প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৪
সাইদা মুন
—সেদিন অফিসে জাবেদ কী করেছিল, যা তুমি আমাকে এখনও বলোনি?
প্রশ্নটা কানে আসতেই মেহরীন নিশ্চুপ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথাটা নুয়ে এল। হাত কচলাতে শুরু করেছেসে। ঘরজুড়ে নেমে এল ভারী এক নীরবতা। দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও যেন অস্বস্তিকরভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তালহা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। আর কোনো কথা বলল না। হাতে ধরা কফির শেষ চুমুকটা নিয়ে মগটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কব্জি থেকে হাতঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলে রাখল। সেখান থেকে ওয়ারড্রবের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ মেহরীন তার পথ আটকে দাড়াল। তালহা থেমে গেল। কপাল সামান্য কুঁচকে কিছু বলতে নিবে তবে তার আগেই মেহরীন হঠাৎ এক পা, এক পা করে তালহার দিকে এগোতে লাগল। তার চোখে-মুখে যেন অদ্ভুত এক দুষ্টুমি খেলা করছে। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা বাঁকা হাসিটা আরও গভীর করে সে ধীরস্বরে বলল,
—একা একটা ঘরে আপনি আর আমি, সুযোগ নেবেন না?
আচমকা এমন কথা শুনে তালহা যেন জমে গেল। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল, যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। এই মুহুর্তে এমন কথার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে লাগল। আমতা আমতা করে বলল,
—ম্…মানে? কী বলছো, মেহরীন!
মেহরীনের ঠোঁটের কোণে এবার আরও চওড়া হাসি ফুটে উঠল। তালহার এই অসহায় অবস্থাটা সে উপভোগ করছে। পরক্ষণেই এগিয়ে এসে আলতো টানে তালহার শার্টের কলারটা ধরে ফেলল। ফলে পিছিয়ে যাওয়ার পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। তালহা আরও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহরীন পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে নিজেকে একটু উঁচু করল। দুজনের মাঝের দূরত্বটুকুও যেন আরও কমে এলো। তারপর চোখে চোখ রেখে মুঁচকি হেসে গেয়ে উঠল,
“I am yours,
and you are mine,
At the end,
it’s you and I…”
অতঃপর গানের শেষ লাইনটা টেনে মৃদু হেসে তাকে হালকা ধাক্কা মেরে সরে এল সে। আর তালহা? সে এখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে বিস্ময়।
নীরবতার ইতি টেনে মেহরীন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
—কী হলো? এত ভয় পাচ্ছেন কেন?
তালহা কাশি দিয়ে উঠল। নড়েচড়ে বডি শক্ত করে দাড়াল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—কই আমি ভয় পাব কেন?
—তাহলে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন কেন?
—আমি পিছাইনি।
—ওহ! তাহলে দেয়ালটা বুঝি নিজে নিজেই আপনার পেছনে চলে এসেছিল?
কথাটা বলেই হুহু করে হেসে ফেলল মেহরীন। তালহা মাথা চুলকাল। মেয়েটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। অসহায় মুখে মাথা নাড়ল। জিজ্ঞেস করল,
—তোমার কী হয়েছে বলো তো?
—কিছুই হয়নি।
—মিথ্যা।
—আচ্ছা, একটু হয়েছে।
—কি হয়েছে?
মেহরীন ধীরে ধীরে দু’হাত পেছনে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাত অনেকটাই নেমে এসেছে। অন্ধকার আকাশের বুক চিরে গোল চাঁদটা নীরব সাক্ষীর মতো ঝুলে আছে। তার চারপাশে দু-একটি তারা মিটমিট করে জ্বলছে। জানালার ফাঁক গলে আসা শীতল বাতাসে পর্দাগুলো আলতো করে দুলে উঠছে, যেন রাত নিজেই নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না সে। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল দূরের আকাশের দিকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—জানেন, প্রথম প্রথম আপনাকে খুব রাগী মানুষ মনে হতো।
তালহার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল,
—আর এখন?
মেহরীনের চোখ তখনও জানালার বাইরেই নিবদ্ধ। শান্ত কন্ঠে জবাব দিল,
—এখন মনে হয়, আপনি রাগী নন, শুধু কথা কম বলেন।
তালহা মাথা কাত করল,
—এটা প্রশংসা, নাকি অভিযোগ?
মেহরীনের ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ভেবে বলল,
—দুটোই।
আবারও নেমে এল নীরবতা। মেহরীন জানালার বাইরের বিস্তীর্ণ অন্ধকারেই চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর তালহাও ধীর পায়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। দু’জনের কাঁধ প্রায় ছুঁইছুঁই। তালহার দৃষ্টি স্থির মেহরীনের মুখে। আর মেহরীন তাকিয়ে আছে দূরের আকাশে। সেভাবেই কাঁটতে লাগল সময়। একটা সময় মেহরীন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব আস্তে করে বলল,
—অনেক কিছু বদলে গেছে তাই না?
— হুম।
—আগে আপনাকে দেখলে ভয় লাগত।
—এখন?
—এখন…
কথাটা শেষ না করেই থেমে গেল সে। তালহা কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল উত্তরের। না পেয়ে অধৈর্য হয়ে শেষে নিজেই ফের জিজ্ঞেস করল,
—আর এখন কী?
মেহরীন ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। চোখদুটো জুড়ে গভীর প্রশান্তি। ঠোঁটে ভেসে উঠল তৃপ্ত, প্রশস্ত এক হাসি,
—এখন আপনাকে দেখলে মনে হয়, আমি নিরাপদ।
কথাটা শুনে তালহার ঠোঁটের কোণেও ধীরে ধীরে জয়ের হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই হাসি আড়াল করে মিছে উদ্বেগের ছাপ এনে গম্ভীর গলায় বলল,
—কিন্তু আমি তো এখন নিরাপদ নই।
মেহরীন কপাল কুঁচকে সোজা হয়ে তাকাল প্রশ্ন করল,
—কেন?
তালহা নিরীহ মুখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—একটু আগে কেউ একজন আমার মানহানীর চেষ্টা করছিল। নিজের ঘরেও সেইফ নই।
ফিক করে হেসে ফেলল মেহরীন। হাসতে হাসতেই বলল,
—ওহ… এই কথা। সুযোগ তো আর রোজ রোজ আসে না। তাই একবারেই ঢিল মেরেছি। যাই বলেন, আপনাকে কিন্তু বেশ অপ্রস্তুত করতে পেরেছি।
তালহা ঠোঁট কামড়ে হাসল হঠাৎই দু’হাত বাড়িয়ে মেহরীনের দিকে ঝুঁকে বলল,
—ও… তাই নাকি? তাহলে আমিও সুযোগটা কাজে লাগাই।
কথা শেষ হতেই শুরু হয়ে গেল কাতুকুতু দেওয়া। আচমকা আক্রমণে মেহরীন একপ্রকার লাফিয়ে উঠল। হাসতে হাসতে বারবার থামতে বলছে তাকে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য কখনো এদিকে, কখনো ওদিকে সরে যাচ্ছে। কিন্তু তালহার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। সে প্রতিবারই ধরে ফেলছে। শেষ পর্যন্ত হাসতে হাসতে বিছানার ওপরই লুটিয়ে পড়ল মেহরীন। হাঁপাতে হাঁপাতে তালহার দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরল,
—আর না প্লিজ। আর হাসতে পারছি না।
তালহা এবার থেমে গেল। মুখে ফুটে উঠল তৃপ্ত এক হাসি। সামান্য ঝুঁকে মেহরীনের কপালে আলতো করে একটি চুম্বন এঁকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর ওয়ারড্রবের সামনে গিয়ে টি-শার্ট বের করতে করতে বলল,
—তুমি কিন্তু দিন দিন খুব দুষ্টু হয়ে যাচ্ছ।
মেহরীন বিছানায় বসেই হেসে উত্তর দিল,
—উঁহু আপনার বউ হচ্ছি।
উত্তরটা শুনে তালহার হাত থেমে গেল। ঠোঁটের কোণে ফের ফুটে উঠল স্বস্তিমাখা, নির্মল হাসিটা । সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মেহরীনের দিকে। মেহরীনও অপলক চেয়ে আছে তারই দিকে। তার হাসিটা নজরে আসতেই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি বুঝি এই মানুষটার এমন নিশ্চিন্ত, নির্ভার হাসি। যে হাসিতে নেই কোনো ভয় কিংবা অস্থিরতা, আছে শুধু এক টুকরো শান্তি। এরই মধ্যে তালহা পাঞ্জাবিটা খুলে টি-শার্ট হাতে নিল। আচমকা খালি গায়ে দেখে মেহরীন হকচকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার সেই অপ্রস্তুত প্রতিক্রিয়াটা আড়চোখে দেখে তালহার ঠোঁটের হাসিটা আরও একটু গাঢ় হলো। টি-শার্ট পরে সে এসিটা চালু করল। তারপর দরজাটা ভেজিয়ে আবার সোফায় গিয়ে বসল। পাশের খালি জায়গাটায় আলতো করে হাত রেখে মেহরীনকে ইশারা করে বলল,
—কাম।
মেহরীন ও চুপচাপ গিয়ে বসল পাশে। মেহরীনের ডান হাতটা নিজের হাটের মুঠোয় নিল। শব্দ করে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
—মেহরীন আর ইউ ওকে?
মেহরীন কিছুক্ষণ চেয়ে রইল তালহার প্রশ্নাত্মক চোখের দিকে। পরপর আবদার করল,
—আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন?
তালহা সেকেন্ডের মধ্যে মেহরীনকে নিজের বুকে টেনে নিল। মেহরীনও তার কোমর জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটো বন্ধ করে বুকভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। তালহার শরীরের পরিচিত উষ্ণতাটা যেন তার ভেতরকে একটু একটু করে শান্ত করে দিচ্ছে। কয়েকফোটা চোখের পানি নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল। তালহা আরও শক্ত করে আগলে নিল তাকে। একসময় আলতো টানে মেহরীনকে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে দিল। এক হাত তার কোমরে, অন্য হাত পিঠে রেখে মাথাটা গুঁজে দিল মেহরীনের ঘাড়ে। শক্ত করে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। মেহরীনও তাকে ছেড়ে দিল না। বরং এক হাতে তালহার চুল টেনে ধরে, অন্য হাতটা জড়িয়ে রইল তার গলায়। দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ সেভাবেই চুপচাপ বসে রইল। এই মুহুর্তে নীরবতাটাই যেন তাদের হয়ে কথা বলছিল। বেশ কিছুক্ষন পর ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখেই তালহা শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
—মেহরীন জাবেদে সেদিন কি করেছিল বললে না।
এবার মেহরীনের হাতের বাঁধন একটু ঢিলে হয়ে এল। বুকের ভেতর জমে উঠল অস্বস্তি। চোখ বন্ধ করে নিল। নিজেকে শক্ত করে বলল,
—শ্লীলতাহানির একটা মামলাও দেবেন ওর নামে।
কথাটা শুনতেই তালহার শরীর যেন ভারসাম্যহীন হয়ে গেল। এক মুহূর্তে তার দুই হাত আলগা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথা তুলে মেহরীনের মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো প্রশ্নও নেই, শুধু ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। আলতো করে মেহরীনের গাল স্পর্শ করল। গলাটা অস্বাভাবিক রকম নিচু,
—ওইদিন তোমার গলার আঁচড়টা…
কথাটা শেষ করতে পারল না। মেহরীন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। বলল,
—হুম তারই কাজ।
এক নিমিষেই তালহার মুখের সমস্ত রং যেন বদলে গেল। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠল। আঙুলগুলো এত জোরে মুঠো করে রেখেছে যে গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। কপালের রগ স্পষ্ট ফুলে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, যেন রাগটা ধীরে ধীরে পাহাড়সম হচ্ছে। তার বুকের ভেতর যেন দাবানল জ্বলে উঠেছে। সে অবিশ্বাস্য চোখে দেখছে মেহরীনকে। তার স্ত্রী এত বড় একটা কথা তার থেকে লুকিয়েছে? এত ভয়ংকর একটা ঘটনা একা একা বয়ে বেড়িয়েছে? আর সে কিছুই জানত না। হঠাৎই নিজের সংযম হারিয়ে গর্জে উঠল তালহা,
—মেহরীন!
তার কণ্ঠের বজ্রধ্বনি ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। মেহরীন চমকে কেঁপে উঠল। তালহার চোখ দুটো রক্তিম। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ভারী শ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। সে মেহরীনকে নিজ থেকে সরিয়ে দিতে চাইতেই মেয়েটা উল্টো আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। দুই হাত দিয়ে তার গলা আঁকড়ে ধরে নিচু স্বরে ভয়ে ভয়ে বলতে লাগল,
—উনি আমাকে বাজে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। আপনি ঠিক সময়েই চলে এসেছিলেন। আমার সাথে জোরজবরদস্তি করতে সক্ষম হয়নি। বিশ্বাস করুন আমাকে সেরকমভাবে স্পর্শ করতে পারেনি..
তালহার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। তাকে থামিয়ে দিল,
—আমি তা জানতে চাইনি।
থেমে সে মেহরীনের হাত আলগা করার চেষ্টা করতে করতে রুদ্ধ গলায় বলল,
—আমি জানতে চাইছি, সেদিন তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছিলে কেন? কোন কারণে।
মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলল। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। তার সেই নীরবতাই যেন তালহার রাগকে আরও উসকে দিল। গলার স্বর আরও কঠোর হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—উত্তর দাও, মেহরীন।
মেয়েটা ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,
—আমি বলতে চেয়েছিলাম।
তালহার গলা আরও কঠিন হয়ে উঠল,
—তাহলে বলনি কেন?
মেহরীন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল। বলতে শুরু করল,
—আমি জানি আমি অনেক বড় বোকামি করেছি। কিন্তু সেদিন যখন আমার সঙ্গে জোরজবরদস্তি করার চেষ্টা করছিল, তখনও আমার প্রথম ইচ্ছে ছিল ছাড়া পেয়ে আপনার কাছেই দৌড়ে যাই। আপনার কাছেই নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু আমি পারিনি।
তালহা দু’হাতে তার বাহু চেপে ধরল,
—কেন পারনি?
মেহরীন ভেঙে আসা কন্ঠে বলল,
—ওই জানোয়ারটা আমাকে হুমকি দিচ্ছিল। আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল। বলছিল, আমি যদি আপনাকে কিছু জানাই, তাহলে আমাদের বিয়ের কথা আপনার পুরো অফিসে ছড়িয়ে দেবে। সবাইকে বলবে আপনি বাল্যবিবাহ করেছেন। আপনার সম্মান নষ্ট করে দেবে, আপনার এত বছরের গড়া সুনাম সব শেষ করে দেবে…
তার গলা কেঁপে উঠল অসহায় চোখে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে গভীর নিশ্বাস নিল। চোখের টলমল পানি যেন গাল বেয়ে না পড়ে সেই জন্য। তারপর আবারও অপরাধী কন্ঠে বলতে লাগল,
—আমি তখন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার জন্য আপনার এত বড় ক্ষতি হবে, এটা আমি ভাবতে পারছিলাম না। এমনিতেই আপনি না চাইতেও আপনার জীবনে এসে জড়িয়ে গেছি। তারপর আবার যদি আপনার সবকিছু নষ্ট হওয়ার কারণও আমি হয়ে যাই।
চোখের কোণ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল,
—তাহিয়া আমাকে আপনার সব মেডেল দেখিয়েছে। প্রত্যেকটার পেছনের গল্পও বলেছিল। বছরের পর বছর আপনি কীভাবে পরিশ্রম করে এই জায়গায় এসেছেন। কীভাবে নিজের নাম, নিজের কোম্পানিকে এই দেশের সেরাদের কাতারে দাঁড় করিয়েছেন আপনারা সব বলেছে। তখন শুধু মনে হচ্ছিল, আমার একটা ভুলে যদি আপনার সব পরিশ্রম মাটিতে মিশে যায়? আপনাদের কোম্পানি দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এমন একটা খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই সবাই জেনে যেত। তখন শুধু আপনাকেই নয়, পুরো পরিবারকেও কথা শুনতে হতো।
আরও কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল থেমে ফের বলল,
—আমি কি পারতাম যেই থালে খাচ্ছি সেই থালেই জেনেশুনে ফুটো করতে। তারউপর আবার ওই এডিট করা ছবিগুলো দেখাল। আমি তো কিছুই বুখে উঠতে পারছিলাম না। ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছিল সব শেষ। আমাদের সম্পর্কটা তো তখন সবে শুরু হয়েছিল। যদি আপনি ওই ছবিগুলো দেখে আমাকে ভুল বুঝে বসতেন? যদি একবারের জন্যও ভাবতেন আমি আপনাকে ঠকিয়েছি? যদি.. যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতেন?
চোখভরা পানি নিয়ে অসহায়ের মতো তাকাল তালহার দিকে,
—আমি আপনাকে হারানোর চিন্তাটা ভীষণ ভয় পাই। এই পরিবারকে হারানোর ভয়। বিশ্বাস করুন, সবমিলিয়ে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন, খুব। জীবনে অনেক আপন মানুষকে হারিয়েছি। সেই হারানোর কষ্টটা কতটা ভয়ংকর, আমি জানি। তাই আবার নতুন করে কাউকে হারানোর চিন্তাটুকুও আমি করতে পারিনি। তাই আমি ওই জাবেদের নামটাও পর্যন্ত মুখে আনিনি।
কথা শেষ হওয়ার আগেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেহরীন। কান্নার দমকে তার পুরো শরীর কাঁপছে। এক মুহূর্তও দেরি করল না তালহা। সে শক্ত করে মেহরীনকে নিজের বুকে টেনে নিল। এক হাত মেয়েটার মাথায়, অন্য হাত পিঠে। বারবার আলতো করে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। মেহরীন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলছে,
—আমি আপনাকে হারাতে চাই না। আপনার সঙ্গে থাকতে চাই সবসময়।
তালহা তাকে শান্ত করতে করতে বলল,
—আমি আছি তো জান। সবসময় তোমার পাশে আছি।
আদুরে গলায় তাকে শান্ত করতে চেষ্টা চালাল। কিন্তু শান্ত ছিল না সে নিজে। একটাই প্রশ্ন বারবার ছুরির মতো বুকের ভেতর বিদ্ধ হতে লাগল, যদি সেদিন সে সময়মতো না পৌঁছাত? বাকি ভাবনাটুকু আর শেষ করতে পারল না সে। শুধু কল্পনাই যেন তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে তুলল। তার বাহুর বাঁধন আরও শক্ত হয়ে গেল। যেন মেয়েটাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেল্পতে চাচ্ছে। শুধুমাত্র তার কারণে মেয়েটা এত বড় একটা বোকামি করে বসেছিল। যদি সেদিন মেহরীনের সঙ্গে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটে যেত। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তালহার। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে। দাঁত কিরমিরিয়ে বিরবির করে বলল,
—জানোয়ারের বাচ্চাকে আমি ছাড়বো না। একে জেলে পঁচিয়ে মারব।
কেটে গেল প্রায় ঘণ্টাখানেক।
মেহরীনকে শান্ত করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তালহার। একের পর এক টিস্যু নিয়ে কখনো তার ভেজা চোখ মুছে দিচ্ছে, কখনো নাক। আবার কখনো মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। অনেক ধৈর্য আর যত্নের পর শেষমেশ মেয়েটা কিছুটা শান্ত হলো। তবু দীর্ঘক্ষণ কান্নার পরের সেই রেশ এখনও রয়ে গেছে। ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে সে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
তালহা গ্লাসে পানি ঢেলে তার সামনে ধরল। মেহরীন নিজে ধরার আগেই সে নিজের হাতেই ধীরে ধীরে পানিটুকু খাইয়ে দিল। এরপর উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে মেরিল আর উলবেন নিয়ে ফিরে এল। বারবার নাক মুছতে গিয়ে নাকের চারপাশটা ঘষা লেগে লাল হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও হালকা ছুলেও গেছে। খুব যত্নসহকারে করে সেখানে সেখানে মেরিল লাগিয়ে দিল সে।
কান্নার মাঝে সেই কখনই মাথার ওড়নাটা খসে পড়েছে। খোঁপা খুলে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এবার তালহা নিজের হাতেই ধীরে ধীরে চুলগুলো গুছিয়ে বেঁধে দিল। তারপর সবশেষে ফুলে-ফেঁপে লাল হয়ে থাকা মুখখানা দুই হাতের আজলায় তুলে নিয়ে মুঁচকি হেসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
—আর কিছু লাগবে ম্যাডাম?
মেহরীন ঠোঁট উল্টে মাথা নেড়ে এবার আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
—আর আদর লাগবে।
কথাটা শুনে তালহা হেসে ফেলল। পরমুহূর্তেই ছোট ছোট অসংখ্য চুমুতে ভরিয়ে দিল তার পুরো মুখ। মেহরীনও খুশি হয়ে উঠল। এরপর তালহা আবারও জিজ্ঞেস করল,
—আর কী কী লাগবে?
মেহরীন ভাবুকস্বরে বলল,
—আর.. একটা বউ পাগল বর লাগবে।
সঙ্গে সঙ্গে তালহার উত্তর এল,
—হয়ে গেলাম বউ পাগল।
মেহরীন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসিমাখা মুখটার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তালহা। এই হাসিটুকুর জন্যই এতক্ষণ ধরে তার এত চেষ্টা, স্বস্তির নিশ্বাস নিল সে। হাসতে হাসতেই মেহরীন মাথা রাখল তালহার বুকে। তালহাও নিঃশব্দে তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিল। হঠাৎই মেহরীনের চোখ পড়ল মেঝের দিকে। মুহূর্তেই সে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল। পুরো মেঝেজুড়ে দলা পাকানো অসংখ্য টিস্যু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—একি! এতগুলো টিস্যু মেঝেতে পড়ে আছে কেন?
তালহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর মুখে বলল,
—ওগুলো টিস্যু নয়, আমার পরিশ্রমের সাক্ষী। এতক্ষণ ধরে আপনার চোখের পানি, নাকের পানি মুছেছি কী দিয়ে, বলুন তো?
মেহরীন টিস্যু বক্সটা হাতে তুলে ভেতরে উঁকি দিল। একটাও টিস্যু অবশিষ্ট নেই। অবাকস্বরেই বলল,
—তাই বলে এত টিস্যুই…
তালহা মৃদু হেসে তার মাথাটা আবার নিজের বুকে টেনে নিল,
—টিস্যু গেলে যাক। বউয়ের কান্নাটা তো থেমেছে, এটাই অনেক।
—ভাই, তুই বদলে গেছিস।
রিতুর বিস্ময়ভরা কথায় ফারাহ মৃদু হাসল। শান্ত কণ্ঠে বলল,
—উহু, আমি বদলাইনি। আমি শুধু একটা জিনিস শিখেছি, জোর করে কখনো কিছু পাওয়া যায় না। আল্লাহ যার জন্য যাকে নির্ধারণ করে রেখেছেন, শেষ পর্যন্ত সে তাকেই পায়। অন্য কেউ হাজার চেষ্টা করলেও সেই জায়গাটা দখল করতে পারে না।
রিতু পেছন থেকে এসে মনখারাপ করে ফারাহকে জড়িয়ে ধরল। তাকে সামলাতে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ফারাহ মুঁচকি হেসে বলল,
—উহু, আমাকে সান্ত্বনা দিতে হবে না। আমি একদম ঠিক আছি।
একটু থেমে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলল,
—আমি বুঝে গেছি, তালহা ভাই মেহরীনকে কতটা ভালোবাসে, কতটা বিশ্বাস করে, আর কতটা সম্মান করে। তাদের সম্পর্কের ভিত্তিটাই এত শক্ত যে, কেউ চাইলেও তাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দাঁড় করাতে পারবে না। আমিও না। তাই নিজ থেকেই সরে এসেছি। যে ভালোবাসা কোনো দিনই আমার হওয়ার নয়, তার পেছনে ছুটে নিজেকে কেন ছোট করব? শুধু শুধু নিজের নামের পাশে ‘ভিলেন’ তকমা কেন লাগাব?
থেমে রিতুর দিকে মুখ ফিরাল ভ্রু তুলে প্রশ্ন করল,
—কি ঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম না?
রিতু ছলছল চোখে ফারাহর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর কণ্ঠে যতই দৃঢ়তা থাকুক, ভেতরে জমে থাকা না-পাওয়ার কষ্টটা রিতুর চোখ এড়াল না। এত সহজে কি আর কেউ নিজের ভালোবাসাকে বিদায় জানাতে পারে? সে কিছু বলল না। শুধু মৃদু একটা হাসি হেসে মাথা নেড়ে ফারাহর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ফারাহ দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলল। চোখদুটো অন্যমনস্ক হয়ে গেল। যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, এমন স্বরে ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
—মানুষ ভিলেনদের ঘৃণা করে, আমিও করি। প্রত্যেক মানুষই নিজের জীবনের মেইন চরিত্র হতে চায়। তাহলে আমি কেন ইচ্ছে করে নিজের গল্পের ভিলেন হব?
তারপর হঠাৎই ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল,
—বরং তাদের সুখের সংসারের জন্য মন থেকে দোয়া করব। আর নিজের সময়টা এবার নিজেকেই দেব। নিজের স্বপ্ন, নিজের জীবন আর নিজের ভবিষ্যৎকে গুছিয়ে নেব। কারও জন্য কারও জীবন থেমে থাকে না। জীবন চলতেই থাকে। আর আমিও এবার সামনে এগিয়ে যেতে চাই। একদিন নিশ্চয়ই এমন একজন মানুষ আমার জীবনেও আসবে, যাকে আল্লাহ আমার জন্য লিখে রেখেছেন। যে আমাকে সব উজাড় করে ভালোবাসবে।
রিতু শক্ত করে ফারাহকে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা সরে গিয়ে জায়গা নিক স্বস্তিরা। অবশেষে মেয়েটা বুঝতে পেরেছে, এটাই তো অনেক। খুশি হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
—তুই সত্যিই সবচেয়ে বেস্ট বেস্ট। আল্লাহ অবশ্যই তোর জন্য সবচেয়ে সুন্দর পরিকল্পনাই করে রেখেছেন। শুধু একটু ধৈর্য ধর, তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখ আর সামনে এগিয়ে চল। দেখিস, একদিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবি, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার জন্য এর চেয়েও ভালো কিছুই রেখেছিলেন।’
তাহিয়া ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরেই নিচে নামার জন্য আকুপাকু করছে। অথচ ফারিস অকারণেই তাকে আটকে রেখেছে। না কোনো কথা বলছে, না কিছু করছে। শুধু একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে উঠল তাহিয়া।
—এই, সমস্যা কী? কিছু বলছেন না কেন? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
ফারিস বিরক্তিতে “চ্” ধ্বনি উচ্চারণ করল। পরপর বলল,
—আহা লিলিপুট, একটু চুপ থাকো তো! আমাকে আমার কাজটা করতে দাও।
তাহিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আপনি তো কিছুই করছেন না। শুধু শুধু আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন?
সে একইভাবে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৩
—চার্জ দিচ্ছি।
তাহিয়া হতভম্ব হয়ে তাকাল,
—কী?
ফারিস নিজের চোখের দিকে আঙুল দেখিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—আমার চোখ….
