প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০
রোজ ও রুশা
তিন দিনের পর আজ বাসায় ফিরেছে নাভান।
বাড়িটা তখন মানুষে ভর্তি। ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা নিয়ে বসে ছিল সবাই। দরজা খুলে নাভান ভেতরে ঢুকতেই সবার চোখ গিয়ে আটকে যায় তার ডান হাতের কবজি থেকে কনুইয়ের নিচ পর্যন্ত বাঁধা সাদা ব্যান্ডেজে। পরনে একটা সাদা গেঞ্জি, তার ওপর পরা কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। চোখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা, হিমশীতল আগুন—যা পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে চারপাশ। কিন্তু নিজে কখনো উত্তাপ প্রকাশ করে না।
আজ তার ভিতরের ঝড়টা বাইরে থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় যেন এক অদম্য হিংস্রতা খেলা করছে।
সোফা থেকে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন জাওয়াদ খান। ভ্রু কুঁচকে ছেলের ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর, ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন–
” কী ব্যাপার! হাতে কী হয়েছে তোমার?”
নাভান কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতা যেন চারপাশের বাতাসকে আরও বেশি ভারী করে তুললো ।
সে জাওয়াদ খানের পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে রাখা ফুলের বড়, চিনা মাটির টবটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই, মুহূর্তের মধ্যে সজোরে এক লাথি মারল সে। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে টবটা ভেঙে খানখান হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। মাটির চটা আর গাছের পাতা চারদিকে ছিটকে গেল। আচমকা এই শব্দে সবাই চমকে উঠল।
রোজ আঁতকে উঠে পাশে বসা রুশার হাত চেপে ধরল। তুষার, অধীর, ঝিনুক—সবাই থম মেরে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে।
কাজল খান শুধু একবার চোখ বন্ধ করলেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিঃশব্দে।
তিনি বুঝে গেছেন, ছেলে কেন আজ বাসায় এসে এভাবে নিজের অদম্য রাগ প্রকাশ করছে। যখন অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন, ঠিক তখনই ঘরের জিনিসপত্র ভাঙে নাভান। মায়ের সাথে সে উঁচু গলায় কথা বলে না, তর্কে জড়ায় না; বরং রাগ হলে চারপাশের জড়বস্তু ভেঙে সে এটাই বুঝিয়ে দেয়—কাজল খানের ভুলগুলো কোথায় এবং কতটা মারাত্মক! নীরব এই ধ্বংসলীলাই নাভানের প্রতিবাদের ভাষা।
জাওয়াদ খান এবার কড়া গলায় ধমকে উঠলেন–
“কী হচ্ছেটা কী শেহতাজ ? এরকম রুড আচরণের মানে কী?”
নাভান ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল, চোয়াল শক্ত হয়ে আটকে আছে। গলার স্বরটা এতটাই ঠান্ডা আর নিচু ছিল যে, তা রাগের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভয়ঙ্কর শোনালো–
“সেটা তোমার বউকে জিজ্ঞেস করো।”
পুরো ঘর নিমেষেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ছেলের এমন বেপরোয়া ও অবাধ্য স্বভাবের জন্য জাওয়াদ খান কড়া স্বরে বললেন”
“শেহতাজ! মায়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটা এখনো শেখোনি?”
নাভান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে বলল–
“শিখেছি বলেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি না।”
“ক্লিয়ার করে বলো কী হয়েছে!”
নাভান এবার সোজা মায়ের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো মায়া নেই, আছে কেবল এক চরম জবাবদিহিতা—
“মা কেন ওই শামসুল আজমীর চৌধুরীকে ছাড়তে সাহায্য করেছে? সব মামলা কেন উঠিয়ে নিয়েছে?”
কথাটা শুনে যেন পুরো ঘরের বাতাস মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। অধীর অবাক হয়ে তাকাল। তুষার সম্পূর্ণ হতবাক। ঝিনুক ফিসফিস করে বলল—
” মামণি… তুমি সত্যি?”
জাওয়াদ খানও এক বুক অবিশ্বাস নিয়ে তাকালেন স্ত্রীর দিকে—
“কাজল রেখা… এটা সত্যি?”
অ্যাডভোকেট এমএলএ কাজল খান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। একজন অনেস্ট আইনজীবীর মুখে আজ কোনো শব্দ নেই। যেন তিনি নিজের পক্ষে বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। তারপর ধীরে ধীরে, ধরা গলায় বললেন–
“হ্যাঁ… আমি মামলা তুলে নিয়েছি।”
“কিন্তু কেন?” জাওয়াদ খানের গলা এবার রাগে ও ক্ষোভে ভারী হয়ে উঠল।
কাজল খান শান্ত অথচ সুদূরপ্রসারী গলায় বললেন–
“আমার ইচ্ছে ছিল ওর সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার। মান-সম্মান, টাকা, ক্ষমতা… সব। এখন ওর কিছুই নেই। না আছে টাকা… না আছে মানুষ… না আছে ক্ষমতা… না আছে সেই পাপের সাম্রাজ্য। একটা মানুষ বেঁচে থেকে যত বড় শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিল… সে পেয়ে গেছে।”
জাওয়াদ খান হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের টি-টেবিলে লাথি মারলেন। কাচের টেবিলটা কেঁপে উঠল বিকট শব্দে।
“এই সিদ্ধান্তটা তুমি একা নিলে? আমাকে অন্তত একবার বলতে পারতে কাজল !”
কথাটা বলেই তিনি রাগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
পুরো বাড়িটাকে যেন এক চাপা অশান্তি গ্রাস করে নিল সবার মাথায় একটাই চিন্তা—কেন এমন বিচক্ষণ, দূরদর্শী একজন মানুষ এই ভুলটা করলেন? এতে যেন বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না, তা তো নিশ্চিত। শামসুল আজমীর চৌধুরীর তো এখন হারানোর কিছু নেই। যার সব ধ্বংস হয়ে যায়, সে আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এক চরম দুশ্চিন্তার কালো ছায়া নেমে এল সবার মাঝে।
পরদিন। হেরা ভার্সিটিতে গিয়েছে । সামনে পরীক্ষা, তবুও আজ তার মন অদ্ভুত অস্থির, উদাসীন। বাসার পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কেন এমন হচ্ছে? ওই লোকটা কেন এমন করছে? শামসুল আজমীর চৌধুরীর জন্য নিলয়কে সাফার করতে হয়েছে অনেক কিছু। কিন্তু নিলয় তো তার বাবার মতো অতটা খারাপ না। তার বুকে ভালোবাসার মতো সুন্দর একটা মন আছে। ছেলেটার এই ভাঙা জীবন নিয়ে মনের অজান্তেই একটু আফসোস করল হেরা।
আর নাভান? হেরা মনে মনে ভাবল, তাকে ওভাবে থাপ্পড় দেওয়ার পর তো সে উধাও হয়ে গিয়েছিল। তিন দিন কোনো খবর ছিল না।
হেরা নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন তার বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগছিল নাভানের অনুপস্থিতিতে। এক তীব্র, চাপা রাগও ছিল নাভানের প্রতি। একটা বার ‘সরি’ বলা তো দূর, বাসায় এসে সে পুরো পরিবেশটাকে বিষিয়ে তুলেছে। অসভ্য গিটারওয়ালা একটা!
হেরা নিজেকে বোঝাতে চাইল–
“নেহাত কাজিন হয়, তা না হলে…”
বলেই সে মনের ভেতর থমকে গেল। কাজিন? নাভান কি শুধু তার কাজিন হয়? উঁহু, নাভান তো কাজিনের সম্পর্কের চেয়েও ঊর্ধ্বে—দুনিয়ার সবচেয়ে পবিত্র আর অলঙ্ঘনীয় সম্পর্কে জড়িয়ে আছে সে হেরার সাথে। নাভান যে তার বিবাহিত স্বামী, তার বর! এই মহাসত্য মনে পড়তেই হেরার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে জোর করে নিজের অনুভূতিগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়। মনে মনে নিজেকে শাসন করে–
“আমি আমার ‘জি ম্যান’কে ভালোবাসি। আমার জি ম্যান এই অসভ্য, অহংকারী গিটারওয়ালার মতো নয়।”
মুহূর্তে তিতিরের কথা মনে পড়ে হেরার। এই মেয়ে ডাকার আর নাম পেল না! তার নিজের পছন্দের নামটাই ওভাবে ব্যবহার করতে হলো? বিরক্তিতে চোখ-মুখ খিঁচিয়ে ধরল হেরা।
রোজ আর রুশা পাশে হাঁটছিল। হঠাৎ জিম সেন্টারের সামনে দাঁড়ানো একটা ছেলের দিকে চোখ পড়তেই হেরা থমকে গেল। নিলয় একটা কালো মাস্ক পরে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে শুধু তার চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই চোখ হেরা ভুলবে কীভাবে?
নিলয় হেরাকে দেখেই মাস্কটা একটু নামিয়ে হাত নাড়ল, “হেরাফুল!”
রোজ চরম বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করল–
“আবার শুরু হলো!”
রুশাও চোখ উল্টালো অবহেলায়।
কিন্তু হেরা তবুও ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। কারণ যত অন্যায়ই হোক, নিলয় কখনো তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। সে তো এই ছেলেকে একসময় বন্ধু মনে করে মনের একটা পবিত্র জায়গায় স্থান দিয়েছিল। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বন্ধুত্বের সাথে!
কাছে যেতেই নিলয় মুচকি হেসে বলল, “কেমন আছো?”
“ভালো। তুমি?”
“আলহামদুলিল্লাহ।” তারপর একটু থেমে বলল, “আজ থেকে এই ফিটনেস সেন্টার আবারো চালু হবে।”
হেরা ভ্রু কুঁচকাল, “মানে?”
“আমি চলে যাওয়ার আগে আমার ছোট ভাই ব্রাদারদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিবো। তাদের একটা কাজ করার সংস্থা করে দিবো খুব দ্রুত, হেরাফুল। এই এক মাসের ভেতর হয়তো।”
হেরা চমকে তাকাল। নিলয় নিচের দিকে তাকিয়ে এক বিষণ্ন হাসি হেসে বলল–
“সবাইকে সব বুঝিয়ে দিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। আর ফিরব না হয়তো।”
“কিন্তু কেন নিলয়?”
“কারণ তোমাদের জীবনে আমার থাকা মানেই সমস্যা। আমার উপস্থিতি কেবল অশান্তি বাড়ায়।”
কথাটা শুনে হেরার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। নিলয় আবার বলল—
“আর… অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খানকে ধন্যবাদ দিও, আমার বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। বাবাকে নিয়ে চলে যাবো অনেক দূরে। তিনিও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।”
কথাগুলো এত শান্ত, এত ধীর স্বরে বলছিল নিলয় যে, হেরার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল। ছেলেটার চোখে আজ সেই চিরচেনা উন্মাদনা নেই, নেই জোর করে কিছু পাওয়ার অগ্রাসী তাড়না। বরং একটা অদম্য ক্লান্তি আছে, এক ভাঙা মানুষের মতো নিঃশব্দে হার মেনে নেওয়া আছে। আর সেটাই হেরাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলছিল।
হেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—সব বাবা কি শামসুল আজমীর চৌধুরীর মতো হয়? আজকাল কত ছেলের অপকর্মের জন্য বাবা-মা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, সমাজের সামনে মুখ লুকিয়ে চলে। সেখানে নিলয় উল্টো বাবার পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে নিজে ভেঙে পড়েছে। যে নিলয় একসময় বাবাকে নিয়ে গর্বে পাগল ছিল, সেই নিলয়ই আজ বাবার দিক থেকে লজ্জিত, অপরাধী।
সবকিছু যেন কেমন উল্টো হয়ে গেছে।
হেরা এটাও লক্ষ করেছে—নিলয়ের আশেপাশে এখন আর কেউ নেই। যে বন্ধুরা একসময় তাকে ঘিরে থাকত, তার একটা ইশারায় জান দিতে দৌড়ে আসত, তারাই আজ ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে। মেয়েরাও আর আগের মতো চারপাশে ঘিরে ধরে না, বরং দূর থেকে সহানুভূতির চোখে তাকায়। সবাই যেন তাকে এক অদৃশ্যের মতো এড়িয়ে চলে। আর সেটার কারণও আছে। রাগ, জেদ আর অন্ধ ভালোবাসার উন্মাদনায় সে অতীতে এমন কিছু কাজ করেছে, যেগুলো ক্ষমার অযোগ্য। এমনকি হেরার জন্য পাগলামি করেছিল, তাকে সবার সামনে অপমান পর্যন্ত করেছে।
তবুও… হেরার খারাপ লাগে।
কারণ সে নিলয়কে এখনকার কলঙ্কিত পরিচয়ে চেনে না। সে তাকে প্রথম দিন থেকে দেখেছে। দেখেছে একটা ছেলে কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে তার পাশে দাঁড়াত। ভার্সিটিতে যখন কিছু হিংসুটে মেয়ে হেরাকে নিয়ে বাজে কথা বলত, অকারণে অপমান করত, তখন এই নিলয়ই সবার আগে ঢাল হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। বন্ধু হিসেবে কখনো হেরাকে একা ফেলে যায়নি।
হেরা জানে, নিলয় তাকে ভালোবাসে। অনেক গভীরভাবে ভালোবাসে। কিন্তু হেরা কখনো তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, কখনো মিথ্যে আশা দেখায়নি। শুরুতে নিলয় উন্মাদের মতো আচরণ করলেও পরে সে বুঝেছিল—ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না। আর সেই কঠিন উপলব্ধিটাই যেন ধীরে ধীরে তাকে বদলে দিয়েছে। এখন নিলয় যখন মাথা নিচু করে হেরার সামনে দাঁড়ায়, বারবার নিজের ভুল স্বীকার করে, তখন হেরার ভেতরে কোথাও একটা বন্ধুত্বের নরম জায়গা জেগে ওঠে। না চাইলেও সে নিলয়কে একটু সময় দেয়, দুটো কথা বলে। কারণ হেরা বিশ্বাস করে—
****বন্ধু যতই ভুল করুক, তাকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করাই একজন ভালো বন্ধুর দায়িত্ব****
নিলয়ের বন্ধুত্বটা হেরা বরাবরই অন্যরকমভাবে দেখেছে। ওদের সম্পর্কের ভেতরে একটা সত্যতা ছিল, একটা নির্ভরতা ছিল। হেরা সবসময় নিলয়ের ভালো দিকটাই দেখত। নিলয় তাকে এক সুরক্ষার চাদরে ঢেকে রাখত সবসময়। হয়তো সেই কারণেই নিলয়ের ভুলগুলোও সে এখন অন্ধের মতো ক্ষমা করে দিচ্ছে। নিলয়ের বাবা খারাপ হতে পারেন, তার পরিবার নিয়ে হাজার প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু নিলয় নিজে যে পুরোপুরি খারাপ না—এটা হেরা বহুবার অনুভব করেছে। কারণ খারাপ মানুষ কখনো কারও জন্য ওভাবে নিঃস্বার্থভাবে লড়াই করে না। কারও চোখের জল দেখে রাত জেগে থাকে না। আর না কাউকে হারানোর ভয় পেয়ে এভাবে তিলে তিলে ভেঙে পড়ে না ।
কিন্তু হেরা যা বোঝে না, তা হলো নিলয়ের ভেতরের সেই অন্ধকার দিকটা। নিলয় বাইরে থেকে যত শান্তই দেখাক, তার বুকের ভেতরে এখনো এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বয়ে যায়। সে এখনো হেরাকে ভয়ানকভাবে ভালোবাসে। এতটাই ভালোবাসে যে, মাঝে মাঝে সেই ভালোবাসাকে আর সুস্থ অনুভূতি মনে হয় না, মনে হয় এক ধরনের রোগাক্রান্ত আসক্তি। সে হেরার ক্ষতি করবে না ঠিকই, কিন্তু তাকে সহজে ছাড়বেও না; নিজের করে নিবে যেকোনো মূল্যে। হেরা কিন্তু এসব জটিল মনস্তত্ত্ব বোঝে না। সে শুধু তার পুরোনো বন্ধুটাকেই দেখে—একটা হারিয়ে যাওয়া ছেলে, যে সব হারিয়ে ফেলার পরও তার কাছে একটু বিশ্বাস, একটু আপনত্ব খুঁজে বেড়ায়।
“চলো… ফিটনেস সেন্টারটা দেখাই তোমাকে।”
নিলয় এমন স্বাভাবিক গলায় বলল যেন কখনো কিছুই হয়নি। না কোনো জোর, না কোনো বাড়াবাড়ি। শুধু শান্ত একটা আমন্ত্রণ।
হেরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটা কয়েকদিন আগেও কেমন উন্মাদের মতো আচরণ করত। অথচ আজকাল বারবার মাথা নিছু করে ক্ষমা চায়, কথা বলার সময় দূরত্ব বজায় রাখে। এই পরিবর্তনটা হেরার মনকে অদ্ভুতভাবে নরম করে দিচ্ছে।
রোজ পাশ থেকে কানে কানে বলল–
“যাস না।
আমার এই শান্ত শয়তানটারে একদম বিশ্বাস হয় না এখন।”
হেরা চোখ রাঙাল–
“চুপ কর।”
তারপর সে ধীরে ধীরে ফিটনেস সেন্টারের ভেতরে ঢুকে গেল। হেরার সাথে টুকটাক কথা বলছে নিলয়, খুব স্বাভাবিকভাবে। এখানে নিলয়ের কিছু ছোট ভাই ব্রাদার ও ট্রেইনাররা আছে। হেরা জানে এটা নিলয়ের ফিটনেস সেন্টার। আগেও দেখেছে, কিন্তু কখনো ভেতরে আসেনি। নিলয় এখানে ছেলে-মেয়েদের ফিটনেস সম্পর্কে অনেক সময় জ্ঞান দিতে আসত, যেহেতু এটা তার নিজস্ব সেন্টার।
ফিটনেস সেন্টারের ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। চারপাশে জিমের আধুনিক সব মেশিন, বড় বড় আয়না আর ভারী মিউজিকের শব্দ। কয়েকজন ছেলে ট্রেনিং করছিল। নিলয় ঢুকতেই সবাই সম্মান নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
নিলয় ধীরে ধীরে তার গায়ের শার্টটা খুলে পাশে রাখল। ঘামে ভেজা শরীর, কাঁধের পেশিগুলো টানটান, হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হেরা প্রথমে বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কৌতূহলবশত আবার চোখ চলে গেল নিলয়ের মুখের দিকে। নিলয় ছেলেদের এক্সারসাইজ দেখাচ্ছে, মাঝেমধ্যে কারও হাত ঠিক করে দিচ্ছে, আবার আয়নার ফাঁক দিয়ে হেরার দিকে তাকাচ্ছে। আর সেই তাকানোটা একদম অস্বস্তিকর ছিল না; বরং এমন… যেন সে শুধু নিশ্চিত হতে চাইছে হেরা সেখানে আছে কিনা।
রোজ দাঁত চেপে ফিসফিস করল–
“এই ছেলে ইচ্ছা করে শরীর দেখাচ্ছে তোরে পটাতে।”
“চুপ করবি?”
বিরক্ত হয়ে বলল হেরা।
রুশা পাশ থেকে বিড়বিড় করল–
“দুইদিন আগেও চকলেট হিরো তোকে থাপ্পড় মেরেছে। এত অপমানের পরও তোর মাথায় চকলেট হিরোর কথাই থাকার কথা। তা না, তুই এই চুইংগাম হিরোর পিছনে পরে আছিস! ধেত! আমার চরম বিরক্ত লাগছে, আমি গেলাম।”
বলে রুশা একরকম রাগ করেই চলে গেল।
কেউ বুঝতে পারে না—হেরার এই তাকিয়ে থাকার মধ্যে কোনো প্রেম নেই। আছে শুধু মায়া, আছে বহুদিনের পুরোনো বন্ধুত্বের একটা অলিখিত টান। সে শুধু দেখছে একটা ছেলেকে, যে সব হারিয়ে ফেলার পরও বারবার তার সামনে স্বাভাবিক থাকার এক ক্লান্তিকর অভিনয় করে যাচ্ছে।
কিন্তু দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা সেই মায়ার ভাষা বুঝল না।
উপরের ফ্লোরের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নাভান। সাদা গেঞ্জির ওপর কালো শার্ট, শক্ত চোয়াল, চোখ দুটো ভয়ঙ্কর রকম শান্ত। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পুরোটা সময় শুধু হেরার ওপর নিবদ্ধ ছিল। আর হেরার চোখ? সেটা বারবার গিয়ে থামছে শার্টলেস নিলয়ের দিকে।
মুহূর্তেই নাভানের বুকের ভেতর এক হিংস্র, ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। তার মনে হচ্ছিল, এখনই নিচে নেমে গিয়ে হেরার ওই অবাধ্য চোখ দুটো উপড়ে ফেলতে। নিলয় ইচ্ছে করেই করছে এসব, ইচ্ছে করেই হেরার সামনে নিজেকে এভাবে প্রদর্শন করছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে—হেরা এখন নাভানের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র দুর্বলতা। নাভানের হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ করলো । নাভান যত হেরার প্রতি কঠোর হবে, হেরা তত নাভানের থেকে দূরে গিয়ে ওই নিলয়ের কাছে আশ্রয় খুঁজবে—এই সমীকরণটা নাভান বুঝতে পারছিল।
‘তুই ভাবছিস হেরা তোকে পছন্দ করতে শুরু করছে?’ মনে মনে এক ভয়ঙ্কর শপথ নিল নাভান।
অন্যদিকে নিলয়ও আয়নার ভেতরের প্রতিচ্ছবি দিয়ে ওপরের তলায় দাঁড়ানো নাভানকে দেখতে পেল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক নীরব চ্যালেঞ্জ। যেন সে চোখ দিয়ে নাভানকে বলছে–
” দেখছিস? হেরা আমার পাশে কতটা স্বাভাবিক থাকে? আমাকে ভয় পায় না ও। তাকে পেতে তোর মতো জোর করতে হয় না। তুই তো ওকে খাঁচায় জোর করে বন্দি করে রেখেছিস ।’
দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। তবুও পুরো সেন্টার জুরে এক অদৃশ্য, বিষাক্ত যুদ্ধ ছড়িয়ে গেল। একজনের চোখ বলছে—
‘আমি ওকে ভালোবাসি, ও আমার কাছেই শান্তি পায়।’( নিলয়)
আরেকজনের চোখ বলছে—
“ও আমার অধিকার, আমার চাদরে ঢাকা সম্পত্তি।( নাভান)
হেরা এসব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কিছুই বুঝতে পারছে না। সে এখনো নিলয়ের দিকে বন্ধুর চোখেই তাকায়। একটা ভাঙা মানুষকে একটু স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে সাহায্য করছে মাত্র। কিন্তু নাভানের চোখে সেই দৃশ্যটা সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ কলঙ্কিত। তার কাছে মনে হচ্ছে—হেরা ধীরে ধীরে নিলয়ের মোহের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
হঠাৎ নাভান ভারী পায়ে নিচে নেমে এল। তার বুটের সেই পরিচিত, ভারী শব্দে পুরো জিম সেন্টার নিমেষেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হেরা ঘুরে তাকাতেই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাভান সোজা এসে এক ঝটকায় তার কবজি চেপে ধরল। কোনো কথা নেই, কোনো ভূমিকা নেই; এক পলকে সে হেরাকে নিজের চওড়া কাঁধে তুলে নিল সবার সামনে!
“এই—! কী করছেন কী? নামান আমাকে!” চমকে উঠে চিৎকার করে উঠল হেরা।
নাভান কোনো উত্তর দিল না। সে হনহন করে ক্লাবরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
হেরা কাঁধের ওপর ছটফট করতে লাগল, পা ছুড়তে লাগল–
“অসভ্য গিটার ওয়ালা ! নামান আমাকে! সবাই দেখছে! কী অসভ্যতা এটা!”
নাভান নির্বিকার, ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“Let them see ”
“আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!”
“Already.”
তার গলার সেই ঠান্ডা, অনুভূতির টোনটা হেরাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলল। এই লোকটা যখন চরম রেগে যায়, তখন চিৎকার-চেঁচামেচি করে না; বরং ভয়ঙ্কর রকম শান্ত হয়ে যায়। আর সেই শান্ত ভাবটাই চারপাশে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
নাভানের ক্লাবরুমে ঢুকে লাথি দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে ভেতর থেকে লক করে দিল নাভান। হেরাকে কাঁধ থেকে নামাতেই হেরা কয়েক পা দূরে সরে গেল। রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে।
“আপনার প্রবলেম কী?!” হেরা হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে উঠল।
নাভান কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই ধীরে ধীরে তার শার্টের হাতার ভাঁজ ঠিক করল। তারপর স্থির, সম্মোহনী চোখে তাকাল হেরার দিকে–
“তুমি নিলয়ের বডি দেখছিলে কেন?”
হেরা যেন নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে স্তম্ভিত হয়ে বলল–
“Excuse me?”
“Answer me, মিসাইল গার্ল!”
“আমি কার দিকে তাকাব, সেটা নিয়ে এখন আপনার থেকে পারমিশন লাগবে?”
“তুমি আমার অধিকার ভুলে গেছো, হেরা?”
“তাই বলে—”
“তাই বলেই।”
কথাটা খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলল নাভান। কিন্তু সেই আস্তে বলার মধ্যেও এক চাপা, দমবন্ধ করা পজেসিভনেস (possiveness) স্পষ্ট ছিল।
হেরা রাগে ও বিরক্তিতে এক তীব্র হাসি হাসল–
“Wow! আপনি সিরিয়াসলি জেলাস!
“জেলাস না।”
নাভান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। হেরা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পর্যন্ত পিছাল। নাভান তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল–
“আমি শুধু পছন্দ করি না, যে আমার জিনিস অন্য কেউ নোটিশ করুক।
“আমি কোনো ‘জিনিস’ না!” হেরা দাঁতে দাঁত চাপল।
নাভানের চোখের দৃষ্টি এক পলকের জন্য নরম হলো, সে মনে মনে বলল—
” তা তো জানি, তুমি তো আমার বুকে যুদ্ধ করার ক্ষুরধার যন্ত্রপাতি।’ কিন্তু মুখে সেই দুষ্টু, বাঁকা ভাবটা বজায় রেখে আস্তে বলল–
**সমস্যা সেটাই। তুমি মানুষ বলেই তো আমার মাথাটা নষ্ট করো। জিনিস হলে তো এতক্ষণে চুপচাপ বাক্সে বন্দি করে রাখতাম।***
হেরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তোলপাড় হতে লাগল। রাগও লাগছে তীব্র, আবার লোকটার এই অদ্ভুত,অধিকারবোধের কথাগুলো শুনলে কেন যেন ভেতরটা কেঁপেও উঠছে। এটাই নাভানের সবচেয়ে বড় সমস্যা। সে মুখে কখনো ‘ভালোবাসি’ বলে না, একবারও না! কিন্তু তার প্রতিটা আচরণে, প্রতিটা নিশ্বাসে এমন এক সর্বগ্রাসী অধিকার থাকে—যা অস্বীকার করার কোনো উপায় কোনো নারীর থাকে না।
হেরা চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “আপনি ওভাররিয়েক্ট করছেন।”
“Maybe.”
“মেবি না, করছেন!”
“তবুও… তোমাকে ওই ইডিয়টের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার ভালো লাগেনি। একদমই না।”
কথাটা এত সোজা, এত অকপটভাবে বলল যে হেরা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। নাভান এবার আরও এক পা এগিয়ে তার একদম সীমানায় চলে এল। এতটাই কাছে যে হেরা নাভানের গায়ের সেই পুরুষালী ঘ্রাণ টা পায়। Roja Parfums Haute Luxe এটি কোনো সস্তা বা সাধারণ পারফিউমের মতো চড়া বা কড়া নয়। এর ঘ্রাণ অত্যন্ত গভীর, দীর্ঘস্থায়ী, উষ্ণ, হালকা মসলাদার, কিছুটা ফুলের মিষ্টি সুবাসযুক্ত এবং দারুণ পাউডারি-স্মুথ। এটি ব্যবহার করলে চারপাশের মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পারবে যে আপনি অত্যন্ত দামি এবং বিশেষ কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন। নাভান হেরার দিকে তাকিয়ে বললো।
“তুমি জানো, আগে এই জিমে মেয়েরা কেন আসত?”
এই জিম সেন্টার হবার পর নাভান এখানেই জিম করতো। এই জিম সেন্টারের অনেক সুনাম ছিলো। নাভান আসলেই অসভ্য মেয়েরা তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। ওয়ার্কআউট ছেড়ে। লজ্জা ও অস্বস্তিতে নাভান আসাই বন্ধ করে দিয়েছিলো। এর কিছুদিন পর সেন্টার বিক্রি করে দেয়া হয়। আর তার মালিক নিলয় আজমীর চৌধুরী। নাভান বাসায় বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে নিয়েছে জিমের জন্য। নাভানের কথা শুনে
হেরা বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল।
নাভান বলল,
“ওয়ার্কআউটের চেয়ে বেশি হাফ অব দেম তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। আর আমার বিবাহিত বউ কি না হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে অন্য পুরুষের নগ্ন শরীরের দিকে? তোমার সাত জন্মের ভাগ্য মিসাইল গার্ল , যে রাগ সামলে আমি এখনো তোমার চোখ দুটো উপড়ে ফেলিনি।”
হেরা ঠোঁট চেপে রইল। কারণ নাভানের এই অহংকারটা মিথ্যে না। নাভানকে দেখলে আসলেই মেয়েরা অন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। লোকটার মধ্যে এমন একটা আলফা ম্যাসকুলিন অ্যাটিটিউড (masculine attitude) আছে, যা আলাদা করে নজর কাড়বেই। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো—আজ হেরার নিজেরই খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, অন্য মেয়েরা নাভানের দিকে ওভাবে তাকায়! নাভান হেরার চোখের সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটা ধরে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা, বিজয়ী হাসি ফুটল।
“কী হলো?” আরও ঝুঁকে এল সে, “এখন বুঝছ ফিলিংটা? যখন নিজের মানুষটার দিকে অন্য কেউ তাকায়, কেমন লাগে?”
হেরা সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, “আই ডোন্ট কেয়ার!”
“Lie better, মিসাইল গার্ল।”
“উফ! সরুন তো এখান থেকে!”
সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু নাভান চট করে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের সাথে আটকে দিল তাকে। পুরোপুরি স্পর্শ করল না, তবুও এতটা কাছে যে হেরার নিশ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।
“অসভ্য গিটারওয়ালা!”
“Hmm?”
“তিনদিন আগে আপনি আমাকে ওভাবে মেজাজ দেখিয়ে মেরেছেন। এখন আবার আমার সাথে এমন বিহেভ করছেন কেন? কী চান আপনি?
এই কথায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল নাভান। তার চোখের সেই হিংস্র দৃষ্টিটা বদলে গেল এক অজানা, গভীর অপলক চাহনিতে। তারপর সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে হেরার নরম গালের পাশে নিজের একটা আঙুল ছোঁয়াল। আলতো করে স্পর্শ করল সেই জায়গাটা।
“Still angry?”
“Obviously!”
“Good.” নাভান নিচু গলায় বলল, “রাগ থাকলে তোমাকে আরও বেশি প্রিটি লাগে।”
“আপনি ইমপসিবল!”
“আর তুমি ড্রামাটিক।”
হেরা এবার সত্যি সত্যি নিজের সব শক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা দিল–
“আমি আপনার এই ডমিনেটিং অ্যাটিটিউড নিতে পারি না! সবসময় শুধু জোর দেখান! আমি থাকব না আপনার সাথে, ব্যাস!”
নাভান এক ভ্রু তুলল, “Really?”
“হ্যাঁ! চলে যাব!”
“কোথায়?”
“যেখানে গেলে একটু শান্তি পাব!”
নাভান কয়েক সেকেন্ড এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হেরার চোখের গভীরে। তারপর আচমকাই হেরার কোমর ধরে এক হ্যাঁচকা টানে একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল। হেরার নরম বুক গিয়ে ঠেকল নাভানের সেই শক্ত পাথর, চওড়া বুকে।
“শান্তি?” নাভানের গলা এবার তীব্র আবেগে ও রাগে ভারী হয়ে এল,
***আমার এই বুক ছাড়া তোমার দুনিয়ার সব জায়গার শান্তি আমি আজীবন কাফন পরিয়ে বরখাস্ত করলাম!”***
দূর থেকে কাচের জানালার ওপাশ দিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল নিলয়। তার চোখ দুটো রাগে ও হিংসায় রক্তিম হয়ে উঠেছে। হাতে ধরা কাচের গ্লাসটা সে এত শক্ত করে চেপে ধরেছে যে, একপর্যায়ে কাচ ভেঙে তার আঙুলের চামড়া কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে, কিন্তু তার সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। তার সমস্ত চেতনা, সমস্ত দৃষ্টি শুধু একটা জায়গাতেই আটকে আছে—নাভান আর হেরা।
দু’জন একে অপরের এতটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে যেন এই বিশাল পৃথিবীতে আর কোনো তৃতীয় মানুষের অস্তিত্ব নেই।
নিলয় দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে শকুনের মতো সুর করে উঠল,
“আমার বুকে আজ যে ব্যথা দিলি নাভান… যে রক্ত আমার হাত থেকে ঝরাচ্ছিস… একদিন ঠিক এই রক্ত তোর নিজের বুকেও বইবে, দেখে নিস শেহতাজ খান নাভান! আমি তোকে শান্তিতে বাঁচতে দেব না।”
এদিকে নাভানের চোখ তখন পুরোপুরি হেরার ওপর আচ্ছন্ন। সে যেন চোখ দিয়েই হেরা’র আত্মাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তার চোখের ভাষা পরিষ্কার—
‘হেরা চাইলেও আমার… না চাইলেও আমার… ও আমার পবিত্র অধিকার।’
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—হেরা নিজেও সেই তীব্র সম্মোহনী দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরাতে পারছিল না। তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত, অবাধ্য এক কাঁপন উঠছিল। নাভানের চোখে তাকালে মনে হয়, এই লোকটা শুধু তাকে দেখছে না, বরং তাকে নিজের অস্তিত্বের ভেতরে টেনে হিঁচড়ে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। হেরার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে।
ঠিক তখনই—
“নাভান বেবি!” চিৎকার করে ঘরের দরজা একরকম ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল তিতির। তার পেছনে তাদের পুরো বন্ধুমহল।
তিতির কোনো কিছু না ভেবেই, এক ঝটকায় হেরাকে নাভানের কাছ থেকে টেনে দূরে সরিয়ে দিল। তিতিরের টানের জোর এতটাই বেশি ছিল যে, হেরা টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়েই যেত, যদি না শেষ মুহূর্তে পাশের একটা টেবিল ধরে নিজেকে সামলাত।
নাভানের চোখ মুহূর্তে তলোয়ারের মতো ধারালো হয়ে উঠল। সে তিতিরকে চরম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ তার মস্তিষ্কে হায়দার আলির সেই শেষ কথাগুলো ভেসে উঠল—
‘তিতিরকে কখনো কষ্ট দিও না বাবা… মেয়েটার হাতে হয়তো আর বেশি সময় নেই… ও মানসিকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
নাভানের শক্ত চোয়াল আরও একটু শক্ত হয়ে গেল। শুধুমাত্র একটা মানবিক দুর্বলতার কারণে, একটা মরণাপন্ন ছেলের শেষ ইচ্ছার খাতিরে সে নিজের ভেতরের বাঘটাকে খাঁচায় বন্দি করল। সে চুপ করে গেল। আর নাভানের এই আচমকা চুপ করে যাওয়াটাই হেরার ভেতরের আত্মসম্মান ও রাগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
তিতির তখন নাভানের একটা হাত নিজের দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদুরে, আদিখ্যেতা জড়ানো গলায় বলছে—
“আমি না বলেছিলাম তুমি এর আশে পাশে থাকবে না ? এখন থেকে তুমি শুধু আমার সাথেই থাকবে। এই মেয়েটা আবার তোমার এত কাছে কেন?”
নাভান তিতিরের চোখ ও কথা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে শান্ত গলায় বলল–
“তিতির, চলো এখান থেকে।”
হেরার দিকে এক চরম ঈর্ষান্বিত ও রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তিতির আবার জেদ ধরল–
“তোমাকে না বলেছি এই মেয়ের আশেপাশে তুমি থাকবে না! তুমি কেন আমার কথা শুনছো না ? আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে এর আশেপাশে থাকছ না, তুমি জাস্ট কাজিন বা ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছ। কিন্তু তুমি একে বুঝিয়ে দাও যে, আমি ছাড়া তোমার জীবনে আর অন্য কোনো মেয়ের জায়গা নেই!”
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি শান্ত হও। তুমি এখন চলো এখানে আর থাকতে হবে না , আমরা একটু বাইরে যাই, চলো।”
নাভান তিতিরকে শান্ত করার জন্য নরম গলায় বলল।
তিতিরের প্রতি নাভানের এই অদ্ভুত, অতি-সুরক্ষামূলক আবেগটা এখন পুরো বন্ধুমহলের কাছেই অত্যন্ত অসহ্য ও রহস্যময় লাগতে শুরু করেছে। কেউ বুঝতে পারছে না—কেন একটা সাধারণ বান্ধবীর জন্য সে এতটা পজেসিভ হয়ে উঠেছে! নাভান ইতিমধ্যে সবার সামনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে–
তিতিরের সাথে কেউ কখনো বেশি জোর গলায় কথা বলবি না।”
কথাটা শুনে সবাই প্রথমে অবাক হয়েছিল, পরে চরম বিরক্ত। কারণ নাভান এমনভাবে আচরণ করছে যেন তিতির শুধু তার একার সম্পত্তি। অথচ তাদের সম্পর্কের আসল নাম কী—সেটা পর্যন্ত কেউ জানে না। এই দ্বৈত আচরণটাই সবাইকে-বিরক্ত করে তুলছে।
হেরা তো ভেতরে ভেতরে চরম অপমানিত ও ক্ষতবিক্ষত বোধ করছিল। নাভান সারাক্ষণ হেরার ওপর নিজের অধিকার ফলাবে, তাকে খাঁচায় বন্দি করার জন্য ভনভন করবে, সে কার সাথে কথা বলছে তা নিয়ন্ত্রণ করবে—অথচ এখন চোখের সামনে আরেকটা মেয়েকে নিয়ে একই রকম আদিখ্যেতা করবে? সেই মেয়েটা হেরাকে অপমান করছে, আর নাভান চুপচাপ তা সয়ে যাচ্ছে?
শেষমেশ নিজের ভেতরের আত্মসম্মানের তীব্র বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে হেরা তীক্ষ্ণ, বরফশীতল গলায় বলে উঠল–
“এক্সকিউজ মি? ‘এই মেয়ে’ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছো?”
তিতির ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল–
“তোমাকেই বলছি। লজ্জা করে না তোমার? একটা বিবাহিত ছেলের সাথে এভাবে চিপকে দাঁড়িয়ে আছো ”
হেরা এবার হাহা করে হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক ভয়ঙ্কর ঠান্ডা ভাব। হেরা ধীরে ধীরে তিতিরের সামনে এগিয়ে এল। তার চোখ দুটো রাগে চকচক করছে, কিন্তু ঠোঁটে লেগে আছে এক অদ্ভুত, ধারালো হাসি। সেই হাসিটাই যেন তিতিরের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তিতির কিছু বলার আগেই হেরা মাথা সামান্য কাত করে তার দিকে তাকাল। তারপর ধীর, স্পষ্ট এবং সুতীক্ষ্ণ গলায় বলল–
“তুমি কি চোখে কম দেখো, তিতির?”
চারপাশের বন্ধুমহলের সবাই একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। হেরার গলার স্বর খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু প্রতিটা শব্দে এমন এক চাপা কর্তৃত্ব আর বিষ ছিল যে, শুনলেই বুক ধক করে ওঠে।
হেরা আরও এক পা এগিয়ে এল–
“এতক্ষণ ধরে কার দিকে আঙুল তুলছ তুমি? আমি নাকি ছেলেদের সাথে চিপকে দাঁড়িয়ে থাকি?”
তারপর নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলে এক মহাসত্যের ঘোষণা দিল ঠান্ডা গলায়–
“ভালো করে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো। আমি যার পাশে দাঁড়িয়ে আছি, সে অন্য কেউ নয়—সে শেহতাজ খান নাভান। আর নাভান আমার অফিশিয়াল ‘হাজবেন্ড’ হয়।”
কথাটা বলার সময় হেরার চোখে একফোঁটা দ্বিধা বা ভয় ছিল না। বরং সে ইচ্ছে করেই প্রতিটা শব্দে জোর দিল, যেন তিতিরের অহংকারের দেয়ালে তা তীরের মতো বিধে যায়।
“হাজবেন্ডের সাথে চিপকে দাঁড়ালে বা জড়িয়ে ধরলে সেটা নিয়ে পৃথিবীর কাউকেই জবাব দিতে হয় না তিতির। হাজবেন্ডের হাত ধরে দাঁড়ানো যায়, তার কাঁধে মাথা রাখা যায়, তার গায়ের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে থাকা যায়… কারণ সেই আইনি ও ধর্মীয় অধিকারটা একমাত্র আমারই আছে।”
চারপাশে একটা চাপা গুঞ্জন ও ফিসফিসানি উঠতেই হেরা এবার সরাসরি তিতিরের চোখের মণি বরাবর তাকাল–
“কিন্তু একটা জিনিস আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না—একটা অবিবাহিত মেয়ে যখন একটা বিবাহিত ছেলের আশেপাশে সারাদিন ওভাবে কুকুরছানার মতো ঘুরঘুর করে, অকারণে গায়ে পড়ে কথা বলে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাছাকাছি যাওয়ার নোংরা চেষ্টা করে… তখন সমাজ বা চরিত্রের ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে সে?”
তিতিরের ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে ও শক্ত হয়ে গেল। হেরা ঠোঁট বাঁকিয়ে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি উপহার দিয়ে বলল–
“আই মিন… তোমাকে কি আর একটু পরিষ্কার করে বোঝাতে হবে ‘চরিত্রের’ কোন জায়গাটার কথা আমি বলছি? নাকি তুমি নিজেই নিজের অবস্থানটা বুঝে গেছো?”
“মানে কী বলতে চাচ্ছো তুমি? তুমি আমাকে অপমান করছ নাভানের সামনে?” তিতির চেঁচিয়ে উঠল।
কথাগুলো শেষ করেই হেরা নাভানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন সে পুরো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাইছে—এই মানুষটার পাশে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর একমাত্র বৈধ অধিকার তার, অন্য কোনো সস্তা মেয়ের না।
“মানে হলো—আমি আমার স্বামীর সাথে কতটুকু কাছে দাঁড়াব, সেটা তোমায় এক্সপ্লেইন করার কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করি না।”
নাভান হেরার দিকে অপলক, স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। চারপাশে এত বড় কেলেঙ্কারী হচ্ছে, তিতির চিল্লাচেল্লি করছে, সেদিকে তার কোনো হুঁশ নেই! সে শুধু হেরার মুখের ওই একটা শব্দে আটকে গেছে—‘হাজবেন্ড!’ হেরা সবার সামনে তাকে নিজের স্বামী বলে দাবি করেছে! এই একটা প্রাপ্তি যেন নাভানের ভেতরের সব রাগ ধুয়ে মুছে দিল।
তিতিরের চোখ ততক্ষণে কান্নায় ও চরম অপমানে লাল হয়ে গেছে। তার হাত কাঁপছে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তিতির… অতিরিক্ত সুন্দর হওয়ার কারণে মেয়েটার অহংকারে মাটিতে পা পড়ত না। সে প্রথম প্রথম হেরাকে কত রকমের কটূক্তি শুনিয়েছে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। আজ সেই হেরা সবার সামনে তার অহংকার ভেঙে গুঁড়ো করে দিল।
তিতির হঠাৎ নাভানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, “তুমি কেন কিছু বলছ না জি ম্যান?” কাঁপা, ভাঙা গলায় বলল সে
“আমি কি এতটাই দেখতে খারাপ? ওই মেয়ের থেকে আমি সুন্দর নই?”
নাভান চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই… কিন্তু এক গভীর, জন্ম-জন্মান্তরের ক্লান্তি আছে,
“তিতির, এখন এসব ফালতু কথা না। চলো।”
“তুমি কি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? তুমি অন্য কারও সাথে ওভাবে থাকলে আমার দম আটকে আসে, আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে নাভান!”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরা চরম অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকাল। তিতির আজ সুস্থ বা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। সে উন্মাদিনীর মতো নিজের ভেতরের সব গোপন কথা সবার সামনে উগরে দিচ্ছে।
“তুমি ওকে ছেড়ে দাও না নাভান…” এবার সে নাভানের শার্ট খামচে ধরে মিনতি করল, “প্লিজ! তুমি ওই মেয়ের সাথে থাকলে আমি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবো, মরে যাবো আমি!”
কথাটা শুনে হেরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। এক অদ্ভুত, তীব্র ব্যথা ধীরে ধীরে তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে অজান্তেই তাকাল নাভানের চোখের দিকে। হেরার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এমনিতে তো সারাক্ষণ অধিকার ফলিয়ে, ধমক দিয়ে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয় এই মানুষটা। ‘এটা করো না’, ‘ওটার পাশে দাঁড়াবে না’, ‘ওর সাথে কথা বলবে না’—সবকিছুতেই যেন তার পুরুষালী অধিকার। কিন্তু আজ? আজ কেন সে পাথরের মতো চুপ? কেন সবার সামনে স্পষ্ট করে, তিতিরের মুখ বন্ধ করে বলছে না—
‘হেরা আমার বিবাহিত স্ত্রী, ওর দিকে আঙুল তোলার সাহস করবি না!’ কেন একবারও দাঁড়িয়ে তিতিরকে শক্ত হাতে থামাচ্ছে না সে?
হেরার বুকটা অভিমানে ও কষ্টে ভারী হয়ে উঠল। হয়তো নাভান যদি এই মুহূর্তে একবার সবার সামনে হেরাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী বলে জড়িয়ে ধরত, তবে তার এতটা কষ্ট লাগত না। একটা মাত্র বাক্যই তো যথেষ্ট ছিল এই দ্বন্দের অবসান ঘটাতে—‘হেরা আমার।’ শুধু এটুকু!
কিন্তু নাভান চুপ। সে সবসময়ই এমন। নিজের অনুভূতিগুলো বুকের এক অন্ধকার কুঠুরিতে তালাবদ্ধ করে রাখে। মানুষটার চোখে হাজারটা অনুভূতি দেখা যায়, কাজে বোঝা যায়,অদম্য রাগ বোঝা যায়, তীব্র অধিকারবোধ বোঝা যায়… কিন্তু মুখে? না, মুখে সে কখনো নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না। হেরা যখন তার কাছাকাছি থাকে, তখন সে নিজের আচরণে আগ্রাসীভাবে বোঝাতে চায়। কখনো শক্ত করে হাত ধরে, কখনো অবুঝ রাগ দেখায়, কখনো বুকের মাঝে পিষে মারতে চায়—কিন্তু ‘ভালোবাসি’ শব্দটা যেন তার ঠোঁট পর্যন্ত এসেও এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যায়। আর আজ নাভানের সেই নীরবতাই হেরার জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের, সবচেয়ে বড় অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিতির এবার আরও একটু কাছে এগিয়ে গেল নাভানের। চোখে জল চিকচিক করছে, গলায় এক করুণ অসহায়ত্ব। “বলো না নাভান… তুমি ওকে ছেড়ে দিবা তো? বলো…”
নাভান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার মাথার ভেতর এক অসহ্য, তীব্র যন্ত্রণা ও চাপ জমছে। তার নিজের স্ত্রীকে তার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য একটা মেয়ে এভাবে অপমান করছে… আর সে সং এর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে! এই নিজের ওপরকার অক্ষমতার ব্যাপারটাই এখন তাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষেপিয়ে তুলছে। কিন্তু হায়দার আলির সেই করুণ মুখটার কথা ভেবে সে কিছুই বলতে পারছে না। এক অদ্ভুত, সামাজিক দুর্বলতার জালে সে আজ বন্দি।
তিতিরের জায়গায় আজ অন্য কোনো মেয়ে থাকলে এতক্ষণে নাভান তাকে চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে এক আছাড় মারত! নিজের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর ফল সে মুহূর্তেই হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিত। বিশেষ করে—হেরার সাথে নিজেকে তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখানোর জন্য! কিন্তু তিতিরকে সে কিছুতেই আঘাত করতে পারছে না। কারণ মেয়েটার প্রতি কোথাও একটা অদ্ভুত সফট কর্নার বা পুরনো কৃতজ্ঞতার দুর্বলতা রয়ে গেছে তার। তিতিরকে এই ভেঙে পড়া, মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেখলেই নাভানের স্মৃতির মণিকোঠায় বহু বছর আগের এক চাপা পড়ে থাকা দৃশ্য জেগে ওঠে—একটা অসহায় মুখ, কান্নাভেজা দুটো চোখ, কাউকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয়। সেই আদম্য ভয় ও স্মৃতিটা থেকেই সে কখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি। আর সেই কারণেই হয়তো আজও তিতিরকে কঠিনভাবে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে পারছে না সে।
“তিতির…” নাভান খুব নিচু, ভারী গলায় বলল–
“তুমি অসুস্থ। আগে নিজেকে ঠিক করো।”
“না! তুমি আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও!”
“চলো তিতির! এখানে আর কোনো ঝামেলা করো না।”
“তুমি উত্তর না দিলে আমি এক পা-ও নড়ব না এখান থেকে।”
নাভান এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। বিরক্তি ও ক্রোধ তার চোখে ছিল স্পষ্ট, কিন্তু তা প্রকাশ পেল না। সে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যেন নিজের ভেতরের হিংস্র বাঘটাকে আবার শিকল দিয়ে টেনে ধরল। তারপর হঠাৎই সে তিতিরের হাতটা ধরল।
“Enough! তুমি এখন চুপচাপ বাসায় গিয়ে রেস্ট নেবে। বাকি কথা পরে হবে।”
কথাটা বাইরে থেকে কঠোর শোনালেও, তার গলার ভেতরের টোনে কোনো তীক্ষ্ণতা ছিল না; বরং সেখানে ছিল এক অদ্ভুত শান্ত, নিয়ন্ত্রিত কোমলতা। আর ঠিক সেই কোমলতাই হেরার বুকের ভেতরের কোনো এক অদৃশ্য তারকে এক ঝটকায় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিল। কারণ এই মানুষটা—এই নিষ্ঠুর নাভান—হেরার সাথে কখনো এত নরম সুরে কথা বলে না। না, এতটা সহজভাবে কখনো হেরা’র মান ভাঙাতে কাছে টেনে নেয় না। এই বিশেষ সুরক্ষার জায়গাটা যেন শুধু তিতিরের জন্যই আলাদা করে বরাদ্দ রাখা!
তিতির কান্নার ভেতরেও ঠোঁটের কোণে এক হালকা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে যেন এক নিশ্চুপ আশ্বাস ছিল—“তুমি আছো আমার পাশে, তাই আমার কোনো ভয় নেই।”
নাভান তিতিরকে আলতো করে ধরে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
আর হেরা… সে শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, কেউ একজন তার চোখের সামনে থেকেই তার নিজের হাতের অধিকার, নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে বিনা বাধায় কেড়ে নিয়ে চলে গেল; আর সে চাইলেও নিজের গলা থেকে একটা শব্দও বের করতে পারল না।
ঝিনুক ধীরে ধীরে এসে হেরার পাশে দাঁড়াল, “হেরা… তুমি ঠিক আছো তো?”
হেরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরে মাথা নাড়ল। তার চোখ দুটো এখনো সেই শূন্য দরজার দিকেই নিবদ্ধ—যেখান দিয়ে একটু আগে নাভান আর তিতির হাত ধরে চলে গেছে। তার দৃষ্টি যেন সেখানে আটকে গেছে, কিছুতেই নড়তে চাইছে না।
এই প্রথম হেরার বুকের এক অজানা কোণে অদ্ভুত, এক তীব্র ভয়ের জন্ম নিল। সেই ভয়টা তিতিরকে নিয়ে নয়। ভয়টা তার নিজের অস্তিত্বের জন্য। কারণ সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে—নাভান অন্য কোনো মেয়ের দিকে একটু ঝুঁকলেই, বা অন্য কাউকে একটু যত্ন করলেই তার নিজের ভেতরের আত্মাটা অস্থির হয়ে উঠছে। অস্বাভাবিক রকম তোলপাড় হচ্ছে বুকের ভেতর। এটা শুধু রাগ না, এটা শুধু অবহেলার অভিমান না—এটা আরও গভীর, আরও প্রাচীন কিছু, যেটার নাম সে এখনো নিজের মুখে স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছে।
ঝিনুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তিতির মেয়েটা যা করছে, তা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে…”
হেরা এবারও কোনো কথা বলল না। কিন্তু তার চোখের কোণে একফোঁটা নোনা জল জমে উঠল—আর সেই জলের ভেতরেই জ্বলতে লাগল এক তীব্র, অদৃশ্য ঈর্ষার আগুন।
নাভান কি তবে সত্যিই তাকে কোনো প্রেমের বাণী না শুনিয়েই, শুধু নিজের উগ্র অধিকারবোধ দিয়ে বাজিমাত করে ফেলেছে? তা না হলে আজ তিতিরের জন্য হেরার বুকে এতটা রক্তক্ষরণ হচ্ছে কেন? নাভান কি তবে তার অজান্তেই নিজের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে হেরার পুরো মনটা দখল করে ফেলেছে? নাকি হেরা নিজেই ধীরে ধীরে এমন এক ভালোবাসার চোরাবালিতে তলিয়ে গেছে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ নেই?
দিনগুলো এরপর অদ্ভুত এক স্থবিরতায় বদলে গেল। তিতির সত্যি সত্যিই বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ল। কখনো তীব্র জ্বর, কখনো মাঝরাতে আতঙ্কে কেঁপে ওঠা শ্বাসকষ্ট, কখনো একাকী বসে নিঃশব্দে অশ্রুপাত—যেন ভেতরের কোনো এক মানসিক ভাঙন তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা থাকতে দিচ্ছিল না।
আর নাভান? সে যেন নিজের সমস্ত কাজ, সমস্ত অহংকার একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু তিতিরের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিল। তিতির ওষুধ সময়মতো খাচ্ছে কিনা তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা, খাবার খেতে না চাইলে একরকম ধমকের সুরে জোর করে মুখে তুলে দেওয়া,—সবকিছুতেই তার সেই একই পুরুষালী দৃঢ়তা, কিন্তু এখন সেখানে দায়িত্বের সাথে মিশে আছে এক অদ্ভুত যত্ন।
তিতির ধীরে ধীরে আবার হাসতে শুরু করল। আর তিতিরের ঠোঁটের সেই বিজয়ী হাসি… হেরার ভেতরটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে তুষের আগুনের মতো পোড়াতে লাগল।
বন্ধুমহলও চুপচাপ সব দেখছিল । সৃজন একদিন ক্যান্টিনে বসে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“নাভানটা ইদানীং তিতিরের ব্যাপারে একটু বেশিই ইনভলভ হয়ে যাচ্ছে না?”
রোজ আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“অসুস্থ একটা মেয়েকে সাহায্য করছে, ঠিক আছে। কিন্তু এই নাটকের শেষ কোথায়? এটা কোথায় গিয়ে থামবে?”
আর হেরা? সে শুধু এক কোণে চুপ করে বসে থাকে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, মুখ ফুটে কিছু বললেই নিজের ভেতরের সেই জ্বলন্ত, নীল অস্থিরতাটা সবার সামনে প্রকাশ পেয়ে যাবে।
একদিন সবাই একসাথে ক্যান্টিনে বসে আছে। তিতির কিছুতেই দুপুরের ওষুধটা খেতে চাইছে না। নাভান বিরক্ত হয়ে পানির গ্লাস আর ওষুধ তিতিরের সামনে এগিয়ে ধরল,
“খাবে।”
“না, খাব না। তেতো লাগে।”
“তিতির! জেদ কোরো না।”
তিতির একদম অবুঝ শিশুর মতো জেদ ধরে সবার সামনে বলল–
” তুমি নিজের হাতে খাইয়ে দিলে তবেই খাব, নয়তো না।”
এই একটা লাইনেই পুরো কেন্টিন যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। বন্ধুদের মধ্যে কেউ আর হাসল না, কেউ রসিকতা করল না। শুধু চোখের ইশারায় একে অপরকে বুঝে নিল—এই সম্পর্কটা আর সাধারণ বন্ধুত্ব বা যত্নের সীমানায় আটকে নেই। নাভান এক মুহূর্ত তিতিরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একপ্রকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, প্রায় অনিচ্ছার মতো হলেও, খুব শান্তভাবে তিতিরের মুখে ওষুধটা তুলে দিল এবং পানি খাইয়ে দিল।
হেরা দূর থেকে পাথরের মতো দাড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। আর তার ভেতরের কোনো একটা সূক্ষ্ম অনুভূতি ঠিক সেখানেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এটা শুধু সাধারণ হিংসা ছিল না; এটা ছিল এক ধরনের প্রিয় মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার তীব্র শূন্যতা—যার নাম সে কাউকে বলতে পারে না, এমনকি নিজের মনকেও না। চারপাশে এত মানুষ আছে, কিন্তু হেরা যেন একাই দাঁড়িয়ে আছে এমন এক প্রান্তরে, যেখানে নাভানের চোখ আর তাকে খোঁজে না, বরং শুধু তিতিরকেই খুঁজে নেয়।
একটা সপ্তাহ এভাবেই নরক যন্ত্রণার মতো কাটল হেরার। প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে নাভান আর তিতিরকে ওভাবে একসাথে দেখতে দেখতে মেয়েটার বুকের ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে পাথরে রূপান্তরিত হচ্ছিল। তিতিরের সাথে নাভানের নিচু গলায় কথা বলা… একসাথে ক্যাম্পাসে হাঁটা… মাঝেমধ্যে তিতিরের দিকে তাকিয়ে নাভানের সেই হালকা, বিরল চিলতে হাসি… সবকিছুই হেরার আত্মাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছিল।
এদিকে শামসুল আজমীর চৌধুরীর কোনো হদিস নেই, সে যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। খান বাড়ির পরিবেশও অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ।
আর নিলয়? সে আগের মতো ক্যাম্পাসে কোনো হৈচৈ বা গ্যাংবাজি না করলেও, প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত একবার না একবার হেরার সামনে এসে দাঁড়ায়। কখনো নির্জন করিডোরে, কখনো লাইব্রেরির কোণায়, আবার কখনো ক্লাস শেষে গেটের সামনে। তার চোখে থাকে ক্ষমা আর পুরনো বন্ধুত্বের এক অমোঘ দাবি। সে মাঝেমধ্যে হেরার দিকে এমন এক তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে, যেন হেরাই তার এই অন্ধকার জীবনে বেঁচে থাকার শেষ এবং একমাত্র অবলম্বন।
অন্যদিকে তিতির দিন দিন আরও বেশি অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবুও নাভান নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে মেয়েটাকে একটু স্বাভাবিক ও হাসিখুশি রাখতে।
কিন্তু এসবের মাঝখানে সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর ঝড়টা তৈরি হচ্ছিল নাভানের নিজেরই ভেতরে। কারণ তার গুপ্তচরদের থেকে খবর এসেছে—নিলয় নাকি ইদানীং লুকিয়ে লুকিয়ে, ক্যাম্পাসের আড়ালে হেরার সাথে দেখা করছে, কথা বলছে!
আর এই একটা খবরই নাভানের মাথার রগ ফুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ সে নিলয়কে শুধু একজন সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না; সে তাকে দেখে তাদের পরিবারের এক চরম ধ্বংসের কারণ হিসেবে। নিলয়ের কুখ্যাত বাবার জন্য নাভানদের জীবনে কত কিছু শেষ হয়ে গেছে! কত রক্ত ঝরেছে অতীতে, কত পবিত্র সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। আর এখন সেই দাগী আসামির ছেলে এসে তার নিজের বিবাহিত বউ হেরার আশেপাশে ঘুরঘুর করবে, তার সাথে প্রেম করার ধৃষ্টতা দেখাবে? নাভান এটা বেঁচে থাকতে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
সেদিন রাতে ড্রিম ক্লাবের সামনে একা দাঁড়িয়ে ছিল নাভান। পরনে কুচকুচে কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখ দুটো এক ভয়ঙ্কর, হিংস্র ঠান্ডায় জমে আছে। দূর থেকে নিলয়কে ওভাবে একা আসতে দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে লক হয়ে গেল।
নিলয় তার স্পোর্টস কারের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, মুখে সেই চিরচেনা বিরক্তিকর, বেপরোয়া শান্ত হাসি।
নাভান ধীরে, বাঘের মতো পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর কোনো কথা বা সতর্কবার্তা না দিয়েই, এক ঝটকায় নিলয়ের শার্টের কলার চেপে ধরে পেছনের দেয়ালে সজোরে এক ধাক্কা মারল!
“তোকে কতবার ওয়ার্নিং দিয়েছি আমি, কুত্তার বাচ্চা?” দাঁত চেপে, হিংস্র ফিসফিসে গলায় বলল সে, “হেরার আশেপাশে আর কখনো যেন তোকে না দেখি!”
নিলয় কোনো ভয় পেল না, বরং নাভানের চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “ভালোবাসলে কোনো সিকিউরিটি, কোনো সামাজিক বাধা—এসব মানে না ব্রো।”
“ফাকিং ভালোবাসা!”
নাভানের এক গর্জনে ড্রিম ক্লাবের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ছেলেগুলোও ভয়ে চুপ হয়ে গেল।
“তোর মতো একটা লম্পট, মেয়েবাজ আবার ভালোবাসার কী বোঝে?”
“কমপক্ষে আমি তোর মতো ফেক (fake) নই নাভান। নিজের বউকে অন্য মেয়ের জন্য ফেলে রাখি না।”
“Shut the fuck up!”
নিলয় এবারও থামল না, বরং নাভানের ইগোতে আঘাত করার জন্য বলল–
“তুই আসলে ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছিস নাভান। তুই ভয় পাচ্ছিস যে হেরা আমার এই নিঃস্বার্থ রূপটা দেখে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে যাবে!”
এই একটা কথাই যেন নাভানের ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে এক ড্রাম পেট্রোল ঢেলে দিল! সে নিলয়কে আরও শক্ত করে দেয়ালে চেপে ধরল, তার গলার নলি যেন ছিঁড়ে যাবে,
“ son of a pig —তোর বাপের ওই নোংরা পাপের জন্য আমাদের জীবন অলরেডি হেল (hell) হয়ে গেছে। আর এখন তুই এসে আমার বউয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিস? এত বড় সাহস তোর?”
নিলয়ের চোখ জোড়া এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল, তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল–
“আমার বাবার পাপের শাস্তি তুই আমাকে দিবি?”
“তোদের বংশের রক্তই নোংরা, বিষাক্ত!”
“Careful, Navan! মুখ সামলে কথা বল।”
“কেন? সত্যি কথাটা গায়ে লাগছে?”
নিলয় এবার নিজের সব শক্তি দিয়ে নাভানের হাত দুটো নিজের কলার থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। তার চোখেও এখন এক আদম্য ক্ষোভ ও রাগ স্পষ্ট। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল–
“হেরাকে আমি সত্যিই ভালোবাসি।”
নাভান এক চরম তাচ্ছিল্যের ও বিষাক্ত হাসি দিল–
“Love?”
সে মাথা নেড়ে এক ভয়ঙ্কর রসিকতার মতো হেসে উঠল–
“তুই ওকে ভালোবাসিস না। তুই হচ্ছিস অবসেশড (obsessed)! এক ধরনের সিক অবসেশড (sick obsessed)!”
“তুই নিজে ওকে সুখে রাখতে পারছিস?” নিলয় পাল্টা তীর ছুড়ল।
এক মুহূর্তে নাভানের চোখ দুটো জলন্ত কয়লার মতো রক্তলাল হয়ে উঠল। সে আবার এক পা সামনে এগিয়ে এল–
“একটা কথা খুব ভালো করে তোর ওই ছোট মগজে ঢুকিয়ে নে।”
তার গলার স্বর এবার ভয়ঙ্কর রকম শান্ত ও নিচু হয়ে এল, যা শোনালো কোনো মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মতো–
“হেরা আমার বিবাহিত বউ। My wife! আমার স্ত্রী! ওর দিকে আর একবারও যদি তুই চোখ তুলে তাকাস, তবে কসম খোদার, তোর ওই চোখ দুটো আমি জীবন্ত উপড়ে ফেলব।”
চারপাশের রাতের বাতাসও যেন এই হুমকিতে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিলয় কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল নাভানের সেই হিংস্র চোখের দিকে। তারপর খুব নিচু, কুটিল গলায় বলল–
“তুই হেরার ব্যাপারে এত ডেসপারেট কেন নাভান?”
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, “Because she is mine! একান্তই আমার।”
“মানুষকে এভাবে পজেশন (possession) বা জড়বস্তু বানিয়ে রাখলে তাকে ভালোবাসা বলে না নাভান।”
“তুই আমাকে ভালোবাসা শেখাবি?”
নাভান রাগে ও অপমানে হেসে উঠল–
“যে নিজের কুখ্যাত বাপের ছায়া (shadow) থেকেও আজ পর্যন্ত বের হতে পারল না, সে আসবে আমাকে লাভ শেখাতে?”
নিলয় এবার সত্যি সত্যি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল–
“বারবার আমার বাবাকে মাঝখানে টানবি না নাভান!”
“টানব!” নাভানের গলা এবার মেঘের মতো গর্জে উঠল–
“কারণ তোর ওই পাপিষ্ঠ বাপের জন্য আজ আমার পুরো ফ্যামিলিটা শেষ হয়ে গেছে! আমাদের রক্তের সম্পর্কগুলো বিষাক্ত হয়ে গেছে! আর তুই সেই ধ্বংসস্তূপের আগুনের ভিতরে দাঁড়িয়ে আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস দেখাচ্ছিস?”
নিলয় স্তব্ধ হয়ে গেল। নাভান এবার নিজের একটা আঙুল তুলে সরাসরি নিলয়ের বুকের মাঝখানে শক্ত করে চেপে ধরল,–
“Listen carefully… হেরার কাছ থেকে চিরতরে দূরে থাক। না হলে তোর এমন অবস্থা করব যে, নিজের কুৎসিত চেহারা আয়নায় দেখার সাহসও তোর আর থাকবে না।”
“হেরা কোনো জড়বস্তু বা জিনিস না যে তুই তাকে সারাদিন ওভাবে পাহারা দিবি।”
“তোর মতো শকুনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আমাকে পাহারা দিতেই হচ্ছে।”
নাভানের কণ্ঠে এক চরম বিষ মিশে গেল–
“কারণ তুই আমাদের জীবনে একটা ফাকিং প্রবলেম!”
নিলয় এবার দাঁতে দাঁত চেপে, চরম এক চাল চেলে বলল–
“ও যদি নিজে থেকে কোনোদিন আমার কাছে চলে আসে? তখন কী করবি?”
এই একটা কাল্পনিক কথাতেই নাভানের পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে অবশ ও শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে রইল নিলয়ের মুখের ওপর। তারপর খুব ধীরে… খুব ধীরে সয়ে, এক ভয়ঙ্কর শান্ত, মেরুদণ্ড কাঁপানো গলায় বলল—
“তাহলে… আমি এই সব আগুনে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেব।”
নিলয় ভয় পাওয়ার বদলে এক তেজি, উন্মাদ কণ্ঠে হেসে উঠল,
“হেরা যদি শেষ পর্যন্ত আমার না হতে পারে… তাহলে আমি তোদের দুজনের সুখও কেড়ে নিব নাভান। তুই সব জ্বালিয়ে দিবি ভাবছিস? আর আমি চাইলে পুরো বিশ্বে তোদের ধ্বংসের এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করব।”
তাদের মধ্যে হঠাৎ এক অস্বাভাবিক, থমথমে নীরবতা নেমে এল। সেই নীরবতার মাঝেই ধীর পায়ে আরও একটু এগিয়ে এলো নিলয়। তার ঠোঁটের কোণে এক কুটিল, বাঁকা হাসি, কিন্তু চোখ দুটো লাল—ভালোবাসা, তীব্র হিংসা আর প্রতিশোধের এক অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর মিশ্রণ। সে নাভানের একেবারে গায়ের ওপর এসে দাঁড়াল। দুজনের তপ্ত নিশ্বাস যেন একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে।
নিলয় মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল
“হেরা যদি আমার না হয়… তাহলে তোরও হবে না নাভান। আমি কখনো হারতে শিখিনি। আমি যা চাই, সেটা না পেলে আমি পুরো পৃথিবীটাকেই বদলে দিই। তুই দেশ সব দিবি ভাবিস… আর আমি চাইলে পুরো পৃথিবীতে এক নতুন রক্তাক্ত ইতিহাস লিখে ফেলতে পারি।”
নাভান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এমন আগুন, যেন এখনই চারপাশের সবকিছু ছাই হয়ে যাবে।
নিলয় আবার এক চরম উস্কানি দিয়ে বলল–
“সেদিন জিম সেন্টারে একটুখানি হাত ধরাতেই… এতেই তুই এত বড় পাগল হয়ে গিয়েছিলি নাভান? যেদিন হেরার মন আর শরীর নিয়ে আমি পাশা খেলবো… তখন তোর কী হবে রে?”
মুহূর্তের মধ্যে নাভানের কপালের ও হাতের নীল রগগুলো ফুলে ফেঁপে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে, নিলয় ইচ্ছে করেই এই নোংরা কথাগুলো বলছে। নাভানের রাগ, তার পুরুষালী ঈর্ষা আর হেরার প্রতি তার অপ্রকাশিত ভালোবাসাকেই সে অস্ত্র বানাতে চাইছে। কিন্তু নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে অন্য একজন পুরুষের মুখে এমন জঘন্য, কামুক কথা… সে আর এক সেকেন্ডের জন্যও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
**ঠাস!**
এক চরম, হাড় ভাঙা ঘুষি গিয়ে পড়ল নিলয়ের চোয়ালে। নিলয় ছিটকে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
**ঠাস!**
কোনো সুযোগ না দিয়েই আরেকটা ঘুষি। তার ঠোঁট ফেটে কালচে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো।
**ঠাস!**
তৃতীয় ঘুষিতে নিলয়ের নাক ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। সেই তাজা রক্ত গড়িয়ে তার গায়ের সাদা শার্টটাকে মুহূর্তেই লাল করে দিল।
তবুও… নিলয় মাটির ওপর পড়ে গিয়েও পাগলের মতো হাসছে। সে হাত দিয়ে মুখ থেকে রক্ত মুছে, নিজের জিব দিয়ে ঠোঁটের কোণের নোনা রক্ত একটু চেটে নিয়ে উন্মাদদের মতো বলল–
” এই রাগটাই তো আমি তোর চোখে দেখতে চেয়েছিলাম নাভান! কারণ তোর সব শক্তি, তোর সব সাহস, তোর এই আকাশচুম্বী অহংকারের আসল নাম একটাই—হেরা! আর আমি ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত করব, যেখানে তোর প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে।”
নাভান বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মাটির ওপর থেকেই নিলয়ের শার্টের ছেঁড়া কলারটা টেনে একহাতে তুলে ধরল–
“হারামজাদা! হেরার পবিত্র নাম তোর এই নোংরা মুখে আর যেন কোনোদিন না শুনি! ও আমার বিবাহিত স্ত্রী, আমার আজীবনের সম্মান, আমার বংশের ইজ্জত, আমার বেঁচে থাকার পুরো পৃথিবী! ওর ওই পবিত্র চোখে আমি ছাড়া আর কোনো পুরুষের প্রতিচ্ছবি নেই। তুই তো দূর, তুই ওর পায়ের নিচের ছায়ারও যোগ্য নোস!”
নিলয় বিকট শব্দে হেসে উঠল–
সম্মান? পৃথিবী? ইজ্জত? এসব বড় বড় ডায়ালগ আমার সামনে দিস না নাভান। ইতিহাস সাক্ষী আছে—ভালোবাসা মানুষকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্বল বানায়। আর তুই এখন এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অসহায় মানুষ। কারণ তোর একটা মাত্র দুর্বলতা আছে… আর তার নাম হলো হেরা!”
নাভানের চোখ দুটো তখন ক্রোধে সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে, সে নিলয়ের মুখের ওপর নিজের নিশ্বাস ফেলে বলল–
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৯
“তুই ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবিস? তুই আসলে কোনোদিন কাউকে পবিত্র মনে ভালোবাসিসনি নিলয়। তুই শুধু নিজের একগুঁয়ে জেদ আর অসুস্থ আসক্তিকে ভালোবাসা বলে ভ্রম করছিস। আর আমার ভালোবাসা কোনো দুর্বলতা নয়… ওটা আমার শক্তি, যা তোকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!”
রাতের অন্ধকারে ড্রিম ক্লাবের সামনে দুই যুবকের সেই তীব্র হিংসা, আর প্রতিশোধের আগুন যেন এক নতুন প্রলয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল—যেখানে জিত যারই হোক না কেন, ছারখার হয়ে যাবে অনেকগুলো জীবন!
