Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৭+২৮

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৭+২৮

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৭+২৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“ তোর স্বপ্ন কী? ”
“ আমার স্বপ্ন হইছে গিয়া- আমি একজন ডাক্তার হমু আর আমার জামাইও একজন ডাক্তার হইবো। আমরা দুজন মিলে একটা হাসপাতাল বানামু তারপর ঐ হানে আমরা দুজন মিলে গরীব মানুষগরে চিকিৎসা দেমু। ”
“ যদি তোর জামাই ডাক্তার না হয়? ”
“ তাহলে আমি বিয়াই বমু না। ”
বলেই খিলখিল করে হাসতে লাগলো হীরা। তার কথায় তার বান্ধবী আফসানাও হেসে উঠলো। বললো,
“ দোয়া করি তোর জামাই যেন এক খান বড়ো ডাক্তার হয়। ”
“ আমিন। ”

সহসা গাড়ির ব্রেক কষতেই অতীতের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসলো হীরা। চোখ বুলিয়ে দেখলো তারা স্কুলের সামনে এসে পড়েছে। সব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে গাড়ি থেকে নামতে শুর করলো সে। তার পাশেই আনিকা, সেও নেমে পরলো ওপাশ দিয়ে। আজকে অনিল তাদের নিয়ে এসেছে। বাড়ির ড্রাইভার কাকাকে নিয়ে আসিফ এহসান কাজের সূত্রে এক জায়গায় গিয়েছেন কিছুদিনের জন্য। তাই এ কদিন অনিলই তাদেরকে নিয়ে যাতায়াত করবে। হীরার টেস্ট চলছে বিদায় তার ও আনিকার এক সাথেই ছুটি হচ্ছে। যার দরুণ অনিলেরও তেমন সমস্যা হবে না। দুজনকে একসাথেই পৌঁছে দিতে পারবে।
গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের গেটের ভেতরে ঢুকতে নিচ্ছিলো হীরা। এর মাঝেই ভেসে আসলো অনিলের নরম স্বর,
“ ভালো করে মনোযোগ দিয়ে এক্সাম দিও। ”
পিছন ফিরে চাইলো হীরা। মুচকি হেসে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাতেই গাড়ি স্টার্ট করে নিজ গন্তব্যে চললো অনিল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ক্লাসে পা রাখতেই চাপা গুঞ্জন ভেসে আসলো সকলের। সবার দিক একবার আড় চোখে চেয়ে পা টিপে টিপে তাপসির নিকট এগিয়ে গেলো আনিকা। তাকে দেখতে পেয়েই খুশিতে গদগদ হয়ে করে উঠলো তাপসি যেনো এতক্ষন তারই অপেক্ষার প্রহর গুনেছে সে। আনিকা বান্ধবীর এমন রিয়েকশন দেখে অবাক না হয়ে পারলো না। কপাল কুঁচকে গেলো তার। বললো,
“ কীরে সবাই কী নিয়ে কথা বলছে? আর তোর মুখেই বা এতো খুশির বাতি জ্বলতাছে কেন? ”
অন্য সময় হলে আনিকার এমন ত্যাড়া কথায় এক চোট ঝগড়া পাকিয়ে দিতো মেয়েটা। তবে আজ তার কিছুই করলো না। উল্টো তাকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে তাপসি প্রবল উল্লাসে বলে উঠলো,

“ আনিকারে…. ”
বান্ধুবীর মুখে এমন সুরেলা ডাক শুনে থতমত খেয়ে গেলো মেয়েটা। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে গেলো তার। চোখ রাঙিয়ে বললো,
“ এই তুই বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো এমন সুরেলা ডাক দিচ্ছিস কেন? আমি কী তোর ভাতার লাগি যে এমন ডাক দিতাছিস।”
এইবার ও কোনো রিয়েকশন নেই তাপসির। সে আনিকার বাহুতে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

“ দোস্ত আমি তো নিউ স্যার এর উপর ক্রাশ খেয়ে ফেলছি রে। ”
তাপসির কথায় না চাইতেও নিজের মধ্যে কিছুটা কৌতূহল কাজ করল আনিকার। তবে তা প্রকাশ হতে না দিয়ে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখেই বললো,
“ কোথায় দেখলি? ”
“ স্যার যখন কলেজে ঢুকছিলো তখন দেখেছিলাম। শুধু আমি না সবাই দেখেছে। দোস্ত রে এত্তো সুন্দর স্যার আমি আমার জীবনেও দেখি নাই। ”
“ বইন থাম তুই এইবার। স্যার কোন ক্লাস নিবে ঐটা জানিস কিনা বল? ”
“ ফিজিক্স। ”
“ তাহলে তো আজকে প্রথম ক্লাস টাই ঐ স্যার এর। ”
সম্বিৎ ফিরলো তাপসির। তৎক্ষনাৎ আনিকার বাহু থেকে মাথা তুলে ঠিকঠাক হয়ে বসলো। তার কাণ্ডে বেশ মজা পেলো আনিকা। বললো,

“ বাহ, বান্ধবী আমার পুরাই ডিপজলের মতো দেওয়ানা হয়ে গেছে। স্যার আসলে একটা ডায়ালগ দিছ তো। লাইক – দিল তো পাগাল হে…. ”
বলেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সে। তবে তা টিকলো না বেশিক্ষণ। দরজা দিয়ে কালো স্যুট এর সাথে ইন করে সাদা শার্ট পরিহিত নতুন শিক্ষক রূপে তার চির শত্রুকে দেখতেই মাথায় একটা বড়োসড়ো বজ্রপাত পরলো তার। বিস্ময়ে চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। অন্যদিকে স্যার ক্লাসে প্রবেশ করা সত্বেও আনিকাকে দাঁড়াতে না দেখে স্যার কে দেখা বাদ দিয়ে আনিকাকে টেনে টুনে দাঁড় করালো তাপসি। রেগে ক্ষীণ কণ্ঠে কিছু বলতে নিবে তার আগেই আনিকা মুখে হাত দিয়ে বলে উঠলো,

“ মি. উগান্ডা!!! ”
এতটাই জোরে বললো যে আশেপাশের কয়েকটা টেবিলের মেয়েও তার কথায় কপাল কুঁচকে তাকালো। প্রথমে অভ্যাস বসত কথাটা বলে ফেললেও পরে সবার দৃষ্টি দেখে থতমত খেয়ে গেলো মেয়েটা। সাদিক সবাইকে বসতে বলতেই চুপচাপ বসে পড়লো সেও। তবে তাপসিকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেভাবে ক্ষণিক পূর্বে তাপসি তাকে টেনে তুলেছিলো সেও ঠিক সেভাবেই তাপসিকে টেনে বসালো। তারপর চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখলো কেউ তাদের এই অদ্ভূত কান্ড কারখানা দেখছে কিনা। নাহ, কারোই এইদিকে খেয়াল নেই সবাই এক দৃষ্টিতে সাদিক এর দিক তাকিয়ে আছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাপসির দিক তাকালো সে। তাপসি এখনো অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আনিকার মুখের “মি. উগান্ডা ” শব্দটাই তার ধ্যান জ্ঞান সব কেড়ে নিয়েছে।

“ এটাই কী তোর ঐ উগান্ডা লোক? ”
কিয়ৎক্ষন চেয়ে থেকে হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়লো তাপসি। মুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো আনিকার। চুপসে যাওয়া মুখে উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো। সে সম্মতি দিতেই তাপসি চেঁচিয়ে উঠলো,
“ কিহহহ! ”
ক্লাসে সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ করছিলো সাদিক। মাঝখানের সারি থেকে এমন চিৎকার শুনে কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকালো সে। তাপসির দিক আঙুল তাক করে বললো,
“ Hey you! stand up ”
বুকটা ছলাৎ করে উঠলো আনিকার। ঢোক গিলে তাকালো সাদিকের দিক। দেখলো হাতের তর্জনীর দ্বারা তাপসিকে ইশারা করছে। এইদিকে কোনো কিছু না ভেবেই চিৎকার দিয়ে তাপসি নিজেই কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছে। নিজের দিক স্যার রূপে ক্রাশের তর্জনী দেখে ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালো সে। সে দাঁড়াতেই সাদিক বললো,

“ নাম কী? ”
“ তা..তাহরিমা খান তাপসি। ”
কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর করলো তাপসি।
“ আগামীকাল থেকে যেনো আপনাদের দুজনকে একসাথে বসতে না দেখি। ”
তাকে ও আনিকাকে ইশারা করে বললো সাদিক। তার কথায় বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো সে। তা দেখে তাকে বসতে বললো সাদিক। সাথে সাথেই বসে পড়লো মেয়েটা। অতঃপর না চাইতেও পুরো ক্লাস চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শেষ করতে হলো তাদের। তবে সাদিকের ক্লাস শেষ হতেই আবারও আলোচনায় বসলো।

পরীক্ষা শেষ করে আনিকার জন্য অপেক্ষা করছে হীরা। কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখাও পেয়ে গেলো তার। তড়িঘড়ি করে আনিকার কাছে গেলো। তাকে দেখে আনিকা খানিক হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“ পরীক্ষা কেমন দিলে। ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”
বলেই প্রশ্নটা বের করতে ব্যাস্ত হলো হীরা। তবে তার আগেই আনিকা সামনে হাঁটা ধরলো। মেয়েটার এসবে খেয়াল নেই সে এখনো সকালের বিস্ময়ের জগতেই আছে। কীভাবে কী হলো! এসব ভাবতে ভাবতেই হাঁটছে সে। অথচ হীরা যে পিছনে পরে গেছে তার কোনো খবর নেই।

ফাইল থেকে প্রশ্নটা বের করে হীরা দেখলো আনিকা অনেকটা সামনে চলে গেছে। প্রশ্ন হাতে দৌঁড় লাগালো সে। কিন্তু সহসা কোথা থেকে যেন কলেজের কিছু ছেলে এসে তার পথ আটকে দাঁড়ালো। তন্মধ্যে একটা ছেলে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো তার সামনে। ভরকে গেলো সে, দু- কদম পিছিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। ঢোক গিলে তাদের থেকে কিছুটা দূরে আনিকার দিকে তাকালো। তবে ডাক দিতে সক্ষম হলো না। এর আগে কখনো এরকম অবস্থায় পড়ে নি সে। এমনটা নয় যে কখনো কারো থেকে প্রপোজাল পায় নি সে। তবে গ্রামে ছেলেরা এভাবে সবার সামনে কখনোই প্রপোজ করেনি। করলেও অন্যজন কে দিয়ে সবার অগোচরে। আর এখানে মাঠভরা মানুষের সামনে কোনো ছেলেকে নিজের সামনে দেখেই ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে মেয়েটা।

“ ভয় পেও না কিউটি গার্ল, আমি তোমায় কিছু করবো না। জাস্ট ফুলগুলো নেও আর তোমার মনটা দিয়ে দাও। ”
পাশে থাকা বন্ধুর থেকে এক গুচ্ছ গোলাপ এনে হীরার নিকট বাড়িয়ে দিয়ে ছেলেটা বললো। তার কথায় হীরা নিজের সকল ভয় দমিয়ে রেখে বলে উঠলো,
“ আমি বিবাহিত। ”
ছেলগুলোর মনে হলো যেন হীরা তাদের সাথে ইয়ার্কি মারছে। উচ্চস্বরে হেসে উঠলো তারা। বেশ বিরক্ত হলো হীরা। তৎক্ষনাৎ সকল ভয় পরিণত হলো রাগে। সে উচ্চ কণ্ঠে ডেকে উঠলো,

“ আনিকা আপু। ”
হীরার কন্ঠ পেতেই ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো আনিকা। পিছনে ঘুরে হীরাকে এতগুলো ছেলের মাঝে আটকে থাকতে দেখে দ্রুত গতিতে ছুটে এলো সে। এসেই ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যে কড়া কণ্ঠে বললো,
“ কী সমস্যা? আপনারা সবাই ওঁকে আটকে রেখেছিস কেন? ”
“ এই আনিকা এইটা কী হয় তোমার? একটু ম্যানেজ করে দেওনা। ”
ছেলেটির কথায় তাকে একটা কষিয়ে থাপ্পড় দিতে মন চাইলেও সিনিয়র ভাই হওয়ায় সে ইচ্ছাকে দমিয়ে রেখে আনিকা স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললো,

“ ওঁ আমার ভাবি হয়। ”
“ আরে ভাবি হবে তো পরে আগে তুমি রাজী তো করাও। ”
এইবার আর নিজের রাগটা দমিয়ে রাখতে পারলো না আনিকা। কটমট করতে করতে বললো,
“ ওঁ আমার ভাইয়ার বিয়ে করা বউ। ফালতু কথা বলবেন না ভাইয়া। ”
আবারও ছেলেগুলো হেসে উঠলো। পাশে থাকা একটা ছেলে রসিকতা করে বললো,

“ তুমিও মজা করছো আমাদের সাথে? তোমার কোন ভাই এইটুকু পিচ্ছি একটা ডলকে বিয়ে কর…! ”
কথাটা শেষ করতে পারলো না ছেলেটা তার আগেই পিছন থেকে ভেসে আসলো এক ভারিক্কি গম্ভীর স্বর,
“ আমি। ”
সাথে সাথেই সকলে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। নিজেদের থেকে বড়ো সুঠাম দেহি এক পূরুষ বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত রেখে তাদের দিকেই শান্ত অথচ কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। যেনো ঐ চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিতে পারবে তাদের। ছেলেগুলো ঘাবড়ে গেলো। হীরার সামনে হাঁটু গেড়ে থাকা ছেলেটাও দাঁড়িয়ে পরলো।

শীতের আগমনে ধরণীতে দিবাকরের রাজত্ব এখন কিছুটা দমে গেছে। চারিদিক আলোকিত করলেও প্রাণী জাতিকে নিজের উত্তপ্ত রশ্মি দ্বারা ঘাম ছুটাতে সে সক্ষম নয় এখন। এমনই এক আবছা আলোকময় বিকেল, কলেজ ক্যাম্পাসের সুবিশাল মাঠ টায় এক দল ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে তাদের ভয়ের ছাপ স্পষ্ট, শরীর ঘেমে উঠছে বারংবার। তাদের সামনেই ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে এক সুউচ্চ যুবক। আশেপাশে থাকা সকল ছেলেমেয়েদের দৃষ্টি তাদের পানেই নিবদ্ধ। সহসাই নিরবতা ভেঙ্গে দন্ডায়মান পুরুষটি তার থেকে বছর আটেক ছোটো, ফুল হাতে থাকা ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললো,

“ তা ফুলগুলো আনতে কতো টাকা খরচ করলে? ”
নুইয়ে রাখা মাথা টা তুলে অনিলের দিক চকিত চাইলো ছেলেটি। সে আগে থেকেই চেনে অনিলকে, আনিকাকে নিতে এসেছিলো বার কয়েক। শুধু সে বললে ভূল হবে এমনকি পুরো স্কুল কলেজের সকলেই তার সম্পর্কে জানে। প্রতিটা শিক্ষকের পছন্দের স্টুডেন্ট ছিলো সে তাই প্রত্যেক শিক্ষকই ক্লাসে ক্লাসে তার প্রশংসা করে। যার দরুণ তার সম্পর্কে সবায়ই অবগত। সুতরাং অনিলের প্রশ্নে চুপ করে থাকার সাহস হলো না তার। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

“ ২০০ টাকা। ”
“ গ্র্যাট জব। তবে আমার বউয়ের জন্য টাকা খরচ করেছো তার জন্য আমার থেকে কিছু পুরস্কার তোমাদের অবশ্যই প্রযোজ্য। ”
কিছুক্ষন ভেবে অনিল ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়া ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যে আবারও বললো,
“ ভয় নেই, বাচ্চাদের উপহার নিতান্তই বাচ্চাসুলভ হবে বড়োদের গুলো তোমাদের হজম হবে না। তা ফটাফট লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যাও সবাই। ”
বিস্ময় নিয়ে অনিলের দিক তাকালো ছেলেগুলো তবে কথা মান্য করতে ভুললো না। সবাই লাইনে দাঁড়াতেই অনিল আদেশ ছুড়লো,
“ এখন ভালো ছেলেদের মতো এক টানা ২০০ বার কান ধরে উঠবস করো। আর হ্যাঁ থামলে সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। ”

“ ভাই এইবার এর মতো ক্ষমা করে দিন। আমরা জানতাম না এটা আপনার বউ। ”
” জানতে না বলেই এই শাস্তি দিলাম। জানার পরেও যদি এই দুঃসাহস দেখাতে তাহলে শাস্তির উচ্চ ডিগ্রিতে নিয়ে দেখাতাম শাস্তি কতো প্রকার ও কী কী! কথা না বলে যা বলেছি তা করো। ”
আর কিছু বলতে পারলো না ছেলেগুলো। চুপচাপ মাথা নিচু করে ভরা ক্যাম্পাসে কান ধরে উঠবস করতে শুরু করলো। এতক্ষন অনিলের সব কান্ড ফ্যালফ্যাল নয়নে দেখছিলো হীরা ও আনিকা। ছেলেগুলোর অবস্থা দেখে এখন পেট ফেটে হাসি আসছে তাদের। দুজন দুজনের দিক তাকাতেই ফিক করে হেসে উঠলো তারা। হাসির শব্দে চোখ রাঙিয়ে অনিল তাকালো তাদের দিক। সাথে সাথেই হাসি বন্ধ হয়ে গেলো দুজনের। একদম চুপটি মেরে ছেলেগুলোর করুন দশা দেখতে লাগলো। পা গুলো ব্যাথা হয়ে গেছে বোধহয় তাদের, যার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছে চেহারায়, ঘেমে নেয়ে লাল হয়ে গেছে এক এক জনের চেহারা। তবে তাতে একটু ও মায়া হলো না অনিলের। এক পর্যায়ে গুনে গুনে ২০০ বার উঠবস করে থামলো ছেলেগুলো। হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে হাপাতে লাগলো এক একজন। এর মাঝেই অনিল আনিকা কে ইশারা করে বললো,

“ ওঁকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বস। ”
ভাইয়ের আদেশে না চাইতেও হীরাকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করলো আনিকা। হাত ধরে দুজনে গাড়ির নিকট এগিয়ে গেলো। তারা যেতেই অনিল ছেলগুলোর দিক ঝুঁকলো। শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বললো,
“ অন্যের স্ত্রীর দিকে নজর দেওয়া কাপুরুষ দের আমার মোটেও পছন্দ নয় সুপুরুষ হও আর নিজের ভাগ্যের সেই পবিত্র নারীর জন্য ভালোবাসা জমাও। নেক্সট টাইম এদিক সেদিক নজর দিলে- ছোটো বলে শাস্তির শীর্ষ স্তর দেখায় দেরি হবে না ”
বলেই সোজা হয়ে হাঁটা ধরলো সে। ছেলেগুলো এক দৃষ্টিতে শুধু তার প্রস্থান দেখলো। অনিল তাদের ওয়ারনিং দিলো না উপদেশ দিলো সেটাই বুঝতে বেগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।

পুরো রাস্তা ফুরফুরে মেজাজে আসলো হীরা ও আনিকা। বাড়ির সামনে আসতেই গাড়ি থেকে নামতে ব্যাস্ত হলো তারা। তবে বাধ সাধলো অনিল। হীরা গাড়ি থেকে নামতে নিচ্ছিলো তখনই সে বলে উঠলো,
“ আনিকা বাসায় যা। আম্মুকে বলিস হীরা আমার সাথে আছে। ”
ভাইয়ের কথায় আনিকা কোনোরূপ প্রশ্ন ছাড়াই সম্মতি দিয়ে বাড়ির দিক হাঁটা ধরলো। এইদিকে আত্মার পানি শুকিয়ে গেলো হীরার। সে আবার কী করলো? অনিল তাকে কেন থাকতে বললো? অনিল আবার তাকে ঐ ঘটনার জন্য শাস্তি দিবে নাতো? ভাবতেই শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,

“ আমি থেকে কী করবো? ”
“ সামনের সিটে এসো। ”
তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই আদেশ ছুড়লো অনিল। হীরাও তৎক্ষনাৎ মুখ ফসকে বলে উঠলো,
“ কেন? ”
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো অনিল। অনিলের চাহনি দেখেই ফটাফট গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে এসে বসে পরলো সে। আর একটি কথা বলারও সাহস করলো না। কোনোরূপ প্রশ্ন ছাড়াই অনিলের সাথে চললো।

মোবাইল হাতে বিছানায় বসে আছে আনিকা। হোয়াটসঅ্যাপে তাদের আজকে আরেকটা নতুন গ্রুপ খুলা হয়েছে। গ্রুপ টা মূলত সাদিকের। সাদিকের বিষয়ের সব তথ্য এই গ্রুপ এ পাওয়া যাবে। সাদিক ও আছে গ্রুপে। সাদিকের আইডি তে ঢুকলো আনিকা। প্রোফাইল পিক টা জুম করে দেখতে লাগলো। একটা বাইকের সাথে হেলান দিয়ে কিছুটা বখাটে ছেলেদের স্টাইল এ ছবিটা তুলা। তবে খারাপ লাগছে না দেখতে বরং বখাটে ভাবটায় যেনো আরও বেশি মানিয়েছে- তেমনটাই মনে হলো আনিকার। এর মাঝেই নাজিয়া বেগম নিচ থেকে হাঁক ছাড়লেন। ফোন রেখে দ্রুত পা চালালো আনিকা অথচ খেয়ালই করলো না ফোন রাখতে গিয়ে আঙুলের চাপ পরে কল চলে গেছে তার চরম শত্রুর কাছে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই আবারও রুমে চলে আসলো সে। এসেই ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা একটা নাম্বার থেকে কল আসছে। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে গেলো তার। তবে কল রিসিভ করলো। ফোন রিসিভ হতেই ওপাশের ব্যাক্তিটি বলে উঠলো,

“ কে আপনি? ”
শেষ এই একটা প্রশ্নই সারাদিনের ফুরফুরে মেজাজটা বিগড়ে দিলো তার। নিজে কল করে যদি আবার নিজেই জিজ্ঞেস করে, “ কে আপনি ” তাহলে মেজাজ না বিগড়ানোর কোনো উপায় আছে? সবারটা সে জানেনা তবে তার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর ঠেকলো প্রশ্নটা। সে কটমট করতে করতে বললো,
“ তোর নানি আমি। এই বদমাইশ আমারে যদি নাই চিনস তো কল দিলি কেন? তগো মতো কিছু ইডিয়ট এর জন্য মুড টাই নষ্ট হয়ে যায়। নেক্সট টাইম কল করবি তো…”
আর বলতে পারলো না সে। তার আগেই ওপাশ থাকা মানুষটি তাকে থামিয়ে বলে উঠলো,
“ এই বেয়াদবের হাড্ডি, এক থাপ্পর দিয়ে গাল লাল করে ফেলবো তোমার। মেনার্সলেস মেয়ে কোথাকার, নিজে আগে কল করে আবার ফাইজলামি করো। কালকে কলেজে তোমায় খুঁজে বের করবো আমি। তারপর বুঝাবো তুমি আমার নানি না অন্যকিছু। ”

বলেই কল কেটে দিলো ওপাশের লোকটি। তব্দা খেয়ে গেলো আনিকা। কলেজে খুঁজে বের করবে মানে! উনি কী কলেজের কেউ? সাথে সাথেই লক খুলে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো সে। লক খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সাদিকের আইডি এবং সাথে দেখলো তার এখান থেকে একটা কল দেওয়া হয়েছে। তার কিছুক্ষন পরেই সাদিকের থেকেও একটা কল এসেছে। বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো মেয়েটা। প্রোফাইল পিক থেকে বেরিয়ে সাদিকের নাম্বারটা চেক করতেই হাত থেকে ফোনটা বিছানায় পড়ে গেলো তার। নিজের কাণ্ডে নিজেরই হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁদতে মন চাচ্ছে এখন। তার হাতটার ও কী ভূল করে ঐ লোককেই কল দিতে হলো?

আর ঐ লোকই বা কেন তাকে নাম্বারে কল দিতে গেলো! হোয়াটসঅ্যাপ ধরেনি বলে কী নাম্বারে দিতে হবে? এখন কী হবে তার? পরক্ষণেই মনে পড়লো তার আইডির নাম তো “ রহস্যময়ী ” ঐ লোক তো তাকে চিনতেই পারবে না। ভেবেই চিন্তা মুক্ত হয়ে আবারও মোবাইল হাতে শুয়ে পড়লো। তারপর সাদিকের নাম্বার টা সেভ করলো “লঙ্কার বান্দর ” নামে। সাথে আবার ব্রেকেট দিয়ে স্যার ও লিখে দিলো। যাই হোক একজন শিক্ষক হিসেবে এইটুকু সম্মান তো প্রাপ্য বলেই মনে হলো আনিকার।

বড়ো একটা দালানের সামনে এসে গাড়ি থামলো অনিলের। গাড়ির জানালা দিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করছে হীরা। দালানটির চারপাশে নজর বুলিয়ে এইটুকু সে বুঝতে পেরেছে এটা একটা মার্কেট। অনিল এসে গাড়ির দরজা খুলে দিতেই নেমে পরলো সে। সে নামতেই অনিল তার হাত ধরে হাঁটা ধরলো। মার্কেটের ভিতরে প্রবেশ করতেই চারপাশে শুধু অলংকারই নজরে পড়লো হীরার। কপাল কুঁচকে গেলো তার তবে প্রশ্ন করার সাহস পেলো না সে। ধীরপায়ে এসে তারা একজন স্বর্ণকারের এর কাছে থামলো। অনিল এসেই স্বর্ণ কারের উদ্দেশ্যে কিছু চুড়ি দেখাতে বললেন। তার কথায় লোকটি সব রকমের চুড়ি তার সামনে রাখলো। তন্মধ্যে এক জোড়া চুড়ি পছন্দ হলে সেগুলো আরও ছোটো সাইজের দিতে বললো। লোকটি ছোটো সাইজের বের করতেই সেগুলোর মধ্যে একজোড়া চুড়ির দাম চুকিয়ে নিয়ে নিলো অনিল। তারপর আবারও গাড়ির দিক হাঁটা ধরলো। পাশে হীরা শুধু নিরব দর্শক হয়ে তার কান্ড দেখলো।

গাড়িতে এসে চুপচাপ বসে পড়লো হীরা। অপর পাশে বসে অনিল আবারও ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে গেলো তারা। গাড়ি থেকে নেমে যেই না বাড়ির দিক হাঁটা ধরলো হীরা তখনই অনিল দুহাতে তার কোমড় চেপে গাড়ির উপর বসিয়ে দিলো তাকে। ভরকে গেলো মেয়েটা, ভয়ে অনিলের দু কাঁধ খামছে ধরলো। অনিলের সেদিকে খেয়াল নেই। সে সন্তর্পনে পকেট থেকে চুড়িগুলো বের করলো। তারপর নিজের কাধ থেকে হীরার হাত গুলো নামিয়ে ঐ দিন ঠিক যতটা রাগ নিয়ে হীরার চুড়িগুলো হাত থেকে খুলেছিলো আজ ঠিক ততটাই যত্ন নিয়ে তা পরাতে থাকলো। এইবার আর চুপ থাকতে পারলো না হীরা, সাহস করে বলেই ফেললো,

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৪+২৫

“ আপনি না ঐ দিন নিষেধ করেছিলেন হাতে চুড়ি পড়তে। তবে আজ কেন পড়াচ্ছেন? ”
“ ঐদিন তোমার প্রতি নিজের মালিকানা খাটানোর প্রয়োজন মনে হয়নি। তবে আজ মনে হলো- তুমি যে একান্তই তোমার ডাক্তার সাহেবের অধীনে বন্দী এক অবুঝপাখি তা এই পৃথিবীকে জানানো দরকার। ”
অনিলের কথায় বোকা বোকা চোখে তার দিক তাকালো হীরা। তার চাহনি দেখে অনিল তার নাকে নাক ঘষে বললো,
“ এইভাবে তাকিও না কিশোরী। এভাবে তাকালে তোমার বুঝদার পুরুষেও কিন্তু তোমার মতো অবুঝপনামি করে বসবে। ”

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৯+৩০