অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৯+৩০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
“এইভাবে তাকিও না কিশোরী। এভাবে তাকালে তোমার বুঝদার পুরুষও কিন্তু তোমার মতো অবুঝ পনামি করে বসবে। ”
অনিলের কথায় ভ্রূ জোড়া কুঁচকে গেলো হীরার। সে বোকা বোকা চোখে অনিলের দিক তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ কী অবুঝ পনামি করবেন? ”
“ বুঝবে না তুমি, বাসায় যাও। ”
হীরাকে গাড়ির উপর থেকে নামাতে নামাতে বললো অনিল। হীরা এইবার নিজের কোমড়ে হাত রেখে নাক, মুখ সিঁটকে বললো,
“ আপনি আমায় যতটা অবুঝ ভাবেন আমি ততটাও অবুঝ নই বুঝলেন? আপনার আম্মু ওরফে আমার শাশুড়ি আম্মুও বলে আমি যথেষ্ট বুঝদার। ”
“ তা এতটাই যখন বুঝদার তাহলে নিজেই বুঝে নেও। আমায় জিজ্ঞেস করছো কেন? ”
নিজের কথার জালে নিজেই ফেঁসে গেলো হীরা। আর কিছুই বললো না অনিলকে। মনে মনে অনিলের জাত-গুষ্টি উদ্ধার করতে করতেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বড়ো বড়ো পায়ে হেঁটে চললো। পিছন থেকে গাড়িতে হেলান দিয়ে হীরার প্রস্থান দেখলো অনিল। সাথে ঠোঁটের কোণে ফোটে উঠলো এক সূক্ষ্ম হাসি। হীরা বাড়ির ভিতর ঢুকতেই সে গাড়িতে উঠতে উঠতে একটাই শব্দ আওড়ালো,
“ অবুঝপাখি ”
ঘরে গিয়ে হীরা আগে ফ্রেস হয়ে নিলো। তারপর নিচে গিয়ে তার জন্য বেড়ে রাখা খাবার খেয়ে আনিকার রুমের উদ্দেশ্যে ছুট লাগালো।
টেবিলে বসে কলেজের পড়া গুলো শেষ করছিলো আনিকা। সে সময়েই ঘরে হীরার আগমন দেখে পড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। হীরার ফরসা হাতে চকচক করতে থাকা সোনালি রঙের বালা গুলোর দিক নজর যেতেই সে জিজ্ঞেস করলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ এইগুলোই বুঝি কিনতে গিয়েছিলে তুমি আর ভাইয়া? ”
বিছনায় বসতে বসতে হীরা উত্তর করলো,
“ হুম। ”
“ ভাইয়া না নিষেধ করেছিলো চুড়ি পরতে? ”
“ এটা তো আমিও জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু তোমার ভাইয়া কী যেনো উত্তর দিলো কিছুই মাথায় ঢুকলো না। ”
কিছুক্ষণ থেমে আবারও বললো,
“ জানো আপু, তোমার ভাইয়াকে না আমার পুরো উচ্চতর গণিতের মতো লাগে এখনি বুঝি আবার একটু পরেই বুঝি না। ”
হীরার এহেন কথায় উচ্চস্বরে হেসে উঠলো আনিকা। তারপর হাসি থামিয়ে হীরার গাল টেনে বললো,
“ আরে বোকা মেয়ে, ভাইয়া জেলাসি থেকে করেছে এসব। চুড়ি পরলে তো তোমায় বিবাহিত মনে হবে আর এতে কেউ আর তোমার দিকে নজর দিতে পারবে না। তাই ভাইয়া তোমাকে চুড়ি পড়তে বলেছে। হায় আল্লাহ, আমার ভাই এতো রোম্যান্টিক হইলো কবে থেকে! ”
আনিকার শেষ কথাটায় যেনো মজা পেলো হীরা। সে ভেঙচি কেটে বললো,
“ কী বললে রোম্যান্টিক? তাও আবার তোমার ভাইয়া! আমি তো মনে করি উনি আস্ত একটা করলা। নাহ, শুধু করলা না, চিরতা, নিমপাতা যতো রকম তেতো স্বাদযুক্ত জিনিস আছে সব তোমার ভাই। ”
হীরা নিজের মতো বলেই যাচ্ছিলো এর মাঝেই আনিকা নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কী যেনো একটা করে তার উদ্দেশ্যে বললো,
“ কী বললে হীরা? আরেকবার বলো না শুনতে পাই নি। ”
আবারও প্রথম থেকে বলা শুরু করলো হীরা। শেষে আরেকটু বাড়িয়ে বললো এইবার। এইদিকে আনিকা তো হীরার কথায় শুধু মিটিমিটি হাসছে আর হীরার দুর্গতির কথা ভাবছে।
পড়া শেষ করে আনিকার সাথে কথা বলার উদ্দেশ্য হোয়াটসঅ্যাপ এ ঢুকলো তাপসি। ডাটা অন করতেই অনেকগুলো নোটিফিকেশন আসলো। তন্মধ্যে একটার মধ্যে চোখ আটকালো তার। একটা অচেনা আইডি থেকে ভয়েস পাঠিয়েছে কে যেনো। প্রথমে সে ভয়েস টাই চালু করলো। ভয়েস চালু হতেই চার দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে কিছু অপ্রত্যাশিত বাক্য প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো,
“ শুরুটা হোক “অচেনা” নামক শব্দটির মধ্য দিয়ে। জানি আমাকে জানার এক নিরব কৌতূহল আপনার মনে অবশ্যই জাগবে। তবে জেনে রাখুন আমি উত্তাল সমুদ্রের সাথে ধেয়ে আসা সেই জুয়ার, যার ভাটার সাথে আপনার হৃদয় নিয়ে যেতে এসেছি। পাবো কী সেই মূল্যবান বস্তু টি? দয়া করে এই অধমকে প্রত্যাখ্যান করে নাজুক হৃদয়টাকে ভেঙ্গে দিবেন না। ”
অজান্তেই এক অনুভূতি মিশ্রিত হাসি ফুটে উঠলো তাপসির ঠোঁটে। ভয়েস টা শেষ হয়ে গেলেও এখনো একেক টা শব্দ তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। কান থেকে মোবাইলটা এনে চোখের সামনে ধরলো সে। কী উত্তর দেওয়া যায় এই ভয়েসের পরিপ্রেক্ষিতে? বুঝতে পারলো না। অন্যকেউ হলে এতক্ষন তার সুপ্রিয় বন্ধবীর থেকে শেখা কিছু সম্মানিত বাক্য ছুঁড়ে ব্লক করে দিতো। তবে কেন যেন এই ভয়েসের মালকিন কে তা বলার ইচ্ছে বা সাহস কোনোটাই হলো না। অবশ হয়ে আসা আঙুল গুলো দিয়ে কিছু একটা লিখার চেষ্টা শুরু করলো।
এইদিকে আইডিতে টাইপিং দেখে একদল ছেলে হই হই করে উঠলো। তন্মধ্যে একটা ছেলে মোবাইল হাতে সবার মধে বসে থাকা ছেলেটিকে বললো,
“ ভাই আমি শিউর তুমি জিতবা। যেই ভয়েস দিছো আমার তো ভয়ই হইতাছে মাইয়া নি আবার তোমার প্রেমে পইড়া যায়। ”
ছেলেটির কথায় বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে উঠলো মোবাইল হাতে থাকা ছেলেটির মুখে। সে ছেলেটির বাহুতে চাপড় মেরে বললো,
“ ধুর শা’লা এখনকার মেয়েরা আবার ভয়েসের প্রেমে পড়ে নাকি।আর যদিও প্রেমে পইড়া যায় তাহলে এর দায় ভার তগো। আমার প্রিয়তমা থাকতে আমি অন্য কাউরে ভালোবাসতে পারমু না। তোরা যা ডেয়ার দিছস আমি তাই করছি। ”
তাদের কথার মাঝেই ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসলো,
” মূল্যবান বস্তটি দিতে যদি আমি নিষেধ করি। তাহলে আপনার হৃদয় কতটুকু ভাঙবে জানতে পারি?”
“ যদি বলি পুরোটাই ভেঙ্গে যাবে। তাহলে বিশ্বাস করবেন? ”
“ হুম করলাম না হয়। ”
“ তাহলে কী পাওয়া যাবে ঐ মূল্যবান বস্তু টি? ”
“ দিয়ে দিলাম না হয়। ”
সাথে সাথেই চিল্লিয়ে উঠলো সব ছেলে দল। হাতের মোবাইলটা পাশে রেখে এইবার ভয়েসের মালকিন তার অপর পাশের ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললো,
“ কিরে তুই না কইলি আমি মেয়ে পটাতে পারমু না বলে- তোর ডেয়ার গ্রহণ করছিলাম না? এখন টাকা বের কর, আমি ডেয়ারও পালন করেছি সাথে মেয়ে পটানোর বাজিও। ”
ছেলেটি কোনোরুপ দেনামুনা করলো না। কথা অনুযায়ী টাকা বের করে দিয়ে দিলো। টাকা হাতে নিয়ে ভয়েসের মালকিন আবারও মোবাইলটা হাতে নিলো। তারপর অপর পাশের মেয়েটির উদ্দেশ্যে লিখলো,
“ ক্ষমা করবেন, আসলে বন্ধুরা ট্রুথ ডেয়ার খেলছিলাম আর সেখানে অচেনা এক মেয়েকে ভয়েস দেওয়ার ডেয়ার দেওয়া হয়েছিলো আমাকে। তাই এই ভয়েস টুকু দিলাম। ”
তাপসি কিছু একটা টাইপিং করছিলো। এর মাঝেই মেসেজটি চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সাথে সাথেই হাত থেমে গেলো মেয়েটার। বারংবার চোখ কচলে মেসেজটি পড়লো। প্রতি বারই একই মেসেজে দেখতে পেলো। অপ্রত্যাশিত এই মেসেজটি পড়তে পড়তেই চোখ জোড়া কেমন যেন জ্বলে উঠলো তার। সদ্য জন্ম নেওয়া অনুভূতি গুলোর হলো অকাল মৃত্যু। আর কিছুই লিখতে পারলো না মেয়েটা। শুধু শেষ বারের জন্য জানতে চাইলো,
“ ওহ, আপনার নামটা জানতে পারি? ”
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে উত্তর আসলো,
“ ভয়েসের মাঝেনা খুঁজুন পেয়ে যাবেন। ”
তার খুঁজতে ইচ্ছে হলো না আর। কেমন যেন অন্যরকম লাগছে ভিতর টা। মোবাইলটা পাশে রেখে শুয়ে পরলো তাপসি। এখন তার নিজের চুল গুলো নিজেরই ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। এতটা বোকা কবে হলো সে? একটা ভয়েস শুনে এমন অনুভূতি কেন হলো তার? যেখানে চোখের সামনে শত পূরুষ থাকতেও সে কখনো কারো জন্য এমন অনুভব করে নি সেখানে সামান্য একটা ভয়েসে এমন মুগ্ধ হওয়ার কী আছে? ধেৎ, এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল তাপসি, ইট ওয়াস আ প্র্যাঙ্ক- নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিতে লাগলো সে।
বই হাতে পুরো রুমে হেঁটে হেঁটে পড়ছে হীরা। সেই তখন আনিকার রুম থেকে এসে পড়তে বসেছে সে। যার দরুণ এখন আর বসে পড়তে ভালো লাগছে না। তাই হাঁটতে হাঁটতেই পড়ছে। এর মাঝেই দরজা দিয়ে নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো অনিল। হীরাকে এভাবে হেঁটে হেঁটে পড়তে দেখে অবাক হলো না। কারন হীরাকে এর আগেও অনেকদিন এভাবে পড়তে দেখেছে সে। অনিল নিজের অ্যাপ্রনটা যথাস্থানে রেখে হীরার দিক এগিয়ে গেলো। তাকে নিজের সামনে এসে এভাবে দাঁড়াতে দেখে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো হীরা। অনিল হীরার হাত থেকে বইটা নিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো। তার কাণ্ডে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো মেয়েটা। মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে তার আগেই অনিল শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে তার নিকট এগোতে লাগলো। ঠান্ডা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ আমি করলা? ”
পিছনের দিক পিছাতে পিছাতে হীরা একটা শুষ্ক ঢোক গিললো। বুঝতে পারলো তার প্রানপ্রিয় ননদিনী তার ভাইকে সব বলে দিয়েছে। আর এখন তার কী হবে- এইটা ভেবেই ভয় জমলো মনে। সে আমতা আমতা করে বললো,
“ না..নাহ, আপনি করলা হতে যাবেন কেন! ”
“ আমি চিরতা? ”
কিছু বলতে পারছে না হীরা। ভয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে সে। অনিল আবারও বললো,
“ আমি নিমপাতা? ”
বলেই হীরাকে নিজের সাথে চেপে ধরলো অনিল। হীরার এখন নিজেকে নিজেরই ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে মারতে ইচ্ছে করছে। কেন যে সে এসব বলতে গিয়েছিলো। তার ভাবনার মাঝেই ভেসে আসলো একটা অপ্রত্যাশিত বাক্য,
“ তুমি খেয়ে চেক করেছিলে? ”
চেহারায় মাছুম ভাব এনে অনিলের দিক তাকিয়ে দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি দিলো হীরা। ভাবলো হয়তো অনিল হয়তো একটু গলবে কিন্তু তার আশায় পানি ঢেলে অনিল হীরার মুখের উপর ঝুঁকে লো ভয়েসে বললো,
“ ওকে চেক করাচ্ছি। ”
তার এমন লো ভয়েসে শরীর কাটা কাটা দিয়ে উঠলো হীরার। অনিল তার একদম ঠোঁট ছুঁই ছুঁই অবস্থায় আসতেই সে অনিলের বুকে মাথা এলিয়ে দিলো। অনিলের বুকে মুখ গুজে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
“ আপনি মিষ্টি, চিনি, গুড় যতো মিষ্টি স্বাদ যুক্ত জিনিস আছে সব। আমি আর কখনো বলবো না ওসব,স্যরি। “
“ আপনি মিষ্টি, চিনি, গুড় যতো মিষ্টি স্বাদ যুক্ত জিনিস আছে সব। আমি আর কখনো বলবো না ওসব,স্যরি। “
কথাগুলো বলার মধ্যেই মৃদু কাঁপছে হীরার শরীর। অনিলের সাথে লেপ্টে থাকায় তা উপলব্ধি করতে পারলো সে। হীরার অবস্থা দেখে সূক্ষ্ম হাসলো অনিল। বুক থেকে হীরার লুকিয়ে রাখা মুখটা তুলে ধরলো চোখের সামনে। বন্ধ চোখের পাতা কাঁপছে তার, দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে রেখেছে। অনিল তার থুতনিতে ধরে মৃদু স্বরে বললো,
“ চেক না করেই বুঝে ফেললে? ”
পিটপিট করে চোখ খুলে অনিলের দিক তাকালো হীরা। বুঝতে চাইলো তার কথার মর্মার্থ। বুঝতেই কপালে খানিক ভাঁজ পড়ল তার। আজব! মানুষ কী মানুষকে খেয়ে চেক করে নাকি!। সবসময় নিজেকে বুঝদার দাবি করে অথচ এখন নিজেই অবুঝদের মতো কথা বলছে! বেশ বিরক্ত হলো হীরা। তবে ভয়ে মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারল না। মিনমিন করে বললো,
“ কীভাবে চেক করবো? ”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো অনিল। যা চোখের আড়াল হলো না হীরারও। চোখ ছোট ছোট করে অনিলের দিক চেয়ে রইলো সে। তবে সহসাই অনিল হীরার নেত্র যুগল ঢেকে দিলো নিজের শক্ত পোক্ত হাত দিয়ে। তার কাণ্ডে বিস্মিত হয়ে হীরা কিছু বলতে নিবে এর আগেই তার নরম তুলতুলে গোলাপি অধর যুগল নিজের পুরুষালী ঠোঁটের আয়ত্তে নিয়ে নিলো অনিল। তার এমন আকস্মিক কাণ্ডে বিদ্যুৎ শক খেলো মেয়েটা। ভিতরে থাকা প্রাণপাখি টা যেনো আজ বেরিয়েই যাবে- বলে মনে হলো। এতক্ষনের মৃদু কম্পমান কায়া টা এইবার থরথর করে কাঁপতে লাগলো। অজান্তেই অনিলের বাহু খামচে ধরলো সে। কিছুক্ষনের মধ্যেই তাকে মুক্ত করে দিলো অনিল। ছাড়া পেতেই আবারও অনিলের বুকে মুখ লুকাতে ব্যাস্ত হলো সে। অনিল এইবার তার বুকের মাঝে কাঁপতে থাকা ছোট্ট শরীরের মালকিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ এইবার বলো টেস্ট কেমন, তেতো স্বাদযুক্ত না মিষ্টি স্বাদযুক্ত? ”
এমন প্রশ্নে তার সাথে আরও চেপে গেলো হীরা। যেনো একেবারে তার বুকের ভিতর ঢুকে যাওয়ার পণ করেছে। মেয়েটার দশা বেগতিক। এমনভাবে নিশ্বাস নিচ্ছে যেনো একজন শ্বাস কষ্টের রুগী সে। অনিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থেকে হীরাকে ছাড়াতে ছাড়াতে ঠান্ডা স্বরে বললো,
“ মুখ তোলো কিছু করবো না আর। ”
শুনলো না হীরা উল্টো অনিল ছাড়াতে নিলে তাকে আরও আকড়ে ধরলো। সেভাবেই ঠোঁট নেড়ে বললো,
“ আমি আপনার দিক তাকাতে পারবো না। ”
অনিলের এবেলায় প্রচন্ড হাসি পেলো। সামান্য এইটুকু তেই নাকি এই কিশোরী তার দিক তাকাতেই পারবে না। আর ভবিষ্যতে তার সাথে আরও কী কী ঘটবে আল্লাহ মালুম! হীরাকে কোলে তুলে নিলো সে। লাইট অফ করে হাঁটা দিলো বিছানার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যেই বলে উঠলো,
“ অথচ আমরা যাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই
তার বুকেই আমাদের স্বস্তি নিহিত থাকে! ”
কথাটা হীরাকে উদ্দেশ্য বলেছে অনিল- তা বুঝতে পারলো সে। নিজেও ব্যাপারটা ভেবে অবাক হলো। সে অনিলের ভয়ে অনিলের বুকেই নিশ্চিন্তে লুকিয়ে আছে- বড্ডো আজব নয়কি ব্যাপারটা!
পরদিন সকালে,
ক্লাসে বসে নিজেদের মতো কথা বলছে আনিকা ও তাপসি। কিছুক্ষন আগেই একজন শিক্ষক ক্লাস করিয়ে গহীরা। এখন সাদিকের ক্লাস। সে না আসায় যে যার মতো বকবক করে যাচ্ছে। এর মাঝেই ক্লাসে সাদিকের আগমন ঘটলো। ক্লাসে এসে কোনোরূপ সময় ব্যায় না করেই লেকচার দেওয়া শুরু করলো সে। তাকে লেকচার দিতে দেখে নিশ্চিন্ত হলো আনিকা। ভাবলো সাদিক হয়তো গতকালের ব্যাপারটা ভূলে গেছে। পুরো আধা ঘন্টা লেকচার দিয়ে থামলো সাদিক। এর মাঝে সকলকেই জিজ্ঞেস করেছে, “বুঝেছে কিনা?” সকলে সমস্বরে “জ্বি স্যার” বলায় আর তেমন কথা বলেনি সে। অবশ্য না বুঝেও উপায় নেই, তার বুঝানোর ধরন এতটাই নিখুঁত যে, আনিকাও স্বীকার করতে বাধ্য। সে মনে মনে বললো, “ নাহ লোকটা ছেলে হিসেবে খারাপ হলেও স্যার হিসেবে একদম পারফেহীরা।” তার ভাবনার মাঝেই সাদিক সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
“ এখানে রহস্যময়ী আইডি নামে আপনারা কাউকে চিনেন? ”
সবাই ভাবনায় পড়ে গেলো। শুধু বাদ রয়ে গেলো তাপসি, সে অদ্ভূত চোখে আনিকার দিক তাকালো। কলেজে উঠার পর ক্লাসের সবার সাথে আনিকার ফোনে কখনো কথা না হওয়ায় কেউই তার আইডি সম্পর্কে কিছু জানেনা। তবে তাপসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। সে আনিকার স্কুল লাইফের বান্ধবী আর তার সাথে প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় আনিকার। তাই আইডির নাম শুনেই তাপসি বুঝে ফেলেছে এটা আর কেউ নয় তার একমাত্র ভন্ড বান্ধবী। সে সন্ধিহান দৃষ্টিতে আনিকার দিক তাকিয়ে বললো,
“ কীরে আবার কী করছিস তুই? ”
“ আরে দোস্ত, তেমন কিছুই না। জাস্ট একটা মিসটেক হয়ে গেছে। ”
তারপর আস্তে আস্তে সব ঘটনা খুলে বলতে লাগলো আনিকা। সাদিক যে ক্লাসে আছে তা বেলামুম ভুলেই বসলো। এইদিকে সাদিক যখন দেখলো আজকেও আনিকা ও তাপসি এক সাথে বসেছে আবার ক্লাসের মধ্যে কথাও বলছে বেশ রাগ হলো তার। আনিকাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ টা মিস করতে চাইলো না সে। তার কেন যানি মনে হচ্ছে গতকালের মেয়েটা এই মেয়েই ছিলো। তবে শিউর না হওয়ায় শাস্তি টা দিতে পারছে না। কিন্তু এখন যখন চান্স পেয়েই গেছে তাহলে সেটা মিস করার কোনো প্রশ্নই আসে না।
“ হে ইউ, মিস ইরাবতী। স্ট্যান্ড আপ প্লিজ। ”
কথার মাঝেই সহসা সাদিকের এমন সম্বোধনে থেমে গেলো আনিকা। জীবনের প্রথম কোনো পুরুষের থেকে এমন ডাক শুনে- না চাইতেও হৃদয় গহীনে কেমন একটা অনুভুব হলো তার। তবে তা সম্পূর্ণ লুকিয়ে থাকলো তার চঞ্চল সত্ত্বার আড়ালে। স্বাভবিকভাবেই দাঁড়িয়ে গেলো সে। দাঁড়াতেই সাদিক জিজ্ঞেস করলো,
“ কী কথা বলছেন? ”
“………..”
বলার মতো উত্তর পেলো না আনিকা। যে উত্তর তার কাছে আছে সেটা দিলে তার কপালে লাল বাতি জ্বলা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। তাই চুপচাপ হাতে থেকে কলমের ক্যাপ কামড়াতে লাগলো। এর মাঝেই সাদিক আবারও বললো,
“ সামনে আসুন আপনি। ”
কোনোরূপ ভনিতা ছাড়াই সামনে গেলো সে। যদিও মনে মনে কিছুটা ভয় কাজ করছে তবে শত্রু পক্ষের সামনে হার মানার মেয়ে-সে নয়।
“ এইবার সবার সামনে লেকচার দিন। ”
আনিকা সামনে এসে দাঁড়াতেই সাদিক বললো। তার কথার পৃষ্ঠে আনিকা জিজ্ঞেস করলো,
“ কী নিয়ে লেকচার দিবো? ”
“ কথা বলার সময় তো বলে দিতে হয়নি কী ব্যাপারে কথা বলবেন! এখন কেন বলে দিতে হবে? ”
“ কথা বলার সময় তো যা মুখ দিয়ে আসে তাই বলে ফেলি। লেকচার এর সময় তো তা বলা যাবে না। আপনি বলে দিলে ভালো হতো। ”
“ আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু লেকচার দিন। ”
আকাশের চাঁদ যেনো হাতে পেলো আনিকা। এইবার তার লেকচার দিয়ে এই লঙ্কার বান্দর কে জব্দ করবে সে। তাকে জব্দ করা না? শুধু শিক্ষক বলে সব কথা মানছে সে। নয়তো এতক্ষনে এই লোকের গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলতো সে। গলা ঝেড়ে নিলো আনিকা। তারপর লেকচার শুরু করলো,
“ আমার নাম আমার আম্মু- আব্বু যা রেখেছে তা। আমার বাড়ি যেখানে আমরা থাকি সেখানে। আমার কলেজ যেখানে দাঁড়িয়ে আমি লেকচার দিচ্ছি সেটা। আমার একটা বড়ো স্বপ্ন আছে আর সেটা হচ্ছে- আমি একদিন এদেশের একজন অকল্যাণীয় লোককে খু’ন করবো। তারপর তাকে খু’ন করে আমি জেলে যাবো। সবাই তো খেয়ে পার্টি করে কিন্তু আমি সেখানে বসে না খেয়েই একটা আধুনিক পার্টি করবো। তবে সব শেষে আমাকে অতি দুঃখ নিয়ে বলতে হচ্ছে যে, আমার এই স্বপ্ন টা পূরণ করতে গেলে আমি নিজেই আমার ভাইয়ার হাতে খু’ন হয়ে যাবো। দুঃখীত হবেন না, কারণ আমি আমার কল্পনায় জল্পনায় প্রতিনিয়ত ঐ লোককে খু’ন করি। উপসসসস! ফিলিংসই অন্যরকম! যাই হোক আজকের জন্য একজন সুনামধন্য বক্তা হিসেবে আমি আমার দীর্ঘতম বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। ”
তার বক্তব্যে সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। একেক জন একেক জনের উপরে ঢলে পরছে হাসির চোটে। নিজের কাজে সফল হয়ে আনিকাও বিশ্বজয়ের হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে সাদিকের দিক তাকিয়ে বললো,
“ এইবার আমি যাই…. স্যার। ”
সাদিক কে “স্যার” বলতে গিয়ে কেমন জানি আটকে গেলো সে। মিস্টার উগান্ডা বলতে বলতে মুখ দিয়ে অন্য ডাক বের হওয়াই যেনো দায় হয়ে পড়েছে এখন তার জন্য। সাদিক নিজের রাগটা ভিতরে দমিয়ে রেখে বললো,
“ যান। ”
দ্রুত পা চালিয়ে নিজের জায়গায় চলে গেলো আনিকা। গিয়ে বসতে পারল না এর আগেই তাকে থামিয়ে সাদিক বললো,
“ আপনি অন্য বেঞ্চে বসুন। আপনাদের দুজনকে একসাথে বসতে নিষেধ করা হয়েছিল। ”
ব্যাগ হাতে নিয়ে পিছনে গিয়ে হাসি মুখে বসে পড়লো আনিকা। যতো যাই করুক স্যার দের কথা অমান্য করার মতো শিক্ষার্থী সে নয়। আজকে মনে না থাকার দরুণ বসে পড়েছিল।
পড়ার টেবিলে বসে মোবাইলে গতকালের সেই ”অচেনা পুরুষের” ভয়েসটি বারংবার শুনে যাচ্ছে তাপসি। ভয়েসের মধ্য থেকে বিভিন্ন নাম বের করে খাতায় লিখছে। তবে কোনোটাই যেনো সঠিক মনে হচ্ছে না। কখনো ভাবছে “ সমুদ্র ” কখনো ভাবছে “হৃদয়” আবার কখনো বা “নিরব”। সবগুলো নিয়ে গবেষণায় মগ্ন হয়ে আছে সে। মন চাচ্ছে ও পাশের লোকটাকে কল করে জিজ্ঞেস করতে, “ যেখানে আপনি সামান্য নিজের এক ভয়েসেই আমার ধ্যান জ্ঞান সব কেড়ে নিয়েছেন সেখানে এই অধমের কী আপনার নামটা জানারও সৌভাগ্য কোনোদিন হবে না? ” আত্মসম্মানের বেড়াজালে আবদ্ধ মন তা বলতে সক্ষম হলো না।
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ২৭+২৮
আর নাতো কোনোদিন হবে। আবারও টেবিলে মাথা এলিয়ে ভাবনায় মগ্ন হলো মেয়েটা। কেন তার সাথেই এমনটা হতে হলো? ঐ লোকটাকি ডেয়ার পূরণের জন্য শুধু তাকেই পেলো! একবারও ভাবলো না তার ঐ মোহময় কণ্ঠে কোনো এক রমণীর পুরো অনুভূতি রা আটকে যেতে পারে- নিজের ভাবনাতে নিজেরই হাসি পেলো তার। আধুনিকতায় ভরা এই আজব ধরণীতে আজও কী কেউ সামান্য ভয়েসের মোহমায়ায় আটকায়? আবার কিনা তাকে নিয়েই তার মনে এতো অভিযোগ! হাস্যকর লাগলো ব্যাপারটা তার কাছে। বিড়বিড় করে নিজের অশান্ত অনুভূতি দের উদ্দেশ্যে তিরষ্কার করে বলে উঠলো,
“ সে ছিল শুধুই ক্ষনিকের এক অদৃশ্য যোগাযোগ,
অথচ তার নামেই লিখে যাই আমি কতশত বেনামি অভিযোগ! ”
