Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৫+২৬

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৫+২৬

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৫+২৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

চারিদিকে আযানের ধ্বনি কর্ণকুহর হতেই ঘুম ভাঙলো হীরার। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালে নিজেকে আবিষ্কার করলো অনিলের লোমশ যুক্ত ফরসা বুকে। বিস্ময়ে তড়িঘড়ি করে সরে যেতে নিলে বুঝতে পারলো অনিল তাকে নিজের উষ্ণ বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। মুখ তোলে অনিলের দিক তাকালো সে। মনে হলো গতকাল রাতের কথা প্রথমে বেশ রাগ হলেও অনিলের শেষের কাণ্ডের কথা মনে পড়লেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো মেয়েটা। তবে তা টিকলো না বেশিক্ষণ হঠাৎই মাথায় ভীড় করলো দুষ্টু বুদ্ধিরা।

মিটিমিটি হেসে নিজের হাত টা এগিয়ে নিলো অনিলের মসৃণ কপোল দ্বয়ের মাঝে বিদ্যমান খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির দিকে। হালকা করে টেনে দিলো তা। ঘুমের মাঝেই কপালে অসংখ্য ভাঁজ পরলো অনিলের। তবে ঘুম ভাঙলো না। বেশ মজা পেলো হীরা, হেসে আবারও টান দিলো, এইবার অনিল তাকে সহ ফিরে অপর পাশে ঘুরে শুয়। যার দরুণ অনিলের সুঠাম দেহের নিচে চাপা পড়ে যায় তার ছোট্ট শরীরটা। ভরকে গেলো মেয়েটা, ভয়ে অন্তরাত্মার পানি সব শুকিয়ে গেলো। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে অনিলকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ ডাক্তার সাহেব? ”
“ ………. ”
“ ডাক্তার সাহেব? ”
আবারও ধাক্কা দিয়ে অসহায় স্বরে ডেকে উঠলো হীরা। এইবার অনিলের ঘুম কিছুটা হালকা হলো। তবে চোখ না মেলেই সে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললো,
“ এখন চিকিৎসা দিতে পারবো না। ”
তার এমন ভয়েসে ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো হীরার পুরো শরীর। আর কিছু বলার শক্তি পাচ্ছে না সে। শরীর কাঁপছে অস্বাভাবিক ভাবে। নিজের কাণ্ডে নিজেরই এখন হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁদতে মন চাইছে তার। কাঁদো কাঁদো মুখে আবারও বলে উঠলো,

“ ডাক্তার সাহেব সরুন না, আমি মরে যাবো তো! ”
হীরার এমন নড়চড় আর বকবকানি তে ঘুম চটে গেলো অনিলের। চোখ খুলে তাকালো সে। হীরাকে নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে গেলো তার। বললো,
“ এখানে কী করছো? ”
“ আপনিই তো আমায় এভাবে চাপা দিয়ে রেখেছেন। ”
সাথে সাথেই হীরার উপর থেকে সরে গেলো অনিল। সে সরতেই যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো হীরা। কোনোমতে বিছানা থেকে উঠে দৌঁড়ে পালালো সে। মনে মনে পণ করলো আর জীবনেও ওঁনার সাথে দুষ্টুমি করতে যাবেনা। সে যেতেই অনিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও ঘুমে মনোযোগ দিলো।

“ কিরে কোথায় যাচ্ছিস? ”
ব্যাস্ত পায়ে নিচে নামতে নামতে আনিকা মায়ের প্রশ্নের উত্তরে বললো,
“ তাপসি দের বাসায় যাচ্ছি। তোমায় না সকালে বললাম কলেজে এতদিন যা পড়িয়েছে সবগুলো আনতে যাবো ওঁদের বাসায়। ”
“ ওহ আচ্ছা যা, জলদি ফিরে আসিস নয়তো অনিল রেগে যাবে। ”
“ আচ্ছা আম্মু। ”
যেতে নিয়েও থেমে গেলো সে। মায়ের পাশে বসে থাকা হীরার উদ্দেশ্যে বললো,

“ হীরা তুমিও চলো। একা একা কী করবে বাসায়? ”
“ নাহ আপু তুমি যাও। ”
“ আরে চলো কিছু হবে না। তাপসিও তোমার মতোই সবার সাথে মিশে। ”
“ নাহ আপু তুমি যাও। আমি এখানেই থাকি। ”
“ আচ্ছা। ”
আর জোর করলো না আনিকা। চলে গেলো বান্ধুবীর বাসার উদ্দেশ্যে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা হেঁটে হেঁটেই চলে যাবে সে। তাদের মধ্যে হীরা গিয়ে কী করবে? দুই বান্ধুবী পড়াশুনা নিয়ে কথা বলবে অথবা তাদের মধ্যে কতো পার্সোনাল কথাই থাকতে পারে। সেটা ভেবেই হীরা যেতে অমত করেছে। আনিকা যেতেই সে নিজ রুমের দিক হাঁটা ধরলো। তাকে চলে যেতে দেখে নাজিয়া বেগম বললেন,

“ কীরে কোথায় যাচ্ছিস? রুমে গিয়ে কী করবি এখন? ”
“ পড়তে বসবো আম্মু। আপনার ছেলে এসে যদি দেখে আমি এখানে বসে ফোন দেখছি তাহলে কালবৈশাখী ঝড় যাবে আমার উপর দিয়ে। ”
তার কথায় হেসে ফেললো নাজিয়া বেগম। হেসে হেসেই বললেন,
“ আচ্ছা যা। ”

টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করছে হীরা। এর মাঝেই ঘরে প্রবেশ করলো অনিল। জুমার নামাজ পড়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলে এতক্ষনে বাড়ি ফিরেছে সে। রুমে এসে হীরাকে পড়তে দেখে সন্তুষ্ট হলো সে। আয়নার সামনে গিয়ে মাথার টুপি টা রেখে নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিলো সে। অতঃপর হীরার উদ্দেশ্যে বললো,
“ ঘুরতে বেরোবে? ”
তার কথায় চকিত চাইলো হীরা। বেশ সময় ধরেই পড়ছে সে। এখন আর পড়তে ভালো লাগছে না তার। আবার ঘরে আনিকা ও নেই বিদায় কোনোকিছুই ভালো লাগছে না। ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে খুশিতে নেচে উঠল তার মন। ফটাফট উত্তর করলো,
“ হুম নিয়ে চলুন না। ভালো লাগছে না ঘরে একা একা। ”
“ রেডি হও। ”
সাথে সাথেই পড়ার টেবিল থেকে উঠে রেডি হতে চলে গেলো সে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা লং টপস এর উপর হিজাব পরে তৈরি হয়ে নিলো হীরা। তৈরি হওয়া শেষ হতেই নিচে অপেক্ষারত অনিলের গাড়ির উদ্দেশ্যে দ্রুত পায়ে রওনা হলো সে। যাওয়ার সময় শাশুড়ি মাকে বলে যেতে ভুললো না।

দুই বান্ধবী বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। অলরেডি তাপসির থেকে নিজের খাতায় সব নোট করে নিয়েছে আনিকা। এখন দুজনের বকবক করার পালা। সহসা নীরবতা ভেঙে তাপসি বললো,
“ তো বিয়েতে কেমন মজা করলি? ”
“ প্রথমে ভালোই এনজয় করেছি তবে শেষে একটা বজ্জাত লোক এসে সব ভেস্তে দিলো। ”
আনিকার কথায় তাপসি কপাল কুঁচকে বললো,
“ কে আবার তোর সব মজা ভেস্তে দিলো। ”
“ আরে তোকে বলেছিলাম না ঐদিন ঐ রাস্তায় দেখা হওয়া এক উগান্ডা লোকের কথা, ঐ লোক আশিক ভাইয়ার বন্ধু। ”

“ তো? ”
“ তো আর কী ঐ উগান্ডা লোকের জন্যই আমি আশিক ভাইয়াকে হাত ধুয়াতে অব্দি যায়নি। ”
“ কেন কী করেছে তোর ঐ উগান্ডা লোক? ”
একে একে সব ঘটনা পাই টু পাই তাপসিকে বললো আনিকা। ভাবলো তার বান্ধবী হয়তো তার কষ্টে একটু কষ্টিত হবে। তবে সে হয়তো ভূলে বসেছিলো বান্ধবীরা কষ্টিত হওয়ার মতো পাবলিক নয়। কষ্টিত হওয়া তো দূরে থাক তার কথা শেষ হতেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো তাপসি। হাসতে হাসতে কাহিল অবস্থা মেয়েটার। সে পেটে হাত চেপে বললো,

“ সামান্য এই একটা বিষয় নিয়ে তুই দুলাভাই এর হাত অব্দি ধোয়ে দিসনি! ”
গা জ্বলে উঠলো আনিকার। সে কটমট করতে করতে বললো,
“ এই ফাজিল মাইয়া, এটা তোর কাছে সামান্য মনে হলো! আমাকে কতবড় অপমান করেছে ঐ লোক। আর তুই বলছিস সামান্য! ”
“ তবে যাই বলিস লোকটাকে আমার খুবই ডেঞ্জারাস মনে হচ্ছে। আর তোদের কেমিস্ট্রি গুলোও সেই লাগছে। ”
হাসি থামিয়ে একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো তাপসি। পরপর আবারও বললো,

“ ছেলেটা দেখতে কেমন রে? ”
“ জানিনা আমি। ওভাবে খেয়াল করিনি। ”
বিরক্তি নিয়ে উত্তর করলো আনিকা। তাপসি আরো জিজ্ঞেস করলো,
“ নাম কী জানিস? ”
“ এই তোর মতিগতি কীরে! এতো কিছু জিজ্ঞেস করছিস কেন? ”
“ আরে আজাইরা বকিস নাতো, এমনেই জিজ্ঞেস করলাম নাম কী? ”
“ কী যেনো বলেছিলো সাদিক না সিদ্দিক মনে নেই আমার। ”
“ ওহ। ”

রমনা পার্কে অনিলের হাত ধরে হাঁটছে হীরা। কিছুক্ষন আগেই তারা এখানে এসে পৌঁছেছে। হাঁটতে হাঁটতেই চারপাশ মুগ্ধ নয়নে দেখছে হীরা। জায়গাটা বেশ পছন্দ হয়েছে তার। চারদিকে অনেক মানুষ কেউ একা একা হাঁটছে আবার কেউ তার প্রিয় মানুষটার হাত ধরে হাঁটছে। অনিলের ধরে রাখা হাতটার দিক দৃষ্টি ফেললো হীরা। অনিলের বড়ো বড়ো আঙুলের ভাঁজে তার ছোটো ছোটো আঙ্গুলগুলো দেখাই যাচ্ছে না। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই হাতের বাঁধনের দিক তাকিয়ে থেকে হীরা আনমনে নীরবতা ভেঙে বলে উঠলো,

“ পৃথবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি কী জানেন? ”
তার কথায় তার দিকে ঘুরে তাকালো অনিল। প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
“ তোমার টা জানিনা। বলো কী? ”
“ বিয়ের আগে একটা মেয়ের কাছে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হলো যখন হাঁটার সময় তার বাবা তার হাত ধরে রাখে। ”
“ আর বিয়ের পর? ”
“ যখন তার স্বামী তার হাত ধরে রাখে! ”
“ Can you feel this? ”
“ Yes I can feel this deeply! ”
খানিকটা হাসলো অনিল। তারপর সামনে এগোতে এগোতেই বললো,
“ বড্ডো বেশিই পেঁকে গেছো দেখছি। ”
“ পাশে থাকা বুঝদার পুরুষের সাইড ইফেক্টের প্রভাবে। ”
বলেই হাসতে লাগলো হীরা। অনিল প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকালেও পরে হীরার হাসি দেখে সেও হেসে ফেললো।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালো অনিল। হীরাকে নামতে না দেখে চোখ ঘুরিয়ে হীরার দিক অনিল। দেখলো মেয়েটা কেমন যেনো করছে চোখে, মুখে ব্যাথাতুর ছাপ স্পষ্ট। সে তৎক্ষনাৎ হীরার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কী হয়েছে? ”
“ পা জ্বলছে অনেক। ”
“ হাটতে পারবে? ”
যদিও হীরার মনে হচ্ছে না সে হাটতে পারবে তবুও বললো,
“ পারবো। ”
বলেই গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে পা জোড়া মাটিতে ফেলতেই ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচিয়ে নিলো সে। সাথে সাথেই উপলব্ধি করতে পারলো সে হাওয়ায় ভাসছে। চকমে তাকালো সে, নিজেকে অনিলের কোলে আবিষ্কার করে তড়িঘড়ি করে বললো,

“ আরে আরে কী করছেন? নামান আমায় আনিকা আপুকে ডেকে দিন আপু এসে নিয়ে যাবে আমায়। ”
তার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই অনিলের। সে নিজের মতো হাঁটছে। লজ্জায় সিটিয়ে যাচ্ছে হীরা। বাড়ির লোক দেখলে কী ভাববে? সে আবারও অসহায় কণ্ঠে বললো,
“ প্লিজ নামিয়ে দিন আমায়। আম্মু, আপু দেখলে কী ভাববে?”
“ একদম চুপ হয়ে থাকো। ”
অনিলের গম্ভীর স্বরে দমে গেলো হীরা। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেললো অনিলের বুকে। একদম ড্রয়িং রুমের সোফায় এসে তাকে সেখানে বসালো অনিল। কেউই সেখানে উপস্থিত নেই দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো হীরা। তবে পরক্ষনেই অনিলকে পায়ে হাত দিতে দেখে আবারও চেঁচিয়ে উঠলো,
“ আরে আরে কী করছেন? ”

“ আরে আরে কী করছেন? ”
বিরক্ত হলো অনিল। কপাল কুঁচকে বললো,
“ সমস্যা কী? ”
“ কিছুনা। ”

অনিলের ওমন ধমকের স্বরে বাধ্য মেয়ের মতো উত্তর করলো হীরা। তারপর আর কিছু বললো না চুপচাপ অনিলের কর্মকাণ্ড দেখতে থাকলো। হীরার পা থেকে ধীরে ধীরে জুতো জোড়া খুললো অনিল। জুতোর আবরণ ছাড়াতেই হীরার মসৃণ পা জোড়া দৃশ্যমান হলো। এতক্ষনের ঘাম আর ধুলায় ফর্সা পায়ের পাতায় রক্তবর্ণের জখম হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা ঠোসা পরে চামড়া উঠে গেছে কিছু জায়গায়। তুলো নিয়ে পানিতে ভিজিয়ে প্রথমে তার পা জোড়া মুছতে লাগলো অনিল। পানির ছুঁয়া লাগতেই কাটা গায়ে লবণের ছিটা লাগার মতো জ্বলে উঠলো হীরার পাটা। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো মেয়েটা। তা নিবারনের জন্য নিচে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা অনিলের কাঁধে অজান্তেই খামচে ধরলো মেয়েটা।

অনিলের সেসবে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সে আস্তে আস্তে হীরার পা মুছে দিয়ে সেখানে মলম লাগাতে ব্যাস্ত। যেনো এটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঠান্ডা মলম মালিশ করতেই জ্বালা কমলো হীরার। কিছুটা নিস্তার পেলো এতক্ষনের জ্বালা থেকে। অনিলের কাজ হতেই সে ফার্স্ট এইড বক্স যথাস্থানে রেখে আবারও হীরার নিকট এগিয়ে এলো। হীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে আবারও কোলে তুলে নিলো অনিল। হঠাৎ করে এসে এভাবে কোলে নেওয়ায় কিছুটা ভরকে গেলো মেয়েটা। তবে মুখ দিয়ে টু শব্দ করলো না। কারণ সে যত যাই বলুক না কেন অনিল তার কথা শুনবে না, উল্টো তাকে একটা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখবে। রুমে এসে হীরাকে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিলো অনিল। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছিলো আনিকা। সে ঘুম ভাঙলো মোবাইলের নোটিফিকেশন এর শব্দে। এক নাগাড়ে নোটিফিকেশন আসতেই আছে থামার নাম নেই। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো। তাদের ক্লাস গ্রুপ এ মেসেজ করছে ছেলেমেয়েরা। মেসেজের মূল টপিক হলো একজন শিক্ষক। আগামীকাল নাকি তাদের কলেজে নতুন শিক্ষক যোগদান করবে সেই শিক্ষক কে নিয়েই কথা বলছে সবাই। ভীষন রাগ হলো তার, মোবাইলটা মিউট করে রেখে দিতে নিচ্ছিলো তবে তখনই একটা লিখার উপর নজর আটকে গেলো তার। চোখ কচলে আবারও তাকালো লেখাতার দিক। নাহ আবারও চোখে সামনে ভেসে উঠলো একই লিখা,
“ সাদিক ”

একটা মেয়ে স্যার এর নাম জিজ্ঞেস করাতে অপর একটি মেয়ে রিপ্লাইয়ে এই নামটি লিখেছে। এটা ঐ সাদিক না তো? ধরফর করে উঠে বসলো আনিকা। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব মেসেজে পড়তে শুরু করলো। তবে কাঙ্ক্ষিত কোনো তথ্যই পেলো না সে। প্রথম থেকে শেষ অব্দি শুধু সব মেয়েরা স্যার এর প্রশংসাই করে যাচ্ছে। তারা নাকি কলেজের বাকি শিক্ষক দের থেকে শুনেছে, “ লাখে একজন শিক্ষক নাকি আসতে যাচ্ছে রবিবারে যেমন মেধাবী তেমন সুদর্শন। আবার সে নাকি এই কলেজেই পড়াশোনা করেছে ২০১৮ সালে এইচএসসি দিয়েছে। ”
সালটা দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো আনিকার। মনে করতে চাইলো তাই ভাই ও তো মনে হয় ২০১৭ সালেই এইচএসসি দিয়েছে। তাহলে কী তারা দুজনে ক্লাসমেট ছিলো? তথ্য অনুযায়ী তো তাই বুঝা যাচ্ছে। “ধ্যাৎ, সে কেন এতকিছু ভাবছে? ঐ লোক যেই হোক না কেন তার এতো ভেবে লাভ কী! ঐ উগান্ডা লোক কখনো শিক্ষক হতে পারবে না এইটুকু সে নিশ্চিত। ” ভেবেই আবারও শুয়ে পড়লো সে। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো সাদিকের ব্যাপার।

বিছানায় এক গাদা হ্যায়ার ক্লিপ নিয়ে বসে আছে হীরা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে এক একটা ক্লিপের ডিজাইন। পার্কের অদূরে একটা দুকানে কাঠগোলাপ এর ক্লিপ দেখে হীরা বলেছিলো একটা ক্লিপ কিনে দিতে। দোকানে গিয়ে অনিল তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো কোনটা নিতে চায়। সে বলেছিল, “একটা নিলেই হলো সবগুলাই সুন্দর” আর এটাই হয়েছিলো তার সবচেয়ে বড়ো ভূল। সে কথাটা সরল মনে বললেও অনিল সেটাকে এতটাই প্রাধান্য দিলো যে, পুরো দোকানে ঝুলানো যতগুলো কাঠগোলাপের ক্লিপ ছিলো সব গুলোই সে নিয়ে নিলো। তার কাণ্ডে অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে গিয়েছিলো হীরা অনিলকে নিষেধ করলেও সে আর তার কথা শুনলো না। হীরা তখনই মনে মনে পন করলো সে আর কোনোদিন অনিলের কাছে কিছু চাইবেই না। সে ক্লিপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার মাঝেই খাবার হাতে রুমে ঢুকলো অনিল। তাকে দেখেই ক্লিপগুলো এক সাইডে গুছিয়ে রেখে দিলো হীরা। অনিল এসে তার পাশে বসলো। হীরা চোখ মেলে শুধু অনিলের কান্ড দেখছিলো তবে অনিলের পরবর্তী পদক্ষেপে চোখ বড়ো বড়ো করে তার দিকে তাকালো সে। অনিলকে নিজের হাতে ভাত মাখাতে দেখে সে অবাক হয়ে বললো,

“ আপনি ভাত মাখছেন কার জন্য? ”
অনিল অকপটে উত্তর করলো,
“ তোমার জন্য। ”
“ কিহ! ”
“ তোমাকে ইনজেকশন দিয়ে সোজা করতে হবে বুঝেছি। আজকাল বড্ডো বেশিই চেঁচাও তুমি। ”
ধমে গেলো হীরা। মনে মনে বেশ রাগ হলো অনিলের উপর। সে যে কেন ঐদিন বলতে গিয়েছিলো সে ইনজেকশন এ ভয় পায়! এর পর থেকে এই লোক শুধু তাকে ইনজেকশন এর ভয় দেখায়। সে কিছু বললেই নাকি ইনজেকশন দিয়ে দিবে। এই পর্যন্ত কতবার এই ওয়ার্নিং দিয়েছে তাকে ভাবলেই বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো তার। সে মিনমিন করে বললো,

“ আমার তো পায়ে জখম হয়েছে হাত দিয়ে খেতে পারবো তো! ”
ঘাড় ঘুরিয়ে হীরার দিক কেমন দৃষ্টিতে যেন তাকালো অনিল। তার এমন চাহনিতে শুষ্ক ঢোক গিললো হীরা। দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো ভয়ে। এই লোক কে মাঝে মাঝে খুব ভয় লাগে তার। ঠিক আগে যেমনটা লাগতো। এর মাঝেই অনিল তার মুখের সামনে লোকমা ধরলো। হীরাও আর কিছু বললো না নিজের মাঝে জাগ্রত হওয়া সকল অসস্তিকে কে দমিয়ে রেখে হা করলো। অনিলের এক লোকমা তেই হীরার পুরো মুখ ঠেসে গেলো ভাত চিবাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে তাকে। মুখের আশেপাশেও ভাত লেগে আছে। তার অবস্থা দেখে অনিলের বেশ হাসি পেলো। হাত বাড়িয়ে হীরার ঠোঁটের আশেপাশে লেগে থাকা ভাত গুলো মুছে দিলো। ঠোঁটে অনিলের হাত লাগতেই কেঁপে উঠলো হীরা। কাঁশি উঠে গেলো তার।

সাথে সাথেই পানি এগিয়ে দিলো অনিল। ঢকঢক করে পানি খেলো মেয়েটা। এইটুকু তেই চোখ মুখ লাল হয়ে চোখের কোণে পানি জমে গেছে। অনিল শুধু পলকহীন দৃষ্টিতে হীরার কান্ড দেখলো। এরপর সে ছোটো করেই লোকমা দিতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে সকল অসস্তি ভাব কেঁটে গেলো হীরার। খাওয়ার মাঝেই মুগ্ধ নয়নে অনিলের দিক তাকিয়ে রইলো। অজান্তেই চোখ থেকে এক ফোঁটা জলবিন্দু গড়িয়ে পরলো। খাওয়ার মাঝে হীরাকে কাঁদতে দেখে অনিল ভ্রূ নাচিয়ে জানতে চাইলো, “ কী হয়েছে? ” জবাবে হীরা মুচকি হেসে দুদিক মাথা নাড়িয়ে বুঝালো “ কিছু না।” অনিল পরের লোকমা দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলো,

“ তাহলে কাঁদছো কেন? আমি খায়িয়ে দিচ্ছি বলে খারাপ লাগছে? ”
চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো হীরা। এইদিকে এই লোক তাকে খাইয়ে দিচ্ছে বলে খুশিতে তার চোখে পানি চলে আসছে আর উনি কিনা বলছে তার খারাপ লাগছে দেখে সে কান্না করছে! সে চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
“ আপনি না বুঝদার পুরুষ, আমার মতো অবুঝ কথা বলছেন কেন? ”
হীরার বলার ধরন দেখে না চাইতেও হেসে ফেললো অনিল। বললো,
“ তোমাকে বুঝা দায় নয় গো কিশোরী তবে তোমার অশ্রুকণা দের বুঝতে যে আমি সক্ষম হচ্ছি না একটু বুঝিয়ে বলবে আমায়? ”

“ নাহ আমি আপনাকে বুঝাতে পারবো না। কারণ কিশোরীদের লজ্জা অনেক বেশি। তবে এইটুকু বলতে পারি আমার খারাপ লাগছে না। ”
হীরার কথায় অনিল শেষ লোকমা টা হীরার মুখে পুরে দিয়ে বললো,
“ ওকে লজ্জাবতী ললনা,
তোমার বুঝানো লাগবেনা ”
বলেই বিছানা থেকে উঠে খালি প্লেট হাতে নিয়ে নিচে চলে গেলো সে। সে যেতেই হীরা ভাবনার মাঝে পরে গেলো-

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৩+২৪

“ তার ডাক্তার সাহেব কে সে বুঝতেই পারে না এখনি একদম শান্ত শিষ্ট থাকে আবার একটু পরেই সেই পুরনো গম্ভীর সত্ত্বায় ফিরে আসে। ” অবশ্য তার জন্যই রেগে যায়। ভেবেই হাসলো সে। তারপর অনিলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
“ আপনাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেদিন যদি আপনার কঠোরতার ভিতরে লুকিয়ে রাখা এই আসল সত্ত্বা টাকে উপলব্ধি করতে পারতাম তাহলে ঐ মুহূর্তেই আমার কিশোরী মণের সব অনুভূতি গুলো আপনার নামে লিখে দিতাম। ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৭+২৮