Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৯

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৯

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৯
তানিশা ভট্টাচার্য্য

পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকে চৌধুরী নিবাসের পরিবেশটাই যেন বদলে গেছে। একরাশ স্বস্তি, গর্ব আর বুকভরা আনন্দ নিয়ে প্রতিটি দিন কাটছে। তানভীর দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসল আজ তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে যে মানুষটি নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে ছিল, সে আর কেউ নয়, তার আর্ভিক। একজন প্রেমিক, একজন পথপ্রদর্শক, একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী আর সর্বোপরি একজন ভালো বন্ধু-সবকিছু মিশিয়েই তানভীর দিনগুলো এখন এক সোনালী রূপকথার মতো কেটে চলেছে।

মিষ্টি রোদের ওমে মাখা একটা সুন্দর সকাল। চৌধুরী নিবাসের ড্রয়িংরুমে হালকা আলোর রোশনাই। অভিক সাহেব সোফায় আয়েশ করে বসে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছেন। তাঁর একহাতে খবরের কাগজ, আর অন্যহাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। মাঝে মাঝেই চশমার ওপর দিয়ে বাইরের বাগানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তির শ্বাস নিচ্ছেন তিনি।
এদিকে রান্নাঘরে তখন মৃদু হাসাহাসি আর খুন্তি নাড়ার মিষ্টি আওয়াজ। রাখী রায়চৌধুরী দুপুরের রান্নার তোড়জোড় করছেন। তানভী কিন্তু আজ আর শুধু দর্শকের ভূমিকায় নেই। সে সুতির একটা সাধারণ কুর্তি পরে, চুলগুলো খোঁপা করে বেঁধে শাশুড়ি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক কাজে হাত লাগিয়েছে। কখনও সে আনাজ ধুয়ে দিচ্ছে, কখনও মশলার কৌটো এগিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনও রাখী রায়চৌধুরীর কপালে জমে ওঠা ঘামের বিন্দু গুলো আলতো করে মুছে দিচ্ছে। রাখী রায়চৌধুরী স্নেহের চোখে পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে বললেন
-“তোর এই রান্নাঘরে এসে হাত পুড়ালে হবে বল তো গুল্লু? কদিন পরেই তো তুই এত বড় একটা দায়িত্বের চেয়ারে বসবি। এখন এই হেসেল সামলানোর কাজগুলো তুই আমার ওপর ছেড়ে দে না!”
তানভী মৃদু হেসে রাখী রায়চৌধুরীর কাঁধে মাথা রেখে বলল

-“আমি যেখানেই যাই না কেন মা, এই বাড়ির রান্নাঘরের এই গন্ধটা আর তোমার হাতের এই ভালোবাসার ছোঁয়া থেকে কি আমি দূরে থাকতে পারি? আর একটুখানি সাহায্য করলে আমার তো কোনো কষ্ট হয় না, উল্টে তোমার পাশে থাকতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”
বউমার এই মিষ্টি কথায় রাখী রায়চৌধুরীর বুকটা জুড়িয়ে গেল। তিনি তানভীর কপালে হাত বুলিয়ে মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন এমন একটা লক্ষ্মী মেয়েকে তাঁদের ঘরের লক্ষ্মী করে পাঠানোর জন্য।
এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে এল আর্ভিক। পরনে তার হালকা নীল রঙের একটি ক্যাজুয়াল শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স। চোখে-মুখে সকালের এক চিলতে স্নিগ্ধ ক্লান্তি থাকলেও তা তার ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই তার চোখ একবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, যেখানে তানভী তার মায়ের সাথে গল্প করতে করতে কাজ করছে। তানভীর মুখের সেই চেনা মায়াবী হাসিটা দেখতেই আর্ভিকের সারাদিনের সমস্ত এনার্জি যেন এক মুহূর্তে ফিরে আসে।
আর্ভিক ড্রয়িংরুমে এসে তার বাবার পাশের সোফায় বসল। অভিক সাহেব খবরের কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই ছেলের উপস্থিতি টের পেয়ে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখলেন। তিনি চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন

-“অফিসের কাজ সব ঠিকঠাক চলছে তো আর্ভিক? নতুন প্রজেক্টটার কী খবর?”
আর্ভিক মৃদু হেসে সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল। বাবার এই কাজের প্রতি কড়া নজর তার বেশ ভালোই জানা। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর দিল
-“হ্যাঁ বাবা, সব একদম ঠিকঠাক চলছে। নতুন প্রজেক্টের পেপারওয়ার্ক শেষ, আগামী সপ্তাহ থেকেই গ্রাউন্ড লেভেলে কাজ শুরু হয়ে যাবে।”
ছেলের দায়িত্বশীল উত্তরে অভিক সাহেব সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন এবং পুনরায় খবরের কাগজে মন দিলেন, ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে তানভী একটি কাঠের ট্রেতে করে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। কফির কাপ থেকে জেসমিন আর কফির মিশ্রিত এক অপূর্ব সুবাস ভেসে আসছে, যা আর্ভিকের অত্যন্ত প্রিয়। তানভী কফির কাপটা আর্ভিকের দিকে বাড়িয়ে দিতেই আর্ভিক এক মুহূর্তের জন্য তানভীর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপার্থিব ভালোলাগা আর কৃতজ্ঞতা। তানভী আলতো হেসে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। আর্ভিক কফির কাপে একটা মৃদু চুমুক দিয়ে তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। সত্যিই, তানভীর হাতের এই কফির কোনো তুলনা হয় না। কফির কাপটা হাতে নিয়েই আর্ভিক একটু ইতস্তত করতে লাগল। সে একবার বাবার দিকে তাকাল, তারপর কফির কাপে আঙুল বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত নরম গলায় বলল

-“বাবা… কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম।”
অভিক সাহেব খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। ছেলের এই আমতা আমতা করা ভাবটা তাঁর চোখ এড়ায়নি। তিনি চশমাটা খুলে কৌতূহলী চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন
-“হঠাৎ অনুমতি চাইছ? কী বলতে চাও, বল।”
আর্ভিক কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে অত্যন্ত বিনীতভাবে বলল
-“আসলে বাবা… আগামী সোমবার থেকেই তো তানভীর ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টার্সে জয়েনিং। অফিশিয়ালি ও আইএএস অফিসার হিসেবে নিজের দায়িত্বভার বুঝে নেবে। তারপর তো আর দম ফেলার ফুসরত পাবে না। সারাদিন ফাইল, মিটিং আর পাবলিক ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আমি ভাবছিলাম… জয়েন করার আগে এই মাঝের দুটো দিন আমরা যদি একটু ‘স্বপ্নবিলাস’ থেকে ঘুরে আসতাম? আসলে বিয়ের পর তো ওকে নিয়ে কোথাও যাওয়াই হলো না। পরীক্ষার জন্য কোনো রিচুয়ালও ঠিকমতো পালন করা হয়নি, আর ওকেও একটু রিল্যাক্স করানোর দরকার ছিল।”

ছেলের মনের কথা বুঝতে অভিক সাহেবের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। বিয়ের পর থেকে তানভী যেভাবে নিজেকে পড়াশোনার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল, আর আর্ভিক যেভাবে তাকে আড়াল করে আগলে রেখেছিল,তাতে এই দুটো মানুষের একান্ত কিছু সময়ের বড়ই প্রয়োজন ছিল।
অভিক সাহেব উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। তাঁর সেই গম্ভীর কণ্ঠের হাসিতে পুরো ড্রয়িংরুম মুখরিত হয়ে উঠল। রান্নাঘর থেকে রাখী রায়চৌধুরীও দরজার আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছেন কৌতূহলী হয়ে। অভিক সাহেব ছেলের পিঠে একটা মৃদু চাপড় মেরে বললেন

-“আরে পাগল ছেলে! তুমি তোমার নিজের স্ত্রীকে নিয়ে তোমাদেরই বাড়িতে ঘুরতে যাবে, তার জন্য আমার কাছ থেকে পারমিশন নিচ্ছো কেন? আমি কি কখনো তোমাকে ভালো কোনো কাজে বাধা দিয়েছি? তানভী শুধু তোমার স্ত্রী নয়, ও এখন এই দেশের একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল অফিসার হতে চলেছে। তার আগে ওর মনটাকে একটু শান্ত আর সতেজ করা খুবই দরকার। তুমি কাল সকাল সকালই ওকে নিয়ে বেরিয়ে যাও।”
বাবার এই অকুণ্ঠ সমর্থন আর স্নেহের কথা শুনে আর্ভিকের মনটা খুশিতে ভরে উঠল। সে কৃতজ্ঞ চোখে বাবার দিকে তাকাল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা রাখী রায়চৌধুরীও মুচকি হেসে তানভীকে চোখের ইশারায় সায় দিলেন। তানভী লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তার বুকের ভেতর তখন এক অজানা উত্তেজনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
দুপুরের খাবারের টেবিলে শুধু এই সফরের গল্পই চলল। ঋষি অফিস থেকে ফিরেই আর্ভিককে খেপাতে শুরু করল

-“বাহ ভাইয়া! তুমি তো কাজের কাজ করে ফেলেছ। আমাদের ডাকার কোনো প্রয়োজনই মনে করলে না? আমরাও তো একটু ঘুরে আসতে পারতাম!”
আর্ভিক এক ধমক দিয়ে তাকে শান্ত করল, কিন্তু তার মুখের হাসি লুকোতে পারল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। চারপাশের আকাশটা ধীরে ধীরে আবছা অন্ধকারে ঢেকে যেতে লাগল। গোধূলির শেষ আলোটুকু বিদায় নিয়ে ঘরের কোনায় কোনায় এখন সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে ওঠার অপেক্ষা।
তানভী রুমে এসে আলমারি খুলে বসেছে। পরদিন সকালেই রওনা হতে হবে, তাই সে তড়িঘড়ি করে একটা মাঝারি সাইজের ট্রলি ব্যাগ বের করল। আলমারি থেকে একের পর এক সুতির শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর প্রসাধন সামগ্রী বের করে সে বিছানার ওপর স্তূপ করে রাখছে। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সে একটার পর একটা জামাকাপড় ভাঁজ করছে আর ব্যাগে ঢোকানোর তোড়জোড় করছে।

ঠিক এমন সময় আর্ভিক ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সে তানভীর এই ব্যস্ততা দেখছিল। তানভীর কপালে হালকা বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, সে আপনমনে কপালে এসে পড়া চুলগুলোকে ফু দিয়ে ওড়ানোর চেষ্টা করছে আর হাত চালিয়ে ব্যাগ গোছাচ্ছে। আর্ভিক কিছুক্ষণ এই দৃশ্য উপভোগ করল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। কাছে এসে বিছানার ওপর রাখা স্তূপীকৃত জামাকাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আর্ভিক নিজের দুহাত বুকের কাছে ভাঁজ করল। তার ঘন ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে সে অত্যন্ত গম্ভীর হওয়ার ভান করে জিজ্ঞাসা করল
-“এই যে ম্যাডাম, এসব কী হচ্ছে? এই জামাকাপড়ের দোকানটা হঠাৎ ঘরের মাঝখানে সাজানোর কারণটা জানতে পারি কি?”
তানভী তার কাজের ব্যস্ততা থেকেই মুখ না তুলে চটপট উত্তর দিল,

-“বাঃ! আপনিই তো সকালবেলা সবার সামনে বললেন কাল সকালে আমরা ‘স্বপ্নবিলাস’-এ যাব। তাই তো প্যাকিং করছি। কোথাও ঘুরতে গেলে তো একটু জামাকাপড় গুছিয়ে নিতেই হয়, তাই না?”
আর্ভিক তানভীর একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল। তানভীর ব্যস্ত হাতের ওপর নিজের বড় ও উষ্ণ হাতটা রাখল। তানভী থমকে গিয়ে আর্ভিকের দিকে তাকাল। আর্ভিক মৃদু হাসল। তারপর অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে তানভীর কপালে নিজের তর্জনী দিয়ে একটা মৃদু টোকা দিল। আর্ভিকের আঙুলের সেই আলতো ছোঁয়ায় তানভীর সারা শরীরে এক মৃদু শিহরণ বয়ে গেল। আর্ভিক তার গভীর মায়াবী চোখে তানভীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল
-“কিছু নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একদম নিজের হাত দুটো খালি রেখে আমার সাথে যাবে। ওখানে তোমার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবকিছু আগে থেকেই রাখা আছে।”
তানভী অবাক হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে আর্ভিকের দিকে চাইল। সে কিছুটা অবিশ্বাসের সুরে ফিসফিস করে বলল

-“ওখানে সবকিছু আছে মানে? আমার শাড়ি, জামাকাপড়…. সব?”
আর্ভিক একগাল হেসে মাথা নাড়ল। তার চোখের মণি দুটো তখন ভালোবাসার তীব্র আলোয় চকচক করছে। সে অত্যন্ত কোমল গলায় বলল
-“হ্যাঁ, সব। আমার ব্লু-বার্ডের কী কী পছন্দ, সে কেমন শাড়ি পরতে ভালোবাসে-তার সবকিছু আমি নিজের হাতে গুছিয়ে রেখেছি।”
আর্ভিকের এই কথাগুলো তানভীর হৃদয়ের গভীরতম কোণে গিয়ে আঘাত করল। একজন মানুষ কীভাবে এতটা নিখুঁতভাবে ভালোবাসতে পারে? সে নিজের অজান্তেই আর্ভিকের বুকের কাছে সরে এল। তার চোখ দুটো সিক্ত হয়ে উঠল এক পরম প্রাপ্তির সুখে। জীবনের সব ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজ সে যে আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার থেকে নিরাপদ আর সুন্দর আর কিছু হতে পারে না।
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়েছে, আর ঘরের ভেতরে দুই ব্যাকুল হৃদয় আগামীকালের এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

ভোরের নরম আলোটুকু যখন চৌধুরী নিবাসের কার্নিশে এসে জমা হয়েছিল, তখন থেকেই বাড়ির পরিবেশ জুড়ে ছিল এক শান্ত কিন্তু চঞ্চল আবহ। বিয়ের পর পরীক্ষা আর ভবিষ্যতের এক পাহাড় সমান ব্যস্ততা তানভীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। আজ সেই সমস্ত বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে সে উড়ে চলেছে তার নিজের আকাশের খোঁজে, পাশে তার আজীবনের সহচর আর্ভিক। সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে আজ ছিল বিশেষ আয়োজন। রাখী রায়চৌধুরী নিজের হাতে লুচি আর আলুর দম বানিয়ে খাইয়েছেন তাঁর আদরের ছেলে-বউ কে। অভিক সাহেব আর ঋষির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, রাখী রায়চৌধুরীর আশীর্বাদী হাত মাথায় ঠেকিয়ে যখন তানভী আর আর্ভিক গাড়িতে উঠল, তখন বেলা প্রায় গড়িয়েছে।
কলকাতা শহর ছাড়িয়ে গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠল, দুপাশের সবুজ গাছপালা যেন উল্টোমুখে ছুটতে শুরু করল। জানলার কাচ নামিয়ে দিয়ে তানভী বাইরের হাওয়াকে নিজের মুখে মেখে নিচ্ছিল। আর্ভিক একহাতে স্টিয়ারিং ধরে আড়চোখে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিটিকে দেখছিল। প্রায় এক ঘণ্টার এই পথ যেন এক নিমেষে কেটে গেল। গাড়ি যখন মূল রাস্তা ছেড়ে একটা লাল মাটির সরু চওড়া রাস্তায় এসে পড়ল, তখনই তানভী বুঝল তারা গন্তব্যের কাছাকাছি এসে গেছে।

রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছাতেই তানভীর চোখের পলক যেন থমকে গেল। গাড়ি এসে দাঁড়াল এক বিশাল, রাজকীয় লোহার গেটের সামনে। গেটের গায়ে পেতলের কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জটিল লতাপাতার নকশা। আর্ভিক গাড়ির হর্ন বাজাতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বিশালাকার গেট দুটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতেই তানভীর মনে হলো সে যেন কোনো এক রূপকথার সাম্রাজ্যে এসে পড়েছে। এটিকে শুধু ‘বাড়ি’ বললে হয়তো অপরাধ হবে; এটি ছিল একটি আস্ত রাজপ্রাসাদ। অনেক, অনেক বড় একটা জমির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই অনন্য স্থাপত্য। চারপাশটা সবুজের চাদরে মোড়া। গাড়ি যাওয়ার পথটুকু নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে ছোট ছোট সাদা আর ধূসর রঙের নুড়ি পাথর দিয়ে, যার ওপর দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় এক মিষ্টি মর্মর ধ্বনি সৃষ্টি হচ্ছিল।
বাড়িটি পুরো শ্বেতপাথরের মতো সাদা রঙে রঞ্জিত, আর তার ছাদ এবং বারান্দার রেলিংগুলোতে ছোঁয়া রয়েছে গভীর নীল রঙের। সাদা আর নীলের এই মেলবন্ধন যেন মাটির বুকে এক টুকরো নীল আকাশকে নামিয়ে এনেছে। বাড়ির সামনে রয়েছে রোমান স্থাপত্যের মতো বিশালাকার থাম বা পিলার, যা ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিটি জানলার ওপরে রয়েছে নিখুঁত খিলানের কাজ। বাড়ির ডানদিক ঘেঁষে চলে গেছে এক বিশাল বাগান, যেখানে দেশি-বিদেশি ফুলের মেলা। বাঁদিকের লনে বসানো আছে পাথরের তৈরি বসার আসন। সেদিন রাতের বেলায় সব কিছু ভালো দেখতে পারেনি সে তবে আজ রাজকীয় এই স্থাপত্যের গাম্ভীর্য আর প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা তানভীকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল।
আর্ভিক গাড়িটি পোর্টিকোর নিচে পার্ক করল। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও নিবিড় হয়ে উঠল। গাড়ি থেকে নেমে তানভী যখন চারপাশটা দেখছিল, তখন আর্ভিক তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,

-“কী ম্যাডাম? পছন্দ হলো তোমার স্বপ্নবিলাস?”
তানভী শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, তার মুখ থেকে তখন কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। সদর দরজার সামনে যাওয়ার আগে একটা বড় বাঁধানো চাতাল পেরোতে হয়। তারা দুজনে যখন সেই চাতালের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে, তখনই ভেতর থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। মাথায় সাদা চুল, পরনে সাধারণ ধুতি আর পাঞ্জাবি, চোখে এক পরম নির্ভরযোগ্যতা। ইনিই এই বাড়ির বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার-মোহন কাকা। মোহন বাবু তানভী আর আর্ভিককে দেখে হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে চওড়া হাসলেন।
-“আসুন দাদাবাবু, আসুন দিদিমণি। আপনাদের আসার পথ চেয়েই বসে আছি। সমস্ত জলখাবার আর দুপুরের খাবার তৈরি করে রেখেছি, গরম গরম খেয়ে নেবেন।”
আর্ভিক সহাস্যে মোহনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-“হ্যাঁ মোহন কাকা, আমরা একটু ফ্রেশ হয়েই আসছি।”

তারপর সে তানভীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে ভেতরের দিকে ডাকল। আর্ভিক তানভীকে নিয়ে দোতলার একটি বিশাল শয়নকক্ষে প্রবেশ করল। ঘরের চারদিকের দেওয়ালগুলো হালকা নীল রঙের, মেঝেতে বিছানো দামী কাশ্মীরি গালিচা। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি বড় কিং-সাইজ সেগুন কাঠের খাট, আর তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজকীয় কাঠের আলমারি। আর্ভিক তানভীর ব্যাগটা একপাশে রেখে আলমারির চাবিটা তানভীর হাতে দিয়ে বলল,
-“নাও, আলমারিটা খোলো।”
তানভী ভ্রু কুঁচকে চাবিটা নিয়ে আলমারির পাল্লা দুটো খুলতেই বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। আলমারির প্রতিটি তাকে থরে থরে সাজানো রয়েছে জামাকাপড়। একদিকে রয়েছে তার প্রিয় সুতির আর সিল্কের হালকা রঙের শাড়ি, অন্য তাকে রয়েছে মানানসই কুর্তি, সালোয়ার। শুধু তাই নয়, একদম নিচের তাকে রয়েছে তার পছন্দের ব্রান্ডের কাজল, সুগন্ধি, আর আলপনা আঁকা কাচের চুড়ি। তানভী অবিশ্বাসের সুরে বলল
-“এসব… এসব আপনি কবে করলেন?”
আর্ভিক পেছন থেকে এসে তানভীর কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিস করে বলল,
-“যখন তুমি লাইব্রেরিতে বসে আইএএস হওয়ার স্বপ্ন বুনছিলে, তখন আমি এখানে তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোর স্বপ্ন বুনছিলাম। যাও, একটা শাড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি পাশের রুমে ফ্রেশ হতে যাচ্ছি।”

তানভী আলমারি থেকে একটি হালকা সবুজ রঙের সুতির শাড়ি বেছে নিল। স্নান সেরে, ভেজা চুলগুলো পিঠে মেলে দিয়ে সে নিচে নামল। আর্ভিক ইতিমধ্যেই ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসে ছিল। দুজনে একসাথে বসে মোহন কাকার হাতের সুস্বাদু খাবার খেল। খাওয়ার পর যখন আর্ভিক একটু বিশ্রামের জন্য ঘরে যাচ্ছিল, তখন তানভী তার হাত ধরে বলল,
-“আমি একটু বাড়ি আর চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখব?”
আর্ভিক শান্ত কন্ঠে বলল
-“হ্যাঁ যাও, কিন্তু সাবধানে ঘুরবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ডাকবে।”
ঘর থেকে বেরিয়ে তানভী ধীর পায়ে বাগানটার দিকে এগিয়ে গেল। বাগানটি সত্যিই অসাধারণ। একদিকে ফুটে আছে লাল, হলুদ গোলাপের মেলা, অন্যদিকে গন্ধরাজ আর কামিনীর সুবাস বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। একটু এগোতেই তানভীর চোখে পড়ল একটি ছোট গোল আকৃতির পাথরের বাঁধানো পুকুর। পুকুরের শান্ত নীল জলে ভেসে আছে লাল আর সাদা পদ্ম ফুল। বাগানটির ঠিক মাঝখানে একটি ছোট পাথরের ফোয়ারা, যা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল মৃদু শব্দে ঝরে পড়ছে। সেই ফোয়ারার চারধারে নানা রঙের বুনো পাখি এসে জল খাচ্ছে, ডানা ঝাপটে স্নান করছে। তানভী মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগল।
হঠাৎ তার কান গেল বাগানের এক কোণ থেকে আসা খসখস শব্দের দিকে। সে এগিয়ে গিয়ে দেখল, মোহন কাকা একটি কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছেন, হয়তো নতুন কোনো ফুলের চারা লাগানোর জন্য। তানভী ধীর পায়ে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তানভীর ছায়া মাটিতে পড়তেই মোহন কাকা থতমত খেয়ে কোদালটি থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন,

-“দিদিমণি! কিছু লাগবে আপনার?”
তানভী হেসে মাথা নেড়ে বলল
-“না না মোহন কাকা। আমি জাস্ট বাগানটা ঘুরে দেখছিলাম। আপনি নতুন গাছ লাগাচ্ছেন?”
-“হ্যাঁ দিদিমণি, দাদাবাবু বলেছিলেন এই কোণে কয়েকটা রজনীগন্ধার চারা লাগাতে। তাই মাটিটা তৈরি করছি।”
কথা বলতে বলতেই তানভীর চোখ গেল কিছুটা দূরে, যেখানে একটি বড় আম গাছের নিচে একটি ছোট বাচ্চা ছেলে খেলছে। ৫-৬ বছর বয়স হবে ছেলেটির। গায়ের জামাটা কিছুটা মলিন, কিন্তু চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত সরলতা। সে শুকনো পাতা আর ছোট ছোট কাঠি দিয়ে আপনমনে খেলছে। তানভী মোহন কাকাকে জিজ্ঞেস করল
-“কাকা, ওই বাচ্চা ছেলেটি কে?”
মোহনের চোখ দুটি মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোদালটি একপাশে রেখে বললেন
-“ওটা আমার নাতি, দিদিমণি। বড় অভাগা ছেলে ও।”
তানভী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“অভাগা কেন কাকা? আর ও আপনার সাথে এখানে থাকে?”
মোহন কাকা তাঁর চোখের কোণের জলটা হাত দিয়ে মুছে বললেন,

-“কী বলব দিদিমণি, কপাল! ওকে জন্ম দিতে গিয়েই আমার একমাত্র মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ওর বাবা তো বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার বিয়ে করল। সৎ মা নিজের সতীনের ছেলেকে সহ্য করতে পারত না। অবহেলা, অত্যাচার তো রোজকার ব্যাপার ছিল। যখনই দেখত ওর বাবা কাজে গেছে, ওকে ঠিকঠাক খেতে দিত না, ঘরে আটকে রাখত, মারধর করত। একটা ছোট শিশুর ওপর কতটা অত্যাচার করা যায় বলুন তো? আমি যখন এসব জানতে পারলাম, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। জামাইয়ের হাত-পা ধরে ওকে এখানে নিজের কাছে নিয়ে এলাম। সেই থেকে ও আমার সাথেই এখানে থাকে।”
মোহন কাকার কথাগুলো শুনে তানভীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করে উঠল। একজন নিষ্পাপ শিশুর ওপর এত অত্যাচার! সে নিজেকে সামলে নিয়ে শুনল মোহন কাকা আবার বলছেন
-“জানেন দিদিমণি, দাদাবাবু অনেক বড় মনের মানুষ। তিনি যখন আমার নাতির সব কথা জানতে পারলেন, তখন থেকে ওর পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, জামাকাপড় সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ওকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, আপনাদের যেন সবসময় সুখে রাখেন।”
এমন সময় বাচ্চাটা তার ধুলোমাখা পায়ে দৌড়ে এল দাদুর কাছে। মোহন কাকার পাঞ্জাবি ধরে টানতে টানতে বলল,

-“দাদু… দাদু! বড্ড খিদে পেয়েছে গো। চল না, একটু খাবার দাও।”
মোহন কাকা বড় ব্যাকুল হয়ে ওনার নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
-“বাবা সোনা, আমি তো এখনো রান্না বসাতে পারিনি। এই কাজটুকু শেষ করেই তোকে ভাত রেঁধে দেব। একটুখানি অপেক্ষা কর ভাই।”
বাচ্চাটি লক্ষ্মী ছেলের মতো মাথা নেড়ে বলল,
-“আচ্ছা দাদু, আমি তাহলে এখানেই বসি।”
বাচ্চাটির এই শান্ত রূপ আর পেটের খিদের কথা শুনে তানভীর মাতৃত্ব জেগে উঠল। সে আর স্থির থাকতে পারল না। সে হাঁটু মুড়ে বাচ্চাটার সামনে বসল এবং পরম স্নেহে তার ধুলোমাখা ছোট্ট হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ডাকল

-“বাবু…এদিকে তাকাও তো… তোমার নাম কী?”
আয়ুষ তার বড় বড় চোখ দুটো তুলে তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“প্রতীক”
তানভী তার কপালে হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে বলল
-“বাহ! খুব সুন্দর নাম তো তোমার। খিদে পেয়েছে? চলো, আমার সাথে চলো।”
মোহন কাকা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
-“আরে না না দিদিমণি! আপনি কেন কষ্ট করবেন? ও আমার সাথেই খাবে, আমি কাজটা শেষ করেই…”
তানভী সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মোহন কাকার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় অথচ আদুরে গলায় বলল,
-“কাকা, আমি আপনার মেয়ের মতোই। মেয়ের কাছে কি বাবা কোনো দ্বিধা রাখে? আপনি আর এক মুহূর্তও কাজ করবেন না। যান, হাত-মুখ ধুয়ে নিন। আজ আপনারা দুজনেই আমাদের সাথে খাবেন।”
মোহনের চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি আর তানভীর কথা ফেলতে পারলেন না। তানভী প্রতীককে পরম মমতায় কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটি প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও তানভীর গায়ের চেনা মায়ের মতো মিষ্টি সুবাসে সে নিশ্চিন্তে তার গলা জড়িয়ে ধরল।

তানভী প্রতীককে কোলে নিয়ে যখন খাবার ঘরের টেবিলে এল, তখন আর্ভিকও নিচে নেমে আসছিল। মোহন কাকা মাথা নিচু করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর্ভিক ড্রয়িংরুমে আসতেই মোহন কাকা কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আর্ভিক মোহন কাকাকে দেখে এক চিলতে হেসে বলল,
-“আরে মোহন কাকা! দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসুন, টেবিলে বসুন। আজ সবাই একসাথে খাব।”
তারপর তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তানভী, তাড়াতাড়ি খাবার বাড়ো তো, বড্ড খিদে পেয়ে গেছে।”
টেবিলে খাবার সাজানো হলো। তানভী পরম যত্নে সবার পাতে ভাত ও তরকারি বেড়ে দিচ্ছিল। যখন সে আর্ভিকের প্লেটে ভাতের পাশে মাছের পিস দিতে গেল, তখন আর্ভিক তানভীর হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বলল
-“তানভী, আজ আমাকে ছোট পিস দাও, আর এই মাছের বড় পিসটা মোহন কাকাকে দাও।”
মোহন কাকা হাতজোড় করে বলে উঠলেন,
-“না না দাদাবাবু! ওটা আপনার জন্য। আমি অত বড় মাছ খেতে পারব না, আমার ছোট পিসেই হয়ে যাবে।”
আর্ভিক অত্যন্ত স্নেহের সুরে বলল,

-“কাকা, কোনো কথা শুনব না। আপনি অনেক পরিশ্রম করেন। আজ আপনি এই বড় পিসটাই খাবেন।”
আর্ভিকের কথামতো তানভী তাই করল, এবং সাথে একটি বড় বাটিতে ভর্তি করে কষা মাংস মোহন কাকার সামনে এগিয়ে দিল।
এদিকে প্রতীক টেবিলের পাশে একটি ছোট চেয়ারে বসে তার ছোট ছোট হাত দিয়ে ভাত খাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার হাত থেকে বারবার ভাত পড়ে যাচ্ছিল। তানভী তা লক্ষ্য করে নিজের খাওয়া থামিয় প্রতীকের পাশে গিয়ে বসল। সে নিজের হাতে ভাতের সাথে মাছ মেখে ছোট ছোট লোকমা বানিয়ে প্রতীকের মুখে তুলে দিতে লাগল।
-“নাও সোনা, হা করো… এই তো লক্ষ্মী ছেলে!”
প্রতীক হাসিমুখে খাচ্ছিল আর আধো আধো গলায় তানভীর সাথে গল্প করছিল। তানভীও তার মুখের ভাতের লোকমা তার সাথে হাসাহাসি আর খুনসুটি করছিল। টেবিলের উল্টোদিকে বসে আর্ভিক এক মনে এই দৃশ্যটি দেখছিল। তার চোখ দুটো যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। আর্ভিকের মনে হলো, তানভীর এই রূপটি সে সারাজীবন দেখলেও তার মন ভরবে না। এটিই তো তার সেই ভালোবাসার মানুষ, যার হৃদয় সমুদ্রের মতো বিশাল।

বিকেল একটু ম্লান হয়ে এল, তানভী আর প্রতীক দুজনে মিলে বাগানে চোর-পুলিশ খেলতে শুরু করল। তানভীর পরনের সবুজ শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে, আর প্রতীক খিলখিল করে হেসে তানভীর আগে আগে দৌড়াচ্ছে। আর্ভিক বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে এই দৃশ্য দেখছিল। হঠাৎ প্রতীক দৌড়ে এসে আর্ভিককে বলল
-“দাদাবাবু! আমাদের সাথে খেলবে চলো না!”
আর্ভিক হেসে উঠে চেয়ার থেকে উঠল
-“আচ্ছা!”
আর্ভিকও খেলায় যোগ দিল। সে প্রতীককে কোলে তুলে নিয়ে তানভীকে তাড়া করল। বাগানের বাতাস তখন তাঁদের তিনজনের মিলিত হাসির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সমস্ত জাগতিক দুঃখ-কষ্ট ভুলে এই তিনটে প্রাণ যেন এক নতুন স্বর্গের সৃষ্টি করেছে।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামল। আর্ভিক বিকেলবেলাতেই মোহন কাকাকে কড়া গলায় বলে দিয়েছিল
-“কাকা, আজ রাতে আপনার আর কোনো কাজ নেই। আপনি বিশ্রাম নিন, রাতে রান্নার দায়িত্ব আমাদের।”
রাত তখন সাড়ে আটটা। স্বপ্নবিলাসের বিশাল রান্নাঘরে এখন দুই নতুন রাঁধুনি ব্যস্ত। আর্ভিক গ্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে কড়াইতে চিকেন কষা রান্না করছে। আর তানভী? সে রান্নাঘরের কাউন্টারের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে দুলছে। তার চোখে এক মায়াবী দৃষ্টি, সে মুগ্ধ হয়ে তার স্বামীর রান্না করা দেখছে। মাঝে মাঝেই গরমের তাপে আর্ভিকের কপালে যে ঘামের বিন্দুগুলো জমছিল, তানভী তার আঁচল দিয়ে আলতো করে তা মুছে দিচ্ছিল। হঠাৎ তানভীর কণ্ঠস্বর কেমন যেন নরম আর ভারী হয়ে এল। সে আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে বলল
-“জানেন আর্ভিক… কাল সকালেই তো আমরা ফিরে যাব। তারপর সোমবার থেকেই আমার জয়েনিং। কিন্তু এই বাচ্চাটার ওপর আমার বড্ড মায়া পড়ে গেছে। ওর ওই মায়াবী মুখটা দেখলে কারোর মনে একটুও দয়া হয় না? ওর সৎ মা, কীভাবে পারল ওর ওপর এত অত্যাচার করতে?”
আর্ভিক কড়াই থেকে খুন্তিটা একপাশে রাখল। সে তানভীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল এবং তানভীর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত শান্ত, গভীর গলায় বলল

-“মানুষের ভেতরের পশুত্ব যখন জেগে ওঠে তানভী, তখন সে সম্পর্কের পবিত্রতা ভুলে যায়। কিন্তু মনে রাখবে, প্রতিটি অন্ধকারের পর যেমন একটা ভোর আসে, তেমনই প্রতীকের জীবনেও একটা সুন্দর সকাল এসেছে। ও এখন আমাদের কাছে আছে, মোহন কাকার কাছে আছে। আর আমার ভালোবাসা ও দায়িত্ব ওর ওপর সারাজীবন থাকবে। তুমি চিন্তা করো না, তুমি একজন আইএএস অফিসার হিসেবে যেমন দেশের হাজারো মানুষের অধিকার রক্ষা করবে, তেমনই আমরা ব্যক্তি হিসেবেও প্রতীকের পাশে সবসময় থাকব।”
আর্ভিকের এই গভীর ও দায়িত্বশীল কথাগুলো শুনে তানভীর চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল। সে পরম শান্তিতে আর্ভিকের চওড়া বুকে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল।
রাতের খাবার তারা চারজনে একসাথে খুব আনন্দ করে খেয়ে নিল। প্রতীক তানভীর কোল ছাড়া ঘুমাতেই চাইছিল না। তানভী নিজের হাতে তাকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই নিজের ঘরে ফিরল।

পরদিন সকালে যখন স্বপ্নবিলাসের গেটের বাইরে গাড়িটা স্টার্ট নিল, তখন মোহন কাকা আর প্রতীক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল। প্রতীকের ছোট্ট হাত দুটির বিদায় জানানোর ভঙ্গিতে তানভীর মনটা একটু খারাপ হলেও, তার চোখে ছিল এক নতুন দীপ্তি। সে জানে, এই সফরটি তাকে শুধু মানসিক শান্তি দেয়নি, তাকে একজন ভালো মানুষ এবং ভবিষ্যতের একজন সংবেদনশীল প্রশাসক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
গাড়ি কলকাতার হাইওয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তানভী আর্ভিকের কাঁধে মাথা রেখে হাসল। তার মনে হলো, ‘স্বপ্নবিলাস’ সত্যিই এক সার্থক নাম, যেখানে প্রতিটি স্বপ্নই এক রঙিন পূর্ণতা পায়।

নীলচে অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে কলকাতা শহর তখন ক্লান্তিতে চোখ বুজেছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই। চৌধুরী নিবাসের প্রতিটি ঘর যখন নিঝুম, শান্ত, তখন দোতলার একটি ঘরের কোণ থেকে চুইয়ে আসছিল তীব্র সাদা আলো।
আইএএস (IAS) অফিসার হিসেবে তানভীর প্রথম জয়েনিংয়ের দিনটি কেটেছে এক তুমুল ঝড়ের মতো। নতুন দায়িত্বের গুরুত্ব, ফাইলের স্তূপ আর প্রশাসনের জটিল মারপ্যাঁচ সামলাতে সামলাতে তার দম ফেলার ফুরসত ছিল না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে নটা। তারপর তাড়াহুড়ো করে রাতের খাওয়া সেরে নিলেও, তানভীর মস্তিস্ক কিন্তু বিশ্রামের অবসর পায়নি। কর্তব্যের যে পাহাড় সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে, তার প্রথম দিনেই সে কোনো ফাঁকি রাখতে চায় না।
শয়নকক্ষের বিশাল বিছানার একপাশে ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে আছে তানভী। ফাইলে চোখ রেখে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছিল। চোখে তার রাজ্যের ক্লান্তি, চোখের কোণে কালচে ছায়া স্পষ্ট,তবুও জেদ আর দায়িত্ববোধ তাকে ঘুমোতে দিচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল আর্ভিক। পরনে হালকা নীল রঙের নাইট স্যুট, চুলগুলো অবিন্যস্ত। চোখে একরাশ ঘুম আর আদুরে আবদার নিয়ে সে তানভীর দিকে তাকাল। সারাটা দিন এই মানুষটার মুখটা সে ভালো করে দেখতে পায়নি। রাতের এই একান্ত সময়টুকুতেই তো সে তার ‘প্রনয়িনী’কে নিজের করে পায়। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তানভীকে অমন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আর্ভিকের মুখটা একটু গোমড়া হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে হেঁটে এসে বিছানায় তানভীর একেবারে গা ঘেঁষে বসল। তারপর তানভীর কুর্তির হাতাটা ধরে মৃদু টান দিয়ে বাচ্চাদের মতো আবদারের সুরে বলল

-“আর কত কাজ করবে, বউ? এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করো। চলো, ঘুমোবে চলো… আমার খুব ঘুম পেয়েছে।”
তানভী ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই অত্যন্ত শান্ত অথচ ক্লান্ত গলায় বলল
-“আপনি শুয়ে পড়ুন আর্ভিক। আমার এখনো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মেইল চেক করা বাকি। আজকের রিপোর্টের একটা খসড়াও তৈরি করতে হবে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন, আমার একটু দেরি হবে।”
আর্ভিক দমবার পাত্র নয়। সে আরও একটু এগিয়ে এসে তানভীর কাঁধে নিজের মাথাটা ছোঁয়ানোর চেষ্টা করে অনুযোগের সুরে বলল

-“উঁহু, তুমি পাশে না শুলে আমার ঘুম আসে না, তুমি তো জানো। সারাদিন তো এই দেশের কাজের জন্যই দিলে, রাতের এই কয়েকটা ঘণ্টা অন্তত নিজের বরের জন্য রাখো। চলো না লক্ষ্মীটি!”
তানভী এবার একটু বিরক্ত হলো। কাজের গভীর মনসংযোগে বারবার ব্যাঘাত ঘটায় সে কপালে হাত বুলিয়ে বলল
-“আর্ভিক, প্লিজ! বোঝার চেষ্টা করুন। এটা কোনো সাধারণ চাকরি নয়। একটা আস্ত জেলার মানুষের দায়িত্ব আমার ওপর। আমি আজ কোনো ভুল রাখতে চাই না। আপনি যান, চুপচাপ শুয়ে পড়ুন।”
মুখ ভার করে আর্ভিক বিছানার অন্যপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার ঘুমচোখে তখন এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। ঘরের তীব্র আলোটা সরাসরি তার চোখে এসে লাগছিল। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর সে আবার উঠে বসল।
-“তানভী! এই লাইটের আলোয় আমার চোখে একটুও ঘুম আসছে না।”

তানভী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারছিল আর্ভিক আসলে তাকে বিরক্ত করার অজুহাত খুঁজছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল। দেওয়ালের সুইচবোর্ড থেকে ঘরের মূল আলোটা নিভিয়ে দিতেই পুরো ঘর নিমেষে অন্ধকারে ডুবে গেল। শুধু জানলা দিয়ে আসা চাঁদের মৃদু আলো তখন ঘরের আসবাবপত্রের ওপর এক রহস্যময় ছায়া তৈরি করেছে। তানভী ঘরের কোণে থাকা পড়ার টেবিলটার সামনে গিয়ে বসল। টেবিলের ওপর থাকা ছোট, ডিম্বাকৃতির স্টাডি ল্যাম্পটা জ্বেলে দিতেই টেবিল জুড়ে এক চিলতে হলদেটে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল। তানভী আবার নতুন করে ফাইলে মনোনিবেশ করল।
কিন্তু আর্ভিকের জেদ যেন আজ পাহাড় সমান। অন্ধকার ঘরে একা শুয়ে থাকতে তার আরও বেশি অস্বস্তি হচ্ছিল। সে বিছানা থেকে নেমে নিঃশব্দে তানভীর পেছনের দেওয়ালটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। কখনো সে তানভীর কানের কাছে এসে ফুঁ দিচ্ছে, কখনো বা তার চুলগুলো নিয়ে আঙুলে জড়াচ্ছে।
তানভী দাঁতে দাঁত চেপে নিজের বিরক্তি সামলানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু যখন আর্ভিক তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে নিজের হাতটা এনে নাড়াতে শুরু করল, তখন তানভীর ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন রাগের আগুন।

-“আপনি কি ছোট বাচ্চা, আর্ভিক? কেন আমাকে এভাবে বিরক্ত করছেন বলুন তো? আমি বলছি তো আমার জরুরি কাজ আছে!”
আর্ভিক একটুও না দমে মুখে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ঝুলিয়ে বলল
-“আমি তো শুধু আমার অধিকার দাবি করছি, ম্যাডাম আইএএস। বরকে সময় দেওয়াও তো একটা নাগরিক দায়িত্ব, নাকি?”
তানভী আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না। এভাবে চললে সারারাতেও তার কাজ শেষ হবে না। সে হনহন করে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বিছানা থেকে একটা কোলবালিশ আর একটা মাথার বালিশ ছোঁ মেরে তুলে নিল। তারপর হনহন করে ফিরে এসে আর্ভিকের একটা হাত ধরে হিড়হিড় করে দরজার দিকে টেনে নিয়ে চলল। আর্ভিক চরম বিস্ময়ে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে বলল
-“এই! একি করছ তানভী? আরে ছাড়ো… কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে?”
তানভী কোনো কথা শুনল না। ঘরের দরজাটা একহাতে খুলে সে আর্ভিককে আলতো ধাক্কা দিয়ে বাইরের করিডোরে বের করে দিল। তারপর তার হাতের কোলবালিশ আর মাথার বালিশটা আর্ভিকের বুকের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলল
-“আজকে আপনার শাস্তি! আপনি বাইরেই ঘুমান।”
-“আরে শোনো তানভী! বাইরে বড্ড ঠান্ডা… তানভী!”

আর্ভিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই তানভী মুখের ওপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ভেতর থেকে খিল তোলার তীক্ষ্ণ শব্দটা আর্ভিকের কানে এসে বিঁধল।
করিডোরের আবছা আলোয় আর্ভিক বোকার মতো বুকে কোলবালিশ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের ঘরে নিজের বউয়ের কাছ থেকে এভাবে বিতাড়িত হতে হবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। বেচারা একরাশ বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে করিডোরের মেঝেতেই বালিশটা পাতল। তারপর কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে দেওয়ালের পাশে শুয়ে পড়ল। রাগে, অভিমানে তার মুখটা তখন একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো ফুলে উঠেছে।
ঠিক সেই সময় বাড়ির ছাদ থেকে ধীর পায়ে নিচে নেমে আসছিল ঋষি। রাতে ছাদে গিয়ে একটু খোলা হাওয়ায় গান শোনা বা আকাশ দেখা তার পুরনো অভ্যাস। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সে যখন নিজের রুমের দিকে এগোচ্ছিল, তখন করিডোরের আবছা অন্ধকারে সে মেঝেতে পড়ে থাকা কোনো এক বিশালাকার বস্তুর সঙ্গে জোর ধাক্কা খেল। হোঁচট খেয়ে ঋষি প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু দেওয়ালটা ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। বিরক্তিতে তার কপাল কুঁচকে গেল।
-“ধুর মশাই! এই মাঝরাতে করিডোরে কে এরকম বস্তা ফেলে রেখেছে?”
পা দিয়ে বস্তুটাকে একটু ঠেলতেই মেঝে থেকে একটা চেনা, কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল
-“কাকে বস্তা বলছিস রে হতভাগা? চোখ দুটো কি পকেটে রেখে হাঁটছিস?”
কণ্ঠস্বরটা শুনে ঋষি চমকে উঠল। সে একটু ঝুঁকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল, স্বয়ং তার বড় ভাই আর্ভিক রায়চৌধুরী কোলবালিশ বুকে নিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে! ততক্ষণে আর্ভিকও ধড়মড় করে শোয়া থেকে উঠে বসেছে। তার চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি আর অপমানবোধের ছাপ।
ঋষি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে হাঁ করে কিছুক্ষণ আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,ষ
-“ভাইয়া! তুমি? তুমি এই মাঝরাতে ঘরের বাইরে মেঝেতে বালিশ নিয়ে শুয়ে আছ কেন?”
আর্ভিক নিজের ধুলো ঝেড়ে বসার ভঙ্গিটা একটু ঠিক করে নিল তারপর একটু ইতস্তত করে মুখটা বাচ্চাদের মতো হাঁড়ি বানিয়ে বলল

-“…কী আর করব ? আমার বউ আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে!”
কথাটা শোনামাত্রই ঋষির মুখের সমস্ত গাম্ভীর্য উধাও হয়ে গেল। তার পেটের ভেতর থেকে এক দমকানো হাসি ঠেলে ওপরে উঠে আসতে চাইল। কিন্তু ভাইয়ের রাগী চোখের সামনে সশব্দে হাসার সাহস তার নেই। তাই সে নিজের ঠোঁট দুটো দাঁত দিয়ে চেপে ধরে, মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। তার কাঁধ দুটো হাসির চোটে অনবরত কাঁপছিল। আর্ভিক আরও রেগে গিয়ে বলল,
-“হাসছিস? লজ্জা করে না নিজের বড় ভাইয়ের এই দুর্দশা দেখে হাসতে? এক ফোঁটা সহানুভূতি নেই তোর বুকে?”
ঋষি কোনোমতে নিজের হাসি সংবরণ করে অত্যন্ত নিরীহ মুখে বলল,
-“না না ভাইয়া, আমি একদম হাসছি না। তবে আমার যতটুকু মনে হয়, তুমি নিশ্চয়ই বড় রকমের কোনো উল্টোপাল্টা কাণ্ড করেছ। নইলে আমার বোনুর মতো শান্ত মেয়ে তোমাকে এভাবে ঘর থেকে লাথি মেরে বের করতে পারে না! তুমি নিশ্চয়ই ওর কাজে ডিস্টার্ব করছিলে, তাই তো?”
আর্ভিক মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে বিড়বিড় করল
-“আমি তো শুধু একটু আদর করতে চেয়েছিলাম…”
-“বুঝেছি!”
ঋষি মুচকি হেসে বলল

-“আইএএস অফিসারের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার ফল হাতেনাতে পেয়েছ। যাই হোক ভাইয়া, গুড নাইট। মেঝেটা কিন্তু বেশ ঠান্ডা, সাবধানে থেকো।”
এই বলে ঋষি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে নিজের ঘরের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল এবং একটু বেশি শব্দ করেই দরজাটা বন্ধ করে দিল, যেন আর্ভিককে বোঝাতে চাইল যে তার নিজের ঘরে ঢোকার স্বাধীন অধিকার অন্তত আছে!
আর্ভিক ঋষির বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপর চরম বিরক্তিতে ঋষির ঘরের দিকে তাকিয়ে একটা ভেঙচি কেটাল।
অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে, বেচারা আর্ভিক আবার সেই কোলবালিশটা আঁকড়ে ধরে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল। ঘরের ভেতরে তখন তানভী হয়তো গভীর মনোযোগে ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছে, আর বাইরে তার আজীবনের সহচর ছাদের আবছা আলো-ছায়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক মিষ্টি অভিমানের জাল বুনছে।

রাত তখন ঠিক একটা। পুরো চৌধুরী নিবাস এখন গভীর ও নিস্তব্ধ । নিঝুম ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা ছোট স্টাডি ল্যাম্পের মৃদু আলোয় এতক্ষণ একটানা খসখস শব্দে ফাইলের পাতা ওল্টানো আর ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালানোর শব্দ আসছিল। অবশেষে তানভী তার শেষ ফাইলটিতে সই করে ল্যাপটপটা বন্ধ করতেই একরাশ ক্লান্তির চাদর যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। দুই চোখের পাতায় তখন রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করেছে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তানভী একটু আড়মোড়া ভাঙল। সারা দিনের ধকল আর রাতের এই মানসিক পরিশ্রমের পর শরীরটা যেন আর সায় দিচ্ছিল না। বিছানার দিকে এগোতে গিয়েই তার হঠাৎ মনে পড়ল করিডোরের কথা। মনের কোণে একটা মৃদু অপরাধবোধ মোচড় দিয়ে উঠল। সত্যিই তো, রাগের মাথায় সে নিজের প্রিয়তম মানুষটাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে! অভিমানী ছেলেটা কি শেষ পর্যন্ত নিচে গিয়ে অন্য ঘরে শুলো, নাকি রাগ করে জেদ ধরে বাইরেই রয়ে গেল?
কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগে তানভী ধীর পায়ে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার খিলটা অত্যন্ত সাবধানে, নিঃশব্দে টেনে সে পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করতেই তার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। করিডোরের মৃদু নীলচে আলোর নিচে, দেয়াল ঘেঁষে শক্ত মেঝের ওপর অবহেলায় শুয়ে আছে আর্ভিক। বুক জড়িয়ে ধরে রাখা কোলবালিশটা যেন তার একমাত্র আশ্রয়। তার চওড়া কপাল জুড়ে কয়েকটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে অভিমানের ছায়া, যেন ঘুমের ঘোরেও সে নিজের প্রনয়িনীর কাছে এক টুকরো অধিকার ভিক্ষা করছে। এত বড় চৌধুরী সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি, যার একটা কথায় শত শত মানুষ ওঠে বসে, সে আজ শুধুমাত্র নিজের স্ত্রীর একটু ভালোবাসার কাঙাল হয়ে এই শক্ত মেঝের ঠান্ডা বাতাসে অবহেলায় ঘুমিয়ে আছে!
দৃশ্যটা দেখামাত্রই তানভীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। এক তীব্র অনুশোচনা আর মায়া এসে ছেয়ে ফেলল তার সর্বাঙ্গ। চোখ দুটো তার অদ্ভুত এক মায়ায় আর্দ্র হয়ে উঠল। সে মনে মনে নিজেকেই তিরস্কার করল

-“ছিঃ তানভী! ও তো একটু আদরের জন্যই এমন চপলতা করছিল। তার জন্য ওকে এভাবে শাস্তি দিলি তুই?”
তানভী আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। সে ঘরের ভেতর থেকে নিজের বালিশটা আর একটা হালকা সুতির পাতলা চাদর হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে সে অত্যন্ত নিঃশব্দে আর্ভিকের পাশে মেঝের ওপর বসল। শক্ত মেঝে থেকে উঠে আসা ঠান্ডাটুকু যাতে আর্ভিকের গায়ে না লাগে, তাই সে পাতলা চাদরটি আর্ভিকের শরীরের ওপর টেনে দিল। তারপর নিজের বালিশটি আর্ভিকের মাথার নিচে আলতো করে গুঁজে দিয়ে, সে নিজেও আর্ভিকের ঠিক পাশে শুয়ে পড়ল।
ঘুমের মধ্যেও হয়তো আর্ভিকের অবচেতন মন তার অতি চেনা, অতি প্রিয় সেই সুবাসটুকু চিনে নিল। তানভী পাশে শোয়া মাত্রই আর্ভিক ঘুমের ঘোরেই এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করল। সে আলতো করে পাশ ফিরে তানভীকে নিজের বুকের আরও কাছে টেনে নিল। তার বলিষ্ঠ দুটি হাত তানভীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের শরীরের সাথে বেঁধে ফেলল, যেন সে কোনোভাবেই তার এই অমূল্য প্রাপ্তিকে হারাতে চায় না।
আর্ভিকের এই আকুলতা দেখে তানভীর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। সেও নিজের হাতটি আর্ভিকের বুকের ওপর রেখে চোখ বুজল। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া, করিডোরের শক্ত মেঝে, সবকিছু যেন এক নিমেষে এক মায়াবী স্বর্গোদ্যান হয়ে উঠল। এভাবেই দুজনে হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ ভাগ করে নিয়ে সারারাত করিডোরের মেঝেতেই ঘুমে তলিয়ে রইল।

পরদিন সকালে যখন চৌধুরী নিবাসের কার্নিশ বেয়ে ভোরের প্রথম সোনালী রোদ করিডোরের মেঝেতে এসে আছড়ে পড়ল, তখন চারপাশ জুড়ে পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে। সূর্যের এক ফালি নরম আলো সরাসরি এসে পড়ল আর্ভিকের বন্ধ চোখের পাতায়। চোখ পিটপিট করে আর্ভিক যখন ধীরে ধীরে চোখ মেলল, তখন তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির হাসি। তার বুকের ওপর পরম শান্তিতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানসী-তানভী। ভোরের আলোয় তানভীর দুধে-আলতা গায়ের রঙ যেন আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কপাল বেয়ে কয়েকটা অবাধ্য চুল তার চোখের ওপর এসে পড়েছে, যা তার শান্ত মুখের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আর্ভিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের তর্জনী দিয়ে অত্যন্ত আলতো করে তানভীর মুখের ওপর ছড়ানো সেই অবাধ্য কেশরাশিগুলো তুলে তার কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার স্পর্শে তানভী একটু নড়েচড়ে উঠলেও ঘুম ভাঙল না।
ঠিক তখনই করিডোরের অন্যদিকের একটি দরজা খোলার মৃদু শব্দ হলো। ঋষি নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে করিডোরের দিকে তাকালো। কিন্তু তাকাতেই তার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। সে অবাক চোখে দেখল, করিডোরের মেঝেতে কোলবালিশ, চাদর আর বালিশ সহযোগে তার ভাইয়া আর তানভী পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছে!

ঋষি কিছুক্ষণ হাঁ করে দৃশ্যটা দেখল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিমটি দুষ্টুমি আর চওড়া হাসি নিয়ে ধীর পায়ে তাদের কাছে এসে দাঁড়াল। সে গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে বলল
-“বাব্বা! ভাইয়া, তোমরা কি সারারাত দুজনে এখানেই বিছানা পেতে শুয়ে ছিলে নাকি? বলি, ঘরের ভেতরের খাটটা কি অপরাধ করেছিল?”
ঋষির গলার আওয়াজ পেয়ে আর্ভিক ঝট করে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে তখন নিজের একান্ত মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটার চরম বিরক্তি। সে তানভীকে জড়িয়ে ধরে রেখেই ঋষির দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে চাপা রাগী গলায় বলল
-“তোর কি সকাল সকাল কোনো কাজ নেই? ঘুম থেকে উঠেই এখানে এসে চোখ পাকাচ্ছিস কেন? তোর কি কোনো সমস্যা আছে?”
ঋষি দুহাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেসে বলল
-“আরে না না, আমার কেন সমস্যা থাকবে ভাইয়া! আমি তো জাস্ট ভাবছিলাম, এই মেঝের যা ঠান্ডা, তোমাদের আবার ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া না হয়ে যায়! রায়চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে আর জেলার নতুন আইএএস ম্যাডাম যদি এভাবে করিডোরে শয্যা পাতেন, তবে মানুষ হাসবে না?”
আর্ভিক চোখ গরম করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল
-“তোকে অত ভাবতে হবে না। নিজের মুখটা এবার একটু বন্ধ কর। তোর এই ভাঙা কাসির মতো গলার আওয়াজে যদি আমার বউয়ের ঘুম ভেঙে যায়, তবে তোর কপালে কিন্তু দুঃখ আছে বলে দিচ্ছি!”
ঋষি আর কথা বাড়িয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাইল না। সে দুহাত কপালে ঠেকিয়ে ইশারায় বলল
-“বাপরে! আমি চললাম।”
তারপর সে হাসতে হাসতে ধীর পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। ঋষি চলে যাওয়ার পর চারপাশটা আবার শান্ত হয়ে এল। আর্ভিক এবার পরম মমতায় তানভীর মুখের দিকে তাকাল। সে তানভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত মৃদু, নরম গলায় ডাকল,

-“তানভী… এই তানভী, ওঠো সোনা। সকাল হয়ে গেছে।”
আর্ভিকের গলার চেনা সুর আর কানের কাছে তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের পরশ পেয়ে তানভী পিটপিট করে চোখ মেলল। চোখের ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে যেতেই সে বুঝতে পারল সে কোথায় শুয়ে আছে। সে দেখল আর্ভিক অত্যন্ত ভালোবাসামাখা চোখে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আর্ভিক আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে ঝুঁকে এসে তানভীর কপালে নিজের ঠোঁট দুটি আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। এক পরম পবিত্র, উষ্ণ ভালোবাসার পরশ। তারপর ফিসফিস করে বলল,
-“এবার উঠে পড়ো তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো। অফিসে যেতে হবে না? দেরি হয়ে যাবে কিন্তু।”
তানভী আর্ভিকের এই রূপটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার মনের ভেতরে এক অদ্ভুত বিস্ময় আর ভালোলাগার ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবল
-“কাল রাতে আমি এই মানুষটাকে এত অপমান করলাম, ঘর থেকে বের করে দিলাম। অথচ তার মনে একটুও রাগ নেই? সকাল হতেই সে আমাকে কতটা ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখছে!”
তানভীকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আর্ভিক মৃদু হেসে তার গালটা একটু টিপে দিয়ে বলল
-“কী হলো? ওভাবে বোকার মতো তাকিয়ে আছ কেন আমার দিকে?”
তানভী একটু লজ্জিত হয়ে চোখ নামিয়ে নিল। সে আর্ভিকের বুক থেকে মাথা তুলে উঠে বসতে বসতে বলল
-“না… কিছু না। চলুন, এবার ওঠা যাক।”
দুজনে মেঝের বিছানা গুটিয়ে নিয়ে আবার নিজেদের ঘরে প্রবেশ করল। নতুন একটা দিনের ব্যস্ততা তাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল।

ঘণ্টাখানেক পর। তানভী স্নান সেরে তার ইউনিফর্মের একাংশ পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আর আর্ভিক সবেমাত্র ওয়াশরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে এসেছে। তার মাথার ভেজা চুলগুলো থেকে এখনো দু-এক ফোঁটা জল চুইয়ে পড়ছে। পরনে তার কেবল একটা কালো রঙের ক্যাজুয়াল ট্রাউজার। তোয়ালে দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে থাকা তানভীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।
তানভী তার ইউনিফর্মের ওপরের অংশটা পরে বোতামগুলো লাগাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাৎই তার চোখের সামনের চেনা ঘরটা কেমন যেন বনবন করে ঘুরে উঠল। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। মাথার ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় খালি হয়ে গেল এবং বুক চিরে এক প্রবল বমি বমি ভাব বা অস্থিরতা জেগে উঠল। তানভী নিজেকে সামলানোর জন্য ড্রেসিং টেবিলের কোণটা ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু তার পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছিল। সে অস্ফুটে একটা আর্তনাদ করে চোখ দুটো বন্ধ করে পড়ে যেতে লাগল।
ওয়াশরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আর্ভিক মুহূর্তের মধ্যে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে এল। তানভী মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই সে তাকে নিজের শক্ত দুটি বাহুর ডোরে আগলে নিল। তানভীকে কোলে তুলে নিয়ে সে দ্রুত বিছানায় গিয়ে বসাল। আর্ভিকের বুকের ভেতরটা তখন ভয়ের চোটে ঢিপঢিপ করছে। সে তানভীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠল। তানভীর দুধে-আলতা গাল দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে, তার কপালে হাত দিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

-“তানভী! তানভী, কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো!”
তানভী কোনোমতে চোখ দুটো একটু মেলে আর্ভিকের হাত দুটো চেপে ধরল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। সে অত্যন্ত দুর্বল গলায় বলল
-“না… ঠিক জানি না। মাথাটা কেমন যেন ঘুরিয়ে উঠল। শরীরটা কেমন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি করছে। আসলে… বেশ কিছুদিন ধরেই মাঝেমধ্যে এমনটা হচ্ছে আমার।”
-“বেশ কিছুদিন ধরে হচ্ছে?”
আর্ভিকের গলার আওয়াজটা এবার একটু ধমকের মতো শোনাল। তার চোখে তখন একই সাথে রাগ আর গভীর উদ্বেগ। সে একটু চড়া গলায় বলল
-“এতদিন ধরে তোমার শরীর খারাপ করছে, আর তুমি আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? তুমি কি নিজের শরীরটাকে লোহা ভাবো তানভী? দেশের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে এভাবে তুচ্ছ ভাবছ?”
তানভী আর্ভিকের এই শাসনে কোনো প্রতিবাদ করল না। সে শুধু ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আর্ভিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণে আনল। সে পরম যত্নে তানভীকে বিছানায় বালিশের ওপর হেলান দিয়ে শুইয়ে দিল। চাদরটা তার গায়ের ওপর টেনে দিয়ে বলল
-“তুমি চুপচাপ শুয়ে থাকো। আমি এক্ষুনি ফ্যামিলি ডক্টর সেনগুপ্তকে ফোন করছি।”
আর্ভিক ফোনের দিকে হাত বাড়াল। তার হাত দুটো উদ্বেগে সামান্য কাঁপছিল।

কিছুক্ষণ পর।
চৌধুরী নিবাসের শয়নকক্ষটি এখন এক থমথমে শান্ত আবহাওয়ায় ঢাকা। বিছানায় তানভী শুয়ে আছে। তার একপাশে বসে তার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছে আর্ভিক। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন রাখী রায়চৌধুরী, তাঁর চোখে পরম উৎকণ্ঠা। পাশে ঋষি আর অভিক সাহেবও দাঁড়িয়ে আছেন গম্ভীর মুখে। পরিবারের আদরের মেয়ের এই হঠাৎ অসুস্থতা কাউকেই শান্তিতে থাকতে দেয়নি।
ডক্টর সেনগুপ্ত অত্যন্ত অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি তানভীকে স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলেন, তার নাড়ি চেক করে দেখলেন এবং কিছু প্রাথমিক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। ডক্টরের মুখের গম্ভীর ভাবটা ধীরে ধীরে এক উজ্জ্বল হাসিতে রূপান্তরিত হতে লাগল। পরীক্ষা শেষ করে স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে ডক্টর সেনগুপ্ত আর্ভিকের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে তখন এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি আর্ভিকের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত আনন্দিত কণ্ঠে বললেন
-“অভিনন্দন, মিস্টার রায়চৌধুরী! চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনার স্ত্রী কোনো কঠিন রোগে আক্রান্ত নন। আসলে… আপনি বাবা হতে চলেছেন। আপনার স্ত্রীর মা হতে চলেছে।”
ডক্টরের মুখ থেকে বের হওয়া এই একটি মাত্র বাক্য যেন পুরো ঘরের নিস্তব্ধ বাতাসকে এক অলৌকিক জাদুমন্ত্রে বদলে দিল। এক মুহূর্তের জন্য ঘরের সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। আর্ভিকের মনে হলো তার কানের ভেতর যেন এক অপার্থিব বাঁশির সুর বেজে উঠেছে। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে তানভীর দিকে তাকাল, যার চোখ দিয়ে ইতিমধ্যেই আনন্দ আর বিস্ময়ের জল গড়িয়ে পড়ছে। রাখী রায়চৌধুরী আনন্দে এক লাফে বিছানার পাশে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ছে। তিনি তানভীর মাথায় হাত রেখে বললেন

-“আমার গুল্লু… আমার ঘরে নতুন সদস্য আসছে! হে ভগবান, তোমায় কোটি কোটি প্রণাম।”
ঋষি আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল
-“বাপরে! আমি কাকা হতে চলেছি? ভাইয়া, তুমি বাবা হতে চলেছ! বিশ্বাস হচ্ছে না আমার!”
অভিক সাহেবও নিজের আনন্দাশ্রু চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি ডক্টরের হাত ধরে ধন্যবাদ জানালেন। পুরো ঘরে তখন এক স্বর্গীয় আনন্দ আর উৎসবের মেজাজ ছড়িয়ে পড়েছে।
ডক্টর সেনগুপ্ত হেসে বললেন
-“আমি কিছু প্রয়োজনীয় ভিটামিন আর ওষুধ লিখে দিচ্ছি। তবে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তানভীর বিশ্রাম আর মানসিক শান্তি। কোনোভাবেই যেন ও কোনো মানসিক চাপ না নেয়।”
ঋষি ডক্টরকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বাইরের দিকে নিয়ে গেল
-“আসুন ডক্টর, আপনাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি।”
রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেব বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে এই নতুন দম্পতির নিজেদের মধ্যে কিছু একান্ত সময়ের প্রয়োজন। রাখী রায়চৌধুরী আর্ভিকের মাথায় হাত বুলিয়ে ইশারায় বললেন
-“তোরা কথা বল। আমি নিচ থেকে তানভীর জন্য একটু স্যুপ আর ফল নিয়ে আসছি।”

সবাই একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা আলতো করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটা এখন একদম শান্ত। জানলা দিয়ে আসা রোদের আলোটা যেন আরও একটু উজ্জ্বল, আরও একটু রঙিন হয়ে উঠেছে। আর্ভিক বিছানায় তানভীর একেবারে গা ঘেঁষে বসল। তার বুকের ভেতর তখন আনন্দের এক মহাসমুদ্র তোলপাড় করছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে তানভীর চোখের জল পরম মমতায় মুছিয়ে দিল। তারপর সে কোনো কথা না বলে তানভীকে আলতো করে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল।
তানভীও তার সমস্ত ক্লান্তি আর দুর্বলতা ভুলে আর্ভিকের চওড়া বুকে মুখ লুকাল। তার মনে হলো, এই বুকের স্পন্দনটুকুই তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
আর্ভিক তানভীর কপালে এক গভীর, উষ্ণ আর আবেগঘন ঠোঁটের পরশ এঁকে দিল। সেই চুম্বনে কোনো কামনার লেশ ছিল না, ছিল কেবল এক পরম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর সীমাহীন ভালোবাসা। সে তানভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত ভারী ও আবেগময় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৮

-“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, তানভী… থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ আমার জীবনে আসার জন্য। আমাকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা দেওয়ার জন্য। আমি বাবা হতে চলেছি তানভী… আমাদের ভালোবাসার একটা অংশ আমাদের মাঝে আসতে চলেছে।”
তানভী আর্ভিকের বুকের জামাটা শক্ত করে চেপে ধরে মৃদু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তবে এ কান্না বেদনার নয়, এ কান্না এক চরম সার্থকতার, এক পরম প্রাপ্তির। তানভী একজন সফল নারী হিসেবে কেরিয়ারের শীর্ষে পৌঁছানোর চেয়েও আজ তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে তার গর্ভে বড় হতে থাকা এক চিলতে নতুন প্রাণ এবং তার পাশে থাকা এই ভালোবাসার মানুষটি।
আর্ভিক তানভীকে নিজের বুকের সাথে আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরল। বাইরে তখন সকালের সোনাঝরা আলোয় পুরো পৃথিবী সেজে উঠেছে এক নতুন জীবনের জয়গান গাইতে।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী শেষ পর্ব