার এমন সম্বোধনে প্রথমে কিছুটা ভরকে গেলো সে। তবে যখন মনে পরলো সে ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিল তখন নিজেও সবার সাথে হেসে গিয়ে বসলো সবার মাঝে। বললো,

“ সবাই মেহেদি দেওয়ায় ব্যাস্ত ছিলো। আমারও খুব ক্লান্ত লাগছিলো তাই ট্যাঙ্ক এর সাথে গিয়ে হেলান দিয়েছিলাম। ভাবিনি ঘুমিয়ে পড়বো। ”।
“ তুমি তো শান্তিতে ঘুমিয়েছো আর পুরো বাড়ি তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে এই নিয়ে। ”
কপালটা খানিক কুঁচকে গেলো হীরার। বললো,
“ কী হয়েছিলো? ”
“ তুমি ট্যাংক এর পিছনে থাকায় আমরা কেউই তোমায় দেখতে পায়নি। তারপর পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন তোমার দেখা মেলে নি তখন এক এক জনের অবস্থা যদি তুমি দেখতে! বিশেষ করে অনিল ভাইয়ার, আল্লাহ উনি হয়তো আরেকটু হলে কেঁদেই দিতেন। ”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ইতির মুখ থেকে কথাগুলো শুনে বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো হীরা। সে তো ভূলে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর এইদিকে এই কাণ্ড ঘটে গেলো সে কিছুই জানে না!
“ তারপর কীভাবে খুঁজে পেলে? ”
“ তারপর আর কীভাবে, অনিল ভাই আবারও ছাদে গেলো তারপর সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষে পানির ট্যাংক এর পিছনে তোমার দেখা পেলো। আমিতো ঐ সময় হাসবো নাকি কাঁদব সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। এইটা কোনো কথা! ”
আবারও সকলে একসাথে হেসে উঠলো। বাদ রইলো না রীতিও সে এতক্ষন কান্না করছিলো। ছোটবেলা থেকে মা- বাবার সাথে থাকা মেয়েটা আজ অন্য এক জায়গায় অন্য এক পরিবারে চলে যাবে- ভাবলেই বুক ফেটে কান্না আসছে তার। আর তাই সবাই তাকে স্বাভাবিক করতেই তার রুমে এসেছিলো।

রতের সব ঘটনা শুনে মিটি মিটি হাসছে আর রুমের দিক যাচ্ছে হীরা। এখন তার বড্ডো আফসোস হচ্ছে- ইশ, সে যদি একটু সজাগ হতো তাহলে হয়তো অনিলের অবস্থা টা দেখতে পারতো। আসলেই কী অনিল তার জন্য এতটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো? ভাবতে ভাবতেই রুমে প্রবেশ করলো সে। সহসা অনিলের কণ্ঠে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো সে,
“ এইগুলো কী করেছো তুমি? ”
শুধু প্যান্ট পরে উদোম গায়ে হাতে একটা তোয়ালে নিয়ে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে হীরার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করেছে অনিল। তার কথায় প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তার দিক তাকালো হীরা। বললো,

“ কী করলাম? ”
“ এইগুলো কী করেছো তুমি! এখন কীভাবে বাইরে যাবো আমি? ”
হীরার নিকট এসে নিজের ঘাড়ের দিকটা দেখাতে দেখাতে বললো অনিল। তার পুরো ঘাড় জুড়ে মেহেদির ছাপ স্পষ্ট, যা গতকাল রাতে হীরা তার গলা জড়িয়ে ধরার কারনে বসে গেছে। কিছুক্ষন সেগুলো পর্যবেক্ষণ করলো হীরা। তারপর ফিক করে হেসে উঠলো। বললো,
“ নট ব্যাড, এখন একদম নিশ্চিত বুঝা যাবে আপনি বিবাহিত আর কেউ আপনার দিক নজর ও দিবে না। ”
“ নট ব্যাড না? নট ব্যাড! ”

হীরার দিক এগোতে এগোতে বললো অনিল। আর এইদিকে হীরা তার আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে দিলো এক দৌঁড়। তবে যেতে পারলো না বেশি দূর এর আগেই অনিল তার কনুই চেপে ধরলো। তারপর কেমন একটা কাঁপনধরানো কণ্ঠে বললো,
“ তাহলে তো আপনার মাঝেও একটা ট্যাগ লাগিয়ে দিতে হয়। যেনো সবাই বুঝতে পারে আপনিও বিবাহিতা। ”
তার এমন গম্ভীর স্বর আর আপনি সম্বোধনে শুনে একটা শুকনো ঢোক গিললো হীরা। বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো,
“ আমাকে তো সবাই ভাবী বলেই ডাকে তাতেই তো বুঝা যাবে আমি বিবাহিতা। আর আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম এখানে আমার কী দোষ আছে বলুন? ”
“ নাহ তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি ঘুমের মাঝে থেকেই সবাইকে নাকানি চুবানি খাওয়াবে তাতে তোমার কী দোষ! ”

“ আপনার কী আমার জন্য চিন্তা হচ্ছিলো? ”
অনিলের দিক মোহময় চাহনি নিক্ষেপ করে কথাটা বললো হীরা। ভাবলো অনিল হয়তো বলবে, “ শুধু চিন্তার কথা বলছো তুমি আমি তো আরেকটু হলে তোমাকে ছাড়া মরেই যেতাম।” তবে তার সব আশায় পানি ডেলে অনিল বললো,
“ নাহ মোটেও না, আমার তো চিন্তা হচ্ছিলো তোমাকে কে নিয়ে গেলো তার জন্য। বেচারা এই অবুঝ রুগী সামলাতে সামলাতে নিজেই রুগী হয়ে যেতো! ”
“ আপনি খুব খারাপ! ভালো ছিলো আমাকে কেউ নিয়েই যেতো। ”
অনিলের থেকে এক টানে নিজেকে ছাড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাগুলো বললো হীরা। তারপর রাগে, দুঃখে রুম থেকে চলে যাওয়ায় সময় অনিল বললো,
“ যেখানে সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আমার নামে লিখে দিয়েছি সেখানে তোমাকে নেওয়ার সাধ্যি কার? তোমার সকল অধ্যায়ের অন্তিম পাতায় তোমার ডাক্তার সাহেবই থাকবে কিশোরী। ”
যেতে যেতেই কথাগুলো শুনে হাসি ফুটলো হীরার মুখে। তবে বললো না কিছুই।

ঘড়িতে তখন দুপুর ৩ টা,
বিয়ে বাড়ির সুদীর্ঘ নকশা করা গেটের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে কনে পক্ষ আর অপরপাশে ছেলেপক্ষ। মাঝখানে ফিতা টেনে দিয়েছে মেয়েরা, জামাইয়ের সামনে ট্রে তে করে দিয়ে রেখেছে বিভিন্ন রকমের সরবত। তবে সেগুলোর একটাও মুখে নিচ্ছে না জামাই। বিরক্তিতে রীতিমতো সবগুলোকে মারতে ইচ্ছে করছে আনিকার। এইবার সে রেগে মেগে জামাইয়ের উদ্দ্যেশ্যে বললো,
“ দেখুন দুলাভাই আমাদের কিন্তু এইবার বিরক্ত লাগছে আপনার বন্ধু কখন আসবে না আসবে এইটার সাথে আমাদের অপেক্ষা করানোর কোনো মানে….”

কথাটি সম্পূর্ণ করতে পারলো না আনিকা। এর আগেই সবার পিছন থেকে ভেসে আসলো এক পুরুষ কন্ঠ,
“ উত্তেজিত হবেন না, উত্তেজিত জনগন জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। ”
সকলের উৎসুক দৃষ্টি গিয়ে পড়লো কথকের উপর। বর পক্ষের সকলে এক সাইড হয়ে দাঁড়াতেই সেখান দিয়ে আগমন ঘটলো এক আগন্তুক এর। লম্বা চওড়া, সুঠাম দেহের অধিকারী, গায়ে বিভিন্ন কারুকাজ সম্পন্ন কালো পাঞ্জাবি, চোখে থাকা কালো সানগ্লাস টা হাতে নিতে নিতেই জামাইয়ের পাশটায় এসে দাঁড়ালো সেই সুদর্শন যুবক। হা হয়ে গেলো কনে পক্ষের সকলের মুখ। আনিকা তো বিস্ময়ে এতটাই অভিভূত হয়ে গেলো যে মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না তার। মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরছে শুধু একটাই বাক্য, “ মিস্টার উগান্ডা, এখানে! ”
“ হেই আ’ম সোহাইফ আহমেদ সাদিক। ”
কথাটি কর্ণপাত হতেই সম্বিৎ ফিরে পেলো আনিকা। দেখলো সাদিক অর্থাৎ মিস্টার উগান্ডা তার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে রেখেছে।

“ আ’ম আনিকা এহসান ইরা, অপেক্ষা করানো ব্যাক্তিদের সাথে কুশল বিনিময়ে ইচ্ছুক নই। ”
বলেই নিজের বাড়ানো হাত টা নিয়ে আসলো। তাতে সাথে থাকা সকল মেয়ে গুলো উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। তবে সামনে থাকা সাদিক এর উপর তার কোনো প্রভাবই লক্ষ্য করা গেলো না। সে শুধু নিঘোর দৃষ্টিতে আনিকার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলো। কিছুক্ষন পর রীতির হবু স্বামী রাফসান আনিকাদের উদ্দেশ্যে বললো,
“ তো শালিকাগণ আপনাদের দুলাভাই খুবই ক্লান্ত। এইবার আপনাদের চাহিদা বলুন ”
তার কথায় সব মেয়েগুলো একে অপরের দিক তাকিয়ে চোখ মেরে নিজেদের আগে থেকে মুখস্থ করা বাণী ছুড়লো,

“ যদিও দুলাভাইয়ের এক একটা ভাইদের চেহারা আঁকা বাঁকা,
তবে আমাদের দুলাভাই একেবারেই ঝাঁকানাকা.
তাই তার শালীদের চাহিদা মাত্র ৫০ হাজার টাকা! ”
বলেই সকল মেয়েরা হাসতে লাগলো। ভাবলো বেয়াইদের ভালোই হেনস্তা করা গেলো আর এর বিপরীতে কিছুই বলতে পারবে না তারা। তবে তাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে টেবিলের উপর হাত রেখে সবার সামনে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকার উপর কিছুটা ঝুঁকে সাদিক বাঁকা হেসে বললো,

“ ভাবীর বোনদের নাহয় নাই ধরি,
তবে ভাবী আমাদের একেবারেই পরি,
তাই তার দেবর হিসেবে আমরাও কিছু দান যাকাত করি! ”
হইহুল্লোড় করে উঠলো ছেলেরা। আর মেয়েরা একদম চুপসে গেলো। আনিকা তো তর্জনী তুলে বলেই ফেললো,
“ হে ইউ… ”
“ ইয়েস, আই অ্যাম। বাট আমি বেয়াদব দের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নই। ”
বলেই আনিকাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে তার পাশে থাকা ইতির এক হাতে হাজার টাকার কিছু নোট ধরিয়ে অপর হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে ফিতা কেটে দিলো সাদিক। অতঃপর হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো বর পক্ষ। যাওয়ার সময় সাদিক একবার তাকালো অগ্নিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকার দিক। কটমট করতে করতে রাগে দুঃখে বাড়িতে ঢুকে গেল আনিকা।

রীতির রুমে রীতির পাশে বসে আছে হীরা। সে বউ মানুষ বিদায় সেখানে গেটের কাছে যায়নি সে। এখানে রীতির সাথে কথা বলছিলো। এর মাঝেই ধুপধাপ পা ফেলে সেখানে উপস্থিত হলো আনিকা। রাগে কাঁপছে তার পুরো শরীর। তার এমন অবস্থা দেখে রীতি জিজ্ঞেস করলো,
“ কিরে কিছু হয়েছে? ”
“ কিছু হয়নি এখনো তবে আমার ভয়ানক কিছু ঘটাতে মন চাচ্ছে। ”
“ কেন? কী ঘটাতে মন চাচ্ছে তোর?”
“ মন চাচ্ছে তোমার জামাইয়ের ঐ উগান্ডার বন্ধু টাকে খু*ন করি। এতো বদমাইশ ছেলে দুনিয়াতে আমি একটাও দেখি নি। ”

“ টাকা দেয়নি বুঝি? ”
“ দিয়েছে ২০ হাজার তবে আমরা চেয়েছিলাম ৫০ হাজার।”
টাকা হাতে রুমে প্রবেশ করতে করতে বললো ইতি। তাকে দেখেই আরো রাগে ফুঁসে উঠলো আনিকা। বললো,
“ তোমাকে বলেছিলাম টাকা নিতে? ”
“ আমি কী করবো উনি তো হাতে দিয়েই চলে গেলেন কিছু বলতেও দিলেন না। ”
“ তুমি আমার সাথে কথা বলো না তো রাগ উঠছে আমার। ”
“ আজব আমি কী করলাম! ”
“ আরে ভাই থাম তোরা এইসব নিয়ে রাগারাগি করে কেউ? মানুষ শুনলে কী বলবে। ”
কিছু বলতে নিচ্ছিলো আনিকা তবে রীতির কথায় থেমে গেলো। আসলেই তো এসব নিয়ে অযথা রাগ করার কোনো মানে হয়! তার তো টাকার জন্য মোটেও রাগ হচ্ছে না রাগ হচ্ছে অপমান করায়। থাক সেও তো করেছে এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের রাগ কমালো আনিকা।

সন্ধার দিক মেয়ে বিদায়ের পালা, কান্নাকাটি চলছে পুরো বাড়ি জুড়ে। রীতির মা নাজিয়া বেগমের কাছ থেকে অনেক কষ্টেই রীতিকে ছাড়িয়ে এনে গাড়ির দিকে নিয়ে আসলো সবাই। তারপর এক পর্যায়ে গাড়িতে উঠানো হলো তাকে। রীতিকে গাড়িতে তুলে মাত্রই ঘুরতে নিচ্ছিলো আনিকা তৎক্ষনাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো কেউ। মাথা তোলে তাকিয়ে দেখলো সাদিক। অমনিই রাগী স্বরে বললো,
“ কী চাই? ”
“ আপনার ভাইয়ার নাম অনিল এহসান আর ভাবীর নাম হাফসা নূর হীরা, রাইট? ”
“ হুম কেন? ”
“ ধন্যবাদ ”
বলেই আনিকাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো সাদিক। আনিকা শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে ইচ্ছেমতো গালাগালি করলো সাদিক কে।

ঘড়িতে তখন রাত বারোটা, অনিলের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামতেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে সকলে ঢুকলো বাড়ির ভিতর। এমন তাড়াহুড়া করে ঐ বাড়ি থেকে এসে সকলের অবস্থাই নাজেহাল। কেউই আজকে আসতে চান নি আর নাতো সাহেরা বেগম তাদেরকে আসতে দিতে চেয়েছিলেন তবে অনিলের এক কথা- সে আজকেই বাড়ি ফিরবে। আর তার দৃঢ় সংকল্পনার জন্যই সকলকে আজকেই আসতে হয়েছে।
রুমে এসেই ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো হীরা। তার সাথেই অনিল এসে সরাসরি ফ্রেশ হতে চলে গেছে। যা দেখে হীরা রীতিমতো অবাক হয়েই রইলো। এতো স্ট্রং থাকেন কী করে উনি? এসে একটু বিশ্রামও নেওয়ার প্রয়োজন বোধও করলেন না? এতো স্ট্রং মানুষ হয়তো এর আগে সে কখনোই দেখে নি। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো অনিল। সে আসতেই হীরা হাত- মুখ ধোয়ার উদ্দেশ্যে ওয়াশরুম এ গেলো।

হাত মুখ ধোয়ে হীরা ক্লান্ত শরীর টা নিয়ে মাত্র বিছানায় শুতে যাচ্ছিলো। এর মাঝেই কানে আসলো অনিলের কড়া আদেশ,
“ পড়তে বসো। দুদিন পর টেস্ট অথচ তোমার কোনো খবর নেই দেখছি! ”
“ আজকে পড়তে ভালো লাগছে না। আগামীকাল থেকে পড়বো। ”
কাতর স্বর হীরার। তবে অনিল গললো না বিন্দুমাত্রও। বললো,
“ গত কিছুদিন একটুও পড়া হয়নি তোমার কথা না বাড়িয়ে পড়তে বসো। ”
তার কথায় আর কিছুই বলতে পারলো না হীরা। ঘুম ঘুম চোখ নিয়েই এগিয়ে গেলো পড়ার টেবিলের সামনে। তারপর ঘন্টাখানেক ধরে পদার্থিজ্ঞানের বেশ কিছু অঙ্ক করলো। অঙ্ক করা শেষ করে ল্যাপটপ এ দৃষ্টিরত অনিলের উদ্দেশে বললো,

“ এইবার ঘুমিয়ে পড়ি? ”
“ আমি যতক্ষন কাজ করি ততক্ষন পড়বে তুমি। ”
সোজাসাপ্টা জবাব অনিলের। মুখটা চুপসে গেলো হীরার। বললো,
“ আজকের জন্য ছেড়ে দিন না প্লিজ। জার্নি করে ভালো লাগছে না পড়তে। ”
ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এইবার হীরার উপর দৃষ্টিপাত করলো অনিল। তার দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরে মনে মনে খুশি হলো হীরা। ভাবলো অনিল হয়তো আজকের জন্য ছেড়ে দিবে তাকে। তবে তাকে হতাশ করে দিয়ে অনিল বললো,
“ ওকে যেকোনো একটা চ্যাপ্টার রিভাইস করে আমার কাছে পড়া দিতে পারলে ঘুমিয়ে যেও। ”
বলেই আবারও নিজের কাজে মনোযোগ দিলো সে। একটি বার ও তাকালো না হীরার অসহায় মুখপানে। তার কাণ্ডে মনের সকল অসহায়ত্ব নিয়েই জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে ছোটো অধ্যায় টা পড়তে লাগলো হীরা। আগে থেকেই পড়া ছিলো তাই আর তেমন সময়ও লাগে নি তার। কিছুক্ষনের মধ্যেই চতুর্দশ অধ্যায় টা রিভাইস করে ফেললো সে।

পড়া শেষ হতেই অনিলের কাছে এগিয়ে গেলো হীরা। তার হাতে বইটা দিয়ে বললো,
“ নিন প্রশ্ন করুন। ”
বইটা হাতে নিলো অনিল। হেলান দিয়ে বসলো খাটের সাথে। তারপর কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে হীরার দিক ভ্রু কুঁচকে তাকালো সে। তার এমন চাহনির অর্থ খুঁজে পেলো না হীরা। সে তো নার্ভাস ফিল করছে। এতক্ষন সবকিছু পাড়বে বলে মনে হলেও এখন কেমন যেন সব গুলিয়ে ফেলছে। তার ভাবনার মাঝেই অনিল প্রথম প্রশ্নটা করলো,

“ GMO- এর পূর্ণরূপ কী? ”
“ Genetically modified organism ”
প্রথম প্রশ্নের উত্তর ভালো ভাবেই দিতে পারলো হীরা। পরপর কানে এলো দ্বিতীয় প্রশ্নটি,
“ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কাকে বলে? ”
ভাবনায় পরে গেলো হীরা। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে তার। আমতা আমতা করে বললো,
“ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো…..”
পরের লাইনগুলো আর মনে করতে পারছে না সে। ঘুম ঘুম চোখে কী পড়েছে না পড়েছে সব মাথার বাইরে চলে গেছে তার। সে ভয়ে ভয়ে বললো,
“ অন্য একটা করুন। এটা মনে পড়ছে না। ”

তার কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো অনিল। তবে প্রশ্ন করতে ভুললো না। এইবারও হীরা প্রশ্নের সঠিক উত্তর করতে সক্ষম হলো না। বেশ রাগ হলো অনিলের। পড়তে বসে বইয়ের মধ্যে হাবিজাবি লিখলে পড়া মনে থাকবে কী করে! আর সে কিনা এই মেয়েকে নিয়েই ভালো কিছু আশা করছে? মেয়েটা আজকাল পড়া শুনায় বেশ ফাঁকিবাজি করছে। ওঁকে এইবার একটা শাস্তি দিতে হবে নয়তো এসব অবুঝপনামি করে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করবে। সে গমগমে স্বরে বললো,

“ তুমি এখন গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গুসল করে আসবে। ”
আঁতকে উঠলো হীরা। তৎক্ষনাৎ অসহায় মুখ করে বললো,
“ এতো রাতে ওমন ঠান্ডা পানিতে গুসল করলে মরে যাবো আমি। ঘুম নিয়ে পড়েছি বলে ভূলে গেছি সব। অন্য শাস্তি দিন প্লিজ। ”
“ ঘুমের মধ্যে হাবিজাবি লিখা তো ভূলো নি। কথা না বাড়িয়ে যা বলছি তা করো। গো ফাস্ট। ”
শেষের কথাটা বেশ জোরেই বললো অনিল। তার এমন কঠোর কণ্ঠে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। মনে পড়লো পড়ার মধ্যেই সে বইয়ের মাঝে অনিলের ও তার নাম লিখেছিলো। সেতো ভূলেই বসে ছিলো এসবের কথা। আর আগে থেকেই পড়তে বসলে তার বইয়ের মধে হাবিজাবি লিখে অভ্যাস। কখনো ফুল, কখনো নিজের নাম কলম হাতে থাকলে যা পারে তাই লিখে সে। এতে তার দোষ কী? কাঁদো কাঁদো মুখে সে কিছু বলতে নিবে এর আগেই অনিল আবারও ধমকে উঠলো,
“ কিছু বলেছি আমি! ”
একদম চুপ হয়ে গেলো হীরা। পানিতে টলমল করা আঁখি যুগল নিয়েই বাধ্য মেয়ের মতো একটা জামা হাতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।

ছাদের এক পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিক ও তার বন্ধুগন। কারো মুখে কোনো কথা নেই সকলেই চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে আশিক ( রীতির স্বামী) বলে উঠলো,
“ তুই যেটা ভাবছিস সেটা নাও হতে পারে সাদিক। ভালো করে জেনে শুনে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবিস। ”
তার কথায় মেঝেতে নিবদ্ধ দৃষ্টি তার উপর নিক্ষেপ করলো সাদিক। বললো,
“ আমি শিউর ওঁ আমার থেকে প্রতিশোধ নিতেই এসব করেছে আর আমি ঠিক একই কাজ করবো ওঁর সাথে। ”
“ সামান্য কিছু ঝগড়া থেকে ওঁ এমন করবে বলে মনে হচ্ছে না আমার। ”
“ মনে তো আমারও হচ্ছিলো না। কলেজের সামান্য কিছু ঝামেলার কারণে ওঁ আমার কলিজায় হাত দিবে। ”
“ তাও ব্যাপারটা নিয়ে শিউর হয়ে তারপর পরবর্তী পদক্ষেপ নিস। ”
“ ওকে তুই রুমে যা রীতি অপেক্ষা করছে। ”
“ আচ্ছা তুই ও গিয়ে ঘুমিয়ে পর এসব নিয়ে আর চিন্তা করিস না। ”
বলেই আশিক নিজের রুমের দিক হাঁটা ধরলো। নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর ঝামেলার কথা শুনে নিজের সদ্য বিবাহিত বউকে রেখে সে চলে এসেছে বন্ধুর নিকট। বন্ধুর থেকে সব ঘটনা শুনে এখন তার নিজেরই চিন্তা হচ্ছে। কে জানে সামনে কী হতে চলেছে। হঠাৎ করে নেওয়া সিদ্ধান্তে পরে না আবার কারো ক্ষতি হয়ে যায়।

দীর্ঘক্ষণ ধরে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো হীরা। অনিলের সাথে জেদ দেখিয়েই এতক্ষন ইচ্ছেমতো পানি ঢেলেছে সে। তবে নিজের জেদের প্রভাব এখন নিজের উপরই পরছে। ঠান্ডায় গোলাপি ঠোঁট জোড়া তিরতির করে অনবরত কেঁপে যাচ্ছে। মৃদু কাঁপা শরীরটা নিয়েই লাইট এর সুইচ এর দিক গেলো সে। গিয়েই ঠাস করে তা নিভিয়ে দিলো। অনিল যে এখনো কাজ করছে এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। জেদের বশে যা মন চাচ্ছে তাই করছে। অনিল সবকিছুই লক্ষ্য করছিলো এতক্ষন তবে কিছুই বলে নি। যখনি হীরা তার পাশে থাকা বালিশটা নিয়ে সোফার দিক হাঁটা ধরলো তখনি তার হাতটা খপ করে ধরে ফেললো সে। ভীষন রাগ হলো হীরার। নিজের রাগটাকে ভিতরে চাপিয়ে রেখে সে স্বাভাবিক ভাবেই বললো,

“ হাত ছারুন আমার। ”
বলেই হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে সে। তাতে অনিল হাত তো ছাড়লোই না উল্টো কোলে তুলে নিলো হীরাকে। চেঁচিয়ে উঠলো হীরা,
“ কী করছেন! নিচে নামান আমায়। ”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো অনিল। শেষমেষ কিনা এই কিশোরী তাকে ধমক দিয়ে কথা বলছে! ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। তারপর হীরাকে বিছানায় এনে কোল থেকে নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
“ চুপচাপ এখানে ঘুমাও। এখান থেকে এক পা নড়লে পা কেটে হাতে ধরিয়ে দিবো। ”
অনিলের এমন গম্ভীর স্বরে চোখ জোড়া ভিজে উঠলো হীরার। হঠাৎ অনিলের এমন কঠোর আচরন সহ্য করতে পারলো না সে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরলো অবাধ্য অশ্রুকণারা। তৎক্ষনাৎ তা আড়াল করতে ওপাশ হয়ে শুয়ে পড়লো সে। কান্না আর ঠান্ডা লাগার দরুণ থরথর করে কাঁপছে তার ছোট্ট দেহটা। অনিল ল্যাপটপ টা যাওগা মতো রেখে নিজেও শুয়ে পড়লো হীরার পাশে। অপর পাশে থাকা হীরার কাঁপুনি স্পষ্ট টের পেলো সে। কিয়ৎক্ষণ বাদে সহসা হীরাকে টান দিয়ে নিজের দিক ঘুরালো অনিল। ছটফটিয়ে উঠলো হীরা, ক্রন্দরত অবস্থাতেই অনিলের বুকে ধাক্কা মেরে বললো,

“ ছুঁবেন না আমার। ছাড়ুন বলছি নির্দয় লোক। আপনি আমার সা….”
আর বলতে পারলো না সে। তার আগেই তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো অনিল। ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“ চুপচাপ ঘুমাও কিশোরী নয়তো তোমার বুঝদার পুরুষ কিন্তু তোমার সর্বনাশ করে ফেলবে। ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২১+২২

স্তব্ধ হয়ে গেলো মেয়েটা। এতক্ষনের সব ছটফটানি নিমিষেই গায়েব হয়ে গেলো তার। অনিলের এতটা সান্নিধ্যে হাত-পা, মুখ সবকিছুই অনড় হয়ে গেছে তার। হৃদস্পন্দন চলছে অস্বাভাবিক ভাবে। নিজের ঠান্ডা হাতটা দিয়ে খামছে ধরলো অনিলের পিঠের শার্ট। এতক্ষনের শীতল শরীরটা উষ্ণ হয়ে উঠলো এর মাঝেই । হীরাকে এমন শান্ত হয়ে
যেতে দেখে সূক্ষ্ম হাসলো অনিল। তারপর পারি জমালো ঘুমের দেশে। হীরার শরীর থেকে কেমন একটা নারীসুলভ মোহনীয় সুঘ্রাণ এসে ভীড় করলো নাকে। নেশা ধরে গেলো তার, চোখের পাতা বুঁজে এলো মুহূর্তেই। লজ্জা, ভালোলাগা, অসস্তি সব কিছু মিলিয়ে এক পর্যায়ে হীরাও ঘুমিয়ে পরলো। এভাবেই কেটে গেলো একটা মিষ্টিময় রজনী

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৫+২৬