Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৯+৩০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৯+৩০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৯+৩০
তানিশা ভট্টাচার্য্য

স্কুল থেকে মাত্র ফিরেছে তানভী। রুমে বসে গোল্ডি আর গোপাল সোনার সাথে খেলা করছে সে। হঠাৎ-ই তার মনে পড়ল আর্ভিক ভাই তাকে ওনার রুমে যেতে বলেছিল। তানভী সেই মতো নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আর্ভিকের রুমের দিকে গেল।
আর্ভিকের রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করা। তানভী দরজার লক খুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে ঢোকা মাত্রই আর্ভিকের শরীরের মাতাল করা ঘ্রাণ তার নাকে এল। যা তার কিশোরী মন কে এলোমেলো করে দিচ্ছে। তানভী মাত্র দুবার এসেছিল আর্ভিকের রুমে। তখন অত ভালো করে দেখেনি। কিন্তু এখন আর্ভিক না থাকার কারণে রুমটা পুরো ঘুরে ঘুরে দেখছে।

ঘরের প্রতিটি কোণ কথা বলে আর্ভিকের রুচি আর শৃঙ্খলার। কাঠের মেহগনি টেবিলটায় বইগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো, যেন একেকটি নীরব প্রহরীর মতো জ্ঞানের অতন্দ্র পাহারায় রত। টেবিলের এক কোণে একটি ইনডোর প্ল্যান্ট তার সজীব সবুজ পাতা মেলে বিকেলের নরম রোদটুকু শুষে নিচ্ছে।
বিছানার সাদা চাদরটি টানটান, কোনো ভাঁজহীন, যেন এক প্রশান্ত সমুদ্রের স্থির জলরাশি। দেওয়াল ঘেঁষে রাখা গিটারটি মৌন হয়ে আছে, হয়তো আর্ভিকের ফেরার অপেক্ষায়। জানলার নীল পর্দা বাতাসের হালকা দোলায় মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে। এই নির্জন ঘরটি কেবল ইট-কাঠের আস্তানা নয়, বরং এক যুবকের সুশৃঙ্খল জীবনবোধ আর স্বপ্ন বুননের এক নিভৃত কাব্যিক প্রেক্ষাপট।
তানভীর চোখ গেল বিছানার উপর রাখা একটা ব্যাগের উপর। সে ভাবল

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আর্ভিক ভাই কি এটার কথা বলেছিলেন?”
তানভী আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল সেটার দিকে। তারপর ব্যাগটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তানভী নিজের রুমে এসে ব্যাগটা খুলল সেটার মধ্যে একটা অসম্ভব সুন্দর চিকনকারি লম্বা আনারকলি কুর্তি ও সাথে সাদা ওড়না। আর সেগুলোর সাথে ম্যাচিং করা জুতো আর জুয়েলারি আছে। তানভীর সেগুলো ভীষণ পছন্দ হল। জামাটা ব্যাগ থেকে বের করতেই জামার মধ্যে থাকা একটা কাগজের টুকরো তানভীর পায়ের কাছে পড়ল। তানভী কপাল কুঁচকে জামাটা সযত্নে বিছানায় রেখে কাগজের টুকরো টা তুলে নিল। তারপর সেটা খুলে দেখল। তাতে লেখা ছিল
“এই সাদা রঙে তোমায় যখন শরতের সন্ধ্যায় দেখব, আমার পূজা তখনই সার্থক হবে।”
এই সাদামাটা কাগজের টুকরোটি তখন কেবল একখণ্ড চিঠি রইল না; তা হয়ে উঠল হৃদয়ের গহীনে জমানো একরাশ মৌন ব্যাকুলতার জীবন্ত দলিল।

কোচিং যাওয়ার পথে চেনা গলিটা হঠাৎ-ই সমগ্ৰর কাছে অচেনা হয়ে গেল। এক পলক অন্ধকার, তারপর সব স্তব্ধ। এখন এক বদ্ধ ঘরের গুমোট অন্ধকারে সমগ্ৰ বন্দি। চোখের ওপর কালো কাপড়ের বাঁধন যেন এক অন্তহীন রাত, যেখানে আলোর কণাটুকুও প্রবেশের অনুমতি পায়নি।
শক্ত দড়িতে বাঁধা হাত-পা; চামড়ায় বিঁধছে রুক্ষতা। মুখ বাঁধা থাকায় তার আর্তনাদ কেবল বুকের পাঁজরে আছড়ে পড়ছে। সে জানেনা কার ইশারায় এই বন্দিদশা, দেখেনি কোনো মুখ। শুধু নাকে আসছে ভ্যাপসা ধুলো আর নাম না জানা ভয়ের ঘ্রাণ। প্রতিটি মুহূর্ত সেখানে কাঁপছে অনিশ্চয়তায়, আর নৈঃশব্দ্য যেন অশরীরী দাপটে তার চারপাশ ঘিরে ধরেছে।

এরমধ্যেই সে শুনতে পেল কয়েক জন পুরুষের কন্ঠস্বর। তারা সবাই ওই রুমের মধ্যে প্রবেশ করে সমগ্ৰর চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, সমগ্ৰ সেটা ভালো মতো বুঝতে পারছে। তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে সমগ্ৰর মুখের বাঁধনটা খুলে দিল। সমগ্ৰ তখন কম্পিত কন্ঠে কাকুতির স্বরে তাদের কে বলল
-“আ… আপনারা কারা? আমাকে… আমাকে এখানে কেন এনেছেন? প্লিজ ছেড়ে দিন!! আমি বাড়ি যাব। আমার মা আমার জন্য চিন্তা করছে।”
উপস্থিত সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তারপর একজন রাগান্বিত গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“কাজটা করার আগে মনে ছিল না!!? যে মা চিন্তা করবে?”
লোকটির কথাটা সমগ্ৰ বুঝতে পারল না। তাই সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল

-“কী কাজ করছি আমি?”
সমগ্ৰর প্রশ্নে রেগে গিয়ে তাদের মধ্যে থাকা আরেক জন লোক সমগ্ৰ কে থাপ্পড় মারতে গেলে আগের লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে
-“স্যারের অর্ডার আছে, বাচ্চা ছেলে ওর গায়ে যেন হাত না তোলা হয়।”
তারপর সমগ্র কে রাগান্বিত কন্ঠে জবাব দিলো
-“সকালে মেয়েটিকে প্রপোজ করেছিলে কেন ?”
সমগ্র ক্রন্দনরত কন্ঠে জবাব দিল
-“বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছা করে করে নি। প্রথম দিন যখন তানভী আমাদের স্কুলে আসে তখন আমার বন্ধুরা আমাকে এটা করার ডেয়ার দিয়েছিল। আর আমি শুধু সেটাই পূরণ করেছি।”

-“তোমার কথা কি করে বিশ্বাস করব? যে তুমি সত্যি বলছো”
-“আপনারা আমার স্কুলে আমার বন্ধুদের বা ক্লাসে সবার থেকে খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমি স্কুলের ডেয়ার পূরণ করার জন্যই ফেমাস।”
লোকটি আর কিছু বলল না পকেট থেকে ফোন বার করে কাউকে কল করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই কল কেটে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল
-“এই এটাকে যেখান থেকে তুলে এনেছিস সেখানে দিয়ে আয়।”

কলকাতার এক আভিজাত্যমাখা বিলাসবহুল অট্টালিকা। বাইরের আকাশটা তখনো কালচে নীল, কিন্তু গঙ্গার দিক থেকে আসা এক চিলতে ঠান্ডা বাতাস জানান দিচ্ছে দেবীপক্ষের আগমন। সপ্তদশী তার শ্বেতপাথরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। তার হাতে ধরা দামি স্মার্টফোন, যাতে হেডফোনের মাধ্যমে বেজে চলেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই অমোঘ কণ্ঠস্বর— ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে…’।
নিচে নিস্তব্ধ তিলোত্তমা শহর, অথচ তার অন্তরে তখন মহিষাসুরমর্দিনীর দামামা। আধুনিক সাজসজ্জার মাঝেও তার পরনের সুতির কুর্তি আর এলোমেলো চুলে এক স্নিগ্ধ বাঙালি আনা। একদিকে শহরের আকাশছোঁয়া দালান আর অন্যদিকে ঐতিহ্যের সুর— এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মেয়েটি যেন এক আধুনিক উমা। ভোরের প্রথম আলো যখন তার চোখেমুখে পড়ে, তখন সেই বিলাসবহুল আভিজাত্য ছাপিয়ে ফুটে ওঠে এক পবিত্র ভক্তির মাধুর্য।
তানভী মনে মনে অনুভব করে পুজোর আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। নতুন নতুন জামা আর ঢাকের বাদ্যির আগাম প্রতিধ্বনি তার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। এই ভোর তাকে মনে করিয়ে দেয়—অঞ্জলির স্নিগ্ধতা, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আড্ডা। সপ্তদশীর স্বপ্নে এখন কেবলই নীল আকাশ আর মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষা।

শরতের কাঞ্চন রোদে মাখা এক আলস্যমাখা দুপুর। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের চণ্ডীপাঠে যে উৎসবের সুর বেজেছিল, তা এখন তানভীর চোখে গভীর তন্দ্রা হয়ে নেমেছে। মধ্যাহ্নভোজ সেরে সে আর তার পোষ্য তার বিলাসবহুল শয়নকক্ষের নরম বিছানায় গভীর ঘুমে মগ্ন।
ঘরের ভারি সিল্কের পর্দার আড়াল চিরে আসা এক ফালি সোনালী রোদ তার শান্ত ললাটে এসে পড়েছে। চারপাশে আভিজাত্যের নিঃশব্দ ছোঁয়া। নরম গালিচা আর শ্বেতপাথরের ফুলদানিতে সাজানো শুভ্র রজনীগন্ধা। সিলিং ফ্যানের ধীর ঘূর্ণনে তার অবাধ্য অলকগুচ্ছ কপালে মৃদু দোলা দিচ্ছে। জানলার ওপারে নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘেরা বয়ে চলছে, আর ঘরের ভেতর সে যেন এক আগত উৎসবের মায়াবী রাজকন্যা। তার নিশ্চিন্ত এই ঘুমে মিশে আছে কৈশোরের নির্মল স্বপ্ন আর পুজোর গন্ধ।

জানলার সিল্কের পর্দা সরিয়ে এক চিলতে কনেদেখা আলো ঘরে আসতেই সপ্তদশীর তন্দ্রা টুটল। মহালয়ার সেই মায়াবী দুপুরের ঘুম শেষে সে যখন চোখ মেলল, ঘরের আভিজাত্য তখন গোধূলির মায়ায় আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। আলস্য ভেঙে সে উঠে দাঁড়াল। জানলার ওপারে তখন পেঁজা তুলোর মতো মেঘেরা সিঁদুর রঙে সেজেছে, আর দূরে কোথাও বেজে উঠছে শঙ্খধ্বনি—আগমনীর বার্তা নিয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে সে যেন এক নতুন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করল।
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা সুন্দর জামাটির ওপর তার চোখ স্থির হলো। গতকালের উপহার—সেই অপরূপ পোশাকটি যেন গোধূলির আলোয় হিরের মতো ঝিলমিলিয়ে উঠল। তানভী মনে মনে ভাবল
“আর্ভিক ভাই আমাকে পূজাতে জামা গিফট করলো। তাছাড়া উনি আমাকে সব সময় কিছু না কিছু গিফট করছেন। আমরাও উচিত ওনাকে কিছু দেওয়া। কিন্তু আমি কি দেবো!?”

কিছুক্ষণ ঠোঁট বেঁকিয়ে কিছু একটা ভাবল তারপর নিজের পড়ার টেবিলে থাকা সব ড্রয়িং মেটিরিয়াল গুলো নিয়ে বসে পড়ল। তানভী আগাগোড়াই ভালো ছবি আঁকে। সে অনেকের পোর্ট্রেট ও বানিয়েছে। তাই সে ভাবলো গিফট হিসাবে আর্ভিক ভাইকে একটা পোর্ট্রেট বানিয়ে দেবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ফেসবুক থেকে আর্ভিকের একটা ছবি বার করে আঁকা শুরু করে দিল।
প্রায় পাঁচ ঘন্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ছবিটা পুরোপুরি আঁকা শেষ হলো। তখন প্রায় সন্ধ্যে ৭টা বাজে। তানভী পোট্রেট টাকে সযত্নে পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দিল।

মাঝখানে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। তানভী স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির সদর দরজার সামনে আসতেই গোল্ডি ছুটে ছুটে তার কাছে এল। তানভী গোল্ডিকে কিছুক্ষণ আদর করল, তারপর ভেতরে ঢুকল। গোল্ডিও তার পিছনে পিছনে এল। ফুরফুরে মেজাজে ভেতরে এলেও এখন সোফায় বসে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখে তানভীর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
-“বোকার মতো তাকিয়ে না থেকে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হো।”
ব্যক্তিটির গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে তানভীর হুঁশ ফিরল। সে নিজেকে স্বাভাবিক করে বিস্মিত কন্ঠে বলল
-“আর্ভিক ভাই আপনি! আপনার তো আরও একসপ্তাহ পর আসার কথা ছিল।”
আর্ভিক এতক্ষণ ফোন স্ক্রোল করছিল। তানভী বলা কথাটা শুনে ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তানভীর দিকে সূক্ষ্ম নয়নে তাকাল। তারপর কন্ঠস্বর তিনগুণ ভারী করে বলল
-“কেন? আগে এসেছি বলে কি তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে!?”
আর্ভিকের কথা শুনে তানভী তব্দা খেয়ে যায়। তারপর না সূচক মাথা নাড়াল। ততক্ষণে রাখী রায়চৌধুরী এসে বললেন

-“গুল্লু দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আয়। সিনু আর তোকে খেতে দিয়ে আমার কাজ আছে।”
বড়মার কথা শুনে তানভী দ্রুত রুমে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল। রাখী রায়চৌধুরী আর্ভিক আর তানভীর খাবার বেড়ে দিলেন। আর্ভিক নির্বাক হয়ে খাচ্ছে। তানভী ভয়ে ভয়ে খাবার খাচ্ছে কিন্তু দৃষ্টি তার আর্ভিকের উপর। আর্ভিক তানভীর দিকে না তাকিয়েই কিছুটা ঠাট্টার স্বরে বলল
-“এখন তাহলে সবজিতেও কাঁটা পাওয়া যাচ্ছে।”
তানভী কিছুই বুঝল না। বোকার মত চেয়ে আছে আর্ভিকের দিকে। আর্ভিক নিজের প্লেট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তানভীর দিকে তাকাল। তারপর তানভীর হাতের দিকে ইশারা করল। তানভী আর্ভিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল, সে এতক্ষণ ধরে মাছের বদলে আলু থেকে কাঁটা ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে। তানভী চমকে উঠে। তারপর মনে মনে ভাবল

“আর্ভিক ভাই ঠিকই বলেন, আমি আসলেই একটা গাধা।”
তানভীর ভাবনার মাঝে আর্ভিক এক বালতি জল ঢেলে দিল। সে খাওয়া শেষ করে গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“আজকে কোচিং যাওয়ার দরকার নেই। খাওয়া শেষ করে আমার রুমে আসবি, একটা এক্সাম নেব। দেখি এই একমাসে
পড়াশোনা করেছিস নাকি গায়ে শুধু হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেছিস।”
এক্সামের কথা শুনে তানভীর খাবার গলায় আটকে গেছে। আর্ভিক তার দিকে একগ্লাস জল এগিয়ে দিয়ে টেবিল ছেড়ে হাত ধুতে উঠে গেল। আর যাওয়ার আগে বলে গেল
-“You have only 20 minutes. তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে আমার রুমে আয়।”

তানভী দ্রুত খাওয়া শেষ করে বই খাতা নিয়ে আর্ভিকের রুমে চলে গেল। তাড়াহুড়োর কারণে সে নিজের রুমের দরজা লক করতে ভুলে যায়। আর্ভিকের রুমে এসে আস্তে করে দরজা ঠেলে বলল
-“আর্ভিক ভাই আসব ?”
আর্ভিক বিছানায় বসে ফোন স্ক্রোল করছিল, তানভী কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তানভী ভিতরে এসে বিছানায় বসল। আর্ভিক ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“আমার রুমে আসার জন্য পারমিশন নিতে হবে না। আর এই নে কোশ্চেন পেপার।”
আর্ভিক তানভীর দিকে কোশ্চেন পেপার এগিয়ে দিতে দিতে বলল
-“Only 20 minutes. Time start now.”

তানভী কোশ্চেন পেপারের দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে ১০ টা বড়ো বড়ো অঙ্ক আছে। তানভী আর্ভিক কে বলল
-“আর্ভিক ভাই ২০ মিনিট একটু বেশি হয়ে গেল না। এত বড়ো বড়ো অঙ্ক গুলোর জন্য”
আর্ভিক তানভীর দিকে শীতল সূক্ষ নয়নে তাকিয়ে কন্ঠস্বর তিনগুণ ভারী করে বলল
-“Then Ok. Only 10 minutes”
তানভী পুরো তব্দা খেয়ে যায়। সে কি বলতে চাইল আর কি হল! তারপর সে করুন কন্ঠে আর্ভিককে বলে
-” আর্ভিক ভা…”
তানভীর কথার শেষ করার আগেই আর্ভিক বলে উঠল
-“সময়ের মধ্যে সব অঙ্ক শেষ না হলে, কানের নীচে দুটো থাপ্পর দেব।”
তানভী বাকি কথাটা গিলে ফেলে চুপচাপ অঙ্ক গুলো করতে লাগল। ঠিক ১০ মিনিট পর আর্ভিক তানভী কে বলল
-“Time up.”

কথাটা বলার সাথে সাথেই একপ্রকার খাতাটা ছিঁনিয়ে নেয় তানভীর থেকে। সময় কম থাকার জন্য তানভী সব গুলো অঙ্ক করে উঠতে পারে নি। অসম্পূর্ণ অঙ্ক দেখে আর্ভিক রাগান্বিত কন্ঠে তানভীকে বলল
-“হাতে কোনো স্পিড নেই! পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নৌকা চালা। তাহলে হাতের স্পিড বাড়বে। ইচ্ছা করছে তুলে এক আছাড় দেই।”
তানভী অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে আর্ভিকের দিকে। আর্ভিক তার হাতে থাকা খাতাটা তানভীর সামনে জোরে শব্দ করে রেখে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল
-“চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যা ইডিয়েট!”

তানভী ছলছল নয়নে গুটি গুটি পায়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। তারপর সে নিজের রুমে এল। রুমে ঢুকে সে দেখল, গোল্ডি খেলার ছলে ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলেছে তার সেই আর্ভিক ভাইয়ের জন্য আঁকা পোট্রেটটি। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাগজের অবশিষ্টাংশগুলো যেন সপ্তদশীর ভেঙে যাওয়া হৃদয়েরই প্রতিচ্ছবি। বিষণ্ণ চোখে সে তাকিয়ে থাকে; যেখানে ছিল শৈল্পিক সুষমা, সেখানে এখন শুধু শূন্যতা।
এক বুক কষ্ট আর চোখের কোণে জমে থাকা জল নিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক নিমিষেই একটি সৃষ্টির মৃত্যু আর একরাশ আবেগের অপমৃত্যু ঘটল তার চোখের সামনে। কয়েক ঘন্টার নিরলস পরিশ্রম আর আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় সে প্রাণ দান করেছিল এক মানবকে। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে মুহূর্তেই সব ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
তানভী কাগজের টুকরো গুলোর কাছে গিয়ে বসে পড়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তানভীর চিৎকার শুনে আর্ভিক দৌড়ে এল তানভীর রুমে। আর্ভিক দরজার সামনে এসে দেখে তানভী ফ্লোরে বসে অঝোরে কান্না করছে। তানভীর কান্না যেন আর্ভিকের বুকে কাঁটা মতো বিঁধছে। আর্ভিক আস্তে আস্তে তানভীর কাছে গিয়ে পিছন থেকে ব্যথিত কন্ঠে বলল

-“তানভী কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন!?”
তানভীর কান্নার মাত্রা দ্বিগুণ হল। আর্ভিক আহত কন্ঠে আবার বলল
-“কি হল বল!”
তানভী পিছন ঘুরে আর্ভিকের দিকে তাকাল তারপর সামনে ফ্লোরের দিকে তাকাল। আর্ভিক তানভীর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল, তানভীর আঁকা আর্ভিকের পোট্রেটটি ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে ফ্লোরে, আর গোল্ডি সেটার সামনে মাথা নিচু করে শুয়ে আছে। আর্ভিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তানভী কে নিজের দিকে ফিরিয়ে কোমল কন্ঠে বলল
-“এটার জন্য কাঁদছিস!! আবার বানিয়ে নেব। আমি শুনেছি তুই খুব ভালো ছবি আঁকিস, আর এবার আমিও তোকে হেল্প করব।”
আর্ভিক এসব কথা বলতে বলতে তানভীর চোখ মুছিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর বলল
-“আর কান্না করিস না। আমার রুমে চল তোর জন্য একটা জিনিস আছে।”
তারপর আর্ভিক তানভীকে বসা থেকে তুলে, তার রুমে যেতে বলল। তানভী বের হয়ে গেলে, আর্ভিক ফ্লোরে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন ছবিটার দিকে তাকালো, তারপর গোল্ডির কাছে গিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“খুব দুষ্টু হয়েছিস। তোর জন্য আমার তানভী চোখের জল ফেলল, পরের বার থেকে এরকম দুষ্টুমি যেন আর না হয়।”

গোল্ডি আর্ভিকের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন সে সম্মতি জানাচ্ছে যে সে এরকম দুষ্টুমি আর করবে না।
এদিকে আর্ভিকের রুমে বিছানার একপাশে বসে আছে তানভী। কিছুক্ষণ পর আর্ভিক রুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। ভিতরে এসে টেবিলের ড্রয়ার খুলে কিছু একটা রেখে দিল। তারপর তানভীর দিকে এক বাক্স চকলেট এগিয়ে দিল। চকলেট পেয়ে তানভীর সব দুঃখ যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। সে বাক্সের মধ্যে থেকে একটা চকলেট বের করে খেতে শুরু করল। আর্ভিক তা দেখে নিঃশব্দে হেসে, গিটারটা নিয়ে বিছানার মাঝামাঝি বসল। তারপর তানভীর দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল

-“কি স্বার্থপর মেয়ে রে তুই! একটা বার জিজ্ঞাসাও করলি না যে চকলেট খাব কিনা। আজ একটা চকলেট দেওয়ার মানুষ নেই বলে…”
আর্ভিকের কথার মাঝে তানভী তার হাতে থাকা চকলেটটা আর্ভিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
-“আপনি খাবেন?”
আর্ভিক কিছু না বলে চুপচাপ তানভীর হাত থেকে চকলেটটা পুরোটা খেয়ে নিল। তানভী আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে উদাস কন্ঠে বলল
-“সবটা খেয়ে নিলেন।”
তানভীর চকলেট অনেক প্রিয়। তার সব পছন্দের জিনিস একদিকে আর চকলেট একদিকে। তানভীর পছন্দের চকলেটের মধ্যে কিটক্যাট,মাঞ্চ,পার্ক সবচেয়ে প্রিয়।
আর্ভিক সহসা জবাব দিল

-“এক বাক্স চকলেট দিয়েছি, ওখানে আরও আছে। ওগুলো শেষ কর। প্রয়োজনে আরো এনে দেব।”
আর্ভিকের কথায় তানভী অনেক খুশি হয়। তারপর আবার চকলেট খাওয়া শুরু করে। আর্ভিক তানভীর দিকে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে আছে। তারপর গিটারে টুং টাং শব্দ করে গাইতে শুরু করে
“এভাবেই দিন রাত ঢলে যাক
মন আমার বার বার বলে যাক,
ভালোবেসে কোনো ভুল করিনি আমি,
ভালোবেসে কোনো ভুল করিনি আমি।।”

অক্টোবরের হিমেল সন্ধ্যায় আকাশের কোণে তখন ম্লান জ্যোৎস্নার আভা। আর্ভিক তার গিটারে সুর তুলেছে, যাতে মিশে আছে হৃদয়ের সবটুকু আকুতি। তার প্রতিটি আঙুলের ছোঁয়ায় ঝরে পড়ছে তার সপ্তদশী রূপসীর প্রতি গভীর অনুরাগ। সুরের মায়াজালে সে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করতে চেয়েছে, যেখানে কেবল তারা দুজন আর ভালোবাসার গুঞ্জন থাকবে।
কিন্তু সপ্তদশী সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার চঞ্চল মন মজেছে চকলেটের স্বাদে। আর্ভিকের সুরের মূর্ছনা যখন তাকে ছুঁতে ব্যাকুল, কিশোরী তখন আপন মনে চকলেটের মোড়ক খুলতে আর তার মিষ্টি স্বাদে ডুবে থাকতেই বেশি ব্যস্ত। একদিকে হৃদয়ের সুর, আর অন্যদিকে শৈশবমাখা তৃপ্তি, একই সন্ধ্যায় দুই বিপরীতধর্মী অনুরাগের কী এক অদ্ভুত মেলবন্ধন!

কেটে গেছে আরো একটা দিন। সকাল বেলা আর্ভিক ঘুম থেকে উঠে রুম থেকে চেঁচিয়ে তার মা কে বলল
-“মা, এক কাপ গরম কফি পাঠাও তো।”
রাখী রায়চৌধুরী সকালের ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিলেন ছেলের কথা শুনে তার জন্য কফি বানাতে লাগলেন। তানভী সবে মাত্র স্কুলের জন্য রেডি হয়ে নিচে নেমেছে, তাকে দেখে রাখী রায়চৌধুরী বললেন
-“গুল্লু একটু এদিকে আয়”
তানভী বেশ ফুরফুরে মেজাজে ওনার কাছে গেল। তানভী যেতেই তিনি তার হাতে এক কাপ গরম কফি ধরিয়ে দিয়ে বললেন

-“সোনা আমার, এটা একটু সিনু ভাইয়া কে দিয়ে আয়। আমার এদিকে গ্যাসে তরকারি বসানো আছে।”
এই বলে তিনি নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন। তানভীর কি আর করার সে কিছুক্ষণ কাপটার দিকে তাকিয়ে, আর্ভিকের রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়াল।
আর্ভিকের রুমের দরজা চাপানো ছিল। তানভী দরজা নক না করে সরাসরি খুলে ভিতরে প্রবেশ করে, প্রবেশ করার সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ে। রুমের ভিতরে আর্ভিক কাবাডের সামনে এলো শরীরে দাঁড়িয়ে কোন শার্ট পড়বে সেটা দেখছে। তার কোমরে শুধু একটা টাওয়াল জড়ানো। আর্ভিকের উদোম পিঠে বিন্দু বিন্দু জলের কনা দৃশ্যমান। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে সবে মাত্র শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে।
তানভী সামনে না তাকিয়েই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৭+২৮

-“আ…আপনার ক..কফি।”
তানভীর কথায় আর্ভিক পেছনে ঘুরে দেখে বলল
-“হুমম, টেবিলে রাখ”
তানভী গুটি গুটি পায়ে গিয়ে কফিটা টেবিলে রাখল। তখনই তার চোখ গেল আর্ভিকের দেওয়ালের দিকে, তানভীর আঁকা পোট্রেট টাকে ট্রান্সপারেন্ট টেপ দিয়ে জোড়া লাগিয়ে ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙানো আছে সেখানে। তানভী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে, আর আনমনে হাসছে।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩১+৩২