Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৫

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৫

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৫
রোজ ও রুশা

” গাড়িটার ভিতর হালকা কফির ঘ্রাণ মিশে আছে বৃষ্টিভেজা রাতের ঠান্ডা বাতাসে। উইন্ডশিল্ডে টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, আর তার মাঝেই নাভানের এক হাতে স্টিয়ারিং, আর অন্য হাতে শক্ত করে ধরা হেরাকে।
হেরা রাগে ফুঁসছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে আছে । চোখ দুটো গোল গোল করে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে। সবার সামনে নির্লজ্জর মতো কোলে নিয়ে এই রাতে হসপিটালের ভিতর যাচ্ছে। দরদ উতলে পরছে,,মনে মনে ভাবছে, বেটা অসভ্য সব জানতি তুই। আমার ভাই হোস, আমার বাবা মা কে তাও জানতি। কিন্তু বলিস নি, ইচ্ছে করে । রাগে ফুসফুস করছে। হেরা বিরক্ত নিয়ে বলে,,,,

‘ এই অসভ্য লোক, ছাড়ুন আমায়!
– নাভান একচুলও নড়লো না। বরং ঠোঁটের কোণে সেই বিরক্তিকর হাসিটা আরো গাঢ় হলো। মা যে বাবাকে মেনে নিয়েছে মনে মনে তা বুঝতে পারছে কিন্তু কিছু একটা হয়েছে মায়ের তা খুজতে হবে। এতো বছরেও বাবা মায়ের ভালোবাসা দেখে মন তৃপ্তি পাচ্ছে ভিষণ। আপাতর সে হেপি। বাকি ঝামেলা ও শেষ করবে একে একে।
“একদম তিরিং বিরিং করবে না। তাহলে একেকটা সম্পর্কের জন্য একেকটা থাপ্পড় দিবো মিসাইল গার্ল।
‘ হেরা হতভম্ব হয়ে তাকালো।
“মানে? ( হেরা )
“মানে সিম্পল। ( নাভান )
– নাভান ঠোঁটের কোণে ধীর হাসি টেনে হেরার দিকে আরো একটু ঝুঁকে এলো। চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি। এতো ঘঠনার পরো রিলেক্সে, সব টেকেল দিচ্ছে সে, যেন কিছুই হয় নি সব স্বাভাবিক।
“শুনো তাহলে হিসাব করে বলি…(নাভান)
সে আঙুল গুনতে শুরু করলো।

“মায়ের সূত্র ধরে তুমি আমার মামাতো বোন… বাবার সূত্র ধরে ফুপাতো বোন… ছোটবেলায় আমার পিছনে পরির মতো ঘুরে ‘লাভান বর’ ডাকতে ডাকতে জীবন অতিষ্ঠ করে রাখতে—সেই হিসেবে তুমি আমার শৈশবের পরি বউ। তারপর ডাকাতের হাত থেকে পালাতে গিয়ে হুট করে বর-বউ হলাম… পরে আবার নেপালে গিয়ে বিয়েও করে ফেললাম।”
নাভান নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“দাঁড়াও… হিসাব এখানেই শেষ হয় নি ।
হেরা চোখ ছোট করে তাকালো।
“ পাগল নাকি!!
নাভান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে গেল—
“রোজ আর রুশার সূত্র ধরে তুমি আমার বেয়াইনি। আবার কাজল খানের আদরের মেয়ে হিসেবে তুমি আমার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার যুদ্ধের পার্টনারও হতে পারো।”
হেরা হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। তারপর কপালে হাত ঠেকালো।
“আপনি কি জন্মগতভাবে পাগল, নাকি পরে ট্রেনিং নিয়েছেন?”
হেরাকে কোলে থাকা অবস্থায় গাড়ি চালাতে চালাতে বললো নাভান —
” এখনো চাচাতো-খালাতো-দেওরাতো সম্পর্ক বের হওয়া বাকি আছে!
****ভালোবাসার জগতে সম্পর্ক তৈরি করতে জানতে হয়। সাধারণ মানুষ একটা সম্পর্ক দেখে… আমি দেখি পুরো বংশবৃক্ষ।****

হেরা কয়েক সেকেন্ড নাভানের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্ত গলায় বললো—
“আমার তো মনে হচ্ছে আপনি মানুষ না… বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো আদমশুমারির লোক! তারা বাংলাদেশের জনসংখ্যার হিসাব করে, আর আপনি মানুষের সাথে সম্পর্কের হিসাব করেন!
– নাভানের মুখে সেই গম্ভির মুচকি হাসি। হেরা মনে মনে বির বির করলো
“না ভাই, এটা নতুন রোগ! মানুষ দেখলেই সম্পর্ক বের করে!
– হেরার মুখ দেখে নাভান এবার ভ্রু নাচালো। মিসাইল গার্ল কে এটোম বোম এর মতো কথা বলতে দেখে। হেরা বিরক্ত হলো বেশ ।
“একটু পর দেখবো রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে আপনি বলবেন, এই লোকটার মামার শালার ফুপাতো ভাইয়ের সাথে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা আছে!
নাভান বুক ফুলিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো—
“সম্পর্ক খুঁজে বের করাও একটা আর্ট। সবার দ্বারা হয় না বুঝলে মিসাইল গার্ল।
হেরা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালো।

***আর আপনি সেই আর্টের হাঁটতে থাকা পারিবারিক ডিএনএ রিপোর্টার! আপনাকে নিয়ে সরকার চাইলে আলাদা মন্ত্রণালয় খুলতে পারে ‘সম্পর্ক আবিষ্কার ও আত্মীয়তা উন্নয়ন অধিদপ্তর!
নাভান এবার হেসে ফেললো । মন ভোলানো হাসি। আচ্ছা হেরার তো মুড অফ থাকার কথা কিন্তু সে নাভানের পাল্লায় পরে সব ভুলে গেছে। তার মানে কি তার বাবা মায়ের প্রতি টান নেই। আসলে আমরা যখন খুব বেশি চিন্তা করি মন খারাপ করি,তখন মানসিক শান্তি যার কাছে পাই তার আশ্রয়ে যেতে চাই। হেরা তো বুঝতেই পারছে না নাভান তার মানসিক শান্তি। আর এই লোক কে এই প্রথম, এতো কিছুর পরেও গম্ভির থেকে হাসতে দেখছে, এটাই যেন হেরাকে আশ্চর্য করে তুলেছে । তাই তো তার এটোম বোম এর মতো কথা না চাইতেও বের হয়ে যাচ্ছে মুখ থেকে । নাভান কিছু বলতে যাবে তার আগেই নাভানের দিকে তাকিয়ে আবারো বললো হেরা!!
“ভাই, সাবধান! আর দুই মিনিট কথা বললে আপনি প্রমাণ করে ফেলবেন পুরো বাংলাদেশই আপনার আত্মীয়!”
হেরা এবার সত্যি সত্যি নাভানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।

“এই অসভ্য লোক, ছাড়ুন আমায়! এভাবে সম্পর্ক আবিষ্কার করতে থাকলে একসময় দেখবো আপনি বলছেন, পূর্বজন্মে আমি আপনার সাত গ্রামের আত্মীয় ছিলাম!
নাভান মুচকি হেসে আরো শক্ত করে হাত ধরলো।
“সেটাও খুঁজে বের করা যাবে… সময় দাও।”মিসাইল গার্ল।
– এতো দুশ্চিন্তার মাঝেও হেরাকে স্বাভাবিক রাখতে পেরে নাভান এবার মুচকি হেসে ফেললো। সেই হাসিতে দুষ্টুমি আছে, আবার অদ্ভুত এক মায়াও আছে।
সে ইচ্ছে করেই হেরাকে আরো শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো।
“এই অসভ্য! আপনার ভিজা শার্টে আমার শরীর ভিজে যাচ্ছে! ছাড়ুন বলছি!”
“অসভ্যতার কিছু কি করেছি, মিসাইল গার্ল? বারবার অসভ্য বলছো কেন?”
“দেখুন, আমায় ছাড়ুন!”

“একদম চুপ। আমার কোলে চুপচাপ বসে থাকো বেবি দের মতো ”
“আমি বেবি না যে কোলে উঠে বসে থাকবো!
নাভান ভ্রু তুললো।
“বাচ্চারাই বুঝি শুধু কোলে উঠে?
“হ্যাঁ! ( হেরা)
“ গাধী! (নাভান)
হেরা সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠলো।
“কি বললেন? আমি গাধী? আপনি গাধা!( হেরা )
নাভান বিরক্ত মুখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“উফফ মিসাইল গার্ল… নড়াচড়া করবে না। ভয় লাগছে অন্য কিছু করে ফেলবো আমি।( নাভান)
হেরার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।
“ছি ছি! আপনি কি বাজে লোক!(হেরা)
– হেরার ছি ছি করাতে নাভান তার দিকে কেমন ভ্রু কুচকে তাকায়। যেন হেরা কি বুঝেছে তা বুঝতে চেষ্টা করছে সে । পরোক্ষনে হেরার ভাব বুঝে বলে উঠে নাক ছিটকে!

“আমি কি তোমার সাথে ইটিমেন্ট হতে চাচ্ছি? নাকি চুমু খেতে চাচ্ছি?
হেরা থমকে গেলো। বিরক্ত নিয়ে বললো!
“ তাহলে এইসব বাজে কথা বলেন কেনো?
নাভান স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে শান্ত গলায় বললো—
“ কারণ তুমি কোলে বসে এভাবে তিরিং বিরিং করলে এক্সিডেন্ট হবে। তখন যদি ভুলে গাড়ি উল্টে ফেলি?
হেরা ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো। ছি” কি ভেবেছিলো সে! নাভান কটাক্ষ করে বলে উঠে!
“এসব চলে মনে? ছি! তোমার মাইন্ড এতো বাজে তোমার মিসাইল গার্ল!
“এই একদম আমাকে এসব কথা বলবেন না।
“বলবো! হাজার বার বলবো! নিজে ভাবতে পারবে আর মানুষ বললেই দোষ? ( নাভান)
“” অসভ্য, গাধা, বাজে লোক!( হেরা)
নাভান মুচকি হেসে হঠাৎ গাড়িটা রাস্তার পাশে থামিয়ে দিলো। হেরা চমকে উঠলো।
“গাড়ি থামালেন কেন?
নাভান ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এলো। এতটাই কাছে যে হেরা নিজের নিঃশ্বাসও আটকে ফেললো।
“কারণ,( নাভান)
নাভান নিচু স্বরে বললো,

“তুমি যখন রাগ করো… তখন তোমাকে আরো বেশি বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে মিসাইল গার্ল। ( নাভান)
হেরা কিছু বলার আগেই নাভান তার কপালে টোকা দিলো।
“আর একটা কথা।
“কি?( হেরা )
“তুমি যতই অসভ্য বলো আমায়… আমার কোলে উঠে ঠিকই ফিল নাও। তা না হলে ওইদিনের মতো আঠা লেগে জোড়া লাগিনি তো আমরা। আর না, তোমায় আমি বেঁধে রেখেছি । তুমি চাইলে কিন্তু উঠতে পারতে আমার কোল থেকে … কিন্তু ওঠোনি। যাই হোক, আমার দয়ার শরীর—তাই কোলে উঠাই বাচ্চাদের।
নাভানের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। হেরা লজ্জা আর বিরক্তির মাঝামাঝি গলায় বলল—
“ আপনি আসলেই অসভ্য!
“ ধন্যবাদ, কমপ্লিমেন্টটা গ্রহণ করলাম।
বলেই নাভান হেরাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে আগলে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো, অথচ বাহ্যিকভাবে শান্ত। যেন পুরো পৃথিবী এলোমেলো হয়ে গেলেও এই মেয়েটাকে সে হাত থেকে পড়তে দেবে না।
– হাসপাতালের করিডোরজুড়ে জীবাণুনাশকের গন্ধ। সাদা আলোয় ঝলমল পরিবেশ। তুষার আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। নার্সরা সম্মান মিশ্রিত কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে। কারণ এই মানুষটাকে তারা চেনে। কঠিন, ভয়ংকর, নির্মম। অথচ আজ সেই মানুষটাই একটা মেয়েকে বুকের সাথে এমনভাবে ধরে রেখেছে, যেন কাঁচের পুতুল।

অন্যদিকে, তুষারের কেবিনে বসে ঝিনুক নীরবে কাঁদছে।
তার চোখ লাল হয়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে। নাভানকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। ছেলেটা বাইরে যতটাই শক্ত, ভেতরে ততটাই ভাঙাচোরা,এটা খুব কম মানুষ জানে।
তুষার চেয়ার টেনে ঝিনুকের সামনে বসে নরম গলায় বলল—
“ এই ঝিনুক মালা, প্লিজ জান… এমন করে কেঁদো না। নাভান সব সামলে নেবে। আমরা আছি তো ওর পাশে। তাই না?
ঝিনুক ভেজা চোখে তাকাল।
“আমি মামনিকে চিনি তুষার… উনি কখনো সহজে আংকেল কে মেনে নেবেন না। আমি শুধু চাই নাভানের একটা সুন্দর পরিবার হোক… এক মন বলছে মামনি মেনে নিয়েছে কিন্তু!
তুষার কথা শেষ করতে না দিয়ে হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“ তুমি না ওর বড় বোন? তোমাকেই তো শক্ত থাকতে হবে। আর আমরা ছেলে মানুষ… অসম্ভবকেও সম্ভব করি ।
একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
“ দেখবে, একদিন সবাই একসাথে থাকবে। ইতিহাসের পাতায় তোমাদের বন্ধুত্বের গভীরতা লেখা থাকবে।
ঝিনুকের চোখে আবার পানি জমল।
তুষার এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

“উফফ… এত সুন্দর করে কাঁদে কেউ? আমার লেডি বাইকার বউয়ের এই রূপ তো নতুন, দেখেই আমি হার্ট এর রুগি হয়ে যাচ্ছি । জান বিয়ের ডেট কিন্তু আরো আগে আনবো !
ঝিনুক কটমট করে তাকাল।
“চুপ করেন হাতুড়ে ডাক্তার।
তুষার মুচকি হাসল। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল—
“ জান, আমার একটা কথা রাখবে?
“ কি ?
“ একটু চোখ বন্ধ করবে ?
ঝিনুক ভ্রু কুঁচকালো।
“কেন?”
“একটা মেডিসিন দেব।”
“কিসের মেডিসিন?”
তুষার নিচু স্বরে বলল—

“যেটা তোমার সব দুশ্চিন্তা কয়েক মুহূর্তের জন্য উধাও করে দেবে।”
ঝিনুক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
বাইরে তখন আচমকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার পাশে সাদা-আকাশি রঙের পর্দা বাতাসে দুলছে। পুরো কেবিনে এক অদ্ভুত কোমলতা ছড়িয়ে পড়েছে।
তুষার প্রথমে ঝিনুকের কাটা হাতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর দুই হাতে তার মুখ তুলে নিল।
ঝিনুক চোখ খুলে কিছু বলার আগেই তুষার নিজের ঠোঁট তার ঠোঁটের ওপর ছুঁইয়ে দিল। মুহূর্তটা থমকে গেল। ঝিনুক প্রথমে সরে যেতে চাইল,কিন্তু তুষার বাধা দিলো অনেক দিন পর কাছে পেয়েছে মেয়েটাকে। এতো সহজে ছেড়ে দিবে এতো ভালো ডক্টর সে নয় । তুষারের শার্টের কলার শক্ত করে ধরল ঝিনুক । তুষার তাকে আরও গভীরভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও জোরালো হলো। ঠিক তখনই—কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নাভান, কোলে হেরা। দৃশ্যটা দেখে নাভান এক সেকেন্ড থমকে গেল। হেরা তো চোখ বড় বড় করে তাকিয়েই রইল। নাভান কাশির ভান করে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।

“উহুম… সরি! ( নাভান)
– তুষার নাভান কে ঠিকি দেখতে পেয়েছে। কিন্তু ঝিনুক উলটো থাকায় দেখে নি। হাতের ইশারা করতে নাভান হেরাকে কোলে রেখে দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলো। করিডোরে দাঁড়িয়েই সে হেরার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করল—
“এই মেয়ে, এখনো ওইদিকে কি হা করে দেখছ?
হেরা চমকে উঠল।
“ আমি… আমি তো কিছু!
“ কি লুচু মেয়ে রে বাবা! বড়লোকি কাজকারবার দেখতে এত ইচ্ছা তোমার?
– লজ্জায় হেরার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেল। সে আর একটা কথাও বলল না। নাভান মুচকি হেসে বুঝে গেল, মেয়েটা ভয়ানক লজ্জা পেয়েছে। যাক দুশ্চিন্তা থেকে কিছুক্ষন এর জন্য মুক্তি তো দিয়েছে মেয়েটাকে এটাই অনেক।
কিছুক্ষণ পর হেরাকে অন্য কেবিনে শুইয়ে এক্স-রে আর ব্লাড টেস্টের প্রস্তুতি নেওয়া হলো।
নার্স সিরিঞ্জ বের করতেই নাভানের মুখের রঙ পাল্টে গেল। সে দ্রুত বলল—
“ রক্ত না নিয়ে কি টেস্ট করা যায় না সিস্টার?
নার্স হেসে ফেলল। পাশ থেকে ঝিনুকও হাসি চাপাতে পারল না। নার্স সিরিঞ্জটা একটু সামনে আনতেই নাভান ভয়ার্থ গলায় বলে উঠল—

“ ক্যানসেল! এই টেস্ট করা লাগবে না। ও মাই গড! এত বড় সিরিঞ্জ!
ঝিনুক এর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে!
“ এই ঝিনুক! তুষার ভাইকে ডাক! এই টেস্ট বাতিল করতে বল!
ঠিক তখনই তুষার কেবিনে ঢুকল।
“ যে ছেলে রক্ত নিয়ে খেলে, সে আজ সিরিঞ্জ দেখে ভয় পাচ্ছে? লাইক সিরিয়াসলি ?!
নাভান গম্ভীর মুখে বলল—
“ভাই, এটা অন্য রক্ত। ও আপনি বুঝবেন না।
তুষার হো হো করে হেসে উঠল।
“ সালা বাবু, এটা তোমার শরীরে ঢুকাব না, হেরার শরীরে দিব!
নাভান বিড়বিড় করল—
“সমস্যা টা তো সেখানেই …!!
হেরা অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে আছে। এই মানুষটা, যে সবাইকে ভয় দেখায়, সে একটা সিরিঞ্জ দেখে এমন কাঁপছে কেন? তুষার গ্লাভস পরে বলল—

“ আচ্ছা সরো, আমি নিচ্ছি।
কিন্তু নাভান দ্রুত হেরার হাত ধরে ফেলল।
“না… আমি ধরছি।
তারপর চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিল।
কিন্তু নাভান এর হাত… অনবরত কাঁপছে।
হেরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। এই প্রথম সে নাভানের ভয় দেখতে পাচ্ছে। কেনো এমন করছে তার প্রতি, এই লোকের তো ভালোবাসা নেই মনে। মানুষ কে মানুষ মনে করে না অহংকারে জন্য, তার উপর তাকে নিয়ে বাজি ধরে হেনোস্তা ও করেছিলো নিলয় এর সাথে । এমন না যে ভালোবাসে নাভান তাকে । পরোক্ষনেই ভাবে, না না ভালোবাসা নয় এটা কাজিন হবার জন্য, হ্যাঁ হেরা তো তার বোন হয় এর জন্য মনে হয়। মনে মনে এসব ভেবছে হেরা। তুষার ভ্রু তুলে বলল—

“ শালা বাবু, তুমি তো পুরো কেবিন কাঁপিয়ে ফেলছ! সুই কোথায় ঢুকাব বুঝতেছি না!
নার্স ঝিনুক তুষার চাপা হেসে উঠল।
নাভান নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল সত্যিই কাঁপছে। কপাল ঘামে ভিজে গেছে।
সে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। ঠিক তখনি সুই ঢুকায় তুষার, হেরা ভয়ে খামচে ধরে নাভানের হাত,, এতোক্ষন নাভানের কাপাকাপি দেখে সুই এর কথা ভুলে গিয়েছিলো। কিন্তু যখন সুই ঢুকায় তখন ভয়ে মেয়েটা এমন ভাবে খামচে ধরে নিজের নক নাভানের হাতে চামড়া ভেদ করে মাংসে ঢুকে যায়। রক্ত বের হতে লাগে কিন্তু নাভানের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হেরাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে যাতে হেরা এক চুল ও ব্যাথা না পায়। অবশেষে রক্ত নেওয়া শেষ হতেই তুষার যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল—

“ জীবনে প্রথমবার এত ভয় নিয়ে কারো রক্ত নিলাম!
ঝিনুক সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
“ বলা তো যায় না, হাতুড়ে ডাক্তার কিভাবে নেয় রক্ত! আমিও একটু ভয় পাচ্ছিলাম।
তুষার মুখ হাঁ করে তাকাল।
“ বাহ! নিজের জামাইকে সাপোর্ট না দিয়ে ওই অসভ্য গিটার ওয়ালাকে দিচ্ছ? কেয়া বাত হে মেরি পেয়ার কি রানী।
– ঠিক যেভাবে কোলে করে এনেছিল, ঠিক সেভাবেই হেরাকে বুকের সাথে আগলে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এলো নাভান। নাভানের শক্ত দু’হাতের বাঁধনে হেরা অদ্ভুত এক নিরাপত্তা অনুভব করছিল, অথচ মুখে বিরক্তির মুখোশ আঁকড়ে ধরে ছিল সে।
গাড়িতে বসতেই নাভান চুপচাপ নিজের ভেজা শার্ট খুলে ফেললো।
হেরা চোখ বড় বড় করে সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নেয়। দুই হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে—
“এই অসভ্য গিটার ওয়ালা কি করছেন! লজ্জা করে না? শার্ট পরুন প্লিজ!
নাভান ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো।
জ্বরের আগের সেই ক্লান্ত বিরক্তি তখনও চোখে স্পষ্ট।

“ বৃষ্টিতে ভিজলে এলার্জি হয় আমার। শরীর চুলকাচ্ছে ভিষণ ( নাভান )
কথাটা বলেই আবার শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিলো সে। হেরার চিৎকারে যেন সত্যিই আর তর্ক করার শক্তি পেল না।
তারপর পুরো রাস্তা দু’জনের মাঝখানে শুধু নীরবতা।
গাড়ির কাঁচে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, মাঝে মাঝে বিদুৎ চমকানোর আলোয় নাভানের ধারালো মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। হেরা চুপচাপ পাশ ফিরে বসে থাকলেও অদ্ভুতভাবে বুঝতে পারছিল— লোকটার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই হেরা প্রায় দৌড়ে ভিতরে ঢুকে যায়।
এতক্ষণ সবাই উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল।
হেরাকে সুস্থ দেখে জাওয়াদ খান স্বস্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। সেদিন সবাই নাভান ভিলাতেই থেকে যায়, কারণ বাইরে তখনও ঝড়-বৃষ্টি থামেনি। রাত গভীর।
চারদিকে নিস্তব্ধতা। দেয়াল ঘড়িতে রাত দুটো বাজতেই পুরো বাড়িটা যেন আরো শান্ত হয়ে ওঠে।
হেরা নাভানের রুমে নরম বিছানায় শুয়ে আছে।
এত নরম বিছানায় সে খুব কমই শুয়েছে। কিন্তু ঘুম আসছে না তার।
বালিশে, চাদরে… এমনকি নিজের গায়েও যেন নাভানের সেই পারফিউমের গন্ধ লেগে আছে।
একটা ভারী, পুরুষালি সুগন্ধ… অদ্ভুতভাবে মস্তিষ্কে নেশা ধরালো । হেরা বিরক্ত হয়ে উঠে বসে।

“উফ! অসভ্য লোকটার গন্ধ সবখানে কেন?
– তবুও কথাটা বলার সময় নিজের বুকের ভেতর কেমন অচেনা কাঁপন টের পেল সে। বিরক্ত মুখে রুম থেকে বের হতেই ড্রয়িং রুমের দিকে চোখ যায়। সোফার উপর আধশোয়া হয়ে আছে নাভান। ঘুমের মধ্যেও কপাল কুঁচকে আছে তার। শরীর কাঁপছে জ্বরে। হেরা একটু ইতস্তত করলো। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
কাছাকাছি যেতেই বুঝলো— লোকটার জ্বর অনেক বেশি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। চুল এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে।
হঠাৎ নাভান ঘোরের মধ্যে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করতে শুরু করলো—
“ নিয়ে যেও না… আমার পরি বউকে নিয়ে যেও না…”
হেরা থমকে গেল।
নাভানের কণ্ঠে এমন অসহায়তা সে আগে কখনও শোনেনি। হেরা একটু ঝুঁকে এলো। মুখে কাছে কান নিয়ে শুনতে চেষ্টা করলো।

“আমার পরি বউয়ের দিকে নজর দিয়েছিস তাই তোর চোখ তুলে ফেলেছি… বুঝ হওয়ার আগ থেকে আগলে রাখছি তাকে… তুই তাকে ছুঁতে চাস? তোর হাত ভেঙে ফেলবো আমি…”সে আমার অধীকার আমার কলিজা, নেপাল শহরে আগুন লাগিয়ে দিবো ওর দিকে তাকালে, তুই যত বড় মাফিয়া হস না কেনো আই ডোন্ট কেয়ার।
কথাগুলো শুনে হেরার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠলো।
তার নিঃশ্বাস আটকে এলো মুহূর্তে। পরি বউ…কথাটা যেন কানে না, সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে লাগে।
এই মানুষটা…যে সবসময় রাগ দেখায়, জোর করে, ধমক দেয়… সেই মানুষটার কণ্ঠে এত ভয়? এত অধিকার? এত ভালোবাসা?
হেরা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো নাভানের দিকে।
জ্বরের ঘোরেও লোকটা যেন কারো থেকে তাকে বাঁচানোর যুদ্ধ করছে। হেরার হঠাৎ মনে পড়লো—
ছোট ছোট মুহূর্তগুলো।
বৃষ্টির মধ্যে তাকে আগলে রাখা।
রেগে গেলেও তার হাত শক্ত করে ধরা।
সবসময় আশেপাশে অদৃশ্য দেয়ালের মতো ঘিরে থাকা। তখন সে ভাবতো— নাভান শুধু জেদি।
কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো তার একটা নরম মন আছে, খুব নরম। … এই জেদটার নাম ভালোবাসা অপ্রকাশিত অগোছালো ভয়ংকর রকম অধিকারী একটা ভালোবাসা। হেরা কবে বুঝবে এসব। হেরা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে নাভানের কপালে ছুঁয়ে দিল। গরমে হাত পুড়ে যাওয়ার মতো লাগলো। অথচ সেই মুহূর্তে তার নিজের বুকটাই বেশি কাঁপছিল। নাভান ঘুমের মধ্যেই অচেতনভাবে হেরার হাতটা চেপে ধরে ফিসফিস করে বললো—

“আমার পরি বউ…
হেরার চোখ কেঁপে উঠলো।
কেন যেন হাত সরিয়ে নিতে পারলো না সে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছিল—যার নাম হয়তো ভালোবাসা…

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৪

অথবা তার থেকেও ভয়ংকর কিছু। হটাৎ হেরার চোখ পড়ে নাভানের হাতের দিকে, ভরকে যায় হেরা, রক্ত জমাট বাধা শুখিয়ে গেছে। মনে পরে খামচে ধরা দৃশ্য। ইসস কি বাজে ভাবে যখম হয়েছে,কিন্তু লোকটা একটু ও টু শব্দ করে নি। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হলো, এদিক সেদিক তাকিয়ে ফাস্টএইড বক্স খুজতে থাকে। না পেয়ে ছুটে যায় নাভানের রুমে,বেড সাইড টেবিল থেকে ফাস্টএইড বক্স এনে, মলম লাগিয়ে দেয় নাভানের হাতে।

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৬