Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী শেষ পর্ব

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী শেষ পর্ব

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী শেষ পর্ব
তানিশা ভট্টাচার্য্য

আদভিকের বুকের ভেতরটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছে। ডায়েরির সাদা পাতা আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ তুলে দিয়েছে। তার মনে হচ্ছে, এই শান্ত চৌধুরী নিবাসের দেয়ালগুলো তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলবে যদি না সে এখনই সত্যের মুখোমুখি হয়।
নিচে তখন সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে। বড় ড্রয়িংরুমে এক থমথমে আভিজাত্য। রাখী রায়চৌধুরী আজ বড় একা। গত ছয় বছর আগে এক নিস্তব্ধ দুপুরে অভিক সাহেব ওনাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছেন। হার্ট অ্যাটাকটা কেড়ে নিয়েছিল ওনার জীবনের স্তম্ভকে। এখন ওনার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা থান, আর কপালে ভাঁজ পড়া চিন্তার রেখা। আদভিক হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই রাখী রায়চৌধুরী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন
-“অগ্নি সোনা! কোথায় যাচ্ছিস ভাই? সেই কখন থেকে তোকে খাওয়ার জন্য ডাকছি। সন্ধ্যা পার হয়ে গেল, ঘরে দরজা দিয়ে কী করছিলি এতক্ষণ?”

আদভিক কোনো উত্তর দিল না। তার কান দিয়ে তখন কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ডায়েরির সেই কাল্পনিক চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সে ঝড়ের বেগে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ঋষির স্ত্রী। গত তিন বছর আগে ঋষির সাথে তার বিয়ে হয়েছে, তাদের কোল আলো করে এসেছে এক ছোট্ট রাজকন্যা। তিনি হাতে খাবারের থালা নিয়ে ডাকলেন
-“ও অগ্নি! দাঁড়িয়ে যাও বাবা, অন্তত দুটো খেয়ে যাও!”
অগ্নি দরজার হাতল ধরে একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে কেবল বলল
-“না ছোটমা, না ঠাম্মি! আমি এখন খেতে পারব না। আমার একটা জরুরি কাজ আছে, আমি আসছি!”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় মুখোমুখি দেখা হলো ঋষির সাথে। সারাদিন অফিস সামলে ক্লান্ত শরীরে ঋষি সবে ফিরছিল। তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই অগ্নি পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। ঋষি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই গ্যারেজে বাইকের স্টার্ট নেওয়ার গর্জন শোনা গেল। তীব্র গতিতে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল আদভিকের কালো বাইকটা। ভিতরে এসে অফিসের ব্যাগটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল ঋষি। কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল
-“কোথায় গেল অগ্নি? ওর চোখেমুখ ওমন কেন? মা, কী হয়েছে?”
রাখী দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলেন। মৃদু স্বরে বললেন
-“জানি না রে বাবা! ছেলেটা যেন আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।”

শহরের রাজপথ চিরে আদভিকের বাইক তখন উল্কার গতিতে ছুটছে। তার প্রথম গন্তব্য তার “মামার বাড়ি”। ডায়েরি টা থেকে সে তার মামার বাড়ির ঠিকানা পেয়েছিল। যে মামার কাঁধে চড়ে সে সারাদিন ঘুরে বেড়াত, আজ সেই মামার বাড়ির সামনে এসে সে পাথর হয়ে গেল। মেইন গেটে বড় একটা তালা ঝুলছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। জানলার শার্সিগুলোয় ধুলোর আস্তর। যে বাড়িতে এক সময় হাসির রোল উঠত, আজ সেখানে জমাটবদ্ধ অন্ধকার বিরাজমান। আদভিক দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল
-“সবাই কোথায় গেল? কী হচ্ছে এসব? কেন আমার থেকে সব লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?”
সেখান থেকে বাইক ঘুরিয়ে আদভিক ঝড়ের বেগে ছুটল ‘স্বপ্নবিলাস’-এর দিকে। আর্ভিক আর তানভীর স্বপ্নের সেই নীড়। কিন্তু গেটের সামনে আসতেই আদভিকের বুকটা হাহাকার করে উঠল। এক সময়ের রাজকীয় অট্টালিকা আজ যেন এক বিবাগী সন্ন্যাসী। আভিজাত্যের পালিশ চটে গিয়ে সেখানে শ্যাওলা আর লতাগুল্মের রাজত্ব। লোহার গেটটায় মরচে ধরেছে। বাগানের দামী ফুলগাছগুলো আগাছায় ঢাকা পড়েছে।

-“মোহন দাদু! ও মোহন দাদু!”
অগ্নি চিৎকার করে ডাকল। মোহন কাকা আর তার প্রতীকই তো ছিল এই বাড়ির কেয়ারটেকার। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। নিস্তব্ধতা যেন তাকে উপহাস করছে। এক সময় যা ছিল আলোয় সজ্জিত, আজ তা এক ধ্বংসস্তূপের কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ আদভিকের শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে এল। সে গেটের বাইরে ধুলোমাখা মাটিতে ধপ করে বসে পড়ল। তার দু-হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল। ভেতরের জমানো কষ্টগুলো আর বাধ মানল না। নিস্তব্ধ রাতকে বিদীর্ণ করে তার গলা চিরে বেরিয়ে এল এক তীব্র আর্তনাদ। সে ডুকরে কেঁদে উঠল
-“পাপা… মাম্মা… তোমরা কোথায়? এই বিজন অন্ধকারে তোমরা আমাকে কেন একা ফেলে গেলে?”
কান্নার নোনা জল মাটির ধুলোয় মিশে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করল। কিছুক্ষণ পর আদভিক মাথা তুলল। তার ভেজা চোখে তখন শোকের বদলে ফুটে উঠেছে এক ভয়ানক প্রতিজ্ঞা। সে উঠে দাঁড়াল, চোখ মুছে বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরল।
সে মনে মনে স্থির করল, যাই হোক না কেন, এই কুয়াশা তাকে ভেদ করতেই হবে। যে রহস্যের মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছে, সেই মেঘ সে ছিঁড়ে ফেলবে। এই ইতিহাসের প্রতিটি ধুলিকণা তাকে জবাব দিতে বাধ্য হবে।
-“আমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি ঠাম্মির কাছে পাব…ঠাম্মি জানে… ঠাম্মি সব জানে!”
সে বিড়বিড় করে বলল। সে আবার বাইক স্টার্ট দিল। তবে এবার আর কোনো পলায়ন নয়, এবার মুখোমুখি হওয়ার পালা। সত্যের মুখোমুখি। আদভিক ফিরছে চৌধুরী নিবাসে, যেখানে তার শৈশব আর তার পরিবারের গোপন কান্না একসাথে লুকিয়ে রাখা আছে।

মিনিট দশেকের মধ্যেই বাইক চালিয়ে চৌধুরী নিবাসের লনে এসে থামল আদভিক। ধুলোমাখা শরীর, উস্কোখুস্কো চুল আর চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জল-সব মিলিয়ে এক চরম বিধ্বস্ত রূপ। সদর দরজা ঠেলে সে যখন ভেতরে ঢুকল, ড্রয়িংরুমে তখন এক ভারী নিস্তব্ধতা। ঋষি, তার স্ত্রী এবং রাখী রায়চৌধুরী সবাই যেন কোনো এক অশুভ আশঙ্কায় বসে ছিলেন।
আদভিককে দেখেই রাখী রায়চৌধুরী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে তাঁর অভিজ্ঞ চোখ দুটি কুঁচকে গেল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন
-“কী হয়েছে বাবা? কোথায় গিয়েছিলি ওভাবে? তোর এ কী চেহারা হয়েছে?”
আদভিক কোনো উত্তর দিল না। সে টলটলে পায়ে এগিয়ে এসে ধপ করে রাখী রায়চৌধুরীর সামনে মেঝেতে বসে পড়ল এবং ওনার হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে অসহায়ভাবে মাথা রাখল রাখী রায়চৌধুরীর কোলে। নাতির এই করুণ অবস্থা দেখে রাখী রায়চৌধুরীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। রাখী রায়চৌধুরী কাঁপাকাঁপা হাতে আদভিকের গালে হাত রাখলেন। এরপর পরম মমতায় বললেন
-“কী হয়েছে আমার অগ্নি সোনার? বল আমাকে… কেউ কি কিছু বলেছে তোকে?”
আদভিক মুখ তুলে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো জেদ নেই, আছে কেবল একরাশ শূন্যতা। ধরা গলায় সে বলল

-“ঠাম্মি, আমার মাম্মা-পাপা কোথায়?”
‘বাবা-মা’ শব্দটা শোনামাত্রই রাখী রায়চৌধুরীর হাতের আঙুলগুলো স্থির হয়ে গেল। যেন কোনো এক নিষিদ্ধ সত্যের স্পর্শ লেগেছে তাঁর শরীরে। মুহূর্তের জন্য ওনার ফর্সা মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন
-“ওমা! এ কী কথা? তোকে তো বলেছি দাদুভাই, তোর পাপা আর মাম্মা বিজনেসের কাজে অনেক দূরে গেছে। ফিরতে দেরি হবে…”
-“তুমি মিথ্যে বলছো ঠাম্মি!”
আদভিক গর্জনের মতো চিৎকার করে উঠল। তারপর আবার অসহায় স্বরে বলল

-“প্লিজ মিথ্যে বোলো না। আমি জানি তারা কাজে গেছে, কিন্তু সেই কাজের শেষ কোথায়? আজ আমি স্বপ্নবিলাস ঘুরে এলাম, মামার বাড়ি ঘুরে এলাম। সবখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর অন্ধকার। তুমি আমাকে বলো… ভাইজাক গিয়ে কী হয়েছিল? কেন মাম্মার ডায়েরিটা মাঝপথে রক্তে ভিজে থেমে গেল? কেন?”
‘ভাইজাক’ শব্দটা আছড়ে পড়তেই রাখী রায়চৌধুরীর চোখের পলক থমকে গেল। চশমার আড়াল থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ওনার কুঁচকানো গালে। তিনি যেন এক লহমায় ষোলো বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনে ফিরে গেলেন। ঋষিও তখন স্থবির হয়ে সোফায় বসে। পুরো ঘরটা যেন এক নিমেষে শ্মশানের স্তব্ধতায় ডুবে গেল। রাখী রায়চৌধুরী এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যা যেন এক শতাব্দীর দীর্ঘ জমাটবদ্ধ হাহাকার। তিনি আদভিকের কপালে হাত বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন
-“তুই তবে সব জেনে ফেলেছিস দাদুভাই? সেই ডায়েরিটা….”
আদভিক মাথা নাড়ল। রাখী রায়চৌধুরী শূন্যের দিকে তাকিয়ে যেন কফিনবন্দী কোনো এক স্মৃতিকে মুক্ত করতে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর আজ যেন কোনো পুরনো উপন্যাসের বিষাদমাখা সুরের মতো বেজে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন…………

৮৮১ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ। যান্ত্রিক চাকার নিরন্তর ঘূর্ণন আর রাস্তার দুই পাশের ধাবমান দৃশ্যপট পেরিয়ে রায়চৌধুরী পরিবার যখন অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজাক শহরে পা রাখল, তখন সূর্য অনেকটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
প্রায় ১৬ থেকে ১৯ ঘণ্টার ক্লান্তিহীন যাত্রার শেষে বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাসের ঘ্রাণ নাকে আসতেই আর্ভিকদের শরীরের অবসাদ যেন কিছুটা ফিকে হয়ে এল।
পুরো পরিবার একসাথে। গাড়ির চালকের আসনে আর্ভিক, পাশে ডায়েরি হাতে তানভী। এই সুন্দর মুহূর্ত গুলো সে ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করছে। পেছনের সিটে অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরী, তাদের আভিজাত্যমাখা প্রশান্তি চোখেমুখে। আর ছিল ঋষি ও ছোট্ট দুই বছরের প্রাণোচ্ছ্বল অগ্নি। হোটেলের চেক-ইন সেরে যখন সবাই একটু গা এলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে, তখনই শুরু হলো অগ্নির চিরচেনা আধো-আধো বুলি আর একগুঁয়ে বায়না।

-“পাপা! সমুদ্র! জল!”
অগ্নির ছোট্ট আঙুল জানলার বাইরের দিগন্তের দিকে। এই বয়সের শিশুদের কাছে নীল জলরাশি এক মস্ত বিস্ময়। রাখী রায়চৌধুরী হেসে বললেন
-“অগ্নি সোনা, আজ নয় কালকে যাব।”
কিন্তু অগ্নি কি আর শোনার পাত্র? তার কান্নামাখা বায়নার সামনে আর্ভিকের কাঠিন্য মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। শেষমেশ আর্ভিক আর তানভী রাজি হলো অগ্নিকে নিয়ে বিচে যেতে।
গন্তব্য ঠিক হলো…”ইয়ারাদা বিচ”।
বিশাখাপত্তনমের হট্টগোল থেকে খানিকটা দূরে, পাহাড়ের ওপারে এই সৈকতটি যেন এক লুকানো স্বর্গ। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে গাড়ি নিচে নামতে শুরু করল, চারপাশের দৃশ্যপট যেন বদলে যাচ্ছে। একদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সবুজ গালিচা, আর অন্যদিকে অসীম নীল জলরাশি। শহরের কোলাহল এখানে এসে স্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু আছে ঢেউয়ের গর্জন আর নির্জন বালুচর।
গাড়ি থেকে নামতেই ঝোড়ো হাওয়া তানভীর এলোচুলগুলোকে অবাধ্য করে তুলল। অগ্নি গাড়ি থেকে নামতেই খিলখিল করে হেসে উঠল। তার খুদে দু-পা বালিতে দেবে যাচ্ছে, আর সে উত্তেজনায় তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে চাইল। আর্ভিক শক্ত করে ছেলের হাত ধরে বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ খেলাধুলার পর অগ্নিকে একটু দূরে বালিতে বসিয়ে দিয়ে আর্ভিক আর তানভী দাঁড়াল জলের একদম কিনারায়। সমুদ্রের ঢেউগুলো এসে তাদের পায়ের পাতা ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার। অস্তগামী সূর্যের শেষ আভা তানভীর মুখে এসে পড়েছে, যা তাকে অপার্থিব সুন্দর করে তুলেছে। আর্ভিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল তানভীর দিকে। তানভী যখন সমুদ্রের বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, আর্ভিক তখন পেছন থেকে আলতো করে তানভীর কাঁধে হাত রাখল।
হালকা হাসিতে আর্ভিক বলল

-“জানো তানভী, এই সমুদ্রের চেয়েও গভীর কোনো একটা জিনিস যদি পৃথিবীতে থেকে থাকে, তবে সেটা তোমার এই কাজলকালো চোখ দুটো।”
তানভী চমকে ফিরে তাকাল। আর্ভিকের চোখে এক গভীর আসক্তি আর মায়া। তানভী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল, তারপর কৌতুক মেশানো স্বরে বলল
-“উফ আর্ভিক! এসব কী বলছো? আজ কি কোনো নেশা-টেশা করেছ নাকি?”
আর্ভিক এক ধাপ এগিয়ে এল। সমুদ্রের গর্জন তখন আরও তীব্র হয়েছে। সে তানভীর দু-হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর কিন্তু স্থির গলায় বলল
-“নেশা? হ্যাঁ তানভী, নেশাই তো। তবে জানো তো, এই আর্ভিক রায়চৌধুরী আজ পর্যন্ত কোনোদিন কোনো জাগতিক নেশার কাছে মাথা নত করেনি। কিন্তু যদি বলো কোনো এক নেশায় আমি আজন্ম বিভোর হয়ে থাকতে চাই, তবে সেটা হলো ‘তানভী’ নামক এই চরম নেশা। তোমার চোখের ঐ মদিরা যে কোনো মাদব দ্রব্যের চেয়েও বেশি তীব্র।”
তানভী লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করল। এরপর আর্ভিক তানভীর হাত ধরে বালিতে হাঁটা শুরু করল। তাদের সামনে দিয়ে অগ্নি ছোট ছোট পা ফেলে দৌড়াচ্ছে। আর্ভিক হঠাৎ গেয়ে উঠল

“Kore kore sapne mere
Barson se the kitne adhoore
Dheere dheere rang saja ke
Toone kar diye unko poore…”
আর্ভিকের সাথে তানভীও গেয়ে উঠল
“Vaada hai vaada chaahenge tumko
Jeevan se zyada hai vaada vaada…”
এরপর দুজনে‌ একসাথে গাইল
“Kore kore sapne mere
Barson se the kitne adhoore
Dheere dheere rang saja ke
Toone kar diye unko poore….”

ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের মাঝখানে এসে হাজির হলো ছোট্ট অগ্নি। তার হাতে একটা ভাঙা সামুদ্রিক ঝিনুক। টলমল পায়ে এসে সে আর্ভিকের পা জড়িয়ে ধরল।
-“পাপা! দেখো! ঝিনুক!”
অগ্নির নিষ্পাপ আহ্বানে মুহূর্তেই রোমান্টিক আবেশটা মায়াবী এক পারিবারিক আবহে বদলে গেল। আর্ভিক নিচু হয়ে অগ্নিকে কোলে তুলে নিল। তানভী অগ্নির গালে একটা চুমু খেয়ে তার চুলগুলো ঠিক করে দিল। এই নির্জন সৈকতে এখন এক পূর্ণাঙ্গ সুখী পরিবারের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। সমুদ্রের নোনা হাওয়া সাক্ষী থাকল সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের।
আর্ভিক অগ্নির নাকের ডগায় আঙুল ছুঁয়ে বলল

-“কী রে বাবা, হয়েছে তো সমুদ্র দেখা? এবার কি আমরা হোটেলে ফিরব? লক্ষ্মী ছেলে হয়ে কথা দিলে কাল তোকে অন্য একটা আরও সুন্দর বিচে নিয়ে যাব।”
অগ্নি তার পাপা-মাম্মার চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। আর্ভিক অগ্নিকে কোলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল গাড়ির দিকে, একপাশে তার জীবনের ধ্রুবতারা তানভী। কিন্তু তারা জানত না, এই সোনালী স্মৃতিটাই হবে তাদের শেষ সুন্দর বিকেল। গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দের সাথে সাথে ইয়ারাদা বিচের নিস্তব্ধ বালুচরে রয়ে গেল তাদের পায়ের শেষ চিহ্নগুলো, যা পরক্ষণেই এক বিশাল ঢেউ এসে চিরতরে মুছে দিল।
ইয়ারাদা বিচের বিকেলটা যেন ছিল এক ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। গাড়ি যখন ভাইজাকের পাহাড়ি রাস্তা ধরে হোটেলের দিকে ফিরছিল, চারপাশ তখন জমাট বাঁধা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। হেডলাইটের তীব্র আলো পাহাড়ি বাঁকগুলোকে কোনোমতে দৃশ্যমান করে তুলছে। চালকের আসনে আর্ভিক, তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি নিবদ্ধ রাস্তার ওপর। পাশে তানভী, তার কোলে মাথা রেখে ক্লান্তিতে ঘুমে কাদা হয়ে আছে অগ্নি। তানভী এক হাতে আগলে রেখেছে ছেলেকে, আর অন্য হাতে ডায়েরির পাতায় কলম চালাচ্ছে। ডায়েরির পাতায় তখন কেবলই সুখের আলপনা।
কিন্তু নিয়তি তখন পাহাড়ের বাঁকে ওত পেতে ছিল।

হঠাৎ করেই পাহাড়ের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে এক দানবীয় গর্জন শোনা গেল। সামনের বাঁক থেকে কোনো সংকেত ছাড়াই ধেয়ে এল এক প্রকাণ্ড লরি। আর্ভিক শেষ চেষ্টা করেছিল স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নিজেদেরকে বাঁচানোর, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, পাহাড়ি সরু রাস্তায় সেই দানবের হাত থেকে নিস্তার ছিল না। প্রচণ্ড এক শব্দে লরিটা সরাসরি ধাক্কা মারল তাদের গাড়িটিকে।
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটা গিয়ে আছড়ে পড়ল পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে। কাঁচ ভাঙার ঝনঝনানি আর ধাতব আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। গাড়ির ভেতর তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। আর্ভিকের মাথা স্টিয়ারিংয়ে গেঁথে গেছে, কপাল বেয়ে রক্তের ধারা সাদা শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। তানভীও সংজ্ঞাহীন, তার কপাল কেটে রক্ত ঝরছে অগ্নির গায়ে। আর ছোট্ট অগ্নি? তার কপালে ঢুকে গেছে জানলার ভাঙা কাঁচের এক ধারালো টুকরো। আর্ভিক আধোখোলা চোখে শেষবারের মতো তানভী আর অগ্নির দিকে তাকাল, তারপর তার পৃথিবীটাও অন্ধকারে ডুবে গেল।
প্রায় আধঘণ্টা পর যখন আর্ভিকের চেতনা ফিরল, তখন তার কানে কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। নিজের শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা উপেক্ষা করে সে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করল। রক্তে ভেসে যাওয়া স্টিয়ারিং থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল

-“তানভী! অগ্নি!”
কেউ উত্তর দিল না। আর্ভিক দেখল অগ্নির নিথর দেহটা তানভীর কোলের ওপর পড়ে আছে। পাগলের মতো আর্ভিক গাড়ি থেকে নামল। তার নিজের পা টলছে, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু বাবার সত্তা তখন পাহাড়ের চেয়েও শক্ত। সে গাড়ির ব্যাক সিট থেকে তানভীর ওড়নাটা টেনে নিল। তারপর অমানুষিক পরিশ্রমে অগ্নিকে নিজের পিঠের সাথে সেই ওড়না দিয়ে শক্ত করে বাঁধল। এরপর টলতে টলতে তানভীকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। এক পা এক পা করে সে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে মূল রাস্তার দিকে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল সে বুঝি পড়ে যাবে, কিন্তু ভালোবাসার টান তাকে টেনে নিয়ে চলল। রাস্তায় এসে সে কোনোমতে একটা অটোকে হাত দেখিয়ে থামাল। অটোওয়ালা মাঝবয়সী এক ব্যক্তি, এই বীভৎস দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল।
-“আরে সাহেব! ইয়ে সাব ক্যায়সে হুয়া?” (সাহেব, এসব কী করে হলো?)
আর্ভিক কোনোমতে বুক চেরা কষ্টে ফিসফিস করে বলল

-“ভাইয়া… হসপিটাল লে চলিয়ে… জলদি।” (দাদা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চল)
অটোওয়ালা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে বুঝতে পারল জীবনের স্পন্দন এখানে সুতোর ওপর ঝুলছে। আর্ভিক পিঠে অগ্নিকে বাঁধা অবস্থায় তানভীকে জড়িয়ে ধরে অটোর পেছনের সিটে বসে পড়ল। অটোওয়ালা সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিল শহরের হাসপাতালের দিকে। হাসপাতালে পৌঁছে আর্ভিক টলতে টলতে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার হাত কাঁপছে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। সে অস্ফুট স্বরে বলল
-“ভাইয়া… আপকা কিতনা হুয়া?” (দাদা কত হল?)
অটোওয়ালা তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে আর্দ্র চোখে বলল
-“এ আপ ক্যায়সি বাত কর রহে হ্যায় সাহেব? আপ মুসিবত মে হো অউর হামারা তো ফরজ বনতা হ্যায় আপকি মাদদ করনে কা। হাম পয়সা নহি লে সকতে। চলিয়ে সাহেব, বরনা দের হো যায়েগা। আপ মেমসাহেব কো লিজিয়্যে অউর হাম বাবু কো লেতে হ্যায়।” (এ আপনি কী বলছেন সাহেব? আপনি বিপদে পড়েছেন, আর আপনাকে সাহায্য করা আমার কর্তব্য। আমি টাকা নিতে পারব না। চলুন সাহেব, দেরি হয়ে যাবে। আপনি মেমসাহেবকে ধরুন, আমি বাবুকে কোলে নিচ্ছি।)

হাসপাতালের করিডোরে তখন যুদ্ধের আবহ। খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছেন অভিক সাহেব, রাখী রায়চৌধুরী আর ঋষি। ওটি-র (OT) বাইরে লাল বাতিটা যেন এক জ্বলন্ত শঙ্কার মতো জ্বলছে। দীর্ঘ সময় পর ডাক্তারবাবু যখন বাইরে বেরিয়ে এলেন, অভিক সাহেব দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ডাক্তারের চোখেমুখে গভীর উদ্বেগ। অভিক সাহেব কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন
-“ডাক্তারবাবু, আমার ছেলে-বউ… আমার নাতি? ওরা কেমন আছে?”
ডাক্তারবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিন্দিতে বললেন

-“দেখিয়ে, বাচ্চে কা কন্ডিশন বহুত খারাপ হ্যায়। উসকে মাম্মি-পাপা তো ঠিক হ্যায়, পর… আগর বাচ্চা বাঁচ ভি যায়ে তো উসকা ইয়াদদাস খো যায়েগা হামেশা কে লিয়ে। কিউকি কাঁচ কা টুকরা উসকে দিমাগ কে উস হিস্সে মে চুভা হ্যায় যঁহা সে সারে ইমোশনস অউর মেমোরিজ কন্ট্রোল হোতি হ্যায়।” (দেখুন, বাচ্চাটার অবস্থা খুব খারাপ। ওর বাবা-মা শারীরিক দিক থেকে সেরে উঠবেন, কিন্তু… বাচ্চাটা যদি বেঁচেও যায়, তবে সে তার স্মৃতিশক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলবে। কারণ কাঁচের টুকরোটা ওর মস্তিষ্কের এমন এক জায়গায় বিঁধেছে, যেখান থেকে মানুষের সব আবেগ আর স্মৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়।)
রাখী দেবী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ডাক্তার সেখানে থেকে চলে গেলেন।

অপারেশনের পর যখন আর্ভিকের জ্ঞান ফিরল, তার চারপাশটা ছিল হাসপাতালের ফিনাইল আর ওষুধের কটু গন্ধে ভরা। মাথার যন্ত্রণায় পৃথিবীটা দুলছিল, কিন্তু তার হৃদপিণ্ড তখন কেবল একটিই নাম জপছে-‘অগ্নি’। সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। একজন বাঙালি নার্স তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন
-“মিস্টার রায়চৌধুরী, আপনি এখনো সুস্থ নন! শুয়ে পড়ুন।”
আর্ভিক চিৎকার করে উঠল
-“আমার তানভী কোথায়? আমার ছেলে কোথায়?”
এক সময় ডাক্তার এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। গভীর বিষণ্ণতা তাঁর চোখেমুখে। তিনি ধীরে ধীরে বললেন
-“সরি মিস্টার রায়চৌধুরী… হাম আপকে বাচ্চে কো বাঁচা নেহি পায়ে।” (ক্ষমা করবেন…মিস্টার রায়চৌধুরী.. আমরা আপনার বাচ্চাকে বাঁচাতে পারিনি)
আর্ভিকের মনে হলো তার পায়ের তলার মাটিটা সরে গিয়ে সরাসরি নরকের অগ্নিকুণ্ডে সে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সে আর্তনাদ করে উঠল

-“অগ্নি! আমার অগ্নি সোনা চলে গেল?”
ডাক্তার দ্রুত তার ভুল সংশোধন করে বললেন
-“নেহি নেহি মিস্টার রায়চৌধুরী, শান্ত রহিয়ে। আপকা বেটা ঠিক হ্যায়। উসকি জান বচ গয়ি হ্যায়। লেকিন… আপকি ওয়াইফ দো মহিনে কি প্রেগনেন্ট থি… ওস বাচ্চে কো হাম বাঁচা নেহি পায়ে।” (না না…মিস্টার রায়চৌধুরী…শান্ত হন। আপনার ছেলে ঠিক আছে। কিন্তু আপনার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান কে আমরা বাঁচতে অক্ষম। উনি ২ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।)
আর্ভিক স্থির হয়ে গেল। আগত অনাগতর সেই দ্বন্দ্বে সে যেন দিশেহারা। একদিকে দুই বছরের আদরের অগ্নি বেঁচে আছে, অন্যদিকে তাদের ভালোবাসার আগামী এক অঙ্কুর অকালেই ঝরে গেল। কিছুক্ষণ পর তানভীরও জ্ঞান ফিরল। কিন্তু তার সেই মাতৃত্বের শূন্যতা আর অগ্নির স্মৃতি হারানোর খবর তাকে পাথর করে দিল।
আর্ভিক তখন বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। পাহাড়ের বাঁকে লরিটা যেভাবে হেডলাইট নিভিয়ে ধেয়ে এসেছিল, তা ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা। সে তার বাবা অভিক সাহেব আর মা রাখী রায়চৌধুরী ও ভাই ঋষি কে নিভৃতে ডেকে নিল।

-“বাবা, মা… একটা কথা খুব মন দিয়ে শোনো,”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বর তখন বরফের মতো ঠান্ডা।
-“এই এক্সিডেন্টটা কেউ খুব ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করে ঘটিয়েছে। আমি এখানে থাকলে অগ্নির ওপর আবারও আক্রমণ হবে। শত্রুরা ভাবুক আমরা শেষ হয়ে গেছি। তোমরা আমার ছেলেটাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। ওর পরিচয় বদলে দাও। ওকে এমনভাবে বড় করো যেন ও ঘুণাক্ষরেও আমাদের অতীত জানতে না পারে। ওর স্মৃতি তো এমনিতেও নেই, ও যেন কোনোদিন না জানতে পারে আজকের এই ঘটনাটা আর ওর আসল নাম বদলে দিও। আজ আমি আমার অনাগত সন্তান কে বাঁচাতে অক্ষম। কিন্তু আমার ছেলে কে আর আমি হারাতে পারব না।”
কথা গুলো আক্ষেপ নিয়ে বলল আর্ভিক, এরপর তানভীর হাত শক্ত করে ধরল।
-“আমরা দুজনে আজই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। সবার চোখে আমরা মৃত। এমনকি তানভীর বাবা-মাকেও কিচ্ছু জানাবে না তোমরা।”
সেই রাতেই এক নিস্তব্ধ হেলিকপ্টার যাত্রায় আর্ভিক আর তানভী অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমাল।

বর্তমান….
ঠাম্মির মুখে এই আখ্যান শুনে আদভিক স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা যেন বিদ্রূপ করছে তাকে। সে এতকাল এক মিথ্যের আবরণে ঢাকা ছিল!
আদভিক অস্ফুট স্বরে বলল
-“আমার বাবা-মাকে কারা মারতে চেয়েছিল? কেন তারা আমাদের ধ্বংস করতে চাইল?”
রাখী রায়চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
-“তোমার বাবার পুরনো শত্রুরা, দাদুভাই। তোমার বাবা সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত। তুমি তোমার মায়ের ডায়েরি পড়ে কি ভেবেছিলে তোমার বাবার শত্রু মাত্র একজন? ওর আদর্শের পেছনে হাজার হাজার শত্রু ওত পেতে ছিল।”
আদভিক উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল

-“তারপর কি হলো ঠাম্মি? আমার… দাদু-দিদা?”
রাখী রায়চৌধুরী আঁচলে চোখ মুছে বলতে লাগলেন
-“তোমার দাদু-দিদা কে তোমাদের মৃত্যুর মিথ্যা খবর দেওয়া হলো। খবরটা পেয়ে ওনারা ভেঙে পড়েছিল। তোমার মামা তৃষাণ, যে বাইক রাইডিং পাগল ছিল, সে সেই দিনই সব ছেড়ে দিল। তারা এই দেশের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে চলে গেল। পুলিশ যখন ইনভেস্টিগেশন করছিল, তখন তোমার মায়ের ডায়েরিটা পায়। আমি সেটা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলাম সেখানে, যেখান থেকে আজ তুমি এটা খুঁজে পেয়েছ। দুদিন পর তোমার যখন জ্ঞান ফিরল, তোমাকে আমরা বোঝালাম তোমার বাবা-মা বিজনেসের কাজে দেশের বাইরে গেছে। তারপর আমরা কলকাতায় চলে এলাম। তোমার আসল পরিচয় মুছে দিয়ে আমরা ‘আদভিক’ নামটা নিলাম।”
আদভিক এবার সরাসরি ঠাম্মির চোখের দিকে তাকাল। তার কন্ঠস্বর কাঁপছে
-“তার মানে… আদভিক আমার আসল নাম নয়? তাহলে আমার নাম কি? আমি কে?”
রাখী রায়চৌধুরী আদভিকের গালে হাত রাখলেন। ওনার ঠোঁট কাঁপছে। ১৬ বছর পর সেই নামটা উচ্চারণ করার সাহস সঞ্চয় করছেন তিনি। তিনি ধীরে ধীরে বললেন

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৫৯

-“তোমার নাম…”
ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের স্তব্ধতা ভেঙে যেমন সেই লরিটা এসেছিল, তেমনি চৌধুরী নিবাসের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে বেজে উঠল কলিং বেল।
“ডিং ডং!”
রাখী রায়চৌধুরী চমকে উঠলেন। রাতের অন্ধকারে এই অসময়ে কলিং বেল যেন কোনো অশুভ বার্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন
-“এত রাতে আবার কে এলো?”
আদভিক উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন হাজারো প্রশ্ন, কিন্তু চোয়াল তার বাবা আর্ভিকের মতোই শক্ত। সে বলল
-“তুমি বসো ঠাম্মি, আমি দেখছি।”
আদভিক ধীর পায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। সে কি তার অতীতের কোনো দূতের মুখোমুখি হতে চলেছে? নাকি নিয়তি আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করতে যাচ্ছে? সে দরজার হাতল ধরল। তার মনে তখন কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়া বইছে। দরজাটা খুলতেই বাইরের শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল তার মুখে। দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে?

সমাপ্ত