ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৮
তানিশা ভট্টাচার্য্য
দিনগুলো যেন ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে বহু প্রতীক্ষিত এবং কাঙ্ক্ষিত ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার দিন দোরগোড়ায়। গত কয়েকটা মাস তানভীর জীবনের ওপর দিয়ে একটা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। বিয়ের আনন্দ, নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া-সবকিছুর মাঝেও একটা জিনিস স্থির ছিল, তা হলো তার লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যকে আগলে রেখেছিল একজন মানুষ, আর্ভিক।
রাত তখন আড়াইটে। সারা চৌধুরী নিবাস নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। শুধু আর্ভিকের রুমের জানলা দিয়ে এক ফালি আলো বাইরের অন্ধকারে উঁকি দিচ্ছে। টেবিলের ওপর বইয়ের স্তূপ, ল্যাপটপ আর একগাদা নোটস। তানভী দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছে। ইন্ডিয়ান ইকোনমির একটা জটিল থিওরি কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। ক্লান্তিতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে তার।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দে তানভী চমকে উঠল। আর্ভিক হাতে একটা ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। ট্রে-তে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর বিস্কুট। আর্ভিক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কফির কাপটা তানভীর সামনে নামিয়ে রাখল। তানভী আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে শুকনো হেসে বলল
-“আপনি আবার কেন উঠলেন? আপনার কাল সকালে অফিস আছে না?”
আর্ভিক তানভীর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে পরম মমতায় ওর কাঁধে হাত রাখল। মৃদু চাপে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করে বলল
-“আমার অফিস আছে জানি, কিন্তু আমার রানীর যে আগামী পরশু পরীক্ষা! আর এই সময়টুকু পাশে না থাকলে আমি কেমন জীবনসঙ্গী হলাম বল তো? কফিটা খাও, জেসমিন টি মিশিয়েছি, মাথাটা হালকা লাগবে।”
তানভী কফিতে চুমুক দিতে দিতে দেখল, আর্ভিক ওর অগোছালো নোটসগুলো গুছিয়ে রাখছে। গত তিন মাস ধরে এটাই আর্ভিকের রুটিন। তানভী পড়তে বসলে আর্ভিক কখনও কফি বানিয়ে আনে, কখনও মাঝরাতে খিদে পেলে নিজের হাতে খাবার বানিয়ে খাওয়ায়। এমনকি তানভীর পড়ার সময় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য বাড়ির বাইরে সে যেন এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তানভী হঠাৎ বইটা বন্ধ করে বলল
-“আমার খুব ভয় করছে আর্ভিক। যদি না পারি? সবার কত আশা। আর আপনি তো আমার পেছনে নিজের সময়, ঘুম সব বিসর্জন দিচ্ছেন।”
আর্ভিক তানভীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তানভীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল
-“তানভী, সাকসেস মানে শুধু ওই আইএএস তকমাটা নয়। সাকসেস হলো এই যে লড়াইটা তুমি করছ, এই যে হার না মানা মানসিকতা। তুমি তোমার সেরাটা দেবে, বাকিটা মহাদেব দেখবেন। আর তুমি যদি না পারো, তাহলেও তুমি আমার সেই একই তানভী থাকবে। কিন্তু আমি জানি তুমি ঠিক পারবে। তাছাড়া আমার ভালোবাসা তোমার রেজাল্টের ওপর নির্ভর করে না।”
আর্ভিকের এই কথাগুলো তানভীর মনে জমানো সব দুশ্চিন্তার মেঘ এক নিমেষে কাটিয়ে দিল। সে আবেগে আর্ভিককে জড়িয়ে ধরল।
পরদিন সকালে চৌধুরী নিবাসে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। রাখী রায়চৌধুরী তানভীকে পড়ার টেবিল থেকে উঠতেই দিচ্ছেন না। এমনকি তানভীর খাবার পর্যন্ত তার রুমে দেওয়া হয়েছে। তৃষাণ ফোন করে তার দিভাইকে মনোবল দিচ্ছে। আর আর্ভিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তানভীর অ্যাডমিট কার্ড, পেন, আইডি কার্ড সব ফাইলবন্দি করছে। পরীক্ষার আগের দিন রাতে আর্ভিক জোর করে তানভীর বইগুলো আলমারিতে তুলে দিয়ে বলল
-“আজ এখন আর কোনো পড়া নয়। এখন শুধু বিশ্রাম আর ঘুম। মাথা ঠান্ডা না থাকলে কাল কলম চলবে না।”
তানভী শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, বিয়ের আগে সে ভাবত বিয়ে মানে বোধহয় পড়াশোনার ইতি। কিন্তু আর্ভিক প্রমাণ করে দিয়েছে, সঠিক মানুষ পাশে থাকলে স্বপ্নগুলো ডানা মেলার জন্য আরও বেশি আকাশ পায়।
পরীক্ষার দিন সকালে আর্ভিক নিজে গাড়ি চালিয়ে তানভীকে সেন্টারে নিয়ে এল। গাড়ি থেকে নামার আগে আর্ভিক তানভীর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল
-“অল দ্য বেস্ট, অফিসার! মনে রাখবে, এই লড়াইয়ে তুমি একা নোও, তোমার পাশে তোমার আর্ভিক সবসময় আছে।”
তানভী পরীক্ষার হলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, তার মধ্যে কোনো ভয় নেই। তার চোখে আছে জেদ আর মনে আছে সেই মানুষটার বিশ্বাস, যে তাকে নিজের চেয়েও বেশি চিনেছে। সেন্টার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আর্ভিক এক মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল। ভালোবাসার এর চেয়ে সুন্দর রূপ আর কী হতে পারে?
পরীক্ষার হলের নিস্তব্ধতা আর ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ পেছনে ফেলে তানভী সেন্টারের গেট দিয়ে বাইরে বেরোলো, তার মনে হচ্ছে এক বিশাল হিমালয় পর্বত সে আজ ডিঙিয়ে এসেছে। কপালে হালকা ঘামের বিন্দু, হাতে নীল কালির দাগ আর চোখে একরাশ ক্লান্তি থাকলেও মনের এক কোণে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে। গেটের বাইরে ভিড়ের মাঝেও তার চোখ দুটো একজনকে ঠিক খুঁজে নিল। সেই পরিচিত নীল রঙের শার্ট, চোখে রোদচশমা, আর ঠোঁটের কোণে চিরচেনা সেই মায়াবী হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্ভিক।
তানভী কাছে আসতেই আর্ভিক কোনো কথা না বলে ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। ভিড় কাটিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আর্ভিক একবারও জানতে চাইল না পরীক্ষা কেমন হয়েছে। সে জানে, এই মুহূর্তে তানভীর মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের বিরামহীন লড়াইয়ের পর একটু বিরাম প্রয়োজন। গাড়িতে ওঠার পর এসি-র ঠান্ডা হাওয়ায় তানভী যেন প্রাণ ফিরে পেল। আর্ভিক ড্রাইভ করতে করতে আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল
-“খুব ক্লান্ত লাগছে? সিটটা হেলিয়ে দিয়ে একটু চোখ বোজো, বাড়ি পৌঁছাতে মিনিট কুড়ি লাগবে।”
তানভী জানলার বাইরে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল। গাড়ি চৌধুরী নিবাসের গেটে থামল, তানভী বাড়ির ভেতর ঢুকতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর মায়া তানভীকে ঘিরে ধরল। আর্ভিক তানভীর ঘাড়ের ওপর হাত রেখে পরম মমতায় ওকে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। রুমে ঢুকে আর্ভিক বলল
-“শোনো, আগে ফ্রেশ হয়ে নাও, তারপর লাঞ্চ করে একটা লম্বা ঘুম দেবে। এতদিন ধরে তোমার ওপর দিয়ে অনেক শারীরিক আর মানসিক ধকল গেছে!”
আর্ভিকের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য তানভীর নেই। স্নান সেরে আসার পর আর্ভিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওকে পেট ভরে খাওয়াল। খাওয়ার পর বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই যেন রাজ্যের ঘুম তানভীর চোখের পাতায় নেমে এল। পাশে বসে আর্ভিক আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল
-“ঘুমিয়ে পড়ো।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে তানভীর ঘুমটা ভাঙল। জানলার পর্দা সরিয়ে দেখল বাইরের আকাশটা তখন সিঁদুরে রঙে সেজেছে, গোধূলির আলোটা ফিকে হয়ে আসছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে চমকে উঠল, ছ’টা বেজে দশ! ইশ, সে এতক্ষণ ঘুমিয়েছে! দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে নিজেকে কিছুটা সতেজ করে নিল সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা দেখে মনে হলো, আজ যেন সেই কয়েকমাসের একটা কালো মেঘ কেটে গেছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুম থেকে খবরের চ্যানেলের শব্দ ভেসে এল। তানভী দেখল অভিক সাহেব সোফায় বসে একাগ্র মনে টিভি দেখছেন। পাশেই ঋষি অফিস থেকে ফিরে ল্যাপটপ কোলে বসে কাজ করছে। তানভী ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। রান্নাঘরের সামনে যেতেই তার কানে এল একটা গুনগুন সুর। রাখী রায়চৌধুরী মনের আনন্দে রান্না করছেন। তানভী ভেতরে ঢুকে হালকা গলায় ডাকল
-“বড়মা, কী করছো? আর আমায় কেন ডাকলে না?”
রাখী রায়চৌধুরী কাজ থামিয়ে ঘুরে তাকালেন। তানভীর উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি স্নিগ্ধ হাসলেন। তারপর একটু কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন
-“এখনও বড়মা? ওই তকমাটা কি আর বদলানো যাবে না? এখনও কী তোর মা হয়ে উঠতে পারি নি?”
তানভী থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই একরাশ লজ্জা আর ভালোবাসা নিয়ে জিভ কেটে বলল
-“আচ্ছা আচ্ছা…ঠিক আছে। মা, আমি কি একটু সাহায্য করব?”
রাখী রায়চৌধুরী এগিয়ে এসে তানভীর কপালে একটা চুমু খেলেন। পরম মমতায় বললেন,
-“না রে মা। কিছু করতে হবে না।”
তানভী তবুও বলল
-“মা তুমি তো পকোড়া ভাজছো আমি তাহলে বাবা আর তোমার জন্য চা আর আমাদের জন্য কফি বানাই?”
রাখী রায়চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন
-“আচ্ছা বেশ!”
কিছুক্ষণ পর ড্রয়িংরুমের আড্ডাটা বেশ জমে উঠল। ট্রে সাজিয়ে ধোঁয়া ওঠা চা-কফি আর গরম গরম পকোড়া নিয়ে এল তানভী আর রাখী রায়চৌধুরী। ঠিক সেই সময় আর্ভিকও নিচে নেমে এল। আর্ভিক সোফায় বসতেই তানভী কফির কাপটা আর্ভিকের দিকে বাড়িয়ে দিল। আর্ভিক কাপটা নেওয়ার সময় তানভীর আঙুলগুলো একবার আলতো করে ছুঁয়ে দিল। সেই স্পর্শে যেন রাজ্যের নিরাপত্তা মিশে ছিল।
অভিক সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন
-“আজকের চা টা তো জবরদস্ত হয়েছে মামনি! মনে হচ্ছে সব ক্লান্তি ধুয়ে গেল।”
ঋষি হাসতে হাসতে বলল
-“বোনু তোর এই হাতের কফির কিন্তু কোনো তুলনা নেই!”
আর্ভিক শুধু তানভীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, যে হাসির মানে কেবল তানভীই বোঝে। খাওয়া-দাওয়ার পর রাতের খাবারের তোড়জোড় শুরু হলো। তানভী আবার রান্নাঘরে যেতে চাইল রাখী রায়চৌধুরী কে সাহায্য করতে। কিন্তু তিনি এবার বেশ কড়া সুরে বলে দিলেন
-“গুল্লু, আমি থাকতে তোকে এখন রান্নাঘরে আসতে হবে না। রান্না করার অনেক সময় আছে। আর যতদিন আমি বেঁচে আছি, তোকে এ বাড়ির হেসেল সামলাতে হবে না। যা, রুমে গিয়ে বিশ্রাম নে।”
তানভী তবুও জেদ ধরছিল, কিন্তু রাখী রায়চৌধুরী একপ্রকার জোর করেই ওকে রুমে পাঠিয়ে দিলেন। রুমে ঢুকে তানভী দেখল গত কয়েকদিনের পড়াশোনার চাপে পড়ার টেবিলটা একদম অগোছালো হয়ে আছে। নোটস, বই, খাতা সব এদিক-সেদিক ছড়িয়ে। সে স্থির করল আজ সব গুছিয়ে তবেই ছাড়বে। সে একে একে বইগুলো আলমারিতে সাজাতে লাগল। যে চ্যাপ্টারগুলো তাকে রাতে ঘুমোতে দেয়নি, যে ইকোনমিক থিওরিগুলো তাকে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল-আজ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মায়া লাগছে।
কাজ করতে করতে সে লক্ষ্যই করেনি আর্ভিক কখন ঘরে ঢুকেছে। আর্ভিক পেছন থেকে এসে তানভীর হাত থেকে একটা মোটা বই নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর ওর দুকাঁধে হাত রেখে আয়নার সামনে দাঁড় করাল।
-“সব গোছানো আজই শেষ করতে হবে নাকি? শরীরটাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও তানভী।”
তানভী আয়নায় আর্ভিকের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
-“জানেন আর্ভিক, আমি ভাবতাম বিয়ের পর হয়তো স্বপ্ন দেখাটাই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি আর সবাই যেভাবে আমায় আগলে রেখেছেন, তাতে আমার নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবো তো? আমি পারবো তো আপনাদের সকলের আশা পূরণ করতে?”
আর্ভিক তানভীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
-“পারতেই হবে এমন কোনো কথা নেই তানভী। তুমি যে লড়েছ, এটাই আমার সবচেয়ে বড় জয়।”
রাতের ডিনারটা হলো এক আনন্দঘন পরিবেশে। চৌধুরী নিবাসের প্রতিটা কোণে আজ যেন খুশির রোশনাই। রাতে যখন তানভী আর্ভিকের বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে গেল, তার মনে হলো, ইউপিএসসি পরীক্ষার ফলাফল যাই হোক না কেন, জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় সে অলরেডি পাস করে গেছে।
রাত তখন গভীর। বাইরের আকাশটা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই থমথমে হয়ে ছিল, হঠাৎই প্রকৃতির মৌনতা ভেঙে শুরু হলো ঝোড়ো হাওয়া। জানলার পাল্লায় বাতাসের ঝাপটা লাগতেই আর্ভিকের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। অভ্যাসবশত সে পাশে হাত রাখল, কিন্তু বিছানার সেই দিকটা শূন্য। শীতল।
আর্ভিকের বুকটা ধক করে উঠল। তানভী কোথায়? বিছানা ছেড়ে উঠে সে দেখল ঘরের বেলকনির দরজাটা খোলা, পর্দাগুলো বাতাসের তোড়ে উন্মত্তের মতো উড়ছে। কিন্তু সেখানেও তানভী নেই। হঠাৎ তার মনে হলো, বৃষ্টির গন্ধে তানভীর বরাবরই এক অদ্ভুত টান আছে। সে কি তবে ছাদে?
পায়ের পাতায় শব্দ না করে আর্ভিক ছাদের দিকে এগোল। ছাদের দরজার কাছে পৌঁছাতেই তার কানে এল এক অপূর্ব শব্দ, ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে সোনার নূপুরের রিনঝিন আওয়াজ। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আর্ভিক থমকে গেল।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তানভী। পরনে হালকা বেগুনি রঙের একটা পাতলা সিল্কের শাড়ি। বৃষ্টির জন্য শাড়িটা ওর গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর ভিজে এলিয়ে পড়েছে, আর কিছু অবাধ্য চুল বাতাসের দোলায় ওর মুখে আছড়ে পড়ছে। তানভী দুহাত বাড়িয়ে বৃষ্টিটাকে অনুভব করছে, তার ঠোঁটে এক স্বর্গীয় হাসি। আর্ভিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। নিজের মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল
-“আমার বৃষ্টিবিলাসী ময়ূরী!”
আর্ভিক ধীর পায়ে তানভীর দিকে এগিয়ে গেল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে তার পায়ের শব্দ তানভী শুনতে পায়নি। ঠিক যখন সে তানভীর একদম পেছনে, তানভী হঠাৎ কারো উপস্থিতি অনুভব করে পেছনে ফিরল। আর সাথে সাথেই ওর মাথাটা গিয়ে ঠেকল আর্ভিকের প্রশস্ত বুকে।
আচমকা ধাক্কায় তানভী ছিটকে যেতে নিলে আর্ভিক শক্ত হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। তখনই শুরু হলো মুশল ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টির ধারায় দুজনেই ভিজছে। তানভী লজ্জায় আর আবেশে চোখ বুজে ফেলল। আর্ভিক নিজের কপালটা তানভীর কপালে ঠেকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। পৃথিবীর সব কোলাহল যেন ওই মুহূর্তটুকুর কাছে থমকে গেছে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাদের দীর্ঘদিনের বিরহ আর অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে ঝরছে। হঠাৎ আর্ভিকের খেয়াল হলো তানভী থরথর করে কাঁপছে। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল
-“অনেক হয়েছে, এবার নিচে চলো। এই অসময়ের বৃষ্টিতে বেশিক্ষণ ভিজলে নির্ঘাত জ্বর আসবে।”
তানভী মুখ গোমরা করে আর্ভিকের হাত ধরে নিচে নেমে এল। ঘরে ঢোকার পর দেখা গেল তানভী পুরো ভিজে গেছে। আর্ভিক একটা তোয়ালে দিয়ে তানভীর মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বলল
-“তাড়াতাড়ি শাড়িটা বদলে নাও, নইলে ঠান্ডা বসে যাবে।”
তানভী একটু আড়চোখে আর্ভিককে দেখল। আর্ভিক নিঃশব্দে হাসছে। তানভী মুখ ফুলিয়ে বলল
-“আপনি একটা বেরসিক, আনরোমান্টিক লোক! একটু বৃষ্টি উপভোগ করতে দিলেন না।”
আর্ভিক কোনো কথা না বলে তানভীর খুব কাছে এগিয়ে এল। আর্ভিক চোখের মায়াবী দৃষ্টিতে তানভী যেন ডুবে যেতে লাগল। আর্ভিক আলতো করে তানভীর চিবুকটা স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলল
-“কী আমি বেরসিক? আনরোমান্টিক?”
আর্ভিককে এতটা সান্নিধ্যে দেখে তানভীর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। তানভী আমতা আমতা করে বলল
-“ক… কি করছেন আপনি? ছাড়ুন আমায়!”
সে আর্ভিককে আলতো ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে চাইল, কিন্তু আর্ভিক আজ ছাড়ার পাত্র নয়। সে তানভীর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর লয়ে গাইতে শুরু করল
“Kya Jaane Tu Mere Iraade…
Le Jaunga Saansein Chura Ke…
Dil Keh Raha Hai Gunehgaar Ban Ja…
Bada Chain Hai Inn Gunaahon Se Aage…
Main Gumshuda Si Raat Hun,
Meri Khushnuma Subah Tum Ho…”
গানের সুর আর আর্ভিকের চোখের সম্মোহনী দৃষ্টিতে তানভী যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর্ভিক ওর কোমর জাপ্টে ধরে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। তানভী বুঝতে পারল, আজ আর পালানোর পথ নেই। আর্ভিক তানভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে বলল
-“বলেছিলাম না তানভী, তোমার পরীক্ষাটা শেষ হতে দাও। সুদে-আসলে সব বুঝিয়ে দেব। আজ আর কোনো অজুহাত চলবে না।”
লজ্জায় তানভী মাথা নিচু করে নিল, ওর গাল দুটো তখন রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে। আর্ভিক তানভীর চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচিয়ে ধরল। তানভীর কাঁপাকাঁপা ঠোঁট আর কাজল ধোয়া চোখের দিকে তাকিয়ে আর্ভিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পরম আবেশে তানভীর ওষ্ঠাধর নিজের দখলে নিল।
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুই হৃদয়ের ব্যাকুলতা। দীর্ঘদিনের দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে আজ তারা একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর্ভিকের আদর আজ একটু বেশিই মত্ত, একটু বেশিই অধিকারবোধে ভরা। রাত যত বাড়তে লাগল, রুমের ভেতরের উষ্ণতা যেন বাইরের শীতল আমেজকে হার মানাতে লাগল।
কয়েক মাস পরের কথা।
চৌধুরী নিবাসের ড্রয়িংরুমে আজ লোকে লোকারণ্য। মিষ্টির প্যাকেট আর ফুলের তোড়ায় ভরে গেছে ঘর। টিভির পর্দায় তখন ফ্ল্যাশ নিউজে দেখা যাচ্ছে ইউপিএসসি-র রেজাল্ট।
তানভী আর্ভিকের পাশে গিয়ে বসল, আর্ভিকের চোখে তখন আনন্দাশ্রু। সে তানভীর মাথায় হাত রেখে বলল
-“অভিনন্দন, অফিসার তানভী রায়চৌধুরী!”
তানভী হাসল, কিন্তু সেই হাসির পেছনে ছিল এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। সে জানত, এই আইএএস (IAS) তকমাটা যতটা তার নিজের, তার চেয়ে অনেক বেশি এই মানুষটার, যে তাকে প্রতি রাতে কফি বানিয়ে দিয়েছে, যে তাকে প্রতিমুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে। আর্ভিক তাকে জড়িয়ে ধরে সবার সামনেই ঘোষণা করল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৭
-“আজ আমার বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে। আমার ব্লু-বার্ড আজ ডানা মেলে বিশাল আকাশে উড়ছে।”
ভালোবাসার এই পূর্ণতা দেখে রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেবের চোখেও জল। তানভী আর আর্ভিকের এই প্রণয়কাহিনি এক নতুন দিগন্ত ছুঁল। যে তানভী একদিন ভয়ে কুঁকড়ে থাকত, আজ সে আত্মবিশ্বাসের শিখরে। আর তার এই সাফল্যের স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রিয় মানুষটি।
