প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭১
সাইদা মুন
—ত… তুমি?
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা একটা ধাক্কায় সামনে ছিটকে পড়ল মেহরীন। সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুম করে মেঝেতে পড়ে গেল সে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন মানুষ প্রায় ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। উপস্থিত সকলে একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তালহা ছুটে গিয়ে মেহরীনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। তার কাঁপতে থাকা হাতটা ধরে সাবধানে তাকে উঠিয়ে দাঁড় করাল।
কিন্তু মেহরীনকে সামলে সামনে তাকাতেই তার চোখের মণি রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই তার বজ্রকণ্ঠে পুরো ড্রয়িংরুম কেঁপে উঠল,
—আপনার সাহস কী করে হলো আমার বাড়িতে এসে আমার ওয়াইফকে ধাক্কা মারার?
তালহার গর্জনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠল। দরজা দিয়ে ঢোকা দুই পুরুষ আর এক মহিলা পর্যন্ত স্পষ্ট কেঁপে উঠল। এদিকে তিতলি বেগম প্রায় ছুটে এলেন মেহরীনের কাছে।
—লাগেনি তো মা? দেখি কোথায় লেগেছে…
উদ্বিগ্ন হাতে তিনি মেহরীনের হাত-পা, কাঁধ, সবকিছু দেখতে লাগলেন। মেহরীন বারবার মাথা নেড়ে না বোঝালেও তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখেমুখে এমন আতঙ্ক যেন বহুদিনের কোনো দুঃস্বপ্ন হঠাৎ বাস্তব হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তিতলি বেগমের এত আদর-যত্ন দেখে হঠাৎ তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন আগন্তুক মহিলাটি।
—এর শরীরে গন্ডারের চামড়া। একে কাটলেও ব্যথা লাগবে না। এইডা এক নম্বরের পিছলা মাইয়া। বেহায়া একটা…
কথা শেষ করতে পারলেন না। তিতলি বেগম ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরলেন। চোখ দুটো এমন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে মহিলার গলার স্বর নিজে থেকেই থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি সামনে এগিয়ে এলেন।
—কথা শুনে মনে হচ্ছে মেহরীনের খুব কাছের কেউ আপনি। কি হন?
প্রশ্নটা শুনেই মহিলার ভঙ্গি বদলে গেল। বুক ফুলিয়ে, গলা উঁচু করে বলল,
—আমি মেহরীনের চাচি। মা-বাপ মারা যাওয়ার পর এই অপয়ারে আমরাই মানুষ করছি। এইডা আমার স্বামী, মেহরীনের চাচা নিজাম শাহ। ভাইয়ের ফালাই যাওয়া ময়লারে নিজের সন্তানের মতো আদর কইরা বড় করছে। পড়ালেখা করাইছে। আর সেই মাইয়াই আমাগো মুখে চুনকালি মাইখ্যা পালাইছে!
কথাগুলো বলার সময় তার চোখেমুখে যেন করুণার চেয়ে অহংকারই বেশি ফুটে উঠছিল। তুমুল রাগ নিয়ে তাকাল মেহরীনের দিকে। যেন এক্ষুনি ছুটে গিয়ে ধরবে তাকে। তার কথায় সকলেই ধারণা পেয়ে গেল এরা কারা। তারা কোন মানুষগুলো সেগুলোও বুঝে গেল। সালমা বেগম চুপ থাকতে পারলেন না। ক্ষোভ দমিয়ে রেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে ফেললেন,
—মাত্রই তো দেখলাম আদর-যত্নের নমুনা। কত ভালোবাসতেন সেটা বুঝতে বাকি নেই।
মহিলার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কালো হয়ে গেল। আমতা আমতা করে নিজের সাফাই গাইতে যাবে তার আগেই হঠাৎ উচ্চস্বরে ডাকে উঠল তালহা,
—দারোয়ান চাচা! দারোয়ান চাচা!
ডাক শুনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হন্তদন্ত পায়ে দারোয়ান ছুটে এল। এমন রণমুর্তি দেখে সে থমথমে কন্ঠে জিগ্যেস করল,
—জি বাবা?
—এসব মানুষ ভেতরে ঢুকল কীভাবে?
দারোয়ান হতভম্ব হয়ে অপরিচিতদের দিকে তাকাল। পরপর তাড়াহুড়ো করে বলক,
—বাবা ওরা বলছিল মেহরীন মায়ের আত্মীয়। তাই ভাবলাম তার পরিবারের কেউ হইব..
তার কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে সে বলে উঠল,
—এরা মেহরীনের কেউ না। মেহরীনের একমাত্র পরিবার এই সিকদার পরিবার, এছাড়া মেহরীনের আর কোনো পরিবার নেই, পরিচয় ও নেই। কথাটা ভালো মতো মাথায় রাখবেন। আর..
তালহার কণ্ঠ বরফশীতল। ফিরল মেহরীনের চাচা-চাচীর দিকে তাদের উদ্দেশ্য করে বলল,
—মুখগুলো ভালো করে দেখে রাখুন। দ্বিতীয়বার এই বাড়ির আশেপাশে দেখলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করবেন। আর এখনই এদের বাড়ি থেকে বের করবেন এটা আমার আদেশ।
আদেশ শুনতেই দারোয়ান ঝটপট করে এগোতেই দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি হঠাৎ হেসে উঠল। হাসিটা ছিল বিষাক্ত।
—বাড়ি থেকে বের করবেন? সমস্যা নাই। আমি আবার আসব, তবে পরেরবার পুলিশ নিয়ে আসব। তারপর কালকের নিউজের হেডলাইন হবে, অল্পবয়সী মেয়েকে ভাগিয়ে এনে বাল্যবিবাহ করায় গ্রেফতার দ্য গ্রেট তালহা সিকদার।
ঘরজুড়ে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। সকলে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে ছেলেটার দিকে। তা দেখে সে আরও বিকৃত হাসল সকলের দিকে চেয়ে বলল,
—আপনারা কি চান আপনাদের বিখ্যাত ভদ্র জ্যান্টেলম্যান ছেলেটার চরিত্রে এমন দাগ লাগুক? এতে কিন্তু ক্যারিয়ারেও এফেক্ট পড়বে।
তালহা মেহরীনকে ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ছেলেটা আর কেউ না জাবেদ। একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল তার। তারপর দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ঠাণ্ডা চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল,
—ইউ জাবেদ, যাকে অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম তাও আবার শখানেক স্টাফদের সামনে, আম রাইট?
জাবেদের মুখ বিকৃত হয়ে উঠল। অপমান ভেসে উঠল চোখে। দাঁত খিচিয়ে চেয়ে রইল সে। তালহা আবারও কটাক্ষ করে বলল,
—তোর মতো চুনোপুঁটি আমাকে ভয় দেখাচ্ছে?
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল তার,
—হাউ ফানি।
আরও এক পা এগিয়ে গেল সে,
—মার খেয়ে, অপমানিত হয়ে পেট ভরেনি? আবার খেতে এসেছিস?
জাবেদ শক্ত মুখে চেয়ে আছে। তবে তালহার কথায় নিজের মেজাজ বিগড়াল না। সে তো এসেছে নিজের অপমানের বদলা নিতেই। তাই হাতে না মেরে ভাতে মারতে চায় সে। নিজেকে শান্ত রেখেই সে মেহরীনের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিরি এক হাসি দিয়ে বলল,
—কার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্যার? এই মেয়ের জন্য? যার চরিত্রের ঠিক নাই? যে কিনা ঘুমায় এক ছেলের সাথে পালায় আরেক ছেলের সাথে।
বাক্যটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তালহার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রাগ চরমে। ঝটকা মেরে জাবেদের কলার চেপে ধরল সে। প্রচন্ড রাগে চোখে যেন আগুন টগবগ করছে। কলার এমনভাবে চেপে ধরেছে যে ছেলেটার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।
—জানোয়ারের বাচ্চা! তোর সাহস হলো কি করে আমার বউকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলার।
পুরো ঘরে হইচই শুরু হয়ে গেছে। সালমা বেগম, বিল্লাল সাহেব, মেহেদি, সবাই মিলে তালহাকে সরানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে নিজাম শাহ আর মহিলাটি মরিয়া হয়ে জাবেদকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন ড্রয়িংরুমটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। জাবেদের অবস্থা নাজেহাল। নিজেকে ছাড়াতে না পেরে হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে।
আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝখানে মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। গুটিসুটি মেরে। কাঁপতে থাকা দুই হাত বুকের কাছে চেপে ধরে। চোখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। তার মনে হচ্ছে সেই অন্ধকার অতীত যে ফেলে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিল তা আবার তাকে গিলে খেতে ফিরে এসেছে। তার সুখ তার এত সুন্দর একটা পরিবার সব গিলে খেতে এসেছে তারা। তবে কি সব পেয়ে আবার হারাতে যাচ্ছে সে। কয়েককদম পিছিয়ে যেতেই হঠাৎ কাধে কারো হাতের সাহারা পেতেই চোখ তুলে তাকাল। দেখল রিতুকে। তাকে চোখের ইশারাতেই শক্ত করতে চাইছে মেয়েটা। আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে রাখল। যেন চাচ্ছে না মেয়েটাকে এই মুহুর্তে একাকিত্ব অনুভব করতে দিতে। বলতে চাচ্ছে আমরা আছি। পাশ থেকে ফাইজাও এক হাতে মেহরীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ফিসফিসিয়ে বলল,
—ভয় পেয় না মেহরীন, আমরা আছি তোমার পাশে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাকিরা মিলে তালহাকে ছাড়িয়ে আনতেই বিল্লাল সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিলেন,
—তালহা! শান্ত হও। এখন মাথা গরম করার সময় না।
সবাই থেমে গেল। তালহা কিছুটা শান্ত হলো। তবে তার মন শান্ত হয়নি। বিল্লাল সাহেব নিজাম শাহের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর যথাসম্ভব ভদ্রতা বজায় রেখে বললেন,
—যেহেতু আপনারা এতদূর থেকে এসেছেন, নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে। চলুন, বসে কথা বলা যাক।
তাদের সোফায় বসতে বলা হলো। কিন্তু ঘরের পরিবেশে আতিথেয়তার লেশমাত্র নেই। যে বাড়িতে কোনো ফকির এলেও তাকে শরবত না খাইয়ে ফেরানো হয় না, সেই বাড়ির তিন গিন্নির একজনও আজ উঠলেন না। প্রচন্ড ঘৃণা মনে নিয়ে নিয়ে বসে রইলেন। কারণ এরা সেই মানুষ, যাদের নাম শুনলেই মেহরীনের মুখে আতঙ্ক নেমে আসে।
তিতলি বেগম মেহরীনকে নিজের একদম পাশে বসিয়ে রাখলেন। এক হাত শক্ত করে তার কাঁধ জড়িয়ে। অন্য পাশে গিয়ে বসলেন তানিয়া বেগম। পেছনে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে রিতু, ফাইজা, তাহিয়া আর মেহেদি। পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে তালহা। তার দৃষ্টি একবারও সরছে না মেহরীনের দিক থেকে। যেন পৃথিবীর কেউ তাকে ছুঁতে চাইলে প্রথমে তালহার ওপর দিয়েই যেতে হবে।
এই দৃশ্য দেখে মেহরীনের চাচি স্পষ্ট অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কি বলবে না বলবে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সে ভেবেছিল মেয়েটাকে হয়তো কাজের লোকের মতো ব্যবহার করা হয়। বড়লোক বাড়ি তার মতো মেয়েকে আর কিভাবেই বা রাখবে। কিন্তু এখানে এসব যেন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এরা তাকে আগলে রেখেছে পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সদস্যের মতো। চিন্তার বাহিরে। রাগ আরও গাঢ় হলো মেহরীনের উপর। তার এই সুখ সে টিকতে দিবে না। মনে মনে ফন্দি আঁটতে লাগল সে।
বিল্লাল সাহেব দুহাতের আঙুল জোড়া লাগিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। তারপর ধীর, স্থির অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
—এবার বলুন।
ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। তার চোখদুটি একে একে তিনজনের ওপর ঘুরে গেল,
—আপনারা আসলে কী চান? কী উদ্দেশ্যে এসেছেন এখানে?
প্রশ্নটা ছুড়ে দিতেই জাবেদ একটা খাম বের করল। সকলের মাঝে রেখে বলল,
—এখানে আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আছে।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। জাবেদ ধীরে ধীরে হাতে থাকা খামটা টেবিলের ওপর রাখল। তার ঠোঁটের কোণে তখনও সেই আত্মতৃপ্তির হাসি। ঘরে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে খামটার দিকে। যেন ওটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে কোনো বিস্ফোরণ।
জাবেদ ধীরেসুস্থে খাম খুলল। তারপর একগুচ্ছ ছবি বের করে টি-টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গেই সময় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল মেহরীনের। নীরবতা নেমে এল ড্রয়িংরুমে, ভয়ংকর এক নীরবতা। সামনে রাখা ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে মেহরীন আর জাবেদকে। একটায় মেহরীন জাবেদকে জড়িয়ে ধরে আছে। আরেকটায় দুজনের হাসিমুখের সেলফি। কোথাও জাবেদের হাত মেহরীনের কোমরে। কোথাও দুজন পাশাপাশি বসে। প্রথম দেখায় যেকোনো মানুষের কাছেই মনে হবে, তারা বেশ ঘনিষ্ঠ। তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে।
তানিয়া বেগম বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলেন। সালমা বেগমের কপাল কুঁচকে গেল। রিতু, ফাইজা, তাহিয়া একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। বিল্লাল সাহেব ও আফতাব সাহেব চোয়াল শক্ত করে বসে আছেন। আর মেহরীন… ছবিগুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই যেম তার দুনিয়া ঘুরতে লাগল। অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল টেবিলের দিকে। আস্তে আস্তে জামাটা শক্ত করে খামচে ধরল। মাথাটা নুইয়ে পড়ল। থুতনি গলায় ঠেকতেই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ার জন্য ছটফট করছে। ভীষণ অসহায়বোধ করতে লাগল। মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে আবার সেই পুরোনো অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিতে চাইছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, উপস্থিত সকলের মাঝে শান্ত মানুষটা হলো তালহা। ছবিগুলোর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে জাবেদের দিকে তাকাল। জাবেদ তখন বিজয়ীর হাসি হাসছে। যেন সে যুদ্ধ জিতে গেছে। কিন্তু তালহার মুখে রাগ নেই, না আছে কোনো বিরক্তি। আশ্চর্যও নেই। বরং তাকে আরও বেশি শান্ত দেখাচ্ছে। যেন এগুলো কিছুই না।
সে ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে নিল। যেন নাটকের দর্শক হয়ে বসেছে। এই দৃশ্যটা জাবেদদের আত্মবিশ্বাসে প্রথম চিড় ধরাল। নড়েচড়ে একে অপরের দিকে চাইল তারা। এরইমধ্যে বিল্লাল সাহেব গর্জে উঠলেন,
—এসব কী?
এবার যেন সুযোগ পেল তারা নিজেদের চাল চালার। দ্রুত জাবেদ কিছু বলার আগেই মেহরীনের চাচি মুখ খুলল,
—জাবেদ আমার ভাইয়ের ছেলে। এই নষ্ট মাইয়া আমাদের ছেলেরে ফুসলাইয়া ফাসলাইয়া নষ্টামি করছে। পরে যখন গ্রামের মানুষ ধরছে তখন আমরা ভালোর জন্য জাবেদের সাথে বিয়া দিতে গেছি। আর এই মেয়ে বিয়ার রাতেই পালাইতে চেষ্টা করছে গ্রামেরই আরেক ছেলের লগে। কিন্তু ওই ছেলে এই মেয়ের কথায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নাই।
তানিয়া বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেল। কথার মাঝে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কিন্তু মেহরীনের তো বয়স্ক লোকের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আর সে কারো সাথে পালিয়ে নয় বরং এমন অসম বয়সী বিয়ে থেকে বাঁচতেই সে পালিয়েছিল।
সঙ্গে সঙ্গে চাচি মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠল,
—দেখছেন দেখছেন, আপনাগো ব্রেইন ওয়াশ করা হয়ে গেছে। এই মেয়ে যেই মিথ্যাবাদী। আপনাদের ফাঁসাইতে ওইদিন মিথ্যা কইছে। আমরা কেন বুড়া লোকের সাথে বিয়া দিব? গ্রামে গিয়া খোঁজ নেন। এই মেয়ের চরিত্র কেমন, সবাই জানে। গ্রামের এমন কোনো পোলা নাই যার ল…
—তাহলে এই কারণেই সেদিন অফিসে তুমি জাবেদকে দেখে এত ভয় পেয়েছিলে?
হঠাৎ তালহার কথায় থেমে গেল তিনি। সবার দৃষ্টি একসঙ্গে ঘুরে গেল মেহরীনের দিকে। মেহরীনও চমকে উঠল। মাথা তুলে তাড়াতাড়ি তাকাল তার দিকে। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে তো সেদিন জাবেদের কথা বলেনি! তাহলে তালহা জানল কীভাবে? তার অবাক মুখটা দেখে তালহা মৃদু হেসে মাথা কাত করল।
—তুমি সত্যিই অনেক সরলসোজা একটা মেয়ে। ভাবছ আমি জানলাম কী করে?
তালহার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল,
—আমাদের অফিসের প্রতিটা করিডোরে, প্রতিটা কোণায় কোণায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, মিসেস সিকদার।
তারপর উঁচু গলায় যোগ করল,
—এত বেখেয়ালি হলে চলে? অফিসে মাঝেমধ্যে একটু-আধটু যাবেন, সব খোঁজখবর নিবেন, ম্যাম। কদিন পর যখন অফিসের শেয়ার আপনার নামে হবে, তখন কিন্তু দায়িত্ব আরও বেড়ে যাবে।
কথাটা যেন স্বাভাবিকভাবেই বলল সে। যেন বিষয়টা বিশেষ কিছুই নয়। কিন্তু কথাটা শুনে ঘরে উপস্থিত কয়েকজনের মুখের রংই বদলে গেল। মেহরীন নির্বাক। সে শুধু তালহার দিকে তাকিয়ে আছে। তালহার প্রথম কথাটাও তার মাথায় পুরোপুরি ঢোকেনি, সেখানে শেষের কথাটা যেন কানেই আসেনি।
ওদিকে জাবেদের চোখ প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। অফিসের শেয়ার মেহরীনের নামে? সে কি ঠিক শুনছে? কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠল,
—কি বললেন?
ঘরের সবাই তার দিকে তাকাল। তার এমন আচরণ দেখে সকলের চোখেমুখেই বিরক্তি ফুটল। জাবেদ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে জিজ্ঞেস করল,
—অফিসের শেয়ার… মেহরীনের নামে দিবেন?
তালহা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
শুধু একটা শব্দ। কিন্তু সেই এক শব্দ যেন বোমার মতো বিস্ফোরিত হলো। জাবেদ ধপ করে উঠে দাঁড়াল। তারপর কয়েক কদম এগিয়ে এল তালহার দিকে। মুখে অবিশ্বাস, চোখে ঈর্ষা আর ক্ষোভ। সে যেন মানতেই পারছে না কথাটা। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
—আপনার এত বড় অফিসের শেয়ার আপনি মেহরীনের নামে করে দিবেন? এই মেয়ের নামে কেন?
এইবার নিজাম শাহ আর তার স্ত্রীও বসে থাকতে পারলেন না। তারা দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। এবার তাদের চোখেমুখে বিস্ময়ের চেয়ে ঈর্ষাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। এতক্ষণের লুকানো রূপ সামলে এল বলে। প্রায় চেচিয়ে তারা বলল,
—এত জায়গা-জমি, এত সম্পত্তি, সব এই অপয়ার নামে?
—এর কী যোগ্যতা আছে এসবের? ভুল করছ বাবা।
মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলল। হতাশার তপ্ত এক শ্বাস বেরিয়ে গেল বুক চিড়ে। এই মানুষগুলো কখনো তাকে মানুষ হিসেবে দেখেইনি। তাদের কাছে সে সবসময়ই ছিল বোঝা। অপ্রয়োজনীয়। অবাঞ্ছিত। এবং সবচেয়ে ফেলনা জিনিস। তাদের থেকে এসব কথা আর তেমন কি। কিন্তু তালহা? একবার তার দিকে নরম চোখে চাইল। সে সোফায় হেলান দিয়েই বসে আছে। মুখে সেই একই শান্ত ভাব। এই লোকটা তাকে এত বিশ্বাস করে? এত মর্যাদা দিচ্ছে? বিশ্বাসই যেন হচ্ছে না মেহরীনের। ক্ষনে ক্ষনে মনে হচ্ছে সে কোনো স্বপ্ন দেখছে যা ঘুম ভাঙলেই শেষ।
তালহার কন্ঠস্বরের পরিবর্তন ঘটল কিছুটা। কঠিন হয়ে এল মুখভঙ্গি। শব্দটা যেন আস্তে করে পুনরাবৃত্তি করল সে,
—যোগ্যতা? মজার কথা বললেন তো।
একটু থেমে মেহরীনের দিকে ইশারা করল। তার কণ্ঠ এবার দৃঢ় ও স্পষ্ট করে বলল,
—এই মেয়েটা আমার স্ত্রী। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। এটাই তার যোগ্যতা। তাছাড়া আমার সম্পত্তি কার নামে থাকবে, সেটা ঠিক করার জন্য আমি আছি। নো নিড ইউর ফালতু আদেশ।
তাদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। রাগে চেয়ে আছেন মেহরীনের দিকে। তালহা এবার ঠাণ্ডা স্বরে শেষ কথাটা বলল,
—সম্পত্তিটা আমার। আর এই মেয়েটাও আমার। তাই ডিসিশন ও আমারই।
তারা নিঃশব্দ হয়ে গেল। তাহিয়া তো ভাইয়ের কথায় বাহ বাহ দিয়ে উঠল। তবে এতে মেহরীনের চাচি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন তৎক্ষণাৎ,
—বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নাও এই মেয়ে…
এবারও তালহা তাকে থামিয়ে দিল। তার কথা তোয়াক্কা না করে দুআঙ্গুলে কপালে স্লাইড করতে করতে বলতে লাগল,
—আসলে আমার বাবা সবসময় বলতেন, সবচেয়ে বড় ভরসা হলো নিজের মানুষ। আমি আর আমার বোন পৃথিবীতে আসার আগ পর্যন্ত আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র মালকিন ছিলেন আমার মা। তিনি নিজের সবকিছু নিঃসংকোচে আমার মায়ের নামে লিখে দিয়েছিলেন। তাই আমিও ভাবলাম, বাবার পরম্পরাটা বজায় রাখি। আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ যদি আমার স্ত্রী হয়, তাহলে আমার সম্পত্তির মালিকও সে-ই হবে। এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে? আমার কাছে তো ব্যাপারটা একদমই স্বাভাবিক। ঠিক বললাম না আম্মু?
তিতলি বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে। চোখেমুখে স্পষ্ট গর্বের ছাপ। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল প্রশস্ত এক হাসি। মুহূর্তের জন্য যেন বহু বছর আগের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। ঠিক এমনভাবেই কথা বলতেন তার স্বামী। একই রকম নির্ভার ভঙ্গি, একই রকম দৃঢ় বিশ্বাস, একই রকম অকপট ভালোবাসা। আজ ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তার বাবারই প্রতিচ্ছবি সামনে বসে আছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে ভরে উঠল। তিনি স্নেহভরা চোখে তালহার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। মুখে কিছু বললেন না, তবে তার সেই হাসি আর চোখের ভাষাই যেন বলে দিল, “একদম ঠিক বলেছিস বাবা।” পাশে বসে থাকা বিল্লাল ও আফতাব সাহেবও মুচকি হেসে ফেললেন।
তালহা এবার টেবিলের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
—দেখলাম ছবি। এবার?
জাবেদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ক্ষোভ জমতে লাগল মেহরীনের প্রতি। রাগে একবার তার দিকে তাকাল। মেহরীন তখন অবাক চোখে তালহাকে দেখছে। রাগে হাত মুঠো করে ফেলল। দাঁত কিরমিরিয়ে সে প্রায় চিৎকার করেই বলল,
—এবার মানে? এই ছবিগুলো দেখেও আপনি শান্ত আছেন?
—শান্ত থাকার কথা না বুঝি?
তালহার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল,
—আসলে নাটকের স্ক্রিপ্টটা আগে পাইনি তো। তাই প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি কি রিয়াকশন দিব।
জাবেদ নাজির শাহ ও উনার স্ত্রী স্তব্ধ। জাবেদের মুখে বিভ্রান্তি স্পষ্ট হলো। চাচি রেগে উঠল,
—নাটক মানে কী? আমরা কি নাটক করছি?
তালহা অবাক হওয়ার ভান করল,
—ওহ!
থেমে একটু ভেবে বলল,
—তাহলে নাটক না?
তারপর চারপাশে তাকিয়ে মাথা নাড়ল,
—সরি সরি। আমি ভেবেছিলাম নাটক চলছে। তবে লাইট ক্যামেরা তো নেই। তারমানে এখনো শুধু রিহার্সেলই চলছে।
তার কথা শেষ হতে না হতেই মেহেদি তাহিয়া রিতু ফাইজারা হু হু করে হাসতে লাগল। এক পাশে দাঁড়িয়ে ফারাহ ও মুখে হাত দিয়ে হালকা হাসল। মেহেদি তো পপকর্ন আনতে ছুটে গেল।
এমন অপমানে জাবেদদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ তাদের গালে চপেটাঘাত করেছে। থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছে তারা। কারণ তারা ভেবেছিল ছবিগুলো দেখেই এই পরিবার মেহরীনকে ঘৃণা করবে। ফাটল এভাবেই ধরাতে পারবে তারা। তারপর নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবে। কিন্তু উল্টো হলো সব। সবাই আরও একজোট হয়ে যাচ্ছে তার দিকে ।
চাচি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। আঙুল তুলে তিতলি বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—আপা, এই মাইয়া আপনার পোলারে জাদু করছে। এই মাইয়া অনেক পোলার জীবন নষ্ট করছে। দেখবেন আপনার ছেলের সম্পত্তি নিজের নামে করে পরে পালাবে। এর মা যেমন আমার ভাসুরের সব শেষ করছে, এইডাও আপনার পোলারে শেষ করব!
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তিতলি বেগম উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখদুটো রাগে জ্বলছে। কণ্ঠস্বর এতটা কঠিন হয়ে উঠল যে পুরো ঘর কাঁপিয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন,
—চুপ!
এক মুহূর্তে তিনি থেমে গেল। তিতলি বেগম এক পা সামনে এগোলেন
—আর একটা শব্দ বললে আমি ভুলে যাব আমার সীমা কোথায় শেষ। আমার বোনের নামে আর একটা বাজে কথা বললে নিজের হাতেই থাপ্পড় মেরে মুখ বন্ধ করে দেব।
মেহরীনের চাচির মুখের রং বদলে গেল,
—বো…বোন?
শব্দটা প্রায় ফিসফিস করে বের হলো তার মুখ থেকে। তিতলি বেগম এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—হ্যাঁ। মেহরীনের মা আমার একমাত্র ছোট বোন ছিল। আমার আপন ছোট বোন।
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেন তাদের কানে বজ্রপাত হলো। জাবেদের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিজাম শাহ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। আর চাচির মুখ তো হা হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো শব্দ করতে পারল না। শুধু অবিশ্বাসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। অবশেষে নিজাম শাহ শুকনো গলায় বলল,
—মানে… আপনি… মেহরীনের খালাম্মা? খালাম্মা?
তিতলি বেগম ধীরে ধীরে মেহরীনের কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর মেয়েটাকে নিজের দিকে টেনে নিলেন। মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। উনার কোমর জড়িয়ে ধরল সে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। তিতলি বেগম তার মাথায় হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—হ্যাঁ। আমি মেহরীনের খালাম্মা। এবং আমি শুধু তার খালাম্মাই না। আমি তার মা।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ভারী পরিবেশটাকে অদ্ভুত করতে হাজির হলো মেহেদি। তার হাতে দুই প্যাকেট ভাজা পপকর্ন। আজ বাইরে থেকে আসার সময় কিনেছিল। এসেই এক প্যাকেট ফাইজার হাতে ধরিয়ে দিল। আরেকটা নিজে খুলে তাহিয়ার দিকে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিল, নিজেও দিব্যি খেতে শুরু করল। তাহিয়া তা দিয়ে খে একটা পপকর্ন তুলে মুখে পুরে নিল।
এদিকে জাবেদ, সালমা বেগম আর নিজাম শাহ তখনো থম মেরে দাঁড়িয়ে। মুখে কোনো কথা নেই। কী বলবে যেন খুঁজেই পাচ্ছে না। তাদের এই নীরবতা দেখে মেহেদির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে অবাক চারিদিক পরখ করে বলে উঠল,,
—কী হলো আংকেল-আন্টি?
আরেক পপকর্ন মুখে পুরে যোগ করল,
—থামলেন কেন? শুরু করুন।
কথাটা সে সরল মনে বললেও কারো গায়ে কাঁটার মতো বাধল। মেহরীনের চাচী এমনভাবে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন যে মেহেদি প্রায় নড়েচড়ে উঠল। আমতাআমতা করে বলল,
—আ…আমি মানে…
সে থতমত খেয়ে পেছনে সরে গেল। তাহিয়া ভাইকে সামলাতে হাসি চেপে বলল,
—আন্টি, ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ।
এক হাত তুলে মেহেদির দিকে ইশারা করল,
—আসলে পৃথিবীতে এটাই ওর প্রথম জীবন। তাই অভিজ্ঞতা একটু কম। কোথায় কী বলতে হয়, এখনও ভালোভাবে শিখতে পারেনি।
তার কথার দুই সেকেন্ড যেতে না যেতেই পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। ফাইজা প্রথমে হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসি শুনে তারপর রিতু। তারপর ফারাহ। মেহেদি নিজেও বুঝতে পেরে অটঠাসিতে মেতে উঠল। একেকজনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এখনই মেঝেতে গড়াগড়ি খাবে।
তিন গিন্নির অবস্থাও খুব একটা ভালো না। তারা প্রাণপণে ঠোঁট চেপে রেখেছেন। কিন্তু চোখের কোণে জমে ওঠা হাসি লুকানো যাচ্ছে না। ছেলেমেয়েগুলো ভীষণ ফাজিল। সিরিয়াস মোমেন্টেও এমন অপদস্ত এক অবস্থা করেছে।
মেহরীনও পর্যন্ত হাসছে। এতক্ষণ কান্নায় ভেজা মুখ নিয়ে বসে থাকা মেয়েটার ঠোঁটের কোণে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠল। কান্নার মাঝেই ফিক করে হেসে ফেলেছে সে। তালহার চোখ তখন তার দিকেই ছিল। মেহরীনের মুখে হাসিটা ফুটতেই বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা উত্তেজনাটা একটু নরম হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
অন্যদিকে জাবেদদের মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো। তারা এসেছিল ঝড় তুলতে। কিন্তু এখানে এসে যেন তাদের উপরই ঝড় এসেছে। তাদের কথায় কেউ গুরুত্বই দিচ্ছে না, বরং মাঝেমধ্যে সবাই মিলে তাদের উপস্থিতিকেই উপহাস করছে। তুমুল রাগে অপমানে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে।
অবশেষে বিল্লাল সাহেব গম্ভীর গলায় ধমক দিলেন,
—কী হচ্ছে এসব? এখন কি হাসাহাসির সময়?
মুহূর্তেই সবাই সোজা হয়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর আবার চুপ। যেন কিছুই হয়নি। ফাইজা মুখ চেপে ধরল। রিতু মাথা নিচু করে ফেলল। মেহেদি তাহিয়ার পেছনে লুকিয়ে হাসছে। ফারাহ ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। তাহিয়া তো স্ট্যাচু হয়ে গেছে যেন। কিন্তু তিন সেকেন্ডের বেশি কেউ টিকতে পারল না। হাসির শব্দ ফের বের হলোই।
রিতু ফিসফিস করে বলল,
—সরি আব্বু…
তারপর মেহরীনের চাচা-চাচীদের দিকে চেয়ে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭০
—কিছু মনে করবেন না, আসলে পৃথিবীতে এটা আমাদেরও প্রথম জীবন, তাই অভিজ্ঞতা একটু কম।
এই মুহুর্তে বিল্লাল সাহেব কেশে উঠলেন হঠাৎ। আসলে তিনি কাশির আড়ালেই হাসি চাপার চেষ্টা করছেন। আর সেটা দেখেই আবার পুরো ঘরে আবারও হাসির বিস্ফোরণ ঘটল।
শুধু তিনজন মানুষ হাসল না। তারা বসে রইল কাঠের মূর্তির মতো। শুধু রাগে জিদে ফুঁসছে তারা। এসবের মাঝেই তালহা কাউকে কল করল….
