অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৫+৩৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
নিজের গায়ে জড়ানো গাঢ় নীল রঙের উড়না দ্বারা অনিলের মুখটা স্বযত্নে মুছতে লাগলো হীরা। মুহূর্তেই কাজে ব্যাস্ত থাকা হাত টা থেমে গেলো অনিলের। হীরার শরীরের নারীসুলভ ঘ্রাণ তীব্র ভাবে তার নাকে, মুখে প্রবেশ করছে। যা নাড়িয়ে দিচ্ছে তার পূরুষ সত্ত্বাকে। এইদিকে হীরা যে নিজের কাজ করতে করতে অনিলের এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে এর কোনো হদিসই নেই মেয়েটার। কাজ সম্পন্ন হতেই হীরা পা দুটো স্বাভাবিক অবস্থায় এনে অনিলের দিক তাকালো। অনিলের আঁখিতে আঁখি মিলতেই শিউরে উঠলো মেয়েটা।
অনিল গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হীরার দিক। হীরার টনক নড়লো তখনই যখন দেখলো সে অনিলের এতটা কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে সাথেই দু’কদম পিছিয়ে গেলো সে। হৃদয়ের অন্তরালে ধরা দিলো লজ্জা নামক অনুভূতিরা। আজকাল সে যে কী থেকে কী করে বসে সে নিজেই বুঝে না। উনি কী ভাবলেন! ধীর গতিতে মাথা তোলে অনিলের দিক আবারও আড় চোখে তাকালো সে। দেখলো অনিলের মুখভঙ্গি একদম স্বাভাবিক, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। তবে তা পরক্ষনেই আবার উধাও হয়ে গেল। এইটুকুর মধ্যেই অনিল আবারও ঘেমে গেছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল হীরার। সে ভেবে পাচ্ছে না এভাবে ঘামছে কেন অনিল। কই তার উল্টো স্বল্প ঠাণ্ডা লাগছে। সে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়লো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ আপনি এভাবে ঘামছেন কেন ডাক্তার সাহেব? আপনার কী বেশি গরম লাগছে? ”
“ হুম লাগছে তো। ”
“ বাতাস করবো আমি? ”
“ বাইরে বাতাস করলে হবে না, ভিতরে গরম লাগছে। ”
কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় হলো হীরার। মুখ ফুটে বেরিয়ে আসলো বিস্ময়ের বাণী,
“ মানেহ, ভিতরে কীভাবে গরম লাগে! ”
“ বুঝবে না তুমি। ”
মুখটা ছোটো হয়ে গেলো হীরার। সে বুঝবে না কেন! একটু বুঝিয়ে বললেই তো হয়! আর কিছু বললো না সে। চুপচাপ অনিলের ফুচকা ভাজা দেখতে লাগলো।
এর মাঝেই রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন নাজিয়া বেগম। অনিলকে এতদিন পর হঠাৎ রান্নাঘরে দেখে অবাক হয়ে বললেন,
“ কীরে অনিল রান্নাঘরে কী করছিস তুই? ”
অনিল উত্তর করার আগেই তার চোখে অনিলের ফুচকা বানানো দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি প্রশ্নাত্তক দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন,
“ কার আবার ফুচকা খেতে ইচ্ছে হলো? ”
“ আমার। ”
পিছন থেকে অপরাধী মুখ করে বলে উঠলো হীরা। নাজিয়া বেগম তার দিক তাকিয়ে হেসে বললেন,
“ তা আমাকে বললি না কেন? ”
“ ভেবেছিলাম উনি আনবেন। কিন্তু উনি তো আনেন নি ডাক্তার সাহেব বলে কথা! ”
হীরার কথায় হাসলেন নাজিয়া বেগম। তারপর অনিলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ তুই রূমে চলে যা, বাকিটা আম্মু করে নিচ্ছি। ”
“ নাহ আম্মু, সমস্যা নেই আমার। তুমি বরং টক টা বানাও। ”
সাথে সাথেই নাজিয়া বেগম ফ্রিজ থেকে পাকা তেঁতুল নামিয়ে টক বানাতে ব্যাস্ত হলেন। হীরার ও বসে থাকতে মন চাইলো না। সে নাজিয়া বেগমকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে শুঁকনো মরিচ গুলো দেখিয়ে বললো,
“ আম্মু আমি মরিচ গুলো গুঁড়ো করে দেই? ”
তিনি কিছু বলার পূর্বেই পাশে থাকা অনিল প্রবল নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে বললো,
“ একদম না, পরে হাত জ্বলবে। ”
ছেলের যত্ন দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না নাজিয়া বেগম। তিনি হেসে হীরার চুপসে যাওয়া মুখের দিক তাকিয়ে বললেন,
“ তোর এসব করতে হবে না মা, তুই বরং গিয়ে আনিকাকে ডেকে আন। ”
আর কিছু বললো না হীরা। দ্রুত গতিতে আনিকার রূমের দিক ছুটলো।
“ ভাই তোর মতিগতি কিছুই বুঝতাছি না আমি। তুই নাকি ঐ মাইয়ারে নিজের প্রেমে ফেলতে চাছ অথচ তোর কান্ড দেখে আমার মনে হচ্ছে তুই ঐ মাইয়ার সাথে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রচনা করতে যাচ্ছিস! ”
রাকিবের কথায় বাঁকা হাসলো সাদিক। কিয়ৎক্ষণ নিরব থেকে সহসা বলে উঠলো,
“ মেয়ে মানুষ রে যতো ইগনোর করবি ততোই ওঁরা তোর প্রতি আকৃষ্ট হইবো। মেয়েদের পিছনে লাইন মারা ছেলেদের প্রতি তাদের আকর্ষণ নেই। তাদের কে ইগনোর কর দেখবি তারা অজান্তেই তোর প্রতি আকৃষ্ট হইয়া যাইবো। ”
“ তোর কী মনে ঐ মেয়ে কী তোর প্রতি আকৃষ্ট হইছে। ”
“ আকৃষ্ট তো ও প্রথম দেখাতেই হয়েছে। যেদিন অনুষ্ঠানে আমি ওঁকে ইগনোর করেছিলাম। আর এখন তা ভালোবাসা ময় বিষাক্ত অনুভূতি তে রূপান্তরিত হতে চলেছে। যা আজকে আমি ওঁর অভিমানী চোখ দেখেই কনফার্ম। কজ, অভিমান যেখানে ভালোবাসা সেখানে। ”
“ ভাই তুই একটা চীজ, তোর এই দশ মণের মাথা টায় বিশ মণ মনে হয় খালি বুদ্ধিই ভরা। ”
“ হুম, আর এই আজাইড়া হিসাব করার জন্য তোর মতো অটিস্টিক আছে। ”
“ এই সাবধানে কথা কইছ। আজকে কইছস, এর পরের বার যদি কছ তাহলে তোর কলিজা কাইটা ভূনা কইরা কুকুররে খাওয়ামু। ”
“ আরে এ কে?
কোথা থেকে এলো এ! ”
লাথি খাইতে না চাইলে তোর ফালতু ডায়ালগ দেওয়া বাদ দে। ”
“ শা’লা আমার গুরোর ডায়লগ রে তুই ফালতু কইলি! তোর জীবনে গার্লফ্রেন্ড হইবো না আমি কইয়া দিলাম। ”
“ তোর মতো ডিপজলের বিগ ফ্যান আমার সাথে থাকলে না হওয়া টাই স্বাভাবিক। ”
বিশ্ব জয়ের হাসি হাসলো রাকিব। পরক্ষণেই আবার সিরিয়াস ভাব ভঙ্গি ধরে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ এই আমার না মাইয়া ডার লাইগা চিন্তা হইতাছে। তোর প্রতিশোধের আগুনে ওঁর জীবনটাই না নষ্ট হয়ে যায়। ঐ নিশ্পাপ মেয়েটারে ধোঁকা দিতে তোর কষ্ট হইবো না জল্লাদ।”
“ তোর কে বলল আমি ওঁরে ধোঁকা দিমু? আর ওঁর জন্য তোর এতো জ্বলতাছে কেন? ভিলেন হইতে আবি একদম মঙ্গল গ্রহে পাঠায় দিমু। মনে রাখিস বাংলা দেশে ভিলেন দের কোনো সাইট নেই। আর প্রধানত তোর মতো মিনি ডিপজলের তো আরো আগেই না। ”
অপমানে মুখটা চুপসে গেল রাকিবের। তবে চোখে মুখে এখনো প্রশ্নাত্তক ভাব। প্রতিশোধ নিবে বলছে আবার বলছে ধোঁকাও দিবে না! কিছুই মাথায় ঢুকছেনা তার। সে কপাল কুঁচকে বললো,
“ তোর কথার মানে বুঝলাম না! ”
“ সময় হলে বুঝবি এখন চুপ থাক। ”
বলেই ওয়াসরুমে ঢুকে গেলো সাদিক। সে ঢুকতেই তার চৌদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল রাকিব।
হাত, মুখ ধুয়ে শক্তিহীন পায়ে হীরার সাথে খুশিমনেই নিচে নামলো আনিকা। নিচে আসতেই দেখতে পেলো টেবিলে থালা ভর্তি ফুচকা এনে রাখছে তার মা। আর অনিল তার কাজ সম্পন্ন করে টেবিলের এক পাশে চেয়ারে বসে মোবাইলে কী যেনো করছে। তাদের নামতে দেখেই নাজিয়া বেগম খাওয়ার জন্য তাড়া দিতে লাগলেন। নিজেদের পছন্দের খাবার পেয়ে তারাও আর দেরি করলো না। গিয়ে খাওয়ায় ব্যাস্ত হলো। নাজিয়া বেগম ও বসলেন তাদের সাথে। ফুচকা ভর্তি টক নিয়ে একটা ফুচকা মুখে পুরতেই তৃপ্তির হাসি ফুটলো হীরার মুখে। ফুচকা চিবোতে চিবোতেই সে অনিলকে ইশারা করে আনিকার কাছ থেকে জানতে চাইলো,
“ উনি খায় না। ”
“ নাহ ”
খেতে খেতেই হাতে নাড়িয়ে বুঝালো আনিকা। হীরার বেশ মন খারাপ হলো। উনি এতো কষ্ট করে বানালেন অথচ উনি একটাও খাবেন না। সাহস করে হীরা বলে উঠলো,
“ আপনি একটা খেয়ে দেখুন না। ”
“ আমি এসব খাই না। ”
মনে মনে ভেঙচি কাটলো হীরা। এতো মজার জিনিস নাকি এই লোক খায় না! ভাবতেই আপসোস হলো তার। আর কোনো কথা না বলে সে নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। ঝালের কারনে মুহূর্তেই ঠোঁট, মুখ লাল হয়ে গেলো তার। তবুও খাওয়া থামানোর নাম নেই তার, ফুচকার থেকে বেশি টকই খাচ্ছে মেয়েটা। তার কাণ্ডে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিল চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বললো,
“ খেয়ে তাড়াতাড়ি রুমে আসবে। ”
বিছানার সাথে হেলান দিয়ে ল্যাপটপ হাতে কাজ করছে অনিল। সহসাই হীরার কন্ঠে দরজার দিক তাকালো সে,
“ আপনাকে সীমাহীন ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব। ”
মুখ থেকে হাওয়া বের করে দিয়ে ঝাল নিবারনের চেষ্টা চালাতে চালাতে বললো হীরা। অতিরিক্ত ঝালের কারনে গোলাপি রঙা উষ্ঠযুগল টকটকে খয়েরী বর্ণ ধারণ করেছে। অথচ চোখে মুখে ভাসছে কৃতজ্ঞতার হাসি। অনিল মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো হীরার মুখপানে। কাছে এগিয়ে এলো হীরা। বললো,
“ আপনি এতো ভালো ফুচকা বানাতে পারেন আগে বললেন না কেন? ”
সম্বিৎ ফিরল অনিলের। সাথে সাথেই দৃষ্টি সংযত করলো। বললো,
“ বললে কী হতো? ”
“ আমার ইচ্ছে হলেই আপনাকে বানিয়ে দিতে বলতাম। ”
“ পরিবর্তে আমি কী পেতাম? ”
“ যা চাইতেন তাই। ”
“ শিউর? ”
“ হুম। ”
“ তাহলে আজকের টা চাইলে পাবো? ”
“ পাক্কা ”
“ এদিকে এসো। ”
অনিলের দিক কিছুটা ঝুঁকল হীরা। সে ঝুঁকতেই অনিল তার কানের কাছে মুখ নিলো। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো হীরার। তবে তা টিকলো না বেশিক্ষণ। অনিলের আবদার কর্ণকুহুর হতেই মুখটা বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেলো তার। অসহায় মুখে বললো,
“ এইটা কেমন আবদার! ”
“ আবদারের কোনো প্রকার দেওয়া হয়নি। ”
“ তাই বলে এটা করতে হবে! ”
“ হুম। তুমি কিন্তু কথা দিয়েছো। ”
আর কিছু বলতে পারলো না হীরা। বড়ো মুখ করে কথা যেহেতু দিয়েছে রাখতে তাকে হবেই। অসহায় মুখ করেই অনিলের আজগুবি চাওয়া পূরণ করার উদ্দেশ্যে পিছন ফিরে হাঁটা ধরলো সে। ঠোঁট চেপে হাসছে অনিল। তবে তা দৃষ্টিগোচর হলো না হীরার। সে যেতে নিলেই অনিল বলে উঠলো,
“ আচ্ছা থাক, প্রথম দিন ইচ্ছে পূরণ করতে হবে না। পরের বার থেকে ভেবে চিন্তে ইচ্ছে পূরণ করার কথা বলবে। নাহয় এমন কিছু চাইবো যা তোমার জন্য মঙ্গলজনক হবে না। ”
অনিলের অগোচরে ভেঙচি কাটলো হীরা। সে তো আর এতো কিছু ভেবে বলেনি। মানুষ যে এমন চাওয়াও চাইতে পারে কল্পনায়ই ছিলো না তার। অবশ্য তার মনে রাখার দরকার ছিলো অন্য কেউ এমন কিছু না চাইলেও তার ডাক্তার সাহেব চাইতেই পারে। কারন উনি তো এর আগেও তার সাথে এমন করেছে। সে অনিলকে বুঝেই উঠতে পারে না, এখনি মনে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সর্বোত্তম পূরুষ হয়তো তার ডাক্তার সাহেব আবার একটু পরেই মনে হয় সে যতটা ভালো মনে করে তার ডাক্তার সাহেব অতটাও ভালো নয়। একটু একটু ভন্ড তার ডাক্তার সাহেব।
কথায় আছে না সুখের দিন বেশিদিন টিকে না- সেটা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে হীরা। কদিন হলো মেয়েটা ছুটি কাটিয়েছে? আজকেই আবার তার কোচিং শুরু হয়ে গেছে। আর ভালো লাগছে না হীরার। কবে যে তার পরীক্ষাটা শেষ হবে আল্লাহ মালুম! এসব ভাবতে ভাবতেই অলস ভঙ্গিতে স্কুলের গেইট দিয়ে প্রবেশ করলো হীরা। তার সাথেই আনিকাও ঢুকে কলেজের দিকে হাঁটা ধরলো।
আজকে প্রথম ক্লাস সাদিকের। তাই আনিকা ও তাপসি আলাদা আলাদা বসেছে। আনিকা একদম চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো বসে আছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ক্লাসে প্রবেশ করলো সাদিক। সবার প্রথমেই আনিকার শান্ত শিষ্ট বদন খানায় চোখ বুলালো সে। তারপর ক্লাসে মনোযোগ দিলো। আধা ঘন্টার মতো এক টানা ক্লাস করিয়ে থামলো সে। তারপর স্টুডেন্ট দের উদ্দেশ্যে বললো,
“ আজকে ক্লাসটা কেমন যেনো বোরিং লাগছে। আর লেকচার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কেউ একজন গান গেয়ে শুনালে ভালো হয়। ”
কথা টা বলা মাত্রই সকল শিক্ষার্থীরা একটা মেয়ের নাম ধরে চিল্লিয়ে উঠলো। মেয়েটা আনিকাদের ক্লাসের টপার দের একজন, গানের গলা বেশ ভালো। এর আগেও অনেক ক্লাসে গেয়েছে। সবার কথায় সাদিক মেয়েটাকে দাঁড় করালো। মেয়েটাও দাঁড়িয়ে পরলো কোনো দেনামুন ছাড়াই। তারপর সাদিকের আদেশে গানের লাইন ধরলো। তবে মেয়ের গান শুনে সাদিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। এমন রোম্যান্টিক গান মানুষ স্যার এর সামনে কী করে বলতে পারে। মেয়েটা সাদিকের দিক আড়চোখে চেয়ে চেয়ে এক একটা লাইন বলছে। যা তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করলো আনিকা। সাদিকও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। যার দরুণ সে অন্যদিক তাকিয়ে আছে। গান গাওয়া শেষ হতেই হাত তালিতে মেতে উঠলো পুরো ক্লাস। তারপর সাদিক আরেকজন কে গান গাইতে বললে কেউই দাঁড়ালো না উল্টো সবাই সাদিক কে গান বলার জন্য অনুরুদ করতে লাগলো। তবে আনিকার মুখ দিয়ে টু শব্দ টিও বের হলো না। আর সেটাই শুধু সাদিকের চোখে পরলো। সাদিক কিছু একটা ভেবে গলা খাঁকারি দিলো। তারপর নিচু হয়ে থাকা আনিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ মিস, ইরাবতী। আপনি কী বলেন গান গাইবো? ”
বেকুব বনে গেলো আনিকা। সে ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি এই লোক তাকে এভাবে সবার সামনে গান গাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করবে। আবার সাদিকের করা “ ইরাবতী” সম্বোধন; সব মিলিয়ে একদম স্ট্যাচু হয়ে গেছে মেয়েটা। সাদিক যে তাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললো আর তার যে দাঁড়ানো উচিত সেটা ও ভূলে বসলো সে। তবে পাশে বসা আরেকটি মেয়ে তাকে গুতো দিতেই সম্বিৎ ফিরল তার। তৎক্ষনাৎ দাঁড়ালো সে। ক্লাসের সকলের উৎসুক দৃষ্টি তার উপরেই। মেয়েটা সবার এমন দৃষ্টির কারন বুঝতে পারলো। সবার ক্রাশ সাদিক তাকে আলাদা করে জিজ্ঞেশ করছে গান গাইবে কিনা! এতে এক এক জনের হয়তো গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে- ভাবতেই সিরিয়াস মুডেও হাসি পেলো তার। তবে তা ঠোঁটে ফুটতে দিলো না। সে সাদিকের সামনে হাসবে না। তার তো কথা বলার ও ইচ্ছে ছিলো না। তবে শিক্ষক বিদায় বলতে হবে। সে অন্যদিক তাকিয়ে মিনমিন করে বললো,
“ সবাই যখন চাইছে গেয়ে শুনান। ”
“ আপনি কী চান? ”
সাদিক মনে হয় আজকে পণ করেছে সে আনিকাকে অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে ছাড়বে। তার এক একটা কথায় মেয়েটা অবাক না হয়ে পারছে না। এই উগান্ডা লোক গান গাইবে কী না গাইবে এটা তাকে কেন বলতে হবে! তবে তার ও মনে মনে একটু একটু ইচ্ছা জেগেছে সাদিকের কন্ঠে গান শুনার। সে বললো,
“ জ্বি স্যার, আমিও চাই আপনি গান। ”
বাঁকা হাসলো সাদিক। সে তো এটার ঐ অপেক্ষায় ছিলো। এমন গান গাইবে যেন ইরাবতী তার অভিমানী লুক থেকে পূর্বের নাগিনী রূপে ফিরে আসে। ঐ লুকেই মেয়েটাকে খাপে খাপ মানায়। আর দেরি করলো না সে। নিজের তীক্ষ্ণ আঁখি যুগল আনিকার পানেই নিবদ্ধ রেখে সুর ধরলো,
WHITE SKIN GIRL GIRL (সাদা চামড়ার মাইয়া মাইয়া)
GIRL HEART BLACK (মাইয়ার হৃদয় কালা🤧)
EYS EYS MEET MEET (চোখে চোখে দেখা দেখি)
MY FUTURE DARK ( আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার 🤣)
WHY THIS KOLAVERI
KOLAVERI KOLAVERI DI…..
আনিকা চোখ ছোটো ছোটো করে সাদিকের দিক তাকালো। দেখলো সাদিক তার দিকে তাকিয়েই কেমন যেন রহস্যময় হেসে হেসে এক একটা লাইন বলছে। এই উগান্ডা লোক কী কোনো ভাবে তাকে উদ্দেশ্য করে গানটা গাইছে? ভাবতেই ভিতরের সব জ্বলে উঠলো তার। এই বদমাইশ লোক তাকে ইন্ডিরেক্টলি অপমান করলো। অথচ আনিকা ভেবেছিলো সাদিক হয়তো গতকাল তাকে দাঁড় করিয়ে রাখার অনুসুচনায় তার মন ভালো করার চেষ্টা করছে। নিজের কপালে নিজেরই একটা বাড়ি দিতে মন চাইলো তার; সে কীভাবে ভূলে গেলো যে, এটা আর কেউ নয় তার চরমসত্রু সাদিক। তবে এতো কিছুর পরেও কেনো জানি অজান্তেই আনিকার গোমড়া করে রাখা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। কেন ফুটলো? জানা নেই তার। ঘন্টা বাজতেই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো সাদিক। আর পিছনে রেখে গেলো আহাম্মক হয়ে থাকা সকলকে। সকলেই সাদিকের এমন সুন্দর কন্ঠে এমন অপ্রত্যাশিত গান শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
গাড়িতে বসে চুপচাপ সামনের দৃশ্য দেখছে হীরা ও আনিকা। অনিলের ড্রাইভিং সিটের পাশের সিট টাতে একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটা অনিলের ক্লাসমেট। দু’জনে একই হসপিটালে কাজ করে। আজকে মেয়েটার ড্রাইভার নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে তাই অনিলের কাছে হেল্প চাওয়ায় অনিল তাকে বাড়ি অব্দি ড্রপ করতে এনেছে। অথচ মেয়েটা সেই কখন থেকেই বকবক করে যাচ্ছে অনিলের সাথে। অনিল হু, হা বলে উত্তর করছে। এর বেশি কিছুই বলছে না। এখন মেয়েটা মূলত হীরার আর অনিলের ব্যাপারে কথা বলছে। এই যেমন: এতো পিচ্ছি মেয়ে কেন বিয়ে করেছিস? তোর বউকে তো একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগে? এডজাস্ট করিস কীভাবে? কিছু বুঝে এইটুকু মেয়ে। অনিল সামনে তাকিয়েই মেয়েটার দিক মুখ এগিয়ে চাপা স্বরে বললো,
“ বুঝদার তো আমি নিজেই। যদি বউ ও বুঝদার হতো তাহলে জীবন পানসে হয়ে থাকতো। অবুঝ বউ কে নিয়ে সংসার করার মজাই আলাদা। তুই বুঝবি না। ”
বলেই স্বাভাবিক হয়ে বসলো সে। অনিলের চাপা স্বরে বলা কথাগুলো হীরার কানে পৌঁছায় নি। সে শুধু এই টুকুই দেখতে পেয়েছে অনিল মেয়েটার দিকে ঝুঁকে কথা বলেছে; আর এটাই তার অন্তঃস্থলে আগুন জ্বালাতে সক্ষম। তবে সে কিছু বলতেও পারছে না। কারন মেয়েটা অনিলের ফ্রেন্ড। আর অনিল ও তো মেয়েটার সাথে কী সুন্দর কথা বলছে! এখানে তার কিছু বলার অধিকার আছে নাকি! তার খেয়াল কে রাখে? আজ বান্ধবীকে পেয়ে সব ভূলে গেছেন সাহেব। নিজের কিশোরী বউটা যে পিছনে বেলুনের মতো ফুলছে এতে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই তার। হীরা ও আর সেদিকে তাকালো না জানাল দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
তিমিরে ঘেরা রাত। ধরণী চাঁদের আলোর শূন্যতায় ভুগছে। গা ছমছম করার মতো এই নিরিবিলি পরিবেশ টাই নির্ভয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে হীরা। কতক্ষণ যাবৎ এখানে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জানা নেই তার। আজকে আনিকার সাথেও আড্ডা দিতে যায়নি সে। আনিকা আসলে বলেছে ভালো লাগছে না। আনিকা ও আর তেমন কিছু বলে নি। চলে গেছে সে। তবে হীরার মন খারাপের কারণ ধরতে পেরেছে সে। কিন্তু কিছু বলেনি কারন তার ভাই এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আনিকা যাওযার পর পরই করিডোরে এসেছে হীরা। ঠাণ্ডায় শরীর বরফ হয়ে গেছে মেয়েটার। এতেও কোনো হুশ নেই তার। সে বাইরে তাকিয়ে আছে অনুভূতি হীন দৃষ্টিতে। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না তার। গাড়িতে বসে অনিলের আর তার বান্ধবীর কথা মনে পড়লেই চোখ দিয়ে টপটপ করে বারি বর্ষণ হচ্ছে। এর মধ্যেই রূমের ভিতর থেকে অনিলের ডাক ভেসে আসলো। চোখ, মুখ মুছে নিলো হীরা। তবে অনিলের ডাকে সাড়া দিলো না।
হীরাকে রূমে না দেখে কপালে ভাঁজ পড়ল অনিলের। ভাবলো হয়তো আনিকার রূমে আছে তাই সেদিকটায় গেলো। তবে আনিকার রূমে গিয়ে দেখতে পেলো আনিকা পড়ছে। তার সাথেও হীরা নেই। চিন্তিত হলো অনিল। আজকে মেয়েটা মন টা কেমন যেন গোমড়া করে ছিলো গাড়িতে। আবার বাড়িতে ঢুকার সময়ও একবারও ঘুরে তাকায়নি অনিলের দিক। অন্যসময় তো এক বার হলেও পিছন ফিরে তাকায়। আজ কেন তাকাল না! আনাদিয়া (অনিলের ফ্রেন্ড) সাথে থাকায় সে কিছু বলতেও পারে নি। হীরা কী কোনো ভাবে আনাদিয়ার ব্যাপার নিয়েই মন খারাপ করে ছিলো। ভাবতে ভাবতেই এদিক সেদিক হীরাকে খুঁজতে লাগলো সে। তবে কোথাও না পেয়ে চিন্তিত বদনে ছাদের দিক হাঁটা দিলো। নাহ, ছাদেও হীরার চিহ্নটুকু নেই। ভিতরটা কেমন যেন করে উঠলো অনিলের। হীরা তো ছাদ আর করিডোর..। করিডোরের কথা মনে পরতেই ব্যাস্ত পায়ে নিচে নেমে আসলো সে। রূমে এসে করিডোরে পা রাখতেই দেখা মিললো ছোট্ট শরীরের মালকিনের। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হীরার নিকট এগিয়ে গেলো সে।
“ এতবার ডাকলাম উত্তর করলে না কেন? ”
বলতে বলতেই হীরাকে নিজের দিক ঘুরালো সে। তবে হীরার ফোলা ফোলা লাল মুখশ্রী চোখে পরতেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার। হীরার ছোট্টো মুখটা নিজের পুরুষালী হাতের আজলায় নিয়ে নরম স্বরে বললো,
“ কেঁদেছো কেন? ”
কিছু বলে না হীরা তবে গাল বেয়ে আবারও অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পরছে তার। অনিল ব্যাস্ত গলায় বললো,
“ কী হয়েছে বলো আমায়। না বললে কীভাবে বুঝবো? ”
“ আপনি কী ঐ আপু টাকে পছ…. ”
আর বলতে পারলো না হীরা গলা জড়িয়ে আসলো তার। অনিল হীরার নত হওয়া মুখপানে তাকিয়ে তাকে আরেকটু জ্বালাতে ঠোঁট চেপে সূক্ষ্ম হেসে বললো,
“ হুম। ”
অশ্রুসিক্ত নয়নে অনিলের পানে চকিত চাইলো হীরা। পুরো গাল চোখের পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে মেয়েটার। আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে এর আগেই অনিল হীরার কোমড় চেপে তাকে নিজের সাথে পেঁচিয়ে ধরলো। তারপর হীরার ক্রন্দনরত মুখ খানা আলতো হাতে মুছে দিয়ে নিরেট স্বরে বললো,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৩+৩৪
“ এই সুবিশাল অন্তরীক্ষে লক্ষাধিক
রঙ বেরঙের পাখির মেলা…..!
অথচ এই অনিল এহসানের দৃষ্টি তার
অবুঝপাখির অবুঝপনামী তেই নিবদ্ধ
থাকে বেলা অবেলা….!”
