মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৯
jannatul firdaus mithila
“ ওহ জাস্ট শাট আপ এন্ড ওপেন দ্য ডোর জা*নোয়ারের*বা*চ্চা! আজকে তোর একদিন আর আমার একদিন! তারাতাড়ি দরজা খোল, আজকে তোকে জাস্ট কোপা*ব আমি!”
শক্তিশালী কাঠের দরজাটার গায়ে অনবরত চাপড় বসছে রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত রুক্ষ হাতের। কাঁপছে চারপাশ! উম্মত্ত যুবকের এহেন হিং স্র কার্যকলাপে মুহূর্তেই ভয়ের ছাপ ফুটলো রমণীর পেলব মুখে। বিবর্ণতায় ছেয়ে গেল সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা! চোখদুটো তার আতঙ্কে বিস্ফোরিত, গোলাপের পাপড়ির ন্যায় পাতলা অধরজোড়া কাঁপছে মৃদু। সপ্তদশী’র ক্ষুদ্রকায় বদনে নেমেছে আকাশসম কম্পন। নিঃশ্বাসের গতি দ্রুত এবং অগোছালো! মানবী সময় নিচ্ছে! অভ্যন্তরে কথা সাজানোর আপেক্ষিক উদ্যোগে তৎপর সে। বহুকষ্টে কম্পিত কণ্ঠনালী হতে বেরুলো ভয়ার্ত বাক্যবাণ,
“ ক্ষমা করে দিন বিস্ট! আমি…আর কোনোদিন এভাবে বলব না!”
রূঢ় মানবের সুশ্রী মুখমণ্ডলে ক্রোধের অনমনীয়তা বাড়ল বৈ কমল না। চোয়ালের রেখা হলো টানটান! ধারালো দাঁত-কপাটি একে-অপরের সনে রুষ্টতায় পিষ্ট হয়ে কেমন কটমট শব্দ তুলছে! বজ্রকঠিন কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে পরক্ষণেই বলে ওঠে,
“ ততদিনে তোর জিভ ঠিকঠাক জায়গা মতো থাকলে তো! দরজা খোল জানোয়া*রের বাচ্চা! তোর জিহ্বা আজকে টেনে ছিঁড়ব আমি।”
আঁতকে উঠে মাহি! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে পরপর। বলিষ্ঠ পুরুষের প্রতিটি কঠিন করাঘাতে কাঁপছে দরজার পাল্লা। সে-ই সঙ্গে ধড়ফড় করছে বোকা মানবীর বুক! মাহি ফের কদম পেছালো। এরইমধ্যে দরজার ওপাশ থেকে ধেয়ে এলো মুগ্ধের কঠিন হুংকার!
“ স্বেচ্ছায় দরজা খোল বেয়াদবের বাচ্চা! আদারওয়াইজ — আমি কিন্তু এক্ষুণি দরজা ভেঙে ফেলব। আর আমি একবার জোর করে ভেতরে ঢুকলে তোর ক*লিজা বের করে তারপরই থামব মনে রাখিস!”
এপর্যায়ে কাঁদো কাঁদো ভাব ধরল মাহি’র পেলব মুখখানা। রক্তিম হলো কোমল গালদুটো। নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে আওড়াল,
“ বললাম তো সরি! ভুল হয়েছে আমার। আর কোনোদিন আপনার কলারে ধরব না!”
দরজার ওপাশে থাকা ব্যাক্তির সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস চলমান। তার বাহাতের মুঠোয় আকড়েঁ রাখা ধারালো তলোয়ারের হাতল, ডানহাত হয়েছে মুঠোবন্দী! মাত্রাতিরিক্ত রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব, আচানক দরজার গায়ে বসালেন জোরালো ঘুষি। একবার, দু’বার পরপর বেশ ক’বার! কন্ঠে ক্রুরতা ঢেলে শুধালো,
“ তোর ভুলের মায়’রে বাপ! দরজা খোল বান্দীর মেয়ে। তোর কতবড় কলিজা, তুই আমার কলার টেনে আমাকে চরিত্রহীন বলিস! গেট খোল, আজকে তোর কলিজা মাপ’ব আমি! দেখব কয়-মণ ওজন হয়েছে তোর কলিজায়। এই দরজা খোল তুই।”
মাহি থামল! কান্না ভুলে গোমড়ামুখে তাকাল বন্ধ দরজার পানে। লোকটার কাছে এতবার ক্ষমা চাওয়া স্বত্বেও মুখ দিয়ে কিসব বলছে! আশ্চর্য! মানুষের দ্বারা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে না? মাহি কপাল গোছায়। কান্নাগুলো সব গলার কাছে আঁটকে রেখে ঢোক গিলল পরপর। চিড়বিড়িয়ে উঁচু কন্ঠে আওড়াল,
“ এমন করছেন কেন আপনি? মানলাম আমার ভুল হয়েছে, তারজন্য সরি বলেছি না? শুনুন বিস্ট! ক্ষমা করা মানুষের মহৎ গুণ।”
“ ক্ষমা? ইউ্য বি’চ! ক্ষমা মা’ই ফুট। একবার দরজাটা খোল শুধু, জনমের মতো ক্ষমা করব তোকে আজকে।”
মাহি গাল বাঁকায়। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে রেখে দাঁড়িয়ে রয় চুপচাপ। ওদিকে দরজায় কঠিন করাঘাত চলমান। ভাগ্যিস দরজাটা মোটা। নয়তো এতক্ষণে নিশ্চয়ই মেয়েটার গর্দান যেতো! দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব দাঁত কিড়মিড় করছে। কন্ঠভরা অদৃশ্য ঝাঁঝ নিয়ে বলে ওঠে,
“ আমি ছাড়া এ পৃথিবীতে সবাইকে তোর বিশ্বাস করতে হয়, তাই না বান্দীর মেয়ে? অথচ তোর বিশ্বাসের মাপদন্ডে সবার উঁচুতে কেবল আমার নাম থাকার কথা ছিলো!”
যুবকের মুখনিঃসৃত এহেন অদ্ভুত হৃদয় নিঙড়ানো বাক্যবাণ গিয়ে আচানক বিঁধল রমণীর কোমল হৃদ মাঝারে। দৃষ্টিতে তার লেপ্টে গেল বিভ্রম! কি বললো লোকটা? তার বিশ্বাসের মাপদন্ডে কেনো লোকটার নাম থাকবে? কে সে? আ ব্লা’ডি বিস্ট! এমন একটা জঘন্যতম মানুষ কেনো তার বিশ্বাসের মাপদন্ডে স্থায়ী হবে? সপ্তদশীর ছোট্ট মস্তিষ্কে জোর বাড়ল কেবল। পেলো না মনের কোণে উত্থাপিত প্রশ্নের কাঙ্ক্ষিত উত্তর। ঠিক তখনি রূঢ় মানব ফের দাঁত খিঁচে আওড়াল —
“ দরজা খোল জানোয়ারের বাচ্চা!”
তক্ষুনি মুখ কুঁচকায় মাহি। চোয়াল করল শক্ত! অসভ্য, বেয়াদব লোক! বড়দের সম্মান দিতে তো জানেই না, সেই সঙ্গে জানেনা বিন্দুমাত্র আদব-লেহাজ। কথায় কথায় অসভ্যদের ন্যায় গা*লাগা*ল করছে। সপ্তদশী বিরক্ত মুখে তৎক্ষনাৎ কন্ঠ উঁচিয়ে চিড়বিড়িয়ে বলে,
“ আশ্চর্য! আপনি কথায় কথায় গা*লাগা*ল করছেন কেনো? ভুল করলে আমি করেছি, এরমধ্যে আমার বাবাকে টানছেন কেনো বেয়াদব লোক? আরে ভাই, আপনাকে বলেছি না আ’ম সরি? এতবার ক্ষমা চাওয়া….!”
পথিমধ্যে বাকরূদ্ধ মাহি! জিভ খসে বাক্যটুকু বেরুনোর পরমুহূর্তেই দরজার গায়ে আঘাত হানলো রূঢ় মানবের প্রবল শক্তিশালী লাথি! এই বুঝি দরজাটা ভেঙে গুড়িয়ে পড়ল বলে। মাহি হতবাক! হতবুদ্ধির ন্যায় সম্মুখে তাকিয়ে থাকতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের হিং স্র গর্জন!
“ ইউ্য বি’চ! হোয়াট দ্য ফা’ক আর ইউ্য ব্ল্যাবারিং জানোয়ারের বাচ্চা? আমি তোর কোন জনমের ভাই লাগি রে? দরজা খোল তুই বান্দীর মেয়ে! হাসবেন্ডকে ভাই ডাকতে লজ্জা করে না তোর কু***বাচ্চা?”
এক নিমিষেই বোধহয় আকাশ ভেঙে পড়ল সপ্তদশীর মাথার ওপর। চোখদুটো বিস্ময়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে ললাট! বিস্ময়াবহে তক্ষুনি দুরত্ব বাড়াল মানবীর তিরতির করে কাপত্রয়ী নরম অধরযুগল। মস্তিষ্ক বনে গেল ফাঁকা! কানের পাশ দিয়ে ভো ভো করে বাজছে কিছু, স্রেফ আওড়াচ্ছে একখানা শব্দ!
“ হাসবেন্ড!”
অদৃশ্য অসারতা ভর করল মাহি’র সর্বাঙ্গে। মুখাবয়ব জুড়ে অবোধ্যের ছাপ। আকাশসম অস্থিরতায় ছেয়ে গিয়েছে অন্তর। সে-ই অস্থিরতার জের ধরে মানবীর কাঁপা কাঁপা পাদু’টো এগোলো। কম্পিত ক্ষুদ্রকায় বদনখানি মাতালের ন্যায় টলতে টলতে কোনমতে এসে দাঁড়াল দরজার সম্মুখে। পরক্ষণেই তার কাপত্রয়ী হাতদুটো একযোগে আঁকড়ে ধরল দরজার নব। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে নবটা একটুখানি ঘোরাতেই খট করে খুলে গেল দরজাটা। আর ওমনি ওপাশ থেকে একটানে দরজাটা পুরোপুরি উম্মুক্ত করলেন মাফিয়া বিস্ট। পরমুহূর্তে পলক ফেলতে না ফেলতেই ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বেচারি সপ্তদশীর ওপর। তার শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবা আচমকা আক্রমণ বসালো রমণীর রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠায়! সে-কি জোর তার হাতের! মেয়েটাকে একপ্রকার ছিটকে নিয়ে গেল পেছনে। ঘটনা প্রবাহে অচল মাহি। জমিনে ঠেকছে না পা! যুবকের রুক্ষ হাতের মুঠোয় কন্ঠা চেপেছে তার, শরীর হয়েছে দোদুল্যমান। ক্ষুব্ধ মানব আঁচানক পা থামাল। সপ্তদশীর পিঠ ঠেকালো ওয়াশরুমের তকতকে দেয়ালের সনে! হাতের জোর বাড়িয়ে, মেয়েটার মুখপানে মুখ এগিয়ে এনে বজ্রকন্ঠে চিড়বিড়িয়ে শুধালো,
“ এবার তোকে কে বাঁচাবে বান্দীর মেয়ে?”
সপ্তদশী ধীরে ধীরে চোখের পর্দা সরালো! অনড় দৃষ্টি তাক করল যুবকের বাদামী চোখদুটোর সনে। রূঢ় মানবের সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই। সে কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে, আচমকা চপেটাঘাতের জন্য যেই না হাত উঁচাল ঠিক তখনি সপ্তদশীর ভঙ্গুর কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ আপনি আমার কে?”
মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার বাড়ন্ত আগ্রাসী থাবা। বাদামী চোখদুটোর ক্ষুদ্র কালো তাঁরা দু’টো হুট করেই আঁটকে গেল মেয়েটার মায়াবী হরিণী নেত্রযুগলের গভীরে। এতক্ষণের মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুন গুলো কিভাবে যে নিভে গেল! যুবক নিজেও সে বিষয়ে সন্দিহান। সপ্তদশী ফের ঠোঁট নাড়ালো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল —
“ বলুন বিস্ট! আপনি আমার কে?”
যুবক হারিয়েছে কোথাও। মায়াবিনীর বিধ্বংসী চোখদুটোর উপচে পড়া মায়ার সংস্পর্শে এসে একমুহূর্তের জন্য হারিয়েছে নিজের সকল ক্রুরতা। মেয়েটার কন্ঠনালী বরাবর চেপে রাখা হাতখানা খানিক আলগা করে নিয়ে, সে কেমন অস্ফুটে গভীর শান্ত গলায় শুধালো,
“ আমি তোর সব!”
তড়াক অস্থির হলো মাহি। দু’হাতের জোরে তক্ষুনি আঘাত বসালো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাগে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে এক-কদম পিছিয়ে গেল মুগ্ধ। গভীর নেত্র সম্মুখ পানে তাক করে রাখতেই মানবী কেমন চিৎকার দিয়ে আওড়াল,
“ না! আপনি আমার কেউ না। কেউ না আপনি! কে-কেউ না।”
যুবকের গভীর দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। সেথায় এবার আধিপত্য জানান দেবার প্রবল আকাঙ্খা ভর করেছে যেন। পাহাড়সম দেহটা টানটান করে নিয়ে, মুগ্ধ ধীর কদমে এগিয়ে এলো মাহি’র পানে। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসির রেশ টেনে বলল,
“ তুই বললেই হলো?”
টগবগে রাগে মুহুর্তেই ফেটে পড়ল মাহি। তড়াক করে জ্বলে উঠল তার চোখদুটো। অক্ষিকোটরের সামান্য অশ্রুর উপস্থিতিতে আঁখি দ্বয়ের মায়া বেড়েছে বহুগুণ। মুগ্ধ কেমন তুষ্ট দৃষ্টে একমনে চেয়ে রইল সেদিকে। তার পাদু’টো মাহি’র মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই সপ্তদশী কেমন সন্দিহান গলায় চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কি করেছেন আপনি আমার সাথে? কোন রহস্যের ভিত্তিতে এতোবড় একটা কথা আপনার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে? সত্যি করে বলুন বিস্ট!”
থামল মুগ্ধ! সামান্য কাত করল ঘাড়। ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল নিম্নাংশের অধর। পরক্ষণেই মেয়েটার ঘাড়ের পেছনে নিয়ে গেল নিজের ডানহাতের উষ্ণ করতল। সেথায় মৃদু টান বসিয়ে এক ঝটকায় মানবীর সুশ্রী মুখশ্রী নিজ সান্নিধ্যে এগিয়ে এনে থামল মুগ্ধ। ঘাড় নামিয়ে নিজ এলোমেলো চুলে আবৃত কপালখানা আলতো করে ঠেকাল মেয়েটার মসৃণ ললাটের সনে। ঠোঁটের কোণে চমৎকার হাসি ঝুলিয়ে মুগ্ধ কেমন বিমুগ্ধ কন্ঠে আওড়াল —
“ এতো তারাতাড়ি সবটা জেনে যাবি? আর ক’টাদিন নাহয় ধৈর্য্য ধর!”
ত্বরিত নড়েচড়ে উঠে মাহি। কন্ঠে অদৃশ্য আগুন ঢেলে শুধালো,
“ না! এক্ষুনি বলুন সবটা। কোন অকাজ করেছেন আপনি? কোন দোহাইয়ে নিজেকে আমার….”
রমণীর কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখা অবস্থায় বাঁকা হাসে মুগ্ধ। পরপরই সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ তোর?”
বাকিটুকু জিভের ডগায় আঁটকে যাচ্ছে সপ্তদশীর। আওড়াতে গিয়ে যত বিপত্তি! মুগ্ধ আড়দৃষ্টে সবটা দেখল। কিয়তক্ষন চুপ করে থেকে গুনল মেয়েটার নিস্তব্ধতা! পরক্ষণেই আগের ন্যায় দৃঢ় কন্ঠে আওড়াল,
“ হাসবেন্ড বলতে জাত যাচ্ছে সিগনোরা?”
তৎক্ষনাৎ শক্ত মুখে চোখ পাকিয়ে দৃষ্টি উঁচায় মাহি। কন্ঠে অনমনীয়তা বজায় রেখে বলে,
“ অসম্ভব! আপনার মতো জঘন্য মানুষকে আর যাইহোক, সজ্ঞানে আমি কোনোদিন নিজের স্বামী হিসেবে মানিনা আর মানবোও না।”
“ ওহ রিয়েলি? তোর মানা অথবা না মানায় আমার যেন কয়টা বা*ল ছেঁড়া গেল বান্দীর মেয়ে? গুনে দেখবি না-কি একবার?”
যুবকের কন্ঠে স্পষ্ট বিদ্রুপ! তা শুনে আগুন জ্বলে উঠল সপ্তদশীর সর্বাঙ্গে। গালদুটোতে লাজের ছায়া লেপ্টে গেলেও, সে কপট ঝাঁঝাল ভাব ধরে রইল। কঠিন কন্ঠে প্রতিত্তোরে বলল,
“ দূরে সরুন অসভ্য লোক! আপনার এসব অসভ্যতামি অন্য জায়গায় গিয়ে দেখান।”
মুগ্ধ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে হাসল। হাতের মুঠোয় চেপে রাখা ধারালো তলোয়ারটা তক্ষুনি অদূরে ছুঁড়ে ফেলতেই তা কেমন ঝনঝনিয়ে উঠল। মাহি সঙ্গে সঙ্গে তটস্থ হলো। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিতেই কর্ণকুহরে প্রবেশ করল মুগ্ধের অদ্ভুত শান্ত কন্ঠ!
“ কাকে গিয়ে দেখাব? আমার তো তুই ছাড়া কেউ নেই বান্দীর মেয়ে।”
বিদ্রুপাত্মক কন্ঠে আওড়ালেও কথার গভীরতা ছিলো বড্ড। তীব্র রাগে গজগজ করতে থাকা মাহি থোড়াই বুঝল এহেন কথার গভীরতার্থ। সে উল্টো শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ফোঁটালো ঠোঁটের কোণে। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,
“ খারাপদের আবার মানুষের অভাব পরে? আশ্চর্য! আপনার কেউ নেই শুনে আমার কি একটু হাসা উচিৎ? না-কি আমার অজান্তেই আমাকে নিয়ে নোংরামিতে মেতেছেন, তা ভেবে একটু কাঁদা উচিৎ? কোনটা করব বলুন? আপনি কি করেছেন আমার সাথে? আমার জানামতে, আমি আপনাকে বিয়ে করিনি। না ধর্মীয় মতে, আর না কোনো কাগজে-……. ”
বাকিটুকু পূর্ণ করবার পূর্বেই থতমত খেল মাহি। তক্ষুনি চোখ উঠিয়ে তাকাল রূঢ় মানবের পানে। দেখল — লোকটা কেমন বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। মাহি বিচক্ষণা। একে-একে দুই মিলিয়ে ভেবে বসল অনেককিছু। নিশ্চিত হবার উদ্দেশ্যে তৎক্ষনাৎ লোকটার পানে ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করল,
“ ডু ইউ্য হেভ এনিথিং লাইক হোয়াট এম আই থিংকিং?”
মুগ্ধ ঠোঁট পিষে হাসল। চোখদুটো সরু করে তাচ্ছিল্যের সহিত আওড়াল,
“ ইয়েস আ’ই হেভ বান্দীর মেয়ে!”
সহসা হতবাকতার অতল সমুদ্রে সাঁতার না জেনে ডুব দিলো সপ্তদশী। অর্ধ ডুবন্তের ন্যায় হাসফাস করতে লাগল ক্রমাগত। ছলছলে দৃষ্টিজোড়া একত্রে নিক্ষেপ করে অস্ফুটে কেবল শুধালো,
“ কিসের কাগজ?”
মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করেনি। উল্টো মেয়েটার ঘাড়ে করতল চেপে পা ঘোরালো উল্টোপথে। মাহি এগোচ্ছে! যুবকের পিছুপিছু ছুটছে একপ্রকার! মিনিট পাঁচেক বাদেই দাম্ভিক পুরুষ সগৌরবে বেরিয়ে এলেন ওয়াশরুম থেকে। অতঃপর কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে ডাকলেন,
“ এডউইন!”
আশেপাশেই ছিলো না-কি এডউইন? ওমন একডাকে তড়িৎ বেগে ছুটে এলো যে! নতমস্তকে তটস্থ হয়ে দুয়ারপানে কদম থামাল এডউইন। দাঁড়িয়ে রইল মনস্টারের হুকুম পাওয়ার অপেক্ষায়। ঠিক তখনি গম্ভীর মুখো রূঢ় মানব, মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে নিজ পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানা এলিয়ে দিলো জানালার দ্বারের কাউচের গায়ে। রাজকীয় ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে, ওভারকোটের পকেট হাতড়ে বার করলেন একখানা ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার এবং লাইটার। ভীষণ ভাব নিয়ে সিগারটা ঠোঁটের কোণে চেপে লাইটার ধরায় মুগ্ধ। মুখভর্তি কলুষিত ধোঁয়া টেনে দম খিঁচে থেমে রইল কিয়তক্ষন। অতঃপর সময় নিয়ে মুখগহব্বর থেকে ধোঁয়াগুলো ছাড়তে ছাড়তে গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ল,
“ ফাইলটা নিয়ে আয়!”
এডউইন বাধ্য মানুষ। হুকুম পাওয়া মাত্রই চলে গেল তামিল করতে। এদিকে হতভম্ব মাহি। হতবিহ্বল ভাব ধরেছে সে। মুগ্ধ তখন নিজ আসনে বসে দুষ্ট ইঙ্গিত ছুড়ঁল মেয়েটার দিকে। ঠোঁটের কোণ হতে সিগারটা নামিয়ে শিস বাজিয়ে মনোযোগ টানল মাহির,
“ ছিছিৎ!”
ত্বরিত কুঞ্চিত দৃষ্টিতে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহি। মুখ ঝামটি দিয়ে বলে ওঠে,
“ কি সমস্যা?”
শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে জিভের ডগা দিয়ে গাল ঠেললো মুগ্ধ। আঙুলের ভাঁজে আঁটকে রাখা সিগারটায় আরেকবার টান বসিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ যতক্ষণে পেপারস আসছে, ততক্ষণ তুই চাইলে এখানে এসে বসতে পারিস!”
কপাল গোটায় মাহি। তাকাল সন্দিষ্ট চোখে। লোকটার ওতবড় দেহটা একাই দখল করে আছে কাউচের পুরোটা জায়গা। তাহলে লোকটা তাকে কোথায় বসার জন্য বলছে? অবোধ বোকা মানবী, বোধগম্যহীনের ন্যায় পরপরই জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় বসতে বলছেন? পাহাড়ের মতো শরীরটা তো একাই ছড়িয়ে আছে কাউচে! তাহলে আবার আগ বাড়িয়ে আমাকে ডাকছেন কেনো? বসব কি আপনার মাথায়?”
“ তুই চাইলে মাথায় কেনো? আর-ও অনেক জায়গাতেই বসতে পারিস! তবে হুটহাট কিছু-মিছুর ছোঁয়া পেলে আমার কিন্তু কোনো দোষ নেই। আপাতত কাছে আয়! বস এখানে।”
বলেই বেহায়া পুরুষ নিজ বদনখানি আরেকটু এলিয়ে দিলো কাউচের গায়ে। পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে উম্মুক্ত করল কোল। মাহি তখনো বোধগম্যহীনের ন্যায় তাকিয়ে আছে। তা আড়দৃষ্টে অবলোকন হওয়া মাত্রই যুবক কেমন বাঁকা হেসে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ দাঁড়িয়ে দেখলে ফিল পাবি বান্দীর মেয়ে? পৃথিবীর সবচেয়ে কম্ফোর্টেবল সিটে বসতে ডাকছি তোকে, আর তুই কি-না ওমন বলদের মতো তাকিয়ে আছিস? ছ্যাহ ছ্যাহ!”
কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো সপ্তদশীর। আপাদমস্তক পরোখ করল রূঢ় মানবকে। বেহায়া লোকটা ওমন কোল ছড়িয়ে বসে আছে কেনো? মাহি কেমন বোকার ন্যায় ফের জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ আর ঐ কম্ফোর্টেবল সিটটা কোনটা?”
এপর্যায়ে গালের ভাঁজে সময় নিয়ে জিভ ঠেসে রাখল মুগ্ধ। হাসল বোধহয় নিরবে। মেয়েটাকে আরেকটু জ্বালাতন করতে তক্ষুনি বেহায়ার ন্যায় হাত রাখল প্যান্টের অগ্রভাগে। দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ এই যে! মা’ই ল্যাপ! পৃথিবীর সবচেয়ে কম্ফোর্টেবল স্থান বসার জন্য! যদিওবা বসলে মাঝেমধ্যে পাখির ডাক শুনবি, বাট ব্যাপার নাহ! সয়ে যাবে। আয় আয়।”
তক্ষুনি তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে জ্বলে উঠল মাহি। কটমট করতে করতে ঝামটি দিয়ে বসল মুখে। কিড়মিড়িয়ে আওড়াল,
“ আ পিওর নির্লজ্জ বেহায়া লোক!”
রূঢ় মানব তৎক্ষনাৎ মেয়েটাকে শুধরে দেবার ভঙ্গিতে বিজ্ঞের ন্যায় হাত নাড়িয়ে চাড়িয়ে আওড়াল,
“ উঁহু! নট অনলি আ পিওর নির্লজ্জ বেহায়া লোক, বাট অলসো আ ডার্টি মাইন্ডেড হট এন্ড হ্যান্ডসাম! ভুল বলিস কেন?”
মাহি আর কথা বাড়াল না। দাঁত খিঁচে মুখ ঘোরালো অন্যত্র। এরইমধ্যে কক্ষে ফের আগমন ঘটল এডউইনের। হাতে তার একখানা কালো রঙা ফাইল! গম্ভীর মুখো মানুষ অতি-শ্রদ্ধায় তা এগিয়ে দিলেন মুগ্ধের দিকে। মুগ্ধ রয়েসয়ে ফাইলটা হাতে নিয়েই গমগমে গলায় বলে বসল,
“ গেট আউট!”
এডউইনকে আর পায় কে? বেচারা এমনিতেই ভয়ে আছে, মনস্টারের আদেশ পাওয়া মাত্রই চলে গেল কক্ষ থেকে। এদিকে মুগ্ধের আর কিছু বলার পূর্বেই মাহি তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে ছো মে’রে যুবকের হাত থেকে নিয়ে নিলো ফাইলখানা। মুগ্ধ নিরুত্তেজ! তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। মাহি অস্থির! এলোমেলো অপ্রসন্ন কায়দায় খুলছে ফাইলের গা। সময় নিয়ে দু-চারটে কাগজ উল্টাতেই আচানক তার দৃষ্টি থমকাল চার নম্বর কাগজের মসৃণ পৃষ্ঠে। যেথায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা — মেরেজ কন্ট্র্যাক্ট।
প্রথম পক্ষ — অধীর রায়।
দ্বিতীয় পক্ষ — মাহিরা এহসান।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রথম পক্ষের সিগনেচারের স্থানে মুগ্ধের স্বাক্ষর থাকলে দ্বিতীয় পক্ষের স্থানে মাহি স্বাক্ষর নেই! সেথায় রয়েছে লাল কালিতে মাখোমাখো একখানা টিপসই! কন্ট্র্যাক্টের শর্তাবলি রয়েছে বেশকিছু! তন্মধ্যে মাহি’র চোখ গিয়ে আটকিয়েছে ৭নম্বর শর্তে। যেথায় জ্বলজ্বল করছে —
◑ আমি মাহিরা এহসান, সজ্ঞানে জানাচ্ছি — আমি অধীর রায়কে নিজ স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছি। রাশিয়ান আইন মোতাবেক — এই বিয়ে আমি মানছি। আমি যদি কোনোদিন তাকে ছেড়ে চলে যেতে চাই অথবা তাকে ছেড়ে চলে যাবার প্রয়াস করি তাহলে সে আমার পুরো পরিবারকে মে’রে ফেললেও আমি কিচ্ছু বলব না। আমি তাকে এই অধিকার দিলাম।
ভড়কায় মাহি। কাঁপা কাঁপা বদনে তক্ষুনি অগ্নিদৃষ্টে তাকায় মুগ্ধের পানে। বজ্রকন্ঠে গর্জে বলে ওঠে,
“ এসব কি বিস্ট? কি এসব? কোন সাহসে আপনি এমন উল্টোপাল্টা পেপারস বানিয়েছেন? আর কে দিয়েছে এই টিপসই?”
মুগ্ধ নির্বিকার! সিগার টানতে টানতে স্রেফ আওড়াল —
“ বিয়ে করেছি তোকে, দিবে কি তোর খালাম্মা?”
মেয়েটার মাথায় বুঝি আবারও আকাশ ভেঙে পড়ল। হতবুদ্ধির ন্যায় অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“ কবে? কখন দিলাম আমি?”
“ যখন ঘুমিয়েছিলি!”
পাদু’টো নড়বড়ে হলো মাহি’র। বদন হলো টলমল! কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় অবিশ্বাসের ছাপ ফুটলো সপ্তদশীর মুখাবয়বে। ঘাড় নুইয়ে আরেকবার তাকাল হাতে থাকা কাগজটার পানে। ওমনি হৃদয় কোণে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো মেয়েটার। সে কেমন শক্ত মুখে তক্ষুনি দু’হাতে দুমড়েমুচড়ে ছিঁড়ে ফেলল সবগুলো কাগজ। কিয়তক্ষন বাদেই পুরো ঘরময় ছড়িয়ে দিলো কাগজের টুকরো গুলো। কার্যসিদ্ধি শেষে ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস ফেলছে মাহি। যেন করে ফেলেছে অনেক বড়ো কিছু। এরইমধ্যে ভাবলেশহীন যুবক কেমন শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ কতগুলো ছিঁড়বি বান্দীর মেয়ে? দ্যাট ওয়াজ জাস্ট আ ফা’কিং কপি!”
সহসা ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় মাহি। নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে নিষ্পাপ মানবী তৎক্ষনাৎ হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মেঝেতে। বাঁধ ভাঙা কান্নায় ফেটে পড়ে থেমে থেমে আওড়ায়,
“ কেনো করলেন এমনটা বিস্ট? আপনি তো আমায় এসব বলে আনেননি। আপনি বলেছিলেন — আমাকে মাত্র ৬মাস নিজের কাছে রাখবেন, তারপর আবারও আমাকে ফিরিয়ে দিবেন আমার পরিবারের কাছে। তাহলে এখন কথা ঘোরাচ্ছেন কেনো আপনি? কেনো বানালেন এমন মিথ্যে কন্ট্র্যাক্ট পেপার?”
দাম্ভিক পুরুষ এতক্ষণে নড়েচড়ে বসল। এক বসায় একখানা সিগার শেষ করে, আরেকটা বার করে এনে গুঁজল ঠোঁটের কোণে। ডানহাতের রুক্ষ আঙুলের ডগায় লাইটারটা দক্ষ কৌশলীর ন্যায় নাড়িয়ে চাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। অতঃপর মাত্র দু’টো কদমে মেয়েটার পানে এগিয়ে এসে দাঁড়াল রূঢ় মানব। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,
“ দ্যাট’স ডিপেন্ড অন মা’ই মুড মা’ই গার্ল! তখন সহ্য হচ্ছিল না, তাই বলেছি ৬মাস রাখব। বাট এখন….”
আলগোছে মাথা তুললো মাহি। যুবকের পানে তাক করল নিজ ফোলা ফোলা ছলছল চোখদুটো। জুড়িয়ে আসা কন্ঠে আওড়াল,
“ বাট এখন?”
মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টেনে মুখ ঝুঁকিয়ে আনে মুগ্ধ। বেয়াদবের ন্যায় সবটা ধোঁয়া ছাড়ল মেয়েটার মুখের ওপর। ওমনি দুর্গন্ধে নিশ্বাস আঁটকে নিলো মাহি। অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে কাশতে লাগল অনবরত। এরই ফাঁকে যুবক আলতো করে আঙুল ঢোকালো মেয়েটার নরম চুলের ভাঁজে। সেথায় মৃদু চাপ বসিয়ে রমণীর পেলব মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়ে এনে ভরাট কন্ঠে আওড়াল,
“ বাট এখন তোকে না জ্বালালে আমার ঘুম হয়না! তোর কন্ঠ কানে না গেলে আমার সকাল শুরু হয়না। তোর মুখ না দেখলে আমার নেশা হয়না! তুই আশেপাশে না থাকলে আমার হ্যালুসিনেশন হয়। মারাত্মক হ্যালুসিনেশন! অন্তত আমার ভালো থাকার প্রয়োজনে হলেও তোকে আমার চাই বান্দীর মেয়ে! শুধু ৬মাসের জন্য না, তোর নিঃশ্বাস অব্দি তোকে আমার চাই! তোর প্রতিটি রাতের দখলদারিত্ব আমি নিজের নামে করতে চাই। তোর প্রতিটি ভোর যেন আমাকে দিয়েই শুরু হয়, সে ব্যবস্থা আমি করতে চাই! তোকে আমি বন্দী বানালাম সিগনোরা! আমার পাপের রাজত্বে একমাত্র কোমল ফুল হিসেবে বন্দী বানালাম তোকে।”
হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে মাহি! যুবকের সুদর্শন মুখখানায় নজর বুলাতেই তার অদৃশ্য দৃশ্যপটে ভেসে উঠেছে — যুবকের করা সকল অত্যাচারের পুনঃদৃশ্য। বাবার অপমান, ভাইয়েদের কান্না! নিজের ওপর করা প্রতিটি অমানবিক অত্যাচার। কানের কাছে আবারও বোধহয় বেজে উঠল যুবকের বলা সেই কথাগুলো!
“ আই জাস্ট হেট ইউ এন্ড ইউর ওয়ার্ডস! ঘৃণা করি আমি তোকে। শুনছিস? ঘৃণা করি তোকে। তোর মুখ দেখলে আমার জাস্ট বমি আসে!”
কথাগুলো মনে পরতেই ডুকরে উঠে মানবী। সহসা নামিয়ে নিলো ঘাড়। উপরিভাগের ধারালো দাঁতকপাটির সনে অধরের নরম চামড়া আঁকড়ে ধরে থেমে থেমে আওড়াল,
“ আপনার কাছে বন্দী হওয়ার চেয়ে ম’রে যাওয়া ঢের ভালো বিস্ট! শত হলেও, আপনার দেওয়া বিষবাক্যের ক্ষতগুলো কি আর ওতো সহজে মিটবে আমার হৃদয় থেকে?”
যুবক নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে আছে অপলকভাবে! হৃদয়টা হুট করেই মোচড়াচ্ছে তার। কেমন যেন একটা চিনচিনে ব্যথা! নাম কি এ ব্যাথার? সে কেমন চোখ কুঁচকাল। অভ্যন্তরের তীব্র ব্যথাগুলো সয়ে নিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,
“ তুই মান বা মান — তোর বাকিটা জীবন এখন থেকে কেবলমাত্র আমার নামে লিখিত হলো! ধীরে ধীরে নাহয় দূর্বলও হবি!”
রমণী পরমুহূর্তেই মুখ তুলে আবারও দৃঢ় কন্ঠে আওড়াল,
“ সামান্য একটা কাগজের টুকরোর এতো ক্ষমতা নেই, যে কি-না মাহিরা এহসানকে আপনার মতো নিষ্ঠুর অধীর রায়ের প্রতি দূর্বল করবে!”
যুবক মোটেও হতবাক হয়নি। উল্টো ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে মুখ এগিয়ে আনলো মেয়েটার মুখপানে। দৃষ্টি সরু করে শুধালো,
“ বাট তুই আগে থেকেই এই অধীর রায় ওরফে মির্জা সায়ান মুগ্ধের ওপর দূর্বল বান্দীর মেয়ে! বিশ্বাস নাহলে নিজেকে একবার প্রশ্ন করেই দেখ!”
ব্যতিব্যস্ত মাহি! অভ্যন্তরের লুকায়িত বাক্যটুকু ধরা পরে যাবার আশঙ্কায় মানবী তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে ভাব ফোটালো কপটতার। দৃষ্টি লুকিয়ে একইরকম স্বরে আওড়াল,
“ তা নিশ্চয়ই আপনার স্বপ্নে!”
যুবক ফের গাল ঠেলে হাসল! ধীরে ধীরে নিজ রুক্ষ অধরযুগল আলতো করে ছোঁয়াল সপ্তদশীর নরম তুলতুলে অধরযুগলের গায়ে। অতঃপর হাস্কি স্বরে আওড়াল,
“ স্বপ্নকে বাস্তবে রুপান্তরিত করতে খুব একটা সময় লাগবে না আমার বান্দীর মেয়ে!”
রমণী তাচ্ছিল্যের হাসি টানল ঠোঁটের কোণে। তাচ্ছিল্যের স্বরে জানালো,
“ কনফিডেন্স ভালো! ওভার-কনফিডেন্স না।”
মুহুর্তেই মাথাটা ধপ করে জ্বলে উঠল মুগ্ধের। জোর বাড়ালো মেয়েটার চুলের গোছায় লুকিয়ে থাকা আঙুলগুলোর। তক্ষুনি মৃদু ব্যথায় ককিয়ে ওঠে মাহি। অথচ রূঢ় মানব কেমন চোয়াল শক্ত করে কটমট কন্ঠে বলছে,
“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু হার্ট মা’ই ইগো সিগনোরা! তুই নিজেও জানিস না, আমি আমার ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য ঠিক কোন কোন পর্যায়ে যেতে পারি! আমি তোকে সময় দিচ্ছি যেন তুই নিজে থেকে আমার প্রতি দূর্বল হতে পারিস। বাট বাট বাট…তোকে আমার প্রতি দূর্বল বানানোটাকে আমার ইগো বানাস না। ট্রাস্ট মি বেইব, এটা তোর জন্য একদম মাত্রাতিরিক্ত টক্সিক হবে!”
মাহি নাক টানছে! দৃঢ় কন্ঠে আওড়াচ্ছে,
“ আমি ম’রে গেলেও আপনার প্রতি উইক হবো না! যদি কখনো এমনটা হবার আশঙ্কা হয়ও তবে আমি নিজেকেই নিজে শেষ করে দিবো। আমি না মানি আপনাকে, না মানি আপনার এসব বুলশিট কন্ট্র্যাক্টকে।”
রাগী মানবের শান্ত হওয়া রাগটা আবারও বুঝি বেড়ে গেল তরতর করে। সে তক্ষুনি এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মাহি’র চুলের গোছা। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্যের ন্যায় অনবরত ডলতে লাগলো নিজ ঘাড়। বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ তুই ম’রবি তাই না?”
বিড়বিড়িয়ে নিজ চিরচেনা খোলসে আবির্ভাব ঘটায় রূঢ় মানব। পকেট হাতড়ে ফোন বের করল নিজের। অতঃপর দক্ষ হাতে ফোনের স্ক্রিনে ট্যাপ করল বারকয়েক।সপ্তদশীর নিরেট চোখ দেখে যাচ্ছে সবকিছু। বোধগম্যহীনতায় ডুবেছে তার মুখ। ঠিক তখনি রূঢ় মানব নিজ হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনটা আলগোছে বাড়িয়ে ধরল মেয়েটার পানে। মানবী আনমনে দৃষ্টে সেদিকে তাকাতেই আচমকা হোঁচট খেল যেন। স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে — একখানা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন! যার বেডে শুয়ে আছে মধ্যবয়স্ক তায়েফ এহসান। গায়ে তাঁর অসংখ্য মেশিনের তার! মুখে অক্সিজেন মাস্ক। মুহুর্তেই আঁতকে উঠে মাহি! অস্থিরতায় চিৎকার দিয়ে দু’হাতে ছিনিয়ে নেয় মুগ্ধের মোবাইলটা। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনের স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে মাহি কেমন কম্পিত কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
“ আব্বু? আব্বু! আব্বু! কি হয়েছে তোমার আব্বু? ও আব্বু। আব্বু দেখো আমি। ও আব্বু, আব্বু আমার দিকে একটু তাকাও না আব্বু। আব্বু গো আব্বু! আব্বুউ!”
মাহি কাঁদছে! বাঁধ ভাঙা আর্তনাদে ডুকরে কাঁদছে। এরইমধ্যে রূঢ় মানব কেমন শক্ত চোয়ালে কাকে যেন আদেশ ছুঁড়ল,
“ মে’রে ফেল বাস্টা’র্ডটাকে।”
আঁতকে উঠে মাহি! হকচকিয়ে তাকায় মুগ্ধের পানে। লোকটা কাকে মা-রার কথা বলল? সন্দিগ্ধতায় কপাল কুঁচকে গেল মাহির। ওমনি হাতে থাকা ফোন থেকে ভেসে এলো টুকটাক কিছু শব্দ। তড়িঘড়ি করে নজর আবারও ফোনের পানে ঘুরিয়ে আনে মাহি। তবে পরমুহূর্তেই যা দেখল — তাতে তার নিশ্বাসটা অবধি গলার কাছে আঁটকে গেল যেন। একজন ওয়ার্ড বয় তার আব্বুর মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে দিচ্ছে! ধীরে ধীরে বুকের ওঠানামার গতি বাড়ছে তায়েফ এহসানের। ছটফটানোও আছে বৈকি! তৎক্ষনাৎ ঘর কাপিয়ে চিৎকার করে ওঠে মাহি। ফোনের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে আওড়াল,
“ এই কে? কে আপনি? আমার আব্বু!এটা…না না আমার আব্বুর কষ্ট হচ্ছে। এই আমার আব্বুর মুখে মাস্ক দেন। আব্বু! আব্বু!”
ওয়ার্ড বয় থামছেনা। এদিকে উদ্বিগ্নতাও কমছেনা মাহির। না কমছে তার কান্না। নির্দয় মানব উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। চলে যাবার উদ্দেশ্যে কদম সরাতে গেলেই আচমকা তার পাদু’টো দু’হাতে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে মাহি! বোধবুদ্ধি সব ভুলে বাবাকে বাঁচানোর শেষ প্রয়াসে বলে ওঠে,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮
“ আল্লাহর দোহাই লাগে আপনাকে বিস্ট! আমার আব্বুকে মা’রবেন না। ঐ লোকটাকে থামতে বলুন। বিনিময়ে আপনি যা বলবেন, যেভাবে বলবেন আমি…আমি কথা দিচ্ছি, আমি সব মুখ বুঁজে মেনে নিবো। তবুও আমার আব্বুকে বাঁচান! একটু দয়া করুন বিস্ট! আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।”
সহসা হাঁটু গেঁড়ে বসল মুগ্ধ। দু’হাতে আলগোছে পা থেকে ছাড়াল মাহি’র হাতদুটো। অতঃপর দৃষ্টিতে দৃঢ়তা ঢেলে কিড়মিড় কন্ঠে আওড়াল,
“ তুই আমার! আমার আগে তোর মর’ণও পাপ।”
