প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৬
সাইদা মুন
—এক্সকিউজ মি… কে বলছেন?
ওপাশ থেকে চঞ্চল কণ্ঠ ভেসে এল,
—আরে বেয়াই, আমি আমি!
তাহসান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তনিমা?
—হ্যাঁ হ্যাঁ! যাক, নামটা এখনো ভোলেননি।
মুহূর্তেই তাহসানের গলা কড়া হয়ে গেল,
—বেয়াদব মেয়ে। এত রাতে একজন টিচারকে কে এভাবে ফোন করে? ম্যানার্স বলে কিছু জানো?
তনিমা যেন কথাটাই কানে তুলল না। উল্টো বলল,
—আরে, এত ফরমালিটির কী আছে? দুদিন পর তো আমরা একই সংসার করবো। তাই ভাবলাম, এখন থেকেই কানেকশনটা ভালো করে রাখি।
কফিতে চুমুক দিতে গিয়েই বিষম খেল তাহসান। কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করল,
—কীইই বললে, সংসার করব মানে?
তনিমা যেন নিজেই নিজের কথা গুলিয়ে ফেলল। কি বলতে গিয়ে কি বলেছে তা বুঝতেই থতমত খেল। তাড়াহুড়ো করে কথা শোধরাতে বলল,
—আরে না না। মানে আমার বোন আপনার ভাইয়ের। না, থুক্কু, আপনার ভাই আমার বোনের… আরে ধুর! উফ!
ওপাশে একনাগাড়ে করা বিড়বিড় শুনে দাঁতে দাঁত চেপে তাহসানই শুধরে দিল,
—আমার বোন তোমার ভাইয়ের।
—ওহ হ্যাঁ, এই তো। এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। আপনার বোন আর আমার ভাইয়ের সংসার হবে। তাই আমরা তো বেয়াই-বেয়াইন। ভাবলাম, সম্পর্কটা একটু মজবুত করে রাখি।
বলেই বোকা হাসল সে। তাহসান বিপরীতে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
—সংসার করবে ওরা। আমাদের কানেকশন মজবুত করার লজিকটা ঠিক বুঝলাম না।
তনিমা এবার পুরোপুরি ফেঁসে গেল যেন। মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে সামনে থাকা আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—ধুর! কীসব উল্টাপাল্টা বকছিস।
নিজেকেই দু-একটা বকা দিয়ে আবার ফোন কানে তুলল। হেসে বলল,
—হে হে মানে আমরা যদি আগে থেকেই ভাব জমিয়ে রাখি, তাহলে বিয়ের গেটে একটু কাটসিট করতে পারব। এই আর কী!
তাহসানের গম্ভীর কন্ঠটা নরম হয়ে এল। একটু সময় নিয়ে বলল,
—ওহ! তার মানে তোমার কিপটে ভাই আগে থেকেই টাকা বাঁচানোর মিশনে নেমে পড়েছে?
এহেন কথায় তনিমা হতভম্ব হয়ে গেল,
—কী বললেন?
—যা সত্যি, তাই বললাম। বিয়ের গেটে যেন কম টাকা দিতে হয়, তাই পাত্রীপক্ষের সঙ্গে আগে থেকেই খাতির জমাতে এসেছো। সেটা একটা বাচ্চাও বুঝবে।
এবার তনিমা ফুঁসে উঠেছে। কথাটা একদম তার গায়ে এসে লেগেছে। প্রতিবাদ করে বলল,
—একদমই না। আমরা মোটেও কিপটে নই।
তনিমার ফুঁসতে থাকা ভারী গলাটা শুনে তাহসানের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল। যদিও সেই হাসির শব্দ ওপাশে পৌঁছাল না। ভালোই লাগছে মেয়েটার রাগ অনুভব করতে। কফিতে আরেক চুমুক দিয়ে আরাম করে চেয়ারে হেলান দিল সে। তাকে আরেকটু নাড়তে বলল,
—আচ্ছা, সময় হলেই দেখা যাবে কে কিপটে আর কে কিপটে না।
তনিমা দৃঢ় গলায় বলল,
—দেখিয়ে দেব। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ..
তাহসান আর কথা বাড়াল না। মৃদু হেসে বলল,
—ওকে ফাইন।
এই বলে তাহসান ফোন কেটে দিল। মুখের ওপর কল কেটে দেওয়ায় তনিমার মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে কয়েক সেকেন্ড রাগী চোখে তাকিয়ে রইল সে।
—উফ! কী রূঢ় মানুষ!
বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে করতে চেয়ারে হেলান দিল। বাসা থেকে একটু দূরের ছোট্ট একটা ক্যাফেতে একাই বসে পিজ্জা খাচ্ছিল সে। শান্ত পরিবেশে খাওয়াদাওয়া করবে ভেবেছিল। কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ টিকল না। কিছুক্ষণ আগে একটা কাপল এসে ঠিক পাশের টেবিলেই বসেছে। তাদের ফিসফিস, হাসাহাসি আর আদিখ্যেতা দেখে তনিমার বিরক্তি ক্রমেই বাড়ছিল। বিরক্তি কাটাতেই তাহসানকে ফোন করেছিল। নাম্বার ম্যানেজ করার পর আর কল করা হয়নি। আবার নম্বরটা ডায়াল করল। এবার একবার রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এল বিরক্ত কণ্ঠ,
—আবার কী?
তনিমাও কম যায় না। উঁচু স্বরে বলল,
—আপনি আমার মুখের ওপর কল কেটে দিলেন কেন?
—তোমার কি আর কিছু বলার ছিল?
—হ্যাঁ…মানে…না…
—তাহলে রাখছি। কাজ আছে।
—আরে শুনুন না প্লিজ!
তাহসান থামল। আস্তে করে বলল,
—কী?
—ভাবছিলাম, তাহিয়া আর মেহরীনের সঙ্গে একটু কথা বলব।
—তাহলে ফুফুর ফোনে কল দাও। ওদের পেয়ে যাবে।
—আপনার ফোন থেকে কথা বললে সমস্যা কী?
—সমস্যা আমি এখন আমার বাসায়। ওদের বাসায় না।
তনিমা অবাক হয়ে বলল,
—আপনার বাসায়?
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
—মিরপুর।
তনিমার গলায় মুহূর্তেই উচ্ছ্বাস নেমে এল,
—আরে! আমার বাসাও তো মিরপুরেই!
—ভালো।
তাহসানের সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে তনিমা ঠোঁট বাঁকাল। আবারও প্রশ্ন করল,
—আপনি ফ্যামিলির সঙ্গে থাকেন?
—না। একাই।
—মেসে?
—না, ফ্ল্যাটে।
—সঙ্গে আর কেউ থাকে না?
—না।
—রান্না কে করে?
—বুয়া।
—ওহ…
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। ওপাশে তনিমা বোধহয় নতুন প্রশ্ন খুঁজছে। তাহসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—ইন্টারভিউ বাকি আছে?
তনিমা ইতস্তত করে বলল,
—উম… না।
—তাহলে রাখছি।
ফোন কাটতে যাবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে তনিমার চড়া গলা ভেসে এল।
—এক্সকিউজ মি! এই টেবিলটা আমার। আপনারা অন্য টেবিলে গিয়ে বসুন।
তবে মাত্র আসা ছেলেগুলো অন্য টেবিলে না গিয়ে সোজা তনিমার টেবিলেই বসল। একজন চেয়ারে হেলান দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—এত বড় টেবিল একা দখল করে বসে আছো কেন? আমরা নাহয় একটু কো-অপারেট করেই বসলাম।
—হ্যাঁ তুমিও সঙ্গ পেলে, আমরাও মজা পেলাম।
কথা শেষ হতেই তিনজনই নিজেদের মধ্যে হুহু করে হেসে উঠল। তনিমা কোনো উত্তর দিল না। কেবল কড়া চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর বুঝে সে হাত তুলে ক্যাফের স্টাফকে ডাকল। তৎক্ষনাৎই দুজন স্টাফ দ্রুত এগিয়ে এল।
—স্যার, এটা ম্যামের টেবিল। আপনারা দয়া করে ওদিকের খালি টেবিলে বসবেন?
তাদের কথায় ছেলেটা নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিল। দাপটের সঙ্গে বলল,
—আমরা এখানেই বসব। সমস্যা কী?
দুজন স্টাফ একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। বিষয়টা নিয়ে তর্ক বাড়াতে তারাও ইতস্তত করছে। কারণ ছেলেগুলো সুবিধার নয়। তাদের অস্বস্তি বুঝতে পেরে তনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অকারণে কর্মচারীদের বিপদে ফেলতে চাইল না। তাই পিজ্জার প্লেট আর কোল্ড ড্রিংক হাতে নিয়ে নিজেই উঠে অন্য খালি টেবিলে গিয়ে বসল। এদিকে ফোনের ওপাশ থেকে তাহসান কয়েকবার ডেকছে তাকে,
—হ্যালো?… হ্যালো, তনিমা? শুনতে পাচ্ছ?
কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে চিন্তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। চেয়ারে বসে তনিমা ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল, কল এখনো কাটেনি। তাড়াতাড়ি ফোনটা কানে তুলে বলল,
—স্যার! আপনি এখনো লাইনেই আছেন? আমি তো ভেবেছিলাম কল কেটে দিয়েছেন।
তাহসান তার কথার জবাব না দিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি এখন কোথায়?
তনিমা খানিকটা অবাক হলো। এমন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তাহসানকে আগে কখনো শোনেনি। আস্তে করে উত্তর দিল,
—আমি তো… একটা ক্যাফেতে। কেন স্যার।
—সঙ্গে কে আছে?
—কেউ না। আমি একাই।
তাহসানের গলা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল,
—হোয়াট? আর ইউ ম্যাড? এখন রাত কয়টা বাজে জানো? এত রাতে একা ক্যাফেতে কী করছ? আর তোমার পরিবারই বা কেমন তোমাকে এভাবে একা ছেড়ে দিল?
তনিমা তাড়াতাড়ি ব্যাখ্যা দিল,
—না না ভুল বুঝছেন। আসলে আব্বু-আম্মু একটা বিজনেস পার্টিতে গেছে। আর ভাইয়াও বিজনেস ট্রিপে গেছে দুদিন হলো। তারা নেই বাসায়।
—তাই তোমাকে একা রেখে গেছে?
—না না, ব্যাপারটা তেমন না। আমাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিল আব্বু। কিন্তু বড়দের পার্টিতে আমার অস্বস্তি লাগে, তাই যাইনি।
—তাই বলে একা একটা মেয়েকে রেখে যাবে?
তার চিন্তিত গলা শুনে তনিমা মৃদু হেসে বলল,
—চিন্তা করবেন না। বাসায় খালামণিকে রেখে গেছে। আর নিরাপত্তার জন্য তো বাড়িভর্তি গার্ড আছেই।
কপট রাগে তাহসান ধমক দিয়ে উঠল,
—বেয়াদব! তো একা বের হলে কীভাবে?
তনিমা ধমম খেয়ে ঠোঁট উল্টে ফেলল। মিনমিন করে বলল,
—বাসায় একদম ভালো লাগছিল না। তাই খালামনির চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।
চোখ বুজে গভীর শ্বাস নিল তাহসান। মেয়েটা প্রতিবার তার ধৈর্য পরীক্ষা নেয় যেন। শক্ত কন্ঠে বলল,
—তুমি এখনই বাসায় ফিরে যাবে।
—এখন?
—হ্যাঁ, এখনই।
তনিমা অসহায় মুখ করে প্লেটের দিকে তাকাল,
—কিন্তু পিজ্জার দুটো স্লাইস এখনো বাকি।
তাহসানের গলা আরও কড়া হয়ে উঠল,
—আমি কী বললাম?
তনিমা দ্রুত মাথা নাড়ল, যদিও সে তা দেখতে পাচ্ছে না। তাড়াহুড়ো করে বলল,
—আচ্ছা আচ্ছা যাচ্ছি। এখনই যাচ্ছি।
কথা শেষ করে সে হাত তুলে ওয়েটারকে ইশারা করল,
—এক্সকিউজ মি, বিলটা…
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশের টেবিল থেকে সেই ছেলেটা উচ্চস্বরে বলে উঠল,
—মামা! ওই টেবিলের বিলটা আমার নামে করেন। আমি পে করব।
কথাটা বলতেই তার সঙ্গীরা শিস বাজিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। টিটকারি আরম্ভ করেছে রীতিমতো একেকজন। তনিমা বিরক্ত চোখে তাদের দিকে তাকাল। মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফোনের ওপাশ থেকে তাহসানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
—ওরা কী বলল?
তনিমা একটু থেমে ধামাচাপা দিতে বলল,
—ও কিছু না স্যার। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি বাসায়।
তার মিথ্যা কথা শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—তুমি যেখানে বসে আছ, সেখানেই বসে থাকবে। এক পা-ও নড়বে না।
তনিমা এবার অবাক। লোকটা একবার যেতে বলছে তো একবার বসতে। বিস্ময়ে প্রশ্ন করল,
—কী?
প্রতিউত্তরে তাহসান তাড়া দিয়ে বলল,
—এই নম্বরেই আমার হোয়াটসঅ্যাপ আছে। এখনই তোমার লাইভ লোকেশন পাঠাও।
—কিন্তু..
—নো আর্গুমেন্ট, সেন্ড ইট নাও।
কথা শেষ করেই কল কেটে দিল তাহসান। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে তাড়াহুড়ো করে কালো শার্টটা গায়ে চাপাল। টেবিল থেকে বাইকের চাবিটা তুলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পার্কিংয়ে পৌঁছে বাইকটা বের করল। ঠিক তখনই হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। “Tonima shared a live location.” লোকেশনটা একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মোবাইলটা বাইকের হ্যান্ডেলের ফোন মাউন্টে সেট করল। পরের মুহূর্তেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল। রাস্তায় হেডলাইটের আলো চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলল বাইক।
ওদিকে ক্যাফেতে বসে তনিমা বিরবির করছে। ভাবছে তাহসানের হঠাৎ কি হলো। সে কি আসছে এখানে? নানান কথা ভাবনার মাঝেই সে আরেকটা কোল ড্রিংক্স অর্ডার দিল। খেতে খেতেই নাহয় ওয়েট করবে।
রাফি আইসক্রিম খেতে খেতেই বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে বাসার পথে হাঁটছিল। আর মাত্র দুদিন পর কলেজ খুলবে, ভাবতেই মুখে হাসি ফুটে উঠছে। অনেকদিন পর আবার ভণ্ডের দলটা একসঙ্গে হবে। আড্ডা, খুনসুটি, একে অপরকে জ্বালানো, সব আবার শুরু হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই এক গলি পেরিয়ে আরেক গলিতে ঢুকল সে। হঠাৎই সামনে অস্বাভাবিক একটা দৃশ্য চোখে পড়ল।
একটা মেয়েকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চার-পাঁচজন ছেলে। নির্জন রাস্তায় মেয়েটা স্পষ্টই অস্বস্তিতে আছে। মাথায় পরিপাটি করে ওড়না টানা, কাঁধে একটা ব্যাগ। দেখে মনে হচ্ছে ভদ্র ঘরের মেয়ে। টিউশন পড়িয়ে কিংবা পড়ে বাসায় ফিরছে। মেয়েটা বারবার বলছে,
—পথটা ছেড়ে দিন, প্লিজ।
কিন্তু ছেলেগুলো পথ ছাড়ার বদলে আরও কাছে এগিয়ে এসে তাকে ঘিরে ধরছে। তা দেখে রাফির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে তার। এবার আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হল না তার। চরম রাগে হাতে থাকা আইসক্রিমটা এতক্ষণ ধরে ডং করে খেলেও এবার ভাব নিয়ে পুরোটা এক কামড়ে মুখে পুরে ফেলল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই যেন তার ভাব ফুঁস হয়ে গেল। বুক ফুলিয়ে নায়কোচিত ভঙ্গিতে দাঁড়াতে গিয়েও মুখটা কুঁচকে গেল। বরফশীতল আইসক্রিম দাঁতে লাগতেই শিরশিরে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় লাফিয়ে উঠে উফফ শব্দ করল সে। হাত দিয়ে দুগাল চেপে ধরে কোনোরকমে দাঁত চেপে আইসক্রিমটা গিলে ফেলল। তারপর দু-একবার গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বুক ফুলিয়ে নিল, যেন মাত্র কিছুই হয়নি।
এবার দাপটের সঙ্গে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে মোটা গলায় শাসিয়ে উঠল,
—এই! এখানে কী হচ্ছে?
সঙ্গে সঙ্গে সকলের দৃষ্টি তার দিকে ফিরল। রাফিকে দেখামাত্রই মেয়েটার চোখে যেন আশার আলো জ্বলে উঠল। আকুল স্বরে বলে উঠল,
—ভাইয়া, দেখুন না ওরা আমার পথ আটকেছে।
কথাটা শুনে রাফি যেন চরম রেগে গেল। নাকের পাটা ফুলিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—কীইইই! এত বড় সাহস।
তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
—আপনি এক্ষুনি বাসায় চলে যান। এদের আমি সামলাচ্ছি।
রাফির কথা শুনে চারজনই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তার দিকে এগিয়ে এল,
—এই! কে রে তুই? ওকে যেতে বলার কে?
রাফি নাকের পাটা ফুলিয়ে নির্বিকার গলায় বলল,
—তুই আমাকে চিনিস না?
একজন ভ্রু কুঁচকে বলল,
—না। কে তুই?
রাফি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল,
—ভুল করলি আমাকে না চিনে। চিনলে এতক্ষণে সম্মান করে কথা বলতি।
কথাটা শুনে ছেলেগুলো আরও ক্ষেপে গেল,
—এই, বেশি ডায়লগ মারিস না। কে তুই, সেটা বল।
তাদের একজন হাত তুলেই এগিয়ে আসছিল। ঠিক তখনই রাফি এক হাত সামনে বাড়িয়ে থামার ইশারা করল,
—এই, দাঁড়া আগে।
চারজনই কপাল কুঁচকে থেমে গেল। রাফি শান্ত গলায় বলল,
—আগে মেয়েটাকে যেতে দে। শুধু শুধু একটা মেয়ের সামনে চারজনে মিলে একজনের কাছে মার খেয়ে প্রেস্টিজ নষ্ট করবি নাকি?
কথাটা শুনে চারজনই একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রাফির আত্মবিশ্বাস দেখে তাদের মনেও মুহূর্তের জন্য সন্দেহ ঢুকে গেল। ছেলেটার ভাবসাব এমন, যেন সত্যিই বড়সড় কেউ। তাদের যেন চুটকিতে উড়িয়ে দিবে। বেশ ভেবে নেয়ে শেষ পর্যন্ত একজন বিরক্ত মুখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই, তুমি যাও।
মেয়েটা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। প্রায় দৌড়েই রাস্তা পার হতে লাগল। যাওয়ার আগে একবার ঘুরে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে বলল,
—ধন্যবাদ, ভাইয়া!
রাফি গম্ভীর মুখেই মাথা নাড়ল, যেন এসব তার কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। মেয়েটা চোখের আড়াল হতেই চারজন আবার তাকে ঘিরে ধরল। রাফি এবারও বুক ফুলিয়ে, দুই হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল,
—লজ্জা করে না? চারজনে মিলে একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বি? এই নাকি তোদের সাহস?
সঙ্গে সঙ্গে চারজনই থেমে গেল। একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—এই তুই-ই তো এতক্ষণ আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ছিলি। এখন কী ভয় পেয়ে গেলি নাকি?
রাফি শব্দ করে হেসে উঠল,
—আব্বে, তোদের ভয় পাব আমি? তোদের মতো চ্যাংড়া পোলাপান এক হাতে দশটা সামলেছি।
বুক ফুলিয়ে আরও বলল,
—দাঁড়া আগে একটু রেডি হয়ে নিই। অনেকদিন পর হাত নষ্ট করবো।
কথা বলতে বলতেই জুতোর ফিতা খুলতে শুরু করল সে। ছেলেগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। একজন কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—এই! জুতা খুলছিস কেন?
রাফি চোখ রাঙিয়ে ধমক দিল,
—হপ, জীবনে ক্যারাটে দেখেছিস? আমি ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন। ক্যারাটে ফাইটের আগে জুতা খুলতে হয়।
চারজনই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রাফি এবার দুহাতে নিজের দুই জুতা তুলে নিল। তারপর হঠাৎ তাদের পেছনের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠল,
—আরে বড় ভাই আপনি।
অপ্রস্তুত হয়ে চারজনই একসঙ্গে পেছন ফিরে তাকাল। রাফি উল্টো ঘুরে এমন দৌড় লাগাল, যেন অলিম্পিকের ফাইনাল চলছে। মাত্র দুই সেকেন্ডের মাথায় একজন ঘুরে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আরে, চাপাবাজটা তো পালাচ্ছে।
তারপর গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
—ধর! ধর বেটাকে!
পরের মুহূর্তেই চারজনই রাফির পেছনে ছুট লাগাল। কিন্তু রাফিকে ধরা কি এতই সহজ? এক গলি থেকে আরেক গলি, কখনো দেয়াল টপকে, কখনো সরু পথ গলে, কখনো ডাস্টবিন এড়িয়ে, প্রাণপণে ছুটতে লাগল সে। ছোটবেলায় গ্রামে কত কি চুরি করতে যেতে কত দৌড়ানি খেয়েছে, আজ অব্দি কেউ ধরতে পারেনি তাকে। আর এরা ধরতে পারবে এত সহজ নাকি। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় হাঁপিয়ে উঠলেও থামার সাহস নেই। মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরছে,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৫
“আজ ধরা পড়লে কেল্লা ফতে। হাড়গুড় একটাও আস্ত থাকবে না!”
শেষমেশ কোনোমতে এক বন্ধুর বাসার গেটের সামনে পৌঁছে গেল। সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে উঠে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কলিং বেল চাপতে লাগল। বুকটা ধড়ফড় করছে। দরজার দিকেই চোখ স্থির। এখন শুধু একটাই আশা, বন্ধু যেন দ্রুত দরজাটা খুলে দেয়। নইলে আজ তার খবর আছে!
—আরে স্যার! আপনি কি পিজ্জার বেঁচে যাওয়া দুটো স্লাইস খেতে এত দূর ছুটে এসেছেন….
